Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৬

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৬

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৬
রাফিয়া জান্নাত রিফা

বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক আমগাছ।
ওই গাছের টকিতে বসে আছে গ্রামের চিরচেনা মুখ সুন্দর।
দাঁতে দাঁত ঘষে খিড়ল খিড়ল আওয়াজ তুলছে সে।
পরে আছে পুরনো এক চেক চেক লুঙ্গি আর বিবর্ণ গেঞ্জি।
কাঁধের একপাশ বেয়ে নেমে এসেছে গামছা।কোমরে হাত চেপে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিড়ল করছে
চোখে-মুখে একরাশ ভাব, যেন আকাশের নড়াচড়া করা মেঘের রহস্য ভেদ করবেই আজ।

সুন্দর,ওর কাজ একটাই চিন্তা করা।নিউটনের থেকেও বড় কিছু আবিষ্কারের স্বপ্নে বিভোর সে।গ্রামের ছেলেরা তাকে “আমাদের সুন্দর ভাই, চিন্তার নিউটন”, বলে আখ্যায়িত করে। গ্রামের সব ছেলে আইডল বলা চলে।
ওর ছোট বোন সুহানা দু’জনের ঝগড়া যেন প্রতিদিনের উৎসব।ঝগড়া থেকে শুরু, শেষে লাঠি হাতে একে অপরের পেছনে ছুটে বেড়ানো। তবুও মজার কথা হলো, কেউ কাউকে মারতে পারে না,রাগের ভেতরেও যে ভালবাসা থাকে, ওদের মধ্যে তা পরিপূর্ণ।
এই চিন্তার গভীরতা থেকে ফিরে এলো সুন্দর।গামছা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে একটু হাই তুললো।ঠিক তখনই কানে এলো এক মেয়েলি ফ্যাচফ্যাচ আওয়াজ,কান্নার মতো, আবার হাসির মতোও।ভালো করে বুঝে উঠতে পারলো না “এ কেমন স্বর”।
চোখ বড় বড় করে চারপাশে তাকিয়ে, মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,,

_কোন মাইয়া রে এই! কান্দে না হাঁসে?ভুত-পেত্নী না তো? যাই দেখি, দেখা লাগবো মেলা কথা আছে ভূতের লগে!”
এই বলে এগোতে লাগলো সেই কন্ঠ অনুসরণ করে,একটু এগোতেই দেখতে পেলে,ওপাশ ঘুরে একটি মেয়ে আম গাছে হেলান দিয়ে গুদুর গুদুর করছে,কি বলছে তা অস্পষ্ট।পিছোন দিকের মাথার চুল দেখা গেল মেয়েটার,বেশ বড় বড়,গায়ে নীল রংয়ের জামা জরিয়েছে, ওড়নার দু মাথা কাঁধ দিয়ে ঝুলছে, সুন্দর নিজের হাত দুখানাকে পিছমোড়া করে বেঁধে চলতে লাগলো সেদিকে।চোখে কৌতূহল, মনে খানিক ভয়, আর মুখে একচিলতে হাসি।ভাবল,,

_এ ভূত হইলে আজকের দিনটা ইতিহাস হইবো!
আম গাছে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে নিঝুম,হাতে একটা আম গাছের পাতা সেটাকে টুকরো টুকরো করছে আর মাটিতে ফেলছে আর সমানে বিরবির করেই যাচ্ছে,কাউকে গালি দিচ্ছে বোধহয়,নাকটাও সমানে টানছে। বিরক্তি ও লাগছে খুব।
পিছোনে একটু কাছে এলো সুন্দর হেলে হেলে দেখতে লাগলো নিঝুমকে যদিও দেখা যাচ্ছে না, সুন্দর ভয়ে সরাসরি সামনে যেতেও পারছে না যদি ভুত পেত কন্যা রুপি হয়,যতই সাহসী হোক না কেন সুন্দর?যদি মেয়ে ভুত পেত হয় তবে লুঙ্গি ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা আছে বৈকি” লুঙ্গি খুলে ইতিহাস হওয়ার ও বাকি থাকবে না কিছু”,ছি এটা কি করে হয় যতই হোক সুন্দর একজন সুদর্শন ছেলে যদিও ওতো ফর্সা নয় তাও কোন মেয়ের ভুত পেতের সামনে ইয়ে করে দিলে যথেষ্ট মানসম্মানে আঘাত লাগবে। সেভাবেই সুন্দর হেলে হেলেই দেখতে লাগলো হেলে দেখার পর্যায় এতো হেলে গেল যে শরীর ভারসাম্য বেগ হারিয়ে কোমড় কুঁজো হয়ে পড়ে যেতে ধরেও পড়লো না নিঝুমের সামনে। হঠাৎ কারো উপস্থিতিতে নিঝুম ধরফরিয়ে উঠে, সুন্দর এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল নিঝুমের সামনে, নিঝুম বুকে ফু দিচ্ছে, নিঝুম কে দেখে সুন্দরের চোখ বড় বড় হয়ে গেল,,,

__ তুমিইইই
ভাবলেশহীন মেজাজ দেখিয়ে উওর দিলো,,
__ হ্যাঁ তো।
এই তো!এই মেয়েটাইতো ,যে ছোটবেলায় একদিন সুন্দরের কোলে মুতে দিয়েছিল।শুধু কি তাই? না, একদিন তো দুইও করেছিল!সেই দুর্গন্ধে টানা তিন দিন গ্রামের পথে শরীরে বহন করে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল সুন্দরকে।কি বাজে সেই গন্ধ,ওই অভিজ্ঞতার পর থেকে আর কখনো কোনো কচি খোকা-খুকিকে কোলে নেয়নি সে।এমনকি নিজের বোন সুহানাকেও কোলে তুলতে ভয় পেত,,
“নিশ্চয়ই এই জাতেরই!” ভাবত মনে মনে।
হঠাৎ সেই স্মৃতি ঝলসে উঠতেই সুন্দর একটু পিছিয়ে গেল,
মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি রাগ, ঘৃণা আর বিস্ময়ের মিশ্রণ।নিজের নাকে হাত দিয়ে হালকা নাক সিটকালো।
মনে মনে বিরবির করে বলল,,

__এই মাইয়াডা-ই তো!আমার সুন্দর ট্রি-কোয়াটারের প্যান্টটারে নষ্ট কইরা দিছিল,হায়রে, এখন দেহি মেলা বড় হইছে, দেখতেও মেলা সুন্দরী!
নিঝুমের দৃষ্টি এখন অন্যদিকে।তবু একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো,সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরকে।চুলগুলো এলোমেলো, কপালে ঘাম জমে আছে,গামছাটা কাঁধ থেকে আধাআধি ঝুলে পড়েছে,লুঙ্গিটাও বাতাসে একটু বেশিই উড়ছে।সব মিলিয়ে এক অগোছালো চেহারা দেখে নিঝুমের মুখটা কুঁচকে গেল,চোখে-মুখে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিচু স্বরে বিরবির করে বলে,,

__কোথাও গিয়ে শান্তি নেঈ সবখানেই মশার আমদানি
কিছুই ভালো লাগে না আর!
কিছু শব্দাংশ সুন্দরের কানে এলো, মুখ কুঁচকে বলল,,,
__ তুমি কি আমারে মশা কইলা?
সুন্দরের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচিয়ে বললো নিঝুম,,
__ এটা বড় বাগান, আল্লাহর ওয়াস্তে মশা অভাব নেই,তাও যদি নিজেকে মশা মনে হয় তো কি আর করার?
সুন্দর নিঝুমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিরবির করে বলে,,
__ শালীর কথা শোনো,কি মুখ লো, ইচ্ছা করছে মুখটারে ভোঁতা কইরা দেই?
এবার সরাসরি বলে,,,

__ তা বাসায় যাও এনে তোমারে থাকতে কেডা কইছে।
নিঝুম রাগ দেখিয়ে আঙ্গুল সুন্দরের দিকে ঝাঁকিয়ে বলে,,
__ আপনি যান,অসয্য লাগছে,যান চলে যান এখান থেকে?
সুন্দর এক গাল বাকিয়ে ভেংচালো, নিঝুমের আঙ্গুলেল পানেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কিছু একটা ভেবে খপ করে নিঝুমের আঙ্গুল ধরে নিলো, নিঝুম কিছুটা জোরেই চেঁচিয়ে বললো,,
__ আঙ্গুল ধরছেন কেন? ছাড়ুন বলছি?
সুন্দর নিঝুমের কথার ভ্রুক্ষেপ ও করলো না,এবার নিঝুম হাতে গিটাটা নিজের হাতে শক্ত করে আবব্দ করে নিঝুমের আঙ্গুল গুলো সুক্ষ্ম চোখে দেখতে লাগলো,মুলত নিঝুমের এত বড় বড় নক দেখে সুন্দরের চক্ষু চড়কগাছে উঠে গেছে,অবাক হওয়া ভঙ্গিতে বলল,,

__ এইততো বড় বড় নখ,ও বাবা গো।এ কোন রাক্ষসী গা,, থুক্কু রাক্ষুসী না শাকচুন্নী।এ কোন শাকচুন্নী গা???
নিঝুম এক ঝটকায় নিজের হাতটাকে ছাড়িয়ে নিলো বললো,,
__ হাউ ডেয়ার ইউ।
সুন্দর হো হো করে আকাশ পানে তাকিয়ে হেসে বললো,,
__ ওহ আই ডেয়ার এ লট মোর দ্যান দ্যাট। শাকচুন্নী আবার ইংরেজি ও পারে হো হো হাউ ফানি?
__ আপনি আমাকে শাকচুন্নী বলেন কোন সাহসে?
__ রিলেক্স, শাকচুন্নী নও তুমি,তাহলে এহন এই বড় বড় নখের সারসংক্ষেপে আসি?
__ আমার নখের কোন সারসংক্ষেপ লাগবে না?
__ লাগবো লাগবো,আগে শুইনা লও।
নিঝুম মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকালো, সুন্দর বললো,,

__ শুনো মেয়ে,দীর্ঘ নখ জীবাণু জমা, সংক্রমণ, আঘাত এবং আঙ্গুলের কার্যকারিতাহ্রাসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।সব থেকে বড় কথা এমন বড় নখ দ্বারা খুন হওয়ার আশঙ্কা সব থেকে অত্যধিক হস্তমৈথুন।
নিঝুমের বিরক্তি রাগ চরম পর্যায়ে নৈকট্য করলো এবার,বেশ রাগ দেখিয়ে সুন্দরের কথার প্রত্যুত্তরে বলল,,
__ তাহলে আপনাকেই খুন করতে চাই?
নিঝুমের এমন কথা শুনে দু পা পিছিয়ে গেল সুন্দর, ভয়ার্ত কন্ঠে ব্যঙ্গ করে দুহাত জোর করে বলল,,
__ ক্ষমা করো আপন শালির নিজের বোন আমার,আমি কেবল মশার সাথে ঝামেলা করি, তোমার নখের সাথে না?
নিঝুম মুখ কুঁচকে নিলো, হঠাৎ নিঝুমে চোখ সুন্দর পেটের দিকে অর্থাৎ নিচের দিকে এলো,গরম লাগার ফলে হয়তো গেন্জিটাকে পেটের উপরে তুলে রেখেছে সুন্দর,নাভি দৃশ্যমান এখন কথা হলো লুঙ্গি বিপদসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে,এ ব্যপারে সুন্দর অবগত নয় টের ও পায়নি, কিন্তু নিঝুমের চোখে পড়লোই সে দৃশ্য, অবিলম্বে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিরেট স্বরে বলল,,

__ সামান্য লুঙ্গি সামলাতে পারে না,আইছে আমার নখের সারসংক্ষেপ দিতে?
সুন্দর কান অব্দি পরিষ্কারভাবেই কথা খানা পোছালো, লুঙ্গির নিচের দিকে তাকালো,আসলেই লুঙ্গি বিপদসীমার বাইরে, যদিও জাঙ্গিয়া আছে, তবুও লুঙ্গি খুলে পড়লে আর এক বিপদ হবে, কারণ জাঙ্গিয়ার অনেক জায়গায় ছিড়া ফাটা আছে,এই মেয়ে দেখতে পেল তখন নিশ্চয়ই মনে মনে বলবে,, সামান্য একটা জাঙ্গিয়া কেনার টাকাও পায় না” এতে সুন্দরকে গরিব উপাধি পেতে হবে, কিন্তু সুন্দর তো গরিব না।
জাঙ্গিয়া কেনার জন্য প্রতিদিন মার্কেটে য়ায কিন্তু প্রতিদিনই সব দোকানে কোন না কোন মেয়ে থাকবেই।এখন কথা হচ্ছে ওই সব ছেমড়ির সামনে যদি সুন্দর জাঙ্গিয়া কেনে তাহলে নির্দ্বিধায় সম্মানের ফালুদা অক্ষুণ্ণ থাকে না।এবং ঠিক সেই কারণে সুন্দরর মনে আছে একটি বিশেষ “ইমেজের ব্যাপার”।যা তাকে সর্বদা সতর্ক রাখে, আর একটি অদ্ভুতভাবে হাস্যরসাত্মক ভয় তৈরি করে।
নিঝুমের দিকে তাকিয়েই গেঞ্জিটাকে দাঁত দিয়ে কামড়ে নিয়ে, লুঙ্গি তুলে গিঁট বেঁধে নিলো।
নিঝুম সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না গদগদ পায়ে স্থান ত্যাগ করলো। সুন্দর এবার নিঝুমের যাওয়ার পানে তাকিয়ে কোমড় দুলানো দেখে বিরবির করলো,,

__হায় বাবা, এ কেমন যুদ্ধাস্ত্র!তার কোমর দুলানোর সাথে আমার মাথা ঘোরা এই এটাচমেন্ট টা পরিষ্কার হলো না।
সুন্দরের লুঙ্গিটা আবার একটু ডিস্টার্ব দিলো,হাত দিয়ে গিঁটটারে ধরে, বিরক্তির সহিত বললো,,
__কি চাংগে উইঠতে চায় এই বালডা,বালডা খালি মাইয়া মানুষ দেখলেই খুলতে চায়,বাল বোঝোছ না কেন জাঙ্গিয়া ফাঁটা,চিড়া, কতবার কমু?লজ্জা ভয়ে তালি দিতে পাই না।
আবার নিঝুমে পানে তাকিয়ে এক চিলতি হাঁসি দিয়ে বলে,,
__ ভালো লাগছে শালীর একমাত্র বোন রে, যদিও বড় বড় নখ সমস্যা নাই চালায় নিমু গা।
আকাশ পানে তাকিয়ে বলে,,
__ মাইয়াডার নামটা যেন কি?
আবার মাথা ঝাড়া দিয়ে বলে,,
__ দুর বাল কি হোক,হোক গে,ওয় আমার একমাত্র শালীর আপন বোন।

তালুকদার মঞ্জিলের বাগানে আসতে, কোথ থেকে যেন সুহানার এসেই জরিয়ে ধরলো ইতি, বিথী, নীধিকে।, সুহানাকে পেয়ে সেই কি নাচানাচি হলো, সুহানা ও ইতি, বিথী, নীধিকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে,।তিন জন থেকে চারজন হলো দল আরো ভারি হলো।সে কি অবিস্মরণীয় সঙ্গম তাদের মধ্যে।এক এক করে তিনজনেরই সাথে গাঢ় ভাবে জরিয়ে ধরল সুহানা।ইতি তো বেশ অভিমান নিয়েই বলল,,
__ মরার মতো পড়ে ঘুমাস??
সুহানা ও অভিমান করে বলে,,
__ তোরা আইছিচ ও আমি ভালা কইরাই জানি, ইচ্ছা করেই আসি নাই,তোরাও তো আমার কোন খোজই নিস নাই।
বিথী বলে,,
__ বাদ দে ওসব,এখন বল কি অবস্থা তোর?
__ ভালোই?
নিধি বলে,,,
__ এবার কিন্তু আমাদের সাথে আমাদের বাড়ি যাবিই যাবি?
সুহানা নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দিলো,,
__ হ্যাঁ,বাবাকে বলেছি,বাবাও সম্মতি জানিয়েছে।
ইতি বলে,,
__ চল ঘরে যাই,খুব খিদে পেয়েছে?
তিনজনই আর সেখানে দাড়ালো না, চারজনেই দ্রুতপায়ে মঞ্জিলের ভিতরে প্রবেশ করলো।

পরের দিন সকাল~~~
আজই গ্রামে বড় মেলা টি বসেছে, যার নাম “বৈরাগী মেলা”। মেলার আয়োজন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং মনমুগ্ধকর হয়।এই মেলাকে বিশেষ করে তুলেছে মেলার অদ্বিতীয় ঐতিহ্য পুরুষরা লুঙ্গি ও শার্টে সজ্জিত হয়, আর নারীরা শাড়ির অপার সৌন্দর্যে রাঙিয়ে তুলে নিজেদের। এই রঙিন ছটায়ই মেলার আনন্দ চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে।এ কারণেই এ মেলা কদর বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় প্রতি বছর অনেক বিদেশী মানুষের আগমন ঘটে।
একটি বড় রুমে আলবান ও আর্দ্র,দির্শক বসে আছে। তালুকদার মঞ্জিলে অনেক বড় হলোও এত সংখ্যক লোকের জন্য একটি করে রুম দেওয়া সম্ভব নয়।
এটি কিছুটা সঙ্কীর্ণ মনে হলেও, মেলার হুলস্থূল ও আনন্দের মাঝেও তাদের আরাম আছে।আলবান,আর্দ্র, বহু বছর পর, আবারও এ মেলায় উপস্থিত মনে মনে অনেক খুশি দুজনেই অজানা খুশির উচ্ছ্বাস জাগছে। যদিও মুখ ভঙ্গিতে তার ছিটেফোঁটাও নেই।দির্শকের কাছেও এমন মেলা একদমই নতুন।
তিনজনই ফ্রেশ হয়ে বিছানার তিন দিকে বসে আছে। নিশ্চিন্ত কিনা তাও বোঝার উপায় নেই,দির্শক ফোন এক্সেল করছে, আর্দ্র ল্যাপটপ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে,আলবান ও ল্যাপটপে VPN সার্ভারের কোন কাজে ব্যস্ত।
একটু আগে মা আলিফা বেগম লুঙ্গি ও শার্ট দিয়ে পরিধান করার হুমক দিয়ে গেছেন।একদম সাফ সাফ জানিয়ে গেছেন,

“পড়তেই হবে”
তিনজনই আর কিছুই বলেনি, কিন্তু এখন তাদের মাথায় লুঙ্গি পরার চিন্তাটাই ঘুরঘুর করছে,অবশ্য তা কেউ কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না, তিনজনের মাথায় একটাই চিন্তা লুঙ্গি পড়লে খুব বাজে দেখাবে। আর্দ্র ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে আলবানকে বলে,,
__ শালা এমন ভাবে আছিস যেনো মায়ের কথা শুনে কোন পটপরিবর্তনেরই হয় নি। লুঙ্গিটা পড়বে কে? কেমনে?আমি পড়লে খুলি যাবে এটা নিশ্চিত?
আবারো দির্শকের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ তোকে শালা বললাম না কারণ তোর বোন নেই, এমনিতেও তোর বোন থাকলেও আমার লাগতো না।তোর মুখে ও বোমা পড়ছে নাকি?
দির্শকের নির্বিকার ভঙ্গিতে খাটের গদিতে গা এলিয়ে বলে,,

__ তাহলে তোর একটা বোন আমায় দে?
আর্দ্র দির্শকে পানে তাকিয়ে বলে,,
__ বল তো আমার বোন কয়টা?
হাঁসি দিয়ে দির্শক বলে,,
__ নিধি বাদে দুইটা রাইট,?
__ ওফ কোর্স।এখন বল আলবানে বোন কয়টা?
__ মে বি তিনটাই?আরো থাকতে পারে বাট আই ডোন্ট নো?
আলবান তড়াৎ করে দির্শকের পানে তাকিয়ে বলে,,
__ আমার বোন ও দুইটা?
দির্শক বলে,,
__ কে কে?
আলবান কিছটা ইতমস্ত করে আমতা আমতা করে বলে,,
__ নিধি,বিথী। ইতিকে ওসব বোন টোন মানি না?
আর্দ্র জোরে হেসে বলে,,
__ ওতো কাহিনী করা লাগবে না বাপ আমার,মনে যে ইটিসপিটিস চলে তা ভালোই জানি?
আলবান মুখ কুঁচকে ল্যাপটপের দিকে তাকায়।
দির্শক হাসতে হাসতে আবার বলে,,
__ আর্দ্র তোর বোন কয়টা?
আর্দ্রের নিরেট জবাব,,

__ দুইটা।
__ কে কে?
__ ইতি, বিথী।নিধিকে আমি ও ওসব বোন টোন মানি না মানবো না।
আলবান এবার আর্দ্রের পানে তাকিয়ে বলে,,
__ শালা তুই আসলেই খবিস?
আলবান ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে দির্শকের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ এখন তুই বল দির্শক?
দির্শক মাথার চুল স্লাইস করতে করতে বলে,,
__ কি বলবো?
__ ওই তিনটের মধ্যে তুই বোনের চোখে কয়জনকে দেখিস।
দির্শক চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস টেনে বলে,,,
__ শুধু তিনজনরে না বিথী বাদে সব মেয়েদেরই আমি নিজের বোনের চোখে দেখি?
আর্দ্রের চোখ বড় বড় হয়ে গেল বিছানাতেই এক লাফে দির্শকের নিকটে গিয়ে বলল,,
__ তাহলে এই চলে তোর মনে,আমার আগেই মনে হয়েছিল।
দির্শক বলে,,

__ ওসব মনে টনে কি চলে তা জানি না আর্দ্র, জানতেও চাই,আর না বিথী কে চাই,চোখে যাদের যেমন দেখি সেটাই বললাম।
আলবান হাসতে হাসতে বলে,,
__ বিথী কে কেন বোনের চোখে দেখিস না?
__ ওর মধ্যে বোনের কোন গুন নেই তাই?
আলবান কিছুক্ষণ ভেবে বলে,,
__ ভালোবাসিস বিথী কে?
হঠাৎ তাচ্ছিল্যে আকারে হাসলো দির্শক,,
__ ওসব ভালোবাসা টালোবাসা আমি ডিসার্ভ করি না আলবান।,আমার জীবনটা তোদের মতো না এটা ভালো করেই জানিস,যদি তোদের মতো আমার জীবন হতো তবে হয়তো বিথীর দেখা পেতাম না।আর না চাইতাম? ভালোবাসা তো দূর?

ভালবাসা তো বিরাট মহৎ কাজ যা সবাই পারে না।যেমন আমাদের আর্দ্রকেই দেখ না সেই ছোট থেকেই নিধিকে ভালোবাসে কত যত্ন,কত সপ্ন নিধিকে নিয়ে, নির্দ্বিধায় আর্দ্র নিধির ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য, অবশ্যই আর্দ্ররই নিধির গুড লাক।যদি বলি তোর কথা তবে তুই ও অনেক আগ থেকেই ইতি কে চাস, কিন্তু তুই ই তা মানতে চাস না,ভালোবাসিস তাও মানতে চাস না, কিন্তু তাও তুই এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ এটা মানিস?আবার এটাই তোকে পীড়া দেয়। তবুও ইতিকে চাস? ধরে বেঁধে হলেও রাখতে চাস? আবার অতীতের সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য ইতিকে শাস্তি দিতে চাস,আরো কতো কি?সব কিছু মাপলে দেখা যাবে বেশিটাই তুই ইতিকেই চাস নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে,খেয়াল ও রাখতে চাস।

আর আমি?আমি কি?কে এই আমি? তোরা ছাড়া জানে কেউ?হা হা,আমি পারবো না তোদের মতো করে রাখতে? আমি এক অভিশপ্ত আগুন,যার ছোঁয়া যে পাবে তবে সে ঝলছে যাবে,এটা আবার আমার জন্য পীড়া?সেটা যদি বিথী হয় তবে সেটা আমার জন্য দগ্ধ? বিথী অন্তত সাহসী, নির্ভীক,সব কিছু জানার আগ্রহ প্রচুর,আমার ক্ষেত্রে ও তাই, ইতিমধ্যেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছেই?চাই না? লাগবে না কাউকে না?তবে হ্যাঁ “জীবনে একবার হলেও মারাত্মকভাবে কারো প্রেমে পড়তে চাই, এবং সেই মোহ নিয়েই জীবন কাটাতে চাই,জানি না কতদিন বাচবো?তাও খুব করে চাই,তবে সেটা বিথী না হোক।আই রিপিট বিথী না হোক?
দীর্ঘ ক্ষনের বলা কথা খুবই মনোযোগ সহকারে শুনলো আর্দ্র,আলবান। আর্দ্র দির্শকের কাঁধে হাত রেখে বলল,,

__ ভালোবাসিস এটা স্বীকার করতে শেখ দির্শক,তুই যা করছিস এটা অন্যায় নয়,এটা তোর প্রতিশোধ আগুন এটা অভিশপ্ত আগুন নয়।
আলবান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,,
__ দির্শক বারবার কেন ভূলে যাস বল তো আমাদের কথা,ভলো খারাপ সব সময় পাবি আমাদের, বিথী অনেক মেচিয়োড় একটা মেয়ে,তোর সত্যি জানলে ও তোকে অবশ্যই বুঝবে, বুঝতে বাধ্য,তুই তোর কাজ চালিয়ে যা।
দির্শক নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,,
__ এখন আমার ওই ডাক্তারকে মারার জন্য হাতে চুলকানি উঠছে,কি করি বলতো,রাগ হচ্ছে খুব?
আলবান, আর্দ্র দুজনেই কিছুটা চিৎকার করে বলে,,,

__ কিইইইই
__ হুম।
আলবান বলে ,,
__ কেন?
__ লজিকাল কোন পয়েন্ট নেই?
আর্দ্র বলে,,
__ আই থিংক তুই বিথীর জন্য ও ডাক্তারকে নিয়ে জেলাস?
দির্শক ঘার কাত করে আর্দ্র পানে তাকিয়ে হেসে বলে,,
__ সামহাউ! তুই তোর বোন কে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছিস।নো ওয়ে!
আলবান বলে,,,
__ জোরে করে চাপিয়ে দিলে নিবে তবে?
__ ওরে শালার তোরা দেখি ভালোই ফন্দি ফিকির আটছো।

এদের কথায় বোঝা গেল আলবানের বোন (বিথী, নীধি) কিন্তু ইতি নয়। আর্দ্রের বোন (ইতি, বিথী) কিন্তু নিধি নয়।দির্শকে বোন (নিধি, ইতি) কিন্তু বিথী নয়। তাদের প্রেয়সীদের নিয়ে আসলেই তারা সেনসেটিভ।কে কার শালা এ নিয়ে প্রচুর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত,যদিও ওসব মানে টানে না তবুও মজা তো করাই যায়।তিন বন্ধু ভাই বলা চলে দীর্ঘ কথোপকথন চললো,অনেক হাসাহাসি একটু দুষ্টুমির মতো মারামারি ও চলল।
এখন তিনজনই লুঙ্গি ও শার্ট পরিধানে ব্যস্ত। লুঙ্গি তিনজনের পরিধান করেছে,সামনে আলবানের ফোনে স্ক্রিনে লুঙ্গি পড়ার ভিডিও চলছে,সেটি অনুসরণ করেই পড়ার কার্য শুরু হলো।একখানি নির্মল শুভ্র মুণ্ডু, যার কিনারা জুড়ে সোনালী বর্ণের পাট রয়েছে। কোমল সুতির এই লুঙ্গিতে ফুটে উঠেছে এক অনাড়ম্বর ঐশ্বর্য, এক গ্রাম্য অথচ মার্জিত সৌন্দর্য।

পরিচ্ছন্ন, ইস্ত্রি করা শুভ্র মুণ্ডু বা লুঙ্গি। এটি সাধারণত একখণ্ড আয়তাকার কাপড় প্রায় দেড় থেকে দুই মিটার দীর্ঘ।
প্রথমে কাপড়টি দু’হাতে ধরে কোমরের চারপাশে জড়িয়ে নিল ডান প্রান্তটি বাম দিক থেকে ঘুরিয়ে কোমরের পেছন পর্যন্ত নিয়ে এসে বাম প্রান্তের সঙ্গে মেলালো,দুই প্রান্ত যেখানে মেলে, সেখানে সামান্য ভাঁজ তৈরি করে সেটি কোমরের মধ্যে গুঁজে নিল।
ব্যাস হয়ে গেছে মুণ্ড লুঙ্গি পড়া, আর্দ্র আয়নার সামনে নিজেকে দ্বার করিয়ে বলছে,,
__ ভাই এই ভাঁজটা খুলে যাবে নাতো। তাহলে ইজ্জতের দফারফা হয়ে যাবে কিন্তু।
এদিকে আলবান,দির্শকের ও একই অবস্থা, আলবান আশ্বাস দিয়ে বলল,,
__ আর্দ্র এতো চিন্তার কিছু নেই,তলে তোর ছোট প্যান্ট তো আছে।
বলেই হাসতে লাগলো আলবান ও দির্শক।
দির্শক হাসতে হাসতে বলে,,

__ ডোন্ট ওয়ারি আর্দ্র, শক্ত করে গিটটা বাঁধা আছে, খুলে পড়ার চান্স নেই?
আর্দ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখলো, কিছু একটা ভেবে হাসলো।
তিনজনই এবার শার্ট পড়লো, আলবানের শার্টের বং গাঢ় বাদামী,দির্শকের শার্টের রং সাদা, আর্দ্র শার্টের রং গাঢ় মেরুন।চুল গুলো স্লাইস করলো, হাতে ঘড়ি পড়লো, নিজদের ফোনটা হতে নিল,ব্যাস মেলায় যাওয়ার জন্য তৈরি।

এদিকে তালুকদার মঞ্জিলের সবাই তৈরি হয়ে অন্দরমহলে, শুধু ইতি, বিথী, নীধি,আর সুহানা নেই।মা সিদ্দিকী বেগম এই নিয়ে মাএ পাঁচ বার ডাকলো কিন্তু সমানে বলেই যাচ্ছে,,
__ হাজার বার ডাকলাম, শোনার কোন নামমাএ নেই,।
এটা সব মায়েদের কমন ব্যাপার ডাকবে দুই থেকে তিনবার কিন্তু বলবে লক্ষ কোটি কোটি বার ডাকছি, অবশ্যই এটা মিথ্যা কথা? ইতি, বিথী, নীধি এটা মানে ও।
ইতি, বিথী নীধি ও সুহানার রেডি হওয়া শেষ এখন চারজনই পায়ে জুতা ফিট করছে।
চারজনেই পরেছে একখানি অপূর্ব কাসাভা শাড়ি , দুধ-সাদা বর্ণের, যার পাড়ে ঝলমল করছে সোনালী সুতার সূক্ষ্ম রেখা। ঐ শাড়ির সঙ্গে মিলেছে গাঢ় নীল বেনারসি নকশাযুক্ত ব্লাউজ, এই সাজে দেখা মিললো ঐতিহ্যের কোমলতা ও আধুনিকতার সংযমিত ছোঁয়া। শাড়ির আঁচলটা ভাঁজ করে কাঁধে গোছানো।ইতি বিথী নীধি কে শাড়ি পড়িয়েছে সুহানা। সিদ্দিকী বেগম চিল্লানি শুনে সুহানা বলে,,,

__ মেঝোআম্মা ডাকছে।
বিথী নিচু হিল জোরে পায়ে লাগাতে লাগাতে বলে,,
__ ডাকুক গে, আমরা কি রাস্তা দেখি নাই নাকি?
ইতি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রং ঢং করতে করতে বলে,,
__ কচু পাতার গায়ে যেমন পানি আটকে না,তেমনি মায়ে কথাও আমার গায়ে লাগে না, কঞ্চির মাইর ওটা আলাদা বেপার।
নিধি কিছু বলছে না সে অন্য কিছু ভাবতে ব্যস্ত,ইতি, বিথী, নীধির মাথার চুল গুলো ছাড়ানো, কিছু চুল একপাশে গোছানো, কিছু চুল পিছনে,পিছোন দিক দিয়ে টাটকা বেলি ফুলের মালা ঝুলছে। মেকআপ বিহীন যা যাবতীয় লাগে সবই দেখা গেল হালকা লাল লিপস্টিক,কাজল সৌন্দর্য চারগুণ বৃদ্ধি করছে চারজেই।হাতে কাঁচের চুড়ি ঝনঝন করে বাজছে।
নিজেদের ফোনটা করে ছোট পার্স ব্যাগে ঢুকিয়ে চলতে লাগলো,
বুকের সামনে রাখা চুল গুলো গলায় খোঁচা দিচ্ছে বিথীর,যদিও ওতো বড় বড় চুল নয় তাও, নিজের সুবিধার জন্য চুলগুলোকে পিছনে দিয়ে হাঁটতে লাগলো।

অন্দরমহলের ইতি, বিথী, নীধি এসে দেখলো কেউ নেই,তাই তারাও চলতে লাগলো।
ইতির কিছু একটা সমস্যা হতেই থেমে গেল,পিটে হাত দিয়ে ঠিক করতে লাগলো,তখনি উদায় হলো আলবানের,ইতির থেকে তিন ফুট দূরত্বে।ইতির পিছনে হাত দিয়ে গুঁতাগুঁতি করা থেমে গেছে,ইতির পিছোনটাই দেখতে পেল আলবান, হঠাৎ চুল ভেদ করে কালো রঙা কিছু একটা চোখে পড়ল আলবানের, যদিও সেটার মানেটা বুঝলো না আলবান, এবং জানেও না সেটা কি, কিন্তু সাদা শাড়ির সঙ্গে কালো রং টা আলবানের কাছে অস্তিকর লাগলো ,একদম ভালো লাগলো না,ইতি কাজ শেষ হওয়ায় চলে যাওয়ার জন্য উদিত হলেই আলবান গম্ভীর কন্ঠের ডাক ছাড়ে,,

__ এই দ্বারা?
ইতি থেমে যায় চিরচেনা কন্ঠস্বর পেয়ে পিছোন ঘুরে তাকায়,আলবান এবার পা থেকে মাথা অব্দি পরখ করে নিলো,থামকালো কিছুক্ষণ,অযাথা কোন কারণে নয়, ইতিকে আজ ভিন্ন পোশাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে,এটা অবশ্যই পীড়াদায়ক যা শুধু আলবানের জন্য,মনে উতাল পাতাল শুরু ও করে দিলো,যা মানে না আলবান কিন্তু তবুও হয়, এগোতে এগোতে গম্ভীর কন্ঠে আবার ইতিকে শুধালো,,,
__ পিছনে ঘোর?
ইতি শুনলো না ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল,ইতির চোখে আলবানের শার্ট লুঙ্গি পড়া বেশ লাগলো, অনেক সুন্দর লাগলো,অপলক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো,আলবান এবার বেশ গর্জেই বললো,,

__ কথা কানে যায় না?
ইতি আর কিছু না ভেবে ঘুরে দাঁড়ালো,আলবান ইতির কাছে এলো,কোন দিকের কোন ভাবান্তর না দেখিয়ে ইতি পিটের চুল গুলো সরালো,ইতি সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠলো,এর প্রতিবাদ করা কথা গুলো গলায় এসে কাঁটা মতো আটকে গেল কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারলো না”আলবান ভাই এ কি করছেন” হালকা কাঁপতে কাঁপতে লাগলো ইতি।
আলবান ভ্রু কুঁচকে ইতির পিঠ দেখলো হঠাৎ চোখ পড়লো ইতির কালো তিলে দিকে। ফর্সা পিটে এই কালো কুচকুচে তিলটা সৌন্দর্যের আর এক প্রতিক, মূহুর্তেই আলবানের কি হলো তা বলা বাহুল্য, শুকনো ঢোঁক গিলে সেখানে থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে চোখ দিলো।
ব্লাউজের অর্ধেক টান ঝুল দুইটা ঢিলে হয়ে গেছে,যার ফলে কালো ফিতে অর্থাৎ অন্তর্বাস দৃশ্যমান,যার মানে আলবানের জানা নেই।সেটা দেখে আলবান চোখ মুখ কুঁচকে বললো,,

__ সাদার সাথে কালো পড়ে ঘুরিস কেন?,দেখতে বাজে লাগে?
চোখ বড় বড় করে ভাবতে লাগলো ইতি,”কালো”কোন কালো?কে কালো পড়েছে?আমি তো সাদা শাড়ি পড়েছি?আবার কিছুক্ষণ ভেবে বলল,, “উনি কি তবে..
নিজের মাথায় নিজেই চাপকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বিরবির করে বলল,,
__ হে আল্লাহ,এর মানে না বুঝলেই ভালো,ছি ছি কি বাজে পরিস্থিতি?
ইতি আলবানের কথার কোন প্রতুওর করলো না কিই বা বলবে” বলার জো আছে নাকি। অস্তিত্ব নিয়ে চুপ করেই রইল ইতি।
আলবান এবার ইতির ব্লাউজের ঝুল জোরা লাগাতে গিয়ে পড়লো মহা ফেচাদে,এই লম্বা ঝুল দুটোর গিট বাঁধতে হবে, যেমন তেমন করে বাঁধলেও তো হবে না।আলবানে বিরক্ত লাগলো, ” মেয়ে মানুষ এসব পড়ে কেন রে বাবা,মহা ঝামেলার কাজ”

কোনরকমে টানটুন করে ঝুল দুটোকে বেঁধে দিলো,কালো ফিতেটাকে ঢেকে দেওয়ার মতো করে,বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ খানা সম্পূন করলো,কত কি যে ভাবলো,ভালো করে বাঁধতে হবে,না হলে পড়ে আবার খুলে যেতে পাড়ে,এই কালো ফিতে দেখা যেতে পারে? তখন আমি নাও দেখতে পারি আরো কত কি যে ভাবলো? সব মনের ব্যাপার স্যাপার।কাজ সম্পন্ন,ইতির পিট থেকে হাত ছড়া মাএই দাঁতে দাঁত চেপে আলবান বললো,,
__ বাল? কালোর সাথে কালো পড়বি,আর না হয় সাদার সাথে সাদা পড়বি,এসব আনমেচিং পড়ে কি প্রমাণ করিস?ডিসগাস্টিং?
ধীর গতিতে ঘুরে দ্বারালো আলবানের দিকে, চোখে চোখ রাখার সাহস হলো না, চোখ নিচু রেখেই মুখে টানেটুনে হাঁসি এনে আলবানে কথাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বলে,,

__ অবশেষে বাল বললেন তবে?
আলবানের হুস আসলো, আসলেই সে বাল বলেছে?এটা বোধগম্য হলো, চোখ এদিকে ওদিক ঘুরিয়ে বলে,,
__ কানের কাছে যদি এই একটাই ওয়ার্ড ঘুরঘুর করে,তবে তো বললোও?
__ বলেছেন এটাই স্বীকার করুন?
__ আমি তোর মতোন না?
__ আমিও আমার মতোন না? থুক্কু আপনার মতোন না?
__ দুর হ সামনে থেকে,তোর মতো কাল নাগিনের সাথে কথা বলা কোন ইচ্ছা নেই ? ওহহ আজ তো আবার সাদা নাগিন হয়েছিস?
দাঁতে দাঁত পিষে ইতি বলে,,

__ আমি কাল নাগিনী না?
__ আঙ্গে তুইইই।
__ আমি কালনাগিনী না??
__ শুধু কালনাগিনই নয় সব নাগিনই তুই?
__ এখন কিন্তু আপনি আমাকে অপমান করছেন?
আলবান ইতির দিকে ঝুঁকে বলে,,
__ এখন থেকে নয় শুরু থেকেই তোকে আমি অপমান করছি?
__ ভালো হচ্ছে না কিন্তু দাবানল ভাই?
__ তবে খারাপ হচ্ছে নাকি,কই না তো?
ইতি আর কিছু না বলে গটগট পায়ে চলে যেতে যেতে বলে,,
__ পড়ে দেখে নিবো?
আলবান গলা উঁচিয়ে বলে,,
__ ছবি তুলে নিতে পারিস।
এই বলে মুখে মুচকি হাঁসির রেখা টেনে ইতির পেছনে পেছনে চলতে লাগলো।

শাড়ি পরে বিথীর ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। হাঁটতে গিয়েই বারবার আঁচলে পা জড়িয়ে যাচ্ছে, এত ধীরে চলতে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল নিজের পা-দুটি আজ অচেনা, একটা লম্বা একটা ছোট। বড় বাগানের ধারে দাঁড়িয়ে সে বিরক্ত মুখে শাড়ির কুচি ঝাঁকিয়ে ঠিক করতে লাগল, আর মুখে মুখে বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করল,,
— বাল পড়ছি, বালের শাড়ি! কতবার বললাম, আমি শাড়ি পরব না। কেউ একটা কথা শুনল না। একেবারে অসহ্য লাগছে!
এই বলে সে আবার কুচির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। মাত্র দুই পা এগোতেই কপাল গিয়ে ধাক্কা খেল এক কঠিন, শক্তপোক্ত কিছুর সঙ্গে। বিথীর প্রথমে মনে হলো,এটা নিশ্চয়ই কোনো গাছ কপালে হালকা ব্যথাও পেল। বিরক্তি এবার চরম পর্যায়ে উঠে গেল।

—এই বালের গাছটা এলো কোথা থেকে…
বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই মাথা তুলে তাকাতেই বিথীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।ওটা গাছ নয়, এক মানুষ!
দির্শক বুকে হাত গুঁজে বিথীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে চোখে স্থির দৃষ্টি, মুখে অচেনা গাম্ভীর্য। বিথীও তার দিকে চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল, যেন বোঝার চেষ্টা করছে, এই হঠাৎ নিরবতা ও স্থির চাহনির মানে কী। দু’জনের চোখ এক মুহূর্তে আটকে গেল, তারপর বিথী হালকা বিরক্ত ভঙ্গিতে দির্শকের দিক থেকে একপা সরে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী, দুষ্মন স্যার?

ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল সে, গলায় ঠাট্টার সঙ্গে একটু খোঁচাও মিশে।
দির্শক কিছু বলল না। তার দৃষ্টি ততক্ষণে বিথীর সাজে আটকে গেছে অপরূপা লাগছে তাকে, যেন সকালবেলার আলোয় ফুটে ওঠা নতুন রঙের জবা। কিন্তু এই সৌন্দর্যটা দির্শকের ভেতরে অদ্ভুত অস্বস্তি জাগাল। সে কি ভাবে দেখলো এ সাজসজ্জাকে এটা বড় কথা নয়?বড় কথা হলো এই সাজসজ্জায় এখন রাগও হচ্ছে।
চুলগুলো এলোমেলোভাবে খোলা এই দৃশ্যটা যেন আরও অস্থির করে দিচ্ছে দির্শকে। বুকের ভেতর এক অনুচ্চারিত কথার ঢেউ উঠল, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ এলো না। সে শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল।নীরব, অথচ কত কিছু বলছে সেই দৃষ্টি।

কিছুক্ষণ নীরবে বিথীর দিকে তাকিয়ে রইল দির্শক। চোখে যেন ভাবনার ঘূর্ণি একদিকে বিরক্তি, কিছুক্ষণ পর হালকা করে আঙুল তুলে ইশারা করল বিথীকে কাছে ডাকল।
কিন্তু বিথী?সে যেন ইশারাটা দেখেও দেখল না। মুখের ভঙ্গি বদলে নিল, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রইল, চোখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তার মনের অভিমান এখনো প্রশমিত হয়নি।
দির্শক এক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। ভালো করেই বুঝল, এই মেয়েকে এখন নরমে পাওয়া যাবে না। তাই শেষ পর্যন্ত নিজেই এগিয়ে গেল তার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে পড়ে থাকা এক চিকন, শুকনো ডাল তুলে নিল হাতে।
বিথী তখনও বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে, মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে পুরোটাই যেন দির্শককে উপেক্ষা করার প্রকাশ। তবু দির্শক জানে, তার এই রাগটাই আসলে অভিমানের মুখোশ।
দির্শক কাছে গিয়ে হালকা ভঙ্গিতে হাতে থাকা ছোট ডালটা দিয়ে বিথীর খোলা চুলের এক গোছা আস্তে করে বুকের ওপর ছড়িয়ে দিল।
ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো একবার দেখল বিথী, আবার একবার বিথী দৃষ্টিপাত করল দির্শকের দিকে। তারপর হালকা বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বলল,,

— উফ! আপনি চুলগুলো সামনে দিলেন কেন? সামনে থাকায় গলায় খোঁচাখুঁচি করছে, ভীষণ অস্বস্তি লাগছে।
দির্শক দুই ভ্রু খানিকটা উঁচু করে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন তার দিকে। ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে বললেন—
— তবে চুল রাখারই বা দরকার কী ছিল? কেটে ফেললেই তো হয়!
বিথী কোনো প্রতিউত্তর দিল না। কথাটা যেন কানে এসেও যায়নি। নীরবে হাত তুলে সামনে পড়ে থাকা চুলগুলোকে পিছনে সরিয়ে নেওয়ার জন্য উদিত হলো সে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ স্বরে দির্শক হঠাৎ বলে উঠলেন—

— এমন ভুল একদমই করবে না, বিথী!
কণ্ঠে কঠোর আদেশের সঙ্গে অজানা সতর্কবার্তা মিশে রইল, আর বিথী থমকে গেল মাঝপথে, হাতে জড়িয়ে রইল তার ছড়িয়ে থাকা চুলের একগুচ্ছ ।
বিথী বিরক্তির রেশ টেনে বলল,,
__ সমস্যা কি স্যার?
__ তুমিই আস্ত একটা সমস্যা,ইউ নো।
__ আমি? আপনার সমস্যা?লাইক সিরিয়াসলি স্যার?
__ ইয়েস।
__ স্যার বলে কিছু বলছি না?নাহলে দেখতেন?
__ কি করবে?
__ অপেক্ষা করেন?কি করি তা বুঝতে পারবেন আশা করি?
এই বলে দির্শকের পাশ কেটে চলে যেতে লাগল।কিছু একটায় হঠাৎ থেমে গেল সে।মুহূর্তের ভেতরেই যেন কোনো অদ্ভুত ভাবনা মাথায় এল।দুই পা পিছু হটে আবার দর্শকের সামনে এসে দাঁড়াল বিথী।ঘাড় কাত করে, চোখে দুষ্টুমি আর কণ্ঠে একরকম ইতস্ততার সুর নিয়ে বলল,

__ডু ইউ লাইক মি, দুশমন স্যার?”
দির্শকের চোখ এক মুহূর্তে বড় হয়ে উঠল।লজ্জা পাওয়ার কথা ছিল হয়তো,কিন্তু তার মুখে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না।বরং মনে একটাই প্রশ্ন দোলা দিল,,
“বিথীর মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলো কেন?
দর্শক কোনো প্রতিউত্তর দিল না।কি-ই বা বলবে সে?নিজেই তো ঠিক জানে না, সত্যিই কি সে বিথীকে পছন্দ করে নাকি কেবল দায়িত্ববোধের টানে এতটা জড়িয়ে পড়েছে।তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট,মেয়েটাকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে তার ভালো লাগে।বিথীর অবাধ্যতা সে সহ্যই করতে পারে না, অবাধ্যকতার জন্য কঠোর শাস্তি দিতে মন চায় দির্শকরে।।
কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে বিথী আবার বলে,,

__ না মানে,এমনি মনে হলো।
দির্শক লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,,
__ কারণ।
__ আপনি আচার আচরণ,কথা বার্তা বলে দেয়।সবার ক্ষেত্রে এক হলেও তা আমার ক্ষেত্রে তা ভিন্ন।
__ আমি তোমাকে ইফ্টিজিং করি,এটাই বোঝাতে চাচ্ছো বোধ হয়?
এই পর্যায়ে বিথীর প্রচুর রাগ হলো,বিরবির করে বললো,,,
__ শালা হুনুমান রে,কোন কথাকে কোন কথায় নিয়ে যায়,বাল ইফ্টিজিং করলেও তো ভালো হতো, পুলিশ স্টেশনে গিয়ে একটা মামলা ঠুকে দিয়ে এই ঝামেলা দফারফা করতাম। বালের স্যার আমার।
এবার বলল,,,

__ আপনি স্যার মানুষ, আমাকে কেন ইফ্টিজিং করবেন বলেন,তবে স্যার না হলে নিশ্চিত করতেন?
দির্শকের নিরেট জবাব,,,
__ আই ডোন্ট লাইক ইউ,আম ইউর টিস্যার,সো একজন শিক্ষক হিসাবে ছাএীকে যে চোখে দেখা উচিত, আমিও সেই চোখেই দেখি,মাথার অভদ্র চিন্তা আসে কি করে?
বিথীর কান পর্যন্ত কথা গুলো পৌছাতেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাড়ালো না গটগট পায়ে যেতে যেতে কটাক্ষ করে বলতে লাগলো,,,

__ওসব ভাব মারা কথা আমায় বলে লাভ নাই,!টিভিতে ওই টিচার-স্টুডেন্টের কত প্রেম-ভালোবাসা দেখি,
বাস্তবে আমার মেলা বান্ধবী স্কুল , কোচিং, প্রাইভেটের টিচারকেই বিয়ে করে,এখন চার বাচ্চার মা হয়ে বসে আছে!সে-সব রোমান্টিক কথা মুখে শুনলেই গা জ্বলে যায়, বাবা গো!
।বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছেন,বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তাও বিয়ে না করে আনরোমান্টিক একটা জীবন কাটাচ্ছেন!
তারপরও আবার বড় বড় কথা!ছি! লজ্জা হওয়া উচিত!ডং মারনি কথা। ছ্যা কোন লাল পানি খেয়ে যে বলতে আসলাম,” স্যার ডু ইউ লাইক মি”। অসহ্য।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৫

বিথীর কথাগুলো স্পষ্টভাবেই কানে এলো দির্শকের।
কথাগুলো শুনে সে বুঝতে পারল না হাসবে, না কাঁদবে।
যাই হোক, বিথী যে সত্যিই সত্যি কথা বলেছে,তা দির্শক নিজেও মানল।তবু, তার জীবনের সমীকরণটা আলাদা
যা বিথী জানে না, বোঝেও না।তার ভেতরের জগৎটা যেন উল্টো ছন্দে বাঁধা,সবকিছুই সেখানে অন্যরকমভাবে ঘটে।
অজান্তেই মনের ভেতর এক ধরনের অবাধ, বেতার যন্ত্রণার ঢেউ বয়ে গেল,নিঃশব্দ, অথচ তীব্র।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৭