তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১০
নীতি জাহিদ
” আপনি না মালয়েশিয়া ছিলেন, এখানে কিভাবে এলেন?”
ইমরান মিনহাজ এর দিকে তাকিয়ে বললো,
” সে অনেক কাহিনী মোনালিসা। তোমার বাবার বোকামীর জন্য। আচ্ছা বাদ দাও তোমরা কোথায় কোথায় গেলে?”
মোনা খেয়ে চোখ মুখ মুছে কায়দা করে কোথায় গিয়েছে, কি কি করেছে সব বর্ণনা করা শুরু করলো। কাল ওরা মহেশ খালি যাবে তা বললো। ইমরান ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
” আমাকে নিবেন আপনাদের সাথে?”
মোনা রিনিঝিনি কন্ঠে হেসে উঠলো। বাবার দিকে ফিরে বলে,
” বাবা উনাকে নিব আমরা। আজ তো সী ফুড খাইনি।কাল খাব একসাথে।”
মিনহাজ যে এখনো আতঙ্কে আছে চোখ মুখ দেখলেই বুঝা যাচ্ছে। ইমরান কাঁধে হাত রেখে বললো,
” আছি তো আমি। তোমার মেয়েকে কক্সবাজারে সেফ রাখার দায়িত্ব আমার। আল্লাহ ভরসা এত চিন্তা করো না।”
মিনহাজ ভরসার হাত পেয়ে হেসে উঠে বললো,
” তোকে মোনা অনেক মিস করছিলো। সন্ধ্যায় আমাকে বলছিলো তুই থাকলে ভালো হত।”
ইমরান হাসে। সেই হাসিতে মোনার মনে উদ্রেক সৃষ্টি হয়। কালচে শ্যাম বর্ণের মানুষ হাসলে বুঝি এত সুন্দর লাগে।
কিছুক্ষন কথা বলে ঘড়িতে দেখলো রাত ৩ টা বাজে। ইমরান নিজের রুমে চলে গেলো। দরজা লাগাতেই ঠক ঠক আওয়াজ হলো। দরজা খুলে দেখে মোনা দাঁড়িয়ে আছে।
” কিছু বলবে মোনালিসা? ”
ইমরান এর হাত টা নিজের কাছে টেনে আনলো। পকেট থেকে একটা কালো মেটাল ব্রেসলেট বের করলো। ইমরানের হাতে পরিয়ে দিয়ে বললো,
” ইমরান সাহেব, ফ্রেন্ডশিপ ব্রেসলেট লাগিয়ে দিলাম। এটা আমি আজ আপনার জন্য কিনেছিলাম। এটা কিনতে গিয়েই হারিয়ে গিয়েছি। আজ থেকে আপনি আমার ও বেস্টফ্রেন্ড। অনেক গুলা থ্যাংকিউ।”
ইমরান হাতের ব্রেসলেট এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মোনার গাল টেনে দিয়ে বললো,
” ওকে ফেয়ার লেডি। যাও এখন ঘুমাতে যাও। মহেশ খালি যেতে হলে খুব ভোরে উঠতে হবে, তবে তুমি আবার ভুল করেছো আমাকে নাম ধরে ডাকবেনা। আংকেল ডাকবে বা অন্যকিছু।”
” আংকেল ডাকবোনা, অন্যকিছু ডাকতে ইচ্ছে করছেনা। কথাই বলবো না আপনার সাথে।”
মোনা ঠোঁট বাকিয়ে চলে গেলো। ইমরান মোনার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। এই মেয়ের চালচলন বুঝা তার সাধ্যের বাইরে। সেদিন যা করলো, ভাগ্যিস বাসার কেউ দেখেনি। নাহলে চরিত্রে দোষ উপাধি পেয়ে যেত ইমরান। কখনো ফুফু তো কখনো ভাস্তি। বিপদে পড়েছে ইমরান। সে তো ফর্সা, প্রিন্সদের মত সুন্দর নয়। তবে কিসের এত টান তার প্রতি!!
পরদিন ভোরে উঠতে কিছুটা কষ্ট হলেও তিনজনই উঠে গেলো। হোটেলে নাস্তা সেরে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে। ইমরান খাবার টেবিল থেকে লক্ষ্য করেছে মোনা কথা বলছেনা। মোনা এবং মিনহাজ ম্যাচিং করে ফ্লোরাল শার্ট পরেছে। এলোমেলো চুলে কাঠির মত কিছু একটা দিয়ে খোঁপাতে মেয়েটাকে খুব মানিয়েছে। জিনিসটা শঙ্খের। কক্সবাজারে শঙ্খের অনেক জুয়েলারি আইটেম পাওয়া যায়। এই কাটিও হয়তো কোনো প্রসাধনীর অন্তর্ভুক্ত। ইষৎ হেসে নিজের খাবার শেষ করলো। ওরা হোটেল এর গাড়ি করে আগে ঘাটে পৌঁছালো। সেখান থেকে ট্রলার বা স্পিড বোটে করে মহেশখালী যাবে।
মহেশখালী কক্সবাজারের একটি উপজেলা। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। দ্বীপের অপর পাশে সুন্দরবন দেখা যায়। কথিত আছে, একসময় এখানে হরিনের দেখা মিলতো। স্পিড বোটে চেপে বসলো তিনজন। একটা বোটে ১০ জন যেতে পারে। ভাড়া ১১০ টাকার মত নেয়। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বোট দুলছে। মোনা ভয় পেয়ে বাবাকে আকড়ে ধরলো। সাগর উত্তাল হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। সমুদ্রের পানি এসে অনেকটা ভিজিয়ে দিচ্ছে তার উপর বৃষ্টি। মিনহাজ ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে। মোনা ভয় পাচ্ছে দেখে ইমরান এগিয়ে এসে মোনার হাত চেপে ধরে বললো,
” মোনালিসাকে তার রহস্যময় হাসিতে দারুন লাগে। মুখ গোমড়া করলে কনজিউরিং এর নান সেই নানী পেত্নীর মতো লাগে। সকাল থেকে কি হলো?”
মোনা ইমরানের হাত ঝামটা মেরে ফেলে দিয়ে ইমরানের দিকে পিঠ দিয়ে বসলো। ইমরান হাতে ব্যাথা পেলো বোটের ধারালো সাইডে লেগে হাত কেটে গেলো। হাতের দিকে তাকিয়ে মোনাকে বললো,
” মোনালিসা তোমার সব অভিমান কি আমার সাথে?”
” কেন!!! আপনি বুঝেন না?”
মোনা ইমরানের দিকে ফিরতেই দেখে হাত কেটে র*ক্ত বের হচ্ছে। মোনা হন্তদন্ত করে মিনহাজকে ডাক দেয়,
” বাবা ইমরানের হাত কেটে গিয়েছে দেখো?”
ইমরান হতচকিত হয়ে মোনার দিকে তাকায়। ইমরান সাহেব ডাকটাই তো ভালো ছিলো। মিনহাজ মেয়েকে ধমক দিলো।
” তুমি আবার ইমরান বলেছো আম্মা।”
” আমার উনাকে আংকেল মনেই হয়না।”
ইমরান টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললো,
” ইটস ওকে মিনহাজ ভাই, ইশান আমাকে ছোট থাকতে ইমরান পাপা বলতো। সো আই ডোন্ট মাইন্ড”
মোনা রাগে কটমট করে তাকালো ইমরানের দিকে। ইমরান জয়ের হাসি হাসছে। মনে হচ্ছে যেন সে মোনাকে হারাতে পেরেছে। ইমরান ওয়ালেট থেকে বের করে হাতে একটা ওয়ান টাইম লাগিয়ে নিলো। মোনা ইমরানকে প্রশ্ন করলো,
” ইশান কে?”
” সেকি মিনহাজ ভাই তোমাকে জানায় নি ইশান কে?”
” নাতো”
” আমার মনেই ছিলোনা ইশানের কথা জানাতে…
মিনহাজ কথা শেষ না করতেই বোট চালক তাড়া দিলো নামতে। মিনহাজ হাত ধরে মোনাকে নামায়। সামনে কাদা রাস্তা পার হওয়ার জন্য বাঁশ দিয়ে রাস্তা করেছে। কক্সবাজার এর বাঁশ দেখে মোনা হা হয়ে বললো,
” বাপরে, বাঁশ ও এত মোটা হয়। এগুলা কি আদো বাঁশ।”
মিনহাজ হাসলো। এরপর সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। এই ব্রিজটাকে শ্যুটিং ব্রিজ বলে। দীর্ঘ এই শ্যুটিং ব্রিজ থেকে টুরিস্ট স্পটে যেতে হলে সি এন জি বা অটো নিতে হবে। ইমরান ৫০০ টাকা দিয়ে একটা অটো ঠিক করলো। সবগুলো ট্যুরিস্ট স্পটে নিয়ে যাবে অটো। প্রথমেই এসে দাড়ালো আদিনাথ মন্দিরে। এই মন্দির মৈনাক পর্বতের উপর অবস্থিত। সিড়ি বেয়ে ওরা পর্বতে উঠছে। সমতল পর্বত টাইপ। সিড়ি গুলো চড়তে আরাম নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে উঠার সময় মোনা পড়ে যেতে নিলে ইমরান ধরে ফেলে। মোনার চোখ পড়লো ইমরানের হাতের ব্যান্ডেজে। অসহায় মুখ করে বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৯
” আর করবোনা স্যরি। বুঝিনি এত ব্যাথা পাবেন।”
” সামনে তাকিয়ে হাঁটো। ”
মোনা বুঝতে পারলো ইমরানের কন্ঠে ঘোর অমানিশা, ক্রোধ। তাই আর কথা বাড়ায় নি।
