তুমিময় বসন্ত পর্ব ৩৯

1142

তুমিময় বসন্ত পর্ব ৩৯
writer Mousumi Akter

চোখ খুলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম ভিন্ন এক জায়গায়।ঝাপসা চোখ দুটো পুরাপুরি স্পষ্ট হতেই কিছুটা বোধগম্য হলো সব কিছু।এটা হসপিটালের কেবিন রুম দেখেই বোঝা যাচ্ছে।আমার হাতে স্যালাইন ধরানো, পাশে অক্সিজেন মাস্ক।মাথাটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে আমার।আম্মু আর বাবা দুজনে আমার দুই হাত ধরে রেখেছে তাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অঝরে।খালামনি আর খালু ও পাশে আছে।আয়াসের আম্মা আর বাবা আমার মাথার কাছে বসে আছে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আয়াসের আম্মার চোখে বৃষ্টির ঢ্ল নেমেছে।অয়ন আর আরহী দাঁড়িয়ে আছে স্রুতির হাত ধরে।মামা বাড়ি থেকে মামা মামি ও এসছে।আয়াস নিথর হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। উস্কো খুসকো চুল,শার্টের বোতাম খোলা,লাল চোখের মনি।আয়াসের দৃষ্টি নড়ছে না, পলকহীন ভাবে মন খারাপ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

আমি চোখ খুলতেই সব থেকে বেশী কাঁদলো বাবা আর আম্মু সাথে আয়াসের আম্মা।আম্মু আর বাবার কাঁন্না থামানোই যাচ্ছে না।এমন কাঁন্না আমার বয়সে আমি দেখি নি। আম্মু কিছুই বলতে পারছে না শুধু কেঁদেই যাচ্ছে।তাদের কাঁন্না দেখে আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারছি না।তবে ভেতর টা জ্বলে যাচ্ছে।সবাই ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।আম্মু,আয়াসের আম্মা,খালামনি বাবা সবাই আমাকে নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।আমার মাথায় হাত বুলোচ্ছে কেউ,হাত মালিস করে দিচ্ছে আর নিজেরা বিভিন্ন কথা বলে যাচ্ছে।আমার কেমন লাগছে,ভালো লাগছে কিনা।এসব কোনো কিছুই যেনো আমার বোধগম্য হচ্ছে না।আরহীর কথা গুলো সবার কথা ভেদ করে মস্তিষ্কের নিউরণে নিউরণে ছুটে বেড়াচ্ছে।শিরা উপশিরায় যেনো র**ক্তে** সাথে ছুটছে সেই বিষাক্ত কথা গুলো।মানুষের জীবনের অতীত এমন ও ভয়ংকর হতে পারে।
বাবা আমার হাত ধরে বললো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

‘মা আমার হৃদয়ে সব থেকে বেশী স্নেহের জায়গা জুড়ে শুধু তুমি আছো।তোমার কিছু হলে তোমার আম্মু আর আমিও শে*ষ হয়ে যাবো।এই তিনদিন তোমার কোনো জ্ঞান ছিলো না।তোমার আম্মু একভাবে কেঁদেছে তোমার আম্মু কতবার সেন্সলেস হয়েছে ঠিক নেই।তোমার আম্মু আর আমার জন্য হলেও তোমাকে শক্ত হতে হবে।তুমি যদি ভুলে যাও আমরা তোমার মা বাবা নই আমাদের কি হবে তুমি বুঝতে পারছো।তোমাকে আগলে রাখতে অনেক যুদ্ধ করেছি।তুমি আমাদের ই মেয়ে মা।’
বাবার দিকে বেদনাদায়ক দৃষ্টিতে তাকালাম উত্তর দিলাম না।

মুহুর্তের মাঝে আমার মনের মাঝে শুরু হলো বেদনার মহাপ্রলয়।আমার অস্তিত্ব সব যেনো বিলিয়ে গেলো।নিজের কল্পনায় চলে গেলাম সেই অতীতে।মারুফ আনান আর রুহানা আনান এর কবরের কথা বারবার মনে পড়ছে।আমার মা বাবা ওখানে সুয়ে আছি।আমি কোনদিন বুঝতেও পারলাম না যে আমার সব থেকে প্রিয় দুইটা মানুষ আমাকে ছেড়ে বহুদুর চলে গিয়েছে।স্বাভাবিকভাবে যদি তাদের মৃ*ত্যু হতো আমি মেনে নিতাম।কিন্তু আমি এটা মেনে নিতে পারছি আমার মা বাবাকে ভীষণ কষ্ট দিয়ে সময় হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে।চারদিকে যে সবাই এত কাঁন্নাকাটি করছে আমার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।আমার মন, চিন্তা,ভাবনা সবটা ই আমার অতীতে প্রবেশ করেছে।আয়াসের আম্মা আমাকে ডাকছে,খালামনি,আম্মু সবাই ডাকছে কোনোকিছুতে কোনো খেয়াল নেই।কেমন ছিলো আমার আম্মু কেমন ছিলো আমার বাবা।চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে আমার।
অনেক সময় পর আম্মুকে জড়িয়ে ধরে জোরে কেঁদে দিয়ে বললাম,

‘আম্মু,আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আম্মু।তুমি ই তো আমার আম্মু আমি তো কোনদিন মায়ের অভাব বোধ করতে পারিনি তাহলে কেনো আমাকে এত ভয়ানক সত্য জানালে।যারা আমাকে জন্ম দিয়েছিলো তারা নেই, এটা আমি মেনে নিতে পারছি না।আজ মনে হচ্ছে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।আমার নিজের মা কি দেখতে তোমার মতোই ছিলো নাকি খালামনির মতো ছিলো।আমি মনে হয় দমবন্ধ হয়েই মা*রা যাবো। আমার একটুও সহ্য হচ্ছেনা এই কষ্ট।’
‘আমি তোমার খালামনি কেউ ভালো নেই।সে তো আমাদের ই বোন ছিলো। বোন হারাবোর কষ্ট আজ ঊনিশ টা বছর আমাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।তুই চোখের সামনে থাকলে সেকেন্ডে সেকেন্ডে মনে করিয়ে দেয় তোর মায়ের কথা।তুই দেখতে অবিকল তোর মায়ের মতো।নিজের বোনকে হারিয়ে তুই ছিলি আমাদের আর আয়াসদের ফ্যামিলির একমাত্র সেতুবন্ধন।’
আয়াসের আম্মার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে বললাম,
‘আপনি আমার ফুপ্পি হন।আগে বলেন নি কেনো?’

‘আজ ঊনিশ টা বছর একমাত্র ভাইকে হারিয়ে সেই সাথে মা বাবা সব হারিয়ে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছি তোমার বড় হওয়ার জন্য।কবে তুমি বড় হবে আমার কাছে নিয়ে আসবো।তোমাকে কাছে পেয়ে একটু হলেও ভাই কে কাছে পাই আমি।তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না মা।তুমি ছাড়া আমাদের কেউ নেই।’
অতীত টা অনেক বেশী ভয়ংকর হলেও বর্তমান টা অনেক সুন্দর আমার।আমার আম্মু আর বাবা যে নিজের মা বাবা না সেটা কখনোই ফিল হয়নি আমার।কিন্তু আজ সবটা জানার পরে ভালো নেই আমি।শুধু আমি নয় আমার মতো আমার পরিবারের প্রতিটা মানুষ ই আমার মা -বাবাকে হারিয়ে কেউ ভালো নেই।
সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেলে আয়াস আমার পাশে এসে বসলো।
আমার হাত দুটো শক্তভাবে চেপে ধরে বললো,
‘নিজেকে কখনো একা ভেবোনা মুগ্ধপরী।অতীতের সত্য তোমার জানা প্র‍য়োজন ছিলো।তার মানে এইনা তুমি সেটা ভেবে কষ্টে থাকবে।আমার আম্মা তোমার ফুপ্পি হয়। আমি নিজে দেখেছি রাতের পর রাত তোমার বাবার শোকে ঘুমোয় নি।ছটফট করেছে,কেঁদেছে।আমার আম্মা তোমার ফুপ্পি হলেও তোমার মা।চারপাশে আমরা সবাই আছি।তুমি কি জানো তুমি এখন কোথায় আছো।ঢাকায় মেডিকেল হসপিটাল এ।তিনদিন চোখ খোলোনি তুমি।পরিবারের সবাই তোমাকে কতটা ভালবাসে আমি এইবার প্রুভ পেয়েছি।তবে আমার ও ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু ভয় পাচ্ছিলাম না।আমি জানতাম তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।আমার জন্য হলেও সুস্থ হবে।পরিবারের সবার জন্য হলেও সুস্থ হবে।তোমার একটা মিনি স্ট্রোক হয়েছিলো ব্রেইনে।এই তিনদিন আমি বুঝেছি তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি কি হয়ে যায়।তুমি আমার শক্তি মুগ্ধতা।প্লিজ ভেঙে পড়োনা আর।’

হসপিটাল থেকে ফেরার সাতদিন পর।আমি আম্মুর কাছেই আছি।এখন সম্পূর্ণ সুস্থ লাগছে।আরহী আমার সাথেই আছে সারাক্ষণ আমাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।আয়াস যশোর গেছিলো আজ আবার নাইট পাশে আসবে।আয়াস কে নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই আজ আমার। সন্ধ্যায় আয়াস আম্মুদের বাসায় এসছে।আমি তখন রেডি হচ্ছিলাম।খুব সাজগোজ করেছি আজ।এত বেশী আগে কখনোই সাজিনি আমি।
আয়াস এসে আমাকে রেডি হতে দেখে বললো,
‘এত গরজিয়াস ভাবে সেজেছো আজ।এমনিতেই সুন্দরী তার উপর এত সেজে কি আমাকে পা*গ*ল টাগল বানাতে চাও।’
‘মৃদু হেসে বললাম, এ বড় ভয়ংকর সাজ।’
‘তাই।’
‘হুম একজায়গা যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা তাই কোথায়?’
‘আমার প্রাক্তন এর সাথে দেখা করতে।’
‘মজা করোনা।সত্যি বলো।’
‘সত্যি অভির সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।তুমি রেস্ট নাও আমি যাবো আর আসবো।’

‘কি ব্যাপার বলোতো।তোমাকে অনেক ম্যাচুরট লাগছে হঠাত।আমাকে তুমি করে ডাকছো, আবার স্ট্রেইট বলে দিচ্ছো তুমি তোমার প্রাক্তণ এর সাথে দেখা করতে যাচ্ছো।কাহিনী কি বেবিডল।’
‘কোনো কাহিনী নেই যাচ্ছি তাই সত্য কথা বলছি।’
‘আমি ও যাবো।তুমি একা ওর সাথে যাবা।’
‘আমি পালিয়ে যাচ্ছিনা কোথাও আয়াস।আর পালিয়ে গেলে তোমাকে এইভাবে বলে যেতাম না।মুগ্ধতা ফিরে আসবে তোমার কাছে।তুমি শুধু ওয়েট করো।’
‘আচ্ছা কতক্ষণ পরে আসবে।’
‘দুই ঘন্টা।’
‘এই রাত তুমি একা যাবে।আমার মন সায় দিচ্ছে না।’

তুমিময় বসন্ত পর্ব ৩৭+৩৮

‘আরহী যাচ্ছে সাথে।তুমি কিন্তু একটুও চিন্তা করবা না আয়াস বাবু।তোমার বউ ফিরে আসবে।কাছে এসো তো কপাল টা এগোও।’
আয়াস কপালে এগিয়ে দিলো।
‘কপালে এক নিঃশ্বাসে কতগুলো চুমু দিয়ে বললাম রেস্ট করো আমি আসছি।’
পাশের এলাকার ই একটা রেস্টুরেন্টে অভি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।আমি আরহী কে সাথে নিয়ে অভির সাথে দেখা করতে গেলাম।

তুমিময় বসন্ত পর্ব ৪০+৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here