Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ১৩

তাকদীর পর্ব ১৩

তাকদীর পর্ব ১৩
নিরুর কল্পনারাজ্য

সকাল সকাল আমিরার কান্নার চোটে ঘুম ভাঙলো আয়রার। ফজরের নামাজটা আদায় করা হয়নি আজ তার। যখন ঘুম ভাঙলো তখন প্রায় সারে ছ’টা। আমিরা সেসময়ে অঝোরে কাঁদছে। প্রভাতের মিষ্টি রোদ্দুরের সাথে পক্ষীগোত্রের সুমিষ্ঠ স্বরের প্রতিধ্বনিসমূহ কর্ণকুহরে ভেসে আসছে ক্রমশ। অর্থাৎ অমানিশা কেটেছে। আমিরার ক্রন্দনে তন্দ্রায় ব্যাঘাত ঘটার ফলস্বরূপ সে উঠে বসলো ঘুম ঘুম চোখে। দু’°হাত মেলে আমিরাকে যেই-না নিজের বাহু বন্ধনে মাতৃস্নেহে জড়িয়ে নিতে যাবে অমনি আয়রার উপলব্ধি হলো—ছোট্ট সত্ত্বাটির শরীরের উষ্ণতা তুলনামূলক এবং স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক। সাথে সাথে মাতৃমন উৎকন্ঠায় ভরে উঠলো। আমিরাকে কোলে নেওয়ার পাশাপাশি তার আদলে নেমে এলো বিষাদের ছায়া। সে মিনমিন করে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কন্ঠে আওড়ালো,

— হে আল্লাহ! মেয়েটার এতো জ্বর কীভাবে হয়ে গেলো হুট করে।
অতঃপর ক্রন্দনরত আমিরার উদ্দেশ্যে সে বাক্য ছু্ঁড়লো,
— আম্মু, আম্মুজান—এইতো আম্মু এখানে। কাঁদেনা আম্মু!
সে আমিরাকে কোলে তুলে শান্ত করার চেষ্টায় নিমঘ্ন হলো। আমিরা বহুক্ষণ যাবৎ কাঁদছে। যার দরুণ তার নরম কায়ার ফর্সা গালদুটো ইতোমধ্যে ছেয়ে গিয়েছে লাল আভার আস্তরণের ভাঁজে। নাকের পাটাতন হয়েছে রক্তিম। চোখদুটোর অবস্থাও নাজেহাল। এমতাবস্থায় আয়রার নজর গেলো পাশেই মেঝেতে গুটিয়ে থাকা জুনায়েদোর পানে। ধবধবে বিছানার উপরিভাগে মাথা নুয়িয়ে বিভোর নিদ্রায় মগ্ন। কেশরাশি কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে কপালের আশেপাশে উপচে পড়েছে। মাথার নিচে দু’হাত গোটানো। গাম্ভীর্যতায় ভরপুর আদলে আদুরে আদুরে ভাব। বুজে রাখা আঁখিদ্বয়ের দীর্ঘ এবং গন পল্লবদ্বয়। আয়রা আশ্চর্য হলো। দাম্ভিক এই পুরুষ এভাবে মেঝেতে লুটিয়ে কেনো পড়ে রয়েছে? তার কপালে ভাঁজ পড়লো। সে হাত দুলিয়ে আমিরাকে শান্ত করতে করতে একঝলক জুনায়েদের সুশ্রী মুখপানে নজর নিবিষ্ট করলো বিস্মিত চিত্তে, যেনো সে উদঘাটন করতে চায়ছে এমন বখে যাওয়া পুরুষের হঠাৎ মেঝেতে শুয়ে থাকার রহস্য। আমিরার ক্রন্দনের চিকন-বাচ্চামো সুর ইতোমধ্যেই জুনায়েদ কর্ণ ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে গিয়েছে যা আপাতত তার প্রতিটি নিউরনকে জাগ্রত করছে। ফলস্বরূপ তার কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলো মুহূর্তের মাঝেই। আদো আদো নীল মণি দুটো খোঁজার চেষ্টা করলো এমন ফ্যাঁচফ্যাঁচ বাচ্চার কান্নার উৎস। জুনায়েদকে জাগ্রত হতে দেখামাত্রই নজর ঘোরালো আয়রা। পাছে যদি চোখাচোখি হয়ে যায়? যদি ভাবে সে জুনায়েদের পানে চেয়ে ছিলো? জুনায়েদ অনবরত কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ উদ্ভাবন করলো আমিরার কথা। মুহূর্তেই মস্তিষ্ক তার সজাগ হলো সম্পূর্ণরূপে। অতিসত্বর সে উঠে গেলো। হাঁটুর ওপর ভার রেখে সটান হয়ে জুনায়েদ ক্ষীপ্র গতিতে উদ্বেগ ভরা কন্ঠে শুধালো,

— কী…কী হয়েছে? কাঁদছে কেনো ও এভাবে?
আয়রা আমিরাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে নিতে প্রত্যুত্তর করলো নিম্ন কন্ঠে,
— জ্বর উঠেছে।
— জ্বর?
জুনায়েদের কপালটি কুঁচকে গেলো। ভ্রুকুটি করে সে দ্বিধান্বিত স্বরে প্রশ্ন করলো,
— কীভাবে এলো?
আমিরা মনমরা স্বরে জবাবে বললো,
— জানিনা, সম্ভবত অতিরিক্ত কান্নার ফলে। আমিরার শরীর একদম-ই কান্না সহ্য করতে পারেনা। অতিরিক্ত কাঁদলেই জ্বর চলে আসে।
আমিরা এবার দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখলো। সারে ছ’টা পার হয়ে গিয়েছে। হতাশ হলো সে। নামাজটা পড়া হলোনা আজ। ইশ! আয়রা অপারগ হয়ে উঠে দাঁড়ালো। আমিরাকে কোলে নিয়ে সারা কক্ষময় পায়চারি করা আরম্ভ করে দিলো। তাতেও কাজ হলোনা। সাধারণত বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখে তাদের ছোট দেহ অনেকটা নাজুক হয়ে ওঠে; ফলস্বরূপ তারা সারাক্ষণ-ই খিটখিটে হয়ে থাকে। ব্যতিক্রময় নয় আমিরাও। অন্যান্য সকল অসুখে তাকে শান্ত রাখা গেলেও জ্বরের ঘোরে আমিরাকে শান্ত করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। জুনায়েদ আমিরার কান্না দেখে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। শুধালো বড্ড চিন্তিত স্বরে,

— আমি কী ডক্টরকে কল করবো? জ্বর কতটুকু এসেছে? শ্যুড উই নিড টু গো টু দ্যা হসপিটাল?
আয়রা তখন আমিরাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিঠে চাপড় মারছে হালকা স্পর্শে। সে নিজের নিম্ন স্বর কিছুটা উঁচিয়ে জুনায়েদের উদ্দেশ্যে জানান দিলো,
— কিছুই শুনতে পাচ্ছিনা। একটু জোরে বলুন।
জুনায়েদ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হলো। সে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে রওনা হলো। আয়রা তার পানে একপলক আড়চোখে তাকালো। তবে পলক ঝাপটানোর পূর্বেই জুনায়েদ এসে হাজির হলো আয়রার সম্মুখে। আয়রার পথ রুখে দাঁড়ানোতে আয়রা দ্বিধান্বিত আদলে নজর উঁচিয়ে চেয়ে রইলো জুনায়েদের পানে। জুনায়েদ মুখভঙ্গির কোনোরূপ পরিবর্তন বিহীন পুরুষ্ঠ দু’হাত এগিয়ে মেলে ধরলো আয়রার পানে। আমিরা ফুঁপিয়ে ফু্ঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। বেশিই খারাপ লাগছে নিশ্চয় বাচ্চাটার। আয়রাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুনায়েদ আয়রার পানে ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় বোঝালো, ‘ওকে হাতে দাও।’ আয়রা তা বুঝতে পেরে জবাব দিলো,
— থাক, আমি পারবো সামলাতে। কিছুক্ষণ পর থেমে যাবে। আপনার খামোকা কষ্ট করতে হবেনা।
জুনায়েদ ফিরতি কেমন অনুনয়ে ভরা কন্ঠে বলে,

— একটু দাও, প্লিজ! আই সোয়্যার, আই ওন্ট মেইক হার ক্রাই মোর। শুধু একটু ওকে বুকে জড়াতে দাও। ওর কান্না আমার সহ্য হচ্ছেনা। খারাপ লাগছে আমার খুব, বিলিভ মি।
দাপুটে; গম্ভীরতার মোড়কে আবিষ্ট বখাটে পুরুষ–যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ারের এমন অনুনয়ে ভড়কে গেলো রমণী৷ সে তো বাস্তবেই রয়েছে। তবে এমন অষ্টম আশ্চর্যের ন্যায় কাণ্ড কীভাবে ঘটে যেতে পারে? জুনায়েদ শাহরিয়ার অনুরোধ করছে? তাও আবার এতোটা অসহায় ভঙ্গিতে। সে হতবাক না হয়ে পারে না। বাধ্যগত সে আমিরাকে জুনায়েদের কোলে তুলে দিলো। জুনায়েদ ধীরলয়ে; ভীষণ যত্নে পাঁজাকোলে তুলে নিলো আমিরাকে। হাঁটতে হাঁটতে সে এদিক ওদিক ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করলো। জুনায়েদ কোলে নেওয়ার কিছুমুহূর্ত মাঝেই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে গেলো। আয়রার কোলেও যে মেয়ে এতক্ষণ কাঁদছিলো সে মেয়ে এখন জুনায়েদের কোলে উঠে শান্ত হয়ে গেলো! আয়রার কাছে এ-যেনো অবিশ্বাস্য কিছুই। কেননা মেয়ে তার জ্বরের ঘোরে অনবরত ঘন্টার পর ঘন্টা অব্দি কেঁদেছে; এমনও হয়েছে আয়রা একবেলা খেতে পারেনি সেই ছোট্ট; নাজুক তনুখানা কেবল মায়ের সান্নিধ্যে পড়েছিলো অসহায় হয়ে তাই। অথচ এই মুহূর্তে আমিরা সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে মাথা হেলিয়ে পড়ে আছে জুনায়েদের বুকে! জুনায়েদ ধীরে ধীরে তাকে কোলে তুলে পায়চারি করছে সারাঘরময়। এভাবেই কিছুসময় পর আমিরা সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে পড়লো। এতে জুনায়েদ কিছুটা স্বস্তি পেলো যেনো। জ্বরের উত্তাপের দরুণ ছোট্ট তনুখানা স্পর্শ করা দায়! ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে হবে শীঘ্রই। সে চিন্তিত আদলে অনেককিছুর-ই হিসেব কষে ফেললো একত্রে। আমিরাকে নিয়ে পায়চারি করতে করতেই হঠাৎ আয়রার কথা মনে হলো তার। সে আয়রার পানে নজর ঘুরিয়ে তাকালো, কপাল কুঁচকে কিছু একটা ভেবে চিরায়ত পৌরুষদীপ্ত কন্ঠে আওড়ালো,

— এই মেয়ে, যাও। ফ্রেশ হয়ে এসো। ও উঠলে আর যেতে পারবেনা বোধহয়।
আয়রা এতক্ষণ শান্ত চোখে তাদের পানে চেয়ে রইলেও টনক নড়লো তার জুনায়েদের কন্ঠে। সে স্বীয় ঘোর হতে বেরিয়ে জবাব দিলো,
— উঠে গেলে মাঝপথে? সামলাতে পারবেন?
জুনায়েদের কপাল আরও খানিকটা কুঁচকে উঠলো। একবার বুকের মাঝে গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে থাকা মেয়েটার পানে চেয়ে দেখলো। লোচনে তার ভীষণ মায়া যা অসীম সমুদ্দুরকেও হারাতে সক্ষম। সে পুরুষটি বাচ্চা মেয়েটার দীর্ঘপল্লববিশিষ্ট আঁখিদ্বয়ের ওপর নজর নিবিষ্ট করে কেমন আদুরে কন্ঠে বলে ওঠে,
— অন্তত আমার বুক থেকে উঠবেনা!

এমন উত্তর আশানুরূপ ছিলোনা মোটেই আয়রার নিকট। সে কিছুটা হতবাক হলো। পরক্ষণেই অগোচরে নিজের হাসিটুকু বিসর্জন দিলো। অজান্তেই হেসে ফেললো সে। জুনায়েদ অবশ্য কথাটি মন্দ বলেনি। এই মুহূর্তে যদি ফ্রেশ হয়ে আসা না হয় পরে হয়তো সে আর যাওয়ার সুযোগটুকুও পাবেনা। আয়রা জুনায়েদের কথামতো ওয়াশরুমের পানে এগোয়। খোলা এলোমেলো কুন্তলবৃন্দ সাদা ওড়নার ভেতরে আড়াল করে সে আরও গভীরভাবে। কদম আগিয়ে নিজের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে পা চালায়। অথচ মাঝপথেই ঘটে এক বিপত্তি। হঠাৎ করেই শুকনো মেঝেতেই পিছলা খেয়ে বসে রমণী। সৌভাগ্যবশত, সেসময় জুনায়েদ নামক পুরুষটি সেই এক-ই স্থানেই উপস্থিত ছিলো। যার দরুণ বলিষ্ঠ দেহের পুরুষটি সহজেই নিজের পেশিবহুল হস্তের দ্বারা পড়ে যেতে চাওয়া রমণীটিকে সন্তপর্ণে আগলে নেয়। আছড়ে পড়ে তার দীর্ঘদেহী এবং শক্তপোক্ত বুকটাতে। একহাতে মেয়েকে সামলে এবং অন্য হাতে স্ত্রীকে নিয়ে মিশিয়ে রাখে বুকের মাঝে। বুকের একপাশে সন্তান এবং অন্যপাশে স্ত্রী! অকস্মাৎ মোটেও না হাসা পুরুষটির ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো অট্টহাসির শব্দ। হাসির তোড়ে বুক কাঁপছে তার। চোখ বুজে রাখা আয়রা তা ঠাহর করতে পেরে ধীরলয়ে চোখ মেলার চেষ্টা করলো সে। এতক্ষণ যেনো জান যায় যায় অবস্থা। আদলে তার ভয়ের অস্পষ্ট এক ছাপ। নিজেকে জুনায়েূের বক্ষে আবিষ্কার করে সে হতবাক হলো। জুনায়েদের হাস্যরত আদলের পানে তাকিয়ে সে বোকা বোকা চেহারায় চেয়ে রইলো। ভীষণ লজ্জাও পেলো। কী ভাববে এখন জুনায়েদ তার ব্যাপারে? নিশ্চয় ভাবে—আয়রা সাধারণভাবে চলতেও জানেনা। আয়রাকে অমনভাবে চেয়ে থাকতে দেখে জুনায়েদ হাসি থামিয়ে বললো,

— মা-মেয়ের দেখছি আমার বুকটা বেশ পছন্দ হয়েছে! একজন জ্বরের ঘোরে বুকের মাঝে পড়ে রয়েছে আরেকজন পিছলা খেয়ে সোজা এসে আমার বুকের উপরেই পড়েছে!
সঙ্গে সঙ্গেই লাজে রাঙা হয়ে উঠলো আয়রার মুখাখানা। সে জুনায়েদ বক্ষস্থল হতে নিজেকে ছাড়িয়ে অদূরে গিয়ে দাঁড়ালো। এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে জবাবে বললো,
— আমম..এইখানটা…কেমন যেনো পিচ্ছিল ছিলো। আমি দ্রুতই ফ্রেশ হয়ে আসছি।
জুনায়েদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আয়রা একপ্রকার পালিয়ে গেলো। ইশ! কী বিব্রতকর মুহূর্ত। এটা মোটেই আশায় ছিলোনা তার। অথচ আয়রা শুনতে পেলোনা উন্মাদ; বেপরোয়া পুরুষটির তার যাওয়ার পথের নজর নিবিষ্ঠ রেখে নিম্নকন্ঠে বলা শব্দগুলো,
— বুকে এসে পড়েছে তো পড়েছেই; একেবারে বুকের ভেতরে গেড়ে গিয়ে বসেছে।
জুনায়েদ আনমনে হাসে। অতঃপর পুনরায় নিজেকে গম্ভীরতার আড়ালে ঢেকে নেয়।

সবে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে আয়রা ওয়াশরুম হতে। মুখখানাতে এখনও মুক্তঝরার ন্যায় অবশিষ্ট পানির কণাসমূহ ঝলমল করছে। সে আশেপাশে নজর বোলাতেই চমকে উঠলো। আশেপাশে কেওই নেই। জুনায়েদ আবার কোথায় গেলো? আয়রা চারপাশে তাকে দেখলোনা। কপালে ভাঁজ পড়লো তার। বাহিরে গিয়েছে হয়তো। আয়রা দ্রুতপদে হাত মুছতে থাকা ভেজা টাওয়ালটি নিয়ে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেলো। বাহিরটা আপাতত সম্পূর্ণ উত্তপ্ত। কড়ারৌদ্রের উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ধরণীতে। প্রভাতের অধিক সময় না গড়ালেও সকালের মিষ্টি রোদ্দুর দেবে গিয়ে ধীরে ধীরে তা পরিণত হচ্ছে উষ্ণতায়। সে বেলকনিতে গিয়ে টাওয়ালটি ছড়িয়ে দেওয়ার পূর্বেই রমণীর নজর গেলো নিচে থাকা পুরুষটির পানে। রৌদ্রত্তাপে পুরুষটির অতিফর্সা শরীর চিকচিক করছে মরুভূমির বালুকণার ন্যায় অথবা অন্ধকার আকাশের তারকারাজির ন্যায়।কোলে তার একটি বাচ্চা যার পরনে হাতকাটা আকাশী রঙের একটি ফ্রগ। পুরুষটির ঘামে চিকচিক করা গর্দান হতে শীতল ধারার স্রোত বয়ে চলেছে। তবু সে ওই কড়া রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে। জুনায়েদের বেলকনির দিকটা হতে শাহরিয়ার কুঞ্জের ব্যাকইয়ার্ড অথবা বাগানসাইডটি সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। অনায়াসোই ফুলে ভরা বড় বাগানটি পর্যবেক্ষণ করা যায়। আয়রা খানিকটাসময় থম মেরে চেয়ে রইলো তাদের পানে। হাসি ফুঁটলো গোটানো অধরযুগলের কিনারায়। মনে মনে আওড়ালো,

— উঁহু! আপনি ততটাও খারাপ নন যতটা আমার ধারণাতে ছিলো, বখাটে পুরুষ!
সে এসবের জন্য এক এবং একমাত্র খোদাতায়ালার নিকট শোকর করলো। পৃথিবীর যা কিছু রটে এবং ঘটে তা তার কারণেই। আয়রার জীবনের সকল পরিবর্তনও এই নিয়মের ব্যতিক্রমে নয়। জীবনের প্রতিটি স্তরে সকল বান্দার উচিত আল্লাহতায়াল নিকট শুকরিয়া করা। এটি আয়রা ভীষণভাবে মানে। সেই হিসেবে ধরেই সে মিনমিনে আওড়ালো,
— শোকর আল্লাহ!
অতঃপর টাওয়ালটি শুকোতে দিয়ে বেরিয়ে আসলো সে বিশাল বিলাসবহুল কক্ষটি হতে। ধীর পদক্ষেপে নিচে ড্রইংরুমে নেমে এলো। আসামাত্রই ডাইনিং টেবিলে দেখা মিললো সৈয়দ রুহানির। সে ব্রেকফাস্ট সারছে। সামনেই এহমাদ শাহরিয়ার। আয়রা নিজের মাথার কাপড় ভালোভাবে গুটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। ডাইনিং এর কাছাকাছি এগোতেই সে সালাম দিলো শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে,

— আসসালামু আলাইকুম, আব্বু। আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।
এহমাদ শাহরিয়ার মুচকি হেসে পাউরুটিতে জ্যাম লাগাতে লাগাতে জবাব দিলেন,
— ওয়ালাইকুম আসসালাম, আম্মু।
সৈয়দ রুহানি হাস্যজ্জ্বল মুখে সালামের ফিরতি জবান দিলেন,
— ওয়ালাইকুম আসসালাম, আয়রা।
তিনি আরও যোগ করলেন,
— এসো, পাশে এসে বসো।
আয়রা আমতা আমতা করলো খানিকটা। দোটানায় পড়ে অবশেষে বলেই ফেললো,
— আম্মু, আমিরার খানিকটা জ্বর হয়েছে তাই একটু আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে। দুপুরের রান্নাটুকু আমি সরাসরিই সেরে ফেলবো।
শাহরিয়ার কুঞ্জে তেমন কোনো সার্ভেন্ট রাখা নেই বাকিদের মতো। সৈয়দ রুহানি এবং এহমাদ শাহরিয়ার উভয়েই নিজের কাজ নিজে করে খাওয়াকে অধিক প্রাধান্য দেন। যতদিন দেহে শক্তি আছে ততদিন অন্যের ওপর নির্ভর হয়ে কী লাভ! সৈয়দ রুহানি পাউরুটি মুখে দিতে জবাবে বললেন,

— পাশে এসে বসো। আমরা কী কৈফিয়ত চেয়েছি? দুপুরের রান্না তুমি একা করবে কেনো? আমরা একসাথে করবো। এখন এসো, নাস্তা করবে। আমিরা তো জুনায়েদের কাছে। এই সুযোগে নাস্তা করে যাও।
আয়রা কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। ফের আমতা আমতা করে জবাব দিলো,
— মানে..আম্মু….উনিসহ আসুক। আমিরাকেও খাওয়ানো হয়নি। তাই..আপনারা নাস্তা করে নিন। আমি তােদর জন্য অপেক্ষা করছি।
সৈয়দ রুহানি এবং এহমাদ শাহরিয়ার খাওয়া থামিয়ে দিলেন। একে অপরের পানে তাকালেন সরাসরি। চোখাচোখি হতেই মুখ টিপে অগোচরে হাসলেন দুজন-ই। সৈয়দ রুহানি তা লুকিয়ে নরম সুরে জবাবে বললেন,
— আচ্ছা, ঠিক আছে!

কিছুক্ষণের মাঝেই সেখানে জুনায়েদ এসে হাজির হলো। ঘেমে নেয়ে বাজে অবস্থা। আমিরার জ্বরের জন্য অবশ্য রোদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো খানিকক্ষণ। তবে এমন অবস্থা হবে জানা ছিলোনা। আমিরা তখন তার ঘাড়ে। জ্বর বোধহয় কিছুটা কমেছে। জেগে আছে বাচ্চাটা। চোখদুটো খুলে রাখা। নেতিয়ে গিয়েছে কেমন যেনো। জুনায়েদ আসতেইন সৈয়দ রুহানি এবং এহমাদ শাহরিয়ার উঠে গেলেন কায়দা করে। ছেলে-মেয়ে দুটোকে একা রাখাটা অনুচিত হবেনা। সদ্য বিয়ে করেছে। অবশ্যই তাদের স্পেইস দেওয়াটা জরুরি।
তারা উঠে সিঁড়ির দিকে অর্থাৎ দোতলার দিকে এগিয়ে গেলেন। যেতে যেতে এহমাদ শাহরিয়ার শুধালেন,
— কী বুঝলে?
সৈয়দ রুহানি মৃদু হেসে জবাবে বললেন,

— বুঝলাম, ছেলে আপনার মতোই হয়েছে।
— আমার মতো? মোটেই না। আমি আমার স্ত্রীকে যথেষ্ট ভালোবাসি।
সৈয়দ রুহানি বোধহয় কপাল চাপড়ালেন। বললেন,
— গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় এমন কথা? বুড়ো বয়সে আপনার ভিমরতি আর গেলোনা।
এহমাদ শাহরিয়ার নিঃশব্দে হাসলেন। জবাব দিলেন না। সৈয়দ রুহানি ফের বললেন,

তাকদীর পর্ব ১২

— জুনায়েদ বাচ্চা পছন্দ করে না। অথচ এখন দেখুন। সব-ই খোদার রহমত!
— তা-যা বলেছো। আয়রার মতো মেয়েটার জীবন নষ্ট হবে ভেবেছিলাম।
— আমিও তাই ভেবেছিলাম কিছুটা। তবে ভাগ্যের রেখা দেখুন। আয়রাকে আমার ছেলের জন্য পছন্দ করেছিলাম অথচ তখন সে বিবাহিত ছিলো অথচ এখন সে আমার বাড়ির বউ।
— খোদার খেল সব-ই, বুঝলে তো বিবিজান!
সৈয়দ রুহানি নিঃশব্দে হাসলেন।

তাকদীর পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here