Home ডেসটেনি ডেসটেনি সারপ্রাইস পর্ব

ডেসটেনি সারপ্রাইস পর্ব

ডেসটেনি সারপ্রাইস পর্ব
সুহাসিনি মিমি

নিশির আকাশজুড়ে নিরন্তর ভেসে বেড়াচ্ছে ঘন ঘন মেঘের আস্তরণ।থেকে থেকে ভেসে আসছে কুকুরের ক্ষীণ স্বর। কখনো সখনো বিদ্যুতের ঝলকানিতে মেতে উঠছে পুরো ধরণী। নিমেষেই আবার চারপাশ গ্রাস করছে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

ঘুটঘুটে সেই অন্ধকারে ডুবে থাকা সিদ্দিক কুঞ্জের ছাদটার এক কোণে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃসঙ্গ মানব। কালো টি-শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে বারবার উড়ে গিয়ে পড়ছে কপালের উপর।ডান হাতটা সাদা বেন্ডেজে মোড়ে থাকলেও মানবের বাম হাতে জ্বলজ্বল করছে জ্বলন্ত সিগরেট।
সিগারেটের প্রতি কখনোই বিশেষ আসক্তি ছিল না তার। প্রয়োজন ছাড়া এই জিনিসটাকে ছুঁয়েও দেখত না। দায়িত্ব আর শৃঙ্খলাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ। তবে দীর্ঘ কোনো মিশনের সময় যখন চাপ অসহনীয় হয়ে উঠত, কিংবা টানা ব্যস্ততায় নিজেকে সামলানোর অবকাশ মিলত না, তখন খুব বেশি হলে এক-দুটি সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্ষণিকের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলত। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম। আজ হিসেব করে পুরো দুই প্যাকেট সিগারেট শেষ করেছে তাজধীর। ছাদের একপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য পোড়া ফিল্টার আর ছাইয়ের স্তূপ। চেয়েছিল সিগারেটের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটাকেও পুড়িয়ে ফেলতে, অথচ তাতেও কোনো লাভ হয়নি। আজ ধোঁয়ার স্বাদও কেমন যেন তেতো, বিদঘুটে ঠেকছে। তাজধীর মাথা তুলে তাকাল আকাশের দিকে।বড্ড অস্থির লাগছে। অদ্ভুত ভারে জমে আছে ভিতরটা। বুঁকের ভিতর বিশাল ভারী কোনো পাথর শক্ত করে চেপে ধরে আছে যেন কেউ। বেন্ডেজ করা হাততার দিকে তাকালো তাজধীর একবার। কাপড়ের নিচে এখনো জ্বালা করছে ক্ষতস্থানটা।

তখন স্টাডিরুম হতে প্রিয়ন্তী বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই নিজের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তার হাতে। দেয়ালে একের পর এক শক্ত আঘাতে ক্ষতপ্রাপ্ত হয় হাতটি। এর অবশ্য যথার্থ কারণও আছে।উত্তেজিত হওয়া, নিয়ন্ত্রণ হারানো, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া— এসব তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না।সেতো এমন ছিলনা কখনই। বছরের পর বছর কঠোর প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা আর দায়িত্ববোধ তাকে শিখিয়েছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রাখতে। তাহলে আজকাল কী হচ্ছে তার?কেন সামান্য কিছু কথাতেই ভেতরটা এভাবে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে?কেন নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না? এতো এতো প্রশ্নর ভিড়ে উত্তরহীন তাজধীর তাকালো মেঘলা খোলা আকাশের পানে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের গভীর থেকে। আজব।যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থেকেও কখনও এমন অস্বস্তি হয়নি।
অসংখ্য কঠিন মিশনে অংশ নিয়েছে। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। সহযোদ্ধার র ক্তাক্ত শরীর কাঁধে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছে। বিস্ফোরণের শব্দ, গুলির বৃষ্টি, মৃত্যুভয় কোনোটাই তাকে ভেঙে দিতে পারেনি এভাবে। অথচ,সামান্য একটা মেয়ের চোখের জল তাকে এভাবে অস্থির করে দিতে পারে, সেটা কখনো কল্পনাও করেনি। আর সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো সে জানে, প্রিয়ন্তী এখন তাকে ঘৃণা করছে। হয়তো অহংকারীও ভাবছে। নিষ্ঠুর ভাবছে। রূঢ় ভাবছে।

তাজধীর মাথা নিচু করল।বাম হাতের আঙুল দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করল ডান হাতের ব্যান্ডেজটা।
ক্ষতটা এখনও তাজা।কিন্তু আশ্চর্যভাবে হাতের ব্যথার চেয়েও বেশি পোড়াচ্ছে অন্য কিছু।অনুশোচনা, তীব্র, অসহনীয় অনুশোচনা।আকাশে আবার বিদ্যুৎ চমকাল।সাদা আলো এসে এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে গেল তার গম্ভীর মুখটা।
রাত প্রায় দুইটার দিকে ছাদ ছেড়ে নিচে নেমে এলো তাজধীর।এরপরই ল্যাপটপ নিয়ে বসে যায়। পার হয় আরো ঘন্টা খানেক। একান্ত মনোযোগে কি যেন করে যাচ্ছে একধ্যানে।
এভাবেই পার হলো তিনটার ঘর।তীক্ষ্ণ চোখে একটা পুরনো ফাইলের দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে থাকল।অনেক বছরের বেশ পুরোনো একটা ফাইল।

কোনো একটা কারণে সেটা স্থগিত হয়ে ছিল এতটা বছর। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই স্তগিত করানো হয়েছিল। চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা কাত করল তাজধীর। এরপর ফোন তুলে সোজা ফোন করল কাউকে।
নিজে কোয়াটারে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে মাঝারি আকারের টেবিলটার নিচে সাপের মতো পেঁচিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অর্ণব। পরনে একটা হাফপ্যান্ট আর অফ হোয়াইট রঙা টি শার্ট। যথারীতি যুদ্ধক্ষেত্রসদৃশ ঘুম যাকে বলে আরকি। অমন সময় কেঁপে উঠে পাশে থাকা যান্ত্রিক ডিভাইস’টা।
ফোনের বিকট শব্দে বিরক্ত হয়ে কুঁকড়ে উঠে অর্ণব।
দ্বিতীয়বার রিং বাজতেই চোখ আধখোলা করে যথারীতি রিসিভ করে কানের পাশে চেপে ধরতে ধরতে একবার নাম্বারটাও পরখ করে নিলো।স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে, “যমদূত” নামটা। অর্ণব বিরক্তিতে গজগজ করল,
“এই সালার আবার এই মাঝরাতে কোন চুলকানি উঠসে!”
কল রিসিভ কড়ে হাই তুলে বলল,

“কী রে ভাই ? রাত সাড়ে তিনটায় কার জানাজা পড়াতে ফোন দিছস?”
“ঘুমাচ্ছিলি?”
অর্ণব চোখ উল্টাল।বড্ড স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না। ভোর চারটায় উঠে যোগব্যায়াম করতেছিলাম।তারপর ভাবলাম একটু ধ্যান করি। এখন তুই ফোন দিয়ে আধ্যাত্মিকতা নষ্ট করলি।এখন বল কী হয়েছে?”
“ইডিয়েট! আমাদের পরবর্তী মিশনের আপডেট কি? ফাইল গুলো রেডি রেখেছিস?”
“ভোর সাড়ে তিনটায় মানুষের মাথায় প্রেম আসে,বউ আসে। আর তোর মাথায় আসে ফাইল! ভোর চারটায় তোর ফাইলের কথা মনে পড়ল?ভাই তুই কি ঘুমাস না?”
“আমি ফিরছি।”
“কোথায়?”
“ব্যাকে।”
মুহূর্তে ঘুম পুরোপুরি উবে গেল অর্ণবের। তাজ্জব হয়ে বলল,
“এই ভোর বেলা? সকালে আয় ভাই। বিস্বাস কর এখন একটুও উঠতে মন চাচ্ছে না। তুই বরং যেখানেই আছিস সেখানে একটু অপেক্ষা কর। ফজর হোক, সূর্য উঠুক তারপর আয়।”

“ইডিয়েট! আমি এখন আসছি না। দুইদিনের মধ্যে আসছি!”
“ওহ!”
তাজধীর আবার বলল,
“আচ্ছা শোন আমি কিছু ইনফরমেশন পাঠাচ্ছি।”
বলতে বলতে টেবিলে রাখা ল্যাপটপে কয়েকটা ফাইল ট্রান্সফার করল। ফোনে নোটিফিকেশন ভেসে উঠতেই অর্ণব খুলে দেখল।তারপর তাজধীর বলল,
“One hour. I want every single detail within one hour.”
“তুই কি বুঝতেছিস তুই কী করতে যাচ্ছিস?”
“খুব ভালোভাবেই।”
“এই কেসটা বন্ধ হয়েছিল বহু বছর আগে। ফাইল সিল করা হয়েছিল। রিপোর্ট মুছে ফেলা হয়েছিল।”
“জানি।”
“শুধু জানিস? এই কেস নিয়ে শেষবার নড়াচড়া করতে গিয়ে কী হয়েছিল ভুলে গেছিস?”
“ভুলিনি।”
“তাহলে আবার কেন?এটা কতটা রিস্কি জানিস না?”
“জানি।আমাদের লাইফে রিস্ক বলে কিছু নেই। আমরা যখন এই প্রফেশনে এসেছি তখন, সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এসেছি।”
“হেইড জানতে পারলে প্রব্লেম হবে।
“হতে দে।এন্ড সেটা হয়েছিল তোদের ফল্টে । তবে আগেরবারের মতো বোকামি তাজধীর সিদ্দিক আযান করছে না।”

“তোর নিজেরও অনেক ক্ষতি হয়ে হয়ে যেতে পারে।”
“জানি।”
“সবকিছু জেনেও কেন আগুনে ঝাঁপ দিতে চাইছিস হঠাৎ?
“তোকে যেটা করতে বলা হয়েছে সেটা কর। ৫ মিনিটস অলরেডি গণ।”
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বুঝল তাজধীর কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে।মানে আসল কারণটা বলবে না।যেমনটা সবসময় করে।অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। এক ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট পাঠাচ্ছি ।”
“গুড।নাও ডু ইট ফাস্ট!”
বলে কল কাটল তাজধীর। বন্ধ করল ল্যাপটপের শাটার। উঠে সোজা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদটাও লুকোচুরি খেলছে। দেখা দিচ্ছে না। সেই ঢেকে থাকা চাঁদের দিকে একমনে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বেশি উঠল মানব,
“ভালোবাসা জীবনে একাধিকবার এসে কড়া নাড়ে,তবে মায়া তেমন নয়।কাউকে ভালোবাসলেই যে তার মায়ায় পড়তে হবে, এমনও কোনো বিধান নেই। অথচ কারও মায়ায় পড়ে গেলে তাকে ভালোবাসা ঠিক যেন,নিয়তির অবধারিত পরিণতি। ভালোবাসার সংজ্ঞা অনুভূতি। আর মায়া! সেতো অস্তিত্ব। আপনি আমার সেই মায়া, মিস ব্লু হাফমুন। আর তাজধীর সিদ্দিক আযান কখনো নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে আপস করে না।কখনই নাহ!”
বলেই বাঁকা হাসল তাজধীর। যেই হাসির পিছনের কারণ জানা নেই কারো। বরং হাসিটা অনেকটা এমন, যেন বহুদিন ধরে মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া কোনো জটিল সমীকরণের উত্তর অবশেষে খুঁজে পেয়েছে সে।

পূর্বাকাশে উদিত হয়েছে সূর্যিমামা। ঘড়ির কাঁটা সবে ছয়টা ছুঁয়েছে মাত্র। রাতভর একফোঁটা ঘুম হয়নি তাজধীরের। ফ্রেশ হয়ে কালো একটা ট্রাউজার আর ধূসর রঙের একটি সাদামাটা টি-শার্ট পরে নিচে নেমে এলো। খুজল মা কে। না পেয়ে বাইরে বের হয়ে এলো। ফজরের নামাজ আদায় করার পর প্রায় প্রতিদিনই বাড়ির সামনের বাগানে কিছুটা সময় হাঁটাহাঁটি করেন মোহনা। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তাজধীর দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল বাগানের দিকে।
সকালের স্বর্ণালী আলোয় বাগানটার তাজা ফুলগুলো চিকচিক করছে। সেই শান্ত পরিবেশের মাঝখানেই হাতে তসবিহ নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছিলেন মোহনা। ছেলের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকালেন তিনি।
“এত সকালে উঠেছিস কেন বাবা?”
তাজধীর এসে দাঁড়াল মায়ের সম্মুখীন হয়ে। সাবলীল কণ্ঠে জানাল,
“আমাকে আজই চলে যেতে হবে, আম্মু।”
মুহূর্তেই হাসিটা মিলিয়ে গেল মোহনার। ভর করল একরাশ হতাশা। বললেন,

“আজই?”
“হুম।”
“মন খারাপ তাইনা আব্বা? মন খারাপ করিস না।
আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। হয়তো এই সম্পর্কটা তোর জন্য লেখা ছিল না।চিন্তা করিস না। তোর জন্য আমরা খুব ভালো একটা মেয়ে খুঁজে বের করব। খুব সুন্দর, খুব ভালো মনের একটা মেয়ে। যে তোকে বুঝবে, তোর যত্ন নেবে।”
উত্তরে নীরব রইল তাজধীর। বলল না কিছুই। মোহনা ছেলের ওই ফোলা ফোলা লালা লাল চোখ দুটোর দিকে চেয়ে গমগমে সরে বললেন,
“রাতে ঘুমাসনি তাইনা?”
এবারেও কোনো উত্তর করলো না ছেলে তার। মহিলা দীর্ঘশাস ফেললেন। যে ছেলে জীবনের এতগুলো বছর কোনো মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায়নি, সে প্রথমবারের মতো কাউকে পছন্দ করেছিল।এমনকি নিজে থেকে বিয়ের কথাও বলেছিল।আর আজ,সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।
মহানা বেগমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল ছেলের দিকে চেয়ে।

“আম্মু।আমার এখনই বের হতে হবে।”
অবশেষে মুখ খুলল তাজধীর।মহানা বেগম চমকে উঠলেন।
“এখনই?এই সকাল সকাল?”
“একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে আর্জেন্ট!”
“নাস্তাও করবি না?”
“রাস্তায় করে নেব।”
“তাও অন্তত আধঘণ্টা পরে যাস। আমি নাস্তা বানাতে বলি।”
তাজধীর মাথা নাড়ল।
“সময় নেই।”
“কী এমন কাজ যে নাস্তা করারও সময় নেই?কালও অন্য কথা বললি। ইচ্ছে করেই কাজের বাহানায় চলে যেতে চাচ্ছিস তাইনা?”
প্রশ্ন ছুড়ে উত্তরের আশায় ভ্রু উঁচিয়ে চেয়ে রইলেন মোহনা। ছেলে তার এবারেও নির্বাক, উত্তরহীন।তবে ছেলেটা হাবভাব দেখে বুঝলেন ছেলে তার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিবেন না । হাল ছাড়লেন অবশেষে তিনি। বললেন ফির,

ডেসটেনি পর্ব ২৭

“কতদিন লাগবে?আবার কবে আসবি?”
“হয়তো খুব শীগ্রই!”
“আচ্ছা, খেয়াল রাখিস নিজের। অন্তত ফোন দিস দিনে একবার করে।”
“চেষ্টা করবো!”

ডেসটেনি পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here