তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩২
নীতি জাহি
মিনহাজ হাতে ইনভাইটেশন কার্ড নিয়ে বসে আছে। মামুন সাহেব ও মোটামুটি উৎসুক। ইমরানের মুখে হাসি। মোনার দাদী উশখুশ করে বললো,
‘আমার নাতনীটারে আনতা নাত জামাই? কতদিন দেখিনা।’
‘আমি তো অফিস থেকে এসেছি আন্টি? স্যরি দাদীজান। কেমন জঘন্য শুনাচ্ছে আমার মুখে এসব ডাক। আমি আন্টি ডাকবো,প্লিজ।’
হাসিনা বেগম হেসে বললেন,
‘আরেহ ডাকাডাকি দিয়ে কি হবে,মনের টানই হইলো আসল টান।’
মায়া এবং সালমা নাস্তা নিয়ে এলো। মায়া মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে নিলে ইমরান বললো,
‘মায়া তোমার ভাস্তিকে এক নজর দেখে এসো, তোমার জন্য ওর যে পরিমাণ ভালোবাসা,ঠিক তার চেয়ে কয়েকগুন অভিমান আমার জন্য জমিয়ে রেখেছে।’
মায়া কোনো কথা না বলে চলে গেলো। মামুন সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আপনাদের বাড়ির মেয়েগুলো বড্ড অভিমানী। ‘
‘সামলে নিও।ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখবে’
ইমরান প্রাপ্তির হাসি দিলো।
কিছুক্ষন পর ইমরান আবার সবাইকে অনুরোধ করলো বিজনেস পার্টিতে যেতে। এরপর বেরিয়ে গেলো।
রাতে বাইরে থেকে ডিনার করে এসেছে ইমরান। ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলো,
‘আপা আসো।’
‘খাবি না?’
‘ উহু খেয়ে এসেছি।ঘুমাও নি কেনো।এত রাত হলো।’
‘ ইমন তুই বলেছিলি আমরা যেন কেউ তোদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা না বলি। বলব না। কিন্তু মেয়েটা আজকে সারাদিন সকাল থেকে এখন অবধি না খাওয়া। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ বারোটা বিশ বাজে। ইশান ও অনেক চাইলো। ওকে বুঝালো কিন্তু খেলো না। উলটো বুঝালো, তোমার বাবা আসলে খাব। পারলে ঠিক করে নেয় সব। ওর ঔষধ আছে।’
‘ এই পনেরো দিন তো ঠিকঠাক মতো খেয়েছে,আজকে এমন কি হলো যে খাচ্ছে না।’
‘ জানিনা,কথা বলে নিস।’
আইরিন চলে যেতেই নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। কেনো যেন ওর বিরক্ত লাগছে। খাবারের সাথে রাগ কেনো?
দরজা লক করা দেখে চাবি দিয়ে লক খুললো ইমরান। রুমে লাইট জ্বলছে। হাতে একটা বই নিয়ে বসে আছে মোনা। চোখ দুটো টকটকে লাল, মুখ ফুলে গিয়েছে। ইমরানকে ঢুকতে দেখে গায়ে ওড়না জড়িয়ে মাথায় ঘোমটা দিলো। কিছু বলার আগে ইমরানই ওর দুই হাতের বাহু ধরে শক্ত করে ঝাঁকি দিলো।
‘ এই মেয়ে কি সমস্যা তোমার,খাচ্ছ না কেনো? এত অপমান করেছো,এত ছোট করেছো সবার সামনে এরপর ও শান্তি হয়নি।’
‘ ব্যাথা পাচ্ছি।’
‘ ইচ্ছে তো করছে চড় দি।কিন্তু গায়ে হাত তো তুলতে পারবোনা।’
ইমরান জোরে শ্বাস নিয়ে রাগ সংযত করলো।এরপর ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসে বললো,
‘কি সমস্যা বলো?’
মোনা খাটের কর্ণারে বসলো। কাল রাতে খাওয়ার পর আর খায়নি। পুরো ২৪ ঘন্টার উপর না খেয়ে আছে। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।
কাতর স্বরে বললো,
‘ আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াবেন। জগে পানি নেই। নিচে গিয়ে আনার শক্তি নেই। ঔষধ গুলা খাবো।’
এর মধ্যে রহিমা খাবার দিয়ে এসেছে। ইমরান সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসলো। কন্ঠ দৃঢ় করলো,
‘আমি বসছি এখানে, খাওয়া শুরু করো।’
‘আপনি খাবেন না?’
‘খেয়ে এসেছি।’
ইমরানের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিলো। এরপর প্লেটে দু চামচ ভাত নিয়ে চুপচাপ খেলো। মুখে টু শব্দ করে নি। নিজে নিজে ঔষধগুলো খেলো।
রহিমা জিনিস গুলো নিয়ে গেলো। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘জানেন বাঁচতে ইচ্ছে করে না এখন। কিন্তু এরপরো মেডিসিন নিই। যেদিন প্রথম বার সুইসাইড করতে গেলাম। চোখ বন্ধ করতেই বাবা আর আপনার চেহারা ভেসে উঠলো। ভয় পেয়েছিলাম অনেক। এরপরো কয়েক পোচ দিয়েছিলাম হাতে। কিন্তু দ্বিতীয় বার যখন গলায় দড়ি দিলাম আমি আর ভয় পাইনি। কেন জানেন?
তখন আমাকে আদর করার আর কোনো মানুষ ছিলোনা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার কেউ ছিলো না। আমি চেয়েছিলাম কেউ বুকে টেনে নিবে। আমার কথা শুনবে।যাকে প্রান খুলে মনের কথা বলতে পারবো। যার সাথে কথা বলতে ভাবতে হবে না আমাকে। আমার খুব ইচ্ছে করে আপনার বিছানায় পাশের বালিশে শুতে, খুব ইচ্ছে করে আপনার হাতটা জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে। খুব ইচ্ছে করে গল্প করতে।
আমি আগে যোগ্য,অযোগ্য বুঝতাম না। কিন্তু এখন বুঝি। আমি খুব স্যরি ওইদিন হুঁশে ছিলাম না তাই ওভাবে আপনাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম। মাফ করে দিবেন। আমি তো বাবার কাছে মানুষ হয়েছি আপনার মত ডিসিপ্লিনড না। দুপুরে আপনি একবার বললে খেতে বসতাম। পরে ভাবলাম হয়তো আমার সাথে খাবেন না তাই জিজ্ঞেস করেন নি। আমি না আগের মত জেদ করিনা। এই যে খেতে বললেন,খেয়ে নিলাম। আমার জেদ ভাঙানোর মানুষ নেই তো। বাবা তো দূরে, ফুফির তো শত্রু আমি। আর মাকে তো দেখিইনি। কিন্তু শেষ বার আপনি যখন চলে এসেছিলেন বাবাকে বলেছিলাম, আমাকে আগলে রাখার মানুষ টা চলে গেলো বাবা। সত্যি হারিয়ে গেলো মানুষটা। স্যরি… অনেক কথা বলে ফেললাম আপনার সকালে অফিস আছে না?
ইমরান অনড় হয়ে আগের জায়গায় বসে আছে। ধীর,শান্ত, উৎকন্ঠা বিহীন নম্র কন্ঠের তোলা সুক্ষ্ম নরম প্রতিবাদ শুনছে। কানে বাজছে প্রতিটা শব্দ। কিন্তু এই শাস্তি মোনার প্রাপ্য। কেনো,কোন সাহসে,কোন অধিকারে এই নিষ্পাপ দেহটাকে শেষ করার জন্য বদ্ধ পরিকর ছিলো? সে কি জানতো না আত্মহত্যা মহাপাপ। একটু বিশ্বাস রাখতে পারলো না ইমরানের উপর? উহু ভুল,সম্পূর্ণ ভুল।এই মেয়ে অল্পতেই অবিশ্বাস করে বসে থাকে।ওকে বুঝতে হবে ইমরানকে অবিশ্বাস করার শাস্তি কতটা ভয়ানক হতে পারে। যদি বিশ্বাসই না থাকে সেখানে ভালোবাসা থাকা বিলাসিতা বৈ আর কিছুই না। এই বয়সে ট্রেন্ডে গা ভাসানোর কোনো হেতু নেই।
‘ আচ্ছা আপনি সেদিন নিউ মার্কেট থেকে আসার সময় লোকটাকে এভাবে মে রেছিলেন কেনো?’
মোনার প্রশ্নে ইমরান অক্ষিপট কুচকে বলে,
‘অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছি।’
‘ কি অন্যায়?’
‘ইমরানের ব্যক্তিগত সম্পদ স্পর্শ করেছে, যা ইমরান যত্নে রাখে।’
‘কি সেই সম্পদ?’
‘মোনালিসা ইমরান শরীফ খান’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩১
ইমরান মোনাকে সেই অবস্থায় ফেলে উঠে চলে গেলো। আয়তলোচনে মোনা চেয়ে আছে। কি বলে গেলো ইমরান? মোনালিসা ইমরান শরীফ খান?? তার মানে সেদিন ভিড়ের মধ্যে স্পর্শ করা সেই ছেলেটাই ছিলো। ইমরান জানলো কি করে? সে কি তাহলে ফলো করছিলো। উহু এটাতো এমরানের চরিত্রের সাথে যায় না। তাহলে কাউকে নিরাপত্তার জন্য মোনার আশেপাশে রেখেছিলো। তবে কি চয়নের কথাই ঠিক। ইমরান সাহেব মোনাকে ভালোবাসে। লোকটা কেন মুখে বলে না? কিছু আক্ষেপ থেকেই যাবে। ভালোবাসি আর শোনা হবে ইমরান সাহেবের মুখ থেকে।
