তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৮
জান্নাতি আক্তার জারা
রাফির সঙ্গে আরশ কেউ আসতে দেখা গেলো বিয়ের বাড়িতে। আইরা মাথা নিচু করে হাত কচলাতে লাগলো। দূর থেকে রাফি আইরার মনোভাব বুঝতে পেয়ে মলিন হাসলো। স্টেজের কাছে এসে প্রথমে আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো দুজন। আরশ আর রাফি কে আসতে দেখে আরাত মাথা ঘুরিয়ে রাফির পেছনে তাকালো। কিন্তু না যাকে দেখার আশায় পেছনে তাকালো সেই বেইমান কে দেখতে পেলো না। রশ্মিও রাফির পেছনে তাকালো এবং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রাফি হাতে রাখা গিফট বক্সটা আরাতের সামনে ধরলো। আরাত মলিন মুখে গিফট বক্স নিয়ে নিয়ে রশ্মির কাছে রাখতে দিলো। সবাই চুপচাপ, কোথায় থেকে কথা শুরু করবে ভেবে পেলো না। হটাৎই এতদিনের ভাবনাগুলো মিথ্যা হয়ে ধরা দিলো। মিথ্যা ভালোবাসার জন্য সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। রাফি আরশ নীরবতা পালন করলো, পুনরায় সবকিছু সাইটে রেখে মুখে হাসি টেনে রাফি আরাত কে বলে,
___” দোয়া করি আল্লাহ নিকট, ব্রো আর তোমার নতুন পথ চলা সুখময় হয়ে উঠুক। বড় ভাই হিসাবে একটা কথায় বলল,মন থেকে অতীত ভুলে যাও। তোমার অতীত থেকে বর্তমান খুব সুন্দর। সবকিছু তোমার উপর, তুমি চাইলেই তোমার বর্তমান সুন্দর।
রাফির কথায় আরাত মুখে হাসি টেনে উওর করলো,
___” ইনশাল্লাহ ভাইয়া, দোয়া করবেন।
রাফিও হাসলো। আরশ আরাতের দিকে অপরাধী চোখে চেয়ে ছিল এতক্ষণ। রাফির কথা বলার পরে আরশ আরাতের সামনে দাঁড়ালো, আরাত কিছু বলল না আরশ আশেপাশে তাকিয়ে বড়দের দেখল। কাউকে আশেপাশে দেখতে না পেয়ে মলিন মুখে বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___” আই এম সরি আরাত, কোথাও না কোথাও তোমার মন ভাঙ্গার জন্য আমিই দায়ী। তোমার অপরাধী আমি। আমি যদি মাহির কে জোর না করতাম তাহলে মাহির হয়তো তোমার সঙ্গে প্রতারণা করতো না….
আরশের কথা বলার মধ্যে আরাত মুচকি হেঁসে উঠলো, সবাই অবাক হলো এতে। আরাত মুচকি হেঁসে বলল,
___” ভাইয়া আপনি কেনো সরি বলছেন। যার সরি বলা দরকার, তাঁর চোখে অপরাধের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। আপনার বন্ধুর দুঃসংবাদ কী জানেন! আমি তাঁকে কখনো ক্ষমা করবো না, কখনোও না।
আরশ আর কিছু বলল না। মলিন মুখে আরাতের কয়েকটা পিক তুলে নিলো। আইরা এতক্ষণ আরাত আর আরশের কথা শুনছিলো। রাফি কে নিজের পাশে দাঁড়াতে দেখে পুনরায় চোখ নামিয়ে নিলো।রাফি এতে মুচকি হাসলো, পকেট থেকে ছোট একটা বক্স বের করে আইরার সামনে ধরলো,
___” আপনার জন্য আমার তরফ থেকে ছোট একটা উপহার।
আইরা চোখ তুলে রাফির হাতের দিকে তাকালো। রঙ্গিল কাগজে ছোট একটা বক্স। আইরা পুনরায় রাফির দিকে তাকাতেই রাফি হাসি মুখে ছোট বক্সটা নিতে বলল। আইরা হাত বাড়িয়ে বক্সটা নিয়ে নিলো।
___” আজকে বক্সটা খুলে আপনার সুন্দর রাতটা নষ্ট করবেন না প্লিজ।
আইরা রাফির কথায় অবাক চোখে তাকালো। রাফি পুনরায় মুচকি হেঁসে বলল,
___” ভয় পাবেন না, এখানে আমার জমানো অনুভূতি আছে। যা আমার কাছে থাকলে আপনার কথা বারবার মনে পরবে। আমি আর আপনাকে মনে করতে চাই না। অবশেষে যে আপনাকে সারাজীবনের জন্য পাইলো, তাঁর সঙ্গে সুখী হন। আপনাদের ভালোবাসায় কখনো কমতি না আসুক। আমি এক হতভাগা, জানতাম আপনার মনে অন্যের বসবাস, তবুও বেপরোয়া অবাধ্য মন কথা শুললো না। যেচে পড়ে কষ্ট পেতে মরিয়া হয়ে উঠলো।
রাফি আর কিছু বলল না। চুপচাপ জায়গা ত্যাগ করলো। বড়বড় পা ফেলে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। রাফির যাওয়ার দিকে সবাই চেয়ে রইলো আরশ রাফির পিছু রাফি কে ডাকতে ডাকতে দ্রুত পায়ে যেতে নিলো। হটাৎই বুকের এক পাশে কারো মাথা এসে ধাক্কা লেগে গেলো। সামনের মেয়েটা ধাক্কা খেতেই দুপা পেছনে সরে দাঁড়ালো। আরশের যাওয়ার পথে ব্যাঘাত ঘটায় রাগ উঠে গেলো মাথায়,
___” তুমি…?
___” হ্যাঁ আমি, আপনার চোখ কী অন্ধ এভাবে একটা মেয়ের সঙ্গে দিনদুপুরে ধাক্কা খাচ্ছেন?
মিমের কথায় আরশ রেগে গেলো। তিশা অবাক হয়ে দুজন কে দেখছে শুধু। আরশ রেখে বলল,
___” ও হ্যালো অন্ধ কাকে বলছো?
___” কেনো আপনাকে, অদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কী আপনার বোধবুদ্ধি চলে গেছে?
___” জাস্ট শাটআপ মূর্খ মেয়ে, চোখের সামনে একটা জলজ্যান্ত মানুষ হেঁটে চলছে, চোখ থাকতে ধাক্কা খাও কিভাবে?
মিম আরশের কথায় আমতা আমতা করতে লাগলো। মিম আর তিশা মিলে গল্প করতে করতে স্টেজের দিকে আসতে ছিলো। দুজন গল্পের এতটা মগ্ন ছিলো সামনে কে আসছে সেদিকে তাঁদের খেয়াল নেই। হাঁটতে হাঁটতে হটাৎ আরশের বুকের এক পাশে ধাক্কা লেগে যায়। মিমের কথা যাই হয়ে যাক দোষটা যারি হো না কেনো। প্রশ্ন কমন না আসলেও খাতা খালি রাখা যাবে না,
___” আমি তো ভেবেছি সামনে কোনো লম্বা খাম্বা দাঁড়িয়ে আছে। আমি যদি জানতাম শহরের শিক্ষিত পন্ডিত মশাই আসছে। তাহলে এই রাস্তা দিয়ে না দরকার পরলে আকাশ দিয়ে উঠে উঠে যাইতাম।
মিমের কথায় আরশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___” আকাশ দিয়ে পরী উরে ওকে, তোমার মতো গ্রামের মূর্খ ক্ষেত না, যেইনা চেহারা সে নাকি আকাশ দিয়ে উড়বে ক্ষেত কোথাকার। আগে নিজের মুখটা সাবান লাগিয়ে পরিবর্তন করো যতসব।
মিমের চোখে পানি এসে গেলো, চেহারা নিয়ে খুঁটা দেওয়া সহ্য করতে পারলো না। হ্যাঁ সে একটু শ্যামা পুরো মুখ জুড়ে মায়া লেগে আছে। কিন্তু সে একেবারে মোটেও কালো না। আরশ চলে যেতে নিতেই সামনে রুপোলী বেগম কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। আরশ দাঁড়িয়ে গেল রুপোলী বেগম আরশের দিকে ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে আছেন। এতদিন আরশ কে খুব শান্ত আর ভালো ছেলে ভেবে এসেছে।সুন্দর চেহারার পেছনে সুন্দর ব্যবহার গড়ে তুলতে পারি নি ছেলেটা। নিজের মেয়ের নামে বাজে কথা শুনতে তিনি নারাজ। আরশ যেন নিজের মধ্যে ফিরে এলো এতক্ষণ রাগের মাথায় কী বলছে বুঝতে পারলো। রুপোলী বেগমের থেকে চোখ ফিরিয়ে পেছনে মিমের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। মিমের আরশের উপর সত্যি সত্যি ভিষণ রাগ উঠে গেলো। রাগ নিয়ে বলল,
___” মানুষের চেহারায় না ব্যবহারে সৌন্দর্য থাকাটা জরুরি, যেটা আপনার মধ্যে নেই। আর আমি কারো জন্য নিজেকে বদলাতে পারবো না। আমি যেমন তেমনি থাকবো। আমার মা-বাবার চোখে সুন্দর থাকলেই আমার জন্য যথেষ্ট।
মিম তিশার হাত চেপে ধরে বড়বড় পা ফেলে সামনে চলে গেলো। আরশ মিমের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত চোখে পুনরায় রুপোলী বেগম কে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। রুপোলী বেগম মেয়ের কথায় তৃপ্তি পেলাম। হাসি মুখে তিনিও স্টেজের দিকে এগুলেন।
___” প্রবলেম কী তোর, আমাকে ক্লিয়ার করে বল সবকিছু?
সন্ধ্যা হাবীবের উপর বিরক্ত হয়ে বলল,
___” আমার আবার কী হবে, কিছু না।
___” আমার ফোন রিসিভ করিস না কেনো?
___” ইচ্ছা হয়েছে তাই।
___” তোর ইচ্ছা মাই ফুট, আমার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগে ফোন কেটে দিয়েছিস কেনো ওইদিন?
___” হ্যাঁ আপনার ইচ্ছাই তো সব তাইনা,আমার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে। ফোন কেটেছি ঠিক করেছি, আবারো কাটবো বারবার কাটবো।
সন্ধ্যা রাগী গলায় কথাগুলো বলে অভিমানে হাবীবের থেকে মুখ ফিরে নিলো। হাবীব সন্ধ্যার বাচ্চাতে মুচকি হাসলো,
___” এদিকে তাকাও?
___পারবো না।
হাবীব সন্ধ্যা কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে নিতে নিতে বলল,
___” আচ্ছা বাবা সরি, এখন থেকে তোমার সব কথা শুনবো। তোমার যা ইচ্ছা করো কিন্তু বিয়ের পরে।
হাবীবের কথায় সন্ধ্যার রাগ পুনরায় বেড়ে গেলো। হাবীব কে নিজের থেকে দূরে সরাতে সরাতে বলল,
___” আবারো বিয়ে, আমি বললাম তো আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো না, আমার বিয়ের বয়স হয়নাই এখনো।
হাবীব রাগী গলায় সন্ধ্যার হাত চেপে ধরে বলল,
___” একদম বাহানা খুঁজবে না সন্ধ্যা, আরাত যদি বিয়ে করতে পারে তুমি পারবে না কেনো, তোমার সঙ্গে হারাম রিলেশনশিপে থাকতে চাইনা। বিয়েও পড়ে পড়াশোনা করা যাবে।
___” আরাত তো পরিস্থিতির চাপে বিয়ে করল, ওর বিয়ের বয়স হয়নাই এখনো।
___” তোমাদের হাদিস অনুযায়ী বিয়ে করার যথেষ্ট বয়স হয়ে গেছে, আমার এতেই চলবে। রেডি হয়ে থাকবে পরশু আম্মু আব্বু যাবে। আঙ্কেল আন্টি কে বলে দিও।
___” আমি পারবো না আব্বু আম্মু কে বলতে।
___” নো প্রবলেম আমি বলে দিবো।
সন্ধ্যা বিরক্ত হয়ে বলল,
___” আপনি আমাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে কেনো করতে চাচ্ছেন?
___”কারণ আমার জীবনে সুখ সহ্য হচ্ছে না তাই।
হাবীবের কথায় সন্ধ্যা আর কথা বাড়ালো না মন ভার করে থাকলো। হাবীব সন্ধ্যার মনভার দেখে মুচকি হেঁসে গালে শব্দ করে একটা চুমু একে দিলো। দুদিন আগে হাবীব সন্ধ্যা কে নিজের বিয়ের কথা বলছিলো। সন্ধ্যা এখন বিয়ে করবে না। কিন্তু হাবীব নারাজ সে এখনই বিয়ে করবে এই নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল সন্ধ্যা হাবীবের কথা বলার মধ্যেই হটাৎ হাবীব কে কথা শেষ করতে না দিয়ে ফোন কেটে দেয়। হাবীব ফোন করলে রিসিভ করে না। এমন কী তালুকদার বাড়িতে আসার পর থেকে সন্ধ্যা হাবীবের দিকে তাকাইনি পর্যন্ত। সঙ্গে কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজছিলো। সন্ধ্যারা আইরা কে নিতে উপরে আসতে নিলে হাবীব বাধ্য হয়ে সন্ধ্যার পিছু নেয়,সঙ্গে আশিকও। আশিক মায়ার হাত ছাঁদে এসে ছেড়ে দিলো। মায়া ছাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে নিচে গার্ডেনের মানুষজন দেখছে। আশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
___”দেখো আমি চাইনা, ভবিষ্যতে গেয়ে আমার ছেলে তোমার মেয়েকে ডিস্টার্ব করুক, তো চলো না দুজন মিলে বিয়ে করে ফেলি?
মায়া হটাৎই আশিকের কথায় ভরকে গেল। হতভম্ব হয়ে গার্ডেন থেকে চোখ ফিরিয়ে আশিকের উপর রাখলো। আশিক দুষ্টু হেঁসে তাকিয়ে আছে। মায়াকে হতভম্ব হয়ে তাকাতে দেখে আশিক পুনরায় দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,
___”চলো তোমাকে আমার ভবিষ্যৎ ছেলে-মেয়ের মা বানাবো?
___” মানে কী আজেবাজে বকছো?
আশিক মায়ার কাছাকাছি এসে বলল,
___”তুমি আমার হয়ে যাও?
___” সারাজীবন আমার কেয়ার করতে পারবে তো?
মায়ার কথায় আশিক চোখ টিপ দিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” এত এত কেয়ার করবো তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝবে না।
মায়া আশিকের কথায় লজ্জা পেয়ে আশিক কে নিজের থেকে দু-হাতে ধাক্কা দিয়ে ছাঁদ থেকে দৌড়ে নামতে নামতে বলল,
___” লুচ্চা কোথাকার।
আশিক মায়ার ধাক্কা সামলে নিয়ে। মায়ার দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মুচকি হাসলো।
এতএত মানুষের ভীরে আনাস কে দেখা গেলেও দেখা নেই শুধু তাকবীরের। আনাস খাবারের দিকে সামলাচ্ছে। আইরা আরাত কে স্টেজে বসানোর পর আত্মীয়সজন হইতে বড়বড় বিজনেসম্যান এসে এসে পরিচয় হয়ে যাচ্ছেন। নতুন বউয়ের মুখ দেখে দোয়া আর গিফট দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ির বড়রা কিছুক্ষণ পরপর এসে এরওর সঙ্গে পরিচয় করে দিচ্ছে। আরাত বেশ বিরক্ত বসে থাকতে থাকতে। তাকবীরের মার্সিডিজ এসে দাঁড়ালো তালুকদার বাড়ির সামনে। তাকবীর গাড়ি থেকে নেমে ব্যাক সিট থেকে কয়েকটা শপিং ব্যাগ বের করে দু’হাতে নিতে দেখা গেলো। ফর্সা শরীরে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত তাকবীর দু’হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ নিয়ে গার্ডেনে রেড কার্পেটের উপর দিয়ে স্টেজের দিকে হেঁটে আসছে। স্টেজ থেকে আরাত লক্ষ করলো ব্যাপারটা। তাকবীরের ফর্সা মুখটাই যেন সাদা লাইটিং ঝিলিক দিয়ে উড়ছে। আরাতের কেনো যেনো নজর ফেরাতে মন চাইলো না মুগ্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। তাকবীরের নজর আরাতের উপর। স্টেজের কাছে এসে আশেপাশে তাকালো। এতএত মানুষের সামনে নিজের অর্ধাঙ্গিনী কে মুক্তির মতো বসে থাকতে দেখে তাকবীরের মেজাজ চটে গেল। আশেপাশে বড়রা কেউ নেই। তাকবীর কে দেখে রশ্মি মিম মায়া সন্ধ্যা নিজেদের হইচই বন্ধ করে সবাই চুপচাপ হয়ে গেলো। তাকবীর আশেপাশে তাকিয়ে আদিল কে ডাকলো।তাকবীরের ডাকে আদিল এসে দাঁড়াতেই। শপিং ব্যাগগুলো আদিলের হাতে দিয়ে রুমে পৌছে দিতে বলল। আদিল কথা মতো ব্যাগ গুলো নিয়ে তালুকদার বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
___” রাত উঠে এসো।
সবাই বেশ অবাক চোখে চেয়ে রইলো তাঁদের দিকে। আরাত বসা থেকে দোপাট্টা ঠিক করতে করতে উঠে পরলো। যাক কোমরটা একটু নিস্তার পেয়ে গেলো এবার। তাকবীর আইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
___” তুমিও আসো।
___” জ্বি ভাইয়া।
তাকবীরের কথামতো আইরা উঠে পরলো। আদনান তালুকদার দূর থেকে নতুন বউদের স্টেজ থেকে উঠতে দেখে এগে এলেন,
___” কী হয়েছে তাকবীর, ওদের উঠতে কেনো বলছো?
তাকবীর বাবার কথায় একটু বিরক্ত হলো। কিন্তু প্রকাশ করলো না। গম্ভীর গলায় শুধু উত্তর করলো,
___” এত মানুষ দের সামনে তালুকদার বাড়ির বউদের বসে থাকার কনো মানে দেখছি না ।
আদনান তালুকদার ছেলের কথায় বললেন,
___” এটা নিয়ম, গেস্টরা নতুন বউদের মুখ দেখবে। পরিচিত হবে।
তাকবীর আদনান তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” যদি আমার অর্ধাঙ্গিনী কে পরপুরুষের সামনে বসে থাকতে হয়। তাহলে সরি আব্বু এমন নিয়ম আমার চাইনা। আমার অর্ধাঙ্গিনী আমার ঘরেই সুন্দর, বাহিরে না, চলো রাত।
তাকবীরের কথায় আদনান তালুকদার কথা বাড়ালেন না। তিনি জানেন তাকবীরের এসব পছন্দ না। আগেই অনুষ্ঠান করতে বারণ করেছিলো তবুও তালুকদার বাড়ির চার ছেলেমেয়ের বিয়ে বলে কথা। একসঙ্গে চারটা বিয়ে যদি চুপিচুপি ঘরোয়া ভাবে হয়ে যায়। তাহলে সমাজ আত্মীয়-স্বজন কিভাবে নিবে ব্যাপারটা
তাকবীর আদনান তালুকদার কে দ্রুত খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করতে বলল। পুনরায় নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আরাত কে হাত রাখতে বলল। আরাত আদনান তালুকদার দিকে তাকাতেই তিনি চোখের ইশারায় যেতে বললেন। আরাত তাকবীরের হাতে হাত রাখলো। তাকবীর আরাতের হাত নিজের হাতের মধ্যে খুব যত্ন সহকারে আগলিয়ে নিয়ে বাড়ির ভিতরে যেতে লাগলো। তাঁদের পিছনে পিছনে আইরা কে ঘিরে আরিশা রশ্মি মিম তিশা মায়া সন্ধ্যা যেতে লাগলো। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখতে উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ টা ঝলমল করছে যেন। তাকবীর বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে করতে অন্য হাতে আনাস কে মেসেজ করলো,
___” বউয়ের দায়িত্ব নিতে পারবি না, বিয়ে করেছিস কেনো। এক মিনিটের মধ্যে ভেতরে আয় নয়তো তোর বাসর রাত ক্যানসেল।
তাকবীর আনাস কে মেসেজ করে, সবার উদ্দেশ্য বলল,আইরা কে যেন আনাস এর রুমে রেখে আসে। কথাটা বলে তাকবীর আরাত কে নিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। বড়রা এখন বাহিরে, বাকিরা সবাই তাঁদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পুনরায় আইরা কে নিয়ে আনাস এর রুমে যেতে চাইলো। আইরা আনাস এর রুমে যেতে নারাজ। সকাল থেকে আনাস নিজের রুমে আইরা কে প্রবেশ করতে দেয় নি। মাঝেমধ্যে কাছে এসে টুকিটাকি খবর নেওয়া ছাড়া। একবারও আনাস এর গিফট দেওয়া শাড়িতে আইরা কে কেমন লাগছে প্রশংসা পর্যন্ত করে নি। আনাস কে ঘিরে আইরার মনে অভিমান জমে আছে। আইরা সবাই কে রেখে বড়বড় পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। এতে যেন সবার নতুন বরের থেকে টাকা উসুল করতে সহজ হয়ে গেলো। তাকবীর কে আটকিয়ে তো আর টাকা আদায় করতে পারবে না। যা আদায় করার আনাস এর কাছ থেকেই করতে হবে। আরাতের রুম পার হয়ে তাকবীর আরাত কে নিজের রুমের দিকে নিয়ে যেতে দেখে আরাত তাকবীরের হাত, দুহাত দিয়ে আটকে ধরলো। তাকবীর ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকালো। আরাত নিজের দিকে তাকবীর কে তাকাতে দেখে মাথা নিচু করে নিচু স্বরে বলল,
___”ওদিকে কেনো নিয়ে যাচ্ছেন?
আরাতের কথায় তাকবীরের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো। আরাত তাকবীরের দিকে একনজর তাকিয়ে পুনরায় মাথা নিচু করে নিলো,
___” না মানে, আমার রুম তো এটা।
___” তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। আজকে থেকে তোমার হাজবেন্ডের রুমে থাকবে।
আরাত আর কথা বাড়ালো না বাধ্য মেয়ের মতো তাকবীরের হাতে হাত রেখে পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। সবার সামনে চঞ্চল আরাত হলেও প্রথম থেকে তাকবীরের সামনে খুব ভদ্র মেয়ে। যদিও আরাতের চঞ্চলতার সম্পর্কে তাকবীর আগে থেকেই অবগত। তবুও নিজের সামনে চঞ্চল আরাত থেকে ভদ্র আরাত কে দেখতে ভালোই লাগে।
আরশ তালুকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখে রাফি বাইক নিয়ে চলে গেছে। দুজন এক বাইকেই এসে ছিলো বিধায় আরশ কে সিএনজি করে ফিরতে হলো। আরশ নিজের বাড়িতে না গেয়ে মির্জা বাড়িতে গেলো। আমান আর আমানের বাবা-মা তালুকদার বাড়িতে থাকবে। রাফি বাড়িতে একা, আরশ মির্জা বাড়ির সামনে নেমে ভারা মিটিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। দরজা খুলাই ছিলো, হয়তো কিছুক্ষণ আগেই রাফি বাড়িতে ফিরছে। ড্রয়িং রুমে লাইট জ্বলছে আরশ সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাফির রুমে চলে গেলো। অন্ধকার রুমে রাফি কে খুঁজে পেলো না আরশ। রুমের বেলকনিতে এসে দাঁড়াতে দেখলো রাফি সিগারেট টানছে দৃশ্য তাঁর অন্ধকার ব্যস্ত রাস্তায়। আরশ রাফির পাশে দাঁড়ালো, রাফি ব্যস্ত রাস্তায় চোখ রেখেই ব্যাথাতূর কন্ঠে বলল,
___”দুনিয়া তে সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো, নিজের ভালোবাসা কে অন্য কারো সঙ্গে দেখা।
আরশ রাফির কথায় মলিন হাসলো,
___” জীবন টা খুব ছোট, কারো জন্য ছোট ছোট মুহূর্তগুলো নষ্ট করিস না। সে তোর না সারাজীবনের জন্য অন্য কারো হয়ে গেছে। ভুলে যা সবকিছু,নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস কর। তোর জীবন কে সুযোগ দে।
___”আমি এই ক্যারিয়ার দিয়েই কী করবো, যদি সেখানে আমার পছন্দের মানুষ টাই না থাকে?
আরশ রাফির কথায় সিগারেটের পকেটে থেকে সিগারেট বের করে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে বলল,
___”যাকে ভালোবেসেছিস সে শুরু থেকেই অন্য কারো ছিল,অন সাইড লাভ খুব ভয়ংকর রে। যে একপাক্ষিক ভালোবাসে সে এই পৃথিবীতেই জিন্দা লাশ হয়ে থাকে।
পুনরায় সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,
___” যত ভুলে যাবি ততই জীবন সুন্দর, ভুলে যা তুই কখনো কাউকে ভালোবেসেছিল। তাঁকে মনে রাখা মানে তোর বোকামি।
আরশের কথায় রাফি নিজের উপর তাচ্ছিল হেঁসে সিগারেট হাত থেকে ফেলে দিলো। অন্ধকার রাস্তা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কুয়াশায় ঘেরা কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বিরবির করে উঠলো,
___”আমিই বোকা আপনি অন্য কারো জেনেও আপনাকে চেয়েছিলাম। আপনি আমার ভাগ্যের বাইরে থাকা এক ভীষণ প্রিয় মানুষ। বাস্তবে আপনি অন্য কারো কিন্তু কল্পনাতে আপনি সারাজীবন আমার হয়েই থাকবেন,হ্যাঁ মেনে নিলাম খুব পছন্দের মানুষ নিজের হয় না। আর একপক্ষী ভালোবাসা কখনো জয়ী হয়না।
আরশ সিগারেট টানতে টানতে রাফির দিকে নজর বুলালো। রাফি কে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, পকেট থেকে ফোন বের করে মাহিরের ফোনে আরাতের পিক গুলো পাঠিয়ে দিলো।
মাহির নিজেদের বাড়িতে ড্রয়িং রুমে সোফাতে বসে আজকের ঘটনা গুলো নতুন করে ভাবছে। এক নিমেষেই কী থেকে কী হয়ে গেলো। আজকে রশ্মি কে নিজের জীবনের সঙ্গে জরাতে চেয়েছিলো অথচ আজকেই গুছানো জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেলো। রাত গভীর হওয়ায় বাড়িটা নীরব হয়ে আছে। মাহির অন্ধকার ড্রয়িং রুমে বসে থেকে নিজের জীবনের হিসাবনিকাশ করছিলো। হটাৎই সাইলেন্ট করা ফোনে আলো দেখা গেলো। মাহির ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো আরশের মেসেজ। মাহির মেসেজ টা চেক করতেই দেখলো আরাতের পিক। মুখে একটু হাসি ফুটে উঠলো, যাকে বউ বানানোর স্বপ্ন দেখাছিলো তাঁর সঙ্গেই বেইমানি করলো। সে বউ সেজেছে ঠিকই কিন্তু অন্যর, মাহির পিক গুলো দেখে রশ্মি কে নিজের করে পাওয়ার নতুন আশা জেগে উঠলো যেন। মিরা ফোনে রিল দেখছিলো এতক্ষণ যাবত , ঘুমানোর আগে দরজা ঠিকভাবে লাগাতে যাবে।অন্ধকার ড্রয়িং রুমে ফোনের আলোতে মিরা নিচে নেমে এলো। মাহির কে সোফায় বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
___” ভাইয়া তুমি ঘুমাও নাই?
মাহির মিরার কন্ঠে ফোন থেকে চোখ তুলে দেখলো, মিরা ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে তাঁর দিকে চেয়ে আছে। মাহির ছোট করে বোনের কথায় উওর করলো,
___” না চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না, তুই এত রাতে জেগে কেনো?
মাহিরের কথা মিরা পাত্তা না দিয়ে মাহিরের পাশে এসে বসলো, মাহির ভ্রু কুঁচকে মিরার দিকে চেয়ে আছে। মিরা মাহিরের পাশে বসে বলল,
___” এত দ্রুত কীভাবে রশ্মি আপুকে ভালোবেসে ফেলছো, ভালোবাসা কী দুএকবার দেখা হলেই হয়ে যায়?
মাহির মিরার কথায় সামনে দিকে তাকালো, মিরা উওর জানার জন্য মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে,
___” এত কিছু তুই কিভাবে জানিস?
___” সন্ধ্যার সঙ্গে কথা হয়েছে ও বলছে সবকিছু, আরাতের তো বিয়ে হয়ে গেলো ওর কাজিনের সঙ্গে তোমার খারাপ লাগছে না?
মাহিরের নিলিপ্তর উত্তর,
___” না।
___” ওর সঙ্গে যে কথা বলছো, ওর প্রতি একটুও মায়া জন্মায়নি?
মাহির উত্তর করতে বলল না। এতদিন কত বলছে মায়া না অভ্যাস হয়ে গেয়েছিল। মনে একজন রেখে আরেকজনের প্রতি মায়া আসে কই থেকে। আরশ কে চুপ করে থাকতে দেখে মিরা পুনরায় বলল,
___” বলবে না?
___” কী বলবো?
___” এই যে এত দ্রুত রশ্মি আপু কে ভালোবেসে ফেলছো কিভাবে?
মাহির সময় নিয়ে আফসোসের নিঃশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলো ,
___”কাউকে ভালোবাসতে সময়ের প্রয়োজন পড়ে না। কখনো কখনো পাঁচ সাল একসঙ্গে কাটালেও মনে হবে দুই প্রান্তের দুজন অচেনা মানুষ। আর কারো সঙ্গে দুদিন কাটানোর পরেও কখনো কখনো মনে হয় যেন জনম জনম কাটিয়েছি তাঁর সঙ্গে।
___” হুম বুঝলাম কিন্তু রশ্মি আপু তোমাকে মেনে নিতে চাইছে না, আপুর মন জিতার কোনো অপশন পেয়েছো?
মাহির অন্ধকারের মধ্যেই মিরার দিকে তাকালো, বোনের কথা শুনে মুচকি হাসলো মাহির, মুচকি হেঁসে মিরার মাথায় হাত রেখে বলল,
___”ভালোবাসার মধ্যে জিত হার নেই, আসল ভালোবাসা হলো, তাঁকে নিজের করে পাওয়ার পথ বন্ধ তবুও তাঁর জন্য অপেক্ষা করা বুঝলি?
মিরা মাহিরের কথায় মায়া ঝাঁকে বলল,
___” হুম বুঝতে পেয়েছি, বাট ভাইয়া আরেকটা কোশ্চেন ছিলো, রশ্মি আপু তোমাকে মেনে নিতে চাইছে না এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
___” কষ্ট তো পেতেই হবে, শান্তি কোথায় পাবো বল আমিও তো কারো মন ভেঙেছি, সেও আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল । তাঁকে ভালোবাসতে দেখেও তাঁকে ধোঁকা দিয়েছি।
মাহির মাথা নিচু করে অসহায় কন্ঠে কথাগুলো বলল,মিরা মাহির কে আগলিয়ে নিলো। মাহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পুনরায় বলল মিরা,
___” সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ভাইয়া, শুধু একবার আরাতের কাছে সবকিছুর জন্য মাপ চাও। আরাত হ্যাপি থাকলে রশ্মি আপু তোমাকে খুব সহজে মেনে নিবে।
আনাস তাকবীরের মেসেজ সিন করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতরে চলে আসে। ড্রয়িং রুমে মিম আর টিশা কে বসে থাকতে দেখে বলল,
___” মিম?
মিম আনাস এর ডাকে মিটিমিটি হেঁসে কথা টেনেটেনে বলল,
___” হ্যাঁ ভাইয়া বলেন?
___” ইরা কই?
___” ও আপনি আমাদের ভাবির কথা জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু ভাইয়া ভাবি তো তাঁর রুমে।
মিম কে ব্যঙ্গ করে কথা বলতে দেখে আনাস ধন্যবাদ দিয়ে দুতালায় উঠে গেলো। আনাস এর পিছু পিছু তাড়াহুড়ায় মিম আর তিশা দৌড়ে গেলো আইরার রুমের সামনে। আনাস নিজের রুমের সামনে এসে নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলো। পুনরায় গলা খাঁকারি দিয়ে চাপানো দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। পুনরায় দরজা টা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিছানার দিকে তাকালো। কিন্তু না যার জন্য এত আয়োজন সেই নেই রুমে। আনাস এর কপাল কুঁচকে এলো, শরীরের কোট খুলে ফুলের সাজানো সোফার উপর ফিকে মেরে রেখে দিলো। গলায় টাই হাত দিয়ে ঢিলা করতে করতে এক হাত কোমরে রেখে ভাবতে লাগলো,
___” মিম তো বলল ইরা নিজের রুমে, তাহলে কই গেলো এই মেয়ে। রাগ করে বিছানার নিচে লুকিয়ে নেই তো, হ্যাঁ তাই হবে।
আনাস কথাগুলো ভেবে বাঁকা হাসলো, দুহাত এক করে উপর দিকে চাঁড়া দিয়ে আইরা কে ডাকতে লাগলো,
___” ইরা, এই ইরা বিছানার নিচে থেকে বের হয়ে আয়, দেখ পুরোদিন কাজের চাপে তোকে সময় দিতে পারিনি সরি, বের হয়ে আয়।
কিন্তু না আইরা আনাস এর কথায় উওর করলো না, না বের হয়ে আসলো। যে মেয়ে রুমেই নেই সে কথা বলবে কিভাবে। আনাস অধৈর্য হয়ে পুনরায় ডাকতে লাগলো,
___” আরে বাবা বলছি তো সরি, বের হয়ে আয় না প্লিজ। দেখ আমি কানে ধরছি আর হবে না। আমি সত ব্যস্ততার মাঝে তোর কাছাকাছি থাকবো কথা দিলাম।
আনাস কথাটা বলতে বলতে মেঝেতে উপর হয়ে শুয়ে পড়ে বিছানার নিচে দেখতে লাগলো, কিন্তু নেই যার জন্য এতক্ষণ একা একা বকবক করলো সেই নেই। আনাস এর নিজের উপর রাগ লাগলো,পুনরায় মনে পড়ে গেলো আইরার নিজের রুম মানে তালুকদার বাড়িতে আইরার জন্য যে রুমটা আছে, এটার কথা বলছিলো মিম। আনাস নিজের বোকামি বুঝতে পেয়ে উপর হয়ে শুয়া থেকে বসে পরলো, পুনরায় নিজেকে ঠিকঠাক করে নিয়ে মলিন মুখে রুম থেকে বেরিয়ে আইরার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো।
সবাই কে আইরার রুমে, দরজার সামনে জোট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাস বলল,
___” তোরা এখানে কী করছোস?
আনাস এর কথায় আরিশা বলে উঠলো,
___” তোমার বউরে পাহারা দেয়।
___” কেনো আমার বউ কী ছোট বাচ্চা?
এবার মায়া বলে উঠলো,
___” না ভাইয়া ছোট বাচ্চা হতে যাবে কেনো, আপনার আমানত আমরা জাস্ট সেফ করছি।
মায়ার কথায় আনাস মুখে হাসি টেনে বলল,
___” তোমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ, এবার সাইট হও নয়তো আমার বউটা কে আমার হাতে তুলে দেও?
রশ্মি সয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
___” তাঁর জন্য তো আমাদের পাওনা মিটাতে হবে ভাইয়া?
___” কীসের পাওনা?
___” আপনার বউকে নিতে হলে আমাদের টাকা দিতে হবে। নয়তো আমরা রুম খুলে দিবো না।
রশ্মির কথায় আনাস তাড়া দিয়ে বলল,
___” তোমাদের ভন্ডামী দ্রুত শেষ কর, আবার বউয়ের রাগ ভাঙ্গাতে হবে আমায়।
মিম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত মেলে দিয়ে বলল,
___” না টাকা ছাড়া কথা হবে না, আগে টাকা?
আনাস বিরক্ত হয়ে বলল,
___” তোদের ডিমান্ড বল?
সবাই সবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে একসঙ্গে চিৎকার দিয়ে বলল,
___” ৫০ হাজার…
আনাস ৫০হাজার টাকার কথা শুনে হেঁসে উঠলো,
___” লাইক সিরিয়াসলি, তোরা ৫০হাজার টাকা কখনো একসঙ্গে দেখেছিস?
তিশা চট করে বলে উঠলো,
___” আমরা একসঙ্গে দেখি নাই, কিন্তু নিজেরাই আলেদা আলেদা দেখিছি।
আনাস এর মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো, সবাই এবার শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আনাস আর কথা বাড়ায় না, পকেট থেকে ওয়লেট বের করে ৩০ হাজার টাকার বান্ডিল মিমের হাতে দিয়ে দিলো,
___” আর একটা কথাও বলবি না চুপচাপ দরজার সামনে থেকে বিদায় হ।
___” কিন্তু ভাইয়া এতে কত…
আরিশা মিম কে আর কথা বলতে না দিয়ে, মিম কে নিয়ে সবাই চলে গেলো। আনাস একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে পুনরায় নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলো। দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই চোখে পরলো আইরা পেঁচা পাখির মতো তাকিয়ে আছে। আনাস আইরার কাছে এসে দাঁড়ালো,
___” রুমে চল?
আইরা বসা আবস্থাতে মাথা অন্য দিকে ঘুরালো,
___” যাবে না ওই রুমে।
___” দেখ ইরা অনেক রাত হয়ে গেছে জেদ করিস না প্লিজ চল।
___” কেনো জাবো আমি ওই রুমে, আমি সকাল বেলা রুম থেকে বের হওয়ার পর কী আমাকে ওই রুমে ঢুকতে দিয়েছিলেন, এখন রাত হয়েছে আমাকে নিতে এসেছেন।
আনাস আইরা কে বিছানা থেকে কোলে তুলে নিতে নিতে বলল,
___” হ্যাঁ তোকে শুধু রাতে আমার কাছে রাখবো আর দিনের বেলা রুমের বাহিরে। শীতের দিনে বিয়ে করেছি কী বউকে দূরে রাখার জন্য। শীতের রাতে আমার বউ লাগবে, এখন একটা কথাও না একদম চুপ।
আইরা আনাস এর বুকে দুহাত দিয়ে কিলাতে লাগলো, আনাস আইরার রুম থেকে নিজের রুম পর্যন্ত আইরা কে কোলে তুলে নিয়ে এলো। রুমের ভিতরে প্রবেশ করে আইরা কে মেঝের ফুলের পাপড়ির উপরে নেমে দিলো। আইরা পায়ে ঠান্ডা পরশ পেতেই মাথা নিচু করে দেখতে লাগলো, পুরো রুমটা লাল গোলাপের পাপড়িতে ভরপুর। গোলাপের পাপড়ির মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট মোমবাতি দিয়ে ডেকোরেশন করা। বিছানার উপরে গাধা ফুলের ডেকোরেশন। পুরো রুমময় শুধু তাজা ফুলের সুগন্ধ আইরা মুগ্ধ হয়ে দেখছে চারপাশ। আইরা কে মুগ্ধ হয়ে চারপাশে চোখ বুলাতে দেখে আনাস, আইরার একহাত টেনে নিজের সঙ্গে জাপতে জরিয়ে নিলো। হটাৎ আনাস এর আক্রমণে আইরা চমকে আনাস এর দিকে তাকালো। আনাস আইরার মুখের কাছাকাছি মুখ আনতেই আইরা চোখ বন্ধ করে নিলো। আনাস আইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো,মুচকি হেঁসে কপালে গভীর ভাবে চুমু রেখে দিলো। আইরার শরীর নিমেষেই কেঁপে উঠলো এতে,
___” চল আমার সঙ্গে চল।
আনাস এর কথায় আইরা চোখ মেলে তাকালো, আনাস দুষ্টু হেঁসে আইরার দিকে তাকিয়ে আছে। আনাস এর হাসিতে আইরা লজ্জা পেয়ে মুখ অন্য পাশে ঘুরালো, আনাস হাসি মুখেই আইরার হাত যত্ন করে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বেলকনির দিকে এগুলো। আইরা চুপচাপ অবাক হয়ে আনাস এর পিছু পিছু এসে বেলকনির দরজার সামনে দাঁড়াতেই অবাক মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠলো, আইরা খুশি আনাস কে জরিয়ে ধরে উৎফুল্লতা হয়ে বলল,
___” থ্যাংক ইউ সো মাচ আনাস ভাই, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বেস্ট উপহার ছিলো।
আনাস মুচকি হেঁসে আইরা কে বলল,
___” জরিয়ে পড়ে ধরবি, আগে বল তোর জন্য আমি সকাল থেকে কষ্ট করে এই ছোট লাইব্রেরী বানিয়ে দিলাম, কেমন হয়েছে?
আইরা আনাস কে ছেড়ে দিয়ে লাইব্রেরীটা মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো, আনাস সকাল থেকে আশিক কে সঙ্গে নিয়ে নিজের হাতে ছোট বেলকনিতে লাইব্রেরি বানিয়ে দিলো, বেলকনির দেওয়াল জুড়ে নানার রকমের উপন্যাস বইয়ের ভরা, একপাশে একটা দোলনা ঝুলানো। বুক পর্যন্ত গাঁথা দেওয়ালর উপরে নানার রকমের তাজা ফুলের গাছ লাগলো। পুরো বেলকনি সাদা পেইন্টিং করা, বেলকনিটা ছোট হলেও সবকিছু একদম পরিপাটি করে সাজানো একটা ছোট লাইব্রেরী, আইরার ব্যক্তিগত লাইব্রেরী। আইরা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সবকিছু আর আনাস দেখছে, তাঁর গিফট দেওয়া সাদা শাড়ি পরিহিত আইরার সিদ্ধ মুখের হাসি। আনাস এক দু পা করে আইরার পেছনে দাঁড়িয়ে আইরা কে পেছন থেকে দু’হাতে জরিয়ে নিয়ে কানের কাছে ঠোঁট ছুয়ে দিয়ে নরম সুরে ফিসফিস করে বলল,
___”তুই আমার জীবনের সব কন্ট্রোল ভেঙ্গে দিলি ।তোর কথা শুনতে ইচ্ছা করে। তোকে ভালোবাসতে ইচ্ছা করে। নিজেকে সামলাতে না তোকে নিয়ে বেসামাল হতে ইচ্ছা করে।
আইরা আনাস এর কথায় লজ্জা পেয়ে আনাস কে জরিয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিলো। আইরার পাগলামিতে আনাস মুচকি হেঁসে উঠলো ,
তাকবীর আরাতের হাত ধরে নিজের রুমে প্রবেশ করলো। আরাতের মনের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। এই প্রথম কোনো ছেলের সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকতে হবে। তাও আবার এই গুরু গম্ভীর ছেলের সঙ্গে। যার সঙ্গে কোনো দিন ঠিক মতো দুটো কথা পর্যন্ত বলা হয়নাই। তাকবীর রুমে এসে আরাতের হাত ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
___” যাও ওয়াশরুমে যাও, প্রথমে ওড়না, স্কাপ চেঞ্জ করবে,তারপর ওজু করে পুনরায় স্কাপটা সুন্দর করে পড়ে বের হবে।
আরাত বুঝলো না চেঞ্জ করে পুনরায় পরতে হবে কেনো। না বুঝে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
___” কেনো, ওজু কেনো করতে হবে?
তাকবীর হাতের ঘড়িটা খুলছিল, আরাতের কথায় আরাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, আরাত বেশ অবাক হলো এতে। তাঁর বীব ভাইয়া মুচকি হেঁসেছে আরাত হাসির দিকে তাকিয়ে মনে মনে মাশাল্লাহ বলতে ভুললো না। তাকবীর মুচকি হেঁসে বলল,
___” দুজন একসঙ্গে নামাজ আদায় করবো।
আরাত ওজু করার কারণ বুঝতে পেয়ে, মাথা নিচু করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। তাকবীর আরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিলো। পুনরায় ঘড়িটা বেড সাইডের উপর রেখে দিয়ে বেড সাইডের উপর থেকে শপিংব্যাগ থেকে পোষাক গুলো বের করলো, একটাতে চারটা বোরকা আর স্কাপ, আরেকটাতে তিনটা থ্রি পিস,আর দুটো ব্যাগে পাঁচটা শাড়ি। আর একটা ব্যাগে কিছু মেয়েদের প্রয়োজনীয় কসমেটিকস। আরাত ওয়াশরুম থেকে ওজু করে বের হয়ে এলো। তাকবীর আরাত কে বের হতে দেখে বলল,
___” রাত দেখো তো, সবকিছু পারফেক্ট আছে কিনা?
তাকবীর কথাটা বলে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আরাত বুঝলো না ব্যাগ গুলোতে কী রয়েছে। ব্যাগের কাছে এসে ব্যাগ দেখতে লাগলো, শাড়ি বোরকা আর থ্রি পিস দেখে ব্যাগগুলো যেভাবে ছিলো আরাত পুনরায় সেই ভাবেই রেখে দিলো। সোফায় দিকে তাকাতেই চোখে পরলো দুটো জায়নামাজ। আরাত জায়নামাজ নিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে একপাশে দাঁড়ালো। তাকবীর ওয়াশরুম থেকে ওজু করে বের হয়ে এসে আরাত কে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, মুচকি হেঁসে কাছে চোখের ইশারায় ডাকলো, আরাত বাধ্য মেয়ের মতো তাকবীরের কাছে এসে দাঁড়াতেই তাকবীর আরাতের শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে ভেজা মুখ মুছতে লাগলো। আরাত প্রথমে আশ্চর্য হয়ে গেলেও পর মুহূর্ত শাড়ির আঁচল টেনে নিতে নিতে বলল,
___” এটা কী করছে, তয়লা আছে তো আপনার মুখ জ্বালা করবে?
তাকবীর এতক্ষণে মুখ মুছে ফেলছে। এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___”চলো নামাজ আদায় করবো?
দু’জনেই নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো। নামাজ শেষে আরাত দু হাত তুলে মোনাজাত করছে। তাকবীর নামাজ আদায় শেষে পেছনে আরাতের দিকে তাকালো। আরাত কে মোনাজাত করতে দেখে মুচকি হেঁসে আরাতের কোলে মাথা রাখলো। আরাত মোনাজাতের মধ্যেই হালকা কেঁপে উঠলো, দ্রুত মোনাজাত শেষ করে তাকবীরের দিকে তাকায় আরাত। আরাত যেন আজকে তাকবীর প্রথম দেখছে। তাকবীরের নতুন নতুন রুপ দেখে বারবার অবাক হচ্ছে। তাকবীর আরাতের কোলে মাথা রেখে মায়াবী কন্ঠে বলল,
___” ব্যাগ চেক করেছো?
আরাত মায়া ঝাকায় যার অর্থ হ্যাঁ,
___” পছন্দ হয়েছে?
আরাত কথা বলে না, চুপচাপ অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে,তাকবীর পুনরায় বলে উঠলো,
___” বাহিরের যাওয়ার জন্য বোরকা, বাড়িতে থাকার জন্য থ্রি পিস, আর হ্যাঁ অবশ্যই মাথায় সবসময় কাপড় রাখবা, শাড়ি তোমার ফেভারেট বাট রুমের ভিতরে পাড়ার জন্য, ওকে?
আরাত শুধু মাথা নাড়ালো, তাকবীর মুচকি হেঁসে শুয়া থেকে উঠে পরলো, আরাত কে উঠতে বলে,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৭ (২)
___” চলো ঘুমাতে চলো?
আরাত তাকবীরের কথায় এতক্ষণে কথা বলে উঠলো,
___” ঘুমাতে যাবো মানে, আমরা কী এক বেডে ঘুমাবো?
তাকবীর পিছনে ঘুরে গম্ভীর গলায় বলল,
___” বিয়ে যেহেতু হয়েছে, এক বেডে ঘুমানোই যায়।
___” না আমি পারবো না।
তাকবীর মুচকি হেঁসে বলল,
___” বাহানা করে না রাত, তোমার যখন ইচ্ছা করবে তখন ভালোবেসো, এখন জাস্ট বেড শেয়ার করো।
