Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৩

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৩

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৩
রিক্তা ইসলাম মায়া

‘আপনি চলে যান নূরজাহান।
নূরজাহান মনে করে ওকে মারিদ নিচে যেতে বলছে। সেজন্য নূরজাহান মারিদকে সেইভাবে উত্তর বলে…
‘আপনি যাবেন না নিচে?
‘আপনি কাল থানচিতে চলে যাবেন নূরজাহান।
নূরজাহান বুক মুচড়ে ওঠে মারিদের কথায়। নূরজাহানের অতীত জেনে কি তাহলে মারিদ নূরজাহানকে তাড়িয়ে দিচ্ছে? নূরজাহান শীতের বরফের ন্যায় জমে যায়। কম্পিত স্বরে বলে…
‘আপনি কি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন?
‘জি।

নূরজাহানের খুব ইচ্ছা করল মারিদকে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে, কেন সে নূরজাহানকে চলে যেতে বলছে? যদি সে নূরজাহানকে তাড়িয়ে দেওয়ারই হতো, তাহলে মারিদ এত খোঁজাখুঁজি করে নূরজাহানকে কেন খুঁজে বের করল? কেন নূরজাহানকে বিয়ে করে এখন তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে? মারিদও কি সবার মতো করে নূরজাহানকে নিয়ে পরিহাস করল? অতি কষ্টে নূরজাহানের গলা চেপে আসে কান্না। এতক্ষণ মারিদকে নিজের অতীত বলতে গিয়ে নূরজাহানের কান্না না আসলেও এবার বুকে কান্না ফেটে আসছে মারিদের অবহেলায়। নূরজাহান ঢোক গিলে নিজের কান্না আটকাতে চায়। মারিদের সামনে কেঁদে নিজেকে ছোট করতে চায় না। মারিদের পাশ থেকে সরে নূরজাহান বেশ শান্ত স্বরে বলে…

‘ আমাকে ক্ষমা করবেন, অপ্রিয় হয়েও বারবার প্রিয় হওয়ার জন্য বিরক্ত করছি! ভালো থাকবেন, আসছি।
নূরজাহান হাতের কফির মগটা নিয়ে চলে যায়। পিছন ফিরে তাকায় না। হয়তো আত্মসম্মানের নাম করে চোখের জল লুকাচ্ছে। মারিদ নূরজাহানের চলে যাওয়ার দিকে নিরলস ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। সে নূরজাহানকে থামানোর চেষ্টা করছে না। দীর্ঘ সময় ধরে নূরজাহানের অতীত জানার পর মারিদের মাথায় কি চলছে, সেটা মারিদের ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা দায়। মারিদ আরও ঘণ্টা খানেক পর রুমে আসল। যাওয়ার সময় ঘরের আলো জ্বালিয়ে গিয়েছিল, এখনো ঘরের লাইট জ্বলছে। নূরজাহান মারিদের ঘরে নেই। বিছানাটা খালি। মারিদ বারান্দায় গেল না নূরজাহানের খোঁজে। সে ঘরের দরজা বন্ধ করে কাবার্ড খোলে। খুব যত্নে তুলে রাখা অপরিচিতার চিঠির বক্সটা হাতে নেয়। বিশ-পঁচিশটা মতো চিঠি হবে বক্সে রাখা। নূরজাহানের কথা অনুযায়ী অপরিচিতা কখনো মারিদকে চিঠি লিখতেই পারেনি। এই বেনামি চিঠি মারিদ অন্য কাউকে লিখছে অপরিচিতা ভেবে। সেদিন মারিদকে ফোন করে চিঠির অপরিচিতার নামে পরিচয় দেওয়া মেয়েটা তাহলে তনিমাই ছিল, যার সাথে দুর্ভাগ্যবশত রিফাতের বিয়ে হয়েছে।

মারিদের মাথা তখনই হ্যাঙ হয়েছে যখন নূরজাহান বলেছিল সে কখনো মারিদকে চিঠি লেখার সুযোগই পায়নি। মারিদ শুরু থেকে অপরিচিতাকে চাইত। অপরিচিতাকে ভেবে সে তৃতীয় পক্ষের কেউ একজনের চিঠির উত্তর দিয়েছে। চিঠি আদান-প্রদান ভুল মানুষের সাথে হলেও মারিদ সবসময় অপরিচিতাকে ভেবেই চিঠি লিখত। তনিমার এসব চিঠি মারিদের কাছে মূল্যহীন। সবচেয়ে বড় কথা তনিমা রিফাতের বউ। অতীতে কি ছিল সেই হিসাব বাদ। বর্তমানে তনিমা মারিদের ভাইয়ের বউ। সে এই সম্পর্কটাকে সম্মান করে এবং কখনো চায় না এই চিঠির বিষয়টা তনিমা, রিফাত কিংবা নূরজাহানের সামনে আসুক। তাহলে বেশ জটিল এবং বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে সবগুলো সম্পর্ক। মারিদ বক্সের চিঠিগুলো রুমের ভিতরের স্টিলের ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। নিচ থেকে লাইটার এনে চিঠিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সবগুলো চিঠি আগুনে জ্বলছে। মারিদ তনিমার চিঠির সঙ্গে তনিমার সাথে অতীতের সম্পর্কটাকেও জ্বালিয়ে দেয় যেন বর্তমান নষ্ট না হয়। মারিদ বারান্দার দরজা খুলে দেয়। রুমের পোড়া গন্ধের জন্য স্প্রে মেরে পুনরায় বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়াতে দেখে নূরজাহান তখনকার মতো করে সোফায় দু-পা তুলে কুঁজো হয়ে চোখের উপর হাত ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে। মারিদ ঘরে এত তোলপাড় করছে, এতে নূরজাহানের হেলদোল নেই। মারিদ নূরজাহানকে ডেকে বলল…

‘এখানে ঘুমাতে হবে না। আপনি রুমে গিয়ে বিছানায় ঘুমান অপরিচিতা।
মারিদ মনে করেছিল নূরজাহান ঘুমে হবে সেজন্য মারিদের কথার উত্তর আসবে না। কিন্তু মারিদকে ভুল প্রমাণ করে নূরজাহানের জবাব আসল তক্ষুনি..
‘সমস্যা নেই, কষ্ট আমার গায়ে সয়ে গেছে। এই সামান্যতে কিছু হবে না আমার। আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি ঠিক আছি।
‘ওকে।
মারিদও পাল্টা তেজ দেখিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ে। বেশ সময় নিয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাগে আবার উঠে বসে। তিরতিরে মেজাজে বারান্দায় গিয়ে নূরজাহানের বাহু টেনে ঝাপটে কোলে তুলে নেয়। নূরজাহান ভয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘ও আল্লাহ, কি করছেন নামান আমাকে, আমি পড়ে যাব।
মারিদ নূরজাহানকে ছুড়ে ফেলার মতো ঢিল মারে নিজের বিছানায়। নূরজাহান হুমড়ি খেয়ে বিছানায় লুটিয়ে পরে হকচকিয়ে উঠতে চাইলে মারিদ নূরজাহানের মাথা বালিশের উপর চেপে ধরে বলে…
‘আপনাকে চলে যেতে বলেছি, কষ্ট করতে বলিনি। যেদিন আপনার মিথ্যা, ছলনা সবকিছু ভুলে আপনাকে আপন করতে পারব, সেদিন আমি নিজে গিয়ে আপনাকে নিয়ে আসব থানচি থেকে। ততদিন আপনি একা থাকবেন, এটাই আপনার শাস্তি।

নূরজাহান টু শব্দ করল না। বালিশে মাথা ফেলে চুপ করে শুয়ে রইল। মারিদ নূরজাহানের গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে সে ওপাশে শুয়ে পড়ে। দুজনের মাঝে একটা মানুষ শোয়ার মতো জায়গা আছে। মারিদ এসির রিমোট নিয়ে নরমাল টেম্পারেচার থেকে হাই টেম্পারেচারে করে চোখ বন্ধ করে। মারিদ রাগে নাকি এমনিই এসির পাওয়ার বাড়িয়েছে জানা নেই। কিন্তু এসির ঠান্ডায় শেষ রাতের দিকে নূরজাহানকে মারিদের পাশ ঘেঁষে পাওয়া যায়। অতি শীতে কুঁজো হয়ে মারিদের বুকের কাছে ঠায় খোঁজে। মারিদ ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘুমাতে পারে না। নূরজাহানের উপস্থিতিতে তার ঘুম ভেঙে যায়। বুকের পাশে নূরজাহানকে পেয়ে এসির রিমোট হাতে নিয়ে অবশিষ্ট যতটুকু কমতি ছিল, সেইটুকু এসির পাওয়ারও বাড়িয়ে দিয়ে রিমোট রাখে। দু-চোখে কাঁচা ঘুম। নূরজাহান বুক ঘেঁষে শুয়ে। মারিদ নূরজাহানের বাহু টেনে দু-হাতে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে। নূরজাহানের গাল মারিদের বুকে চেপে যেতে নূরজাহান চোখ মেলে তাকায়। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দুজনের গভীর আলিঙ্গন। মারিদ নূরজাহানের পিঠে আদুরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, বারবার মাথায় ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে। মারিদ জানে নূরজাহান ঘুমে। অথচ দুজনেই জেগে। কেউ কারও জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে না বলে নূরজাহান ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকে। এই ভালোবাসা, এই যত্ন, ব্যবসায়িক সাহেবের বউ হওয়া , মধ্যরাতে বুকে ঠায় পাওয়া—এসব নূরজাহান স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। অথচ আজ বাস্তব হচ্ছে। নূরজাহান অনুভব করল সে আজ ভিষণ সুখী। দুঃখগুলো নূরজাহানকে ছুঁতে পারছে না। পিনপিনে নীরবতা ভেঙে মারিদ মোহাচ্ছন্ন গলায় ডাকল নূরজাহানকে..

‘ আপনাকে একটা কিস করতে ইচ্ছে করছে অপরিচিতা। করি?
নূরজাহান হুম, হ্যাঁ কিংবা হেলদোল কিচ্ছু করল না। ঘুমের ভান ধরে শক্ত কাঠ হয়ে শুয়ে রইল। মারিদের আবদার নূরজাহানের গায়ে কম্পন ধরিয়েছে। সেই কম্পন মারিদও টের পাচ্ছে। মারিদ দুষ্টু কণ্ঠে বলে..
‘আপনি তো ঘুমে? আমি একটা না, পাঁচটা কিস করলেও আপনি বুঝবেন না, তাই না?
মারিদ কথাটা বলতে বলতে নূরজাহানের বাহু টেনে নিজের বালিশে শুইয়ে দেয়। নূরজাহানের মুখের উপর ঝুঁকে তিরতির করে কাঁপতে থাকা নূরজাহানের চোখের পাতায় শব্দ করে দুটো চুমু খেয়ে নূরজাহানের গলায় মুখ গুঁজে ভারী গলায় বলে…

‘পাব না জেনেও আপনাকে বারবার খুঁজেছি। একবার নয়, শতবার সন্ধান করেছি। আপনাকে খুঁজে পাওয়াটা আমার ভাগ্যে ছিল, নয়তো আমি নিয়তি মেনে নিতে চেয়ে ছিলাম পাব না বলে।
সকাল বেলা ডাইনিং টেবিলে সকলে বসে নাস্তা করছে। নূরজাহান শাশুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। নূরজাহানের গায়ে হালকা জ্বর, ঠান্ডা হয়েছে । মারিদের রাতে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দেওয়াতে ঠান্ডা-জ্বর এসেছে। নূরজাহান বেগুনি রঙের শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে। লম্বা চুলের বেণি শরীর ছাড়িয়ে ফ্লোরে খানিকটা পড়ে আছে। রোজিনা তরকারির বাটি আনা-নেওয়া করার সময় অসাবধানতায় নূরজাহানের চুলে পা পড়তেই নূরজাহান বেঁকে যায়। রোজিনার তরকারির বাটিও ছিটকে পড়ে যায়। সকলে খাওয়া ছেড়ে সেদিকে তাকায়। রোজিনা হৈ হৈ করে একবার সালমার কাছে মাফ চাইছে তরকারির বাটি ফেলে দেওয়াতে, অন্যবার নূরজাহানের কাছে মাফ চাইছে চুলে পা রাখাতে। নূরজাহান কিছু বলে না। সে রোজিনার কাজে সাহায্য করতে চায় তরকারির ঝোল পরিষ্কার করতে। সালমা বাধা দিয়ে বলে…

‘এসবে তোমার হাত দিতে হবে না। রোজিনাই পরিষ্কার করতে পারবে। তুমি সরে দাঁড়াও।
নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে পাশে সরে যায়। সালমা নূরজাহানের চুলের বেণি দেখে বলে..
‘এত বড় চুল সামলানোও মুশকিল, তোমার চলাফেরাতেও ঝামেলা হয়। একটা কাজ করো, সুফিয়া-আফিয়ার সাথে আজ পার্লারে গিয়ে চুল কেটে এসো। বেশি কাটতে হবে না, যাতে মাটিতে না পড়ে তোমার সমান সমান হয় ততটুকু কাটলেই চলবে।
শাশুড়ির কথায় নূরজাহান ‘জি আচ্ছা’ বলে সম্মতি দেয়। মারিদ খেতে খেতে সালমার কথাটার বিদ্রূপ করে বলে, ‘দরকার নেই চুল কাটার। চুল সামলাতে না পারলে দরকার হলে আমি মানুষ রেখে দেব, তারপরও কেউ যেন চুলে হাত না দেয়।

মারিদ সালমার একমাত্র ছেলে। মারিদ নূরজাহানকে সালমার থেকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, ব্যাপারটা সালমার পছন্দ হচ্ছে না। সবে বিয়ে হয়েছে, এখনই বউয়ের কথা বলছে মারিদ। সালমা অসন্তুষ্ট গলায় বলে…
‘বড় চুল সামলানো মুশকিল, তুই মেয়েদের কিছু বুঝিস? নিষেধ যে করছিস?
‘আমি এত কিছু বুঝতে চাই না। যেটা নিষেধ করেছি সেটা নিষেধই থাকবে। এরপরও যদি কেউ আমার কথা অমান্য করে চুলে হাত দেয়, তাহলে আমি সব চুল আগুনে জ্বালিয়ে দেব।
সালমা অপমানে থমথমে মুখে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নূরজাহান শাশুড়ির অপমানিত মুখটা দেখে সে নিজেও থমথমে খেয়ে যায়। মারিদের নিষেধ করাটা যে সালমা ভালো দৃষ্টিতে নিচ্ছে না, সেটা নূরজাহানও আঁচ করতে পারছে। নূরজাহানের থমথমে মুখটা অপমানে গাঢ় করে মারিদ মাহবুবের উদ্দেশ্যে ফের বলে…
‘বাড়ির ড্রাইভারকে বলবেন নূরজাহানকে থানচিতে পৌঁছে দিতে।
মাহবুব খাওয়া থামিয়ে বলে, ‘নূরজাহান কি আজ চলে যাবে?
‘জি।

সুখ খাচ্ছিল। নূরজাহান চলে যাবে শুনে খাওয়া থামিয়ে হৈ হৈ করে বলে, ‘তাহলে আমিও ভাবির সাথে যাব ভাবীদের বাড়িতে বেড়াতে। এখন তো আমার ছুটি। পরীক্ষাও শেষ। গেলে সমস্যা হবে না।
সালমা সুখকে ধমকে ওঠে। মায়ের ধমকে সুখ চুপ করে যায়। সালমা মারিদকে বলে,
‘ নতুন বউ বাড়িতে আসতে না আসতেই আবার বাপের বাড়ি চলে যাবে কেন? আমরা কি অনুমতি দিয়েছি তোর বউকে যাওয়ার, যে চলে যাবে বলছিস?
সালমার অসন্তুষ্টি উপস্থিত সকলেই বোঝে। মারিদ সালমাকে শুধিয়ে বলে,
‘নূরজাহান যেতে চাচ্ছে না, আমিই পাঠিয়ে দিচ্ছি ওকে।
‘বউ আসতে না আসতেই তুই পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছিস কেন? তোর বউয়ের তুই-ই সর্দার? আমরা মা-বাবা কেউ না? আমাদের গুরুজনদের অনুমতি প্রয়োজন নেই তোদের এখন?
‘আহ সালমা! ছোট একটা বিষয় তুমি বড় করছ কেন? নূরজাহানকে তো আমরা এখনো উঠিয়ে আনিনি। মারিদ যদি নূরজাহানকে পাঠাতে চায় তাহলে যাক। বাড়ির বউ তো আজ না হোক কাল এই বাড়িতেই আসবে, তাই না? এখন গেলে সমস্যা কই?
মারিদ মায়ের অসন্তুষ্টিতে পাত্তা দিচ্ছে না। মাহবুবও মারিদের হয়ে বিষয়টা সামলাচ্ছে। নূরজাহান থমথমে মুখে শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে। মারিদ প্রথমে নূরজাহানের চুল নিয়ে মাকে নিষেধ করল, এখন আবার সালমার অনুমতি না নিয়ে নূরজাহানকে থানচিতে পাঠিয়ে দিচ্ছে—এতে সালমা নিশ্চিতরূপে নূরজাহানকে ভুল বুঝছে। অথচ নূরজাহান নিজেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। কিন্তু আত্মসম্মানের তাগিদে মারিদকে না করতে পারছে না।

‘বিয়ে করেছে সবে দু-দিন হলো। এখনই আমার কথার কোনো দাম নেই। মা অদামের হয়ে গেছে, ঘরে নতুন বউ এসেছে তাই। তোদের যা খুশি তাই কর। আমাকে কোনো কিছুতে আর ডাকিস না।
সালমা রেগেমেগে নিজের ঘরে চলে যায়। ফাতেমা, মুনিয়া, মাহবুব সকলেই সালমার পিছন থেকে ডাকে, সালমা ফিরে আসে না। মারিদ খাওয়া শেষ করে উঠে চলে যায়। সে সালমার রাগে পাত্তা দেয় না। যাওয়ার আগে নূরজাহানকে একপলক দেখে নেয়। নূরজাহান টেবিলের কোণায় মাথায় ঘোমটা টেনে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে। সুখ মায়ের অনুপস্থিতিতে মারিদকে ডেকে বলে,
‘ভাই, আমি কিন্তু ভাবির সাথে যাব। তুমি আম্মাকে রাজি করিও।
সুখের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাদ চিৎকার করে ওঠে,
‘ আমিও সুখ আপুর সঙ্গে যাব সুন্দর ভাবির বাড়িতে মারিদ ভাই।
নূরজাহান সালমার ঘরের দরজায় নক করে। সালমা পিঠ মুড়ে বিছানায় শুয়ে। নূরজাহানের হাতে একটা চিরুনি আর কেঁচি নিয়ে এসেছে। মিহি গলায় ডাকে সালমাকে, ‘আম্মা আসব?
সালমা নূরজাহানের ডাকের উত্তর দেয় না। মারিদের সঙ্গে রাগ করে না খেয়েই এসে শুয়ে পড়েছে। মাহবুব, ফাতেমা, মুনিয়া এত করে বলার পরও নাস্তা করতে রুম থেকে বের হয়নি সালমা। নূরজাহান নিজেও খায়নি। সালমা নূরজাহানকে ভুল বুঝছে সেজন্য সে শাশুড়িকে রেখে খায়নি। নূরজাহান ফের ডেকে বলে, ‘আম্মা আসব?

‘তুমি এসে কি করবা? যাও গিয়ে ব্যাগ গোছাও। তোমার স্বামী আদেশ করে গেছে, তা গিয়ে পালন করো। শ্বশুর-শাশুড়ির অনুমতি তো তোমাদের জামাই-বউয়ের দরকার নেই। আমরা হচ্ছি পরগাছা। আমাদের কথা কে শুনবে?
নূরজাহান সালমার অনুমতি ছাড়াই ঘরে ঢোকে। সালমার পায়ের কাছে বিছানায় বসে, সালমার পায়ে হাত দিয়ে বলে…
‘আমাদের ক্ষমা করে দিন আম্মা। আমরা আপনাকে অসন্তুষ্ট করতে চাইনি। আমার মা নেই, আপনি আমার মা। আমি আপনাদের ছেড়ে যেতে চাই না। কিন্তু আপনার ছেলে কাল রাতে আমাকে বলল, আমি নাকি যৌতুক ছাড়া আপনাদের বাড়িতে মাগনা বউ হয়ে চলে এসেছি। সেজন্য উনি আমাকে আজ বাড়িতে পাঠাতে চাচ্ছেন, যেন আবার আসলে যৌতুক নিয়ে আসি।
নূরজাহানের কথায় সালমা হুড়মুড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল। অবিশ্বাস্য গলায় অবাক হয়ে বলে…
‘মারিদ তোমাকে বলেছে যৌতুকের কথা?
‘জি আম্মা।

‘ মারিদ, টাকা টাকা করতে করতে দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছে। দিন নাই রাত নাই সারাক্ষণ টাকার পিছনে দৌড়ায়। এখন আবার ওর বিবেকে কেমনে ধরল তোমার কাছে যৌতুক চাইতে? ওর বাপে যৌতুক নিয়ে বিয়ে করছে? যে ও যৌতুক চাচ্ছে বউয়ের থেকে? ছেলেটার কত অধঃপতন হলো। আজ ওহ বাড়িতে আসুক। এই কথার বিচার হবে।
খবরদার বউ, তুমি যৌতুকের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাবে না।
নূরজাহানের ভাবমূর্তি বেশ স্বাভাবিক। হাতের চিরুনি আর কেঁচি সালমার হাতে দিয়ে বলে, ‘আপনার ছেলে যখন আমাকে পাঠাচ্ছে, তখন আমাকে যেতে দিন আম্মা। নয়তো উনি ভাববেন আমি আপনাকে ফন্দি করে এই বাড়িতে থাকতে চাচ্ছি।
‘ ভাবলে ভাববে এতে সমস্যা কোথায়? আমি তোমার শাশুড়ি হই, আমি তোমার সুখ-দুঃখ দেখব না তো কে দেখবে?

‘জি আচ্ছা আপনি যা বলবেন তাই হবে।
নূরজাহানের উপর সালমার রাগ চলে যায়। কিন্তু মারিদের উপর রাগটা দ্বিগুণ হয় নূরজাহানের মিথ্যা বলায়। মারিদ ছেলে মানুষ, মাকে এটা-সেটা বলে মানিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু নূরজাহান এই বাড়ির বউ। শাশুড়ি অপছন্দের তালিকায় একবার চলে গেলে তখন শাশুড়ীর সঙ্গে মিলে সংসার করাটা মুশকিল হবে। মা-ছেলের মধ্যে এখন মনমালিন্য হলেও পরে ঠিক হয়ে যাবে, নিজের পেটের সন্তান কোনো মা-ই ফেলে দিবে না। কিন্তু বউ-শাশুড়ির মধ্যে মিল না থাকলে সংসারে অশান্তি দিন দিন বাড়ে। সালমা বলে…
‘এসব কেঁচি-চিরুনি আমাকে দিয়েছ কেন? কি করব?
‘আমি কখনো পার্লারে যাইনি আম্মা। আমার জন্য আপনিই পার্লার। আপনি আমার চুল কেটে দিন আপনার মতো করে।
নূরজাহান পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়ায়। চুলগুলো সব ঝরঝর করে শরীর বেয়ে ফ্লোরে ঠেকে। সালমা কেঁচি হাতে নিয়ে কনফিউজড হয়ে বলে…
‘আমাকে বলছ চুল কেটে দিতে? আমি তো এসব পারি নারে বউ। কখনো কারও চুল কাটিনি। ছোটবেলায় সুখের চুল কেটে দিতাম মাঝেমধ্যে। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর থেকে ওরা সবাই দলবেঁধে পার্লারে চলে যায়। আমারও অভিজ্ঞতা নেই এসবের।

‘সমস্যা নেই আম্মা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পরবে না। আপনার যেমন খুশি তেমন করেই আমার চুল কেটে দিন। আঁকাবাঁকা হলেও সমস্যা নেই, দু-দিন পর দেখবেন চুল আবার বড় হয়ে গেছে। আপনি কাটুন।
নূরজাহানের কথায় সালমা ভরসা পায়। চিরুনি দিয়ে চুল গুছিয়ে নূরজাহানের পায়ের কাছে বসে। এত বড় চুল কাটতে এখন সালমারই মায়া হচ্ছে। কিন্তু উনি নোটিস করেছে বড় চুলের জন্য নূরজাহানের চলাফেরায় সমস্যা হয়। চুলের বেণি করলে ফ্লোরে পড়ে থাকে, এতে চুলের আগায় ময়লা হয়ে যায়। আবার এত বড় চুল সবসময় নূরজাহান খোঁপা করেও রাখতে পারে না, চুলে গন্ধ করে। এসব বিষয় নোটিস করেই সালমা তখন বলেছিলেন নূরজাহানের চুলের আগা কেটে নূরজাহানের সমান সমান করে নিতে। সালমা খুব মনোযোগ দিয়ে নূরজাহানের চুল কেটে দেয় নূরজাহানের পায়ের গোড়ালি সমান করে। প্রায় দশ ইঞ্চির মতো চুল কেটে সালমা উঠে দাঁড়ায়। চুলগুলো হাতে নিয়ে আফসোস করে বলে…
‘এত সুন্দর চুল কাটতেও মায়া লাগে। তুমি কার চুল পেয়েছ বউ?
নূরজাহান হেসে সালমার থেকে চুল নিয়ে বলে,
‘আমি আলেহা ফুফির মতো চুল পেয়েছি আম্মা। আলেহা ফুফির অনেক চুল।

সালমা বলেছিল নূরজাহানকে পাঠাবে না, কিন্তু মারিদের বারবার ফোন করায় সালমা বাধ্য হয়ে নূরজাহানকে পাঠাতে হয়। তবে এবার নূরজাহানের সঙ্গে সালমা নিজেই সুখ ও রাদকে পাঠায়। দুজন ব্যাগপত্র গুছিয়ে বসে ছিল নূরজাহানের সঙ্গে যাবে বলে। কাল শুক্রবার রাদিলের জন্য পাত্রী দেখায় সুখের যাওয়ার কথা ছিল, অথচ সুখ নূরজাহানের সঙ্গে আজ থানচিতে চলে গেছে—খবর রাদিলের কানে আসে। হীরাই রাদিলকে জানিয়েছে। পুরো সপ্তাহ রাদিলের পাত্রী দেখার গুঞ্জন হয়েছে, রাদিল নিজেও সম্মতি দিয়েছিল, কিন্তু সুখের অনুপস্থিতিতে রাদিল বেঁকে বসে বিয়ে করবে না বলে। হীরা চৌধুরীর মাথায় হাত। পাত্রী পক্ষকে কথা দিয়ে রেখেছেন উনারা কাল যাবেন, অথচ আজ রাদিল বিয়ে করবে না বলেই বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। রাদিল কি চাইছে হীরা বুঝতে পারছে না। সুখকে পছন্দ করে কি না সেটাও বলছে না। সারাদিন জার্নি করে সন্ধ্যায় থানচিতে পৌঁছায় নূরজাহান, সুখ ও রাদ। হৈচৈ করে সুখ, রাদ, আশনূর নূরজাহানের পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছে পুরো সন্ধ্যা, রাত এগারোটার দিকে দুজনই শুয়ে পড়ে। সারাদিন জার্নি করায় ক্লান্ত সবাই। সুখ ও রাদ নূরজাহানের বিছানায় শুয়েছে। রাদ মাঝে শুয়েছে, সুখ ও নূরজাহান দু-পাশে। নূরজাহান এখনো ঘরে আসেনি, বাবা ও দাদীর সঙ্গে বসে গল্প করছে। নূরজাহানের অনুপস্থিতিতে সুখ নিজের হোয়াটসঅ্যাপে রাদিলকে ভিডিও কল করে। দু-বার রিং হওয়ার পরও ওপাশ থেকে রাদিল কল রিসিভ করেনি। সুখ হীরার ফোনে কল দেয়। হীরা কাজের মহিলাকে নিয়ে রান্নাঘরে ছিলেন। উনার ফোনটা ড্রয়িংরুমের সোফায় বাজছিল। আজ বৃহস্পতিবার হওয়ায় রাদিল আজ বাসায় ছিল। বসার ঘর পেরিয়ে ডাইনিংয়ে যাচ্ছিল পানি নিতে। মায়ের ফোনের শব্দে সেদিকে যেতে যেতে হীরাকে ডেকে বলে…

‘আম্মু, তোমার ফোন বাজছে।
‘রিসিভ করে দেখ কে কল করেছে।
রান্নাঘর হতে হীরা রাদিলকে ডেকে কথাটা বলেন। রাদিল ফোন হাতে নিতেই দেখে সুখ ভিডিও কল করেছে। সুখ ঢাকায় নেই এটা সে দুপুরেই শুনেছিল। এই খবরটা তার ভিতরে অদ্ভুত অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। কাজে মন বসছে না বলে অসময়ে কাজ ফেলে আজ বাসায় এসে পড়েছে। সুখের ভিডিও কলটা রাদিল রিসিভ করতেই হলুদ আলোয় আলোকিত সুখের মুখটা ভাসল মানসপটে। সুখ বোধহয় প্রস্তুত ছিল না রাদিলকে দেখবে। তাড়াহুড়োয় পাশ থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়াল। বালিশে কাত হয়ে শুয়ে অধিকার নিয়ে বলে…
‘তোমার ফোন কোথায় রাদিল ভাই? এত কল করলাম রিসিভ করোনি কেন?
নূরজাহানের বাড়িতে ১০০ ওয়ার্ডের হলুদ বাল্বের আলোয় সুখের মুখটাও হলুদ লাগছে। রাদিলের মনে যেন এখন শান্তি লাগছে সুখকে দেখতে পেয়ে। রাদিল বলে…

‘ওয়েট! আমি তোকে আমার ফোনে কল দিচ্ছি।
সুখের কল কেটে হীরার ফোনটা সোফায় রেখে দেয়। খালি পানির বোতলটা রেখে ফ্রিজ থেকে নতুন পানির বোতল নিয়ে ঘরে যায়। ভিতর থেকে দরজা আটকে রাদিল ফোন হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভাসছে সুখের হোয়াটসঅ্যাপ কল দুটো। রাদিল সুখকে ভিডিও কল করে বিছানার পাশের কর্নার টেবিলের উপর ফোনটা রেখে সে বোতলের পানি পান করছে। সুখ কল রিসিভ করে রাদিলকে দেখে দাঁড়িয়ে পানি পান করতে।
‘বসে খাও। দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নেই।
সুখের কথামতো রাদিল বিছানার পাশে বসে পানি পান করে বলে…
‘তুই আমাকে না বলে হঠাৎ থানচিতে চলে গেলি কেন?
‘তুমি আমার খোঁজ নাও না। তাহলে আমি তোমাকে বলে কেন আসব?
রাদিল ফোনটা হাতে নিয়ে সুখের চোখের দিকে তাকিয়ে বেশ অধিকার নিয়ে বলে…
‘যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তোর খোঁজ নেই বা না নেই, তুই সবসময় আমাকে তোর খবর জানিয়ে কাজ করবি, বুঝেছিস?

‘আমার অন্য কারও সাথে বিয়ে হয়ে গেলে, স্বামীর ঘরে গিয়েও তোমাকে জানিয়ে কাজ করতে হবে রাদিল ভাই?
‘হবে না।
‘কি হবে না?
‘তোর বিয়ে অন্য কোথাও বিয়ে হবে না।
‘তাহলে কোথায় বিয়ে হবে রাদিল ভাই?
রাদিল সুখকে ধমকে বলে…
‘ এই তোর বয়স কত? খালি বিয়ে বিয়ে করিস? বিয়ের কি বুঝিস তুই?
‘আমি সব বুঝি।
রাদিল থমথমে খেয়ে যায়। সে সুখকে ধমকে দমাতে চেয়েছিল, কিন্তু সুখ দ্বিগুণ তেজে সম্মতি দিচ্ছে সে বিয়ের সব কিছু জানে ও বোঝে বলে। রাদিল খানিকটা লজ্জায় পড়ে যায়। সে কথা ঘোরাতে চেয়ে বলে…
‘তুই অকালে পেকে গেছিস পাকনি।
‘অকালে পেকেও কি লাভ হলো বলো? মানুষ তো আমার মন বোঝে না।
‘বোঝে।
‘তাহলে বলো আমার মন কি চায়?

রাদিল ভারী শ্বাস ফেলে। উত্তরটা তার জানা, অথচ সে নিরুপায়। রাদিল আজ তালবাহানা করছে না সুখকে নিজের ফিলিংস সম্পর্কে জানাতে। সে নিজেই আজ সুখের চেয়ে দ্বিগুণ উতলা হয়ে আছে সুখকে বিয়ে করে বউ বানাতে চাই বলে। কিন্তু সুখ ছোট। মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মামা-মামি কখনোই সুখকে ছোট বয়সে বিয়ে দেবেন না। রাদিলের অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। রাদিল ভারী গলায় বলে…
‘তোর মন কি চায় সেটা তুই বলতে পারবি। আমি কীভাবে জানব?
সুখ চট করে রেগে যায় রাদিলের উপেক্ষা করাতে। সুখ জেদি কণ্ঠে বলে…
‘রাদিল ভাই, তুমি কি সত্যি এত অবুঝ? নাকি শুধু আমার বেলায় তোমার অবুঝপনা?
রাদিলের দৃষ্টি ঘুরে গেল সুখের রাগান্বিত মুখটার দিকে। সে উদাস গলা বলে…
‘তুই আরেকটু বড় হ।
একই মেজাজে সুখ বলে…

‘বারবার ফিরিয়ে দিও না তো রাদিল ভাই। আমার গায়ে লাগে। একবার চলে গেলে সত্যি সত্যি কিন্তু আর ফিরব না।
‘তোকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই সুখ। তোকে ছাড়া আমি বোধহয় অচল। তাই নিজেকে তোর কাছে আত্মসমর্পণ করছি।
রাদিলের মায়াময় কন্ঠে সুখের মাঝে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। সুখ শোয়া থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে তাড়াহুড়ায় বলে…
‘তাহলে একবার বলো ভালোবাসি?
রাদিল পাল্টা প্রশ্ন করে বলে…
‘ভালোবাসি বললে তুই আমার হবি?
‘হব মানে? ১০০% হব। তোমাকে গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি সব দিচ্ছি আমি তোমার হব। তুমি শুধু আমাকে একটা মিনিট সময় দাও। আমি পাঁচটা মিনিট পরে তোমাকে কল দিচ্ছি।
‘পাঁচ মিনিট কেন?

টুট টুট করে সুখের কল কেটে যায়। রাদিল বোঝে না সুখ হঠাৎ কল কেটে দিল কেন। রাদিল ফোনটা বিছানার পাশে রেখে অপেক্ষা করে। সুখ আবার কল দেবে সে জানে। যেহেতু রাদিল স্বীকারোক্তি দিয়েছে সে সুখকে পছন্দ করে, তার মানে এই মুহূর্তে সুখের মাঝে শান্তি নেই। রাদিলকে আজ সারারাত ফোনে রাখবে নিশ্চিত। রাদিল ল্যাপটপ খুলে ইমেইল চেক করে। দুই-তিন মিনিট পরপরই রাদিলের রুমের দরজায় ধাক্কা দেন হীরা চৌধুরী। তিনি বেশ চিন্তিত স্বরে রাদিলকে ডেকে বলছেন…
‘রাদিল? বাপ আমার, কাঁদিস না? দরজাটা খোল। আম্মুর কাছে বল কি হয়েছে তোর? সুখকে তোর জন্য চাইতে কালই আমি মাহবুব ভাইয়ের কাছে যাব। তারপরও দরজাটা খোল বাপ।
মায়ের কথায় রাদিলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সে সুখের জন্য কান্নাকাটি করছে, এই কথা রাদিলের মাকে কে বলল? রাদিল বিছানা থেকে উঠতে যাবে তক্ষুণি মকবুলের কল আসে রাদিলের ফোনে। ছোট মামার কল দেখে রাদিল দরজা না খুলে মকবুলের কল রিসিভ করে সালাম দেয়…
‘আসসালামু আলাইকুম ছোট মামা।
মকবুল গমগমে আওয়াজে রাদিলের সালামের উত্তর দিয়ে বলে…
‘ওয়ালাইকুম সালাম। রাদিল, তুমি আর সুখ কত বছর ধরে রিলেশনে আছো?
রাদিলের মাথা ঘুরে উঠল মকবুলের কথায়। সে সুখের সাথে রিলেশনে আছে, এটা সে নিজেই মকবুলের কাছে প্রথম শুনেছে। তাছাড়া মকবুলকে কে বলেছে সে সুখের সাথে রিলেশনে আছে? রাদিল অবিশ্বাস্য গলায় বলে…

‘জি মামা?
‘সুখ ফোন করে বলল তোমরা নাকি তিন বছর ধরে রিলেশনে আছো। কাল তোমার জন্য আমরা পাত্রী দেখতে যাব এটা নাকি তুমি মানতে পারছ না বলে সুখকে ফোন করে কান্নাকাটি করছ, আত্মহত্যা করবে বলে নিজেকে রুম বন্দি করে রেখেছ?
রাদিল হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে থমকে জায়গায় বসে রইল। রাদিল সুখের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না করতেই যে সুখ পরিবারকে জানিয়ে দেবে, সেই ধারণা রাদিলের ছিল না। রাদিল লজ্জায় পড়ে যায়। অস্বস্তিতে কথা বলতে পারে না। মকবুল রাদিলের নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে বলে…
‘শোন রাদিল, সুখ ছোট মানুষ, বোঝে কম। তুমি পড়াশোনা জানা শিক্ষিত একটা ছেলে, তোমার কাছে আমরা ছেলেমানুষি আশা করি না। তুমি বাবা পাগলামো করো না। আমরা কাল তোমার মাকে নিয়ে বসব। তোদের পছন্দ আমরা ফেলে দেব না, কিন্তু এখন নিজেকে ঘর বন্দি করে রাখো না। হীরা আপা টেনশন করছে, যাও আপাকে নিয়ে ভাত খাও গিয়ে আগে।

মকবুলের কল কেটে যেতে না যেতেই রিফাতের কল আসে রাদিলের ফোনে। সুখ যে চারপাশে আগুন লাগিয়েছে, সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছে রাদিল। রাদিল ঠোঁট কামড়ে কপালের একপাশ চুলকায়। যে কাজটা করতে রাদিলের বছর লাগতো, সেই কাজটা সুখ দুই মিনিটে পরিবারকে জানিয়ে করে ফেলেছে। রিফাত ঠিকই বলে, সুখ আসলেই ভন্ড। রাদিল রিফাতের কল রিসিভ করে উদাস গলায় ‘হ্যালো!’ বলতেই রিফাত হৈ হৈ করে ওঠে ফোনের ওপাশ থেকে গালি দিয়ে বলে…
‘শালা হারামি! ভদ্রলোক সেজেছিস? তুই বলে সুখের সঙ্গে তিন বছর ধরে রিলেশনে আছিস?
‘তোকে কে বলেছে এটা?
‘সুখ বলেছে।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪২

‘তোর বোন যখন বলেছে, তখন সত্যিই বলেছে। আছি আমরা তিন বছর ধরে রিলেশনে।
‘শালা হারামি মাদারবোর্ড, তোর এত অধঃপতন হয়েছে? সুখকে না পেলে বলে মরে যাবি তুই হ্যাঁ?
রাদিল দারুণ হাসে। সে হাসলে বাম গালে সুন্দর একটা টোল পড়ে। সুখ এতো মিথ্যা বলতে পারে ধারণা ছিল না। রাদিল এক হাতে কপালের চুলগুলো ঠেলে পিছনে দিতে দিতে বলে…
‘তোর বোনকে বেশি ভালোবাসি তো, তাই কলিজা নড়ে।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here