তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৯
রিমঝিম বৃষ্টি
” আমি কোথায় ঘুমাবো…?”
ফারিশা সবেমাত্র ইয়াশকে বিছানায় বসিয়ে রুম আটকাতে গেছিলো আর তখনি ইরাদ এসে হাজির হলো রুমের সামনে সাথে করে একটা বালিশও নিয়ে এসেছে তা দেখে ফারিশা ভ্রু কুঁচকে বললো,
” আপনাকে পুরো একটা রুম দিলাম, এরপরও আপনি ঘুমানোর জায়গা পাচ্ছেন না..! ”
ইরাদ মাথা উঁচিয়ে ফারিশার পিছন থেকে বিছানায় শুইয়ে থাকা ইয়াশকে দেখে বললো,
” ইয়াশের পাশে ঘুমায় আমি..?”
” একদমই না নিজের রুমে গিয়ে ঘুমান..!”,
বলেই ঠাস করে দরজা আটকে দিলো তা দেখে ইরাদ কিছুটা মন খারাপই করলো এবার। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরেরদিন দুপুর বেলা ————
” শুনুন ইয়াশকে দেখে রাখবেন আমি ক্যাফেতে যাচ্ছি একটু..!”,
ইরাদ ফারিশাকে থ্রিপিস পড়ে যেতে দেখে বললো,
” আমি তোমাকে কিছু দিয়েছিলাম ফারিশা সেটা দেখা উচিত ছিল তোমার..?”
ফারিশা তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে যেতে যেতে বললো,
” পরে দেখবো চলে গেলাম..!”,
বলেই চলে যেতে লাগলে ইরাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” ক্যাফেতে না গেলেই নয় ফারিশা, আমি আছি তো.?”
ফারিশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে ইরাদের দিকে তাকালো মৃদু হেসে বললো,
” তাই ছিলেন বুঝি আপনি। এতগুলো বছর আমি ওই ক্যাফের টাকাতেই সংসার চালিয়েছি আর আপনি একদিন এসেই হুকুম করছেন বাদ দিতে। বলেছি তো ২০ দিন আগে কাটান তারপর দেখা যাবে.! “,
বলেই বেরিয়ে চলে গেলো ইরাদ শুধু নিঃশব্দে সেদিকে তাকিয়ে দরজা আটকে দিলো।
ফারিশা ক্যাফেতে যেতেই দেখতে পেলো জাহিদ কে। জাহিদ ক্যাফেতে বসে বসে কফির জন্য সবকিছু রেডি করছিলো ফারিশাকে দেখে বললো,
” এসেছিস তুই ভালোই হয়েছে একটু থাক তুই আমি বাড়ি থেকে জাস্ট দশ মিনিটের জন্য যাবো আর আসবো..!”
ফারিশা ব্যাগ টা রেখে চুলার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,
” আচ্ছা সমস্যা নেই তুই যা..!”
জাহিদ পরনের এপ্রোন খুলতে খুলতে বললো,
” শোন আজ বিকেল হতেই ক্যাফে বন্ধ করে চলে যেতে বলেছে জিসান বাসায়, তাই সেই অনুমান করেই কফি বানাস..!”
” আচ্ছা জিসান ফিরবে কবে ফোন দেয় না যে..?”
জাহিদ উত্তর না দিয়ে বরং মিটমিটিয়ে শুধু হাসলো। জাহিদ কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো ক্যাফে থেকে আর ফারিশা সেদিকে এক নজর তাকিয়ে কফি বানাতে শুরু করলো।
দুপুর হতেই ইরাদ গোসল সেরে সাথে ইয়াশকেও গোসল করিয়ে বের হলো ওয়াশরুম থেকে। ইরাদের পরনে শুধু টাওজার আর গায়ে কোনো শার্ট নেই শুধু গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে রেখেছে। ইয়াশ কে নিয়ে বের হতেই হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো। ইরাদ ভাবলো হয়তো ফারিশা চলে এসেছে। ইয়াশকে নিয়ে দরজা খুলতেই তার দৃষ্টি স্থির হলো ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে। জিসান ফারিশাকে সারপ্রাইজ দিবে জন্য একদম ডাক্তারের এপ্রোন পড়েই সোজা তাদের বাড়িতে এসেছিলো সাথে ইয়াশের জন্য এক ব্যাগ ভর্তি গাড়ি, চকলেট নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে বোধহয় এসব আশা করেনি। ইরাদকে দেখে তার হাসি মুখখানা মুর্হুতেই মাঝেই গায়েব হলো যেনো।
ইরাদ জিসান দেখে হেসে উঠলো ছেলের হাত ধরে ব্যঙ্গ সুরে বললো,
” আব্বুজান দেখেন তো আপনার মামা এলো নাকি..? ”
ইয়াশ জিসানের দিকে তাকিয়ে বললো,
” জিতান তুমি কোতায় চিলে এতদিন..?”
জিসান গম্ভীর দৃষ্টি ফেলে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে রইলো এক ধ্যানে তা দেখে ইরাদ সদর দরজার দেওয়ালের সাথে বা হাতের কনুই ভর করে ভ্রু নাচিয়ে বললো,
” তা ডাক্তার এর পোশাকে দেখছি যে, এটা রিয়েল নাকি ফেইক..?”
” আপনি এই বাড়িতে কী করছেন! ফারিশা কোথায়..?”
ইরাদ টাওয়াল দিয়ে নিজের চুলগুলো মুছতে মুছতে বললো,
” বোকার মতো কেউ প্রশ্ন করে। আমি আমার স্ত্রীর সাথে থাকবো না তো কোথায় থাকবো? তা তুই হঠাৎ এলি যে..?”
জিসান ঝুঁকে এসে ইয়াশকে ব্যাগ টা দিয়ে বললো,
” ইয়াশ বাবা তুমি এগুলো নিয়ে রুমে গিয়ে খেলো..? ”
ইয়াশ ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে বললো,
” এগুলো সব আমাল..?”
” হুম সব তোমার..!”
ইয়াশ খুশি হয়ে সেগুলো নিয়ে ভেতরে যেতেই জিসান ইরাদের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,
” আপনি এতো ছ্যাচঁড়া কেনো? মেয়ে পাচ্ছেন না বোধহয় তাই না, এজন্য এর পিছনে ছুটছেন এখন..?”
ইরাদ সাইডে সরে এসে বললো,
” ভেতরে আয় বসে কথা বলি..?”
জিসান ইরাদের দিকে তাকিয়ে হাসলো শুধু আর বললো,
” কী মনে হয় আপনি জিতবেন, উমম একদমই না শেষমেশ জলে ডুববেন আপনি..! ”
” ডুবলাম না হয়। চেষ্টা করলে কেউ বিফলে যায় না বুঝলি তো আর নিজের বউ-বাচ্চাকে নিয়ে আমি ডোবায় যাবো না খালে তা তোকে ভাবতে হবে না । এসব বাদ দে, কী জন্য এসেছিস তাই বল.?”
জিসান উত্তর দিলো না, পকেট থেকে ফোন বের করে ফারিশাকে কল দিতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করতেই জিসান থমথমে গলায় বললো,
” কয় আছিস তুই..?”
” কেনো ক্যাফেতে আছি..!”
জিসান ইরাদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো,
” আচ্ছা ওখানেই থাক আমি আসছি..?”,
বলেই কল কেটে দিয়ে জিসান ইরাদ কে বললো,
” যার খোঁজে আসলাম সে আমার কাছে গিয়েই বসে আছে হায় কী কপাল। আচ্ছা থাকেন, আমি যায় তার চেয়ে বরং আপনি বাচ্চার দেখভাল করুন..!”,
বলেই চলে গেলো ইরাদ তা দেখে হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো রাগে। দ্রুত দরজা আটকে খাবার বেড়ে ইয়াশের কাছে গিয়ে বসে বললো,
” ইয়াশ বাবা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তো আমরা আম্মুর কাছে যায়..!”
” সত্যি যাবে কিন্তু আম্মু তো নিলো না আমাদেল..!”
ইরাদ ভাত মাখিয়ে ইয়াশের মুখে দিতে দিতে বললো,
” আমি নিয়ে যাচ্ছি তোমায় তাড়াতাড়ি খাও তো..!”
দু’জনে দ্রুত খেয়ে রেডি হয়ে নিলো। তারপর বের হতেই হঠাৎ ইরাদের মনে হলো গতরাতে তো তার কাছে যা টাকা ছিলো সব ফারিশা নিয়ে আটকে রেখে শুধু তার কাছে দুই হাজার টাকা দিয়ে বলেছে ” এই বিশ দিনের খরচ আপনার এটা! এই টাকা বিশ দিন অব্দি চালিয়ে দেখাবেন! “। ইরাদ এবার কী করবে কিন্তু তার যেতেই হবে। সেখান থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো দ্রুত। বাইরে গিয়ে দোকান থেকে টাকা ভাঙিয়ে রিকশাকে ডাকলো,
” এই মামা যাবেন..!”
মাঝারি বয়সী ছেলেটা গাড়ি নিয়েই সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
” কোথায় যাবেন..? ”
” উত্তরার টেকআউটের সামনেই..! ”
” ৩০ টাকা দিয়েন..! ”
ইরাদ কিছু না ভেবেই উঠে পড়লো।
” এক কাপ কফি দিন তো দ্রুত একদম টগবগে গরম চায়..!”
টেবিলে বসা এক অল্পবয়সী মেয়ে, পরনে তার দামী শাড়ি, স্টাইল করে চুল বাঁধা সাথে ভারী মেকাপ । ফারিশা এসে অব্দি কাস্টমার পায় নি শুধু কিছুক্ষণ আগে দু’জন এসেছিলো তারা চলে গেছে। ফারিশা মেয়েটার হুকুম মতে একদম গরম গরম ধোঁয়া উঠা কফির কাপ এনে রাখলো মেয়েটার সামনে আর শান্ত গলায় বললো,
” ম্যাম আপনার কফি..!”,
এতটুকু বলেই চলে যেতে লাগলে মেয়েটার কথা শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো ফারিশা।
” ইরাদ কেমন আছে..?”
ফারিশা পেছন থেকে ফের সামনে ঘুরে মেয়েটাকে পরখ্ করে বললো,
” ঠিক চিনলাম না আপনাকে..?”
কাবিশা নিজের থুতনিতে আঙ্গুল রেখে বললো,
” তা জেনে আপনার কী, খুব তো অসহায়ত্বের নাটক করছেন। আবার ক্যাফেতে জব করেন দেখছি। চরিত্র ঠিক আছে আবার..! “,
বলেই কাবিশা মুখ খিঁচড়ে উঠলো যেনো তাকে কেউ তেঁতো কিছু খাইয়ে দিয়েছে ফারিশা মুর্হুতেই ক্ষেপে উঠলে রাগী গলায় বললো,
” শুনন কে আপনি জানি না তবে একজনের চরিত্র তুলে কথা বলবেন না নয়তো, মুখ নয় সাথে হাত চালাতে বাধ্য হবো..!”
” আপনার কত টাকা চায় বলুন আমি দিবো কিন্তু ইরাদের জীবন থেকে চলে যান প্লিজ। আমরা দু’জন দু’জনকে ভালোবাসি..!”
ফারিশা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললো,
” এতই ভালোবাসেন তো আসতে দিয়েছেন কেনো আমার কাছে, ধরে রাখতে পারেন নি তারে । আর একদম টাকার গরম দেখাতে আসবেন না আপনি? পারলে এখান থেকে বেরিয়ে যান প্লিজ..! আপনার মতো একটা কাস্টমার হাতছাড়া করলে খুব একটা ক্ষতি হবে বলে তো মনে হয় না..!”
কাবিশা অপমানবোধ করলো। বসা থেকে উঠে রাগী গলায় বললো,
” এই কাবিশা খানকে অপমান করার ফল তোমায় ভুগতে হবে ফারিশা। ভালোই ভালোই সরে যাও ইরাদের জীবন থেকে নয়তো নিজের বিপদ ডেকে আনবে সাথে বলা তো যায় না তোমার ছেলে…..
বাকি কথা বলার আগেই ফারিশা নিজের সর্বোচ্চ গায়ের জোরে এক চড় বসিয়ে দিলো কাবিশার গালে। আর কিছুটা উঁচু কন্ঠে বললো,
” আমায় যা করার করিস কিন্তু আমার ছেলের দিকে যদি একটু আচঁ আসে তোকে খুন করতে আমি দু’বার ভাববো না তাতে যদি আমার ফাঁসিও হয় হোক । প্রথমবার ভুল করেছি আমি, কিন্তু দ্বিতীয় বার আর করছি না নিজের মাথায় ঢুকিয়ে রাখিস কথাটা..!”
কাবিশা নিজের গালে হাত বুলিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে জোরে শব্দ করে হেসে উঠলো আর বললো,
” আমার গায়ে হাত তুললি তুই..? “,
এতটুকু বলেই কাবিশা একটানে ফারিশার ডান হাত টা টেনে হাতের ওপর গরম কফি ঠেলে দিলো সাথে সাথে ফারিশা যেনো গগন ফাটানো চিৎকার দিয়ে উঠলো। হুট করে এমন আক্রমণ হবে তা বোধহয় ফারিশা আন্দাজও করতে পারেনি। হাতের তালু যেনো মুর্হুতেই মাঝেই লাল হয়ে ফোসকা পড়ে গেলো। ব্যাথায় কুকঁড়ে উঠে ফ্লোরেই নিজের হাত ধরে বসে কাঁদতে লাগলে তা দেখে কাবিশা ঝুঁকে এসে বললো,
” এ তো সবে শুরু মিস ফারিশা আর এখুনি নুইয়ে পড়লি তুই আহারে…!”,
বলেই বাঁকা হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেলো ক্যাফে থেকে । বের হতেই জিসানের সাথে দেখা হলো কাবিশার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দু’জনের নজর মিলিত হলো, কাবিশা জিসান কে দেখে চলে যেতেই জিসান ভেতরে চলে গেলো। কিন্তু ভেতরে যেতেই যেনো সে থমকালো। ফারিশা ফ্লোরে বসেই নিজের লালিত হাত টা ধরে শুধু গুঙড়িয়ে কাঁদছে । জিসান দৌড়ে এসে ফারিশার পাশে বসে তার হাত ধরেই বললো,
” ওহ গড কী করেছিস এসব তুই । ইসস দাঁড়া বরফ আনছি কাঁদিস না তুই..? “,
দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বরফ এনে তার হাতে দিতে দিতে বললো,
” এসব কাজ তোকে কে করতে বলেছে বল তো। দেখ তো হাতটা কতটুকু পুড়িয়ে ফেললি, চল তো হসপিটালে আমার সাথে মেডিসিন দিলে দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে..!”
ফারিশার যেনো কোনো কথাই কানে যাচ্ছে না , তার হাত জ্বলে যাচ্ছে যার ফলে তার মাথা সহ যেনো ঝিম ধরে আসছে। এদিকে হাতের একদম বেহাল দশা দেখে ফারিশাকে ধরে তুলতে গেলে চট করে এসে ইরাদ তার হাতটা ধরে ফেলে, ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে ফারিশার কাছে এসে বসলো এদিকে ফারিশা নিজের সব ভার ছেড়ে দিলো যেনো। জ্ঞান হারিয়ে ঢোলে পড়লো ইরাদের কোলে। ইয়াশ মায়ের এমন অবস্থা দেখে ভয়ে ইরাদের হাত আঁকড়ে মুখ ঢেকে ফেললো। ইরাদ চোয়াল শক্ত করে বললো,
” কী করেছিস তুই ওর সাথে। হাত পুড়লো কীভাবে ওর.?”
জিসান সেদিক পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ইয়াশকে পাশ থেকে কে তুলে বললো,
” এসব ড্রামা দেখার সময় নেই মিস্টার ইরাদ। দ্রুত ওকে নিয়ে আসুন আমার গাড়ি আছে হসপিটাল নিতে হবে.!”,
বলেই বেরিয়ে গেলে ইরাদ আর পাঁচ-কান না ভেবে ফারিশাকে কোলে তুলে বেরিয়ে গেলো। দ্রুত হসপিটাল পৌঁছে ফারিশা কে কেবিনে নিতেই জাহানারা শিকদার এগিয়ে এসে ফারিশার হাত দেখে বললো,
” কি হলো ফারিশার এভাবে হাত পুড়লো কীভাবে..?”
” আগে ট্রিটমেন্ট করুন তো দ্রুত.! “,
ইরাদের কথা শুনে জাহানারা এক নজর সেদিকে তাকিয়ে ফারিশার দিকে খেয়াল করলো। ইরাদ পিছু ঘুরতেই দেখলো জিসানের কাঁধে ইয়াশ মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শুধু। ইরাদ এগিয়ে গিয়ে জিসানের থেকে ইয়াশকে নিতে গেলে ইয়াশ এলো না জিসানকেই আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। ইরাদ হাত বাড়িয়েও ফিরিয়ে নিলো, জিসান তা দেখে বাঁকা চোখে এক নজর ইরাদকে দেখেই জিসান কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো ইয়াশকে নিয়ে। ইরাদ সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ফারিশার এমন অবস্থা দেখে তারও শরীরে কাঁপন উঠেছিলো যেনো কিন্তু এমন হলো কীভাবে ইরাদের তাতে সন্দেহ হলো।
প্রায় বিকেলের দিকে ফারিশার জ্ঞান ফিরলো। নিভু নিভু চোখে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো সে হসপিটালে। ঘাড় কাত করে এক নজর হাত টা দেখলো এখন জ্বালা কম হলেও পুরোপুরি ঠিক হয় নি, হাতটা যেনো তার ভার হয়ে আছে। পাশেই ইরাদকে বসে থাকতে দেখলো চোখ বন্ধ করে তাকে দেখে ফারিশা উঠতে উঠতে বললো,
” আপনি এখানে কেনো, আমার ছেলে কোথায়..?”
ফারিশার গলা পেয়ে ইরাদ চট করে চোখ খুলে তাকালো আর চিন্তিত গলায় বললো,
” তোমার হাত ঠিক আছে এখন, ব্যাথা করছে না তো..?”
” ইয়াশ কোথায়..?”
ইরাদ শান্ত হয়ে বললো,
” জিসানের কাছে..!”
” দায়িত্ব আপনার ছিলো জিসানের কাছে কেনো, নিয়ে আসুন ওকে..?”
ইরাদ উঠে গিয়ে বাইরে যেতেই দেখতে পেলো জিসানের কোলে ঘুমোচ্ছে ইয়াশ। ঘুমের মাঝেও যেনো কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। এগিয়ে গিয়ে সোজা ইয়াশকে নিজের কোলে তুলে নিলে জিসান উঠে বললো,
” ফারিশার জ্ঞান ফিরেছে..? “,
ইরাদ ভেতরে যেতে যেতে বললো,
” হ্যাঁ.!”
জিসানও ছুটলো সেদিকে। ফারিশা ইয়াশকে পেয়ে নিজের কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। জাহানারা এগিয়ে এসে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললো,
” আমি কিছু মেডিসিন আর মলম দিয়েছি ঠিক করে নিও আর একটু সাবধানে কাজ করবে তো। দেখো তো বাচ্চাটাও ভয় পেয়ে গেছে..!”
” বিল কত হয়েছে হসপিটালের বলুন পে করে দিচ্ছি..! ”
ইরাদের কথা শুনে জাহানারা পাশ ঘুরে এবার ইরাদকে ভালো করে দেখে বললো,
” কে আপনি..?”
” জি আমি ওর হাসবেন্ড..!”
জাহানারা এক পলক শুধু পিছনে থাকা নিজের ছেলের দিকে তাকালো তারপর ফারিশার দিকে ঘুরে বললো,
” বিল লাগবে না। ফারিশা বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নাও। আর হে হাতের ওপর প্রেশার দিও না আজ..!”
ফারিশা মাথা নাড়িয়ে মৃদু হেসে বললো,
” ধন্যবাদ আন্টি..!”
” আরে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছুই নেই তুমি নিজের খেয়াল রেখো..!”
হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরে ফারিশা রুমে যেতেই ইয়াশকে শুইয়ে দিলো। ইরাদ তার রুমে এসে ফারিশার হাত ধরে দেখতে চাইলে ফারিশা এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিয়ে গরম চোখে তাকিয়ে বললো,
” মিথ্যা নাটক করছেন আবার আমার সাথে আপনি..?”
হুটহাট এমন প্রশ্নে ইরাদের কপাল কুঁচকে গেলো। পাশে ছেলেকে এক নজর দেখে ফারিশা কে বললো,
” আস্তে বলো ফারিশা ইয়াশ ঘুমাচ্ছে । আর এসব কি বলছো তুমি কীসের নাটক..?”
” আপনার মেইন উদ্দেশ্যেই আসলে আমার ছেলেকে কেড়ে নেওয়া, আমাকে চান না আপনি তাই না..! ”
ফারিশার কথায় ইরাদ আরেকটু এগিয়ে এসে বললো,
” ফারিশা এসব কি বলছো! আমি তোমাকেও চায়, আমার ছেলেকেও চায় বলেছি তো তাহলে এমন করছো কেন তুমি..?”
ফারিশা টলমল চোখে তাকিয়ে বললো,
” ভালোবাসেন আমায়..! ”
” বাসি.. ভালো আমি তোমাকে। আজ যদি তোমাকে সত্যিই ভালো না বাসতাম তাহলে এতগুলো বছরে আমি ঠিক বিয়ে করতাম। আমি তোমাকে ভালোবাসি জন্য আঘাত পেয়েছি ফারিশা। তবুও আমার দ্বিতীয়ত নারীর প্রতি কোনো ফিলিংস আসে নি এতগুলো বছরে কখনো। আমার শুধু তোমাকেই চায় ফারিশা..! ”
ফারিশা দেওয়ালের সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ভারী শ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করে বললো,
” তাহলে কাবিশা কে..?”
ইরাদের মুখ এবার শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” কাবিশাকে চিনো কিভাবে তুমি? আর এর মধ্যে ও এলো কীভাবে..? ”
” কেনো চমকালেন বুঝি। আপনার প্রেমিকা আজ ক্যাফেতে এসেছিলো। আমাকে হুমকি দিয়েছে সাথে আপনার ছেলেকেও। ”
তারপর নিজের ক্ষত হওয়া হাত টা তার সামনে ধরে বললো,
” এই যে পুড়ে যাওয়া হাতটা দেখছেন তা আপনাকে কেড়ে নেওয়ার নাকি ফল। শুনুন, ঝগড়া-মীমাংসা যা ইচ্ছে করেন আমার সাথে করুন, বিশ্বাস করুন সব সহ্য করতে পারবো কিন্তু আমার সন্তানের কিছু হলে আমি মরে যাবো। আপনাদের দোহায় লাগে এর মধ্যে আমার বাচ্চাকে টানবেন না..!”,
বলেই অঝোরে কাঁদতে লাগলো ফারিশা। ওপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ টার রাগ যেনো তিরতির করে বেড়ে উঠলো এবার । কপালে, হাতের নীল শীরাগুলো যেনো ফুলে উঠেছে, রাগে তার চোয়াল কাঁপছে। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ধুপধাপ পায়ে বেরিয়ে গেলো ফ্ল্যাট থেকে। ফারিশা সেদিকে এক নজর তাকিয়ে সেখানেই বসে কাঁদতে লাগলো।
সবেমাত্র মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়িতে ঢুকলো কাশেম খান তার স্ত্রী আজ বাড়িতে তার বাপের বাড়ির লোকজনদের দাওয়াত দিয়েছিলো তাই তাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলো। সবাই চলে গেলেও তার মা রয়ে গেছে। দু’জনে বেশ গল্প জুড়েছে নামাজ পড়ে নিজের রুমে । কাশেম লিভিং রুমে বসে একটু টিভি অন করে দেখতে বসলো। কাবিশা নিজের রুমে বসে ফোনে সেই হাসাহাসি করছে।
” দীদা আজ যা দিয়েছি না হারে হারে মনে থাকবে
তার। ”
ওপাশ থেকে আয়েশা চৌধুরী কিন্তু ভীতি গলায় বললো,
” বেশি লাগে নাই তো, পরে আবার যদি কেইস কইরা বসে..!”
কাবিশা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো,
” উফ দীদা বেশি লাগেনি হালকা লেগেছে। তবে বলে এসেছি ইরাদকে না ছাড়লে ওর অবস্থা আরও খারাপ করে দিবো হুম..!”
” কাবিশা..! কাবিশা..! ”
নিচের থেকে ইরাদের গলা ভেসে আসতেই কাবিশার কান সজাগ হলো যেনো কয়েক সেকেন্ডের জন্য, পরক্ষণেই হাসি ফুটলো মুখে ইরাদ এসেছে তার বাড়িতে তারওপর আবার তার খোঁজে । দ্রুত ফোন কেটে নিচে চলে যেতেই দেখতে পেলো ইরাদকে। ইরাদকে দেখে পাশ থেকে কাশেম খান দাঁড় হয়ে বললো,
” আরে ইরাদ তুমি। এসো! এসো! বসো তুমি কাবিশাকে ডাকছি আমি..!”,
ইরাদ বসলো না সামনে তাকাতেই কাবিশাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সেও এগিয়ে গেলো সেদিকে । কাবিশা এগিয়ে আসতেই আচমকা ইরাদ নিজের শক্ত হাত দিয়ে জোরে চড় বসিয়ে দিলো কাবিশার গালে। মুর্হুতের মাঝেই কাবিশার হাসি মিলিয়ে গেলো। অবাক হয়ে ইরাদকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইরাদ ফের তার গালে আরেকটা চড় বসিয়ে দিলো।
” তোমার সাহস তো কম নয় আমার বাড়ির এসে আমার মেয়েকে মারছো..? ”
কাশেম এগিয়ে আসতে গেলেই ইরাদ চেঁচিয়ে উঠলো,
” আপনার.. মেয়ের সাহস কি করে হয় আমার বউকে মারার। আজ ও মেয়ে জন্য মেরে সাহস পাচ্ছি না নয়তো ছেলে হলে এর করুণ দশা কী হতে পারে দেখিয়ে দিতাম। আর কোন সাহসে তুই আমার বউয়ের হাত পুড়িয়েছিস তাই বল আমায়..?”
শেষ কথাটা কাবিশার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো। তা শুনে কাবিশা কান্নারত গলায় বললো,
” ঠিক করেছি, সুযোগ পেলে ওকে মেরেও ফেলবো মিস্টার ইরাদ চৌধুরী..! ”
ইরাদ রাগে আশেপাশে তাকাতেই দেখতে পেলো কিচেন রুম। সামনে এগিয়ে কাবিশার হাত খপ করে ধরে ব্যঙ্গ হাসি দিয়ে বললো,
” তার আগে চল তোকে একটু জাহান্নাম ঘুরিয়ে নিয়ে আসি..!”,
বলেই টানতে টানতে কিচেন রুমে নিয়ে যেতে লাগলে কাশেম রাগী গলায় বলে উঠলো,
” এই আমার মেয়েকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো তুমি? কাবিশার মা নিচে এসো তো..! “,
জোরে ডেকে নিজেও মেয়ের পিছু পিছু যেতে লাগলো। ইরাদ কিচেনে গিয়ে গ্যাস অন করেই কাবিশার হাত চট করে আগুনের ওপর ধরলো ঠিক সেই জায়গায় যেই জায়গায় ফারিশার হাত পুড়িয়েছে সে। কাবিশা চিৎকার দিয়ে উঠলো ব্যাথায়। হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগলো। ইরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
” তোর প্রেমিক হয় আমি বল আমায়, তোর প্রেমিক হয় আমি। তোর সাথে আমার সম্পর্ক আছে..?”
কাবিশা কান্নারত গলায় বললো,
” না না আপনি আমার কেউ হন না, দোহায় লাগে ছেড়ে দিন আমি মরে যাবো এবার..?”
” আমার বউয়ের কাছে মিথ্যা বলেছিস কেন তুই? তুই যদি আমার স্ত্রীর কাছে গিয়ে ক্ষমা না চাস আর যদি না বলিস তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই তাহলে তোকে জ্যন্ত পুঁতে রেখে যাবো। মিথ্যে কথা বলার ফল তোকে বুঝিয়ে দিবো..!”
কাশেম এগিয়ে এসে মেয়ের এই হাল দেখে মেয়ের হাত ইরাদের থেকে এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে ইরাদের গায়ে হাত তুলতে গেলে ইরাদ খপ করে তার হাত ধরে লালিত চোখে তাকিয়ে বললো,
” মেয়েকে সাবধান করে দিবেন আমার পরিবারের দিকে যেনো হাত না বাড়ায়। এবার তো শুধু পুড়িয়েছি পরের বার পুরোটা ছাই করে দিয়ে যাবো কথাটা আপনার মেয়ের মাথায় ঢুকিয়ে দিবেন…!”,
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৮
বলেই ইরাদ হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। এদিকে মেয়ের চিৎকার শুনে কাবিশার মা, তার নানু দৌড়ে এসে দেখে তার মেয়ের হাত পুড়ে ফোঁসকা পড়ে গেছে একদম আর কাবিশা শুধু চিৎকার করছে আর ছটফটাচ্ছে..!”
