তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৮
নীতি জাহিদ
ডান হাতের তিন আঙ্গুল দিয়ে কপাল ঘষছে। কপাল থেকে হাত নামিয়ে বালিশে হেলান দিলো। গায়ে হাসপাতালের হালকা আকাশী পোশাক। মাথার উপর ফ্যান টা চলছে। শূণ্য দৃষ্টিতে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। সামনে বসে থাকা তরুনীর দিকে তাকানোর সাহস নেই। চোখ মেলাতে লজ্জা লাগছে। বড় বড় জ্ঞানের বাণী দেওয়া ইমরানের মুখে আজ শব্দ নেই। বুয়েটের ক্যাম্পাসে ইমরান যখন বক্তৃতা দিত সব কিছু নিস্তব্ধ থাকবো। শিক্ষকমণ্ডলী অতি আগ্রহ নিয়ে ইমরানের কথা শুনতেন। আজ ইমরান নিরব, এই প্রথম মনে হচ্ছে ভালোবেসে বড্ড ভু*ল করেছে। তাও একবার না দু দু বার একই ভু*ল করেছে। নিজের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ফোনটা বাম হাতে ধরে আছে। কাকনের মেসেজটা মোনা পড়েছে। এই মেসেজ পড়ে কোনো মেয়েরই মাথা ঠিক থাকবেনা। সেখানে মোনা তো কিশোরী। আবেগ,অনুভুতির সংমিশ্রণ ওর মধ্যে। কি করে মেনে নিবে ভালোবাসার মানুষের এই রূপ।
‘ আমি আসছি আংকেল, রেস্ট নিন আপনি। বাবা বাইরে অপেক্ষা করছে।’
আংকেল শুনে মনে হলো কেউ বুকে ধা*রা*লো,তী*ক্ষ্ণ, সদ্য শান দেওয়া খ/ঞ্জ/র/টা ঢুকিয়ে হৃদয় চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে। মোনা চলে যেতে নিলেই ইমরান ওর হাত টা ধরে সাথে সাথে বুকে টেনে নেয়। অকস্মাৎ টান পেয়ে মোনা বুকে আঁচড়ে পড়লো।
‘ স্যরি মোনালিসা,এভাবে ফেলে যেও না। চোখের অগোচরে ও কিছু সত্য থাকে।’
নিজেকে ছাড়িয়ে মোনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ বিকাশের সাথে এংগেইজমেন্টের ডেট নেক্সট ফ্রাই ডে।বাবাকে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছি।ইশান ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে আসবেন।’
‘ ভেরি গুড। এবার তাহলে হাসপাতালে বলে দিই যেন আই সি উ র ব্যবস্থা করে রাখে আমার জন্য।’
মোনা থমকে দাড়ালেও পেছন ফিরে চাইলো না।বাবাকে পাঠিয়ে দিলো।
কিছুক্ষন পর মিনহাজ হন্তদন্ত হয়ে ইমরানের কেবিন থেকে বের হয়ে মোনাকে নিয়ে বাসায় এলো। বিকাশের পরিবারকে ফোন দিয়ে জানালো যেন তারা প্রস্তুত থাকে।
কফি হাতে রহিমা উপরে যাওয়ার সময় আইরিন বাঁ/ধা দেয়। নিজেই নিয়ে যাবে।অনেক দিন ভাই এর সাথে বসে গল্প করা হয় না। হাস্পাতাল থেকে ইমরান এসেছে আজ ৫ দিন হলো। এত অসুস্থতার ভেতর ও কাজ আর কাজ। একটু আগে বাইরে থেকে এসে সোজা রুমে গিয়েছে। দরজায় কড়া নাড়লো।
‘ আসো আপা।’
‘ বুঝিস কি করে ইমন?’
‘ তোমার পায়ের আওয়াজ বুঝবোনা আপা এটা হয়? বসো।’
‘ শরীর কেমন ভাই?’
‘ বিন্দাস,যেমন দেখছো।’
‘ ভাবলাম একটু গল্প করি তোর সাথে। একটু পর ইশতিয়াক আসতেছে তুশিকে নিয়ে।’
‘ জানি আমি,ওকে এই খবরটা না দিলেও পারতে। তড়িঘড়ি করে লন্ডন থেকে আসাটা কম কথা নয়। ভালো কিছু রাঁধো তিন ভাই বোন মিলে খাব। এতদিন ছাঁই পাশ খাইয়েছো শুধু।এসব ক্লিয়ার স্যুপ, বয়েলড ভেজিটেবল খেতে ভালো লাগে না আপা?’
‘ কাল তো মোনাদের ওখানে যেতে হবে
মিনহাজ আজ ও ফোন দিয়েছে। কি গিফট দিবো বলতো?’
ইমরান আলমারির কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা গিফট বক্স দিলো বোনের হাতে।
‘ ডায়মন্ডের রিং? কবে নিলি?’
‘ নিলাম আরো আগে। আমি তো পরাতে পারবোনা,তুমি দিয়ে দিও এটা।’
‘ তুই যাবিনা? শুনলাম কাবিন হয়ে যাবে।’
‘ না কাজ আছে অনেক। পরে গিয়ে দেখা করে আসবো কাবিন হবে কে বললো,মায়া? এখনো যোগাযোগ আছে তোমার সাথে?’
আইরিন নিশ্চুপ। খুব করে চাইতো মায়ার মতো একটা সুন্দর মেয়ে ইমরানের বউ হোক। ভাগ্যদোষে হলোনা। অন্যমনস্ক আইরিনের হাত ধরে ইমরান বললো,
‘ আপা, আম্মার মত বড় করেছো আমাদের দুই ভাই কে। কোনো কথাই লুকাই নি। মায়া আমার জন্য ছিলোনা আপা।’
‘ বিয়ে করবিনা আর?’
‘ তোমার ভাই একটা অনেক বড় অ*ন্যা*য় কাজ করে ফেলেছে। আগে যদিও সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু আগামীকালকের পর আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এই যে শক্ত খোলসের ভেতর ইমরানটা গুটিয়ে গিয়েছে আপা।’
‘ কি হয়েছে ভাই, হাসপাতাল থেকে আসার পর তোকে দেখছি আগের মত নেই আর তুই। আমার রুমে যাস না কথা বলিস না।’
‘ নি/ষি/দ্ধ অ*ন্যা*য় করে ফেলেছি আপা। বের হওয়ার চেষ্টা করছি। ইমরানের সাথে তা যায় না।’
‘সেদিন মোনা তোকে ইমরান সাহেব সম্বোধন করেছে’
‘আর করবেনা,সেটাই শেষ ছিলো।’
আইরিনের বড় একটা দীর্ঘ শ্বাস। কি বলে শান্তনা দেবে ভাইকে। যা বুঝার তা সেদিনই বুঝতে পেরেছিলো। কেউ মেনে নিবেনা। ভাই এর দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ ইমন আমি মোনাকেও মেনে নিতাম। শুধু তোর পাশে কাউকে চাই।’
‘ঘুমাতে যাও আপা,একটু একা থাকব’
অ/শা/ন্ত রজনী আজ শেষ হচ্ছে না। কাল থেকে মোনালিসা থাকবে না। হয়ে যাবে অন্য কারো। অন্য কারো বুকে মাথা রাখবে। হয়তো আর কেউ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলবে না, ‘ ভালোবাসি ইমরান সাহেব’। এই শক্ত পোক্ত বলিষ্ঠ কালচে শ্যাম বর্ণের মানুষ টাকে কাঁদতে দেখেছে খুব কম মানুষ। অথচ আজ অবলীলায় দু চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে ইমরানের। দু হাত দিয়ে যত মুছতে চেষ্টা করছে তত বেড়েই চলেছে অশ্রুর গতি। ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে আকাশকে বলি,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৭
‘ মোনালিসাকে বলো আকাশ,আজ তার ইমরান সাহেব কাঁদছে তার জন্য। তুমি অন্য কারো সাথে কেনো ঘর বাঁধবে মোনালিসা? তুমি কথা দিয়েছিলে আমার হবে।’
