মেজর কারদার পর্ব ১৫
ফিনারা ঝুমুর
আকাশ ফুটো করে সেই যে বৃষ্টিকন্যারা অবাধ্য আহ্লাদে ধরিত্রীতে নেমে এসেছে, তারা আর বিদায় নেওয়ার নামই নিচ্ছে না। গতকাল দুপুরে শুরু হওয়া সেই অবিরাম ধারাবর্ষণ রাত কেটে এখন দিনের মধ্যভাগ হতে চলল, অথচ মেঘেদের বুক চিরে নামা সেই কান্নায় বিন্দুমাত্র বিরাম নেই। প্রকৃতির কী এমন গভীর বেদনা, কে জানে! সেই বেদনার আগুনে যেন ঘৃতাহুতি দিতেই সন্ধি করেছে বেতাল হাওয়া আর রুদ্র বজ্রেরা। খানিক পরপর চাবুকের মতো এমনভাবে তীব্র হাওয়া দুলে উঠছে, যেন এই ফতেখাঁরকূলের পুরো জাত-কূল এক নিমেষে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আর থেকে থেকেই আকাশ কাঁপিয়ে কাছে-দূরে সবখানে বিকট শব্দে আছড়ে পড়ছে এক একটা বজ্রপাত।
প্রকৃতির এ যেন এক নিজস্ব প্রতিযোগিতা—কে হারবে আর কে জিতবে! কিন্তু তাদের এই প্রলয়ংকারী লড়াইয়ের মধ্যিভাগে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি তরুণীদের ঘোরার আনন্দটুকু এক্কেবারে মিত্তিকায় পরিণত হয়ে গেছে।
“এই তানি! চল না রে, উঠোনে গিয়ে একটু মন ভরে বৃষ্টিবিলাস করি!”
ডাক্তার বাড়ির সেই বিশাল কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘের গদগদ গলায় ভেসে আসা এমন রোমাঞ্চকর আবদারটুকু এক বাক্যে, বিনা দ্বিধায় নাকচ করে দিল বাকি তিন বান্ধবী। ওদের সাফ কথা—বাইরে এখন যে বজ্রপাত আর ঝড় হচ্ছে, এই মরণ-যাঁতাকলের মাঝে কোনোভাবেই বৃষ্টিতে ভিজতে যাওয়া যাবে না। কিন্তু অবাধ্য মেঘালয়া কি আর কারোর বারণ শোনার পাত্রী?
বন্ধুদের সেই আকুল বারণ আর চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ও একাই অন্দরমহল ছেড়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল উন্মুক্ত উঠোনে।আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ধেয়ে আসা তীব্র বৃষ্টির কণাগুলো পরম তৃপ্তিতে নিজেদের বিলিয়ে দিতে লাগল মেঘের কোমল কায়ায়। ধীরে ধীরে তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে গেল এই চঞ্চল শ্যামাঙ্গিনীকে। ফিরোজা রঙের সিল্কের পোশাকটি ভিজে এখন মেঘের শরীরের সাথে লেপ্টে যেতে শুরু করেছে। ওর পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা সেই দীঘল কালো রেশমের ন্যায় কুন্তলরাশি সম্পূর্ণ ভিজে টুপটুপ করে শ্বেত স্বচ্ছ জল নিগড়াচ্ছে মাটির বুকে।
মেঘ দুই হাত দুই পাশে প্রসারিত করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে চোখ বুঁজল। বৃষ্টির প্রতিটি শীতল ছোঁয়া যেন ওর ভেতরের সমস্ত অস্থিরতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিচ্ছে।
“মেঘু, বেশি ভিজিছ না রে! এমনিতেই ঠান্ডা বাতাস, জোর জ্বর আসবে কিন্তু!”
বাইরে বৃষ্টির এই উন্মাতাল মাতমের মাঝে বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে বলা রাইসার গলাটা খুব একটা জোরে শোনা গেল না। মেঘ যেন এক অন্য ভুবনের বাসিন্দা, সে নিজের খেয়ালেই নাচছে, ভিজছে আর আপনমনে গুনগুন করে গাইছে,
~মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ~
সে নিজের অঞ্জলি ভরে বৃষ্টির শীতল পানি তুলে নিয়ে তা ছুড়ে মারছে গগনপানে। সেই অবাধ্য পানি আবার মহাসগৌরবে ধরিত্রীতে ফিরে এসে মৃত্তিকায় জমে থাকা জলের সাথে মিতালী গড়ছে, পরম মমতায় ভিজিয়ে দিচ্ছে উঠোনের কচি ঘাস আর মেঘের আলতা রাঙা পায়ের পাতা।
~তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ~
ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। হুট করে খুব কাছে-পিঠে কোথাও এক বিকট শব্দে তীব্র বজ্রপাত আছড়ে পড়ল! সেই কানফাটানো তীক্ষ্ণ আওয়াজ কানে যেতেই এক লহমায় থমকে গেল মেঘের চঞ্চল পদযুগল। ভয়ের এক অতর্কিত হিমশীতল স্রোত যেন ওর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। আর এক মুহূর্তও বাইরে থাকার সাহস হলো না; যত্রতত্র নিজের সেই ভেজা কায়া কোনোমতে টেনেহিঁচড়ে এক প্রকার দৌড়েই সে অন্দরের বারান্দার দিকে নিয়ে গেল।
বান্ধবীরা ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তোয়ালে এগিয়ে দিল। কিন্তু এই হুলস্থুল আর ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যে চার বান্ধবীর কেউই একটা মস্ত বড় ব্যাপার খেয়ালই করতে পারল না। দ্বি-তল বাড়ির উত্তরের গরাদ থেকে একজোড়া মুগ্ধ লেচন চেয়ে আছে মেঘের পানে। সে চোখ ক্ষীণ কামনা, আর বাকি সব বাসনা।
আকাশের সেই অবিরাম কান্না অবশেষে থমকেছে। আকাশ ফুটো করে নামা বৃষ্টি থামতেই ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকা চঞ্চল প্রাণগুলো খাঁচাছাড়া মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ছটফট করে বেরিয়ে পড়ল বাইরের পানে। এতক্ষণ যেন এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দিনী হয়েছিল ওরা সকলে। বিহঙ্গদের বর্তমান ঘোরার গন্তব্য স্থান হলো রামুর বিখ্যাত রাবার বাগান। ফতেখাঁরকূল হতে এই রাবার বাগান বেশ নিকটে অবস্থিত হওয়ায়, এখান থেকেই শুরু হলো ওদের এবারের ট্যুরের ঘোরার পূর্ণ শান্তি ও আনন্দের যাত্রা।
আজকে চার বান্ধবীর পরনেই রয়েছে আরামদায়ক কুর্তি ও পায়জামা স্যুট। সাজ-রবের ধরন সবারই প্রায় এক—হালকা কাজল আর খোলা চুল। ভিন্নতা শুধু পোশাকের রঙে, উচ্চতায় আর শরীরের কায়া বর্ণে । গল্প করতে করতে ধীরপায়ে ওরা রাবার বাগানের একদম মাঝ বরাবর এসে থামল। মেঘ এখানে আগে এলেও বাকি তিনজনের চোখে এখন অপার মুগ্ধতা! প্রকৃতির এই শান্ত ও স্নিগ্ধ শোভাঘমে এসে নিজেদের এক্কেবারে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে ওদের।
ওরা দেখল, চারদিকে উথাল-পাথাল করা সারি সারি রাবার গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি গাছের কাণ্ড চমৎকার করে কেটে সেখানে সুন্দর করে আঁটানো রয়েছে মাটির অর্ধ-গোলাকৃতির ছোট ছোট পাত্র। গাছের বুক চিরে ফোঁটায় ফোঁটায় নিঃসৃত হওয়া রাবারের শ্বেত রস তাতে টুপটুপ করে পড়ে জমা হচ্ছে। এই কক্সবাজার জেলায় কোনো চা বাগান নেই, তা মূলত রয়েছে দেশের পার্বত্য অঞ্চল ও সিলেট বিভাগে (যেমন—খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার)। তাই এই রাবার বাগানের মায়াবী পরিবেশটাই ওদের কাছে এক নতুন বিস্ময় হয়ে ধরা দিল।
“ইশ! রামুর এই রাবার বাগানটা যে এতটা অপরূপ হতে পারে, তা সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাসই হতো না!”
তানিয়ার এমন মুগ্ধকর চরণের সাথে সাথে রাইসা আর ফাতিমাও একীভূত হলো। দুজনেই একই সুর ধরে নিজের মনের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলল,
“সবুজে ঘেরা এই শান্ত প্রকৃতি এত অপার সৌন্দর্যের অধিকারিণী হতে পারে, তা তো আমরা আগে কখনো বুঝিনি রে ভাই! বুঝলে হয়তো অনেক আগেই ঘর পালাতাম। এক্কেবারে চিরতরে মিশে যেতাম এই প্রকৃতি মায়ের শীতল কোলে!”
ওদের দু-চোখে যেন এক মায়াবী মরীচিকা বাসা বেঁধেছে। সবুজের এই চিরন্তন অভয়ারণ্যে নিজেদের বিলিয়ে দিতে চাইছে ওরা। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রকৃতি বুঝি আসলেই এমনই জাদুকরী! উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার ওপর সুবিন্যস্তভাবে তৈরি হওয়া এই রাবার বাগান আসলেই যেকোনো মানুষের মনমুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। পৃথিবীর সব মানুষ তো আর প্রকৃতির এই আদিম ও শান্ত রূপের স্বাদ পায় না; আর যারা পায়, তারা সহজে এই মায়াবী স্থল ত্যাগ করে চেনা কোলাহলে ফিরে যেতে চায় না।মেঘ ওদের এই মুগ্ধতা দেখে একটা গাছের গায়ে হাত দিয়ে মৃদু হাসল।
নিজেদের মধ্যে সোনালী সময় কাটিয়ে সন্ধ্যার ঠিক আগ-মুহূর্তে বাড়ি ফেরার জন্য রাবার বাগান থেকে বেরিয়ে পড়ে চার বান্ধবী। কিন্তু ফাতিমা, রাইসা আর তানিয়া নিজেদের গল্প আর সেলফি তোলার নেশায় এতটাই মশগুল ছিল যে, মেঘ যে অলরেডি ওদের পেছন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তা ওরা খেয়ালই করেনি।
ওরা সকলে যখন রাবার বাগানের মূল ফটক দিয়ে বাইরে চলে যায়, মেঘ তখন একা দাঁড়িয়ে ছিল বাগানের ঠিক মাঝখানে। একটু আগে একটা রাবার গাছের ডালের সাথে লেগে ওর গলার সাধের পার্লের মালাটা ছিঁড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল মাটির বুকে। সেই মুক্তোগুলো কুড়াতে গিয়েই ওর এতখানি দেরি হয়ে যায়। কিন্তু কাজ শেষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাতেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল ওর। পুরো নির্জন স্থানে বন্ধুদের কাউকে না দেখে এক মুহূর্তের জন্য ও ভীষণ ঘাবড়ে গেল।
“ওরা কি আমায় ফেলে আসলেই চলে গেল?”
মেঘ ত্রস্ত পায়ে ব্যাগটা চেপে ধরে বাগান ত্যাগ করার জন্য যেই না দু-পা বাড়াল, অমনি ঝোপের আড়াল থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে ওর সামনে পথ আগলে দাঁড়াল একদল বখাটে ছেলেপুলে। সন্ধ্যার আবছা আলোয় ওদের প্রত্যেকের চোখে হিংস্র লালসা আর আদিম দেহের ক্ষুধা স্পষ্ট। দেহের শিরায় শিরায় প্রবাহমান সেই নোংরা ক্ষুধা নিয়ে ওরা মেঘকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। এই মুহূর্তে মেঘ যেন এক অসহায় শিকার, আর ওরা ক্ষুধার্ত ভক্ষক!
“কী সুন্দরী! ভর সন্ধ্যায় এই নির্জন বাগানে একা একা কই যাও?”
দলের এক ছেলে কপাট হেসে মেঘের দিকে তাকিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ও উপহাসের সুরে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। মেঘের শান্ত চোখে এক লহমায় ভয়ের শীতল স্রোত খেলা করে গেল। আর শিকারের চোখে সেই ভয় দেখামাত্রই বখাটেরা একযোগে পৈশাচিক উল্লাসে হেসে উঠল নিজেদের মাঝে। শিকারের চোখে ভয় দেখার মজা যে আলাদা, বড্ড ভিন্ন স্বাদের! যা ওরা প্রতিনিয়ত উপভোগ করে অভ্যস্ত।মেঘ নিজের ভেতরের ভয়টা কোনোমতে চেপে গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব শক্ত করে বলল,
“পথ ছাড়ুন! ভদ্রলোকের মতো বলছি সামনে থেকে সরুন। এভাবে একটা মেয়ের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
দলের যে মেইন পান্ডা, সে মেঘের দিকে ধীর পায়ে সামান্য এগিয়ে এসে চিবুক নেড়ে বলল,
“আরেহ! ভদ্রলোক তো শহরে থাকে রে সোনা। এই নির্জন বাগানে এখন তুমি একা, আর আমরা। পুরো এলাকা ফাঁকা! চল না, সবাই মিলে একটু লীলাখেলা খেলি। মজা দিবা, মজা নিবা— বোঝো না কিছু সোনা-মনা?”
ছেলেটার এমন চূড়ান্ত নোংরা আর কুৎসিত ইঙ্গিত বুঝতে পেরে মেঘের পুরো গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইল। তীব্র ঘৃণায় ও রাগে ওর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। কিন্তু মেঘ আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো ভয়ে কেঁদে কেটে ওদের পায়ে পড়ল না। সে বমি করার ভান করে খানিকটা নিচু হয়েই চোখের পলকে নিজের পায়ের এক পাটি শক্ত হিল চটি জুতো খুলে হাতে তুলে নিল।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক চরম ক্ষিপ্রতায় ও হিংস্র আক্রোশে সেই চটি জুতো দিয়ে ‘ধাম ধাম’ করে পর পর কয়েকটা কড়া বাড়ি বসিয়ে দিল সেই বখাটে পান্ডার দুই কপোলে।আচমকা এমন চটির মার খেয়ে পান্ডা ছেলেটা নিজের গালে হাত দিয়ে ছিটকে দু-পা পিছিয়ে গেল। তার সাঙ্গপাঙ্গরা তো থ বনে গেল এক সেকেন্ডের জন্য!
“আমায় ছুঁয়েই দেখ, জ্বলে পুড়ে এক্কেবারে অঙ্গার হয়ে যাবি!”
শিকারের এই অকল্পনীয় তেজ আর চটির আঘাত দেখে দলের পান্ডা ছেলেটার মাথা এক লহমায় গরম হয়ে যায়। নিজের সাঙ্গপাঙ্গদের সামনে এমন চরম অপমান সে মেনে নিতে পারল না। সে আগে-পিছে কিচ্ছু না ভেবে এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে শক্ত মুষ্টিতে চেপে ধরল মেঘের দীঘল কুন্তল । মাথার চামড়া ছিঁড়ে আসার মতো তীব্র যন্ত্রণায় মেঘ ককিয়ে উঠতেই ছেলেটা চুলগুলো আরও শক্ত করে নিজের মুঠোয় টেনে ধরে এক খ্যাঁপাটে বাঘের ন্যায় গর্জে উঠল,
“শা\লী! খুব তেজ না তোর? আজ তোর এই শরীর থেকে সব তেজ টেনে বের করব। মা\গী, চাইছিলাম ভালোয় ভালোয় আপস করতে। তুই তা হতে দিলি না! আজ তোরে এই নির্জন বাগানে বোঝামু গণধর্ষ\ণ কারে কয়, কত প্রকার ও কী কী!”
কথাটা বলেই সে মেঘের চুল ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে বন্য পশুর মতো টেনেহিঁচড়ে বাগানের আরও ভেতরের গভীর অন্ধকারের অভিমুখে নিয়ে যেতে শুরু করল। বাকি ছেলেগুলো একযোগে পৈশাচিক উল্লাসে হাসতে লাগল মেঘের এই চরম দুর্দশা দেখে। এতক্ষণের সাহসী মেঘের চোখের বাঁধ এবার ভেঙে গেল, দু-চোখ ফেটে নোনা জল বেরিয়ে এল। কপোল চুঁয়ে চুঁয়ে সেই নোনা জল টুপটুপ করে ঝরে পড়তে লাগল নিস্তব্ধ বাগানের ঘাসের ওপর। ওর অবচেতন মনে তখন গত রাতে ফোনের ওপারে অচেনা পুরুষকে বলা নিজের কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—ঝিলি আপুর মতো তবে ওকেও কি আজ হায়েনাদের শিকার হতে হবে?
কিন্তু মেঘ দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। বখাটে পান্ডাটা ওকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় ভারসাম্য হারাতেই ওর হাতের মুঠোটা চুলের ওপর থেকে সামান্য আলগা হলো। আর ঠিক সেই সুযোগেই মেঘ নিজের দেহের সর্বশক্তি এক সুতোয় এনে এক মরণকামড় বসিয়ে দিল ছেলেটার হাতে, একই সাথে কনুই দিয়ে তার পেটে তীব্র আঘাত হানল।
আচমকা এই প্রাণপণ প্রত্যাঘাতে ছেলেটা ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে এক ধাক্কায় নিজের থেকে কিছুটা দূরে সরে যেতেই, মেঘ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে উল্টো পথান্তরে সোজা দৌড় দিল!চারপাশে ঝোপঝাড়, কাঁটাগাছ আর পাহাড়ি উঁচু-নিচু মাটির সব বাঁধা সে উপেক্ষা করতে থাকল কেবল নিজের সম্ভ্রম বাঁচানোর তাগিদে। গাছের ডাল আর কাঁটার আঘাতে হাত-পা ছড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করেছে, ক্ষতস্থানগুলো তীব্র যন্ত্রণায় জ্বলছে, জুতো ছাড়া খালি পায়ে পাথরকুচি বিধে যাচ্ছে, তবুও সে থামল না। দম ফুরিয়ে আসছে, ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে আছাড় খেয়েও সে আবার উঠে দৌড়াচ্ছে। চোখের জলের কারণে সামনের পথ ঝাপসা, শরীরের সমস্ত তেজ তখন ক্লান্তিতে সামান্য নিশ্চল হয়ে আসছে, কিন্তু ভেতরের বাঁচার তাগিদটুকু তাকে অবিরত ছুটিয়ে নিয়ে চলল বনের বাইরের দিকে।
মেঘকে হঠাৎ করে আর দেখতে না পেয়ে কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ পড়ল মুসার। অস্থির হাতে চোখের সামনে দূরবীনটা অ্যাডজাস্ট করে চারিদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজল সে, কিন্তু রাবার গাছের ঘন সারির মাঝে মেঘের কোনো চিহ্ন না পেয়ে মুসার হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল! শরীর বেয়ে এক হিমশীতল ভয়ের স্রোত নেমে গেল তার। ম্যামের প্রতি মুহূর্তের আপডেট যদি সে দিতে না পারে, তবে শীর্ষ স্যার তাকে আস্ত মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে!দ্রুত পকেট থেকে থরথর করে কাঁপানো হাতে ফোনটা বের করে সে ডায়াল করল শীর্ষর পার্সোনাল নাম্বারে। পুরো রিং হয়ে একবার কলটা কেটে গেল।
“স্যার ফোন কেন ধরছে না! উফ, খোদা!”
মুসা কপালে জমা ঠান্ডা ঘাম মুছে মরিয়া হয়ে আবারও কল দিল।এবার ওপাশ থেকে কল রিসিভ হওয়ার যান্ত্রিক শব্দ শুনতেই মুসা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে হরহরিয়ে বলে উঠল,
“স্যার! স্যার! সর্বনাশ হয়েছে, ম্যামকে হঠাৎ করে আর খুঁজে পাচ্ছি না!”
মুসার মুখের এই অশুভ কথা শোনামাত্রই ওপাশে জিপের স্টিয়ারিং ধরে থাকা শীর্ষের ফর্সা কপালের নীল রগগুলো রাগে ও উত্তেজনায় ফুলতে শুরু করল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তেই রক্তবর্ণ ধারণ করল। ফোনের স্পিকারে এক ভয়ঙ্কর ঝাঁঝালো গলায় চ্যাঁত করে গর্জে উঠল সে,
“শাট আপ, ইউ ইডিয়ট! তোমার মতো অপদার্থের কাছে আর কী আশা করা যায়! এক ফোঁটা সিকিউরিটি মেইনটেইন করতে পারো না! আই নিড হার আপডেট রাইট নাও! মেঘের কী হয়েছে জলদি বলো!”
শীর্ষর সেই বাঘের মতো রাগান্বিত ও কর্কশ গলা শুনে ভয়ে কলিজা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল মুসার। মৃত্যুর তীব্র ভীতি জেগে উঠল ওর মনে। সে হতাশা আর আতঙ্কে দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে চারপাশের উঁচু-নিচু টিলার দিকে এদিক-ওদিক তাকাতেই হঠাৎ তার নজরে এল সেই ভয়ঙ্কর ও বীভৎস দৃশ্য! দৃশ্যটা দেখামাত্রই পায়ের নিচের মাটি যেন এক ঝটকায় আলগা হয়ে গেল মুসার। সে আতঙ্কে ও উন্মাদনায় ফোনে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“স্যার! স্যার! ম্যামকে কতগুলো স্থানীয় বখাটে ছেলে হন্যে হয়ে তাড়া করছে! ম্যাম রক্তাক্ত অবস্থায় খালি পায়ে পালাচ্ছেন, ওনার খুব বিপদ স্যার! স্যা–”
কিন্তু মুসার কথা পুরো শেষ হওয়ার পূর্বেই ওপাশ থেকে কলের লাইন চ্যুত হওয়ার খটখটে কর্কশ শব্দ ভেসে এল। শীর্ষ কল কেটে দিয়েছে। মুসা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে হাতের ফোনটা পকেটে গুঁজে কোমর থেকে নিজের সরকারি রিভলভারটা বের করল। তারপর সেই অন্ধকারের ঝোপঝাড় আর কাঁটাগাছ মাড়িয়ে বখাটেদের অভিমুখে নিঃশব্দে ও ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়াতে শুরু করল। মেজরের রূপ নেওয়ার আগেই মেঘকে নিজের প্রাণ বাজি রেখে হলেও বাঁচাতে হবে তাকে!
কাঁটাবন আর ঝোপঝাড়ের হিংস্র বাধা পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই মেঘ আর এক কদমও দৌড়াতে পারল না। ফুসফুস ফেটে বাতাস বেরিয়ে আসছে, লিভারের নিচে তীব্র যন্ত্রণা। সে কোনোমতে পেছনে চেয়ে দেখল অন্ধকারের মাঝে সেই হায়েনাদের আর দেখা যাচ্ছে না। মেঘ ভাবল, হয়তো সে ওদের ফাঁকি দিতে পেরেছে। এক বুক স্বস্তি আর ক্লান্তিতে ও একটা মোটা রাবার গাছের গুঁড়ির সাথে হেলান দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। অবসাদে চোখ দুটো বুজতেই হঠাৎ করে অন্ধকারের আড়াল থেকে ওর ওপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই নরপশুরা! ওরা পালায়নি, বরং বাঘের মতো ওৎ পেতে শিকারকে ক্লান্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।
“আর কই যাইবা, সোনামণি? অনেক তো দৌড়াদৌড়ি করাইলা! এবার আমাদের সাথে একটু রঙ্গ করতে শুরু করো।”
দলের পান্ডাটা মেঘের ভেজা বুকের ওপর চেপে বসে নোংরা দাত বের করে হাসল।
“আহ! কী টসটসা মা\ল রে ভাই! পুরাই মাখন। খাইয়া আজ চরম মজা পাওন যাইবো।”
অন্য একটা বখাটে মেঘের ছড়ে যাওয়া পায়ের ওপর হাত বুলিয়ে কদর্য মন্তব্য ছুড়ে দিল।
“ঢাকাইয়া মা\ল বইলা কতা! শরীর দেখছস? হ্যাঁ! হেহে!”
সকলের এই বীভৎস ও কদার্য মন্তব্য শুনে মেঘের ভেতরের পাকস্থলী ওলটপালট করে উঠল। তীব্র ঘৃণায় আর আতঙ্কে ও নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হরহর করে সেই পান্ডা ছেলেটার মুখের ওপরই বমি করে দিল।আচমকা এই কাণ্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে পান্ডাটা এক হিংস্র আক্রোশে ‘ঠাস’ করে মেঘের নরম কোমল গালে এক মস্ত বড় চড় কষিয়ে দিল! চড়ের চোটে মেঘের ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল।
“শা\লী খা\ন\কী! বমি করনের আর জায়গা পাও না? এই বমি আজ তোরে ধইরা তোরেই খাওয়ামু!”
ছেলেটা খ্যাঁপা কুত্তার মতো চেঁচিয়ে উঠল।ওরা মেঘের দু-হাত শক্ত করে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকল গভীর ঝোপের দিকে। সম্ভ্রম হারানোর তীব্র আতঙ্কে মেঘ চারপাশের অন্ধকার অরণ্যের দিকে তাকিয়ে কলিজা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কেউ আছেন? আমায় বাঁচান! বাঁচান আমায়! আল্লাহর ওয়াস্তে কেউ একটা সাহায্য করুন!”
দূরে দুই-একজন রাবার শ্রমিক লাঠি হাতে এই দৃশ্য দেখলেও, বখাটেদের চিনতে পেরে আর নিজেদের ঝামেলায় জড়াতে চাইল না। ওরা ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। অসহায় মানুষের এই নির্মমতা দেখে মেঘ এবার শব্দ করে ভেঙে পড়ল। চোখের কোণ বেয়ে বারিধারা ধুয়ে দিতে লাগল গালের রক্ত। একটা মেয়ের কাছে তার ইজ্জত নিজের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান, আর সেই অমূল্য সম্পদ আজ লুণ্ঠিত হতে চলেছে ভেবে ওর আত্মা কাঁপতে লাগল।
“কেউ আইবো না সোনামণি, কেউ না! আজ তোরে বাঁচানোর মতো কোনো বাপের ব্যাটা এই রামুর মাটিতে নাই!”
ঝোপের আড়ালে নিয়ে এক ঝটকায় টেনে মেঘের কুর্তির হাতা দুটো ছিঁড়ে ফেলা হলো। ওরা মেঘকে ভেজা ঘাসের ওপর একটা জড় বস্তুর মতো ছুড়ে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর নিথর শরীরের ওপর। পাশবিক টানে ছিঁড়ে ফেলা হলো ওর বুকের ওপর থাকা সুতোর এমব্রয়ডারির সেই ফিরোজা রঙের সিল্কের কাপড়! এক নিমেষে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল ভেতরের অ\ন্ত\র্বাস।
মেঘ লজ্জায়, তীব্র অপমানে আর ঘৃণায় ডুকরে কেঁদে উঠল। নিজের শেষ শক্তি দিয়ে ও হাত-পা ছুড়ে বাধা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল, কিন্তু সাত-আটটা পশুর শক্তির সামনে সতেরো বছরের একটা কোমল মেয়ে কতটা-ই বা পারে? ও আবারও চোখ বুঁজে শেষবারের মতো সাহায্য চাইল আরশের মালিকের কাছে।
ঠিক তখনই মেঘের সেই কোমল ফর্সা কপোলে একটা পশুর নোংরা হলদেটে দাঁতের কামড়ের তীব্র দংশন অনুভব হতেই, ও নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়ে শেষ চিৎকারটা ছাড়ল,
“আল্লাহ রে–!”
মেজর কারদার পর্ব ১৪
মেঘের এই গোঙানিতে বখাটেরা যেন আরও পৈশাচিক আনন্দ পেল। চারপাশের পরিবেশটা হুট করেই এক মরণ-নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজটাও যেন থমকে গেল।মেঘের চিৎকারে ওরা মজা নেয়। মজা–। চারপাশ নিস্তব্দ হয়ে যায়। আর কোনো শব্দ শোনা যায় না। এরপরই, এমন শব্দ শোনা যায়, যা শুনে কেঁপে ওঠে পুরো রাবার বাগান। গাছে বসা পাখিরা ভয়ে পালায় গাছ ছেড়ে। পাখির কিচিরমিচির শব্দের মাঝে শোনা যায় সেই চিৎকার।
“আহহহহ! বাঁচাও। বাঁচাও–!”
