তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২১
আতিয়া আদিবা
সকালের প্রথম প্রহরের আলো তখন স্কাইলাইন ভিলার বিশাল কাঁচের জানালা গলে উপচে পড়েছে অফিসঘরের মেঝেতে। তবে এ আলোতে কোনো মিষ্টতা নেই। পুরো ঘর জুড়ে বিরাজমান থমথমে নীরবতা।
অফিসঘরের কোণায় রাখা রাজকীয় সোফাটায় মুখোমুখি বসে আছে দুজন মানুষ। শেহজাদ এবং সামাইরা।দুজনের দৃষ্টিই নিবদ্ধ মাঝখানের টি-টেবিলের ওপর রাখা ধবধবে সাদা আইনি কাগজগুলো ওপর। এই কাগজগুলোই আজ তাদের নিয়তিকে এক অদ্ভুত পরিহাসে খণ্ড খণ্ড করে দিতে চলেছে।
টেবিলের একপাশে বসে আছেন সামাইরার সুপরিচিত একজন বিশ্বস্ত উকিল, মিস্টার আসাফ। বেশ প্রবীণ।চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ফাইলের শেষ পাতাটি ওলটালেন তিনি।
সুফিয়া রহমান সেসময় নিজের শোবার ঘরেই ছিলেন।
তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারলেন না যে এই ভিলারই অফিসঘরে আজ তারই জীবনের শেষ নিঃশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একটি বৈবাহিক সম্পর্কের শেষ পরিণতি লেখা হচ্ছে।
সামাইরাকে মোটেও বিচলিত দেখাচ্ছে না। একদম শান্তভাবে বসে আছে। তার চোখেমুখে কোনো লুকানো হাহাকার কিংবা নাটকীয়তা নেই। সে অত্যন্ত ধীরহস্তে টেবিলের ওপর রাখা দামী কলমটা তুলে নিল। আইনি কাগজের পাতায় খোদাই করা প্রতিটি শর্ত সে অতি সন্তপর্ণে নিজের চোখে আরেকবার দেখে নিল। কাগজে লিখা আছে_
“এই বৈবাহিক চুক্তি ও আইনি সম্পর্কটি সুফিয়া রহমানের জীবনকাল পর্যন্তই বৈধ বলিয়া গণ্য হইবে। সুফিয়া রহমানের মৃত্যুর ঠিক পরবর্তী দিন হইতে এই বিবাহ বাতিল হইবে এবং সামাইরা বিনতে হক, শেহজাদ রহমানের সাথে সমস্ত বন্ধন ও সন্তানসহ আইনি অধিকার হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত বলিয়া গণ্য হইবেন।”
সামাইরা এক মুহূর্তও ইতস্তত করল না।হাসিমুখে অত্যন্ত নিখুঁত এক টানে কাগজের নিচে একটি স্বাক্ষর বসিয়ে দিল।
সই করার পর কলমটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতেই তার বুক চিরে এক দীর্ঘ, অবরুদ্ধ স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। অবশেষে! এবার সামাইরা তার সম্মুখে বসা পুরুষটির দিকে তাকাল।
শেহজাদ এতক্ষণ একদৃষ্টিতে সামাইরার সই করার ভঙ্গিটা দেখছিল। তার চোখের মণি দুটো কেমন আদিগন্ত শূন্যতায় ছেয়ে আছে আজ। সে যে এক টুকরো কাগজের সামনে আজ বড্ড অসহায়!
শেহজাদ কোনো কথা না বলে কলমটা তুলে নিল। তার বলিষ্ঠ হাতটা সামান্য কাঁপল। তবুও সে খুব দ্রুত এক টানে নিজের সইটা বসিয়ে দিল।
সই শেষ হতেই সে কলমটা টেবিলের ওপর সশব্দে ছুড়ে মারল। সেই শব্দে গোটা ঘর যেন মৃদু কেঁপে উঠল। মিস্টার আসাফ ফাইলটা গুছিয়ে নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বললেন,
-আইনি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমি তাহলে আসছি।
আইনজীবী চলে যাওয়ার পরও সামাইরা সোফা ছেড়ে উঠল না। সে নিস্পৃহ চোখে কাগজগুলো নিজের ব্যাগে পুরে নিল। এক কপি রেখে দিল শেহজাদের জন্য।
শেহজাদ সোফায় হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে বসে রইল। তার এই নীরবতা সামাইরাকে এক অদ্ভুত জয়ী সত্তার স্বাদ দিল। সে মুচকি নিজের শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
স্কাইলাইন ভিলাতে সামাইরার অনুরোধে আজ পোলাও কোরমার আয়োজন করা হয়েছে। ওর নাকি ভীষণ খেতে ইচ্ছা করেছে।
শেহজাদ মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করল না। বরং দ্রুত গিয়ে তার গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়ি চালাতে চালাতে প্রতি নিয়ত বদলে যাচ্ছিল ওর মুখের হাবভাব।
একবার সে বাম হাত দিয়ে নিজের গলার দামী সিল্কের টাইটা এক হেঁচকায় টেনে খুলে ছুড়ে মারল পেছনের সিটে। কিছুক্ষণ পর আবার শার্টের কলারের বোতামগুলো সজোরে ছিঁড়ে ফেলল সে।
চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে চামড়া ফেটে যাওয়ার উপক্রম হল। সিগারেটের ছ্যাঁকাও আজ তার মনের ভেতরের দহনকে শান্ত করতে পারবে না।
সামাইরা তার চোখের সামনে হাসিমুখে নিজের মুক্তির কাগজে সই করেছে। সে একটুও কাঁদেনি। একটুও দ্বিধা করেনি। বরং সই করার পর তার বুকের ওই স্বস্তির নিঃশ্বাসটা শেহজাদের চোখে পড়েছে। এত কিছুর পরেও সে সামাইরাকে ঘৃণা করতে পারছে না। এর চেয়ে বড় নরকযন্ত্রণা আর কিই বা হতে পারে?
শেহজাদ সামাইরার সামনে নিজের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য মাথা নত করেছে। কিন্তু তার ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর, ক্ষ্যাপাটে সত্তাটা আজ ঢাকার রাজপথে এসে এক প্রলয়ংকারী রূপ ধারণ করল।
সে তার ডান কানের এয়ারপডটা অন করে সরাসরি কল লাগাল তার পার্সোনাল সিকিউরিটি হেড লিমনের নাম্বারে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই শেহজাদ হিসহিস করে উঠল,
-জোন জিরো রেডি করো। ঢাকার ওই ব্ল্যাক সিন্ডিকেটের মাদারচো*দগুলো গত রাতে স্কাইলাইন ভিলার সিকিউরিটি গ্রিড লিক করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। ওদের আজ আমি নিজের হাতে ছিঁড়ে টুকরো করব। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে!
ওপাশ থেকে লিমন অত্যন্ত ভীত গলায় উত্তর দিল,
-সব রেডি আছে, কিং। আরসালানের মেইন লোকটাকে আমরা তুলে এনেছি। ও এখানেই আছে। আমরা ম্যানেজ করে নিতে পারব। আপনি কেন হাত নোংরা করবেন, কিং?
-শাট দ্য ফা*ক আপ! যেটা বলেছি সেটা করো।
লিমন আর কথা বাড়ালো না। নিচু স্বরে বলল,
-অফ কোর্স, কিং।
শেহজাদ ওরফে কিং এর মাফিয়া সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র কাজের ধরণটা কোনো সস্তা অপরাধের ডেরা নয়। সে কোনো মাদক ব্যবসা, অস্ত্র চোরাচালান কিংবা ফুটপাতের সস্তা চাঁদাবাজি করে এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলেনি। যথেষ্ট পরিশ্রম করেছে। এত অল্প সময়ে এই অবিশ্বাস্য বিপুল অর্থের পাহাড় গড়ার পেছনে ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল এবং কৌশলগত শ্যাডো ইকোনমি।
কিং এর নেটওয়ার্ক মূলত নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক ট্যাকটিক্যাল টেকনোলজি স্মাগলিং, গ্লোবাল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স, সুইচ ব্যাংকের ব্ল্যাক মানি ট্র্যাকিং এবং ক্রস-বর্ডার হাই-ভ্যালু অ্যাসেট প্রোটেকশন। সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্রের ডিফেন্স গ্রিডের গোপন চিপস কিংবা কোনো মাল্টি-ন্যাশনাল বিলিয়নেয়ারের সিক্রেট ডেটা সিকিউরিটি, সবকিছুর অদৃশ্য চাবি থাকে কিং এর হাতে।
দেশের বড় বড় ভিআইপি এবং আন্তর্জাতিক লর্ডরা যখন কোনো আইনি জটিলতায় ফেসে যায়, শত্রুর ফাঁদে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে থাকে, তখন তারা কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে স্মরণ করে ‘কিং’ কে।
তবে এই অন্ধকার জগতের একটা অত্যন্ত কঠোর নীতি আছে, যা কিং নিজে তৈরি করেছে। অযথা কোনো নিরাপরাধ অথবা সাধারণ বেসামরিক মানুষের গায়ে একটা ফুলের টোকাও লাগানো যাবে না।
কিং এর পুরো গ্যাং কোনোদিন কোনো সাধারণ মানুষের ক্ষতি করেনি। কোনো নিরীহ প্রাণ কেড়ে নেয়নি। তারা কেবল তখনই আঘাত করে, যখন কেউ তাদের কোড ব্রেক করে বা কিং এর ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে।
বিগত প্রায় তিন মাস ধরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক পুরনো রাইভাল গ্রুপ ‘দ্য ব্ল্যাক সিন্ডিকেট’ এর প্রধান আরসালানের সাথে শেহজাদের এক তীব্র বিরোধিতা চলছিল। আরসালান চেয়েছিল কিং এর এই গ্লোবাল টেক-স্মাগলিং এর রুটটা দখল করতে। কিন্তু কিং এর কড়া নজরদারির কারণে সে প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে।
শেষ অব্দি আরসালান চরম সীমা লঙ্ঘন করে বসে।
গতকাল রাতে আরসালানের একটা স্পেশাল ব্ল্যাক-অপ্স টিম স্কাইলাইন ভিলার আউটার থার্মাল পেরিমিটার ম্যাপ করার চেষ্টা করে। তারা ভিলার পেছনের সিকিউরিটি গ্রিড হ্যাক করে ভেতরে একটা স্থানীয় ট্র্যাকিং ডিভাইস ও আরসালানের সিগনেচার মেটাল কয়েন পুশ করেছিল।
তাদের এই চেষ্টা শেহজাদের কাছে ছিল এক ভয়ংকর থ্রেটের মতো।
যে স্কাইলাইন ভিলার অন্দরে তার অসুস্থ মা রয়েছে, প্রেগন্যান্ট স্ত্রী রয়েছে, সেই ভিলার দেওয়ালে শত্রুর হাতের ছোঁয়া লেগেছে! এই বিষয়টি শেহজাদের ভেতরের আদিম হিংস্রতাকে এক হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল।
কিং নিজের হাতে কাউকে মারে নি এতদিন। তার একটা ইশারায় গ্যাং এর লোকেরা অপরাধীর নাম পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেয়। সে রহমান টাওয়ারে বসে থেকে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে শুধুমাত্র নির্দেশ দিতে অভ্যস্ত।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। সামাইরার সামনে বসে পেপার সাইন করার পর শেহজাদ মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে। তার বুকের ভেতরের ক্ষোভ আর ভালোবাসার হাহাকার এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, এই নরকযন্ত্রণা লাঘব করতে আজ সে নিজে হাতে রক্ত ঝরাতে চলেছে।
সেই পরিত্যক্ত গুদামঘরের নিচে অবস্থিত ‘জোন জিরো’তে শেহজাদ প্রবেশ করল। আজ লোহার চেয়ারটার ওপর হাত-পা শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে আরসালানের মেইন রাইট-হ্যান্ড এবং শার্পশুটার, জামিল।
কিং ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই তার শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। গ্যাং এর সকলে কিং এই রূপ দেখে ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তারা কোনোদিন তাদের কিং কে এত হিংস্র লুকে দেখেনি!
শেহজাদ আজ কোনো চেয়ার টেনে বসল না। কোনো সিগারেট ধরালো না। সে সোজা এগিয়ে গেল জামিলের সামনে।
কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই শেহজাদের এক লাথি আছড়ে পড়ল জামিলের বুকে। লোহার চেয়ারসহ জামিল মেঝের ওপর ছিটকে পড়ল। যন্ত্রণায় বিকট এক চিৎকার দিয়ে উঠল।
শেহজাদ নিজে নিচু হয়ে জামিলের চুলগুলো নিজের মুঠোয় খপ করে চেপে ধরে তাকে টেনে সোজা করল। তার গলার স্বর তখন অচেনা শোনাচ্ছে,
-তোর বসের এতবড় সাহস কীভাবে হলো রে? তোরা ভেবেছিস তোরা আমার স্কাইলাইন ভিলার সিকিউরিটি পেরিমিটারে পা দিবি? আমার পার্সোনাল ওয়ালে এসে হিট করবি?
জামিল রক্তমাখা মুখে কোনোমতে থুতু গিলল। সামান্য হাসার চেষ্টা করল।
কিং নিজের মাথার চুলে এলোমেলো ভাবে হাত বুলিয়ে বলল,
-এই তুই হাসছিস কেন? খাং*কির পোলা তুই হাসস কেন?
আরো বেশ কিছু লাথি গিয়ে পড়ল জামিলের মুখে।
-আমাকে আরসালানের নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড দে, জামিল। নয়ত তোকে জানে মেরে ফেলব মাদারচো*দ।
জামিল অস্ফুট স্বরে বলল,
-আমাকে মারলেও আমি আরসালান ভাইয়ের নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড বলব না..
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেল না জামিল। শেহজাদ টেবিলের ওপর থেকে একটা ভারী লোহার রড তুলে নিয়ে সরাসরি আঘাত করল জামিলের ডান পায়ের হাঁটুতে। হাড় ভাঙার এক বীভৎস শব্দ জোন জিরোর কংক্রিটের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।
জামিল তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করে উঠল।
-আমার পরিবারের ক্ষতি করতে চাস তোরা? হ্যাঁ! আমার পরিবারের?
শেহজাদ লোহার রডটা দিয়ে জামিলের বুকে একের অপরকে আঘাত করতে করতে পৈশাচিক চিৎকারে গর্জে উঠল।
-ভেবেছিস তোরা আমার সেই বাড়িকে টার্গেট করবি যেখানে আমার মা আর আমার স্ত্রী নিশ্চিন্তে ঘুমায়? তোদের পুরো ব্ল্যাক সিন্ডিকেট আমি এই ঢাকার মাটি থেকে উপড়ে ফেলব!
শেহজাদ আজ সম্পূর্ণরূপে অনিয়ন্ত্রিত। সামাইরার দেওয়া শর্তের সমস্ত কষ্ট, নিজের ভালোবাসার নিঃস্বতা সে আজ উগরে দিচ্ছিল এই অপরাধীর শরীরের ওপর।
জোন জিরোর হলুদ আর সাদা বাতির নিচে শেহজাদের এই দানবীয় রূপ দেখে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাকি সদস্যরাও ভয়ে কাঁপতে লাগল।
জামিল এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে শেহজাদ রডটা মেঝেতে ছুড়ে মারল। তার পরিধেয় সাদা শার্টে তখন অপরাধীর রক্তের ছিটেফোঁটা লেগে গেছে। সে লিমনের দিকে তাকিয়ে হাড়হিম করা গলায় বলল,
-আরসালানের হেডকোয়ার্টার আজ রাতের মধ্যে ক্র্যাশ কর লিমন। ও যেন কাল সকালের সূর্য এই ঢাকায় বসে দেখতে না পারে। দিস ইজ আমার ফাইনাল অর্ডার।
লিমনের বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। সে এতবছর ধরে ‘কিং’ এর সাথে আছে। কিন্তু নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা এমন এক লুকে সে তার বসের কখনো দেখেনি। লিমন কিছুটা দ্বিধা নিয়ে একধাপ এগিয়ে এল। বুকে সাহস জুগিয়ে নিচু স্বরে বলল,
-কিন্তু কিং… আরসালানের মূল ডেরায় যদি আমরা এভাবে ওপেন অ্যাটাক করি, তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরো চেইনে একটা বড়সড় ঝামেলা বেঁধে যাবে। আরসালানের সাথে এই সিন্ডিকেটের আরও দুই-তিনজন বড় মাফিয়া লর্ডের স্ট্রং পার্টনারশিপ আছে। আমরা ওদের চেইনে হাত দিলে তারা সবাই আমাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে ক্ষেপে যাবে।
লিমন এক মুহূর্ত থামল। কিং এর মুখের কোনো পরিবর্তন না দেখে সে নিজের গলার স্বর আরও কিছুটা নামিয়ে এনে অত্যন্ত লজিক্যাল পয়েন্ট তুলল,
-কিং, আপনি অনেক সাবধানে নিজের পরিচয় আড়াল করে রেখেছেন। বাইরের দুনিয়া, মিডিয়া, সরকার সবাই আপনাকে চেনে রহমান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের একচ্ছত্র মালিক হিসেবে। দেশের প্রথম সারির বিজনেস টাইকুন আপনি। এই যুদ্ধের তীব্রতা যদি বাড়ে তবে কোনো না কোনো লুপহোল দিয়ে আপনার এই ‘কিং’ পরিচয় জনসমক্ষেফাঁস হয়ে যাওয়ার একটা বিশাল চান্স থাকবে।
লিমনের এই অত্যন্ত যৌক্তিক এবং দূরদর্শী আশঙ্কার বিপরীতেও কিং বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক চরম ড্যাম কেয়ার ভাব। এক পৈশাচিক ঔদাসীন্য।
-আই ডোন্ট ফা*কিং কেয়ার। আই ডোন্ট কেয়ার আমার এই বিজনেস টাইকুনের মুখোশ থাকল নাকি খসে পড়ল! ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেইন, মিত্রতা আর মাফিয়া লর্ডদের আমি জুতার তলায় রাখি।
শেহজাদ লিমনের কলারটা এক ঝটকায় মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল। বলল,
-ওই ভিলার ভেতরে আমার পরিবার থাকে! আমার অসুস্থ মা থাকে। আমার স্ত্রী থাকে আর…
অনাগত সন্তানের কথা বলার আগে থেমে গেল কিং। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-আমার জীবনের সবচেয়ে দামী মানুষগুলো থাকে। আর ওই আরসালানের কুত্তা/র বাচ্চারা আমার ঘরের পেরিমিটারে ঢুকে সিকিউরিটি গ্রিড লিক করার দুঃসাহস দেখায়? গতরাতে ওরা জাস্ট ডিভাইস পুশ করেছে। কিন্তু কাল যদি ওরা দেওয়াল টপকে সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে যেত? আমার ফ্যামিলির কোনো বড় ক্ষতি করে বসত? তখন এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেইন এসে আমার শান্তি ফিরিয়ে দিত? নাকি এই একশো কোটি টাকার বিজনেস সাম্রাজ্য আমার ঘরের লোকেদের নিরাপত্তা দিত?
শেহজাদ লিমনকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। মরণঘাতী সুরে বলল,
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২০
-আমার পরিবারের ওপর সামান্য আঁচ আসার আগে আমি সবকিছু ছারখার করে দিব। দ্যাটস অল।
শেহজাদ আর এক সেকেন্ডও জোন জিরোর সেই নরককুণ্ডে দাঁড়াল না। সে সশব্দে আওয়াজ তুলে সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে লাগল।
