Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৪

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৪

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৪
রাফিয়া জান্নাত রিফা

__ ভাই… পু-পুলিশ! পালাতে হবে… চলো ভাই, ওঠো!
কিন্তু দির্শকের মাঝে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। অন্যদিকে পুলিশের আতঙ্কে নাতাশা ও মুশতাক চৌধুরীর শরীর কাঁপতে লাগল ভয়ে।
দির্শক নিথর দৃষ্টিতে হাঁটু গেড়ে বসে রইল। চোখে কোনো ভাবান্তর নেই। নিথেক্সের দিকে তাকিয়ে সে শান্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,

__ বিথীকে ফোন দে।
নিথেক্স দির্শকের কাঁধে হাত রেখে ব্যাকুল স্বরে বলল,,
__এখন এসবের সময় নেই ভাই। আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে।
__আমি যা বলেছি, তাই কর।
নিথেক্স বিরক্তি আর উৎকণ্ঠা নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে দির্শকের হাতে তুলে দিল। দির্শক দ্রুত ফোনটি হাতে নিয়ে সেখানেই বসে পড়ল। নিজেকে সামলে নিয়ে বিথীর নম্বরে ডায়াল করল। রিং গেল, কিন্তু ফোন ধরল না বিথী।
দির্শকের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে এলো, শরীর কাঁপতে লাগল অস্বাভাবিকভাবে। দির্শকের এমন অবস্থা দেখে নিথেক্স আর নিজেকে সামলাতে পারল না শব্দ করে কেঁদে ফেলল। দির্শকের কাঁধ চেপে ধরে বলল,,

__ ভাই… ওঠো ভাই। আমাদের পালাতে হবে। বিথী ওর পরিবারের কাছে ভালো থাকবে।
কাঁপতে কাঁপতে দির্শক বলল,,
__ব্যাপারটা সেটা নয়, নিথেক্স। আমার বিথী ভালো নেই।
সে আবারও বিথীর নম্বরে ডায়াল করল। এবার মাত্র দু’বার রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো। দির্শক ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,,,
__ বিথী… বিথী…
কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা ধরেছে নিধি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলল,,
__কে বলছেন?
__ নিধি! বিথী কোথায়? ওকে ফোনটা দাও। আমি কথা বলব। দাও!
নিধি বুঝে গেল এ দির্শক স্যার। কান্নার আওয়াজ একটু বেড়ে গেল।
__ স্যার… বিথী অজ্ঞান হয়ে গেছে। কিছুতেই জ্ঞান ফিরছে না।
কথাগুলো কানে পৌঁছানো মাত্র দির্শক যেন পাথর হয়ে গেল। বারবার তার কানে শুধু একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল,,

“বিথীর জ্ঞান ফিরছে না।”
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো অসংখ্য আহাজারি কান্নার আওয়াজ। দির্শকের চোখ ভিজে উঠল। অসাড় হাতে ফোনটি মাটিতে পড়ে গেল।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। পরক্ষণেই আকাশ বিদীর্ণ করা এক চিৎকারে ফেটে পড়ল দির্শক। পাগলের মতো নিজের চুল ছিঁড়তে লাগল একের পর এক।
দির্শকের এমন অবস্থা দেখে নিথেক্স ছুটে এসে তার বাহু জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,
__ভাই, এমন করো না। তোমার এমন অবস্থা দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। চলো ভাই, এখান থেকে চলে যাই। চারদিকে পুলিশের সাইরেন বাজছে। তারা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। চলো, ওই চোরা রাস্তা দিয়ে পালাব।
ব্যথায় ভাঙা কণ্ঠে দির্শক ঢোঁক গিলে বলল,,
__ তুই পালিয়ে যা নিথেক্স। আমি বিথীর কাছে যাব।
এই বলে সে উঠে দাঁড়াল। নিথেক্স কান্না থামিয়ে বলল,,

__ ভাই, আমি এতটা স্বার্থপর নই যে তোমাকে ফেলে চলে যাব। পাগলামি করো না। আমাদের পাসপোর্ট রেডি আছে। চলো, প্লিজ।
দির্শক সামান্য বিরক্তির ছাপ নিয়ে নিথেক্সের কাঁধে হাত রাখল। নিথেক্সের চোখের পানি মুছিয়ে বলল,,
__ বিথীর কাছে আমাকে যেতেই হবে। অনেক হিসাব এখনো বাকি। এত সহজে আমি পুলিশের হাতে ধরা দেব না। তুই চোরা রাস্তা দিয়ে পালা।
নিথেক্সের কান্নার বেগ কিছুটা বেড়ে গেল,সে আরও কিছু বলতে চাইলে দির্শক তাকে থামিয়ে দিল,,
__আরে পাগল, কাঁদছিস কেন?
নিথেক্স হঠাৎ দির্শকের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,,

__ ভাই, তোমার কিছু হলে আমি বাঁচব না।
__ আমার কিছু হবে না। তুই নাতাশা আর ওই বাস্টার্ড ডাক্তারকে নিয়ে চলে যা। আমার চিন্তা করিস না। যা।
অনেক জোরাজুরির পর অবশেষে নিথেক্স নাতাশা ও ডা. মুশতাক চৌধুরীকে নিয়ে চোরা রাস্তা দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল সে। অঝোরে কাঁদছিল নিথেক্স। তার বুক জুড়ে শুধু একটাই ভয়,
এই দেখা হয়তো শেষ দেখা।
নিথেক্স, নাতাশা ও মুশতাক চৌধুরী ঝোপঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল।
অতঃপর দির্শক প্যান্টের পকেট থেকে কালো রুমাল বের করে মুখে জড়িয়ে নিল। নিরবে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোতে লাগল।

ধীরে ধীরে চারদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল। জঙ্গল আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। পাতার খসখস শব্দে ভরে উঠল চারপাশ। পেছনে একবারও তাকাল না দির্শক। ছন্নছাড়া, অগোছালো পথিকের মতো সে এগিয়ে চলল বুকে জমে থাকা অগণিত হাহাকার নিয়ে।এই মুহূর্তে দির্শককে মধ্যে কোন প্রকার ভয় ভীতি নেই,না রাগ না , দুঃখ কষ্ট।
ঠিক তখনই পুলিশের লাইটের আলোয় দির্শক ধরা পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশদের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। বন্দুক তাক করে তারা ছুটে আসতে লাগল দির্শকের দিকে…পুলিশ বলতে লাগলো,,,
__ এই দারা বলছি দারা নাহলে গুলি করে দিবো।
পুলিশের কঠোর হুঙ্কার দির্শকের কানে পৌঁছানো মাত্রই সে পেছনে একবারও ফিরে তাকাল না। সামনে থাকা অজানা অন্ধকারের দিকেই ছুটে চলল প্রাণপণে। ঠিক তার পেছনেই ছুটছে পুলিশ চারপাশ কাঁপিয়ে তুলছে তাদের ভারী পায়ের শব্দ।

বারবার থামার নির্দেশ দিল পুলিশ, কিন্তু দির্শক থামল না। শেষমেশ বন্দুকের নল উঁচু হলো। একের পর এক গুলির শব্দ ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল নীরব জঙ্গলে। তবুও দির্শক থামেনি সে ছুটেই চলেছে, এখন প্রাণের চেয়েও বড় কিছু তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনে।
হঠাৎ এক পর্যায়ে একটি গুলি দির্শকের ডান বাহু ভেদ করে বেরিয়ে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় সে কেঁপে উঠল। রক্তে ভিজে গেল তার হাত। যন্ত্রণায় দাঁত কামড়ে ধরে ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরল সে কিন্তু পা থামাল না।
যন্ত্রণা, রক্তক্ষরণ, মৃত্যুভয় সবকিছুকে উপেক্ষা করে দির্শক ছুটে চলল অন্ধকারের বুকে, শুধুমাত্র একটি নাম আঁকড়ে ধরে,,
বিথী।

বিথীর জ্ঞান ফিরেছে এইমাত্র। ডাক্তার এসে ওষুধ লিখে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জানিয়ে গেলেন,,
শরীরের অতিরিক্ত দুর্বলতা আর দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার কারণে ঠিকমতো খাওয়া না হওয়াতেই এমন অবস্থা হয়েছে।
তবু বিথীর শরীর এখনো মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে। বিথীর দু’পাশে বসে থাকা ইতি আর নিধির চোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ইতির মনে বারবার ভেসে উঠছে বিথীর সেই কাঁপতে থাকা নিথর শরীরের দৃশ্য ভাবলেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

সোফার এক পাশে মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছেন সিদ্দিকী বেগম। তাঁর পাশে বসে আছেন আলিফা বেগম আর মিলি বেগম। নাঈম তালুকদার ও নাজিম তালুকদার অফিসে থাকা অবস্থায় মেয়ের এমন অসুস্থতার খবর পেয়ে হতভম্ব হয়ে সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন বাড়িতে।
বিথী একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সিলিং ফ্যানের দিকে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে দির্শকের সেই মুখখানা। তার দু’চোখের পানি নিঃশব্দে বালিশে মিশে যাচ্ছে।
নিধি নিজের চোখের পানি মুছে বিথীকে আলতো করে আধশোয়া করে বসালো। হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে খুব যত্নে তাকে খাওয়াতে লাগল। শুরুতে বিথী না করলেও, চারপাশে সবার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে আর আপত্তি করল না। খেতে খেতে হঠাৎ চোখে পড়ল তার মা নিঃশব্দে কাঁদছেন। দৃশ্যটা দেখে বিথীর বুক কেঁপে উঠল। সে ইতি নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,,

__ মা কাঁদছে কেন? মাকে কাঁদতে মানা কর না।
ইতি, নিধি তোরা দু’জনও কাঁদছিস দেখছি। উফফ… বড় মা, তুমি ও কাঁদছো! আরে আমার তো তেমন কিছুই হয়নি। আমি একদম ঠিক আছি।
সিদ্দিকী বেগম তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে বিথীর কাছে এসে বসলেন। আদর করে বিথীর মুখখানা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,,
__ মা আমার, কী হয়েছে তোর? তুই তো এমন হুট করে কখনো জ্ঞান হারাস না। ইতি-নিধির মাঝে মাঝে এমন হলেও, তোর তো কখনো এমন হয়নি। তবে কেন আজ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লি? শরীর কাঁপছিল, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল তোর…

মায়ের কথায় বিথী থতমত খেয়ে গেল। কী উত্তর দেবে সে? আসলে উত্তর দেওয়ার মতো কিছুই তো তার জানা নেই। এমন হুট করে কেন অজ্ঞান হয়ে গেল, কেনই বা শরীর কাঁপতে শুরু করল এর কোনো ব্যাখ্যাই তার নিজের কাছেই নেই। আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে এমন কিছু কখনো ঘটেনি। তাহলে আজ কেন?
তবে কি দির্শকের কারণেই এমন হয়েছে?
এই প্রশ্নটা মনে আসতেই বিথীর চোখ দুটো ভিজে উঠল। দির্শকের নামটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কোথাও যেন হাহাকার করে উঠল। অথচ সে কাঁদতে চায় না একদমই না। তবুও অদ্ভুতভাবে কান্না এসে গলা চেপে ধরছে। ইচ্ছে করছে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতে।
নিজের এই দুর্বলতায় হঠাৎ করেই রাগে ফেটে পড়ল বিথী। মনে মনে নিজেকেই গাল দিল,,

__কী সব বাল ছাল ভালোবাসা! আজব তো! এমন কান্না পাচ্ছে কেন? এত মন খারাপ লাগছে কেন? আমি কেন শক্ত হতে পারছি না?
চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে গভীরভাবে ভাবতে লাগল…
বিথী পাঁচ গাসের মতো খেয়েই আর খেতে পারল না। নিধি অনেক জোরাজুরির পরেও সে আর একদানা বাড়াতে রাজি হলো না। আলিফা বেগম বিথীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে কোনো কথা না বলে নিজের কাজে চলে গেলেন। সিদ্দিকী বেগমও বিথীকে পুরো খাবার শেষ করার কড়া নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন।
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল আলবান ও আর্দ্র। বিথীর অসুস্থতার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে দুজনেই ছুটে এসেছে। বিথীকে সুস্থ অবস্থায় দেখে তারা দুজনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
নিধি তখনও ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদেই চলেছে। বিথী আর ইতি হাজার চেষ্টা করেও তার কান্না থামাতে পারল না। বরং আর্দ্রকে দেখামাত্রই নিধির কান্নার আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। বিছানা থেকে নেমে সে দৌড়ে এসে আর্দ্রকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,

__ বিথী কেমন কেমন করে কাঁপছিল জানেন? আমার খুব ভয় করেছিল!
আর্দ্র নিধির চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলল,,
__ কিচ্ছু হতো না বিথীর।
নিধির এমন কান্ড দেখে বিথীর মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। ইতি বরাবরই নিধির এই বাচ্চামো স্বভাবে অবাক হয়। নিধির এই শিশুসুলভ আচরণ কেবল আর্দ্রের কাছেই মানায় এই ভাবনাটা ইতির ভালোই লাগে। আড়চোখে সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আলবানের দিকে তাকাল। কিন্তু আলবান তখন ইতির দিকেই তাকিয়ে ছিল। লজ্জায় ইতি চোখ নামিয়ে নিল।
আলবান ও আর্দ্র কিছুক্ষণ বিথীর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের ঘরে চলে গেল। নিধিও গেল আর্দ্রকে খাবার বেড়ে দিতে। ঘরে রইল শুধু ইতি আর বিথী।
ইতি বিথীকে আলতো করে নিজের উরুতে শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বিথী শিশুদের মতো গুটিয়ে রইল। নরম স্বরে ইতি জিজ্ঞেস করল,,,

__ কিসের টেনশন তোর?
__ তাকে অসম্ভব ভালোবাসার?
__ভালো তো বাসিসই, তাহলে টেনশন কিসের?
বিথী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাঙা কণ্ঠে বলল,,
__কিন্তু সে তো ভালোবাসে না।
__ছিনিয়ে নে?
__জোর করে ভালোবাসা চাই না।
__ কেন?
__ বহুত যত্নে হৃদয়মাঝারে রেখেছি… ওটা ক্ষুণ্ন করতে চাইছি না।
__ এটা ভুল করেছিস।
বিথী হালকা হেসে বলল,,
__ হ্যাঁ, জেনেও ভুল করেছি।
__ ভুলে যা তাকে?
__ আত্মহত্যা করতে বলছিস?
ইতি কিছু বলল না। বিথী আবার বলল,,
__ সে কি কালো জাদু করেছে আমার উপর, ইতি?
__ কেন?
বিথী নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে বলতে লাগল,,

__আজ তাকে অন্য একটা মেয়ের হাত ধরে থাকতে দেখামাত্রই শরীরটা কেঁপে উঠল। মনে হলো কেউ যেন হঠাৎ করে বুকের ভেতর থেকে আমার হৃদপিণ্ডটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুরভাবে, নির্মমভাবে। মুহূর্তের মধ্যেই হৃদয়টা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কয়েক দিনের পরিচয়ে এত ভালোবাসা এল কোথা থেকে, এত মায়াই বা জন্ম নিল কীভাবে? অথচ সে তো শুরু থেকেই ভালোবাসতে চায়নি এই সত্যটা জেনেও কেন এমন হাহাকার, কেন এমন শূন্যতা আমাকে গ্রাস করছে? জানা সত্যের পরেও কেন… কেন?
বিথীর কথায় ইতি কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। একটু পরে বিথী আবার ডাকল,,

__ইতি?
__ হুঁ।
__ আলবান ভাইকে কতটা ভালোবাসিস?
ইতি ঢোঁক গিলে বলল,,,
__জানি না।
বিথী মৃদু হেসে বলল,,
__এই ‘জানি না’-টাই হলো ভালোবাসা… তীব্রতর ভালোবাসা, বুঝলি?
ইতি আর কিছু না বলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,,
__আমি একটু আসছি।

সে বিথীকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল। দরজার সামনে এসেই দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঁদতে লাগল। কেন কাঁদছে, নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না শুধু জানল, বুকটা ভীষণ ভারী লাগছে। তাই কেঁদেই ফেলল।
কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে চোখের পানি মুছে আলবানের দিকে পা বাড়াল ইতি।
বিছানার এক পাশ থেকে আরেক পাশে বারবার গড়িয়ে পড়ছে বিথী। চোখ বন্ধ করলেই যেন ঘুম ধরা দিচ্ছে, অথচ মুহূর্ত পরেই ভেসে উঠছে দির্শকের মুখখানা অবিকল স্পষ্ট, নির্মমভাবে স্পষ্ট। বিরক্তি আর অসহায়তার চাপে হঠাৎই চোখ দু’টো ভিজে উঠল। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে আবার কেঁদে ফেলল সে।
ঠিক তখনই জানালার ফাঁক গলে আসা হঠাৎ এক ঝলক বাতাস বিথীর পুরো শরীরটা শিহরিত করে তুলল। বুকটা কেঁপে উঠল। জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল আকাশ ভালো নেই, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে মাগরিবের আজানের সুর নীরব গভীর আহ্বান।
বিছানা ছেড়ে ধীরে ধীরে নামল বিথী। নামাজ পড়ার ইচ্ছায় জানালাটা বন্ধ করে দিল, তারপর ওজু করতে চলে গেল ওয়াশরুমে।

ওজু শেষে জায়নামাজ বিছিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করল। কিন্তু মুনাজাতে হাত তুলতেই, না চাইলেও আবার চোখ ভিজে এলো। মস্তিষ্ক কড়া স্বরে বলছে দির্শকের কথা বলবি না। অথচ মন অবাধ্য হয়ে ফিসফিস করে বলছে আল্লাহর কাছে তাকে চাই, খুব করে চাই।
শেষমেশ মনকেই জয়ী হতে দিল বিথী।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মুনাজাতে বলে উঠল,,,
“হাজারো ভুল আর খারাপ জানার পরও কেন মন তাকে চায়, আল্লাহ? এই বেহায়া মনটাকে কীভাবে বেঁধে রাখি আমি? তাই তো তাকে তোমার দরবারে চাইছি। এমন অবাধ যন্ত্রণা আগে কখনো পাইনি, কখনো না।
আমার তো কত আপনজন আছে, তাদের কত কত ভালোবাসা, তবু কেন একান্ত তার ভালোবাসার এত প্রয়োজন? কী আছে তার ভালোবাসায়, যা এত পরিবারের মানুষের ভালোবাসায় পাচ্ছি না? কেন মনে হয়, তাকে না পেলে আমি বাঁচব না? এ কেমন ভাবনা, আল্লাহ! তার জন্য মরার কথাও মাথায় আসে কেন? আত্মহত্যা তো মহাপাপ তবু কেন সেই পাপের নামও মনে আসে?
এ কেমন দহন, আল্লাহ? এ কেমন পীড়া? এই জ্যান্ত দহন থেকে আমাকে মুক্তি দাও। মুক্তি দাও, আল্লাহ মুক্তি দাও…”

কথাগুলো বলতে বলতেই উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল বিথী। কান্নায় ভেঙে পড়ে জায়নামাজের ওপরেই হেলে পড়ল। দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদল সে নিঃশব্দে, আবার কখনো শব্দ করে। কান্নার পর এক অদ্ভুত প্রশান্তি পেলেও মনটা আর একটু বেশিই অস্থির হয়ে উঠল।
বুকের বাম পাশে হাত রাখল বিথী। ভেতর থেকে যেন দ্রিমদ্রিম শব্দ উঠছে অস্বাভাবিক, ভয়ংকর। হঠাৎ করেই রাগে, ক্ষোভে নিজের বুকেই কিল-ঘুষি মারতে লাগল সে।
জায়নামাজ গুছিয়ে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল বিথী। তবু বুকের কাঁপুনি থামছে না। আধশোয়া হয়ে পা দুটো ছড়িয়ে দিল। খেয়াল করল পা দুটো অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। অসহ্য লাগছে সবকিছু। মনে মনে কয়েকটা অশ্লীল গালি আওড়াল। চোখ বন্ধ করে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
ঠিক তখনই,,

“খট!”
বিকট এক শব্দে মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল বিথী। চোখ খুলে দরজার দিকে তাকিয়েই সে হতবাক। ধীরে ধীরে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসল।
দরজার দিক থেকে হন্যে হয়ে তার দিকে ছুটে আসছে কেউ একজন।প্রথমে মনে হলো স্বপ্ন।কিন্তু না।
এ তো দির্শক।
হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসছে সে। পুরো শরীর রক্তে ভেজা। রক্তে মাখামাখি দির্শকের শরীর। সমুদ্র নীল চোখজোড়া দেখেই বিথী নিশ্চিত হলো এ দির্শকই।
রক্তাক্ত সেই দৃশ্য দেখে বিথীর বুকটা প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল। কিছু বোঝার আগেই দির্শক প্রচণ্ড জোরে তার দিকে এগিয়ে এলো।

ঠিক সেই মুহূর্তেই রক্তাক্ত দু’টি হাত দিয়ে দির্শক বিথীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
সময় যেন হঠাৎ থমকে গেল। বিথীর শরীর বরফের মতো হিম হয়ে রইল। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় জানালাটি সজোরে খুলে গেল, পর্দা ভেদ করে শীতল হাওয়া ছুঁয়ে দিলো তাদের দু’জনকেই। বিথীর মনে হলো সে বুঝি কোনো দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে আছে।
দির্শকের আলিঙ্গন আরও গাঢ় হয়ে উঠল, যেন সে নিজেকে বিথীর মাঝেই বিলীন করে দিতে চাইছে। বিথীর ঘাড়ে মুখ গুঁজে থাকল দির্শক, তবুও শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা অশ্রু বিথীর ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। শীতল স্পর্শে বিথীর চেতনা ফিরে এলো। নড়তে চাইল, কিন্তু পারল না।
সে কোনো কথা বলল না। শুধু আলতো করে দির্শকের পিঠে হাত রাখল। মুহূর্তেই আঙুলে লেগে থাকা তরল অনুভব করে চমকে উঠল বিথী। হাত তুলে তাকাতেই দেখল রক্ত।
বিথীর শরীর কেঁপে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
দির্শক তখন দু’হাতের মুঠোয় বিথীর মুখখানা ধরে, কপাল, দু’গাল, থুতনিতে একের পর এক উন্মাদের মতো চুমু বসাতে লাগল। বিথী তখনও স্তব্ধ হয়ে দির্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। অসহায়, করুণ কণ্ঠে দির্শক বলল,,,

__ আইম সরি, বিথী।
বিথী চোখ জোড়া মুহূর্তেই ভিজে এলো দির্শক এ কথা প্রতিক্রিয়া না দিয়ে সে বললো,,
__ আপনার শরীরের এতো রক্ত কেন?
__ গুলি লেগেছে?
বিথী গাল বেয়ে পানি নামলো,,
__ কে গুলি করছে?
__ পুলিশ?
__ কেন?
__ পাঁচটা খুন করেছি?
বিথী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বিথী, দির্শক ফের বিথীকে বলে,,
__ আমার একটা কথা রাখবে বিথী?
থেমে থেমে বিথী বলে,,,

__ কি…কথা?
__ আমাকে যেভাবে এখন ভালোবাসো সেভাবেই সবসময় সারাজীবন ভালোবাসতে হবে?
তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো বিথী,,,
__ পাগল হতে বলছেন?
__ সে পাগল পাগলামো যেনো শুধু আমার জন্য হয়?
হঠাৎ কিছু একটা ভেবে দির্শকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো,আগের ন্যায় আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বিথীকে।
এসময় হুট করে হতভম্ব হয়ে বিথীর ঘরে প্রবেশ করলেন সিদ্দিকী বেগম ও নাঈম তালুকদার।
মেয়েকে কোন অপরিচিত পুরুষ এভাবে জড়িয়ে ধরেছে বলে ক্ষোপে ফেটে গেলেন,নাঈম তালুকদারের বুঝতেও দেরি হলো না যে এটা দির্শক প্রধান,রাগ নিয়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে এবং রাগ দেখিয়ে বললেন,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৩

__ এই ছেলে এই ছাড়ো, আমার মেয়েকে, ছাড়ো বলছি?
দির্শকের কর্ণপাত হলো কিনা তা বলা বাহুল্য কিন্তু বিথী তার বাবাকে দেখে দির্শকে সাড়াতে চাই কিন্তু পারলো না।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৫