ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৮
রিক্তা ইসলাম মায়া
রিফাত বিছানায় হাত-পা মেলে শুয়ে। পায়ের কালো সুজগুলো নিয়েই শুয়ে পড়েছে সে। একটু ক্লান্ত লাগছে, তাই দশ মিনিট রেস্ট নিতে এসেছে। ঢাকা থেকে রিফাতের গ্রামীণ পরিবেশ বেশ ভালো লাগছে। এবার সপরিবারে মারিদদের শ্বশুরবাড়িতে এসেছে। রিফাত বেশ এনজয় করছে। দুহাতে মুখের উপর ফোন ধরে রেখেছে। সবটুকু মনোযোগ ফোনের স্ক্রলে। এখানে নেটওয়ার্কের বেশ সমস্যা। ঘরের ভেতরে নেটওয়ার্ক পাওয়াই যায় না। তারপরও রিফাত ফেসবুক স্ক্রল করছে। তনিমা ঘরে ঢুকেছে রিফাত বুঝতে পারেনি। খাটের পাশে দাঁড়িয়ে তনিমা মাথার ঘোমটা একটু টেনে নিল। ঘরের লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে রেখেছে রিফাত। তনিমা নরম স্বরে রিফাতকে ডেকে বলল—
‘ এই, ঘরের সুইচবোর্ড কোথায়?
মেয়েলি রিনরিনে গলার স্বরে রিফাত চমকে উঠে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। হাতের ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তনিমার মুখে আলো ফেলতেই তনিমা নিজের মুখে হাত রাখে আলো রোধ করতে। রিফাত হতবাক গলায় বলে—
‘ আপনি এখানে?
‘ জি, আমি এখানে। প্লিজ আলো সরান, আমার চোখে লাগছে।
রিফাত ফোনের আলো ফ্লোরে ফেলে বিচলিত ভঙ্গিতে বলে—
‘ আপনি এখানে কেন এসেছেন? কেউ দেখলে কী বলবে?
তনিমা নিজের মুখ থেকে হাত সরিয়ে শান্ত স্বরে জবাব দিয়ে বলল
‘ আমার জানা মতে, কেউ দেখলে ভালোই বলবে হয়তো। জামাই-বউ এক ঘরে থাকা জায়েজ। তাছাড়া আপনার আম্মা আমাকে পাঠিয়েছেন। তাই কেউ দেখলেও কিছু বলবে না।
রিফাত এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিল সে আর সিঙ্গেল নেই; বিবাহিত পুরুষ। তনিমা ওর ছাত্রী নয়, বউ হয়। রিফাতের বিচলিত ভাব কমে এল। সে স্বাভাবিক হয়ে বসল। কিন্তু তনিমার হঠাৎ উপস্থিতিতে সে খানিকটা ইতস্তত বোধ করছে। রিফাত বলল—
‘ আম্মা আজাইরা মানুষ। আপনাকে অমনি পাঠিয়েছেন হয়তো আমার ঘরে।
‘ অমনি উনি পাঠাননি। আমি এসেছি আপনার আম্মাকে বলে।
রিফাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে…
‘ কেন এসেছেন? কিছু বলবেন?
‘ জি আমার কিছু কথা আছে আপনার সাথে। তাই এসেছি। কেন আপনার কোনো কথা নেই আমার সাথে?
রিফাত বুঝতে পারল তনিমা তার মুখোমুখি হতে চাচ্ছে। কিন্তু মারিদের শ্বশুরবাড়িতেই যদি রিফাত বলে দেয় তনিমাকে চিঠি সে লেখেনি, মারিদ লিখেছে—তাও তো নিশ্চিত নয়; মারিদ তনিমাকে চিঠি লেখে কি না সেটাও বলা যাচ্ছে না। মারিদ বলছে সে অপরিচিতাকে চিঠি লিখেছে, আর তনিমা বলছে সে মারিদকে লিখেছে—এখানে একটা কনফিউজড পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে। এসব কনফিউশন পরিস্থিতির জটিলতা ভাঙতে গেলে হাঙ্গামা সৃষ্টি হবে। এসব হাঙ্গামা মারিদের শ্বশুরবাড়িতে করা যাবে না। আবার তনিমাকেও সে মিথ্যা বলবে না। সে আপাতত তনিমাকে জানিয়ে রাখবে যে সে তনিমার চিঠিওয়ালা নয়। তনিমার চিঠিওয়ালা কে সেটা রিফাত এই মূহুর্তে সঠিক জানে না, তবে সে কার পরবর্তীতে গিয়েছিল সেই নামটা বলবে ঢাকা ফিরে এখন না। তখন আপোসে তনিমা আর মারিদ নিজেদের ঝামেলা মিটিয়ে নেবে, এসবে রিফাত নেই। রিফাত নিজেকে প্রস্তুত করে ভদ্রভাবে বলে—
‘ আচ্ছা, আপনি বসুন, আমি ঘরের আলো জ্বালছি আগে।
রিফাত উঠতে চাইলে তনিমা বাধা দিয়ে বলে—
‘ আপনার আপনার উঠতে হবে না। আমাকে বলুন, আমি ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি।
‘ আপনার ডান পাশে একটা সুইচবোর্ড আছে দেখুন।
রিফাত ফোনের আলো সেদিকে ধরলে তনিমা ঘরের আলো জ্বালায়, ঘরের কাঠের দুপাটের দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তনিমাকে দরজা লাগাতে দেখে রিফাত খানিকটা কপাল কুঁচকে বলল—
‘ আপনি দরজা লাগাচ্ছেন কেন?
‘ বাড়িতে অনেক মানুষ আছে। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না আমাদের কথা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি শুনুক?
রিফাত চুপ করে যায়। তনিমা রিফাতের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে খাটের কিনারায় বসে। ইতস্তত ভাব নিয়ে দুজনই চুপ রইল কিছু সময়। কে কোথা থেকে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। রিফাত তো জানেই না চিঠিওয়ালার কী কাহিনি, সে আগে কথা শুরু করবে কীভাবে? রিফাতকে চিন্তামুক্ত করে তনিমা কিছু সময় নিয়ে রয়েসয়ে বলে—
‘ আপনি আমাকে ইগনোর করছেন কেন? আপনি তো জানেন আমি কে? আমাদের কীভাবে পরিচয় হয়েছিল। হতে পারি আমি আপনার ছাত্রী, কিন্তু এখন আমাদের মাঝে একটা সুন্দর সম্পর্ক আছে। আপনি কোনোভাবে কি বিয়েটা অস্বীকার করতে চাচ্ছেন? সেজন্য আমাকে ইগনোর করছেন?
তনিমা প্রথম কথা বলাতে রিফাত কাছে বিষয়টা সহজ হয় কথা বলতে…
‘ দেখুন মিস তনিমা, আপনাকে সরাসরি কিছু কথা বলি, মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। আশা করছি আপনি বিষয়গুলো মিউচুয়ালি হ্যান্ডেল করবেন। কারণ আমরা এখন মারিদের শ্বশুরবাড়িতে আছি, তাই হাঙ্গামা করবেন না, কষ্ট লাগলেও বিষয়গুলো আপাতত মনে চেপে রাখবেন। ঢাকা ফিরে আমরা আবার এসব বিষয়ে কথা বলব, বুঝতে পেরেছেন?
রিফাত মূল কথা শুরু করার আগেই তনিমাকে সতর্ক করে নিল, রিফাতের কথায় হাঙ্গামা কিংবা কান্নাকাটি না করতে। তনিমা রিফাতের কথায় কপাল কুঁচকে বসে। তনিমা ধরে নিয়েছে রিফাত এখন তনিমাকে বলবে—’আমি আপনাকে বউ হিসেবে মানতে পারব না, আমার অন্য কোথাও সম্পর্ক আছে হেনতেন। তনিমা এসব ভেবেই এই ঘরে এসেছে রিফাতের সঙ্গে কথা বলতে। তাই এই মুহূর্তে রিফাত যাই বলুক না কেন, তনিমা কান্নাকাটি কিংবা ঝামেলা করবে না। বরং রিফাতের মনোভাব বুঝবে এবং রিফাতকে জানাবে তনিমা কী চায়। রিফাত রয়েসয়ে বলতে শুরু করে—
‘ আসলে আপনি যাকে মনে করছেন আমি সে নই। আমি সম্পূর্ণ বিপরীত একটা মানুষ। বলতে পারেন, আপনার সাথে আমার ভুল বোঝাবুঝির থেকেই বিয়েটা হয়েছে। আমি আপনার প্রেমিক পুরুষ নই, অন্য কেউ মিস তনিমা।
রিফাতের কথার মানে তখনও বুঝল না তনিমা। রিফাতকে শুধিয়ে তনিমা কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বলে—
‘ আপনি কী বলতে চাচ্ছেন সেটা স্পষ্ট ভাষায় বলুন। আমার আপনার কথা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।
রিফাত বলে—
‘ আমি আপনার চিঠিওয়ালা নামক কোনো পুরুষ নই। আমি আমার জীবনে কাউকে আধখানা চিঠিই লিখিনি, সেখানে চিঠিতে কীভাবে প্রেম করব? আমি আসলে অন্য কারও জায়গায় আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভুলবশত পুলিশের ঝামেলায় পড়ে আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। বাকিটা তো আপনি নিজেই জানেন।
‘ তো আপনি কার পরিবর্তে গিয়েছিলেন? চিঠিওয়ালা তাহলে কে ছিল?
‘ আমি কার পরিবর্তে গিয়েছিলাম আর আপনার চিঠিওয়ালা কে ছিল, তা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। আপনার চিঠিওয়ালা আসলে কে ছিল সেটা আমি নিজেও জানি না, তবে আমি কার পরিবর্তে সেদিন আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম সেটা আমি আপনাকে ঢাকা ফিরেই জানাব।
তনিমা তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে বলে…
‘ কেন, এখন জানালে কী সমস্যা?
‘ সমস্যা আছে বলেই তো বলছি পরে বলব। একটু ধৈর্য ধরুন, সময়ের সাথে সাথে সবটা জানতে পারবেন।
‘ তো এখন আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? কী করতে চান? আমাকে ডিভোর্স দিতে চান?
ডিভোর্সের কথাটা এত সহজ ভাবে তনিমা বলে দিবে রিফাত সেটা ভাবে নি। তনিমাকে সম্মতি দিয়ে রিফাত বলে..
‘ জি। তবে আপাতত কিছুদিন সময় যাক, তারপর আমি দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে ডিভোর্স লেটার পাঠাব।
তনিমা যেন জানত রিফাত এসব কথাই বলবে ওকে। এজন্যই তনিমা রিফাতের পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানতে চাইল, আর রিফাত সরল মনে সবটা জানিয়েও দিল তনিমাকে। রিফাত জানে না তনিমার মনে কী চলছে। জানার কথাও না। তনিমাকে রিফাত ছাত্রী হিসেবে দুবছর ধরে চেনে, অথচ ওদের কথা বলার একান্ত সময় এই প্রথম। কলেজেও ক্লাসের বাইরে ওদের কখনো কথা হয়নি। একটা মানুষকে আপনি কাছ থেকে না জানলে কখনোই বুঝতে পারবেন না সে মানুষটি কেমন। রিফাতের ক্ষেত্রেও তাই হলো; রিফাত জানে না তনিমা ব্যক্তি হিসেবে কেমন কিংবা তার আচার-আচরণ কীরকম হতে পারে। তনিমা রিফাতের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আশেপাশে কিছু একটা খুঁজে রিফাতকে বলল—
‘ আপনার কাছে খাতা-কলম হবে স্যার?
রিফাত অবাক হলো। তনিমাকে প্রশ্ন করে বলে—
‘ আপনি খাতা-কলম দিয়ে কী করবেন?
‘ লিখব।
‘ এখন পড়াশোনা করবেন?
‘ না, আমি স্যারকে জীবনের মান নির্ণয়ের সূত্রটা বোঝাব, তাই খাতা-কলম লাগবে। আপনার কাছে হবে স্যার?
রিফাত তনিমার মনোভাব বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে মেয়েটার কী হলো? রিফাত একটা সিরিয়াস টপিকে কথা বলছে—জীবন সংক্রান্ত। অথচ মেয়েটা জীবনের মান নির্ণয়ের কিসের সূত্র নিয়ে পড়েছে! তনিমা আশেপাশে তাকিয়ে খাতা-কলম না পেয়ে রিফাতের হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল—
‘ আপনার ফোনেও তো লেখা যাবে, তাই না? দিন, আপাতত আপনার ফোনটা হলেই চলবে।
‘ আমার ফোনে কী লিখবেন আপনি?
‘ আপনি বলেছেন আমি যেন হাঙ্গামা না করি; সেজন্য ফোনে লিখে জানাই আমি কষ্ট পাচ্ছি কি না।
তনিমাকে রিফাতের কাছে বেশ অদ্ভুত আর ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার মনে হলো। রিফাত হাত বাড়িয়ে তনিমাকে ফোনটা দিতেই তনিমা রিফাতের ফোনে নোটপ্যাড ওপেন করে লিখতে শুরু করল। তনিমা ঠোঁট চেপে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা লিখছে বেশ সময় নিয়ে। রিফাত অধৈর্য হয়ে বসে আছে তনিমা কী লিখছে তা জানতে। লেখা শেষ হতে তনিমা রিফাতকে ফোনটা দিয়ে বলে—
‘ আমি চলে যাওয়ার পর আপনি এটা পড়বেন কেমন?
রিফাত তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, সে হয়তো তনিমাকে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। মেয়েটা কি এখন কোথাও বসে নিরবে কাঁদবে? হয়তো রিফাতের কাছ থেকে কষ্ট লুকাতে তনিমা এখন পালিয়ে যাচ্ছে এখান থেকে। রিফাত মনে মনে বেশ অপরাধবোধ নিয়ে তনিমাকে সান্ত্বনা দিতে বলে—
‘ আপনি কি বেশি কষ্ট পাচ্ছেন? কষ্ট পাবেন না মিস তনিমা, আমি আছি আপনার পাশে।
তনিমা খুব স্বাভাবিকভাবে মাথায় ঘোমটা টেনে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে—
‘ আমি জানি আপনি আছেন। কিন্তু আপনি জানেন না যে আপনি আছেন।
‘ মানে?
তনিমা রিফাতের কথার উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। তনিমা রিফাতকে গোলকধাঁধায় ফেলে গেছে। রিফাত তনিমার চলে যাওয়া দেখে নিজের ফোনের দিকে দৃষ্টি বুলাল। চিঠির মতো করে সেখানে লেখা পেল—
‘ ডিয়ার স্যার,
আপাতত আপনাকে স্যার বলেই সম্বোধন করি। কারণ আপনি এখনো আপডেট হয়ে আমার স্বামীতে রূপান্তর হতে পারেননি। যেদিন আপনার মাঝে স্বামীর কোয়ালিটি আসবে, সেদিন ‘ডিয়ার স্বামী’ লিখব; আপাতত ততদিন তোলা রইল। শুনুন স্যার, আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আমি সরাসরি এক উত্তরে দিচ্ছি, আর সেটা হলো—আপনি দুনিয়ার যত অজুহাত, বাহানা আর মিথ্যা কাহিনিই বানান না কেন, আমি ইহজীবনে আপনাকে কখনো ছাড়ব না। ওই যে একটু আগে বললেন না, কিছুদিন পর আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠাবেন? আমাকে ডিভোর্স দেবেন সেটাও আপনার দুঃস্বপ্ন। আপনি ডিভোর্স লেটার পাঠালে আমি আপনার বাড়িতে রুমে গিয়ে আত্মহত্যা করব। মরার আগে সবাইকে একটা করে চিঠি লিখে যাব যে আমার মৃত্যুর জন্য আপনি দায়ী। তাই বলছি, আপনার ব্যাচেলর লাইফে যতগুলো গার্লফ্রেন্ড ছিল, সবাইকে টাটা বাই বাই করে আমার কাছে ফিরে আসুন। কারণ আপনাকে নিয়ে সংসার করার স্বপ্ন অলরেডি আমি মনস্থ করে ফেলেছি। তাই আপনিও ডানে-বামে না তাকিয়ে শুধু আমাকে নিয়েই ভাবুন। আপনি একটু আগে আমাকে যে কাহিনিটা শোনালেন— যে আপনি আমার চিঠিওয়ালা নন অন্য কেউ, তাহলে বলি, আমার তাতেও চলবে। কিন্তু ডিভোর্স চলবে না। তাই এসব চিন্তা বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে ভাবুন। এতেই আপনার মঙ্গল।
ইতি—
অবাধ্য বউ।”
তনিমার চিঠি পড়ে রিফাত থমকে বসে। তনিমা যে রিফাতের বলা একটা কথাও বিশ্বাস করেনি, সেটা স্পষ্ট তনিমার লেখা চিঠিতে বোঝা যাচ্ছে। তনিমা রিফাতকে চিঠিওয়ালা ভেবেই সংসার করতে চাচ্ছে এবং এজন্য আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দিল রিফাতকে! রিফাত তো ভেবেছিল মেয়েটা তার কথায় কষ্ট পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, সেজন্য সে সহানুভূতি দেখাচ্ছিল; অথচ মেয়েটি তাকে কষ্ট দিয়ে চলে যাচ্ছিল। আচ্ছা, রিফাত ডিভোর্স লেটার পাঠালে কি মেয়েটা সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করবে রিফাতের ঘরে এসে? রিফাতের মনে তনিমার আত্মহত্যার ব্যাপারটা নিয়ে ভয় ও অস্থিরতা কাজ করছে। রিফাত এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারছে না তার আসলে কী করা উচিত। তনিমাকে নিয়ে রিফাতের সংসার করা অসম্ভব। কোনোভাবেই বিষয়টা যায় না। কিন্তু এই কথাটা রিফাত তনিমাকে কীভাবে বোঝাবে?
হৈচৈয়ের মধ্যে মারিদ ও নূরজাহানের বিয়েটা সম্পন্ন হলো বেলা ৫টা ৪৫ মিনিটে। মারিদ শক্ত কাঠ হয়ে বোবার মতো বসে রইল। যে বিয়েতে মারিদ সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছিল, সেই বিয়েতেই মারিদের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। হুজুর সাহেব যখন বারবার মারিদকে কবুল বলতে বলছিলেন, তখন মারিদ বেশ সময় নিয়ে কবুল বলে। অথচ প্রথমবার নূরজাহানকে বিয়ে করতে কবুল বলার সময় মারিদ এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি; তাহলে এবার কী হয়েছে মারিদের? বিয়ের জন্য মারিদ সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরেছিল দুপুরে। দুই পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ মারিদের বিয়ের জন্য সেজেগুজে হৈচৈ করছে। মারিদের বিয়ের কিছুক্ষণ আগেই হাসান ও আলেহা দুজন মিলে মারিদকে অবগত করে নূরজাহানের প্রথম বিয়ের ব্যাপারটি। আলেহার ছেলের সঙ্গে নূরজাহানের ফোনে বিয়ে, মানিক সওদাগরের উৎপাত, তারপর আলেহার স্বামীর মৃত্যু, অবশেষে দুজনের তালাক—সবটাই জানানো হয় মারিদকে। নূরজাহানের বিয়ে মারিদের জীবনে আসার আগেই হয়েছিল, তাহলে নূরজাহান কেন একটা বারের জন্যও এত বড় কথাটা মারিদের সঙ্গে শেয়ার করল না? নিজের পরিচয়, নাম-ধাম, ঠিকানা, এমনকি বিয়েটা পর্যন্ত লুকাল কেন অপরিচিতা?
মারিদকে নূরজাহানের বিয়ের সত্যিটা জানালে কি মারিদ মেনে নিত না? এত মিথ্যার আশ্রয় কেন? এত ছলনা করে অপরিচিতা কী পেয়েছে? দিনের পর দিন মারিদকে শুধু মিথ্যা আর ছলনাই করে গেছে ভালোবাসার নাম করে। আর মারিদ ভালোবেসে বোকার মতো বিশ্বাস করে গেছে। এর হিসাব মারিদ নূরজাহান থেকে নেবে। মারিদের রাগে-ক্ষোভে সবকিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে, দাঁত কামড়ে কোনো রকমে নিজেকে কন্ট্রোল করছে। তখন হাসান ও আলেহার কথাগুলো শুনে মারিদ তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিতে পারল না। সবকিছু শুনে সে কেমন বোবা বনে যায়। সে সেখান থেকে চলে এসে শুধু বিয়ের আসনে বসে পড়ে। মারিদকে বিয়ের আসনে বসতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন হাসান ও আলেহা। মূলত এই কথাটা মারিদকে জানানোর জন্যই হাসান কৌশল করে বিয়েটা একদিন পিছিয়েছিলেন। সত্যিটা জানার পর যদি মারিদ নূরজাহানকে বিয়ে করতে বেঁকে বসত, তাহলে হাসান এখানে বাধা দিতেন না। কিন্তু হাসানের বিশ্বাস অর্জন করে মারিদ গিয়ে সরাসরি বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ে। বিয়ের হৈচৈয়ের মাঝে সবাই আনন্দ করছে, কিন্তু মারিদ মাথা নিচু করে নিজের ঘরে বসে আছে। রিফাত, রাদিল, সুখ, মকবুল, খালেদ, মাহবুব—সবাই একে একে মারিদের কাছে এসেছে নূরজাহানের সঙ্গে গিয়ে বসতে। সবাই দুজনের বিয়ের ছবি তুলবে এবং বিয়ের বিভিন্ন নিয়ম পালন করবে। মারিদ এতে কোনো নিয়মেই রাজি হলো না। সে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে রাত নয়টা পযন্ত। হঠাৎ কি মনে করে মারিদ উঠে গেল নূরজাহানের ঘরে। নূরজাহান লাল বেনারসি শাড়ি পরে বউ সেজে নিশ্চুপ বসে ছিল। নূরজাহানকে ঘিরে সবাই বসে। মারিদ নূরজাহানের ঘরে ঢুকেই সবাইকে আদেশ করলো চলে যেতে। সে নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলবে। বাড়ির বড়রা হৈচৈ করে নূরজাহানের ঘরে সবাইকে ডেকে নিয়ে গেল মারিদকে নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে। সবাই বেরিয়ে যেতে মারিদ ঠাস করে দু’পাটের কাঠের দরজাটি লাগালো। নূরজাহান মারিদকে দরজা লাগাতে দেখে সে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়াল ওর পড়ার টেবিলের সঙ্গে মিশে। নূরজাহান মাথায় ঘোমটা টেনে ছিল মারিদ শব্দ করে দরজা লাগিয়ে তৎক্ষনাৎ তেড়ে গেল নূরজাহানের দিকে। নূরজাহানের গলা চেপে ফাঁস দিয়ে রাগে তিলমিলিয়ে বলে…
‘ আপনি আমার সাথে প্রতারণা কেন করলেন? এত মিথ্যা, এত ছলনা কেন? আমি তো আপনার কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে যাইনি। তাহলে কেন আপনি ঝড়ের মতো এসে আমার জীবনটা তচনচ করে দিয়ে চলে গেলেন? এটা করে কী শান্তি পেলেন? বলুন, কী সুখ পেয়েছেন আমাকে ঠকিয়ে?
নূরজাহানের মাথার ঘোমটা পরে গেছে মারিদ গলা চেপে ধরার সাথে সাথেই। নূরজাহানের নিশ্বাস আটকে আসছে। নূরজাহান মারিদের হাত ছাড়াতে ছটফট করে কাশতে কাশতে বলল…
“আমি ব্যথা পাচ্ছি মারিদ সাহেব। নিশ্বাস নিতে পারছি না। প্লিজ আমাকে ছাড়ুন।
নূরজাহান বলেছে ওর গলা ছাড়তে কিন্তু মারিদ তাতেও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলে…
“ছেড়ে দেব? ছেড়ে রেখেছিলাম বলেই তো আমাকে বারবার ঠকাতে পেরেছেন। এত মিথ্যার আশ্রয় কেন নূরজাহান? কেন আমাকে নিয়ে এত খেলেছেন?
নূরজাহান গায়ের জোরে দু’হাতে মারিদের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাগে ফুসফুস করে বলে….
‘ বিয়ে হতে না হতেই গুন্ডামি শুরু করে দিয়েছেন? এটাই আপনার আসল রূপ না?
‘ আর আপনার আসল রূপ কোনটা, অপরিচিতা? মিথ্যা ভালোবাসা দেখিয়ে কেন আমাকে না বলে হারিয়ে গেলেন? কি অপরাধ ছিল আমার? যার শাস্তি আপনি আমাকে তিলে তিলে দিলেন? একটা বছর কি আপনার কাছে কম ছিল? কেন এত ছলনা করলেন আমার সাথে?
নূরজাহানের হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে মারিদের কণ্ঠে ‘অপরিচিতা’ ডাক শুনে। নূরজাহানের রাগী বাঘিনীর মুখটা তৎক্ষণাৎ স্তব্ধতায় থমকে গেল, দুচোখে ধরধর করে অশ্রু ঝরল। নূরজাহানের কণ্ঠ কাঁপছে মারিদকে পাল্টা প্রশ্ন করতে। নূরজাহান যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে এক মুহূর্তের জন্য। খেই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে পিছনের টেবিলটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়ায় নূরজাহান। অতীত বর্তমানে এসে এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, তা নূরজাহান দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। নূরজাহানের মাথায় যেন এক আকাশ ভেঙে পড়েছে। নূরজাহান শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজাতে চাইল, কিন্তু তৃষ্ণার্ত গলা সেই কখন শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। নূরজাহান কোনো রকমে কম্পিত স্বরে একটু করে মারিদকে বলতে চাইল—
“আ… আপনি? আপনি কে?
‘ বেইমানের রূপ আপনার মতোই হয়, অপরিচিতা। বাহিরটা সুন্দর, কিন্তু ভেতরটা নোংরা কুৎসিত, কলুষিত।
দ্বিতীয়বারের মতো মারিদের কণ্ঠে ‘অপরিচিতা’ ডাক শুনে নূরজাহান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে—
“আপনি? আপনি আমার ব্যবসায়ী সাহেব?
নূরজাহানের কণ্ঠে ‘ব্যবসায়ী সাহেব’ ডাক শুনে মারিদ তৎক্ষণাৎ বিছানার উপর থাকা চা-মিষ্টির প্লেটগুলো ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে। নূরজাহান শব্দ করে কেঁদে ওঠে। হিংস্র রাগে ফুঁসছে মারিদ। আঙুল তুলে নূরজাহানকে শাসিয়ে বলে—
“আমি আপনার কেউ না। আপনি একটা বেইমান, প্রতারক। আমার হবেন বলেও অন্য কারও হয়ে গেলেন?
নূরজাহান তৎক্ষনাৎ দৌড়ে এসে মারিদকে জাপটে জড়িয়ে ধরতে গেলে মারিদ তৎক্ষণাৎ নূরজাহানকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দেয়। নূরজাহান শব্দ করে কাঁদছে আর দুহাত মেলে বারবার মারিদকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে, আর মুখে বুলি আওড়াচ্ছে—
‘ আপনি শুধু আমার। আপনি শুধু আমার। আর কারও না।
নূরজাহান যতবার মারিদকে জড়িয়ে ধরতে আসছে, ততবার মারিদ নূরজাহানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। নূরজাহান যেন পাগল, দিশেহারা হয়ে গেছে মারিদের পরিচয় পেয়ে। মারিদ নিজের রাগে-ক্ষোভে নূরজাহানের পাগলামি উপেক্ষা করে ঘর ছেড়ে বেরোতে চায়। নূরজাহানকে ধাক্কা দিয়ে ফ্লোরে ফেলে মারিদ দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে চায়। মারিদের ধাক্কায় ফ্লোরে পরে নূরজাহানের হাত কেটে যায় কাঁচের কাপ-প্লেটের ভাঙা অংশে লেগে। মারিদকে দরজা খুলতে দেখে নূরজাহান পাগলের মতো ফ্লোর থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে মারিদকে পিছন থেকে জাপটে জড়িয়ে হু হু শব্দে কেঁদে উঠে বলে—
‘ আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আপনি শুধু আমার। আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না। কোথাও না।
মারিদ আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে রাগে-ক্ষোভে নূরজাহানের গায়ে হাত তুলে ফেলবে। মারিদ এই মুহূর্তে ঝামেলা চাচ্ছে না, আবার সবকিছু সহ্যও করতে পারছে না সে। মারিদ জোরপূর্বক নূরজাহানের দুহাত পেট থেকে ছাড়িয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। নূরজাহানও থেমে নেই, মারিদের পিছনে দৌড়ে চিৎকার করে মারিদকে থামাতে চাইছে। মারিদ ও নূরজাহানের বিয়ের জন্য বাড়িতে ডিজে বক্স বাজাচ্ছে সাজিদ ও আহাদ। বাড়ির সবাই উঠানেই ছিল। মারিদ নূরজাহানের সঙ্গে একান্ত দেখা করতে গিয়েছিল বলে বাড়ির বড়রা কেউ সেদিকে গেল না। মাত্র বিয়ে হয়েছে দুজনের, নতুন বর-বউ নিজেদের জন্য সময় নেবে—এটাই স্বাভাবিক। সুখ আশনূরকে নিয়ে ভাতঘরে ছিল। সাদা জামাতে-খাবারের তেল পড়ে দাগ হয়ে গেছে, আশনূর সেই হলদে জায়গায় লেবু ঘষে দাগটা তোলার চেষ্টা করছিল এতক্ষণ। মারিদ ও নূরজাহানের চিৎকার হালকা-পাতলা কানে এসেছিল; যদিও উঁচু শব্দে গান বাজছিল, তারপরও অল্প-স্বল্প শোনা যাচ্ছিল।
আশনূর সুখ ওরা আপত্তিকর কিছু ভেবে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তক্ষুণি মারিদকে রাগান্বিত ভঙ্গিতে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে দেখে অবাক হয়। সবচেয়ে বেশি অবাক হয় যখন নূরজাহান মারিদকে আটকাতে তার পিছনে দৌড়ে হাউমাউ করে চিৎকার করে কাঁদছে দেখে। সুখ মারিদকে চিৎকার করে ডাকে থামতে। কিন্তু মারিদ দাঁড়ায় না দেখে আশনূর ও সুখ দৌড়ে গিয়ে নূরজাহানকে জাপটে জড়িয়ে আটকায়, যাতে মারিদের পিছনে দৌড়ে বাইরে না যায়। বাইরে পরিবারের বড়রা আছে, নূরজাহানকে এই অবস্থায় দেখলে মাইন্ড করবেন। মারিদ কেন রেগে বেরিয়ে গেল? নূরজাহান কেন কাঁদছে?—এই মূহুর্তে আশনূর ও সুখ দুজনই জানে না। আশনূর নূরজাহানকে নিয়ে জোরপূর্বক ফ্লোরে বসে পড়ে। নূরজাহান শক্তি দেখিয়ে আশনূরের বাঁধন ছুটতে চাইছে দেখে সুখও তৎক্ষণাৎ নূরজাহানকে ফ্লোরে চেপে ধরে অস্থির গলায় প্রশ্ন করে বলে—
‘ ভাবি, কী হয়েছে আপনার? এভাবে কাঁদছেন কেন? ভাই কিছু বলেছে আপনাকে?
আশনূরও একই প্রশ্ন করল নূরজাহানকে। অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে বলল—
‘ পরী, বইন আমার কী হয়েছে তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন? জামাইবাবু কিছু বলেছেন তোকে? আমাকে বল কী হয়েছে তোর?
শক্তিতে সুখ ও আশনূরের সঙ্গে না পেরে নূরজাহান আশনূরের উপর শরীর ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে—
‘ আমার উনাকে এনে দাও বুবু। উনি চলে যাচ্ছেন। উনি আবার আমাকে একা করে চলে যাচ্ছে। আমি উনাকে আবার হারিয়ে ফেলব বুবু। তুমি উনাকে এনে দাও। এনে দাও।
সুখ দুহাতে নূরজাহানের গালের পানি মুছে দিতে দিতে বলে—
‘ তুমি কত বোকা ভাবি! ভাই তোমাকে বিয়ে করেছে একা ফেলে চলে যাওয়ার জন্য? জামাই কখনো বউকে ফেলে যায়, বলো? আমরা সবাই তোমাদের বাড়িতে কেন এসেছি বলো? তোমাকে মারিদ ভাইয়ের বউ করে সঙ্গে নিয়ে যেতে এসেছি ভাবি। তাহলে আমরা কি তোমাকে এখানে একা রেখে যাব বলো? তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব আমাদের বাড়িতে। তখন তো মারিদ ভাই সবসময় তোমার সাথেই থাকবে ভাবি, তাহলে বোকার মতো এখন এত ভয় পাচ্ছ কেন?
নূরজাহানের কান্না থামে না। কাঁদতে কাঁদতে বলে…
‘ উনি সত্যি চলে গেছে, সুখ। আর আসবে না। আমি জানি।
‘ আমার ভাই কোথাও যাননি, একটু পর আবার আসবেন দেখিও তখন। হয়তো এখন রেগে আছেন কোনো কারণে, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কখনো যাবেন না ভাবি। ভাইয়ের ওপর বিশ্বাস রাখো।
নূরজাহান সুখের কথা মেনে নিলেও নিজের তোলপাড় মনকে শান্ত করতে পারল না। কেমন অশান্ত, অস্থির, উত্তেজিত ও দিশেহারা হলো মারিদের জন্য! দিশেহারা নূরজাহানের কান্নার শব্দ কমে আসলেও কান্নার বেগ কমল না, নিঃশব্দে শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। আশনূর ও সুখ নূরজাহানকে নিয়ে নূরজাহানের ঘরে যায়। দরজা বন্ধ করে তারা নূরজাহানকে শান্ত করার চেষ্টা করে। বাইরের বড়রা কেউ নূরজাহানকে এভাবে কাঁদতে দেখলে বুঝবেন মারিদ ও নূরজাহানের মাঝে ঝামেলা হয়েছে, আর এতে বাজে প্রভাব পড়বে দুই পরিবারের মাঝে। নতুন বিয়ে করা বউ-জামাই যদি বিয়ের প্রথম রাতেই এভাবে কান্নাকাটি আর রাগারাগি করে, তাহলে জীবনের বাকি সময়টা কীভাবে কাটাবে তাঁরা?
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৭
আশনূর দ্রুত রুমের কাপ-প্লেটের ভাঙা অংশ গুলো পরিষ্কার করে নিলো। সুখ নূরজাহানের গায়ের বেনারসি শাড়িটা ঠিক করে নূরজাহানকে শোয়াল। নূরজাহানের মুখটা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিল, যাতে কান্নার ভেজা মুখটা খানিকটা হলেও ঠিকঠাক দেখায়। মারিদ নূরজাহানের ওপর জিদ করে সেই রাতেই সবাইকে ছেড়ে একা গাড়ি ড্রাইভ করে ঢাকা চলে যায়। নূরজাহানের বাড়িতে সবার আরও একদিন, একরাত থাকার কথা ছিল, অথচ মারিদ সবাইকে ফেলে চলে যায়। ফোনে সবাইকে বাহানা দেয়—মারিদের কনস্ট্রাকশনের মালামাল চুরি হয়েছে, সেজন্য ইমার্জেন্সিতে মারিদকে ঢাকা ফিরতে হয়েছে। মারিদ চলে যাওয়াতে মাহবুব পরদিনই সবাইকে নিয়ে ঢাকা ফিরতে চান, কিন্তু হাসান ও তারানূর জোর করে তাদের আরও একটা দিন রেখে দেন থানচিতে।
