ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৫
অনামিকা আহমেদ
রূপের হৃদস্পন্দন বোধয় এখন বুলেট ট্রেনের চেয়েও দ্রুতবেগে ছুটছে, যেকোনো সময় বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়তে পারে। রূপ শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে তড়িঘড়ি করে জানালার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নেয়, যেনো কোনো মতেই ইশতিহার তাকে দেখতে না পায়। ঘরে তখন লণ্ঠনের মৃদু আলো দপদপ করে জ্বলছে, পুরো ঘরটা একপ্রকার সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে। তাই খানিক দুর হলেও যে সে ইশতিহার এর নজর এড়াবে সেটা নিয়ে রূপের মনে খানিক সন্দেহ ছিল। তাই গা ঢাকা দেওয়ার চেয়ে উত্তম উপায় তার মগজে খেললো না। শুকনো গলায় একটু ঢোক গিলে তাড়াহুড়া করে লণ্ঠন টা নিভিয়ে রূপ দাদির পাশে শুয়ে পড়ে।
বুকটা তখনও ধরাশ ধরাশ করছে, ইশতিহার এর উপস্থিতি এর আগে কখনো তাকে এতটা ভীত করে তোলেনি। ঠিক সেই সময়ে নিজের তলপেটে কিছু একটা অনুভব করে রূপ। শীর্ণ শরীরে বড় পেটটা নিয়ে তাকে দুর্ভোগ পোহাতে হলেও মাতৃত্বের স্বাদ যেনো সব কিছুকে ভুলিয়ে দেয়। আলতো করে পেটের ওপর হাত রাখতেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। মায়ের দুশ্চিন্তা যেনো বাচ্চাটার ও ঘুম হারা*ম করে দিয়েছে। বুঝতে পারছে রূপ, তাই তো আর কিচ্ছু না ভেবে পাশ ফিরে চোখ বুজে শুয়ে পড়ে সে।
রূপ কে দেখতে না পেলেও হঠাৎ আলো নিভে যাওয়াটা ইশতিহার এর চোখ এড়ায় নি,যা তার মনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করে। শরীরের রাগ তার এখনও কমেনি বিন্দুমাত্র, শুধু সময়ের অপেক্ষা। তার পর সম্পূর্ণ রাগ রূপের ওপর ঢেলে দিতে সে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করবে না। বাকা হাসি হেসে আঙুলে চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে ইশতিহার বাড়িতে প্রবেশ করে।
গ্রামে মধ্যরাতে শেয়াল আর পেঁচার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দই যেনো আসে না। মাঝে মাঝে বাতাসে গাছের পাতার মর্মর শব্দ ভেসে এসে তৈরি করে এক ভুতুড়ে পরিবেশ, তবে আজ বাতাসের কোনো বালাই নেই। পরিবেশ টা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ, পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার নিশ্বাসের শব্দ ও কানে ভীষণ রকমে লাগছে। রূপের চোখে ঘুম নেই, জোর করে চোখ বুজে থাকলেও ঘুমের দেখা নেই। হঠাৎ আবছা শব্দগুলোর জাল ছিন্ন করে তার কানে আসতে থাকে কারো পায়ের আওয়াজ।
বাড়িটা বেশ পুরোনো হওয়ায় বসার ঘরে কাঠের পাটাতন দেওয়া। তাই সেখানে হাটা চলা করলে প্রায়ই শব্দ পাওয়া যায়, তার ওপর দাদির ঘরটা নিচ তলায়। রূপ ভালই বুঝতে থাকে এটা ইশতিহার ছাড়া আর কেও নয়। ক্রমশ শব্দটা বিকট আকার ধারণ করে তার কাছে আসতে থাকে। রূপ ভয়ে কাথায় মুখ গুঁজে দেয়। শীতল পরিবেশেও সে তর তর করে ঘামছে। পাশে শুয়ে থাকা দাদীকে ডাক দিয়ে জাগানোর মত শক্তিও যেনো তার শরীরে হইলো না।
হঠাৎ এক মুহূর্তের হেরফেরে শব্দটা থেমে যায়। অনেকক্ষণ কান পেতে থাকলেও রূপ আর কিছু শুনতে পায় না। রূপ বুঝতে পারে না কি করবে। ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে কাউকে না দেখে একটু শান্তি পেলেও পরক্ষণে সোজা হয়ে তাকালে নিজের ঠিক ওপর ইশতিহার কে দেখে রূপ ভয়ে বিছানার সাথে লেপ্টে যায়। তার ঠোঁট গলে বের হয় অস্ফুট আর্তনাদ। ইশতিহার রূপের ঠিক উপরে উঠে চার হাত পায়ের ওপর ভর দিয়ে আছে, যেনো রূপের শরীরের সাথে তার শরীরের স্পর্শ না হয়।
ইশতিহার শক্ত করে রূপের মুখ চেপে ধরে ধীরে ধরে শরীরের পুরো ভার টা তার ওপর ছেড়ে দিতে থাকে। রূপের ভয়ার্ত দৃষ্টি তখন ইশতিহার এর রক্তিম চোখের দিকে নিবদ্ধ। ইশতিহার নিজের মুখটা আরও নিচে নামিয়ে রূপের ঘাড়ের কাছে নিয়ে যায়। তার সংবেদনশীল অংশে শিহরন জাগিয়ে হিসহিসিয়ে রূপের কানে কানে বলে,
” তোকে মানা করেছিলাম আমি, কিন্তু তুই কথা শুনলি না। তাই এখন যেটা হবে সেটার জন্য নিজেকে দায়ী করার জন্য প্রস্তুত হ।”
এই বলে ইশতিহার রূপের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে রূপের কোমর জড়িয়ে তাকেও নিজের কাছে টেনে নেয়। ইশতিহার এর স্পর্শ আর মাদকতা ভরা কন্ঠ শুনে রূপের বুঝতে বাকি নেই ইশতিহার এখন ঠিক কী চাইছে। রূপ ভাঙ্গা গলায় বলে উঠে,
” কিন্তু দাদি যে উঠে পড়বে।”
” দাদির সামনে স্বামীর সাথে রঙ্গলীলা করলে বুঝি অনেক পাপ হবে? আর স্বামীর অবাধ্য হওয়া বুঝি পাপের কিছু না তাই না?”
রূপ আর কিছু বলে না। ইশতিহার তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেয়। কারণ এখন ইশতিহার কে থামানো মানে আগ্নেয়গিরি কে জাগিয়ে তোলা। ইশতিহার রূপের ঘাড় থেকে চুল গুলো সরিয়ে সেখানে চুমু খেতে খেতে কামড় বসায়। রূপের সারা শরীর নড়ে উঠে, কিন্তু সে প্রতিবাদ করে না। বরং ইশতিহার এর চুলগুলো কে শক্ত করে ধরে তার কাছে নিজেকে পরাস্ত করে।
ইশতিহার রূপ তে বিছানা থেকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এই অপ্রত্যাশিত বিরতির কারণ বুঝতে না পেরে রূপ জিজ্ঞাসু চোখে ইশতিহার এর দিকে তাকালে প্রতিউত্তরে জোটে শুধু ইশতিহার এর বাকা হাসি।
ইশতিহার দক্ষ হাতে রূপ তে মেঝের ওপর রেখে তার গাল স্লাইড করতে করতে বলে,
” আজকে না হয় বিছানার নিচেই কাজটা সেরে নেই। তোর মধ্য অস্বস্তি কাজ করলে আমি আবার মজা পাই না। এখন আর দাদিও উঠবে না আর তুই মন মতো চিৎকার করতে পারবি। আজ আমাকে থামাতে আসবি না রূপ, শাস্তির বাকি অংশ কালকের জন্য তোলা রইলো। ”
এই বলে ইশতিহার এর দাঁড়ায় না। শার্টের বোতাম গুলো খুলতে খুলতে রূপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ইশতিহার এর এমন অপ্রত্যাশিত আগমন সবাইকে অবাক করলেও সুলেখা যেনো স্তম্ভিত হয়ে যায়। আজ ভোর ভোর উঠে রান্নাঘরে সকলের জন্য নাস্তা বানানোর জন্য ঢুকেছিল সে, ঠিক সেই মুহূর্তে ইশতিহার কে টাওয়াল দিয়ে নিজের ভেজা চুল মুছতে মুছতে তার শাশুড়ির ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে তিনি ভূত দেখার মতো ভয় পেয়েছিলেন। আর একটু হলেই হয়তো হার্ট অ্যাটাক তিনি করেই ফেলতেন। তবে ইশতিহার এসবে এতটা পাত্তা না দিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে সুলেখা গলা খাঁকারি দিয়ে উঠে বলে,
” কি রে তুই কখন এলি?”
” রাতে।”
” রাতে কেনো? কোনোদিন তো এমুখো হোস না, তাহলে আজ হঠাৎ?”
” সে আপনি বুঝবেন না, তার জন্য বিবাহিত হলেই হয় না, মেচুরিটিও লাগে। আপনার সেটা বোধয় এখনও হয়ে উঠেনি।”
এই বলে ইশতিহার শীষ বাজাতে বাজাতে বাড়ি থেকে বের হয় যায়। সুলেখার মুখটা লজ্জা আর রাগে লাল হয়ে উঠে। তিনি ঠোঁটে বিড়বিড় করতে থাকে,
” কি অসভ্য ছেলে হয়েছে? বিয়ের পর মানুষ শুধরে যায়, আর এ তো দিনদিন বিগড়ে যাচ্ছে। রূপ কি করে একে সহ্য করে সেটা সেই জানে।”
বাড়ির সকলে খাওয়ার টেবিলে এক সাথে বসে খাবার খাচ্ছে। সুলেখা আর আমরিন এর সাথে রূপ ও কাজে হাত লাগাচ্ছে, যদিও সবাই আপত্তি করেছিল সে যেনো কাজ না করে। কিন্তু দাদি পুরানো যুগের মানুষ, তার মতে বাড়ির কাজ কর্ম তো বাড়ির বউ রাই সামলাবে, আর রূপ এখন বাড়ির বড় ছেলের বউ। তার দায়িত্ব এখন কোন নয়। তবে সব কিছু ছড়িয়ে আমরিন এর দৃষ্টি যেনো রূপ কে ছাড়তে চাইছিলই না। রূপের ভেজা চুল আর ইশতিহার এর আকস্মিক আগমন তার কাছে সবটাই পরিষ্কার করে তোলে।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৪
আমরিন এর এমন বাজ পাখির দৃষ্টি রূপ কেও ভীষণ অপ্রস্তুত করে তোলে। কিন্তু তবুও সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সকলের পাতে খাবার দিতে ব্যস্ত। হঠাৎ সদর দরজায় আরও আগমন ঘটলে সকলের মনোযোগ সেদিকে যায়। ফিনফিনে শুভ্র রঙ্গা এক মেয়ে এসে হাজির হয়েছে, বয়স আঠারোর কাছাকাছি, চোখদুটো বেশ জ্বলজ্বল করছে। মুখে হাসির অন্ত নেই যেনো সে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার জিনিসটা হাতের কাছে পেয়েছে।
” ইশতিহার ভাই, তুমি এসেছো। জানো আমি তোমার জন্য কতদিন পথ চেয়েছিলাম। তুমি একটা বারের জন্য ও আমার সাথে দেখা করতে এলে না এই কয়টা বছর।”
