Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৪

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৪

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৪
রিক্তা ইসলাম মায়া

তনিমার বেশ রাত করে পড়ার অভ্যাস আছে। ডাক্তারি পড়ার শেষ নেই। দম পাওয়া যায় না। রাত ১২:৪৫। ঘুমে চোখ বারবার লেগে যাচ্ছে। তনিমা বই খাতা খুলে কলমে লিখছিল কিছু কিন্তু বারবার ঘুমে চোখ বুঁজে যাচ্ছে বলে মাথা ঢুলছে বইয়ের উপর। ঘুমে তনিমার কপাল টেবিলে ভারি খেতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। হাতের কলম রেখে দু’হাতে তৈলাক্ত মুখ ঘষে ঘুমের রেশ কাটাতে চায়। তনিমার ক্লাসের আরও কিছু অ্যাসাইনমেন্ট বাকি। এখন ঘুমিয়ে গেলে সকালে কাভার করার সময় পাবে না। তনিমা উঠে ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসে। চোখে পানি পড়ায় ঘুমের রেশ আপাতত কেটেছে তবে কিছুক্ষণের মধ্যে আবারও ঘুম এসে যায়। তনিমা ঘুম কাটাতে রান্নাঘরে যায়। গরম গরম কফি বানিয়ে ঘরে ফিরে আসে। এবার হয়তো তনিমার ঘুমের রেশ কিছুটা কমেছে। পড়াশোনায় বেশ মনোযোগ দিতে দেখা যায়। মধ্যরাতে হঠাৎ রিফাতের নাম ভাসে তনিমার ফোনের স্ক্রিনে। ভাইব্রেশনের ভো ভো শব্দে তনিমা বিরক্ত হয়। ভাবে মাহি হয়তো পড়া বুঝতে পারছে না বলে এত রাতে তনিমাকে কল করেছে। সচরাচর মাহি ছাড়া এত রাতে তনিমাকে অন্য কেউ কল করতে পারে, সেই কথাটা তনিমার মাথায় আসেনি প্রথমে। তনিমা বইয়ের উপর থেকে ফোন রিসিভ করে কানে ধরে বলে…

‘ বল।
কলদাতা কে সেটা তনিমা দেখেনি। ভেবেছিল মাহি কল দিয়েছে। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে বেশ অসন্তুষ্টির গলায় শোনা যায় রিফাতের…
‘ বল কি? একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হয়ে এইভাবে কথা বলেন গুরুজনদের সাথে? এই শিখেছেন পড়াশোনা করে?
তনিমা চট করে কান থেকে ফোনটি সরিয়ে স্ক্রিনে রিফাতের নামটি দেখে জিভে কামড় দেয়। মাহি ভেবে কলটি রিসিভ করেছিল। তনিমা দমে না গিয়ে ফোনটি পুনরায় কানে ধরে রিফাতকে শুধিয়ে বলে…
‘ শিখেছি তো অনেক কিছুই স্যার। কিন্তু এত কিছু বিশ্লেষণ করতে গেলে আমার আগে জানতে হবে গুরুজনটা কে? আমার স্যার নাকি স্বামী? স্বামী হলে ইটস ওকে, সবকিছু জায়েজ। কিন্তু স্যার হলে বলতে হবে এত রাতে ছাত্রীকে কেন কল দিয়েছে সেটা, কোন মতলবে?
তনিমা বেশ চতুর, তার প্রমাণ রিফাত আরও আগেই পেয়েছিল তনিমার কথাবার্তায়। রিফাত এই মুহূর্তে নিজেকে তনিমার স্যার দাবি করলে তনিমা রিফাতকে কথার মারপ্যাঁচে ফাঁসাতে চাইবে হেনতেন বলে। আবার স্বামী বললেও তনিমা ছাড় দেবে, বিষয়টা এমনও না। রিফাত তনিমাকে এই মূহুর্তে যাই বলে স্বীকারোক্তি দেবে, তাতেই তনিমা রিফাতকে কথার জালে ফাঁসাবে। তাই রিফাত তনিমার প্রসঙ্গ এড়াতে চেয়ে বলে…
‘ আপনার কাছে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়ে গেছে, সেইগুলো দিয়ে যান। আমি আপনাদের বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি।

তনিমা ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। দ্রুত পায়ে জানালার পর্দা সরিয়ে নিচে উঁকি দিয়ে দেখে রিফাত গাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তনিমা নিজেকে আড়াল করে যাতে রিফাত দেখতে না পায়। তনিমা বলে…
‘ সরি স্যার, আমি একটা বিবাহিত মেয়ে। আপনি মধ্যরাতে হুটহাট এসে আমাকে এইভাবে বাসার নিচে ডাকতে পারেন না, এতে লোকে খারাপ ভাববে। আমার স্বামীও মাইন্ড করতে পারে। আপনি বরং চলে যান স্যার। আমি আসব না।
রিফাত কানে ফোন চেপে তনিমাদের বিল্ডিংয়ের দিকে তাকায়। চারতলা বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় ফ্লোরে হয়তো তনিমাদের ফ্ল্যাট। তনিমার রুম কোনটা রিফাত জানে না। একটা রুমে এতক্ষণ আলো জ্বলছিল কিন্তু এখন লাইট অফ। তনিমাই লাইট অফ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছে। রিফাত বিরক্তির স্বরে বলে…
‘ তনিমা, কাগজগুলো আমার বেশ প্রয়োজনের। প্লিজ তাড়াতাড়ি দিয়ে যান।
‘ আপনার কোনো কাগজপত্র তো আমার কাছে নেই স্যার। আমার স্বামীর কিছু কাগজপত্র আছে, ঐটাতো আর আপনাকে দেওয়া যাবে না তাই না?

‘ আমার ঐটাই লাগবে। দিয়ে যান।
তনিমা দুষ্ট হাসে। জানালার ফাঁক দিয়ে রিফাতকে দেখে বলে…
‘ তারমানে আপনি মানছেন আপনি আমার স্বামী হন সেটা?
‘ আপনি যা ভাবেন তাই। এখন কাগজগুলো দিয়ে যান তো।
রিফাতের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির সুর। তনিমা বিষয়টা পাত্তা না দিয়ে বলে…
‘ কাগজ নিতে চাইলে আপনাকে আগে শ্বশুরবাড়িতে আসতে হবে।
‘ আপনি আসলেই এত ফাজিল তনিমা নাকি আমার সাথেই এত ফাজলামি করেন কোনটা?
তনিমা কিছু না ভেবে চট করে উত্তর দিয়ে বলে…
‘ আমি ব্যক্তিগত সবার সাথেই ফাজিল।
রিফাত চুপ করে যায়। তনিমা রিফাতকে ব্যক্তিগত ভাবে নিচ্ছে বিষয়টা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। রিফাত খানিকটা সময় নিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে…

‘ আমি দাঁড়িয়ে আছি। আপনি কাগজগুলো দিয়ে যান।
রিফাত কল কেটে দেয়, তনিমাকে আর কিছু বলার সুযোগ দেয় না। তনিমা ফের একবার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে রিফাতকে দেখে বইখাতা বন্ধ করে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলে রিফাতের সেদিনকার দেওয়া ওয়ালেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো হাতে নেয়। রিফাতের দেওয়া টাকা থেকে তনিমা সেদিন পাঁচশত টাকা খরচ করেছিল। সেই পাঁচশত টাকা পরে আবার যোগ করে সব টাকাই রিফাতের ওয়ালেটে ঢুকিয়ে রাখে। তনিমা বাসার কাপড়ে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে মা-বাবা, ভাই-ভাবি সকলেই ঘুমে। তনিমা বাহির থেকে দরজা তালা মেরে বেরিয়েছে। রিফাত তনিমাদের বাড়ির গেট থেকে খানিকটা উত্তরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তনিমা গেটের তালা খুলে সেদিকে আগায়। রিফাত তনিমাকে লক্ষ্য করে। তনিমা সুন্দর। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ। এই যুগে একটা আধুনিক মেয়ে যতটা স্মার্ট ও ভদ্র দেখালে সুন্দর দেখায়, তনিমা ততটাই সুন্দর। পিঠ অবধি সোনালী চুলগুলো মাথায় ঝুঁটি বাঁধা। গায়ে লম্বা গেঞ্জি আর মেয়েলি ট্রাউজার পরা। সাদা একটা ওড়না চাদরের মতো শরীরে জড়িয়ে রাখা। মুখটা হালকা তৈলাক্ত ভাব। তনিমা রিফাতের কাছাকাছি এসে ওয়ালেটসহ কাগজপত্রগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলে…

‘ নিন।
রিফাত সবগুলো জিনিস হাতে নেয়। ওয়ালেটে টাকা দেখে ভ্রু কুঁচকে তনিমাকে বলে…
‘ ওয়ালেটে টাকা ফেরত দিচ্ছেন কেন? খরচ করেননি?
‘ না।
‘ কেন? এগুলো তো আপনারই ছিল।
‘ আমি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে কারও কিছু নিই না। আপনি যেদিন ব্যক্তিগত সম্পর্কের কেউ একজন হবেন সেদিন আমি নিজেই অধিকার দেখিয়ে খরচ করব।
রিফাত কিছু বলে না। তনিমার ক্লান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে…
‘ আপনি এত রাত অবধি জেগে ছিলেন?
তনিমা হতাশায় তিলমিলিয়ে উঠে বলে…

‘ আপনাদের স্যারদের মধ্যে কি কোনো মায়া-দয়া আছে স্টুডেন্টদের প্রতি? প্রতিটা স্যারই ক্লাসে এত এত পড়া দিয়ে চলে যান, একটা বারও চিন্তা করেন না স্টুডেন্টরা এত পড়া কিভাবে শেষ করবে? আপনারা আসেন, ক্লাস করেন, এত এত পড়া দিয়ে আবার সুন্দর করে চলে যান। আর আমরা রাত জেগে পড়েও বালের এত পড়া শেষ করতে পারি না। মাথা মাঝেমধ্যে হ্যাং হয়ে যায়, তারপরও পড়ার আগামাথা কিছুই বুঝি না। না বুঝে তখন উড়াধুড়া মুখস্থ করি। বাল পড়ালেখা ছেড়ে যে জামাইর ঘর করব, সেই উপায়ও নেই। জামাইও মন বোঝে না। সবদিকই ঝামেলার শেষ নেই।
তনিমার জায়গায় অন্য কেউ হলে রিফাতের মুখে এতক্ষণে খৈ ফুটতো। কিন্তু সে তনিমার শেষের কথা গুলো শুনেও তেমন গুরুত্ব দেয়নি। রিফাত, রাদিল, মারিদ তিনজনই ভালো স্টুডেন্ট ছিল। ভালো স্টুডেন্ট থাকায় আজ তারা লাইফে সেটেল্ড হতে পেরেছে। কিন্তু তনিমা যে সঠিক গাইডলাইন পাচ্ছে না বলে পড়াশোনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, সেটা রিফাত বুঝতে পেরে বলে…

‘ আপনি টিউশনি নেন না?
‘ নিই, মোজাম্মেল স্যারের কাছে। কিন্তু স্যার সপ্তাহে দুই দিন একটা সাবজেক্ট বোঝান, বাকি সাবজেক্টগুলো আমার একা কাভার করতে কষ্ট হয়ে যায়। তখন এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে নোট চেয়ে চেয়ে পড়তে হয়।
রিফাত তনিমার অসুবিধা বুঝে বলে…
‘ ঠিক আছে। কাল থেকে আপনি কোনো সাবজেক্ট না বুঝলে আমার কাছে যাবেন। আমি বুঝিয়ে দেব।
তনিমা অবাক হয়ে বলে…
‘ আপনি আমাকে পড়াবেন? সত্যি?
‘ জি! কোনো বিষয়ে না বুঝলে কলেজ ছুটির পর যাবেন, আমি বুঝিয়ে দেব।
তনিমা আনন্দে সম্মতি দেয়, ‘আচ্ছা’ বলে। রিফাত ওয়ালেটের সবগুলো টাকা বের করে তনিমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে…
‘ আমি কোনো কিছু দিলে সেটা আবার আমাকে রিটার্ন করবেন না। এটা আমার পছন্দ না, বুঝেছেন?
‘ আপনি তো স্বেচ্ছায় দেননি। আমিই জোর করে নিয়েছিলাম।
‘ আপনার সেই অধিকার আছে জোর করে নেওয়ার, তার জন্যই নিয়েছেন। আমি কিছু মনে করেনি।
‘ তারমানে আপনি মানছেন আমাদের সম্পর্কটা তাই তো?
‘ আমি কিন্তু আপনার চিঠিওয়ালা না তনিমা।
তনিমা চট করে জবাব দিয়ে বলে…

‘ ওকে।
তনিমার ‘ওকে’ বলাতে রিফাত অবাক হয়ে বলে…
‘ ওকে মানে? আপনার সমস্যা নেই যে আমি আপনার চিঠিওয়ালা না এটাতে?
তনিমা সুন্দর হাসে। গালে আসা চুল গুলো কানের পিছনে গুঁজে বলে…
‘ আপনিই আমার চিঠিওয়ালা, আপনিই আমার স্বামী, আমিই আপনার বউ।
রিফাত তনিমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, ‘ভিতরে যান।
‘ আপনি আসবেন না?
‘ না।
তনিমা ভিতরে যায় না। রিফাতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। রিফাতের দৃষ্টি তনিমার উপর। তনিমা এদিক-সেদিক তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রশ্ন করে বলে, ‘আমি আপনার ছাত্রী বলে আপনার আমাকে মেনে নিতে সমস্যা হচ্ছে তাই না?

রিফাত তনিমার সাথে হুট করে হওয়া বিয়েটা নিয়ে আজও কিছু ভাবেনি। তার ভাবান্তর শূন্য। তনিমা চিঠিওয়ালাকে খুঁজছে, যেটা রিফাত না—সে অলরেডি তনিমাকে এই বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তনিমা যেটা বিশ্বাস করছে না। রিফাত এতদিনের ভাবনায় ছিল সে তনিমাকে এই বিষয়টা বুঝিয়ে বিয়েটা থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তনিমা রিফাতের প্রতি বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে, যেটা না চাইতেও রিফাত তনিমাকে নিয়ে ভাবতে বসে। যদি তনিমা চিঠিওয়ালাকে বাদে শুধু রিফাতকে চাইত, তাহলে হয়তো হিসাব আলাদা হতো। তনিমাকে হয়তো রিফাত স্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা চিন্তা করত। রিফাত তনিমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে…
‘ ধরেন কখনো জানতে পারলেন আমি আপনার অনুসন্ধান করা সেই চিঠিওয়ালা না, তাহলেও কি আমার সাথে এই বিয়েতে থাকতে চাইবেন?

‘ জি।
তনিমা রিফাতের কথার অর্থ কিংবা গভীরতা না বুঝেই চট করে হ্যাঁতে উত্তর দিয়ে বসল। রিফাত তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণতার সাথে বলে,
‘আমি একবার হাত ধরলে কিন্তু আপনি ছাড়তে চাইলেও ছাড়ব না তনিমা। বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিন।
‘ সিদ্ধান্ত নিয়েই আমি আপনাকে বিয়ে করেছি।
‘ তাহলে বেশ, আমাকে কিছুদিন সময় দেন সবটা মানিয়ে নেওয়ার। আমি একবার কোনো কিছুতে জড়িয়ে গেলে পরে আর বেরুতে পারি না। আপনাকে যখন বলেছি মেনে নেব, তখন আর মৃত্যুর আগে ছাড়ছি না। আপনি ছাড়তে চাইলেও ছাড়তে পারবেন না।
ভীষণ ভালো লাগা ছেয়ে গেল তনিমার মন ও মস্তিষ্ক জুড়ে। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে মাথা নত হয়ে আসল তনিমার। রিফাত বেশ উদাসীন দৃষ্টিতে তনিমার লজ্জা মিশ্রিত মুখটা দেখল। রিফাত সবসময় চাইত সে কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করবে, কিন্তু সে যে তার ছাত্রীর সঙ্গে ফেঁসে যাবে, এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। হয়তো এটাই নিয়তি।

ভোর রাতে হাসান ধান ক্ষেতের জমিতে পানি দিয়ে বাড়িতে এসেছে। ক্ষেতে উইডার মেরে ঘাস পরিষ্কার করে ড্রেন কেটে নতুন পানি দিয়ে এসেছে ক্ষেতে। কাঁধে উইডার মেশিনটা পাশে রেখে উঠানের সামনে খোলা বারান্দায় বসে হাঁপাতে লাগে। গলা ছেড়ে ডাকে নূরজাহানকে…
‘ আম্মা আমারে এক গেলাস পানি দিইয়া যান।

আজ সোমবার। সকাল সাতটার ঘর। সাজিদ, মাজিদ, আহাদ কেউ বাড়িতে নেই। শুক্রবার করে মাজিদ বাড়িতে আসবে। জমি থেকে ফেরার পথে হাসানের সঙ্গে এলাকার মাসুদ মাস্টারের দেখা হয়েছিল। লোকটা পাঞ্জাবি-টুপি মাথায় দিয়ে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে হাসানকে জমিতে কাজ করতে দেখে দাঁড়ায়। এক কথায় দুই কথায় হাসানকে মাসুদ মাস্টার নিজেই তার বড় ছেলে তৌহিদের জন্য আশনূরের বিয়ের কথাটা তোলে। মাস খানেক আগে নূরজাহানের বিয়েরও আগে মাসুদ মাস্টারের বড় ছেলের জন্য আশনূরের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। হাসান, মাজিদ, তারানূর সবাই এই বিয়েতে সম্মত ছিল। কিন্তু মাঝে নূরজাহানের বিয়ে নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় আশনূরের বিয়ের বিষয়টা মাথা থেকে ছুটে যায়। মাসুদ মাস্টারের আর্থিক অবস্থা ভালোই, খারাপ না। এই গ্রামের প্রদান পাঁচজন গণ্যমান্য পরিবারের মতোই তাদের মান-মর্যাদা। বিয়েতে অসম্মতি দেওয়ার কোনো কারণ দেখছে না হাসান। সবচেয়ে বড় কথা, তৌহিদ ছেলেটা বেশ ভালো ও ভদ্র। এখন সে গ্রামের বাজারে দুই-তিনটা দোকান দিয়ে কাজ-কারবার করে। ইনকাম ভালোই। এর থেকে বড় কথা হলো, হাসানের পরিবারের নামে এত বদনাম এলাকায় থাকার পরও মাসুদ মাস্টারের মতো গণ্যমান্য মানুষ উনার মেয়ে আশনূরকে ছেলের সঙ্গে বিয়ে করাতে এসেছে, এটা সৌভাগ্য। হাসানের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে তারানূর ছেলের পাশে মোড়ায় বসে। হাসান মাটিতে বসে উঠানের দিকে চেয়ে থাকে। মায়ের উপস্থিতি বুঝে বলে…
‘ আইজ ক্ষেতে মাসুদ মাস্টার আইছিল। হের বড় পোলা লাইগা আমাগো আশনূরের বিয়ার কথা কইয়া গেছে আবারও। কি করমু আম্মা? সমন্ধডা ভালা। ফিরাই দেয় কেমনে?

‘ ফিরাই দিবি ক্যান? এমন ভালা সমন্ধ বারবার তোর মাইয়া লাইগা পাইবি হাসান? মাসুদ মাস্টারের বংশ ভালা। হুনসি পোলাটাও কামকাজে কর্মীক। আমাগো আশনূর সুখে থাকব।
মা-ছেলের কথা মাঝে ফোড়ন কাটে শাহানা। পিছন থেকে খেঁকিয়ে উঠে বলে…
‘ আপনাদের এক চুক্ষে ঘী অন্য চুক্ষে তেল। নূরজাহানের মতো কলঙ্কিত মাইয়ারে কোটিপতি দেইখা বিয়া দিসেন। শহরে থাকব, বিলাসিতার জীবন পাইব আর আমার আশনূরের বেলায় দুইনিয়তী। সারাজীবন আমার কলিজাডায় যেমন দাগ দিসেন এহন আমার মাইয়ার কপালডাও পুরাইতে চাইতেন আপনেরা মা-পোলা মিল্লা? আমি হেইডা হইতে দিমুনা। আমি এহোনো বাইচ্ছা আছি। আমার জীবন আঙ্গার কইয়া আমি সতীনের মাইয়া এমনে পালি নাই। আমার পালনের ঋণ শোধ করণ লাগব আপনেগোর। আমার আশনূরের বিয়া নূরজাহানের মতো কোটিপতির ঘরেই দিতে হইব।

নূরজাহান বাবার জন্য পানি নিয়ে এসেছিল বারান্দায়। নূরজাহানের পিছন পিছন শাহানাও বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাসান তারানূরের কথা শুনেই বিদ্রুপ করে উঠে জবাব দেয়। নূরজাহান কোমর নুইয়ে হাসানকে পানি দিচ্ছিল। নূরজাহানের হাত থেমে যায় শাহানার কথায়। নূরজাহান ঠায় জমে উঠে দাঁড়ায়। তারানূর, নূরজাহান দুজনেই শাহানার তিরস্কারের মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসান শাহানার সঙ্গে কথা বলে না, চোখ তুলে তাকায়ও না শাহানার দিকে সেদিনের নূরজাহানের ঘটনার পর থেকে। হাসান নূরজাহানের থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে নীরবে পান করে। হাসানকে চুপ থাকতে দেখে তারানূর প্রতিবাদ করে বলে…
‘ এইগুলা কি কও বউ? আমরা নূরজাহানরে কোটিপতি ঘরে বিয়া দিসি? নূরজাহান হের কপালে গেছে কোটিপতি ঘরে। আল্লাহ জোড়া লেইখা রাখছিল হের লাইগা নূরজাহানের বিয়া শহরের পোলার লগে হইছে। নইলে তুমি তো হেরে মারতেই চাইছিলা, শেষ পযন্ত পারলা না। আল্লাহ বাঁচাইবার মালিক, তাই নূরজাহানরে বাঁচায় রাখছে। কথায় আছে না? রাহে আল্লাহ মারে কেডা?
তারানূর কখনো শাহানার বিপক্ষে কথা বলতো না। কিন্তু আজকাল বলে। নূরজাহানের হয়ে এটা-সেটা বলে উত্তরও দেয়। শাহানা রাগে তিলমিলিয়ে বলে…

‘ আমারে এসব কথা কইয়া দমাইতে পারবেন না আপনেরা মা-পোলা। আমি আপনাগো মা-পোলার নাড়িভুড়ি বুঝি। এই সংসারে জান দিয়া খাইটাও দাম পাইলাম না আইজও। আপনে আর আপনের পোলা-মাইয়া মিল্লা আমার সোনার সংসারে সতীনের ঠায় দিসেন। আমার এত ভালোবাসার পরও আপনের পোলা সারাক্ষণ আয়েশা, আয়েশা করতো। আর এহোন আয়েশার মাইয়া নূরজাহান নূরজাহান করে। এই সংসারে আমি আর আমার পোলা-মাইয়া হইল পরগাছা। আমাগো কোনো দাম নাই। আপনের পোলার চোখে সব দামী মানুষ হইল নূরজাহান আর হের মা-ই আয়েশাই। এত বছর ধইরা এই সংসারের কামলা খাইটাও আপনেগোর মন পাইলাম না। আমার সাফ কথা হুনেন আম্মা। নূরজাহানের মতো কলঙ্কিত মাইয়া যদি কোটিপতি ঘরে বিয়া দেওন যায়, তাইলে আমার পবিত্র মাইয়া আশনূরের বিয়াও নূরজাহানের বরাবরি ঘরে দেওন লাগব। নইলে আমি এই সংসারে আগুন লাগাইয়া দিমু কইয়া দিলাম।
তারানূর শাহানাকে বিদ্রুপ করে কিছু বলতে চেয়েছিল। হাসান পানির গ্লাসটা নূরজাহানের হাতে দিয়ে তারানূরকে বলে…

‘ আমার পোলা-মাইয়া সব আমার লাইগা সমান। কাউরে আমি দুই চুক্ষে দুইনিয়তে দেহি না। নূরজাহান যেমন আমার মাইয়া, আশনূরও আমার মাইয়া। আমি চাই আশনূরের বিয়াও নূরজাহানের লাহান ভালা বড় জায়গায় হোক। এতে বাপ হিসাবে আমি আনন্দবোধ করমু যে আমার দুইডা চোখের মুণির বিয়া ভালা জায়গায় হইছে, তাঁরা স্বামী-সংসার লইয়া ভালা আছে, এইটা বাপ হইয়া আমার গর্বিত বিষয় হইব। নূরজাহানের বিয়া আমি দেয় নাই। নূরজাহানের ভাগ্যে ছিল তাই এইখানে বিয়া হইছে। আমি মাসুদ মাস্টারের পোলার সমন্ধ নাহয় ফিরাই দিমু আম্মা। কিন্তু নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ির বরাবর করার মতোন কোনো সমন্ধ আমার হাতে নাই। যদি কারও হাতে ভালো সমন্ধ থাকে, তাইলে আমারে কইও, আমি খোঁজ নিয়া সেইখানেই আশনূরের বিয়া দিমু।
শাহানা যেন হাসানের এই কথার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাসানের কথা শেষ হওয়া মাত্রই শাহানা বলে,
‘ নূরজাহানের জামাইর লগে যে ডাক্তার পোলাডা আইছিল আমাগো বাড়িতে রাদিল নাকি কি ? হের লগে আমার আশনূরের বিয়ার কথা কন।

নূরজাহান, হাসান, তারানূর সকলে চমকে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আশনূর মায়ের চিল্লাচিল্লি শুনে ভাতঘর থেকে দৌড়ে এসে এসব কথা শুনে পাথরের মতো জমে দাঁড়ায়। মাজিদের বউ নদীও শুনেছে সব। নূরজাহানের শরীর মৃদু কেঁপে ওঠে শাহানার কথা শুনে। কালরাতে ঘরে ফিরে নূরজাহান সুখের মুখ থেকে শুনেছে ডক্টর রাদিল আর সুখ ওরা তিন বছর ধরে রিলেশনে আছে। সুখ নিজের পরিবারকে জানিয়েছে এই কথাটা। নূরজাহান ওর শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে যতটুকু বুঝেছে, ওই বাড়ির সবাই রাদিল আর সুখের বিয়েটা নিয়ে সম্মত আছে। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে আলোচনা করে সুখ রাদিলের বিয়ের বিষয়ে কিছু একটা করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে শাহানার এমন প্রস্তাবে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়িতে ঝড় তুলতে পারে। নূরজাহানকে এই নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তাও ঐ বাড়ির থেকে শুনতে হতে পারে। নূরজাহানের ঠায়ই এখনো স্বামীর ঘরে হয়নি। এর মাঝে শাহানার প্রস্তাবে নিরদ্বিধায় ওই বাড়ির মানুষ ভাববে, লোভে পড়ে নূরজাহান এখন নিজের বোনকেও ওই বাড়ির ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। বারান্দার সাথে লাগোয়া নূরজাহানের ঘরটা। বারান্দায় বসে কেউ কথা বললে সেটা নূরজাহানের ঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যায়।
সাতসকালে সুখ, রাদকে ঘুমে দেখে এসেছিল নূরজাহান। যদি কোনো ভাবে শাহানার চিল্লাচিল্লিতে সুখের ঘুম ভেঙে যায় আর কথাগুলো শুনে নেয়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সুখ ওই বাড়ির সকলের আদরের। নূরজাহানের শ্বশুর-শাশুড়ি তো মেয়েকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। শাহানার কথাবার্তা যদি সুখ কিংবা রাদ শুনে ওই বাড়িতে বলে দেয়, তাহলে নূরজাহান ওই বাড়ির সবার চোখে ছোট হয়ে যাবে চিরতরে। তারানূর আশ্চর্য হয়ে বলে…

‘ কি কও বউ? এই কথা ওই বাড়িতে হুনলে আমাগোট মানসম্মান কিছু থাকব? হেরা তো আমাগোরে লোভী মানুস মনে করব।
‘ হেরা কি মনে করব না করব, এই কথা আপনেরা অগ্রীম কেমনে কন? নূরজাহানের মতো নষ্টা ছেঁড়িরে যখন ওই বাড়ির মানুষ মাইনা লইছে, তখন আমার পবিত্র আশনূরেও মাইনা লইব। আপনেরা বিয়ার প্রস্তাব দেন হেগোরে। নইলে আমি এই সংসারে আগুন ধরাই দিমু কইয়া দিলাম।
শাহানা রাগারাগি ভঙ্গিতে চলে যায়। নূরজাহানের চোখে পানি টলমল করছে শাহানার কথায়। হাসান, তারানূর হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকে। আশনূরও হাসানের মতো করে শাহানার সঙ্গে কথা বলে না। আজও চুপ থাকল। শাহানা চলে যেতেই আশনূর বারান্দায় হাজির হয়। হাসানকে বলে…
‘ আমার তৌহিদ ভাইরে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই আব্বা। আমি রাজি। আপনি মাস্টার কাকারে সম্মতি দিয়ে দেন আব্বা।
হাসান শাহানার কথা ধরে আপত্তি জানাতে চাইল,

‘ কিন্তু আপনের আম্মা…
আশনূর হাসানকে থামিয়ে বলে, ‘ বিয়ে আমি করব আব্বা। এখানে আমার সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। আমি জানি আমার আব্বা আমার জন্য ভুল কাউকে বাছাই করবেন না। আমার ভরসা আছে আপনার উপর। আপনি মাস্টার কাকার পরিবারকে বলে দেন আসতে।
তারানূর মাঝে ফোড়ন কেটে বলে…
‘ তোর আম্মা ভেজাল করব। মাস্টার পরিবারের মানুসরে ডাইকা আনার পরে যদি তোর আম্মা হেগো অসম্মান করে, তাইলে কি হইব? গেরামে মুখ দেখাইতে পারুম আমরা?
‘ এমন কিছুই হবে না দাদী। আমি আম্মাকে বুঝাব। চিন্তা করো না।
হাসানের চিন্তিত কপালের বলিরেখা কমল না। হাসান জানে শাহানা কি রকমের মানুষ। শাহানা সহজে কাউকে ক্ষমা করতে পারে না। মানুষ কথা মনে রেখে দ্বিগুণ হারে সেটা তিলে তিলে ফেরত দেয় কষ্টে উপহাসে। যার ভুক্তভোগী হাসান ও নূরজাহান দুজনেই। এখন শাহানা আশনূরের জীবনটাও নিজের মতো করে চালাতে চাচ্ছে। আল্লাহ জানে এর ফল কি হয়।

নূরজাহান মনের সংশয়ে দ্রুত নিজের ঘরে ঢোকে। সুখ শাহানার চিল্লাচিল্লির কথা শুনেছে কিনা, সে ভয়ে আছে। ঘরে ঢুকেই নূরজাহানের কলিজা মুচড়ে ওঠে সুখকে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে দেখে। ভয়ে নূরজাহানের গলা শুকিয়ে এলো। সুখ কাঁদছে মানে শাহানার কথাবার্তা সব শুনেছে। রাদ ছোট মানুষ হওয়ায় সে এখনো বিছানায় ঘুমোচ্ছে। নূরজাহান বিচলিত ভঙ্গিতে খাটের কিনারে বসে সুখের মাথায় হাত রেখে বলে, ‘ সুখ? লক্ষ্মীটি? কি হয়েছে?
নূরজাহানের কথার সাথে সাথে সুখ নূরজাহানকে জাপটে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে বলে…
‘ আমি রাদিল ভাইকে অনেক ভালোবাসি ভাবি। রাদিল ভাই আমার অনেক শখের পুরুষ। তাঁকে আমি ভালোবাসি বলেই তার বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁকে হাসিল করতে চাচ্ছি। তুমি ভাবি রাদিল ভাইকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না। আমি পারব না রাদিল ভাইকে ছাড়া বাঁচতে। মরে যাব।

নূরজাহান বুকে চাপ অনুভব করে। কম্পিত হাতটা সুখের পিঠে রেখে সান্ত্বনা দিতে চাচ্ছে কিন্তু কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। সুখের কান্নায় রাদ ঘুম ঘুম চোখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। ওই ঘর থেকে হাসান, তারানূর, আশনূরও দৌড়ে আসে। সুখ কেন কাঁদছে, বিষয়টা কারও কাছে নূরজাহান স্পষ্ট করল না। তবে আশনূর খানিকটা আঁচ করতে পেরেছে বলে হাসান ও তারানূরকে পাঠিয়ে দেয় নিজেদের ঘরে। আশনূর সুখের মুখোমুখি বসে, সুখের মাথায় হাত বুলিয়ে একটা লুকানো গোপন কথার স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে…
‘ তুমি আমার আম্মার কথায় কিছু মনে করো না সুখ। আমি আমার আম্মার কথায় কাউকে বিয়ে করব না। আমার জন্য যে বিয়ের সম্বন্ধটা এসেছে? সেই ছেলের সঙ্গে আমার দুই বছরের প্রেম আছে। আমি বিয়ে করলে তাঁকেই বিয়ে করব। তুমি নিশ্চিতে থাকো তো। তোমার রাদিল ভাইকে কেউ নিবে না তোমার থেকে।
আশনূরের কথায় নূরজাহানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নূরজাহান হতবুদ্ধি হয়ে অবাক চোখে আশনূরের দিলে তাকিয়ে শুধাল… ‘ তোমার তৌহিদ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বুবু?
আশনূর অবলীলায় স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে…

‘ হুম।
‘ এজন্য মাস্টার কাকা বারবার আব্বার কাছে তোমার বিয়ের প্রস্তাব পাঠাচ্ছিল তাহলে? তৌহিদ ভাই কি ঘরে জানিয়েছে তোমাদের সম্পর্কের কথা বুবু?
‘ হ্যাঁ।
সুখ নূরজাহানকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে। রাদ আশনূর সুখ নূরজাহান কারও কথার কোনো আগামাথা বুঝতে পারছে না। নূরজাহান রাদকে টেনে নিজের কোলে শুইয়ে দেয় পুনরায় ঘুমাতে। সুখ দু’হাতে চোখের পানি মুছে বলে…
‘ সত্যি বলছো আপু?
‘ তিন সত্যি বলছি।
চট করে সুখের মাঝে চঞ্চলতা দেখা গেল। মন ভুলানো হাসি দিয়ে বলে…
‘ আমার আপনাকেও অনেক পছন্দ আপু।
আশনূর হেসে ফেলে। দু’হাতে সুখের গাল টেনে বলে,
‘আমারও তোমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে সুখপাখি।

হাসানের থেকে শুনেছে সওদাগর বংশের সকল পুরুষ এখনো জেলে আছে। হাসপাতালে মানিকের চিকিৎসা চলেছে অনেক দিন। একটু সুস্থ হওয়ার পরপরই মানিককেও জেলে নেওয়া হয়েছে। মারিদ চার থেকে পাঁচটা কেস সওদাগর পরিবারের নামে করেছে, যার জন্য মন্ত্রী হারুন সওদাগর থাকার পরও রেহাই করতে পাচ্ছে না, ভাই ভাতিজাদের সে। মোল্লা সওদাগর ও তার দুই ছেলে ও মানিকের সঙ্গীদলবল সবাই জেলে আছে। মানিক, রতন জেলে থাকলেও তাপস আপাতত ঢাকায় আছে। গ্রামের পরিস্থিতির জন্য তাপসকে আপাতত কয়েক দিন গা ঢাকা দিয়ে ঢাকায় থাকতে বলেছে হারুন সওদাগর। বড় চাচার কথায় তাপস ঢাকায় আত্মগোপন করে আছে। সওদাগর পরিবারের অনুপস্থিতিতে গ্রামের পরিবেশটাও অনেকটা সুস্থ লাগছে। নূরজাহান থানচিতে এসেছে আজ দুদিন। সিকদার বাড়িতে কাজে মানুষ শেফালী খালা অসুস্থতার জন্য কয়েক দিন ধরে নাকি সিকদার বাড়িতে আসে না কাজ করতে। হাসান ফোন করে শেফালীর খোঁজ নেয় কিন্তু সশরীরে গিয়ে শেফালীকে দেখার সুযোগ হয়নি। সুখ, রাদ, আশনূরের সঙ্গে পুকুরে নেমে গোসল করতে। সাথে ওই পুকুরপাড়ের ছোট ছোট কিছু ছেলেমেয়েরাও যোগ হয়েছে। সবাই মিলে পানিতে নেমে আনন্দ করছে। নূরজাহান ভাবল একবার গিয়ে শেফালীকে দেখে আসবে। শেফালীকে নূরজাহানের মা আয়েশা এই সিকদার বাড়িতে কাজের জন্য এনেছিল তারপর থেকে শেফালী এই বাড়িতেই একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসাবে আছে। বয়সে শেফালী আয়েশার সমবয়সী হবে। শেফালীর ছেলেমেয়ে, সংসার বলতে একটা চৌদ্দ বছরের মেয়ে আছে, যাকে আরও এক বছর আগে বিয়ে দিয়েছিল পাশের গ্রামে মতিনের লগে।

খালি বাড়িতে অসুস্থ শেফালী কিভাবে জীবন যাপন করছে সেই ভেবেই নূরজাহান সিদ্ধান্ত নিল শেফালীর সঙ্গে এই ভরদুপুর বেলায় দেখা করতে যাবে। নূরজাহান কালো বোরখায় নিজেকে আড়াল করে মুখের উপর নেকাব ফেলে। হাসান আজ রামদা হাতে নিয়ে বেরুলো না। সওদাগর পরিবারের সবগুলো জাউরা জেলে আছে, কেউ আজ নূরজাহানের ক্ষতি করতে চাইবে না বিধায় হাসান নিশ্চিন্তে রশিদের অটোরিকশা ডেকে নূরজাহানকে নিয়ে শেফালীর বাড়ির সামনে থামে। শেফালীর বাড়িটা গ্রামের পূর্বে যে পাহাড়গুলো আছে, তার তলদেশে মাটি কেটে একটা টিনের ঘর বানিয়ে পাহাড়ে থাকছে। এই টিনের ঘরটা অবশ্যই হাসান টাকা দিয়েছিল বানাতে। হাসানের অনেক অবদান আছে শেফালীর জীবনে। শেফালীর মেয়ে মর্জিনাকে এক বছর আগে বিয়ে দেওয়ার সময় সকল খরচ ও যৌতুকের ভার হাসানই নিয়েছিল। রশিদ পাহাড়ের রাস্তায় অটোরিকশা থামায়। এর থেকে আগে গাড়ি যাবে না। পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তা বেশ ভাঙাচোরা। নূরজাহান গাড়ি থেকে নেমে যায়। হাসান নূরজাহানের সঙ্গে যায় না, সে গাড়িতে থাকবে বলেছে। নূরজাহান হাতের কিছু ফলমূল নিয়ে পাহাড়ের রাস্তা ধরে শেফালীর ঘরের দিকে এগোয়..

‘ আম্মা, তুমি কইছিলা জামাইর ঘর মাইয়াগো আপন ঘর হয়। বাপের বাড়ি ক্ষণস্থায়ী। জামাইর বাড়িরে নিজের বাড়ি মনে করতাম। কিন্তু আমার শ্বশুরবাড়ির মাইনষে কয়, ওইটা নাকি আমার বাড়ি না। আমি নাকি তিন কথার বেডি, হেগো পোলা আবার তিন কথা কইলে আমি নাকি তাগো বাড়ির কেউ না। ক্যান আম্মা? জামাইর বাড়ি আমার না, বাপের বাড়িও আমার না, তাইলে আমার বাড়ি কোনটা আম্মা? যে বাড়ি থেইক্কা আমারে কেউ কখনো তাড়াইতে পারব না, আমার হেই বাড়ি কোনটা আম্মা?

ছোট টিনের ঘরটায় তিনটা রুম। একটা খাবার ঘর, বাকি দুটোতে মা-মেয়ে থাকে। শেফালীর মেয়ের নাম মর্জিনা। তেরো বছর বয়সেই মর্জিনাকে বিয়ে দেয় পাশের গ্রামের দিনমজুর মতিনের সঙ্গে। মর্জিনার স্বামী মতিন রিকশা চালায়। ছয় ভাইবোনের সবার ছোট ছিল মর্জিনার জামাই। সে বাবা-মা, ভাইবোনের বাধ্যগত ছেলে হওয়ায় বউয়ের হয়ে কখনো কথা বলে না। বরং বাবা-মা আর বোনের কথা শুনে মর্জিনাকে বিয়ের এক মাসের মাথায় ধরে মারধর করত। মর্জিনা ছোট মানুষ, মাকে ফোন করে কান্নাকাটি করে এসব কথা জানালে শেফালী সবসময় মেয়েকে বোঝাত স্বামীঘর মেয়েদের আপন ঘর। শ্বশুরবাড়ির মানুষ কষ্ট দিলেও মুখ বুঁজে মেনে নিতে হয়। বউ কথা না শুনলে জামাই একটু-আধটু মারধর করেই। শেফালীকেও মর্জিনার বাবা মারত। শেফালী ধৈর্য ধরে ছিল বলে আজ মর্জিনার বাবার সংসারে টিকতে পেরেছে। মর্জিনাও ধৈর্য ধরে স্বামী-সংসার করতে পারলে সেও এক সময় সুখ পাবে। স্বামী সুখ না দিলে ভবিষ্যতে সন্তানের সুখ দেবে। শেফালী মাঝঘরের চৌকির উপর বসে। মর্জিনা টিনের ঝাপটার সাথে লেগে ছোট পিঁড়িতে বসে মাকে প্রশ্ন করে। ছোট মর্জিনার রঙিন স্বপ্ন বিয়ের পর চুরমার হয়ে গেছে। বিয়ে নিয়ে কিশোরী মর্জিনার মনে ছিল উচ্ছ্বাসের ঢেউ। বিয়ে মানুষকে সুখ দেয়, আপন ঘর দেয়, স্থায়ী ঠিকানা দেয়—এমনটাই তার মা বলত। সে ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে শুনে এসেছে স্বামীঘর মেয়েদের আপন ঘর হয়। অথচ স্বামীঘরে গিয়ে শুনল স্বামীর ঘরও তার না। সারাদিন গাধার মতো কাজ করেও কত কথা শুনতে হয় শশুর বাড়ির মানুষজন থেকে! এত কাজ করেও কারও মন পাওয়া যায় না। কাম করতে পারলে ভালো না করতে পারলে এটা সেটা বলে খোঁচা দেয়। মর্জিনাকে যৌতুকের জন্যও ধরে মারধর করে ওর স্বামী। শাশুড়ীই মতিনকে বলে মর্জিনাকে মারতে। অথচ এতকিছু শুনেও মর্জিনা মা বলে স্বামীর ঘরে সহ্য ধৈর্য করেই চলতে হয়। শেফালী চৌকিতে বসে পান চিবোতে চিবোতে মেয়ের কথায় বিদ্রুপ করে বলে…

‘ মাইয়াগো কোনো আপন ঘর নাই। মাইয়া হইলো বহুরূপী। যহন যে ডালে যায়, তহন হেই ডালই তার আপন নিবাস। মাইয়াগোর বিয়ার আগে বাপের ঘর, বিয়ার পর স্বামীর ঘর, শেষ কালে ছেলের ঘরই হইল নারীর আপন ঘর, বুঝলি?
‘ নারী ক্যান বহুরূপী আম্মা? ক্যান নারীর আপন ঘর নাই? ক্যান সবাই নারীর বেলায় বৈষম্য কইরা দেখে? বাপের ঘরে মেয়ে, স্বামীর ঘরে বউ, সন্তানের ঘরে মা। আম্মা, নারীর নিজের পরিচয় কি?
‘ মাইয়াগোর জন্ম থেইক্কা নারী শব্দটাতেই অবহেলিত। নারীর ঠাঁই সবসময় পুরুষের পরেই আসে মর্জিনা। কথায় আছে নারী তুমি বহুরূপী। এইডা তোরে মানাই লইতে হইব। এডাই বাস্তব।
মায়ের কথায় মর্জিনা আহত হচ্ছে। ততই প্রশ্নের তীর ছুড়ে যাচ্ছে শেফালীর দিকে। মর্জিনা সহজ-সরল একটা মেয়ে। ছোটবেলা থেকে মর্জিনা বেশ প্রশ্ন করত জগৎ-সংসার জানার আগ্রহে। শেফালী যা বলত, তাই বিশ্বাস করত। মায়ের চোখে রঙিন দুনিয়া দেখতো। মর্জিনার বাবা মর্জিনার সাত বছর বয়সে মারা যায়। মায়ের হাত ধরেই মর্জিনার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকে শেফালী মর্জিনাকে যা শিক্ষা দিয়েছে, সেসব শিক্ষার কিছুই স্বামীর ঘরে গিয়ে মর্জিনা পায়নি। বরং পেয়েছে দুঃখ-কষ্ট লাঞ্ছনা আর তিরস্কারের জীবন। মায়ের ঘরে মর্জিনা যতটুকু ভালো ছিল, স্বামীঘরে তার থেকেও কষ্টে আছে। তাই আজ শেফালীর সকল শিক্ষার উপর মর্জিনার প্রশ্নের আঙুল উঠছে…

‘ দুনিয়ার সব নিয়ম নারীর বেলায় ক্যান আম্মা? তোমার কওয়া সবগুলা ঘর তো পুরুষের ঠিকানা কইলা তুমি। এইহানে আমার ঘর কোনটা আম্মা?
মর্জিনার বয়স কম। সাজানো রঙিন স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় মেনে নিতে পারছে না। হাহাকারে বুক ভেঙে আসছে কষ্টে। মায়ের কাছে সে কি আকুতি-মিনতি নিজের আপন ঠিকানা খোঁজার! মর্জিনার প্রশ্নের সঠিক উত্তর শেফালীর কাছেও নেই। শেফালী নিজে তার মা, দাদী, শ্বশুরবাড়ি কিংবা সমাজ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছে, তাই ছোট মর্জিনাকে বোঝাতে চাচ্ছে। শেফালী পান চিবোতে চিবোতে শক্ত গলায় বলে…
‘ শোন মর্জিনা, মাইয়া মানুষের ভাগ্য এমনই হয়। পরগাছার ন্যায়। হেগো কোনো আপন ঘর থাহে না, শ্বশুরবাড়িতে কষ্ট কইরাই জীবন কাটাইতে হয়। আমি যেমন তোর বাপের সংসার কষ্ট কইরা পার করছি, তুইও তাই কর। এখন কষ্ট কর, একদিন সুখ আইব।
আবার একটা নতুন অনিশ্চিত আশা দিল শেফালী মর্জিনাকে। মর্জিনা বুঝে গেছে ওর মা ওকে শুধু মিথ্যা আশা দিচ্ছে সান্ত্বনার নামে, যার কোনো অস্তিত্ব কিংবা গুরুত্ব নেই দুনিয়াতে। কিন্তু এটা কথার কথা সবাই বলে আশা দেয়। মর্জিনা আহত হয়। মায়ের কথা মানেই মানিয়ে নাও, আশায় থাকো। মর্জিনা বুঝে গেছে নারীর জীবন আশায় পার হয়। যেমন আশায় শেফালী নিজের জীবন পার করেও সুখের দেখা পায়নি। তেমন আশায় মর্জিনাকেও দিন পার করতে বলছে। মর্জিনা আহত মনে কঠিন কিছু সত্যের মুখোমুখি করায় শেফালীকে। ক্ষীণ মনে বলে…

‘ ওই একদিন কবে আইব আম্মা? তুমি কি সুখের দেখা আজও পাইছো আম্মা? তোমার তো জীবন গেল, যৌবন গেল, মনের শখও মইরা গেল। নারী শুধু আশায় বাঁচে তার একদিন সুখ হইব। কিন্তু সুখ তার কহনোই হয় না আম্মা, যেমন তোমারও হয় নাই। তুমি এহনো আশায় আছো একদিন সুখী হবা। কিন্তু তোমার সুখের দিন আইতে আইতে তুমি ফুরাই গেছ আম্মা, তোমার গায়ের রঙ, সৌন্দর্য ফুরাই গেছে। এহন তোমার শরীরে আস্তে আস্তে রোগ বাসা বান্ধতাছে। এহন তোমার আর বিলাসিতা, শখ জাগে না আম্মা। জাগে শুধু নিয়ম কইরা ঔষধ খাওনে কথা। তোমার অনিশ্চিত সুখের আশায় তুমি যে কহন ফুরাই গেছে তার টের পাও নাই আম্মা।
শেফালী মেয়ের কথায় উত্তর দিতে না পেরে মর্জিনাকে ধমকে চুপ করাল। শেফালী নিজেও জানে মর্জিনার প্রত্যেকটা কথা সত্যি। কিন্তু এই সমাজে সব সত্যের ঠাঁই নেই। নূরজাহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শেফালী ও মর্জিনার কথোপকথন শুনেছে। মর্জিনাকে শেফালী ধমক দিতেই নূরজাহান ক্ষীণ স্বরে বলে…

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৩

‘ খালা আসব?
‘ কে?
‘ আমি নূরজাহান।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here