Home ডিজায়ার আনলিশড ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪ (২)

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪ (২)

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪ (২)
সাবিলা সাবি

জাভিয়ানের প্রাইভেট শিপের কমান্ড রুমে তখন এক ভারী স্তব্ধতা। আধুনিক স্ক্রিনগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরের মানচিত্রের নীল আভা জাভিয়ানের পাথুরে মুখে আছড়ে পড়ছে। ঠিক তখনই রায়হান পকেট থেকে একটি পুরনো ফাইল বের করে কথা বলে উঠল। “স্যার, আপনার কি ভ্যালেরিয়ার কথা মনে আছে? সেই মেয়েটি, যে মেক্সিকো সিটির আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনোগুলোতে আপনার ছায়ার মতো লেগে থাকত?”
জাভিয়ান স্ক্রিন থেকে নজর সরিয়ে রায়হানের দিকে তাকাল। তার চোখে এক বিষাক্ত স্মৃতির ঝিলিক নিয়ে বললো “মনে থাকবে না কেন? আমার ক্যাসিনো ক্লাবের সবচেয়ে শার্প জুয়ার পার্টনার ছিল সে। তাসের চালে ওকে হারানো ছিল প্রায় অসম্ভব।”

রায়হান তখন বললো “স্যার, আসল তথ্যটা ও গোপন করেছিল। ভ্যালেরিয়া আসলে মেইলস্ট্রোমের আপন খালাতো বোন! ও শুধু আপনার গেম পার্টনারই ছিল না, ও ছিল মেইলস্ট্রোমের পাঠানো সবচেয়ে বিশ্বস্ত চর।”
জাভিয়ান ডেক-এ পায়চারি করতে করতে একটা শীতল, ক্রুর হাসি দিল। রায়হান অবাক হয়ে দেখল জাভিয়ানের চেহারায় কোনো বিস্ময় নেই। “রায়হান, তুমি কী ভেবেছো আমি এতই বোকা? ভ্যালেরিয়া যে মেইলস্ট্রোমের কাজিন, সেটা আমি ক্যাসিনোতে আমাদের তৃতীয় গেমের দিনই বুঝে গিয়েছিলাম। ওর হাতের উল্কি আর কথা বলার ধরন— সবই মেইলস্ট্রোমের মতোই। তুমি তো জানোই, মেয়েদের প্রতি আমার একধরণের অ্যালার্জি আছে। কেউ আমার খুব কাছে এলে আমার গা ঘিনঘিন করে। কিন্তু তারপরেও যে ভ্যালেরিয়াকে আমি আমার গেম পার্টনার করেছিলাম, তার কারণ একটাই—আমি জানতাম ও মেইলস্ট্রোমের খালাতো বোন। ওকে আমি কাছে রেখেছিলাম যাতে মেইলস্ট্রোমের প্রতিটি খবর আমার নখদর্পণে থাকে।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রায়হান স্তম্ভিত হয়ে গেল। জাভিয়ানের বুদ্ধির গভীরতা মেপে পাওয়া ভার। সে উত্তেজিত হয়ে বলল—”অসাধারণ স্যার! তাহলে ওকে এবার কাজে লাগান। ওর ক্যাসিনো আইডি আর আইপি ট্র্যাকিং করলেই আমরা ওর খোজ পেয়ে যাব। ও যেখানেই লগ-ইন করবে, আমাদের ট্র্যাকার তাকে ধরবে।”
জাভিয়ান থামল। রায়হানের কাঁধে হাত রেখে সে এক অদ্ভুত প্রশান্তির সাথে বলল—”ইউ আর গ্রেট রায়হান! তুমি প্রমাণ করে দিলে কেন তুমি আমার সেক্রেটারি হওয়ার যোগ্য। মেইলস্ট্রোম ভাবছে আমি রাগের মাথায় অন্ধ হয়ে দ্বীপে ঝাঁপ দেব, কিন্তু আমি ওকে ওর নিজের জালেই জড়াব। ভ্যালেরিয়াকে আমরা সরাসরি টার্গেট করব না, ওকে আমরা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব মেইলস্ট্রোমের সাম্রাজ্যে ফাটল ধরাতে।”

রায়হানের কথায় জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। রায়হান ফাইলটা গুছিয়ে রেখে আরও একটু ঝুঁকে এসে বলল—”স্যার, কাজটা কিন্তু আমাদের জন্য আরও সহজ হবে। ভ্যালেরিয়া আপনার জন্য একদম পাগল ছিল। ক্যাসিনোতে কাটানো সেই দিনগুলোতে ও প্রায়ই আমাকে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করত—কীভাবে আপনার মন গলানো যায়? কী করলে আপনি ওকে একটু আলাদাভাবে দেখবেন, একটু পছন্দ করবেন? ওর এই দুর্বলতাটুকু আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ওকে ইউজ করা এখন খুবই ইজি হবে।”

জাভিয়ান ধীরপদে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউগুলো যেন তার মনের ভেতরের অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। জাভিয়ান অত্যন্ত গম্ভীর আর শীতল গলায় বললো “ইউজ তো ওকে আমি করবই রায়হান, তবে তুমি যেভাবে ভাবছো সেভাবে নয়। ভালোবাসা বা ইমোশন দেখিয়ে কাউকে ব্যবহার করা জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর স্টাইল নয়। ওর আমার প্রতি যে দুর্বলতা, সেটাকে আমি মেইলস্ট্রোমের বিরুদ্ধে এক চরম বীজ হিসেবে ব্যবহার করব।”

রায়হান তখন বললো “বুঝলাম না স্যার। আপনি কি ওকে আমাদের দিকে টেনে আনবেন না?”
জাভিয়ান ধীর গলায় বললো “না। আমি চাই মেইলস্ট্রোম ভাবুক যে ভ্যালেরিয়া অলরেডি আমার সাথে হাত মিলিয়েছে। যখন একজন মাফিয়া তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষের ওপর বিশ্বাস হারায়, তখন তার সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আমি ভ্যালেরিয়াকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করব, যেখানে মেইলস্ট্রোম নিজেই ওকে শত্রু ভাবতে শুরু করবে। আর সেই সুযোগেই আমি আমার তান্বীকে ওখান থেকে ছিনিয়ে আনব।”
জাভিয়ান তার হাতের গ্লাসটা সজোরে টেবিলের ওপর রেখে বললো “মেইলস্ট্রোম কৌশল খেলছে,রায়হান, ট্র্যাকিং শুরু করো। ভ্যালেরিয়ার আবেগ দিয়ে নয়, বরং ওর অস্তিত্ব দিয়ে আমি মেইলস্ট্রোমের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকব।”

তিনটি দিন পার হয়ে গেছে। জাভিয়ান তার তুখোড় কৌশল আর ব্ল্যাক-স্কোয়াড নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই নির্দিষ্ট জোনে অবস্থান করছে ঠিকই, কিন্তু ফলাফল শূন্য। রহস্যময় দ্বীপটির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, জাভিয়ান যে চালই চালছে, কেউ একজন তা আগেভাগেই জেনে যাচ্ছে এবং পাল্টা চাল দিয়ে জাভিয়ানের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

শিপের ডেড-সাইলেন্ট কমান্ড রুমে জাভিয়ান জানালার বাইরে ধূসর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। জাভিয়ান খুব নিচু আর গম্ভীর স্বরে বললো “তিন দিন, রায়হান। তিন দিনেও আমরা ওই দ্বীপের এক ইঞ্চি মাটির নাগাল পেলাম না। প্রতিবার যখন আমরা কোনো সিগন্যাল ট্র্যাক করছি, সেটা ভুয়া প্রমাণিত হচ্ছে। আমার চালগুলো কেউ একজন আগে থেকেই উল্টে দিচ্ছে।”

রায়হান পাশেই দাঁড়িয়ে ল্যাপটপে ডেটা এনালাইসিস করছিল। জাভিয়ানের কথা শুনে সে মাথা তুলল।
জাভিয়ান আবার ও বললো “আমার মনে হচ্ছে রায়হান… আমার এই চালগুলো উল্টে দেওয়ার পেছনে এমন কেউ আছে যে আমার সবচেয়ে কাছের। আমার প্রতিটি নিশ্বাস আর প্রতিটি পদক্ষেপের খবর যার নখদর্পণে।”
এই কথাটা শোনা মাত্রই রায়হানের হাত থেকে একটা ফাইল টুপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে জাভিয়ানের ছায়ার মতো থাকা রায়হান ভাবতেই পারেনি জাভিয়ান তাকে এভাবে সন্দেহ করবে।

রায়হান অত্যন্ত আহত আর ধরা গলায় বললো “স্যার… আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ তো এই মুহূর্তে আমি। আপনার প্রতিটি প্ল্যান আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তার মানে… আপনি আমাকেই সন্দেহ করছেন?”
রায়হানের চোখে পানি টলমল করে উঠল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, অপমানে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে ভাবল, যে জাভিয়ানের জন্য সে নিজের জীবন দিতে দ্বিধা করেনা, আজ সেই জাভিয়ান তাকেই বিশ্বাসঘাতক ভাবছে!
জাভিয়ান কয়েক মুহূর্ত রায়হানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে রায়হানের কাঁধে শক্ত করে হাত রাখল। জাভিয়ানের কঠিন মুখটায় এক চিলতে মায়ার আভা দেখা দিল। “রায়হান! তুমি কি সত্যিই ভেবেছো আমি তোমাকে সন্দেহ করছি? না রায়হান… আমি এই পুরো পৃথিবীকে অবিশ্বাস করলেও তোমার প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহ কোনোদিন করব না। তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আমার নিজের মৃত্যুর মতোই ধ্রুব আর সত্যি।”
রায়হান বিস্ময়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখের পানি টুপ করে গাল বেয়ে পড়ে গেল। জাভিয়ান তখন বললো “আমি শুধু অবাক হচ্ছি, তুমি-আমি ছাড়া আর কে এমন আছে যে আমার মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে বসে আছে? যে আমার চালগুলো পড়ার ক্ষমতা রাখে? শত্রু আমার ঘরের ভেতরের কেউই রায়হান, শত্রু আমার ঘরে থেকে কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে আমার কাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে।”

রায়হান চোখের পানি মুছে নিজেকে সামলে নিল।জাভিয়ানের এই অগাধ বিশ্বাস তার ভেতরে নতুন শক্তি জোগাল। “ধন্যবাদ স্যার। আপনার এই বিশ্বাসটুকুই আমার কাছে সব। এবার আমি নতুন করে খুঁজব। মেইলস্ট্রোম যদি জাদু জানে, তবে আমরাও বিজ্ঞান দিয়ে তাকে টেনে বের করব।”
জাভিয়ান তখন মনে মনে ভাবল, তবে কি মেইলস্ট্রোম ছাড়াও তৃতীয় কোনো শক্তি এই খেলায় নেমেছে? কেউ কি গোপনে মেইলস্ট্রোমকে সাহায্য করছে? নাকি ভ্যালেরিয়া নিজের অজান্তেই কোনো ট্র্যাকার বা সিগন্যাল জাভিয়ানের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে যা আসলে মেইলস্ট্রোমেরই একটা ফাঁদ?

এই তিনটি দিন দ্বীপের সেই রহস্যময় বাংলোর ভেতরের পরিবেশ এক বিচিত্র রূপ নিয়েছে। একদিকে জাভিয়ান যখন বাইরের দুনিয়ায় হন্যে হয়ে খুঁজছে, অন্যদিকে এই বাংলোর এক বদ্ধ ঘরে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত মায়া আর বেদনার গল্প।
তান্বী গত তিনদিন ধরে এক মুহূর্তের জন্যও ভ্যালেরিয়াকে কাছছাড়া করতে চায় না। ভ্যালেরিয়া যতবারই বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যেতে চায়, তান্বী ততবারই কোনো না কোনো অজুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে। এমনকি রাতেও সে নিজের ঘরে না গিয়ে ভ্যালেরিয়ার সাথে ঘুমানোর বায়না ধরে।
মেইলস্ট্রোম প্রথমে আপত্তি করলেও তান্বীর কান্না আর জেদের কাছে হার মানে। তার মনে হয়েছিল, ভ্যালেরিয়ার চেহারার মিল যদি তান্বীকে শান্ত রাখে, তবে তাই হোক।

রাত তখন দুটো…..
পুরো দ্বীপে সুনসান নীরবতা। জানালার বাইরে কেবল সমুদ্রের গর্জন। ভ্যালেরিয়া পাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার শরীরের সেই মেক্সিকান পারফিউমের কড়া গন্ধ ছাপিয়েও তান্বীর কাছে মনে হচ্ছে এটা তার সেই এলিনা আপার গায়ের মায়াভরা গন্ধ।
তান্বী বালিশে মাথা রেখে ভ্যালেরিয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চাঁদের আলো জানালার পর্দা চিরে ভ্যালেরিয়ার নাকে আর চিবুকে এসে পড়েছে। তান্বী সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে ভ্যালেরিয়ার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

তান্বী মনে মনে বললো “কেন তুমি আমার আপা হয়েও আপা নও? তোমার এই কপাল, এই বন্ধ চোখের পাতা—সবই তো আমার সেই চেনা মানুষের মতো। অথচ তোমার ভেতরে এক বিষাক্ত পৃথিবী লুকিয়ে আছে। আপা, তুমি কি জানো জাভিয়ান আমাকে কচ্ছপের মতো নিজের খোলসে বন্দি করে রেখেছিল? আর এখন আমি এমন এক মানুষের হাতে বন্দি যে আমার শরীর নয়, আমার আত্মাকে সহ বন্দি করতে চায়। আমি কার কাছে যাব আপা?”
ভ্যালেরিয়া ঘুমের ঘোরে একটু নড়ে উঠল। তান্বী দ্রুত নিজের চোখের জল মুছে ফেলল, কিন্তু কান্না থামছে না। সে ভ্যালেরিয়াকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হচ্ছে, এই শরীরটা যদি তার আপার না-ও হয়, তবুও এই ছোঁয়াটুকু তাকে অন্তত এক রাতের জন্য হলেও নরক থেকে দূরে রাখছে।

তান্বী ফিসফিস করে বলতে লাগল, “আমি জানি না কাল কী হবে।কেউ হয়তো আসবে আমাকে বাঁচাতে আর নয়তো এই ঝড়-তুফান মাফিয়াটা আমাকে চিরকালের জন্য আড়াল করে দেবে। কিন্তু আজ এই রাতে আমি শুধু আমার আপাকে পাশে চাই।”
ভ্যালেরিয়া হঠাৎ চোখ মেলে তাকাল। তান্বীর কান্নার শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেছে। সে দেখল তান্বী তার বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কাঁদছে। ভ্যালেরিয়ার প্রথম ইচ্ছে হলো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে, কিন্তু তান্বীর থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটা দেখে সে কেমন যেন কুঁকড়ে গেল।
ভ্যালেরিয়া খুব নিচু আর কর্কশ স্বরে বললো “আবার কাঁদছো? বলেছি না আমি তোমার আপা নই! আমাকে জড়িয়ে ধরে কেন নিজের সময় নষ্ট করছো?”

তান্বী কোনো উত্তর দিল না, শুধু আরও জোরে আঁকড়ে ধরল। ভ্যালেরিয়া অবাক হয়ে দেখল, তার পাথরের মতো কঠিন হৃদয়ের কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। যে মেয়েটাকে সে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তার চোখের জল এখন ভ্যালেরিয়ার সিল্কের নাইটগাউন ভিজিয়ে দিচ্ছে।ভ্যালেরিয়া অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবল, জাভিয়ান আর মেইলস্ট্রোমের মতৈ মানুষ কেনো এই মেয়েটার জন্য পাগল হয়েছে—কারন এই সাধারণ মেয়েটার মায়ার কাছে সে নিজেও হেরে যাচ্ছে।

সময় যেন জাভিয়ানের কাছে থমকে গেছে, কিন্তু মনের ভেতরের অস্থিরতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। দিনের পর দিন তান্বীর কোনো হদিস না পেয়ে জাভিয়ান এখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়তে পারে।
সেই রাতে জাভিয়ান ড্রয়িং রুমের সোফাতেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অবচেতন মনে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। দেখল, চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা, আর সেই কুয়াশা চিরে তান্বী তার দিকে হেঁটে আসছে। তান্বীর চোখে সেই চিরচেনা মায়া। স্বপ্নে জাভিয়ান সব বাধা ভুলে তান্বীকে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরল। তার কপালে, গালে, চিবুকে অসংখ্য চুমু এঁকে দিল সে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব হারিয়ে গেলেও এই মুহূর্তটা বাস্তব। জাভিয়ান বিড়বিড় করে বলছিল, “তান্বী, আর কোনো ডিল নেই, আর কোনো শর্ত নেই…তুমি এখন থেকে শুধু আমার হয়ে থাকবে।”
কিন্তু ঠিক তখনই কাঁচ ভাঙার এক বিকট শব্দে জাভিয়ানের ঘুমটা ভেঙে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। চারপাশ অন্ধকার, নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ। জাভিয়ান হাহাকারের মতো দুহাত বাড়িয়ে তান্বীকে খুঁজল, কিন্তু তার শূন্য হাতের মুঠোয় ধরা দিল কেবল শীতল বাতাস।

এক নিমেষে জাভিয়ানের ভেতরের সেই ভয়ংকর ‘সাইকো’ সত্তাটা জেগে উঠল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, চোখের মণি লাল হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল, তান্বী পাশে নেই—এই ধ্রুব সত্যটা তার মস্তিষ্ক আর নিতে পারছে না। তার ভেতরের সেই পুরনো অসুখ, সেই চরম অধিকারবোধ আর উন্মাদনা তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। সে পাগলের মতো তার ঘরের আলমারি খুলে তান্বীর সেই জামাটা বের করল। সেটা নাকে চেপে ধরে তান্বীর গায়ের ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু তাতেও তার তৃষ্ণা মিটল না। জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
জাভিয়ান ফিসফিস করে, নিজের মনেই বললো “তুমি নেই জিন্নীয়া… কিন্তু তোমাকে আমার কাছে অনুভব করতেই হবে। এই শূন্যতা আমাকে মেরে ফেলছে। আমি যদি তোমাকে ছুঁতে না পারি, তবে তোমার অস্তিত্বকে আমি আমার নিজের ভেতরে গেঁথে নেব।”

জাভিয়ান ড্রয়ার থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করল। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক পৈশাচিক উজ্জ্বলতা। সে ঠিক করল, তান্বীকে কাছে পাওয়ার জন্য সে এক চরম কাণ্ড করবে—যা কেবল একজন উন্মাদের পক্ষেই সম্ভব।
সে রায়হানকে চিৎকার করে ডাকল। “রায়হান! এখনই ডক্টরকে ডাকো। আমার শরীরে একটা পার্মানেন্ট ‘মার্ক’ চাই। এমন কিছু যা প্রতি মুহূর্তে আমাকে মনে করিয়ে দেবে তান্বী আমার চামড়ার নিচে মিশে আছে। আর হ্যাঁ, ওই দ্বীপের সিগন্যাল যদি আজ না পাওয়া যায়, তবে আমি এই পুরো শহরটাকেই জ্বালিয়ে দেব। আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না!”

জাভিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, তান্বীকে খুঁজে বের করার আগ পর্যন্ত সে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য তার শরীরের কোনো এক অংশে তান্বীর নাম বা কোনো চিহ্ন খোদাই করবে, যাতে প্রতিটি যন্ত্রণায় সে তান্বীর অস্তিত্ব অনুভব করে।
জাভিয়ানের ভেতরের উন্মাদনা এখন আর কোনো সীমানা মানছে না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘাড়ের বাঁ দিকটা দেখছে। ঠিক কানের নিচ থেকে শুরু করে ঘাড়ের পাশ বেয়ে কাঁধের ওপর পর্যন্ত জায়গাটা সে বারবার স্পর্শ করছে।
সেখানে প্রতিটি রক্তবিন্দুতে সে তান্বীর নাম শুনতে পাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, এই নামের ছোঁয়া না থাকলে সে হয়তো আর কয়েক ঘণ্টা পরেই দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে।
জাভিয়ান ডক্টরকে রুমে আসতে বারণ করে নিজেই সেই তীক্ষ্ণ ছুরি আর বিশেষ এক ধরণের কালো কালি নিয়ে বসে পড়ল। রায়হান রুমে ঢুকে দৃশ্যটা দেখে আঁতকে উঠল।

“স্যার! আপনি কী করছেন? ডক্টরকে করতে দিন, আপনি নিজের ক্ষতি করছেন!”
জাভিয়ান এক অমানুষিক শান্ত গলায় বললো “সরে যাও রায়হান। এটা আমার আর আমার তান্বীর ব্যাপার। এই যন্ত্রণাটুকু না পেলে আমি বুঝতে পারছি না যে ও এখনো আমার বেঁচে থাকার কারণ। এই রক্ত যখন ঝরবে, তখন আমি ওর প্রতিটি নিশ্বাস আমার ঘাড়ের কাছে অনুভব করব।”
জাভিয়ান কোনো অ্যানাস্থেশিয়া বা অবশ করার ওষুধ ছাড়াই নিজের ঘাড়ের চামড়ায় ছুরি দিয়ে আঁচড় কাটতে শুরু করল। কানের নিচ থেকে শুরু হয়ে সেই ক্ষত নেমে এল কাঁধের ওপর পর্যন্ত। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল, কিন্তু জাভিয়ানের মুখে কোনো কষ্টের ছাপ নেই; বরং তার চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
খুব নিখুঁতভাবে সে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করল—
‘T A N B I’

রক্ত আর কালির সংমিশ্রণে তার ঘাড়ের সেই জায়গাটা লাল-কালো হয়ে এক বীভৎস কিন্তু শৈল্পিক রূপ নিল। রায়হান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল, জাভিয়ান যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে না, বরং সে নামের ওপর হাত বুলিয়ে হাসছে।”এবার ও আমার একদম কাছে। কেউ ওকে আমার থেকে দূরে সরাতে পারবে না। মেইলস্ট্রোম আমার শরীর থেকে প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু এই নামটা মুছতে পারবে না।”
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল সেই টাটকা ক্ষত। রক্তের ধারা তার সাদা শার্ট ভিজিয়ে নামছে। জাভিয়ান সেই অবস্থায় রায়হানের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখের মণি এখন টকটকে লাল “রায়হান, এই ক্ষতটা শুকানোর আগেই আমি ওই দ্বীপে থাকতে চাই।
জাভিয়ানের এই সাইকো রূপ দেখে রায়হান বুঝল, এবার ধ্বংস অনিবার্য। জাভিয়ান এখন আর কোনো সুস্থ মানুষ নয়, সে এক রক্তাক্ত প্রেতাত্মা হয়ে তান্বীকে ছিনিয়ে আনতে যাচ্ছে।

মেক্সিকো সিটির হাড়কাঁপানো শীতের এক রাতে, একটি নিভৃত আর্ট স্টুডিওতে সময়ের চাকা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। চারপাশ অন্ধকার, শুধু জাভিয়ানের সামনে রাখা সেই বিশাল বেদীর ওপর কৃত্রিম আলো এসে পড়েছে। তার সামনে নতজানু হয়ে কাজ করছেন পৃথিবীর সেরা কয়েকজন ম্যানিকুইন প্রস্তুতকারক। জাভিয়ানের রক্তবর্ণ চোখে গত কয়েক রাতের নির্ঘুম যন্ত্রণা।
সে প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখছে এক অমানুষিক তীক্ষ্ণতায়। তার গম্ভীর, কম্পিত কণ্ঠস্বর স্টুডিওর দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল

— “আমি নিখুঁত চাই। প্রতিটি লোমকূপ, চোখের কোণের ওই সূক্ষ্ম রেখা, হাসির সেই অবাধ্য ভাঁজ—সবকিছু… ঠিক যেমনটা ছিল আমার জিন্নীয়ার। এক চুল এদিক-ওদিক হলে এই স্টুডিওসহ তোমাদের আমি শেষ করে দেব।”
নির্মাতারা যখন ধীরে ধীরে আবরণ উন্মোচন করল, জাভিয়ানের শ্বাস থমকে গেল। এটা স্রেফ কোনো সিলিকনের ডামি নয়; এটি এক জীবন্ত স্মৃতি।তান্বীর সেই স্নিগ্ধ চাহনি, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মায়াবী হাসি, আর পিঠ বেয়ে নেমে আসা সেই দীর্ঘ, রেশমি কালো চুলের রাশি। জাভিয়ান অপলক চেয়ে রইল; যেন কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে সে তার হারিয়ে যাওয়া স্বর্গকে আবার মাটি খুঁড়ে বের করে এনেছে।

মেক্সিকোর এক ফার্মহাউসে আজ আলোর লেশমাত্র নেই। জানালার ওপার থেকে আসা নিওন আলোর এক চিলতে নীলচে আভা ঘরের মাঝখানে রাখা সেই মানবীমূর্তির ওপর এসে পড়েছে। ঘরের বাতাসে দামী তামাক আর তেকিলার উগ্র গন্ধের মাঝেও জাভিয়ান যেন এক অলীক সুবাস খুঁজে পাচ্ছে।
সে হাতে একটি রুপোলি চিরুনি নিয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে ম্যানিকুইনটির হাঁটু অবধি লম্বা চুলগুলো আঁচড়ে দিচ্ছে। তার ঠোঁটে এক অপার্থিব প্রশান্তির হাসি। সে কাঁপাকাঁপা হাতে মূর্তির শীতল গালে স্পর্শ করে বিড়বিড় করে উঠল— “ওরা ভেবেছিল তোমাকে আমার থেকে আলাদা করবে? কত বোকা ওরা! দেখ তান্বী… তুমি এখনো আমার নিশ্বাসের ঠিক এতটা কাছেই আছ।”

জাভিয়ান আলমারি থেকে বের করে আনল সেই কাঙ্ক্ষিত মেরুন রঙের শাড়ি। এই সেই শাড়ি, যা পরে প্রথমবার দেখার দিন জাভিয়ানের জগত উলটপালট হয়ে গিয়েছিল। শাড়িটা হাতে নিতেই জাভিয়ানের নাকে যেন তান্বীর শরীরের সেই ঘ্রাণ আছড়ে পড়ল। সে অতি সাবধানে, যেন কোনো জ্যান্ত মানুষকে সাজাচ্ছে, সেভাবে ম্যানিকুইনটিকে শাড়িটি পরাতে শুরু করল। প্রতিটি কুঁচি যত্ন করে ঠিক করে দিচ্ছে, প্রতিটি ভাঁজ করার সময় তার আঙুলগুলো পুতুলটির গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে এক গভীর তৃষ্ণায়।
সে ঘোর লাগা গলায় ফিসফিস করে বলল “জিন্নীয়া… আজ তোমাকে ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো লাগছে। এই মেরুন রঙটা তোমার গায়ের সাথে মিশে যেন আগুনের মতো জ্বলছে। এই তো, কুঁচিটা একটু বেঁকে গেছে… দাঁড়াও, ঠিক করে দিচ্ছি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে রায়হান ঘরে ঢুকল। দৃশ্যটি দেখে রায়হানের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। তার হাতের ইনভেস্টিগেশন ফাইলটা যেন নিমিষেই পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল। সে দেখল, জাভিয়ান তখন সেই নির্জীব মূর্তির হাতে মাথা রেখে আলতো করে চুমু খাচ্ছে।
রায়হান আর্তনাদ করে উঠল “স্যার! একি উন্মাদনা শুরু করেছেন আপনি? কার সাথে কথা বলছেন?”
জাভিয়ান শান্তভাবে মূর্তির চুলে হাত বুলাতে বুলাতে তর্জনী উঁচিয়ে ইশারা করল। “শশশ… আস্তে কথা বলো রায়হান। দেখছ না তান্বী মাত্র ড্রেসটা চেঞ্জ করল? ও খুব টায়ার্ড, একটু পরেই আমরা ডিনার করব।”
রায়হান আতঙ্কে শিউরে উঠে বলল— “স্যার, এটা স্রেফ একটা মূর্তি! আপনি কি ধ্বংস হয়ে যেতে চান?”
জাভিয়ান এক ঝটকায় রায়হানের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন কোনো মানুষের করুণা নেই, আছে এক হিংস্র খুনি নেশা। সে গর্জে উঠে বলল “মূর্তি? আরেকবার যদি ওকে মূর্তি বলেছ, তবে তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব রায়হান! ও আমার তান্বী। আমি ওর হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি, ও আমার সাথে কথা বলছে! ওর নিশ্বাসে এই ঘরটা জীবন্ত হয়ে আছে, আমি অনুভব করতে পারছি তুমি পাচ্ছ না?”

তারপর জাভিয়ান ম্যানিকুইনটিকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার এই ঘোর, এই ডিলিউশন (Delusion) এখন আর স্রেফ প্রেম নেই; এটি এখন একটি ভয়াবহ মানসিক রোগ ‘Obsessive Love Disorder’।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, জাভিয়ান এখন বাস্তব জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। যখন কোনো মানুষ কাউকে পাওয়ার জন্য নিজের সব ক্ষমতা—জাহাজ, হেলিকপ্টার, সেনাবাহিনী—ব্যবহার করার পরও ব্যর্থ হয়, তখন তার মস্তিষ্ক এই ভয়াবহ ‘ডিফেন্স মেকানিজম’ তৈরি করে। এটি কোনো সাধারণ বিচ্ছেদ নয়, এটি ‘অবজেক্ট-ফিক্সেশন’। জাভিয়ানের কাছে তান্বী এখন কোনো মানুষ নয়, বরং একটি ‘অবজেক্ট’ বা ‘লক্ষ্য’, যাকে সে নিজের আয়ত্তে রাখতে যেকোনো বিভ্রমকেও সত্যি বলে বিশ্বাস করতে রাজি।
ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক ডার্ক কেস আছে, যেখানে মানুষ প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিতে না পেরে তাদের মোমের মূর্তি বানিয়ে বা তাদের দেহাবশেষ সংরক্ষণ করে ঘরে সাজিয়ে রাখে।

মেক্সিকো সিটির সেই নির্জন আর্ট স্টুডিও আর জাভিয়ানের উন্মাদের মতো আচরণের খবর মেইলস্ট্রোমের কাছে পৌঁছাল তার এক বিশ্বস্ত চরের মাধ্যমে। দ্বীপের অন্ধকার স্টাডি রুমে বসে মেইলস্ট্রোম যখন ল্যাপটপে সেই ফুটেজ আর তথ্যগুলো দেখছিল, তার ঠোঁটে এক পৈশাচিক আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।সে গ্লাস ভর্তি মদ নিয়ে ভ্যালেরিয়াকে নিজের কাছে ডাকল।

মেক্সিকো সিটির সেই নিভৃত স্টুডিওতে কী ঘটেছিল, তা মেইলস্ট্রোমের চরেরা অত্যন্ত গোপনে ক্যামেরাবন্দি করতে সক্ষম হয়েছিল। দ্বীপের সুরক্ষিত স্টাডি রুমে বসে মেইলস্ট্রোম যখন সেই ফুটেজটি প্লে করল, তখন রুমের তাপমাত্রা যেন হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। মনিটরের নীলচে আভা মেইলস্ট্রোমের মুখে এক অশুভ ছায়া ফেলেছে।সেখানে দেখা যাচ্ছে, আধো-অন্ধকার স্টুডিওর মাঝখানে জাভিয়ান দাঁড়িয়ে। তার পরনের সাদা শার্টের কলার রক্তে ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তদারকি করছে একদল কারিগরকে, যারা গভীর নিপুণতায় তৈরি করছে তান্বীর এক হুবহু সিলিকন প্রতিকৃতি। ফুটেজে দেখা গেল, জাভিয়ান হঠাৎ উন্মাদের মতো এক কারিগরের কলার চেপে ধরল।
জাভিয়ান চেরা গলায় গর্জে উঠে বললো “নিখুঁত চাই! ওর চোখের কোণের ওই তিলটা যদি এক চুল এদিক-ওদিক হয়, তবে তোমাদের হাত আমি জ্যান্ত কেটে ফেলব। ও আমার জিন্নীয়া… ওর হাসিতে যে মায়া ছিল, তা এই মূর্তির ঠোঁটে ফুটে উঠতে হবে!”

মেইলস্ট্রোম গ্লাসের সবটুকু মদ এক চুমুকে শেষ করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক বিদ্রূপ।”দেখেছিস ভ্যালেরিয়া? মেক্সিকোর সেই তথাকথিত বাঘ এখন একটা প্লাস্টিকের পুতুল নিয়ে খেলা করছে! ও নাকি তান্বীর ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য সিলিকন বানাচ্ছে। আর ওর ঘাড়ের দশা দেখো— নিজের চামড়া খুবলে ‘TANBI’ লিখেছে। পাগলামিরও একটা সীমা থাকে, কিন্তু জাভিয়ান তো সীমানা ছাড়িয়ে নরকে পা রেখেছে। ও এখন বাঘ নয়, ও এখন এক মগজহীন সাইকো!”

ভ্যালেরিয়া ফুটেজের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো জমে রইল। জাভিয়ানের ওই দগদগে লাল ক্ষত আর ডিলিউশনাল চাহনি দেখে তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। “ব্রো, তুমি এটাকে উপহাস করছো? যে মানুষটা একটা প্রাণহীন মূর্তিকে জ্যান্ত ভেবে নিজের রক্ত দিয়ে পুজো করতে পারে, সে যখন জানবে জ্যান্ত তান্বী এখানে বন্দি, তখন সে কতটা নৃশংস হতে পারে ধারণা আছে?এই দ্বীপ পুরোটা ও জ্বালিয়ে দিবে।এটা ওর দুর্বলতা নয় ব্রো, এটা ওর এক সংহারী রূপের পূর্বাভাস। ও নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে শুধু তান্বীকে নিজের ভেতরে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।”

তারা কেউই জানত না যে দরজার ওপাশে অন্ধকার করিডোরে একটা ছায়ার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তান্বী। সে আসলে মেইলস্ট্রোমের চোখ এড়িয়ে ভ্যালেরিয়াকে খুঁজতে এদিক-ওদিক যাচ্ছিল, কিন্তু কক্ষের ভেতর থেকে আসা জাভিয়ানের নামটা শুনেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়। দরজার সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে সে যা শুনলো, তা শোনার জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না।
জাভিয়ানের সেই রক্তাক্ত ঘাড়… দগদগে লাল ক্ষত দিয়ে ফুটে ওঠা তার নামের প্রতিটি অক্ষরের কথা। জাভিয়ান সেই মূর্তির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে কোনো অলৌকিক প্রার্থনায় মগ্নের মতো হয়ে থাকার কথা শুনে মুহূর্তেই তান্বীর পায়ের তলা থেকে পৃথিবীটা সরে গেল। সে নিজের দুহাতে মুখ চেপে ধরল যাতে তার ভেতরের গুমরে ওঠা আর্তনাদ দেয়ালে প্রতিধ্বনি না তোলে। সে দেয়াল ঘেঁষে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে, কিন্তু তার হৃৎপিণ্ড যেন হাজারটা হাতুড়ির ঘা খাচ্ছে।

তান্বী (মনে মনে) বললো “জাভিয়ান… একি সর্বনাশা নেশায় মেতেছো তুমি? কেন নিজেকে এভাবে ছিঁড়ে তছনছ করে দিলে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলে গেছো, আমার নিখোঁজের খবর শুনেও তোমার কোনো কিছু আসে যায়না। কিন্তু তুমি তো আমার জন্য নিজের শরীরটাকে এক জীবন্ত কবরস্থান বানিয়ে ফেললে! একটা জড় মূর্তিকে আমি ভেবে তুমি ডুকরে কাঁদছো? আমি তো এখানে জ্যান্ত ধুঁকছি জাভিয়ান… আমি এখানে!”
এতদিন তার মনে যে অভিযোগের পাহাড় ছিল, জাভিয়ানের এই আত্মঘাতী উন্মাদনার কথা শুনে তা এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেল। তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ান তাকে শুধু ভালোবাসা নয়, তাকে এক ভয়ংকর অসুখের মতো নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিয়েছে। মেইলস্ট্রোমের পৈশাচিক হাসি আর জাভিয়ানের রক্তাক্ত আত্মসমর্পণের কথা— এই দুইয়ের মাঝে পড়ে তান্বীর মনে হলো তার বুকটা এখনই ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।
সেখানেই অন্ধকার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে মনে মনে এক অটল প্রতিজ্ঞা করল— জাভিয়ান তাকে উদ্ধার করতে পারুক বা না পারুক, সে নিজে এবার এই নরক ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। জাভিয়ানের ওই রক্তাক্ত ঘাড়ে নিজের হাত না রাখা পর্যন্ত তার আত্মা শান্তি পাবে না।

রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে দ্বীপের রহস্যময় স্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউগুলো যখন সৈকতের পাথরে আছড়ে পড়ছিল, সেই শব্দের চেয়েও ভয়াবহ এক আর্তনাদ তান্বীর বুকের ভেতর গুমরে মরছিল। জাভিয়ানের ওই রক্তাক্ত উন্মাদনার খবর শোনার পর থেকে তান্বীর স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসছে। সে আর স্থির থাকতে পারল না; হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টলমলে পায়ে ছুটে গেল ভ্যালেরিয়ার ঘরের দিকে।
ধপাস করে মেঝেতে পড়ে ভ্যালেরিয়ার পা দুটো জড়িয়ে ধরল তান্বী। তার চোখের লোনা জলে ভ্যালেরিয়ার দামী কার্পেট ভিজে একাকার। “আপা, আমি আপনার হাতে-পায়ে ধরছি, দয়া করুন!” তান্বীর কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল, “আমাকে এখান থেকে বের হতে সাহায্য করুন। ওই মানুষটা… ওই মানুষটা নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে আমার জন্য। সে তো পাগল হয়ে যাচ্ছে! আমাকে কোনোভাবে ঝড়তুফানের এই নরক থেকে বের করে জাভিয়ানের কাছে পৌঁছে দিন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”

ভ্যালেরিয়া এক ঝটকায় তার পা সরিয়ে নিল। তার চোখের মণি দুটো তখন শীতল আর তাচ্ছিল্যে ভরা। ঘৃণা আর ঈর্ষার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ খেলা করছিল তার ঠোঁটের কোণে।
“হেল্প?” ভ্যালেরিয়া তীক্ষ্ণ স্বরে হেসে উঠল, “তুমি কি সত্যিই পাগল হয়েছো তান্বী?মেইলস্ট্রোম আমার পরিবার, আমার ভাই। আমি ওর সাথে বেইমানি করে তোমাকে পালাতে সাহায্য করব? আর তুমি কে? তুমি হলে আমার ‘লাভ রিভাল'(প্রেমের প্রতিদ্বন্দি) যে জাভিয়ানকে আমি বছরের পর বছর নিজের করে পাওয়ার আরাধনা করেছি, সেই জাভিয়ান আজ তোমার জন্য একটা প্রাণহীন মূর্তিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে! তার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে তোমার নাম। আমি কেন তোমাকে ওর কাছে পৌঁছে দেব? তুমি এখানে পচে মরলেই বরং আমার তৃপ্তি।”

ভ্যালেরিয়ার কর্কশ কথাগুলো তান্বীর বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সে বুঝতে পারল, ভ্যালেরিয়ার মনের ভেতর যে প্রত্যাখ্যাত প্রেম আর ঈর্ষার আগুন জ্বলছে, সেখানে দয়া পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তান্বী নিজের চোখের জল মুছে নিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর তখন মিনতিতে থরথর করে কাঁপছে।
“ঠিক আছে আপা.. আপনি আমাকে সাহায্য করবেন না, জানি। কিন্তু আপনার কাছে আমার একটা শেষ মিনতি।” তান্বী উদভ্রান্তের মতো ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই যে ঝড়তুফান লোকটা…,সে যেভাবে জাভিয়ানকে দেখছিল—ওই ফুটেজটা কি আমাকে একবার দেখানো যায়? আমি শুধু একটিবারের জন্য ওকে দেখতে চাই। ওই নামটা সে নিজের শরীরে কীভাবে লিখেছে… সে এখন কেমন আছে… শুধু একবার দেখতে দিন!”

তান্বীর এই বিধ্বস্ত রূপ, তার চোখের ওই অমানুষিক আর্তি দেখে ভ্যালেরিয়ার পাথুরে হৃদয়েও যেন কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিল। সে দীর্ঘক্ষণ তান্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। হয়তো জাভিয়ানের প্রতি এই সর্বনাশা ভালোবাসা দেখে সে নিজেই ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভ্যালেরিয়া চুপিচুপি বলল, “মেইলস্ট্রোম এখন আশেপাশে টহল দিচ্ছে। ও জানতে পারলে আমরা দুজনেই শেষ। ঠিক আছে, তোমাকে আমি দেখাব। দেখাব জাভিয়ান এখন কেমন উন্মাদের মতো আচরণ করছে। তবে এখন নয়… মাঝরাতে। যখন এই দ্বীপের প্রতিটি প্রাণ ধোঁকায় পড়ে ঘুমিয়ে থাকবে, তখন আমি তোমাকে নিয়ে যাব ওই সিসিটিভি আর ড্রোন ফুটেজের কন্ট্রোল রুমে।”

তান্বী শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তার প্রতিটি নিশ্বাস যেন এক একটি দীর্ঘ শতাব্দী হয়ে কাটছিল। জানালার বাইরে অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে শুধু একথাই বিড়বিড় করছিল— “জাভিয়ান, আর একটু ধৈর্য ধরো। আমি আসবো খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে। তোমার ওই রক্তাক্ত ঘাড়ের ক্ষতটা যতক্ষণ না আমি নিজের হাত দিয়ে মুছে দিচ্ছি, ততক্ষণ আমার মরণও হবে না।”

মাঝরাত। নিঝুম দ্বীপের বুকে তখন কেবল প্রশান্ত মহাসাগরের আদিম গর্জন শোনা যাচ্ছে। চারিদিকে নোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর অরণ্যের রহস্যময় নিস্তব্ধতা। ভ্যালেরিয়া অত্যন্ত সন্তর্পণে তান্বীকে নিয়ে সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমের দিকে পা বাড়াল। মেইলস্ট্রোম তখন ঘুমে আচ্ছন্ন—অন্তত তারা তেমনটাই ভেবেছিল।
ভারী ইস্পাতের দরজাটা যখন নিঃশব্দে খুলে গেল, কন্ট্রোল রুমের ডজন খানেক মনিটরের নীলচে আভা তান্বীর পাংশুটে মুখে আছড়ে পড়ল। ভ্যালেরিয়া কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে মেক্সিকো সিটির সেই অভিশপ্ত স্টুডিওর ফুটেজটি বড় স্ক্রিনে ওপেন করল।

স্ক্রিনে ফুটে উঠল এক নারকীয় দৃশ্য। আধো-অন্ধকার এক বিশাল আর্ট স্টুডিও যার মাঝখানে বেদির ওপর বসানো সেই সিলিকন মূর্তি—হুবহু তান্বীর আদলে গড়া এক বিষণ্ণ প্রতিচ্ছবি। জাভিয়ান সেই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা শার্টের কলার টাটকা রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। জাভিয়ান যখন মুখ তুলল, তান্বীর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। কানের নিচ থেকে ঘাড়ের হাড় অবধি দগদগে ক্ষতের ওপর খোদাই করা প্রতিটি অক্ষর— ‘T A N B I’ মনে হচ্ছে কেউ যেন কাঁচা চামড়া খুবলে ঘৃণা আর প্রেমের এক রক্তাক্ত মহাকাব্য লিখেছে।
ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, জাভিয়ান কাঁপাকাঁপা হাতে মূর্তির গাল স্পর্শ করছে আর বিড়বিড় করে বলছে, “জিন্নীয়া, আর অল্প কটা দিন… আমি আসছি।”

দৃশ্যটি দেখা মাত্রই তান্বী দুহাতে মুখ চেপে ধরল। তার বুকের পাঁজর যেন মটমট করে ভেঙে যাচ্ছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না; মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তার ওই কান্নার শব্দ যেন কন্ট্রোল রুমের শীতল দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
ভ্যালেরিয়া কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তান্বীর বিধ্বস্ত অবস্থার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার ঠোঁটে এক বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল।”আরে! তুমি কাঁদছো কেন তান্বী? তুমি না বলেছিলে জাভিয়ান ক্যারেক্টারলেস?ও নাকি অগণিত মেয়ের সাথে রাত কাটায়, মেয়েদের শেয়ার করে—তবে এখন ওর এই দশা দেখে তোমার বুক ফাটছে কেন? ওর এই বীভৎস পাগলামি দেখে তো তোমার তৃপ্তি হওয়ার কথা যে লোকটা তিলে তিলে মরছে!”

তান্বী কান্নার তোড়ে কথা বলতে পারছিল না। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল যেখানে জাভিয়ান তখন সেই মূর্তির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক অপার্থিব প্রার্থনায় মগ্ন। তান্বী হেঁচকি তুলে মাথা উঁচু করল। তার চোখের চাহনিতে তখন কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ঘৃণা নেই।
তান্বী ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে বললো “হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম ও খারাপ অনেক খারপ! আমি ভেবেছিলাম ও ক্যারেক্টারলেস! কিন্তু আপা… আমি ওকে ভালোবাসি! আই লাভ হিম ভেরি মাচ! কখন ভালোবেসে ফেলেছিলাম নিজেও জানিনা। আর আমি জানতাম না ও আমাকে পাওয়ার জন্য নিজের শরীরটাকে এভাবে কসাইয়ের মতো কাটবে। আমি ওর ওই রক্ত মাখা ঘাড়টা একবার নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখতে চাই আপু। ও ক্যারেক্টারলেস হোক বা সাইকো—ও তো আমারই হাজবেন্ড!”

ভ্যালেরিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তান্বীর এই সপাটে স্বীকারোক্তি যেন তাকে এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ করে দিল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ান আর তান্বীর এই সম্পর্ক এখন আর কোনো মাফিয়া-বন্দি গেম নেই; এটি এক ভয়াবহ আত্মঘাতী প্রেমে রূপ নিয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় একটি ভারী শব্দ হলো। ভ্যালেরিয়া আর তান্বী দুজনেই শিউরে উঠে দরজার দিকে তাকাল। ভারী লোহার দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। চৌকাঠে দীর্ঘদেহী মেইলস্ট্রোম দাঁড়িয়ে। তার চোখে কোনো ক্রোধ নেই, আছে এক বরফশীতল শূন্যতা যা অন্ধকারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল। প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ তান্বীর হৃদপিণ্ডে হাতুড়ির ঘা দিচ্ছিল।

মেইলস্ট্রোম তান্বীর একদম সামনে এসে দাঁড়াল।
মেইলস্ট্রোম যখন তান্বীর মুখ থেকে ওই অমোঘ স্বীকারোক্তি “আই লাভ হিম”—শুনল, তার ভেতরের ধূর্ত শিকারিটা মুহূর্তেই হিংস্র হয়ে উঠল। সে এতক্ষণ জাভিয়ানের উন্মাদনা দেখে তাকে তাচ্ছিল্য করছিল, কিন্তু তান্বীর এই অবিচল ভালোবাসা তার অহংকারে সজোরে আঘাত করল।
সে তান্বীর চিবুকটা এত জোরে চেপে ধরল যে তান্বীর মুখটা যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গেল। মেইলস্ট্রোমের চোখে তখন কোনো করুণা নেই, আছে এক পৈশাচিক জিঘাংসা।
মেইলস্ট্রোম দাঁতে দাঁত চেপে বললো “ভালোবাসো? তার মানে আমার এতদিনের চেষ্টা, এই বিলাসিতা, এই নিরাপত্তা—সবই তোমার ওই সাইকো জাভিয়ানের রক্তমাখা ঘাড়ের কাছে হেরে গেল? খুব ভালো সোলফ্লেম, তুমি নিজেই নিজের ধ্বংসের রাস্তা বেছে নিলে।”

সে তান্বীকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে কন্ট্রোল রুমের বড় স্ক্রিনের সামনে নিয়ে এল। সেখানে জাভিয়ানের সেই রক্তাক্ত মূর্তি-বিলাসের দৃশ্য তখনও স্থির হয়ে আছে। “তুমি হয়তো ভাবছো তোমার এই ভালোবাসা ওকে বাঁচিয়ে দেবে? ভুল করছো। তোমার এই এক একটা ভালোবাসার শব্দ জাভিয়ানের কফিনে এক একটা পেরেক ঠুকছে। জাভিয়ান এখন অলরেডি এই দ্বীপের উপকূলে পৌঁছে গেছে। আমি ওকে আটকাইনি, কারণ আমি চেয়েছিলাম ও আসুক। ওকে জ্যান্ত কবরে পাঠানোর এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হবে না।”
তান্বী কান্নায় ভেঙে পড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। আর্তনাদ করে বলল, “দয়া করুন… ওকে মারবেন না।আপনি যা চান আমি তাই করব!”

মেইলস্ট্রোম তখন বললো “গুড। তবে শর্ত একটাই। জাভিয়ান যখন তোমার সামনে আসবে, তুমি ওকে বলবে যে তুমি স্বেচ্ছায় আমার কাছে এসেছো। তুমি ওকে বলবে যে ওর মতো বিকৃত মস্তিস্কের আর ক্যারেক্টারলেস লোকের সাথে থাকা তোমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি ওকে ঘৃণা করো—এই মিথ্যেটা যদি তোমার মুখ দিয়ে না বের হয়, তবে আমি এক মুহূর্ত দেরি করব না। ওর হৃদপিণ্ড আমি ছিঁড়ে ফেলব।”
মেইলস্ট্রোম ভ্যালেরিয়াকে ইশারা করল তান্বীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তান্বী যখন রুম থেকে বের হচ্ছিল, সে শেষবারের মতো স্ক্রিনে জাভিয়ানের সেই ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকাল। তার ভেতরে তখন রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। সে মনে মনে শুধু বলল— “ক্ষমা করো জাভিয়ান, তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমাকে তোমার চোখের সামনে নিজের আত্মাকে খুন করতে হবে।”

দ্বীপের আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো প্রশান্তি নেই; বরং তা এক আসন্ন ধ্বংসের পূর্বাভাস নিয়ে আসছে। মেইলস্ট্রোম তার রেইনকোটের কলারটা ঠিক করে নিয়ে তান্বীর দিকে এক স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তার হাতে থাকা ওয়াকি-টকিতে তখন উপকূল রক্ষা বাহিনীর সংকেত ভেসে আসছে।
মেইলস্ট্রোম এক অমানুষিক শান্ত গলায় বললঝ “শোনো তান্বী, তোমার জাভিয়ান এখন অলরেডি এই দ্বীপের উপকূলে পৌঁছে গেছে। হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর পা এই মাটিতে পড়বে। ও ভেবেছে মেইলস্ট্রোমের সাম্রাজ্যে ও বীরের মতো ঢুকবে, কিন্তু ও জানে না আমি নিজেই ওকে এই পর্যন্ত আসার পথ করে দিয়েছি। আমি চেয়েছিলাম ও আসুক—একদম আমার হাতের নাগালে।”

সে তান্বীর কাছে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন সাপের হিসহিসের মতো তীক্ষ্ণ।”মনে রেখো, নাটকটা ঠিক সেভাবেই হবে যেভাবে আমি স্ক্রিপ্ট লিখেছি। তুমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। ওর ওই রক্তাক্ত ঘাড় আর পাগলামি দেখে তোমার ভেতরটা ছিঁড়ে গেলেও তুমি চোখে এক ফোঁটা পানি আনতে পারবে না। তুমি সপাটে ওর মুখে বলবে যে তুমি ওকে ঘৃণা করো! তুমি বলবে—ওর মতো একটা সাইকো আর পিশাচের চেয়ে আমার মতো ক্ষমতাবান মানুষের ছায়ায় থাকা অনেক বেশি নিরাপদ। তুমি আমার কাছে স্বেচ্ছায় থাকতে চাও—এই কথাটা যেন ওর কানে তপ্ত সিসার মতো লাগে।”

তান্বী থরথর করে কাঁপছিল। তার ঠোঁট দুটো নীল হয়ে গেছে আতঙ্কে। মেইলস্ট্রোম তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট রিমোট বের করে দেখাল। “যদি তোমার গলায় সামান্যতম কাঁপুনি আমি দেখি, তবে আমার স্নাইপারের ট্রিগার এক সেকেন্ডও দেরি করবে না। জাভিয়ানকে যদি জ্যান্ত ফেরত পাঠাতে চাও, তবে আজ ওর হৃদয়টা তোমাকে পাথর দিয়ে থেঁতলে দিতে হবে। ও যেন এই দ্বীপ থেকে তোমার ভালোবাসা নয়, বরং চরম ঘৃণা নিয়ে ফিরে যায়। তুমি কি পারবে নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতে তাকে মানসিকভাবে খুন করতে?আমি জাভিয়ানের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী তান্বী। ও খেলে পেশিশক্তি দিয়ে, আর আমি খেলি মানুষের ভাগ্য নিয়ে।”

তান্বী কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু অঝোরে জল ঝরছে তার চোখ দিয়ে। সে বুঝতে পারছে, জাভিয়ান তার জন্য নরক পার হয়ে এসেছে, অথচ তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে বিষাক্ত এক মিথ্যে দিয়ে।
মেইলস্ট্রোম ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকিয়ে আদেশ দিল, “যা,ওকে তৈরি কর। জাভিয়ানের জাহাজ ভিড়ছে। আমি চাই জাভিয়ান যখন ওর সামনে দাঁড়াবে, তখন যেন সে এক অন্য তান্বীকে দেখে যে তান্বী এখন মেইলস্ট্রোমের অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।”

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৪

মেইলস্ট্রোম রুম থেকে বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকাল।”মনে রেখো তান্বী, তোমার এক ফোঁটা ভালোবাসা জাভিয়ানের মৃত্যু নিশ্চিত করবে। যদি ওকে জ্যান্ত ফেরত পাঠাতে চাও, তবে আজ তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর অভিনয়টা করতে হবে।”

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৫