তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৭
নীতি জাহিদ
বড় অবেলায় পেলাম তোমায়
কেন এখনি যাবে হারিয়ে ?
কি করে বল রব একেলা ?
ফিরে দেখ আছি দাড়িয়ে-দাড়িয়ে…
কেন হঠাত্ তুমি এলে ?
কেন নয় তবে পুরোটা জুড়ে ?
আজ পেয়েও হারানো যায়না মানা
বাঁচার মানেটা রয়ে যাবে দূরে…
একটা,দুটো,এরপর অনেক গুলো করতালি। ইমরানের গান যেন পুরো অনুষ্ঠানের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিলো। গান ছেড়েছে অনেক বছর। গান ছাড়ার উপর্যুক্ত কারণ পুরোনো স্মৃতি মনের পীড়া বাড়িয়ে দিতো। আজ আবার গেয়েছে। হারানোর আকুতি থেকে। কাঁকন কয়েক পা এগিয়ে এলো ইমরানের গান শুনে। নয়ন মিনহাজকে বলে,
‘ ভাই এই মাইয়ার মত বে/হা/য়া আর নাই, এখন দেখো কেমনে গায়ে ঘেষতেছে। রিক্তা থাকলে ঝাটা নিয়া পিটাইতো ওরে। ইশানটাও এই বয়সে মায়ের নতুন রূপ দেখতেছে।’
‘ আমার খারাপ লাগছে নয়ন, ইশানের জন্য।’
‘ রাখো খারাপ লাগা মজা নেও, ইমরান খেইপা আছে ভাই। চ/ড় থা*প্প*ড় না মাইরা বসে।’
কাঁকন স্টেজে উঠে সবার সামনে ইমরানকে জড়িয়ে ধরলো। সেই ঘ্রা/ন, সেই কোমলতা কিন্তু আজ ইমরানের বড্ড রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে ধা/ক্কা দিয়ে সরিয়ে দিক কয়েক হাত দূরে। চোখ পড়েছে ইশানের দিকে। সে চায় না ইশানের সামনে তার মাকে বাবা অ/স/ম্মা/ন করুক। একজন বাবা হিসেবে ছেলেকে প্রতিটি নারীকে সম্মান করা শিখিয়েছে।সেখানে নিজে অসম্মান করলে যে ছেলের ম/নো/ক্ষু/ণ্ণ হতে পারে!! নিজেকে সংযত করে সরাতে চাইলো কাকনকে। আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে কাকন।
‘আমাকে আকর্ষণ করানোর মত কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই তোমার মধ্যে। সরে দাঁড়াও।’
কথাটায় কতটা ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে কাঁকনের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে জানান দিচ্ছে। কাঁকন সরার পর ইমরান স্টেজ থেকে নেমে ইশানকে জড়িয়ে ধরলো। ইশানের দু চোখ লাল। ছেলেটা কেঁদেছে। বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো ইমরানের ছেলের চোখের জল দেখে। ইশান কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
‘ পাপা মোনা আন্টিকে মা বানাও। এই মহিলাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। প্লিজ পাপা।’
ইমরান কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে। চক্ষু কোটর থেকে বেরিয়ে যাবার উপক্রম। শুকনো ঢোক গিললো ছেলের কথা শুনে। ছেলে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বাবাকে সম্মতি দিচ্ছে। ইমরানের হঠাৎ করে শরীর ঝাঁ/কি/য়ে উঠলো মোনার দিকে চোখ যেতেই। মেয়েটা কেমন পাথরের মত অনড় হয়ে আছে। সহ্য করা যাচ্ছে না। ইমরানের মনে হচ্ছে বুকের উপর অনেক বড় কিছু দিয়ে কেউ সজোরে আঘাত করেছে। সামনে পা এগুচ্ছে না। চোখের সামনে সব ঝাপসা দেখছে ইমরান বুক ধরে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। তৎক্ষনাৎ সবাই এসে ইমরানকে ঘিরে ধরে। ইশান বাবাকে পানি খাওয়াচ্ছে। কাঁকন ধরতে আসলে ইশান সবার সামনে চেঁচিয়ে বলে,
‘ আর এক পাও আগাবেন না। আমার পাপার কিছু হলে আপনাকে আমি ছাড়বোনা। আপনার জন্য আমার পাপার এই অবস্থা।’
ইশান হঠাৎ মোনার হাত ধরে ইমরানের পাশে বসিয়ে বলে,
‘ পাপাকে দেখো আন্টি,আমি আসছি।’
সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে ইমরানের হঠাৎ অসুস্থতায়। মোনা ইমরানের হাত ধরতেই ইমরান শক্ত করে নিজের অজান্তেই মোনার হাত ধরলো ওর বুকে। কেউ মাথা না ঘামালে একজনের অসহায় দৃষ্টি জানান দিচ্ছে, ইমরানের জীবনে নতুন কারো আগমন হয়তো ভালো কিছুর আভাস নাও হতে পারে। ইমরানের বডিগার্ড দুজন ওকে গাড়িতে উঠালো। ইশান, মিনহাজ,নয়ন এবং মোনাকে অনুরোধ করলো হাসপাতালে যেতে। অন্য গাড়িতে মিসেস আইরিন’ রা যাচ্ছে। কাঁকন নিজের সাথে ইশানের ব্যবহার দেখে অবাক।
রাত সাড়ে এগারোটা। ডাক্তার কিছুক্ষন আগে বলে গিয়েছে ইমরান মাইল্ড স্ট্রো*ক করেছে। অনেক বেশি প্রেশার নিয়েছে কোনো ব্যাপারে। নয়ন কিছুটা আঁচ করতে পারলেও মিনহাজ বুঝেনি। কারণ নয়ন খুব করে চায় মোনা আসুক ইমরানের ভাঙা হৃদয়ে। ইমরানের বুকে মোনার হাত দেখে তখনই বুঝে গিয়েছে গো/ল/মা/ল আছে।
মোনা নির্বাক। মস্তিষ্ক শূণ্য, কি থেকে কি হয়ে গেলো। সুখ কেনো ধরা দিতে চায় না ওর ছোট্ট জীবনে?? ইমরান এখনো কাঁকনকে ভালোবাসে! কতটা যত্নে আগলে ধরলো স্টেজে। সেখানে মোনার ওর জীবনে জোর করে যাওয়াটা অবান্তর লাগছে। গেস্ট রুমে সন্ধ্যায় ইমরান আর কাঁকনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেছে মোনা। কাঁকনের শাড়ির আঁচল ফ্লোরে ছিলো। সেই অবস্থায় ইমরান এবং কাঁকন একে অন্যের অধরে….. আর ভাবতে পারলো না। সেই দৃশ্য মোনা ভাবতেই পারছে না। চোখ দুটো বার বার ভিজে যাচ্ছে। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। হঠাৎ করে আর্তনাদ করে উঠলো।
‘ বাবা মাথা ব্যাথা করছে আমার। সহ্য হচ্ছেনা এই ব্যাথা। আমি চলে যাব এখান থেকে।’
মিনহাজ মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে বললো,
‘ এইতো বাবা ইমরানকে দেখেই চলে যাব। তোমাকে দিয়ে বাবা আসবো। চিন্তা হবে তো মা ওকে না দেখে গেলে।’
আইরিন মোনাকে আগলে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ইমরানের জ্ঞান ফেরার পর প্রথম ইশান ঢুকে রুমে। মিট মিট করে চোখ খুলে ইশানের দিকে তাকায় ইমরান। ছেলেটা কেঁদেছে। আজ যেই ব্যবহার দেখেছে ছেলের, যে কোনো বাবা এমন ছেলে নিয়ে গর্ববোধ করবে।
‘ পাপা মোনা আন্টি ভালো নেই। সুস্থ হও। একটু আগেও ওনার বাবাকে বলছে তোমাকে না দেখেই বাসায় যাবে।’
‘ বাবা মোনাকে আন্টি ডেকোনা৷ কেউ শুনলে অন্য কিছু ভাববে।’
ইশান মাথা নত করে বললো, ‘ পাপা আমি সব জানি। ওই মহিলা তোমার সাথে সন্ধ্যায় যা করেছে মোনা আন্টি দেখেছে,আমিও ছিলাম তখন। পরের ঘটনা অবধি আন্টি দাঁড়ায় নি। আমি অনেক বার বলতে চেয়েছিলাম তুমি ভুল দেখেছো কিন্তু….’
চোখ দুটো যদি আজ আর না খুলতো, কেনো শ্বাস এলো শরীরে, কেনো আটকে আজই দুনিয়া ছেড়ে গেলো না, কেনো আবার মানুষটার মুখোমুখি হতে হবে! শেষে ছেলে,মোনা দুজনের সামনেই যে অসভ্যতা! ছিঃ! ছিঃ! আজ কাঁকন যা করেছে সেটা দেখলে যে কেউই ভাববে ইমরান অসভ্য। আত্মসংবরণ ক্ষমতা নেই ইমরানের। আর ভাবতে পারছেনা শরীর আবার খারাপ হচ্ছে৷ জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। এত অসম্মান, ধিক্কার নিজেকে কখনো করেনি। নিজের ব্যক্তিত্বের উপর নিজেরই আত্নবিশ্বাস ছিলো। আজ সব এক নিমিষেই হারিয়ে গিয়েছে। ইশান নার্স কে ডাক দিতেই নার্স ওকে বের করে দিলো।
রুমে এসেই দরজা আটকে চুপচাপ জানালার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোনা। আজ মনে হলো সত্যিই ইমরানের কোনো অনুভুতি নেই ওর প্রতি । যা ছিলো তা সহানুভূতি। এর জোরেই হেসে দু একটা কথা বলতো। এসব নিয়ে ভাবা সমীচীন নয়। তাই মোনা বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে দুটো এন্টি ডিপ্রেশন টেবলেট বের করে খেয়ে নিলো। গত তিনবছর এগুলা খাচ্ছে। বাবা জানে না। মাঝখানে খাওয়া বন্ধ ছিলো। ইমরানের সাথে কথা বললে মন ভালো থাকতো,তাই ঔষধ এর প্রয়োজনই পড়েনি। একটা স্লিপিং পিল ও খেলো। ভালোবাসা মানেই মোহ,যে মোহে ডুবে তার আজ আবেগ,অনুভুতি, মন সব নিঃস্ব। ভালো থাকুক ইমরান।
দরজায় কড়া নড়ার আওয়াজে উঠে দরজা খুলতেই দেখে মায়া দাঁড়িয়ে। ভেতরে ডুকে দরজা আটকে দিলো মায়া। মায়া কাঁদছে।
‘ ফুফি কাঁদছো কেন?’
‘ জানিস মুনিয়া,আমার সহ্য হয়না ইমরান ভাইয়ের সাথে ওই কাঁকনকে।’
মোনা মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছেনা। দুজনই আজ একই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে।
কাঁকনের শরীর জ্বলছে। সামান্য ঠোঁটে কিস করাতে সজোরে থাপ্পড় মেরেছে। ইমরানকে দেখে নিজেকে সংযত করতে পারেনি । দিন দিন আরো সুদর্শন হচ্ছে ইমরান। সাথে ছেলেটাও কত বড় হয়ে গেলো। এই ইমরানকে তার চাই। এত সুনাম চারদিকে তার। এত বিখ্যাত একজন মানুষ যার সান্নিধ্যে আসতে হাজার ও মেয়ে আকুল হয়ে আছে,সেই মানুষকে কিনা অগ্রাহ্য করলো। কিছু একটা ভেবে ইমরানের ফোনে একটা মেসেজ দিলো।
টুং টাং আওয়াজ আসলো মোনার ব্যাগ থেকে। এটাতো মোনার ফোনের আওয়াজ নয়। মোনা ব্যাগে হাত দিয়ে দেখে ইমরানের ফোন!! তখনই মনে পড়লো ইশান সামলে রাখতে দিয়েছিলো। ফোনটা হাতে নিতেই দেখে জ্বলজ্বল করছে কাকনের নামটা। সোয়াইপ করতেই ফোন খুলে গেলো। লোকটা কি পাসওয়ার্ড পছন্দ করে না?? নিজেকে আটকাতে পারলোনা।মেসেজ অপশনে গিয়ে মেসেজ পড়া শুরু করলো,
‘ ইমরান তুমি আগের মতই পাগল আছো। সেই স্বাদ তোমার ঠোঁটে এখনো আছে। তোমার উন্মাদনা আমাকে বরাবরের মতই টানে। যতই রা*গ করে থাকোনা কেনো,আমার উপর বেশিক্ষন রা*গ*তে পারবে না। আচ্ছা ইমরান তোমার মনে পড়ে,আমাদের বাসর রাতের কথা। উফ তুমি পাগল হয়ে গিয়েছিলে। তোমার ভালোবাসার চিহ্ন এখনো আমার পেটে,বক্ষে,গলায়। টেনশনের সময় গুলোতে আমাকে চাইতে,আমি বুঝতাম না।এখন আমি তোমার হিসেবে থাকতে চাই। আবার আমাদের সংসার হবে।তুমি,আমি আর ইশান। তোমার ছোঁয়া আমি কিভাবে ভুলি ইমরান। ফিরে আসো। সুস্থ হয়ে রিপ্লাই দিও।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৬
ফোনটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো। কালই গিয়ে ছুঁড়ে মারবে। আর কখনো ভালোবাসা প্রকাশ করবে না। একটু ও না। কি লাভ হলো এত ঔষধ খেয়ে। নির্ঘুম আরেকটা রাত কাটাতে হবে..
