Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫১
জান্নাতি আক্তার জারা

দিনটা শুক্রবার সকালে নামাজ আদায় করে তাকবীর প্রতিদিনের মতো মর্নিং ওয়াক থেকে বাসায় ফিরে পুনরায় ঘুমিয়ে ছে, শুক্রবারের দিনটা তালুকদার বাড়িতে একটু অন্য রকম কাটে, বাড়ির ছেলেরা বাড়িতে সময় কাঁটায়, একসঙ্গে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যায়, আর বাড়িতে আয়োজন টা এমন থাকে যেন প্রত্যেকটা শুক্রবার একটা ঈদের দিন, তাকবীর মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরে ঘুমিয়েছে একদম এগারো থেকে বারোটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠবে, তারপর শাওয়ার নিয়ে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যাবে, আনাস এর বেলা কিছুটা ভিন্ন, ফজরের নামাজ আদায় করে সকালের নাস্তা করে বাড়ি থেকে বের হয় আড্ডা দিতে বা কখনো কাজিন মহল কে নিয়ে কোথাও ঘুরতে বের হয়,

যদিও বাবার কথাতে কাজিন মহল কে নিয়ে ঘুরতে বের হতে হয়, নয়তো কাজিন মহল কে সঙ্গে নিয়ে ঘুমার মতো ছেলে আনাস না, আরাত সকালের নাস্তা করে হেলেদুলে রুমে চলে এলো, রুমে এসে তাকবীর কে ঘুমাতে দেখে আরাত পা টিপে টিপে ধীরপায়ে তাকবীরের সামনে এসে দাঁড়ালো, কয়েক সেকেন্ড তাকবীর কে দেখে মেঝেতে বসল, বিছানায় হাতের উপর মুখ রেখে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, তাকবীর ঘুমে মগ্ন, আরাতের ইচ্ছা হলো চুপিচুপি কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে, মনের ইচ্ছা মনেয় পুষে রাখলো, যদি তাকবীর কেনো ভাবে বুঝতে পারে তাহলে লজ্জায় ফেলবে, আরাত যেটাই করে না কোনো,কোনো না কোনো ভাবে ধরা পড়েই, কোনো রিক্স নেওয়া যাবে না, আরাত তাকবীরের ঘুমের সুযোগ নিয়ে মিনিটের পর মিনিট চুপিচুপি দেখতে লাগলো, শেষমেশ মনের বাসনা পূরণ করতে তাকবীরের কপালে ঠোঁট ছুঁয়েই দিলো,না তাকবীর জেগে গেলো না, আরাত ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে নিজেই একা একা লজ্জা পেলো, মনে মনে ভাবতে লাগলো, ছিহহ আরাত তুই উনার ঘুমের সুযোগ নিলি, নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পাচ্ছে বারবার,পর মুহূর্তে নিজেকে সান্তনা দিলো, তুই তো তোর বর কে চুমু দিয়েছিস অন্য কাউকে না, আরাত নিজের মনে একটার পর একটা ভাবনা ভাবতে ভাবতে তাকবীরের চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

___” চেয়েছিলাম একটুখানি সত্যিকারের
ভালোবাসা, অথচ আমার রব আমাকে এক পৃথিবী সমান নেয়ামত দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর পরিকল্পনা সবচেয়ে উত্তম।

তাকবীর ঘুমের মধ্যে মাথায় নরম হাতের ছুঁয়া পেয়ে কপাল কুঁচকে,কিছুটা নড়াচড়া করে উঠলো, আরাত তাকবীর কে নড়াচড়া করতে দেখে দ্রুত তাকবীরের মাথার চুলের মধ্যে থেকে নিজের হাত বের করে নিলো, তাকবীর কাঁচা ঘুমে নড়াচড়া করে পুনরায় ঘুমিয়ে পরল, তাকবীর কে পুনরায় ঘুমাতে দেখে আরাতের মাথায় সয়তানি এসে ভর করলো, দুষ্টু হেঁসে বসা থেকে উঠে পা টিপে টিপে রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে এলো, নিজের রুমে এসে আলমারি থেকে কসমেটিক বক্স বের করে, বক্স থেকে লাল টকটকে লিপস্টিক বের করে হাতে নিয়ে, কসমেটিক বক্স রেখে,আগের ন্যায় পুনরায় পা টিপে টিপে তাকবীরের রুমে এলো, বিছানার কাছে এসে তাকবীরের উপরে একটু ঝুঁকে ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেঁসে তাকবীরের ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক লাগাতে লাগলো, তাকবীর আরাতের ছোঁয়াতে প্রথমে নড়েচড়ে উঠে,তাঁর কিছুক্ষণ পড়ে পুনরায় ঠোঁটে কিছুর স্পর্শ অনুভব হতে ঘুমের মধ্যে কপাল কুঁচকে পিটপিট করে চোখ মেলে, তাকবীর কে চোখ মেলতে দেখে আরাতের হাসি মুখ বন্ধ হয়ে যায়, হকচকিয়ে উঠে সোজা হয়ে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য দৌড় দিতে নেয়, তাকবীর চোখ খুলতেই নিজের অতি নিকটে আরাত কে দেখে, আরাত কে নিজের থেকে পালাতে দেখে আরাতের হাত টেনে এক ঝটকায় নিজের শরীরের উপরে ফেলে, দু-হাতে আরাতের কমোর জরিয়ে ধরে ভ্রু কুঁচকে আরাত কে পরক করতে লাগলো, আরাত তাকবীরের থেকে চোখ লুকাচ্ছে বারবার, তাকবীর ভ্রু কুঁচকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,

___” পালাচ্ছিলে কেনো ?
আরাত তাকবীরের উপর শুয়ে থেকে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” আপনাকে সুন্দর লাগছে!
আরাতের কথায় তাকবীরের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে এলো, সন্ধিহান গলায় বলল,
___” আমার কেনো মনে হচ্ছে তুমি কিছু একটা বাঁদরামো করেছো ?
তাকবীরর কথায় আরাত নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে, তাকবীরের ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দেখতে অদ্ভুত লাগছে,আরাত কে দুষ্টু হাঁসতে দেখে তাকবীর নেশাতূর কন্ঠে বলে উঠলো,

___”এমন দুষ্টু হাসো কেনো, তোমার মতলব কী হ্যাঁ বাই এনি চান্স তুমি আমাকে লুটে নেওয়ার ফন্দি হানছো না তো?
কথাটা বলতে বলতে তাকবীর আরাতের গলায় মুখ ডুবে দিলো,আরাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে না না বলতে বলতেই তাকবীর আরাতের গলায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত না পারে এবার কান্না করে দেয় এমন হাল, তাকবীর ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে গলার দিকে চোখ পরত-ই চমকে উঠলো, পুনরায় আরাত চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে রাখতে দেখে তাকবীর আরাত কে নিজের শরীরের উপর থেকে দ্রুত বিছানায় শুয়ে দিয়ে ব্যাকুল কন্ঠে বলতে লাগলো,

___” রাত, রাত ডোন্ট ক্রাই, আই এম সরি, আই এম সরি বাবা, আমি বুঝতে পারিনি এতটা লেগে যাবে, আই এম সরি, চোখ মেলো এই তাকাও, কী করবো কী করবো হ্যাঁ ফার্স্ট-এইড বক্স।
ব্যাকুল কন্ঠে কথা গুলো বলতে বলতে তাকবীর বিছানা থেকে নামতে নেয়, আরাত তাকবীরের হাত টেনে ধরে আটকায়,তাকবীর পিছনে ফিরে আরাত কে স্বাভাবিক দেখে তীক্ষ্ণ চোখে আরাত কে পরক করতে লাগলো, আরাত চোখ নামিয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠলো,

___” আপনি যা ভাবছেন, ওইটা না এগুলো লাল লিপস্টিক।
আরাতের কথায় তাকবীর গম্ভীর হয়ে এলো, এতক্ষণে বুঝতে পারলো আরাত তখন পালাতে লাগছিলো কেনো, আর তাকবীর যেটাকে লাভবাইট ভাবছে এটা লিপস্টিকের রং, তাকবীর দ্রুত বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো, সঙ্গে সঙ্গে ভাজ পড়া কপাল সোজা হয়ে গেলো, তাকবীর বুদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ঠোঁট ঘষে দেখতে লাগলো, আরাত বিছানায় বসে কাচুমাচু মুখে তাকবীর কে দেখছে,
___” ইম্পসিবল মেয়ে।

তাকবীর ওয়াশরুমে চলে গেলো, আরাত বিছানা থেকে বাঁকা হয়ে তাকবীরের যাওয়া দেখে হাসি দিয়ে উঠলো, নিজের প্রতি তাকবীরের ব্যাকুলতা দেখে মনের শান্তিতে বালিশ হাতে নিয়ে সাদা নরম বিছানায় দাঁড়িয়ে এলোমেলো ভাবে নাচতে লাগলো, কয়েক মিনিট গুনগুন করে গান বলে নাচার মধ্যে ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ এলো, আরাত শব্দ পেয়ে এক হাতে বালিশ মাথার উপর রেখে পিছনে ফিরে তাকালো, তাকবীর কে ওয়াশরুমের সামনে কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসি মুখটা ফুরুট করে বন্ধ হয়ে গেলো, জিভ দিয়ে শুঁকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আঁড়চোখে তাকবীর কে দেখতে দেখতে বালিশ জায়গায় রেখে দিলো, তাকবীর এখন হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আরাত কে দেখছে, আরাত হাসার চেষ্টা করে বিছানা থেকে নেমে এলোমেলো বিছানা ঠিক করতে লাগলো, তাকবীর এবার গম্ভীর মুখে রুম থেকে বেলকনিতে পা বাড়ালো, আরাত তাকবীরের যাওয়ার দিকে মুখ বাঁকা বিরবির করতে লাগলো,

___” উমমম গোমরা মুখো কোথাকার, একটু হাসলে কী এমন ক্ষতি হতো, উনার বাপ-দাদার সম্পত্তি কেউ লেখে নিয়ে যেত নাকি!
আরাত একা একা বকবক করতে করতে আয়নায় সামনে এসে টিস্যু দিয়ে গলা মুছতে লাগলো, গলা পরিস্কার করতে টিস্যু গলাতে ছোঁয়াতেই আরাত আয়নার মধ্যে জায়গা টা দেখে নিজেই লজ্জা পেলো, লজ্জামিশ্রিত হেঁসে মাথা ঘুরে বেলকনির দিকে তাকালো, তাকবীর বেলকনির সোফাতে বসে আছে নজর তাঁর রুমে আয়নার সামনে আরাতের উপর, আরাত তাকবীরের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত গলা পরিস্কার করে চোখ নামিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, তাকবীর আরাত কে লজ্জা পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করল,
___” এ খোদা… এতকিছু হওয়ার পড়েও এই মেয়ের এত লজ্জা কই থেকে আসে মাবুদ।

আরাত একটানা ড্রয়িং রুমে এসে থেমে গেলো, এখন কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে, বড় করে শ্বাস টেনে আশেপাশে তাকালো, ড্রয়িং রুম বর্তমান ফাঁকা, আরাত সোফাতে বসে টিভি চালু দিয়ে টিভি দেখতে লাগলো, টিভিতে চলছে পাকিস্তানি ডামা,আরাত পুরো ধ্যানজ্ঞান টিভিতে দিলো, পায়ের উপর পা তুলে থুতনির কাছে ইমুট রেখে মনোযোগ সহকারে টিভি দেখছে, সময়টা এগারোটার ঘরে আহিন রশ্মিদের বাড়িতে আলভীর সঙ্গে খেলছে, মিম নিজের রুমে, আইরা আনাস বাদবাকি সবাই নিজেদের রুমে, আরাত টিভিতে মনোযোগ দিয়ে ভুলেই গেলো তাকবীর রুমে আছে, বেশ কিছুক্ষণ টিভি দেখার মধ্যে আদিবা তালুকদার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন আরাতের সঙ্গে কথা বলার জন্য, আরাত কে ডাকতে যাবে তখনই দেখে মেয়ে তাঁর ড্রয়িং রুমেই পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে টিভি দেখায় মগ্ন হয়ে আছে, আদিবা তালুকদার মেয়েকে দেখে হাতাশা প্রকাশ করলেন, তিনি আরাত কে ডাকতে যাচ্ছিল, আহাদ তালুকদার আরাতের হাতের তরকারি খেয়ে বেশ প্রশংসা করছিল, আজকে তো শুক্রবার অবকাশ সবকিছু, তাই আদিবা তালুকদার ভাবলেন আরাত কে আজকেও রান্না করতে বলবেন, নিজে মেয়েকে হেল্প করবে, মেয়েদের এভাবে তো আর মানায় না, রান্না তো জানতেই হয়, এখন তো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, যদিও নিজেদের বাড়িতে মেয়ে থেকে যাবে সারাজীবন, তাই বলে কী কাজ রান্নাবান্না শিখতে হবে না, আদিবা তালুকদার ভাবলেন ছুটির দিনগুলোই আরাত কে একটা একটা করে রান্না শেখাবে, ভদ্র মহিলা আরাতের সামনে এসে ভারী কন্ঠে বলল,

___” টিভি অনেক দেখেছো, এখন চলো আমার সঙ্গে কিচেন রুমে চলো, আজকে রান্না তুমি করবে আমি তোমাকে হেল্প করবো চলো!
আরাত হটাৎই টিভি দেখার ব্যাঘাত ঘটায় বিরক্ত মুখে আদিবা তালুকদারের দিকে তাকালো, পায়ের উপর থেকে পা নামিয়ে সোফাতে ভালোভাবে পুনরায় বসতে বসতে মুখ নাচক করে উঠলো,
___” মা সরো তো, আমাকেও টিভি দেখতে দেও, আমি কোনো রান্নাবান্না করতে পারবো না!
আরাতের মুখের ভঙ্গিমা দেখে আদিবা তালুকদার ব্যঙ্গ করে বললেন,
___” তালুকদারের মেয়ে কিচেন রুমে চলেন, এভাবে অকর্মা থেকে যাবেন সারাজীবন হ্যাঁ ?
আরাত বিরক্ত মুখে বলল,
___” মা প্লিজ, বিরক্ত করো না তো আইরা আপু কে ডাকো, আমি পারবো না।
আদিবা তালুকদার এবার মেয়ের কথায় রেগে গেলেন,

___” কেনো আইরা কে কেনো ডাকবো, আইরা কি এই বাড়ির একাই বউ, তুমি না,শাশুড়ীদের কথা থেকে বেঁচে গেছো, যদি অন্য কোথাও বিয়ে হতো তখন কী করতে শুনি,তাকবীর বাবার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে জন্য বেঁচে যাচ্ছো, অন্য কোথাও বিয়ে হলে তোমার জন্য কথার ডালা শুনতে হতো আমাদের।
আরাত আদিবা তালুকদারের কথা পাওা না দিয়ে টিভি দেখতে চাইলো, কিন্তু মায়ের এতএত বাণী আর নিতে পারলো না, মুখটা গম্ভীর করে সোফা থেকে উঠে পরলো, আদিবা তালুকদার আরাত কে উঠতে দেখে আরো বকবকানি শুরু করলেন, আরাত কিছু না বলে স্টোর রুমের দিকে পা বাড়ালো, আদিবা তালুকদার আরাত স্টোর রুমের দিকে যেতে দেখে বুঝলেন আরাত রান্না করবে না, ভদ্র মহিলা রাগী গলায় একটার পর একটা কথা শুনাতে শুনাতে তিনি কিচেন রুমে চলে গেলো, আরাত স্টোর রুম থেকে একটা লাগেজের মতো গান বাজানো বক্স বের করে ড্রয়িং রুমে রাখলো, পুনরায় দৌড়ে রুমে এসে দেখলো ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে, আরাত সেদিকে পাওা না দিয়ে বিছানায় উপর থেকে নিজের ফোন নিয়ে পুনরায় নিচে নেমে এলো, আদিবা তালুকদার কিচের রুমে তরকারি কাটতে কাটতে একা একা রাগী গলায় কথা বলছেন,আরাত বক্সের সঙ্গে ফোনের ব্লুটুথ ওয়ান করে গান সার্চ দিয়ে গান চালু করে বক্সের উপর বসে পরলো,বক্সে জোরে সাউন্ড দিতে দুটো লাইন বেজে উঠলো,

” সংসার আমার ভাল্লাগে না,
সংসার বিষের বড়ি
সংসার জ্বালায় ইচ্ছা করে গলায় দিতে দড়ি..!
আরাত গানের তালে তালে কিচেন রুমের দিকে তাকিয়ে সুর মেলাচ্ছে, হটাৎ তালুকদার বাড়িতে গান বাজানোর সাউন্ডে বাড়ির সবাই অবাক হয়ে নিজেদের রুম থেকে বের হতে লাগলো,আরাত বক্সের উপর বসে গানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কিচেন রুমের দিকে চেয়ে থাকার মধ্যে দেখলো আদিবা তালুকদার হাতে খুন্তি নিয়ে রাগী মুখে কিচেন রুম থেকে বের হচ্ছেন, আদিবা তালুকদার কে এমন রাগী রুপে দেখে আরাত ভীতু মুখে বক্স থেকে তাড়াহুড়ায় নিমে সোফার পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,

___” তোর ভন্ডামী বের করেছি, আমরা তোকে জ্বালায় তাইনা, লুকাচ্ছিস কেনো বের হ, বের হ বলছি?
আরাত সোফার আড়ালে দাঁড়িয়ে সাহস খাটিয়ে বলল,
___” দেখে মা, তুমি এভাবে খুন্তি নিয়ে আমাকে দৌড়ানি দিতে পারো না, আমি বড় হয়ে গেছি, তার থেকে বড় কথা আমার এখন বিয়ে হয়ে গেছে, আমার একটা মান সম্মান আছে!
সবাই রুম থেকে বের হয়ে মা মেয়ের ঝগড়া দেখছে, আদিবা তালুকদার রাগী গলায় পুনরায় খুন্তি ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন,

___” তোমার এখন মনে পড়ে গেলো, তোমার বিয়ে হয়েছে তাইনা, আমি যখন রান্নার কথা বললাম তখন মনে ছিলো না?
আরাত মুখ গোমড়া করে নিলো , রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার কে বলল,
___” ছোট কী করছিস, রান্না তো আমরা দুজন মিলে হাতাহাতি সামলে নিবো, তুই আমার ছেলের বউ কে কেনো ভয় দেখাচ্ছিস?
আরাত শাশুড়ির সাপোর্ট পেয়ে শাশুড়ীর পিছনে এসে আঁচল ধরে দাঁড়ালো, আদিবা তালুকদার বড় জা কে বললেন,
___” ভাবি ও দিনকে দিন মাথায় উঠে নাচতাছে, বিয়ে হয়ে গেছে রান্নাবান্না কিছু তো শিখতে হবে, যদি অন্য কোথাও বিয়ে হতো তখন কী করতো বলেন তো?
আরাত মায়ের কথায় দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বলল,

___” মা আমি কখন তোমার মাথায় উপর উঠে নাচলাম আমি তো বক্সের উপর বসে নাচছিলাম!
আরাতের কথায় আদিবা তালুকদার আরো রেগে গেলেন, আদিবা তালুকদার কে রেগে যেতে দেখে আইরা রাবেয়া তালুকদার মিম মুখটিপে হাসলো, আদিবা তালুকদার রাগী গলায় পুনরায় বলল,
___” দেখছেন ভাবি দিনকে দিন কেমন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে ?
___” মা আমি ভালো ছিলাম কবে?
আদিবা তালুকদার কিছু বললেন না রাগী চোখে আরাতের দিকে চেয়ে রইলেন,রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে আরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

___” ছোট মানুষ, একটু দুষ্টুমি করবেই, চলো আমি তোমার রান্নায় হেল্প করছি!
কথাটা বলে আদিবা তালুকদার আরাত কে কিচেন রুমে নিয়ে গেলেন, তাঁদের পিছনে পিছনে আইরা আদিবা তালুকদার গেলো, মিম বক্সটা পুনরায় স্টোর রুমে রেখে নিজের রুমে চলে গেলো, চারজন মিলে রান্না করছে, চারজন বললে ভুল হবে আরাত আইরা রান্না করছে, আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার তরকারি কেটে আগে মেলে দিচ্ছে,কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার তাকবীরের মাথা ব্যাথা করতে লাগলো, কিছুক্ষণ বেলকনিতে বসে থেকে রুমে চলে এলো শাওয়ার নিতে, প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে, আরাত কে এখনো রুমে না পেয়ে কিছুটা হতাশ হলো, জুম্মার আজানের সময় হয়ে গেছে, একেবারে নামাজের জন্য পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে রেডি হয়ে নিচে নামলো, নিচে এতক্ষণ কি হয়েছে কিছুই জানতে পারলো না তাকবীর, নিচে এসে মসজিদের উদ্দেশ্য বের হতেই কিচেন রুম থেকে ক্ষণে ক্ষণে খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ভেসে এলো, তাকবীর কিচেন রুমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তাকাতেই এক সুন্দর মুহূর্তের উপর চোখ আটকে গেলো, আরাতের মাথায় বরাবরের মতো কাপড় দেওয়া, আরাত কে মাথায় কাপড় দেওয়ার কথা আর বলে দিতে হয় না, তাকবীর বিয়ের প্রথম রাতে বলার পর থেকে আরাত ঘরের বাহিরে কখনো আর মাথার চুল বের করে চলে না, আরাত কিচেন রুমে খুন্তি দিয়ে তরকারি নড়াচড়া করছে আর রাবেয়া তালুকদারের গল্প শুনে খিলখিলিয়ে হাসতে ছে, তাকবীর হাতে হাত ভাজ করে গম্ভীর আর মুগ্ধ চোখে কিচেন রুমের দিকে তাকিয়ে আছে, আদনান তালুকদার নিচে এসে ছেলেকে কিচেন রুমের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ছেলের চোখ অনুসরণ করে সেদিকে তাকালো, কিচেন রুমে দুই মেয়ে আর বাড়ির দুই গিন্নিকে গল্প করে হেঁসে হেঁসে কাজ করতে দেখে আদনান তালুকদার তাকবীরের ঘারে হাত রাখলেন, তাকবীরের চাহনি পরিবর্তন হলো নিজেকে গম্ভীর করে তুলল, আদনান তালুকদার কে ঘারে হাত রাখতে দেখে গলা খাঁকারি দিলো, আদনান তালুকদার তাকবীরের দিকে চেয়ে বললেন,

___” এটাই বাড়ির পূর্ণতা, বাড়ির গিন্নি ছেলেমেয়ে রা এভাবে বাড়িকে মজবুত করে রাখে, দেখো কী সুন্দর দৃশ্য, মনটা জুড়িয়ে যায়,এভাবে সারাজীবন তালুকদার বাড়ির সম্পর্কটা মজবুত থেকে যাক যুগের পর যুগ।
আদনান তালুকদারের কথায় তাকবীর ছোট করে জবাব দিলো,
___” ইনশাআল্লাহ।
এতক্ষণে আনাস আর আহাদ তালুকদার মসজিদে যাওয়ার জন্য নিচে নেমে এসেছে, তাঁদের সঙ্গে আহিন ও রয়েছে, বাড়ির বাহিরে আলভী রেডি হয়ে অপেক্ষা করছে তাঁদের সঙ্গে মসজিদে যাবে বলে, এটা তাঁদের প্রতি শুক্রবারে হয়ে আসে, আহিন আদনান তালুকদার কে বলে উঠলো,
___” আব্বু চলেন লেট হয়ে যাচ্ছে।
আদনান তালুকদার হাসি মুখে হ্যাঁ বলে পা বাড়ালো, এভাবে বাবা ছেলে পাঁচ জন মিলে মসজিদের উদ্দেশ্য বের হলো, তবে বাড়ি থেকে বের হতে হতে কিচেন রুম থেকে কানে ভেসে এলো রাবেয়া তালুকদারের কথা,
___” জলদি রান্না শেষ করো, শাওয়ার নিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে।

নামাজ আদায় করে বাড়িতে ফিরতেই দেখলো রুপোলী বেগম আর মিমের বাবা তালুকদার বাড়ির হল রুমের সোফাতে বসে আছে, আদিবা তালুকদার ছোট ভাই ভাবি কে জুস এনে দিয়েছে গলা ভিজানোর জন্য, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার আনাস অবাক হয়ে সোফাতে বসে জানতে চাইলো, কাউকে কিছু না জানিয়ে হটাৎ তালুকদার বাড়িতে আসার কারণ, মিমের বাবা-মা যে তালুকদার বাড়িতে আসার আগে কাউ কে কিছু না বলে এসেছে, এজন্য সবার এতটু বেশি উচ্ছ্বাস জানার জন্য, রুপোলী বেগম জুসের গ্লাস টি-টেবিলে রেখে দিলো, মুখে হাসি টেনে আদনান তালুকদারের কথা জবাব করল,

___” ভাইজান, মিম কে আজকে আন্টি পড়াতে আসবো, বেয়াইনের সঙ্গে আমার কথা হইছে, ঘরোয়া ভাবে আন্টি পড়ে দিয়ে যাবো, মিম তো আমাদের উপর রাগ করে গ্রাম থেকে চলে এসেছে, গ্রামে তো বললেও যাবে না এজন্য আমরাই চলে আসলাম, আপনারা একটু আমার মেয়েটারে বুঝান, এমন সুন্দর বড়োলোক ছেলে সহজে হাতে পাওয়ার যায় না।
আদনান তালুকদার ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন, আহাদ তালুকদার বড় ভাইয়ের চাহনি দেখে গম্ভীর গলায় মিমের বাবার দিকে চেয়ে বলল,
___” তোমার বোনের কাছে শুনলাম মিম রাজি না বিয়েতে, মেয়ের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমারা সিন্ধান্ত নেওয়া ঠিক মনে করছো ?

মিমের বাবা কী উত্তর দিবে ভেবে পেলো না, রুপোলী বেগমের দিকে তাকালো তিনি, মূলত মিমের বাবা বরাবরই রুপোলী বেগমের সিদ্ধান্তর উপর কথা বলা না, তিনি মনে করেন একা সংসার উনার গিন্নি যা সিন্ধান্ত নেবে সংসারের জন্য ভালো কনো সিন্ধান্তয় নিবে, কারণ মিমের দাদিমা মা-রা যাওয়ার পর থেকে রুপোলী বেগম একা হাতে সংসার টা নতুন করে গড়ে সাজিয়ে তুলছে, মিমের বাবা সারাদিন মাঠঘাট সামলাতে ব্যস্ত থাকে, রুপোলী বেগম সংসার সামলান, তবে রুপোলী বেগমের স্বাভাব সম্পর্কে তিনি সবই জানেন, গ্রামে বাকি মহিলা দের সঙ্গে বাঁধাবাঁধি করে চলেন সবসময়, সবার চাইতে তাঁর সংসারে এটা ওটা বেস্ট খোঁজে, তাইতো তিনি সবচেয়ে সুন্দর সুদর্শন ছেলে খোঁজেন নিজের মেয়ের জন্য, যাতে গ্রামে সবাই কে বলতে পারে, সবার চেয়ে আমার মেয়েজামাই সুন্দর বেশি, আরিশার বিয়ে তে আরশ কে এক দেখায় তিনি ভেবে নিয়েছিলো আরশ কে নিজের মেয়ের জামাই বানাবে, কিন্তু পরক্ষণে তাকবীর আরাতের বিয়ের দিনে আরশ মিম কে সামান্য ধাক্কা লেগে যাওয়ার, মিমের গায়ের রং নিয়ে কথা বলায়, আরশ কে আর পছন্দ করেন না, যতই আরশ সুদর্শন হোক না কেনো, মিম তাঁর একমাত্র মেয়ে, অনেক সাধনার পর মিম কে তাঁরা পেয়েছে, সেই মেয়েকে কেউ ছোট করে কথা বলবে এটা নিয়ে মেনে নিবে না, আরশ অপমান করার পরপর মিম কে প্রতিবাদ করতে দেখে রুপালী বেগম আর আরশ কে কিছু বলেন নি, কারণ উনার যা বলার সব তাঁর সাহসী মেয়ে বলেই দিয়েছিলো, তারপর যখন দেখতে পেলো মিমের জন্য বিয়ের সম্বন্ধ আসা পরিবারের ছোট ছেলে আরশ, তখন রুপালী বেগম একটু বেশিই খুশি ছিলেন, কারণ দুটো, এক গায়ের রং নিয়ে খোঁটা দেওয়া আরশের সামনে মিম সবসময় থাকবে, তাঁকে ভাবি ভাবি বলে ডাকবে, আর দুই হানিফ আরশের মতো সুদর্শন, যদিও আরশ একটু লম্বা বেশি হানিফের চেয়ে,তবুও তো সুদর্শন,দুই ভাইয়ের চেহারাটা অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রুপোলী বেগম আহাদ তালুকদারের কথায় হাসি মুখে বললেন,

___” ভাইজান মিম ছোট মানুষ, জেদ বেশি এজন্য যা মনে করছে ওটাই সঠিক মনে হচ্ছে, বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবেন, আর আমি এতটা সাহস পাইতাম না শহরে মেয়ে কে বিয়ে দিতে, আমার এক মাএ মনের বল শুধু মাএ আপনাদের কারণে, আপনাদের চোখের সামনে থাকবে মেয়েটা,আপনারা খোঁজ খবর রাখবেন, আমার মেয়েটা সুখী হবে।
রুপালী বেগমের কথায় আহাদ তালুকদার আর কিছুই বললেন না, ভদ্রলোক কী আর বলবে রুপোলী বেগম আগেই আটঘাট বান্ধে কথা বলছে, আনাস রুপোলী বেগম কে বলে উঠলো,

___” বাট মামী, আপনি বা মামা সকাল বেলা একটা কল করতে পারতেই আমরা আয়োজন করতাম, এতটুকু সময়ের মধ্যে এখন কিভাবে আয়োজন করবো আমরা?
আনাস এর কথায় আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার সহমত প্রকাশ করলো, রুপোলী বেগম স্বাভাবিক ভাবে বলল,
___” আনাস বাবা একদম টেনশন করতে হবে না, বিয়ান সাব আমাকে বলেছেন, ছোটখাটো ঘরোয়া ভাবে শুধু আন্টি পড়িয়ে দিয়ে যাবে, চার থেকে সাত জনের মতো মানুষ আসবে, আমাদের শুধু তাঁদের খাবারের আয়োজন করতে হবে এতটুকুই।
রুপালী বেগমের কথায় আদনান তালুকদার বলে উঠলো,
___” খাবারের আয়োজন হয়ে যাবে কিন্তু বাড়িটা ডেকোরেট করার একটা ব্যাপার ছিলো!
___” ভাইজান, বললাম তো সবকিছু হটাৎ হয়ে যাচ্ছে, উনারা তো আন্টি পড়িয়ে দিয়ে যাবে শুধু, বিয়ের সময় খুব বড় করে ধুমধামে বিয়ে দিবো।
আদনান তালুকদার ছোট করে বলল,
___” দেখো তোমার যা ভালো লাগে।
___” জ্বি ভাইজান।

রুপালী বেগম বসা থেকে উঠে গেলেন, আহাদ তালুকদার আনাস কে বলল, আনহা শেখ কে ফোন করে তালুকদার বাড়িতে আসতে, আর যাদের সারতে পারবে না তাঁদের ফোন করে আসতে বলল,আনাস বাবার কথা মতো আনহা শেখ কে ফোন করলো একে একে যাঁদের সারতে পারবে না তাঁদের ফোন করে ইনভাইট করল, আদিবা তালুকদার রান্না ঘরে নতুন করে রান্নার আয়োজন করতে করতে আহিন কে পাঠিয়ে দিলেন, রাহিমা সুলতানা কে ডেকে আনতে সঙ্গে রশ্মি আলভী কেউ আসতে বললেন, রান্না ঘরে নিমেষেই পুনরায় তোরজোর শুরু হয়ে গেলো, আহাদ তালুকদার মিমের বাবা কে নিয়ে বাজারে গেলেন, রাহিমা সুলতানা এসে, আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদারের সঙ্গে কাজে হেল্প করতে লাগলো, আর আইরা, বাকিদের দুপুরের খাবার সার্ভ করতে লাগলো, আনাস আহিন আলভী আদনান তালুকদার খেতে বসেছে, আইরার সঙ্গে রশ্মি টুকিটাকি হেল্প করছে, এতক্ষণে আনহা শেখ এসে পড়েছে, আতিফ শেখ রাস্তা থেকে আহাদ তালুকদারের সঙ্গে বাজারে গিয়েছে,কয়েক মিনিটেই তালুকদার বাড়িতে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠান আমেজ লেগে গেলো,

তাকবীর মসজিদ থেকে ফিরে হল রুমে না দাঁড়িয়ে নিজের রুমে চলে এসেছে, বেলকনির সোফাতে বসে মিটিমিটি রোদে শরীরটা সোফার সঙ্গে এলিয়ে দিয়েছে, আজকে যেন শরীর মন দুটোই রসকষ হয়ে আছে, কমতি কমতি অনুভব হচ্ছে, কমতি অনুভব হওয়াটা খুব স্বাভাবিক, কারণ বিয়ের পর থেকে তাকবীর বাড়িতে যতক্ষণ থাকতে, তাকবীরের পাশে আরাত না থাকলে মনটা ছটফট করে মনে হয় কিছু একটা নেই চারপাশে, বিয়ের আগে তো তাকবীর একা থাকতো তখন তো এমন ছটফট লাগেনি,তাকবীর বুঝতে পারলো এটা বউ কে পাশে না পাওয়ার ছটফটানি, সবসময় একা একা থাকা তাকবীর বিয়ের পর একটুর জন্য বউ কে পাশে না পাওয়ার ছটফট করছে, অফিসে কাজের মধ্যে দিন পর করে দেয় আজকে শুক্রবার হওয়ায় আরাত কে পাশে না পেয়ে ছটফট করছে, সকাল বেলা আরাতের দুষ্টুমির জন্য তাকবীর কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেয়েছিল, তাকবীর প্রথমে আরাতের গলায় লাভবাইট ভেবে নিজের উপর রাগ লাগছিলো, পরক্ষণে নিজের বোকামির জন্য রাগ লাগছিলো, তারপর থেকে আরাত কে আর কাছে পায়নি, এখন প্রায় তিনটার কাছাকাছি, বিয়ে করে বউ বাড়িতে থাকা অবস্থায় শুক্রবারের দিনে বউ কে ছাড়া কাটাতে হচ্ছে,

আরাত এতক্ষণ মিমের রুমে ছিলো, মিমের সঙ্গে কথা বলছিলো, মিম নিজেও এতকিছু জানতো না, আরাত বলার পড়ে মিম হা হুম কিছুই বলেনি, স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে সবকিছু, বাড়ির বড়রা মিম আরশের বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না, এর মধ্যে অন্য ছেলের সঙ্গে মিমের এনগেজমেন্ট আজকে অথচ মিমের মধ্যে কোনো রিঅ্যাকশন নেই, আরাত মিমের সঙ্গে কথা বলে নিচে নেমে আসে, নিচে নেমে আসতেই আইরা আরাত কে বলে,

___” কী রে কই ছিলি এতক্ষণ খাবি না, ভাইয়াও তো খেতে এলো না?
আইরার কথায় আরাতের তাকবীরের কথা মনে পড়ে গেলো, বুঝতে পারলো তাকবীর এখনো খাবার খাইনি, আরাত ডাইনিং টেবিল থেকে নিজের আর তাকবীরের জন্য প্লেট সাজাতে সাজাতে বলল,
___” মিমের সঙ্গে কথা বললাম, আপু মিমের খাবার টা উপরে পাঠিয়ে দিও।
আরাতের কথায় আইরা মিমের জন্য প্লেট সাজাতে লাগলো, আরাত আহিন কে মিমের প্লেট রুমে দিয়ে আসতে বললে রশ্মি বলে,
___” আপু দেও আমি ওকে খাইয়ে দিয়ে আসি!
আইরা রশ্মি কে প্লেট আর এক গ্লাস পানি দিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
___” হ্যাঁ এটাই ভালো হবে, তুই খাইয়ে দিয়ে আয়, আমিও এখান থেকে যেতে পারবো না এখনো, মামা আর আম্মু আসবে তাদের খাবার দিতে হবে, দেখ হটাৎ কত কী চলছে, মিমের মনের অবস্থা কেমন কে জানে, ওদিকে যেতেও পারছি না।
আইরা কে কাজ করতে করতে এত কথা বলাতে আরাত হেঁসে বলল,

___” হয়েছে হয়েছে বাড়ির গিন্নি, আপনি এদিকে সামলান আর….
আরাতের মুখের কথা আইরা কেড়ে নিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,
___” আর আপনি আপনার বর কে সামলান যান!
আইরার কথায় রশ্মিরাত দুজনেই হেঁসে উঠলো, হেঁসে রশ্মিরাত এক সঙ্গে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো, সিড়ির কয়েক পা যেতেই আরাত রশ্মি কে বলে উঠলো,
___” কী রে তুই এই বাড়িতে এখন আসিস না কেনো?
আরাতের কথায় রশ্মি জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, আরাত রশ্মি কে দাঁড়াতে দেখে পিছনে ফিরে বলল,
___” কী দাঁড়িয়ে গেলি কেনো?
রশ্মির মুখে কথা নেই, আরাত নিরবে কয়েক পলক রশ্মি কে পরক করলো, ঠান্ডা কন্ঠে রশ্মির দিকে তাকিয়ে বলল,

___” কী হয়েছে তোর, আমার সঙ্গে শেয়ার করছিস না কেনো, আগে তো এমন ছিলি না?
রশ্মি মলিন মুখে আরাত কে সিঁড়িতে রেখে নিজে যেতে যেতে বলল,
___” কিছু ভাবনা একান্তই নিজের হয়, না কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায়, না কাউকে বোঝানো যায়।
রশ্মি মিমের রুমে চলে গেলো, আরাত স্তব্ধ হয়ে রশ্মির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো, কখন তাঁদের মধ্যে এতটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেলো, যে আরাতের সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না, আরাত কয়েক সেকেন্ড জায়গায় নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মলিন মুখে রুমে চলে এলো, তাকবীর কে রুমে না পেয়ে মলিন মুখে বেলকনিতে পা বাড়ালো, তাকবীর আরাত কে দেখে কোনো পরিবর্তন ঘটলো না আগের ন্যায় বসে রইলো, আরাত মলিন মুখে খাবারের প্লেট টি-টেবিলে রেখে আরাতের পাশে বসলো, তাকবীর কে নড়াচড়া করতে না দেখে আরাত নিজে থেকে কথা বলে উঠলো,

___” খাইয়ে দেন!
তাকবীর এখনো আগের ন্যার বসে থাকলো, আরাত বুঝলো তাকবীর সকালের দুষ্টুমির জন্য অভিমান করে আছে,আরাত তাকবীরের হাত ধরে জিদের ন্যায় বলে উঠলো,
___” আমার খুব খিদা লেগেছে, দ্রুত খাইয়ে দেন?
তাকবীর কিছু বলল না, সোজা হয়ে বসে গ্লাস নিয়ে হাত পরিস্কার করে ভাত মাখতে লাগলো, আরাত তাকবীরের দিকে দেখছে,তাকবীর চুপচাপ ভাতের লোকমা আরাতের মুখের সামনে ধরলো, আরাত তাকবীরের মুখের দিকে চেয়ে ভাতের লোকমা মুখে পুড়ে নিলো, তাকবীর আঁড়চোখে আরাত কে দেখে পুনরায় প্লেটের দিকে নজর ফিরালো, আরাত তাকবীর কে বলল,

___” শুধু আমাকে কেনো খাওয়াচ্ছে, আপনিও খান!
তাকবীর এখনো আরাতের কথায় জবাব করলো না, না নিজে খেলো, শুধু আরাত কে খাওয়াচ্ছে, আরাত মলিন মুখে কয়েক লোকমা খেয়ে পানি খেয়ে নিলো, তাকবীর পুনরায় খাওয়াতে নিলে আরাত না করে দেয়, তাকবীর ভাতের প্লেট টি-টেবিলে রেখে দিয়ে হাত ধুয়ে নিলো, তাকবীর কে হাত ধুতে দেখে আরাত বলে উঠলো,
___”আপনি খাবেন না, হাত পরিস্কার করছেন কেনো, এক প্লেটে খাবেন না, নতুন প্লেট নিয়ে আসবো, এর আগে তো আমরা এক প্লেটে খেয়েছি, আপনি আমাকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেয়েছেন,এজন্য এক প্লেটে নিয়ে আসলাম আমি!
আরাতের এতএত প্রশ্নে তাকবীর একটাও জবাব করল না,তাকবীরের নীরবতা আরাতের পছন্দ হলো না, বসা থেকে উঠে তাকবীরের দু-হাত হাঁটুর উপর থেকে সরিয়ে থমথমে মুখে তাকবীরের কোলে উঠে বসলো, আরাতের সাহসে তাকবীর অবাক হলো, আরাত কী করছে গম্ভীর মুখে দেখতে লাগলো, আরাত তাকবীরের কোলে বসে টি-টেবিল থেকে ভাতের প্লেট হাতে তুলে ভাত মেখে তাকবীরের মুখের সামনে ধরে বলল,

___” হা করেন!
তাকবীর অবশ্য মুখে স্তব্ধ হয়ে আরাত কে দেখছে শুধু, তাকবীর কে মুখ খুলতে না দেখে আরাত এবার ধমকে বলল,
___” কী হলো মুখ খুলতে বলছি না?
নিস্তব্ধ তাকবীর আরাতের ধমকে চুপচাপ মুখ খুলল, আরাত তাকবীর কে হা করতে দেখে হাসি মুখে একটার পর একটা লোকমা খাওয়াতে লাগলো, আর বকবক করতে লাগলো,
___” জানেন বাড়িতে কী হচ্ছে?
তাকবীর এতক্ষণে ছোট করে উওর করলো,
___” নো।
আরাত পুনরায় তাকবীরের মুখে লোকমা তুলে দিয়ে রাগী স্বরে বলে উঠলো,

___” তা জানবেন কেনো,বাড়ির খবর রাখেন আপনি, সবসময় অফিস আর রুম নিয়ে পড়ে থাকেন!
___”একটু মিস্টেক, তোমাকে এ্যাড করতে ভুলে গেছো।
তাকবীরের কথায় আরাত তাকবীরের দিকে তাকালো,আরাত তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো, তাকবীর গভীর চাহনিতে আরাত চোখ নামালো,তাকবীর আরাতের হাতে চুড়ি দেখতে না পেয়ে পায়ের দিকে তাকালো, পায়ে নুপুর নেই, তাকবীর আরাতের গলার দিকে তাকাতে দেখলো গলায় চেন আছে শুধু, তাকবীর গম্ভীর গলায় বলল,

___” নুপুর কই?
আরাত পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” খুলে রেখে দিয়েছি!
তাকবীর ভ্রু কুঁচকালো, আরাত তাকবীরের চাহনিতে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” এত দামী জিনিস আমি পড়ে থাকতে পারবো না, যদি হারিয়ে ফেলি এজন্য খুলে রেখে দিয়েছি।
আরাতের কথায় তাকবীরের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হলো,গম্ভীর গলায় ছোট করে বলল,
___” তোমার থেকে দামী কিছু কী আর এই দুনিয়াতে থাকতে পারে?
আরাত কথা বলল না, তাকবীরের থেকে দৃশ্য সরিয়ে নিলো, তাকবীর এতক্ষণে দুষ্টু হেঁসে আরাতের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে উঠলো,

___” আমি কী পড়িয়ে দিবো?
আরাত তাকবীরের কথার মিনিং বুঝতে পেয়ে, লজ্জা পেয়ে এঁটো হাতে তাকবীরের হাত চেপে ধরে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে বলে উঠলো,
___” একদম না আমি পারবো।
তাকবীর আরাতের লাজুকময় মুখের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আরাত আরো বেশি লজ্জা পেতে লাগলো, তাকবীরের সাদা পাঞ্জাবির হাতে আরাতের এঁটো হাতের হলুদ দাগ লেগে আছে, তাকবীর আরাত কে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত কপালে ঠোঁটের ছোঁয়া পেতেই চোখ মেলে তাকালো, তাকবীর আরাতের আদুরে মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে নাকের সঙ্গে নাক ঘষলো, আরাত ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

___” ছেড়ে দেন, হাত ধুতে হবে।
___” উঁহু কেনো ডিস্টার্ব না।
আরাত ঠোঁট উল্টে বলল,
___” বাড়িতে অনুষ্ঠান চলছে, নিচে যেতে দিন প্লিজ?
তাকবীর কপাল কুঁচকালো, স্বাভাবিক হয়ে গম্ভীর গলায় জানতে চাইলো,
___” অনুষ্ঠান মানে?
আরাত তাকবীর কে ইশারা করলো ছেড়ে দিতে, তাকবীর ছেড়ে দিলো আরাত কে, আরাত কোল থেকে নেমে হাত ধুতে ধুতে বলল,
___” মামা-মামী এসেছে দেখছেন তো, আজকে মিমের এনগেজমেন্ট।
তাকবীর সোফাতে ঠিকঠাক হয়ে বসলো, আরাত হাত ধুয়ে তাকবীর কে একবার দেখে রুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
___” পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে নিচে আসবেন।
আরাত কথাটা বলে প্লেট নিয়ে চলে গেলো, তাকবীর আরাতের দিকে চেয়ে আছে, আরাতের অধিকার দেখিয়ে কথা বলা বলে দিচ্ছে তাকবীর নিচে আসবে, সবার সঙ্গে নিচে সামিল থাকবে।

মিরা আর মাহমুদ ইসলাম বাজারে এসেছে, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা লেগে গেছে, চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে, মিরা কিছু কসমেটিক নিবে, শুক্রবার ছুটির দিন বাবার সঙ্গে জেদ ধরেছে বাজারে যাবে,সঙ্গে কিছুটা বাবার সঙ্গে বাহিরে সময় কাটানো হবে, আর কসমেটিক নেওয়া হবে, কসমেটিক নেওয়া শেষে মাহমুদ ইসলাম মেয়েকে নিয়ে কাঁচাবাজারে দোকানে সামনে এলো, মেয়ের পছন্দের দেখিয়ে দেওয়া সবজি কিনে নিয়ে,সঙ্গে একটা বড় মাছ নিলো, এক হাতে বড় মাছ আরেক হাতে কাঁচা বাজার নিয়ে হাঁটছে, মিরা কাঁচা বাজারের ব্যাগ মাহমুদ ইসলামের থেকে নিজে নিয়ে নিলো,বাবা মেয়ে হাসি মুখে গল্প করতে করতে হাঁটছে,মিরা মাহমুদ ইসলাম কে বলে উঠলো,
___” বাবা রশ্মি আপু কে তোমার কেমন লাগে?
মাহমুদ ইসলাম মেয়ের কথায় অবাক হয়ে চাইলো মিরার দিকে, মিরা মাহমুদ ইসলাম কে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে পুনরায় বলল,

___” না বলতে চাইছিলাম,রশ্মি আপু আর ভাইয়ার ব্যাপারে তো সব জানো, ভাইয়া নিজেকে একঘরে করে রেখেছে,হ্যাঁ মানছি ভাইয়া ভুল করেছে তাঁর জন্য তো সরি বলছে তাই-না, পুরো কলেজের সামনে দুজনেই দুইদিন ভাইয়া কে থাপ্পড় দিয়েছে, আর কত অপমানিত হবে।
মিরার কথায় মাহমুদ ইসলাম অবিশ্বাস্য চোখে বললেন,
___” মাহির কে থাপ্পড় দিয়েছে মানে?
মিরা এবার আমতা আমতা করতে লাগলো, কথায় কথায় মুখ ফসকে থাপ্পড়ের বিষয়টা বলে ফেলছে, মাহমুদ ইসলাম কথাটা শুনে কষ্ট পেলো কিছুটা, যতই মাহির অপরাধ করুক না কেনো ছেলেতো, মাহমুদ ইসলামের কথায় মিরা কথা ঘুরাতে বলল,

___” না মানে, আমি বলে কী আমরা কী মাহির ভাইয়ার জন্য রশ্মি আপুদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে পারি না?
মাহমুদ ইসলাম মিরার কথা শুনলো ঠিকই কিন্তু উওর করলো না, মিরা পুনরায় মাহমুদ ইসলাম কে কিছু বলতে নেবে হটাৎ রাস্তায় ওপাশে বাইকের উপর একজন কে দেখে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, রাফি বাইকে বসে আছে,দেখে মনে হচ্ছে কারো জন্য অপেক্ষা করছে, মাহমুদ ইসলাম মিরা কে দাঁড়াতে দেখে পিছনে ঘুরে তাকালো, মিরার চোখ অনুসরণ করে রাস্তায় ওপাশে রাফি কে দেখে হাসি মুখে রাফি কে ডাক ছাড়ালেন,
___” রাফি…. ?
রাফি বাইকে বসে আমানের অপেক্ষা করছিলো, আমান বাজারের ভেতরে গেছে কিছু কিনা কাটা করার জন্য, তালুকদার বাড়িতে যাবে বলে, আমানের অপেক্ষা করছিলো রাফি, কারো ডাকে সামনে তাকাতেই দেখলো মাহমুদ ইসলাম রাস্তায় ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে, রাফি বাইক রেখে রাস্তা পার হয়ে হাসি মুখে মাহমুদ ইসলামের কাছে এসে সালাম দিলো, রাফির সালামের উত্তর নিয়ে মাহমুদ ইসলাম বললেন,

___” কারো জন্য অপেক্ষা করছিলে মনে হচ্ছে?
রাফি মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” হ্যাঁ আঙ্কেল, আমান ভাই কিছু কেনাকাটা করার জন্য ভিতরে গিয়েছে, ভাইয়ার জন্য ওয়েট করছিলাম।
মাহমুদ ইসলাম হাসি মুখে বলল,
___” ও আচ্ছা, আমি আর মিরা বের হয়েছিলাম, এই যে দেখছো মাছ আর মিরার হাতে বাজার।
মাহমুদ ইসলাম হাসি মুখে মাছ দেখিয়ে দিয়ে বলল, রাফি মাহমুদ ইসলামের কথায় অবাক হয়ে মাহমুদ ইসলামের পিছনে তাকালো,মিরা কে রাফি এতক্ষণ লক্ষ করেনি চোখেও পড়েনি, মাহমুদ ইসলামের পিছনে তাকাতেই দেখলো মিরা মাথায় কাপড় দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, রাফি মিরা কে দেখতে পারবেই কিভাবে, মাহমুদ ইসলাম রাফি কে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে মিরা মাহমুদ ইসলামের পিছনে লুকিয়ে পড়ছে, যাতে রাফির চোখে না পড়ে, রাফি মিরা কে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মিরা মুখে মেকি হাসি দিয়ে রাফি কে চোরাচোখে দেখতে দেখতে সালাম দিলো ,

___” আসসালামু আলাইকুম রাফি ভাইয়া?
রাফি মিরার দিকে চেয়ে গম্ভীর মুখে সালাম নিলো, মাহমুদ ইসলাম মিরা কে রাফির নাম ধরে ডাকায় মিরা কে ধমক দিয়ে উঠলো,
___” রাফি ভাইয়া কী হ্যাঁ, বড়দের কেউ নাম ধরে ডাকে, শুধু ভাইয়া বলে ডাকো?
রাফির সামনে বাবা-র কাছে ধমক খেয়ে লজ্জা পেলো মিরা, মাথা নিচু করে ছোট করে বলল,সরি, রাফি মিরার দিকে তাকিয়ে মাহমুদ ইসলাম কে গম্ভীর গলায় বলল,
___” ইটস ওকে আঙ্কেল, ছোট মানুষ বুঝতে পারে নি।
রাফির কথায় মিরা অন্য দিকে ফিরে মুখ বাঁকা করে বিরবির করে উঠলো ,
___” ছোট মানুষ বুঝতে পারেনি,উনি খুব বুঝতে পারে।
মিরা কে অন্য দিকে ফিরে বিরবির করতে দেখে রাফি মাহমুদ ইসলামের থেকে বিদায় নিয়ে বলল,

___” আঙ্কেল আসলাম লেট হয়ে যাচ্ছে।
___” হ্যাঁ অবশ্যই, একদিন আমাদের বাসায় ঘুরতে এসো, আগের মতো তো আর আসো না?
রাফি হাসি মুখে বলল,
___” এইভাবে আর সময় হয়ে উঠে না আঙ্কেল, ইনশাল্লাহ চেষ্টা করবো।
রাফির কথায় মাহমুদ ইসলাম হাসি দিয়ে বলে উঠলো ,
___” অবশ্যই অবশ্যই, আচ্ছা ঠিক আছে ভালো থেকে অন্য দিন দেখা হবে।
___” জ্বী আঙ্কেল।
মিরা এতক্ষণ রাফি আর মাহমুদ ইসলামের কথা গুলো শুনছিলো, কিন্তু পুরো সময় নজর ছিলো রাফির উপর, রাফি মাহমুদ ইসলামের থেকে বিদায় নিয়ে মিরার দিকে তাকাতেই মিরা চোখ নামিয়ে নিলো, রাফি গম্ভীর গলায় মিরা কে বলল,

___” আল্লাহ হাফেজ ।
আল্লাহ হাফেজ বলে রাফি চলে গেলো, মিরা কে আল্লাহ হাফেজ বলার সুযোগ পর্যন্ত দিলো না, মিরা কিছুটা অপমানিত হলো এতে, পুনরায় মাহমুদ ইসলামের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে রাফি কে যতদূর দেখা যায় দেখতে লাগলো, মাহমুদ ইসলাম হাসি মুখে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
___” ছেলেটা কিন্তু সত্যি অমায়িক আর শান্তশিষ্ট, শুনেছিলাম রাফির বড় ভাইয়ের শালিকে পছন্দ করতো, মেয়েটার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে?
মিরা দূর থেকে দেখলো, আমান আসার সঙ্গে সঙ্গে রাফি বাইক টান দিলো, মিরা সেদিন থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বাবার কথায় বলে উঠলো,
___” কিছু বললে বাবা?
মাহমুদ ইসলাম হাঁটতে হাঁটতে বলল,
___” মন কই ছিলো এতক্ষণ?
মিরা মাহমুদ ইসলামের কাছে দৌড়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে হাসি মুখে বলল,
___” মন যেখানে থাকার কথা সেখাই আছে, শুধু একটু জায়গা পরিবর্তন হয়েছে।
মিরা কথাটা শেষ করে বাবা-মেয়ে একসঙ্গে হেঁসে উঠলো,

তালুকদার বাড়িতে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গিজগিজ করছে মানুষ, আশিক মায়া সন্ধ্যা হাবীব, আজকে সন্ধ্যা হাবীবের সঙ্গে হানিয়াও এসেছে, এদিকে আমান আরিশা রাফি, সবমিলিয়ে এক অন্য রকম আমেজ ভরপুর হয়ে উঠেছে, আরিশা কে পেয়ে আনহা শেখ তো মেয়ের কাছে থেকে সরছে না, কিছুক্ষণ পরপর এটা ওটা নিয়ে এসে খাওয়াচ্ছে আরিশা এতে খুব বিরক্ত, এতকিছু একবারে খাওয়া যায় নাকি, কিন্তু কে শুনে কার কথা আনহা শেখ যেন আজকেই নাতিনাতনি কে পেয়ে গেছেন, হানিফ দের বাড়ি থেকে এসেছে মোট পাঁচজন, হানিফ আরশ আর আরশের বাবা-মা, তাঁদের সঙ্গে আরশের ছোট একটা কাজিন এসেছে নাম তাঁর নূরফিহা, মায়া সন্ধ্যা রশ্মি আইরা হানিয়া পাঁচজন আইরার ঘরে আড্ডা দিচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে মায়া সন্ধ্যা মিমের সঙ্গে দেখা করে এসে আইরার রুমে, মিম আর আরশের বিয়ে নিয়ে কথা বলছে নিজেরা, সন্ধ্যা সবকিছু শুনে আফসোস করে বলে উঠলো,

___” ইসস আমি ওইদিন কলেজে ছিলাম না, আমি থাকলে ওই তাসিনের বাচ্চা কে চুলের ঝুটি ধরে পুরো ভার্সিটিতে টেনে মাঠের মধ্যে ছ্যাঁচড়াতাম।
সন্ধ্যার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা বলল না, তাসিন কে পুরো মাঠে ছ্যাঁচড়ালো, হানিয়া সন্ধ্যার রিয়েকশন দেখে ফিক করে হেঁসে দিলো, আর বাকি সবাই স্বাভাবিক মতো যেটা হওয়ার দরকার এটাই হলো, বিরক্ত মুখে তাকালো সন্ধ্যার দিকে, হানিয়া কয়েক দিন থেকে সন্ধ্যা কে দেখছে যেন আরাতের ডুপ্লিকেট, রশ্মি সন্ধ্যার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” ওখানে তোমার ওস্তাদ উপস্থিত ছিলো, সেই ব্যর্থ হয়েছে বনু।
সন্ধ্যা পুনরায় বলে উঠলো,
___” আরাত মানবতা দেখাছে, আমি এতটা মানবতা ফেরিওয়ালা না, আমার তো শুনেই ইচ্ছা করছে ছেমরি রে উমমমমম।
মায়া সন্ধ্যা কে শান্ত করে বলে উঠলো,

___” হয়েছে হয়েছে শান্ত হও, আমি একটা বুদ্ধি দেই শোনো?
সবাই মায়ার দিকে তাকালো,
___” ওই মেয়ে কে ফাঁদে ফেলে প্রথমে ক্লাস রুমে আনবে,তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে এলোপাতাড়ি দিয়ে দিবে ঢুসুম ঢুসুম।
মায়ার কথায় আইরা রাগী চোখে মায়ার দিকে তাকালো, আইরার তাকানো তে মায়া বলল,
___” এই এভাবে তাকাচ্ছিস কেন, আমি কিন্তু ভুল কিছু বলিনাই বৃদ্ধি খাটা?
___” তোর ওই মজিবর মার্কা কথার জন্য আমার সুন্দর বৃদ্ধিগুলো নষ্ট করতে পারবো না, আর একটাও কথাও না, মিম কিছু বলছে না যেহেতু ও কিছু প্লান করছে, আমরা হানিয়ার কথা বলি!

সবার আড্ডায় কিন্দবিন্দু হানিয়া হয়ে গেলো, নিচে অনেকদিন পড়ে আনাস আশিক আদিল হাবীব আমান আর তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছে রাফি, ছয়জন মিলে ছাঁদে আড্ডা দিচ্ছে, নিচে ড্রয়িং রুমে বাড়ির বড়রা নিজেরা নিজেরা মিম আর হানিফ কে নিয়ে কথা বলছে, হানিফ দের তালুকদার বাড়িতে আসা প্রায় পনেরো মিনিটের মতো হবে, এসে থেকে ড্রয়িং রুমে সবার সঙ্গে বসে আছে, হানিফের ফোনে ক্ষণে ক্ষণে মেসেজ আসছে, হানিফ আগেই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে, আরশ ছটফট করছে জায়গা থেকে উঠার জন্য, রাফির সঙ্গে দেখা হয়নি, রাফিকে মেসেজ দিয়েছে কিন্তু রাফি মেসেজ সিন করেনি,

হানিফের পাশে বসা ছোট কিউট নূরফিহা এদিক ওদিক ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে পুরো বাড়ি দেখছে, ডাইনিং টেবিলের দিকে চোখ যেতেই দেখলো দুটো ছেলে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে, একটা ছেলে গালে হাত দিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে, আরেকটা ছেলে তাঁর পাশে বসে আপেলে কামড় বসাচ্ছে, আর তাঁর পাশের ছেলেটা কে বিরক্ত মুখে দেখছে, নূরফিহা সোফা থেকে নামলো, বড়রা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে দেখে নূরফিহা কে কেউ খেয়াল করলো না, নূরফিহা ধীর পায়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালো, নিজের হাত বাঁড়িয়ে দিয়ে বলল,

___” হাই আই এম নূরফিহা এন্ড ইউর নেম?
আলভী দুই গালে হাত রেখে মলিন মুখে বসে ছিলো, যাকেই এই মনে ধরে তারই বিয়ে হয়ে যায়, মায়াবতী কে তো কম ভালোবাসি নি তারপরও মায়াবতী আলভী কে রেখে তাকবীর কে বিয়ে করে নিলো, মায়াবতী কে কষ্ট করে মন থেকে বের করে সাহসীরানী কে মনে জায়গা দিলো, কয়েকদিন না যেতেই সাহসীরানী অন্য কে বিয়ে করছে, মায়াবতী তাও কয়েক বছর টিকছিলো আর সাহসীরানী ঠিক মতো দশ দিও টিকলো না, এজন্যই লোকে বলে প্রথম প্রেম কে কখনো ভুলা যায় না আর প্রথম বউয়ের মতো কেউ হয়না। আলভী কথাগুলো মনে মনে ভাবছিল আর মনের দুঃখ গুলো নিজের মনে লুকাচ্ছিলো, কারণ এখন যদি আহিনের সামনে মনের দুঃখ গুলো প্রকাশ করে তাহলে আহিন লাথি দিয়ে তালুকদার বাড়ি থেকে বের করে দিবে, এমনই বিরক্ত মুখে পাশে বসে আপেল চিবাচ্ছে আর নজরে নজরে রাখছে, আলভীর ভাবনার মধ্যে মুখের সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে অচেনা এক মেয়ে কে দেখে আলভী অবাক হলো, আহিন ভ্রু কুঁচকে দুজন কে দেখছে, আলভী হাসি মুখে হ্যান্ডশেক করল,

___” আলভী,বাই দ্যা ওয়ে নাইস নেম।
নূরফিহা হাসি মুখে বলল,
___” থ্যাঙ্ক ইউ।
আলভী আগের ন্যায় হেঁসে বলল,
___” মোস্ট ওয়েলকাম।
আহিন দুজনের কথাকথনে বিরক্ত হলো, আলভী কে ইংরেজিতে কথা বলতে দেখে আরো বেশি বিরক্ত লাগলো, মনে মনে ভাবলো সালা বলদ সবসময় বলদের মতো বোকা বোকা প্রশ্ন করে আর এখন ইংরেজি মারাচ্ছে, নূরফিহা আহিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

___” হাই ইউর নেম?
আহিন আপেল চিবাতে চিবাতে বিরক্ত মুখে বলল,
___” তোকে কেনো বলতে যাবো?
নূরফিহা মুখ অন্ধকার করে নিলো,
___” তুমি অনেক পচা!
___”তোর প্রশংসা শুনতে চাইনি।
নূরফিহা মন খারাপ করে চলে গেলো, পুনরায় ড্রয়িং রুমের সোফাতে গিয়ে হানিফের পাশে মুখ অন্ধকার করে বসে পরলো, নূরফিহা কে মন খারাপ করে যেতে দেখে আলভী রেগে বলল,

___” তুই নূরফিহার সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করলি কেনো, মন খারাপ করছে ?
আহিন নাক-মুখ সিটকে বলল,
___”তুই গিয়ে খেলা কর মন ভালো হয়ে যাবে,তোর মন খারাপ ভালো হয়ে গেছে?
আলভী আহিনের শেষের কথায় হাসি মুখে বলল,
___”হ্যাঁ।

আহিন আলভীর দিকে তাকিয়ে বলল, মিম আপু ঠিক বলছিলো বড় হয়ে তুই প্লে বয় হবি, আহিরের কথায় আলভীর পুনরায় তাঁর সাহসী রানীর কথা মনে পড়ে গেলো, চেয়ারে বসে আগের ন্যায় চিন্তিত মুখে গালে হাত রাখলো,
মিম রুমের ভিতরে এমাথা ওমাথা পায়চারি করছে, হানিফ কে কয়েকবার মেসেজ করেছে দেখা করার জন্য কিন্তু হানিফ মেসেজ সিন করছে না, না কোনো রিপ্লাই দিচ্ছে,আরাত এতক্ষণ মিমের রুমে ছিলো, হানিফ কে মেসেজ করে পাচ্ছে না দেখে আরাত নিচে গেছে হানিফ কে ডাকতে,মিম পুরো রুম পায়চারি করতে করতে বিরক্ত হয়ে বিছানায় বসে পরলো, কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর হুট করে রুমের দরজা খুলে গেলো, মিম হানিফ এসেছে ভেবে পিছনে ঘুরে দরজার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে আটকে গেলো.

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫০

___” আপনার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করছি জা…
দরজার সামনে হানিফের বদলে আরশ কে দেখে মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো, মুখে রাগ ফুটে উঠলো নিমেষেই, আরশ অনেক খোঁজে মিমের রুম বের করল, এর আগের তালুকদার বাড়িতে আসলেও মিম কোন রুমে থাকে তা তো জানে না, প্রত্যেকটা রুম নানান বাহানা দিয়ে দিয়ে খুঁজে অবশেষে মিমের রুম খোঁজ পেলো, রুমে ঢুকে দরজার লাগিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরে মিমের দিকে তাকাতেই, টকটকে লাল শুতির শাড়িতে মিম কে দেখে আরশ স্তব্ধ হয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, মিম কে একদম নতুন বউ বউ লাগছে, আরশের চাহনি দেখে মিম রাগী গলায় বলল,
___” একদম তাকাবেন না, বদ নজর লেগে যাবে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫২