Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৮
জান্নাতি আক্তার জারা

দুপুর ১২:৫৮ আরাত মিরা সন্ধ্যা তিনজন গল্প করতে করতে টিফিন পিরিয়ডে কেন্টিনে এসে বসলো। মিরা বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে। তিনজন বসতেই দেখলো তাঁদের কে নিয়ে আশেপাশে বসা মেয়েদের ফিসফাস করতে। সন্ধ্যা পিছু ফিরে তাঁদের কিছু বলতে যাবে আরাত সন্ধ্যা কে বাঁধা দিলো।

__”বাদ দে, হুদাই টাইম নষ্ট।
__”ওরা আমাদের নিয়ে কিছু বলছে! আর তুই বাদ দিতে বলছিস ?
__”যেহেতু আমাদের নিয়ে বলছে , তাহলে ভাব আমরা সেলিব্রেটি।
আরাতের কথায় মুচকি হাসলো মিরা। সন্ধ্যা মুখ বাঁকা করে বলল,
__”উমমম সেলিব্রিটি এসে গেছে, তোর ফেসবুকে কয়টা লাইক পড়ে বলতো?
__”আমার পিক যদি আপলোড দিতাম, ফেসবুকে আগুন লেগে যেতে আগুন।
__” ও রিয়েলি বেবি!
__”হ্যাঁ, আমি চাইনা ফেসবুক বাসিন্দারা আগুনে ঝলসে যাক। আর তোর এই বেবি সোনা হাবীব ভাইয়া কে গিয়ে শুনা বেচারা খুশি হবে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

__”সে আমাকে পেয়েই খুশি।
দুজনের কথায় শব্দ করে হেঁসে উঠলো মিরা। তাঁদের খুনসুটি মধ্যে কোথায় থেকে একদল মেয়ে এসে তিনজনের সামনে দাঁড়ালো।
__” এখানে আরাত কে?
একদল মেয়ের মধ্যে শার্ট প্যান্ট পরিহিত একটা মেয়ে। মাথার চুলগুলো বেবি কাটিং দেওয়া। দেখে মনে হচ্ছে বড়লোকের মেয়ে আদরে আদরে বাঁদর হয়ে গেছে। আরাত দের নিজের দিকে ভ্রু কুচকে পা থেকে মাথা অব্দি পরক করতে দেখে মেয়েটা এবার উচ্চ স্বরে বলল,

__”হেই আমার মুখে কী গবেট লেখা আছে?
__” নো!
__”তাহলে কথার উত্তর না করে গবেট দের মতো তাকিয়ে আছো কেনো?
মিরা মেয়েটার উচ্চ স্বরে কথা বলায় চমকে ওঠলো। মিরা উওরে মেয়েটা পুনরায় কথাটা বলতে। আরাত মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলল,
__” গবেট লেখা নেই! বাট আপনার শরীরে পাকনামি পাকনামি ভাব আছে।
__” হোয়াট নন্সেন্স আর ইউ টকিং এবাউট?
“বাপ রে ইংরেজি! ইংরেজি তো আমি জানিও না বে। কিছু তো বলতে হবে, নয়লে মান সন্মান চলে যাবে! হাউ হিজুমে ভাংচালাখানা কদম তলায় চিড়িয়াখানা। বাপের বাড়ি দুমকা শ্বশুর বাড়ি বাঁকুড়া হিজুমে হিজুম
মেয়েটার রাগ যেন বেড়ে গেলো আর মেয়েটার সঙ্গে আসা বাকি মেয়েদের থেকে শুরু করে পুরো কেম্পাস শব্দ করে হেঁসে উঠলো। সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে হাতের তালি দিতে দিতে বলল,

__”সেই দিয়েছিস! পুরোই রিল-সের কামাল।
মেয়েটা রাগে টেবিলে উপর শব্দ করে হাত রাখলো। রাগী গলায় আরাত কে বলে,
__”হু আর ইউ ননসেন্স?
__” আইএম ননসেন্স! ও সরি আইএম আরাত, যাকে
খুঁজতে এসে আপনি পাকনাকি করছেন।
__”হোয়াট ইস গোয়িং ও হেড়ে? (এখানে কী হচ্ছে)
মাহিরের কন্ঠে হটাৎ সবার হাসাহাসি বন্ধ হয়ে গেলো।
মেয়েটা আরাত তের সঙ্গে কথায় পেয়ে উঠলো না। মাহির আরশ রাফি কে আসতে দেখে পরিবেশ টা নীরব দেখা গেলো। মাহির ক্যাম্পাসে পা দেওয়ার পর থেকে তার নজর আরাতের উপর। রাফি আশেপাশে তাকাতে বাদবাকি মেয়েরা যারযার মতো ব্যস্ত হয়ে পরলো। দেখা গেলো শুধু প্যান্ট শার্ট পরিহিত মেয়েটাকে। তার নজর আরাত আর মাহিরের উপর। আরাত মাহিরের তাকিয়ে থাকা চোখে চোখ রেখে পুনরায় ফিরিয়ে নিলো। শার্ট প্যান্ট পড়া মেয়ে টা আরশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখতে আসলাম, মেয়েটার মধ্যে কী এমন রয়েছে। যার জন্য ছেলেদের তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ব্রো মেয়েতো নয় যেন জলন্ত আগুরে ফুটন্ত খই।
শার্ট প্যান্ট পরিহিত মেয়েটা ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গেলো। আরাত, মেয়েটার প্রথম কথার অর্থ বুঝতে না পেয়ে রাফির দিকে তাকালো। রাফি কথা ঘুড়াতে আরাতের কাছে আইরা কথা জানতে চাইলো।

__” আমার আপন বিয়াইন কেমন আছে বিয়াইন?
__” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে বিয়াই সাব।
__” তাঁর ভালো থাকা মানে আমার ভালো থাকা। ওর একটু খেয়াল রাখবে আরাত। ওকে সবকিছু থেকে বের করতে তোমার হেল্প লাগবে।
আরাত বিস্মিত চোখে রাফির দিকে তাকালো। রাফির চোখ রাফির কথা বলা, বলে দিচ্ছে আইরার সবকিছু রাফির জানা। আরাত একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিলো। আইরার জীবনে একজন দায়িত্বশীল মানুষ আসতে চলছে। যে সবকিছু যেনে বুঝে আইরা কে আপন করতে চায়। কিন্তু আইরা কে আগে সবকিছু থেকে বের করতে হবে। আরাত নিজের ভাইয়ের অবহেলিত নারীকে নিজে যতটুকু সম্ভব হেল্প করবে। আইরা কে বুঝাবে সামনে তার জন্য সুন্দর একটা জীবন অপেক্ষা করছে । কথাগুলো ভেবে মুচকি হেসে পুনরায় প্যান্ট শার্ট পরিহিত মেয়েটার শেষের কথা মনে আসতেই রাফির কাছে জানতে চাইলো,

__”ভাইয়া মেয়েটা কী বলে গেল! ছেলেদের আমার থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে মানে?
__”এখন ক্লাসে যাও আরাত, আমাদের লেট হয়ে যাচ্ছে। আমরা বের হবো এখন, চল আরশ।
রাফি পুনরায় কথা ঘুড়িয়ে আরশ কে নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে দ্রুত পায়ে বের হচ্ছে। আরাত রাফি থেকে চোখ ঘুড়িয়ে মাহিরের দিকে রাখলো। মাহির আরাত কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে। ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট টা শরীরে পুনরায় ঠিক করে নিতে নিতে বড়বড় পা ফেলে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গেলো।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলল, আনাস সকাল থেকে অফিসে মন স্থির করতে পারছে না। সকাল বেলা বোনের কথাটা মনের অজান্তেই একদম বুকে গিয়ে লাগছে। তুমি আইরা আপুর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না। কথাটা মনে পরতে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে রাখা বন্ধ চোখ বিরক্তিতে খুলে গেলো। নিমেষেই রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। টেবিলে রাখা ফাইল গুলো ছুড়ে ফেলে মাথার উশখুশ চুলগুলো দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরে নিজের রাগগুলো ঝেরে ফেলতে চাইলো,

__”কেনো! কেনো! কেনো! কেনো মনটা ছটফট করছে। কেনো মনটা অস্বস্তিতে ভরপুর হয়ে আছে। কোনো কিছু ভালো লাগছে না, কেনো। উফফফ আই ফীল ডিসগাস্টেড। আই হেট মাই ফিলিং।
আনাস বাইকের চাবি নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে গেলো। অন্ধকার নির্জন ফাঁকা বাগানে এসে বাইক টা দাঁড়ালো। চারপাশে বড়বড় গাছগাছালি ছাড়া কিছু নজরে পরছে না। সঙ্গে পাখির নীরব টুকিটাকি কিচিরমিচির। আনাস প্রায় আধাঘন্টা ধরে অন্ধকার আকাশে একফালি চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে। সিগারেট টানতে টানতে নিজের জীবনের হিসাবনিকাশ করতে ব্যস্ত।

__” আমার কেনো এমন লাগছে। ইরার সঙ্গে বাজে বিহেভ করাতে আমার ভিতরে অস্বস্তিকর লাগছে কেনো। আচ্ছা আমি কী ওর কাছে একটা সরি বলে দিবো! না না সরি বললে আবার পাগলামো শুরু করবে প্রয়োজন নেই সরি বলার। উওওও আনাস কূল ডাউন, কূল ডাউন নিজেকে শান্ত কর।
__এভাবে চলছে না আমার, তোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে। হ্যাঁ আমি কথা বলবো তোর সঙ্গে। শুধু সকালটা হতে দে ইরা। আমি আমার মনের ছটফটানির কারণ তোর কাছে জানতে চাইবো। তোকে বলতে হবে তোকে ঘিরে আমার কেনো এমন লাগছে, কেনো।
আনাস বাইকে ওঠে বিষন্নতা মন নিয়ে চললো তালুকদার বাড়ি দিকে। ফর্সা শরীরে মেরুন রঙের ঢিলেঢালা শার্ট টা বাতাসের তালে তালে ফুলে ফুলে উঠছে। উশখুশ চুল বিষন্ন মন নিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে আনহা শেখের চোখে পরলো আনাস। আনহা শেখ ভাইয়ের ছেলেকে পরক করলেন।

__”আনাস দাঁড়া! তোকে এমন লাগছে কেনো ?
আনহা শেখের কথায় আনাস দাঁড়িয়ে গেলো। আনাস মাথা ঘুরিয়ে আনহা শেখ কে দেখলো একবার পুনরায় আশেপাশে তাকিয়ে আইরা কে খুঁজলো। ড্রয়িং রুমে রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার আর আনহা শেখ কে দেখতে পেয়ে আনাস আনহা শেখের দিকে চেয়ে বলল,

__” ফুপি ইরা কই?
__”আইরা তো আরাতের রুমে! কেনো ও কী তোকে আবার বিরক্ত করছে ?
__” এতদিন সামনাসামনি করতো, এখন কল্পনাতে শুরু করছে, বিরক্তিকর অনূভুতি।
আনাস আনহা শেখের কথার উত্তরে বিরবির করল। নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে পুনরায় বলল,
__”না ফুপি, তোমরা গল্প করো আমি ফ্রেশ হতে গেলাম।
আনাস ধীরপায়ে সিড়ি বেড়ে উপরে উঠছে। সিঁড়ির প্রথমে আরাতের রুমে সামনে আসতে আইরা রুম থেকে নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্য বের হইলো। দুজন সামনাসামনি। আনাস সের চোখ আইরার মুখময়ে বিচরণ করছে। আইরা আনাস কে পাশকাটিয়ে চলে যেতে নিলে আনাস শান্ত কন্ঠে পিছু ডাকলো,
__”ইরা?
আইরা আনাস সের ডাক অগ্রহ করে সিড়িতে পা রাখতে যাবে। আনাস দ্রুত পায়ে আইরার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো।
__” এভোয়েড করছিস কেনো?
__”আপনাকে এভোয়েড করার কারণ দেখছিনা?
আইরা কে বিরক্তি মুখে কথা বলতে দেখে আনাস অবাক হলো। যে আইরা এতদিন আপনি থেকে তুমি বলে ডাকা নিয়ে আনাস সের সঙ্গে ঝগড়া করতো। সেই মেয়ে ডিরেক্ট নিজে থেকে আপনি বলে সম্বোধন করছে। আনাস নিচে মাথা ঘুরিয়ে ড্রয়িং রুমে মা ফুপি কে দেখে নিলো। মা ফুপিরা গল্পে মসগুল। আনাস আইরা দিকে তাকিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলো,

__”এভাবে কথা বলছিস কেনো! তোর মুখে আপনি ডাকটা মানাচ্ছে না।
__”তুমি ডাকটা সবার জন্য না। অন্তর থেকে আসে কাছের মানুষের জন্য।
__”আমি তোর কাছের মানুষ না?
আনাস সের প্রশ্নে আইরা। আনাস সের দিকে তাকালো। আনাস পূর্ব থেকে আইরা দিকে প্রশ্নভরা চাওনি তাক করা ছিলো। আইরা পুনরায় চোখ ঘুড়িয়ে অন্য দিকে ফিরালো। কিছুটা সময় নিয়ে উওর করলো
__”ছিলেন একসময়।
কথাটা বলে পুনরায় আনাস কে পাশ কেটে যেতে নিলো। আনাস আইরা হাত টেনে ধরে আরাতের রুমের দেয়ালে সঙ্গে চেপে ধরে বলে উঠলো।

__”তোর প্রবলেম কী হ্যাঁ! কেনো পালাচ্ছিস আমার থেকে। তুই কেনো বুঝতে পারছিস না। আমি প্রতি টা মুহূর্তে মেজাজ হারাচ্ছি। হুট করে কোথাও থেকে রাগ এসে ভর করে আবার একটু পরই বিষন্নতা চেপে ধরছে। এই যে মিনিটে মিনিটে অনুভূতি পাল্টাছে এটা নিয়ে আমি নিজেও এখন খুব ক্লান্ত। আমি জানি না আমার কি হয়েছে জানি না কি করার দরকার! জানি না আমার কিসের অভাব! কিসের কমতি। আমি নিজের এতো বদলানোর কারণ টাও খুঁজে পাচ্ছি না। আমাকে এই অনুভূতি থেকে মুক্ত কর ইরা প্লিজ।

আইরা কষ্টভরা চোখে তাকালো। নিজেকে কঠোর বানাতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভালোবাসার মানুষ কে ছটফট করতে দেখে নিজেকে এলোমেলো লাগছে এখন। যার জন্য পুরো এক সপ্তাহ তালুকদার বাড়িতে পা ফেলে নাই। নিজের অনূভুতি গুলো থেকে বাঁচতে সারাদিন উপন্যাসের মুখ গুঁজে ছিলো। নিজেকে খুব কষ্ট করে সামলাছে। তবুও মনকে কঠোর বানাতে পারে নাই। দূরে থেকে আরো বেশি করে ভালোবাসার পুরুষের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে। দিনকে দিন ভালোবাসার প্রতি ভালোবাসা বেড়েই চলেছে। কিন্তু মানুষটার প্রতি ঘিন্না জন্মিছে। নিজের আত্মসম্মানে আঘাত হানছে। অনেক তো ছোট হলো আর না। এবার নিজেকে ছোট করবে না আর। আইরা নিজেকে সামলে নিয়ে আনাস সের হাত থেকে নিজের হাত ঝাড়া মেরে বের করে নিয়ে কান্নাভরা কন্ঠে উচ্চ স্বরে বলল,

__” আপনি আমার হাত ধরেছেন কার অনুমতি নিয়ে। একটা ছেলে হয়ে একটা মেয়ের হাত ধরতে লজ্জা করে না। আমার চরিত্র কে ছোট করে আপনার স্বাদ মেটেনি। আবারো আমাকে চরিত্রহীন প্রমান করতে পথ আটকে ধরেছেন। হ্যাঁ আমি চরিত্রহীন আপনাকে আর প্রমান করতে হবে না। চরিত্রহীনের হাত ধরতে ঘিন্না লাগছে না আপনার?
__” ইরা…..
অসহায় চোখে আইরা কে দেখছে আনাস। আইরা আনাস সের চোখে চোখ রেখে পুনরায় বলল
__” বুকের ভিতর কষ্ট হচ্ছে তাইনা? আমারও সেম লাগতো। আমি কষ্টগুলো সহ্য করে নিতাম।
আনাস পুনরায় আইরা হাত চেপে ধরে,
__”বাট আমি সহ্য করতে পারছি না ইরা!
__” কেনো পারছো না ভাইয়া! আইরা আপু তো তোমার থেকে দূরে থাকছে। তোমাকে বিরক্তি করে না তাহলে তোমার তো দিনগুলো আনন্দে কাঁটার কথা?

হটাৎ আরাতের কথায় দুজনে আরাতের দিকে তাকালো। আনাস দ্রুত আইরা হাত ছেড়ে দিয়ে বোনের দিকে তাকালো। ছোট বোনকে প্রশ্ন করতে দেখে আনাস উওর করতে পারলো না। চুপচাপ তাকিয়ে একবার আরাত তো আরেকবার আইরা কে দেখছে। আরাত এতক্ষণ রুমের ভিতরে ছিলো। আইরা বের হওয়ার পরপর আরাত রুম থেকে বের হতে যাবে। আনাস সের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে দরজার আড়ালে দাড়ালো। সবকিছু আড়াল থেকে শুনছিলো এতক্ষণ। আনাস সের শেষের কথায় চুপচাপ দাড়িয়ে থাকতে পারলো না। রুম থেকে বের হয়ে প্রশ্নগুলো করলো আরাত।
__” কী ভাবছো ভাইয়া! তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। একটা চরিত্রহীন মেয়ে তোমাকে আর বিরক্ত করে না?
__” বুড়ী আমি এটাই মেনে নিতে পারছি না। ও কেনো আমাকে বিরক্ত করছে না। ও কেনো আগের মতো পাগলামি করছে না?
পুনরায় আরাতের সামনে আইরা দুহাত ধরে বলতে লাগলো,
__” এই ইরা আই-এম সরি! দেখ আমি রাগের মাথায় তোর সঙ্গে মিস বিহেভ করেছি। প্লিজ আগের মতো হয়ে যা প্লিজ!

__” বারবার আপনি একজন চরিত্রহীন মেয়ের হাত ধরছেন। যে মেয়ের চরিএ ঠিক নেই সেই মেয়ের থেকে দূরে থাকা ভালো।
আনাস অপরাধী চোখে দেখছে শুধু। আইরা আফসোসের নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলতে শুরু করল,
__” জানেন তো খুব আফসোস হয়। কি করলাম কেন করলাম কার জন্যই বা করলাম। যার কাছে আমার অনূভুতি গুলো অবহেলিত। তার কাছে আমি আমার অনূভুতি ঢেলতে এসেছিলাম। অবশেষে চরিএহীনের তকমা নিয়ে ফিরলাম। এটাই আমার ভালোবাসার প্রতিদান। আমি মেনে নিয়েছি আর সুখেও আছি…
আইরা কথায় মধ্যে হটাৎ আনাস সের গালে থাপ্পড়ের শব্দ শুনা গেলো। আরাত আইরা আনাস তিনজনের উচ্চ স্বরে কথা বলায় নিচ থেকে আনহা শেখ রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার। তিনজন উপরে উঠে এলো। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ছেলেমেয়ে কথা গুলো অবাক নয়নে দেখছিলো শুনছিলো। আদিবা তালুকদার ছেলের অপরাধ বুঝতে পেয়ে হটাৎ নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেয়ে। দ্রুত পায়ে গিয়ে আনাস কে থাপ্পড় দিলো। আরাত আইরা চমকে ওঠে তাকালো। আনাস গালে হাত দিয়ে মায়ের দিকে অপরাধী চোখে চেয়ে আছে। আরাত নিজের মা কে ভাইয়ের গালে থাপ্পড় দেওয়াতে এগিয়ে গিয়ে আদিবা তালুকদার বলল,

__” মা শান্ত হও।
রাবেয়া তালুকদার বললেন,
__” ছোট আমরা বসে কথা বলতে পারতাম। এতবড় ছেলের গায়ে হাত দিলি কেনো?
__” ভাবি আমাদের সবার চোখে আইরা পাগলামো গুলো পড়ে আর ও। আমি মেনে নিলাম আইরা কে ওর পছন্দ না। তাই বলে চরিত্রহীন বলবে। ওর চোখের সামনে ছোট আইরা বড় হয়ে উঠছে।
__” মা প্লিজ শান্ত হও, ভাইয়া কে আর বকো না।ভাইয়ার খারাপ লাগছে প্লিজ মা।
__” ভাবি শান্ত হন, এতে আনাস সের দোষ নেই। আমার মেয়ে যদি আনাস কে বিরক্তি না করতো তাহলে এমন টা হতো না। আমি এতদিন ভেবে এসেছি ভাইবোন যেভাবে ঝগড়া করে আবদার করে বিরক্তি করে। আমার মেয়ে সেভাবে আনাস সের সঙ্গে পাগলামো করে বেড়ায়।
আনহা শেখ এবার আনাস সের দিকে তাকালো। আনাস অপরাধী চোখে ফুপি কে বলল,

__” আই এম সরি ফুপি,
__” সরি কেনো বলছিস পাগল, তুই তোর জায়গা থেকে ঠিক আছিস। জানিস তো আমার প্রথম সন্তান তুই আর তাকবীর। আমার বিয়ের পরপর যখন জানতে পারলাম তোরা এই দুনিয়াতে তোর বাবা-মার কোল আলো করে আসতে চলেছিস। আমার খুশির কমতি ছিলো না। আমি এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি প্রতিদিন ছুটাছুটি করতাম। তোরা যখন দুনিয়ায় মুখ দেখলি তখন আমি তোদের নিজের হাতে মানুষ করেছি। গোসল করিয়ে দিয়েছি। খাবার খাওয়াছি। নিজ হাতে বড়ো করেছি। তোদের প্রতি টান টা আমার বরাবরই। যেমন একটা মায়ের থেকে থাকে। তুই বড়ো হতে চললি আমার কোলের আলো হয়ে আরিশা জন্ম হইলো।

তখন আলেদা শান্তি খুঁজে পেলাম। নিজের অস্তিত্ব কে নিজের হাতে বড়ো করতে থাকলাম। তখন নিজে নিজে অনুভব করলাম। তোদের থেকে আমার মেয়েকে বেশি ভালোবাসি আমি। ভাবিস না এজন্য তোদের প্রতি আমার ভালোবাসা কমে গেছে।আগের মতো আছে আর থাকবে। আরিশা পরপর আমার আইরা দুনিয়াতে আসলো। তাকেও ছোট থেকে আমার ভালোবাসা আমার যত্ন আমার স্বভাব দিয়ে বড়ো করে তুলছি। আমি জানি আমার মেয়ে কেমন। হয়তো তুই রাগের মাথায় ছিলি এই সময় আমার মেয়ে তোকে বিরক্তি করছে। তাই বলে আমার মেয়ে চরিত্রহীন হয়ে যায় নাই! আমার মেয়ে পবিত্র। আমার মেয়ের আত্মসম্মান রয়েছে।
আমি জানতাম না তোদের মধ্যে এতকিছু ঘটে গিয়েছে। এখন জালনাম। আজকের পর থেকে তোর আশেপাশে আমার মেয়ে কে দেখবি না কথা দিলাম। আমি বরাবরই আমার আইরার থেকে তোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। তুই আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিলে আমার খারাপ লাগতো না। আমি মেনে নিতা,কিন্তু তুই আমার মেয়ের চরিত্র নিয়ে কথা বলছিস।
আনহা শেখ মেয়ের হাত ধরে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিচে নামতে নামতে বলল,

__ ” ভাবি কালকে আরিশার শশুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য রেডি থাকেন। ভাইদের রেডি থাকতে বলেন, রাত হয়ে যাচ্ছে আসলাম আমি।
আনহা শেখ আইরা কে নিয়ে চলে গেলো। আদিবা তালুকদার ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন। আরাত আর রাবেয়া তালুকদার দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে আনাস নিজের রুমে গিয়ে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো। মূলত আইরা আর আনহা শেখ তালুকদার বাড়িতে এসেছি। আরিশা শশুর বাড়ি থেকে কালকে দাওয়াত। আনহা শেখ নিজের ভাই আর ভাবিদের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। আজকে রাত আনহা শেখ তালুকদার বাড়িতে থাকতেন। আতিফ শেখ রাতে তালুকদার বাড়িতে আসতো। আইরা তালুকদার বাড়িতে আসতে চাইছিলো না। কিন্তু আনহা শেখ মেয়ে কে একা বাড়িতে রাখতে নারাজ ছিলো বিধায় আইরা প্রায় এক সপ্তাহ পর বাধ্য হয়ে এসেছিল তালুকদার বাড়িতে।

রাত সাড়ে এগারোটা। আরাতের চোখে ঘুম নেই। নিজেকে খুব একা লাগছে। ভাইয়ের সঙ্গে আজকে বেশ তর্ক করেছে। আনাস ভিতর থেকে দরজা লাগানো পর আরাত অনেকবার আনাস কে ডাক ডেকেছিলো আনাস দরজা খুলে নাই। আরাত রাহিমা সুলতানা সঙ্গে ভিডিও কলে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললো। চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না বিধায় ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলো। স্ক্রল করতে করতে হটাৎ একটা আইডি চোখে পড়লো। ইংরেজিতে লেখা আজান তালুকদার তাকবীর। নামটা বিরবির করে পড়তে চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তাকবীরের নরম ঠোঁটে ছোঁয়া। আরাত ব্যাপারটাতে বেশ লজ্জিত। লজ্জিত হয়ে তাকবীরের থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেদিন আর তাকবীর কে চোখে পড়ে নাই। কথায় কথায় রাবেয়া তালুকদারের মুখে শুনেছিলো তাকবীর দেশে নেই। কথাটা আরাতের জন্য সুখবর ছিলো। তাকবীরের সামনে আর পারতে হবে না। আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। সেদিনের দৃশ্যটা স্মৃতিচারণ হতে আরাত নিজের মনকে সান্তনা দিতে ভাবলো। প্রায় সপ্তাহ পার হতে চললো তাকবীর দেশে নেই এতদিনে ব্যাপারটা ভুলে গেছে।

কথাগুলো ভেবে পুনরায় আরাত অবিশ্বাস্য হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো আইডি নামটা। প্রোফাইলে পিকে তাকবীরে পিক। পিকটা এমন তাকবীর ব্ল্যাক হুডি পরিহিত মাথায় ব্ল্যাক কেপ। গাড়ীর ডাইভিং সিটে বসা। স্টারিং এর উপর একহাত, আরেক হাত দিয়ে কানে ফোন গুঁজা।
হয়তো পিক ওঠানোর সময় কারো সঙ্গে কথা বলছিলো। কথা বলার মধ্যে হটাৎ কেউ তাকবীর কে পিছু ডেকেছে তাকবীর ভ্রু কুঁচকে পিছু ঘুরতে।পিকটা উঠানো হয়েছে। আরাত পিকটা অবাক চোখে দেখছে। আরাতের জানা মতো তাকবীর কখনো পিক ওঠায় না। প্রোফাইল পিকটা দেখে বুঝা যাচ্ছে কেউ ইচ্ছা করে হটাৎ তাকবীরের পিক ওঠাছে। তার থেকে বড়ো কথা তাকবীরের ফেসবুক আছে। আরাত পুরো প্রোফাইল ঘুরে শুধু দুটো ক্যাপশন ছাড়া আর কিছু খুজে পেলো না। একটা ক্যাপশন লেখা,

__” উপরওয়ালা আমাকে আরো ধৈর্যশালী করুক,আমি আরো নীরব হতে চাই।
আরাত মনে মনে ক্যাপশন টা পড়ে ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,
__” উমমম আমি আরো নীরব হতে চাই। সারাদিন মুখ দিয়ে গুনে গুনে দুটো কথা বের করে না আরো নীরব হতে চায়। হয়তো বোবার জায়গায় মিস্টেক করে নীরব লেখে ফেলায় ছে।
আরাত একা-একা বিরবির করে হেঁসে উঠলো। পুনরায় আরেকটা ক্যাপশন পারতে লাগলো। ক্যাপশন টা চল্লিশ মিনিট আগে আপলোড দেওয়া।

__” তোমাকে ভালোবাসতে ভালো লাগে, তোমাকে না পেয়েও ভালোবাসতে ভালো লাগে।
আরাত ক্যাপশন টা একবার পড়ার পর অবিশ্বাস্য হয়ে শুয়া থেকে বিছানায় বসে পরলো। হাত দিয়ে চোখ কচলে বারবার পড়তে লাগলো। না ভুল দেখছে না। আরাতের মন উৎফুল্লতা ভরে উঠলো। কাকে দেখানো যায়, এতো রাতে কেউ জেগে নেই। কারো সঙ্গে শেয়ার করতে না পেলে আজকে আর চোখে ঘুম ধরা দিবে না। আরাত বিছানায় ওঠে এলোপাতাড়ি নাচতে নাচতে উচ্চ স্বরে বলে উঠলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৭

__” বীর ভাইয়া প্রেমে পড়েছে, আমাদের গম্ভীর ভাইয়া ভালোবাসে। কিন্তু কাকে….
কে সেই মেয়ে হটাৎ কথাটা মাথাতে আসতেই আরাত নাচানাচি বন্ধ করে চিন্তিত মুখে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ ভেবে মুখে হাসি ফুটে উঠলো,
” হানিয়া আপু! তারমানে হানিয়া আপু কে বীর ভাইয়া লাইক করে। রশ্মির বাচ্চা তোর উপর রাগ করে আমি তোর সঙ্গে কথাগুলো শেয়ার পর্যন্ত করতে পারছি না। আমার মনের অস্থিরতার দায়ভার সব তোর।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৯