Home তুমি এলে বসন্ত নামে তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২০

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২০

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২০
রিমঝিম বৃষ্টি

চৌধুরী প্যালেস———–
” সবকিছুর একটা ধৈর্য থাকে মা..! ইরাদ কাশেমের বাড়িতে গিয়ে কী করেছে শুনলে তো সব আর এদিকে ওর মার নেই খবর এত জ্বালা তো ভালো লাগে না..!”
ইমদাদুল এর কথা শুনে আয়েশা চৌধুরী মনটা খারাপ করে বললো,
” তুই রইছিস বউ লইয়া আর আমি আমার গয়নার বাক্স নিয়ে ভাবতাছি। ওইটা ছাড়া আমার আর সম্পদ বলতে রইলো টা কী। গরীব সবাইরে কইতাম এহন নিজেই গরীব হয়ে যাচ্ছি বোধহয়..!”
পাশ থেকে সুমানা আয়েশার কথা কানে না তুলে ইমদাদুলকে বললো,
” ভাইজান আপনি না হয় একবার ইরাদকেই বলুন যদি বড় ভাবীর খবর জানে সে কোথায় আছে..?”
ইমদাদুল কিছুটা শক্ত চোখ করে কঠোর ভাবে জানালো,

” তা তো আমি কালই যাবো। ওর সাহস এত বাড়ছে কেমনে যে অন্যের বাড়ি গিয়ে মাস্তানগিরি করে..! ”
ইভান তাদের পাশেই বসে ছিলো, পাশ থেকে টুক করে উঠে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই ইমদাদুল বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,
” আর এই হয়েছে আরেক ছেলে, বলেছি ব্যবসার হাল ভালো না একটু হাত লাগাও আমাদের সাথে। না উনি আবার বন্ধুত্বের সাথে আড্ডা না দিলে বাঁচেন না..! ”
ইভান পিছন ঘুরে বিরক্ত স্বরে বললো,
” উফফ! বাবা আমি তো বলেছি আমার ব্যবসা ভালো লাগে না, মাথাতেও ঢুকে না এসব, আমি ভার্সিটির প্রফেসর হবো দেখো একদিন তারপর না হয় গালি দিও..!”
” হে তুমি বিশ্বের ভন্ড প্রফেসর হবে তখন এই দুনিয়ায় আর পড়াশোনা বলে কিছু থাকবে না..!”
তারেক চৌধুরী দু’জনের ঝগড়া দেখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। ইভান ওপরে গিয়ে সোজা সাবাহ্’র রুমে ঢুকলো, ইভান জানে এইসময় সাবাহ্ ঘর খুলেই পড়াশোনা করে । কিন্তু সাবাহ্’কে আজ রুমে পেলো না, ইভান বেলকনিতে পা রাখতেই দেখতে পেলো সাবাহ্ কে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে মৃদু বাতাসে তার চুলগুলো যেনো উড়ছে। বাইরের বাতাস আজ ভীষণ ঠান্ডা এ যেনো শরীর আর মন দুটোই ঠান্ডা করার মতো। ইভান এক পা এক পা করে চুপিচুপি এগোতেই সাবাহ্’র কথায় থেমে গেলো,

” ইভান ভাই হঠাৎ যে আমার ঘরে এলো..?”
ইভান নড়েচড়ে সাবাহ্’র পাশে গিয়ে দাঁড় হলো রেলিং ধরে বললো,
” কাহিনী কী তোর আজ সকাল থেকে তোকে চোখে পড়ে নি, এত কি করিস রুমের মধ্যে তুই..?”
সাবাহ্ উত্তর দিলো না বেলকনি থেকে ভেতরে এসে আলমারি থেকে চুইংগাম এর বক্স বের করে বেডের ওপর রেখে সাবাহ্ পড়ার টেবিলের কাছে এগিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। ইভান তা দেখে এক লাফে বেডের ওপর বসে একটা চুইংগাম মুখে দিয়ে বললো,
” এইজন্যই তো তোকে এত ভালে লাগে। দেখ তুই বুঝে গেলি কত সহজে আমার মুড অফ..!”
” কেনো আপনার চাদিয়া বুঝলো না বুঝি..?”
ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর বললো,
” আর ইউ জেইলাস্ সিস..?”
সাবাহ্ রাগী চোখে পিছন ঘুরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাজির হলো আরেক জন।
” কী রে তোরা কী গল্প করিস..? “,
বলতে বলতে ভেতরে ঢুকলো তমা। ইভানের পাশে বসে একটা চুইংগাম নিলো আর বললো,
” বাড়িতে কী চলছে বল তো। এত ঝামেলা আর ভালো লাগে না..! ”
ইভান সটান হয়ে শুইয়ে বললো,

” সেটা আমিও ভাবছি। কিন্তু আমার কথা হলো মানুষ কতটা ছ্যাঁচড়া হলে একটা বিবাহিত ছেলের জন্য পাগল হয়। ওই কটকটি কাবিশার জন্যই এত ঝামেলা হচ্ছে আবার দেখ ভাইয়া আর ভাবী এই নিয়ে কিছু বাঁধিয়েছে নাকি কে জানে.? ”
সাবাহ্ তমার দিকে তাকিয়ে বললো,
” আপু চলো আমরা একদিন ভাবীর বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসি..!”
” হু চলো আপু আমরা যায় ঘুরে আসি, বাড়ির এই ঝামেলা আর দেখতে মন চাচ্ছে না..!”
দু’জনের কথা শুনপ তমা কিছুটা ভেবে বললো,
” আচ্ছা তাহলে আমরা তিনজন পরশু দিন যায় সেদিন সাদিয়া চলে যাবে কিন্তু বাড়িতে কিছু বলবি না। সবাইকে বলবো নানুর বাসায় যাচ্ছি নয়তো চাচ্চু জানলে রাগ করতে পারে.!”
তমার কথা শুনে দু’জনেই রাজী হলো।

রাত বাজে ১১ টা ইরাদ ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড় হয়েছে কিন্তু নক করার সাহস পাচ্ছে না ফারিশা যদি বকা দেয়। আজ তার হাতে-গুণে একদম একশত টাকা শেষ হয়ে গেছে আর রইলো উনিশশো টাকা এখনো আঠারো দিন তাকে পার করতে হবে তবুও আসতে গিয়ে তাকে কতটা পথ হাটতেও হয়েছে আজ যা তার অভ্যাসের বাইরে যেনো । কিন্তু কীভাবে সে চলবে এই ক’টা দিন জানে না তবে তাকে এই টাস্ক পূরণ করতেই হবে। ভীষণ ক্লান্ত তার ওপর রাতের খাওয়া হয়নি। দরজায় নক করতেই ওপাশ থেকে খুলে দিলো ফারিশা । ইরাদ চোরাচোখে এক নজর ফারিশাকে থমথমে মুখ খানা দেখে ভেতরে যেতে লাগলেই তার গম্ভীর কণ্ঠ শুনে থেমে গেলো।
” কোথায় ছিলেন এতক্ষণ..? ”
” উমম! একটু বাড়ির দিকে গেছিলাম কাজ ছিলো..!”
ফারিশা দরজা আটকে ইরাদের সামনে দাঁড়ালো। ইরাদ ফারিশার হাতের দিকে তাকিয়ে বললো,
” হাতের ব্যাথা কমেছে কি একটু..?”
” তা আপনাকে ভাবতে হবে না। নেক্সট টাইম রাত ৯ টার মধ্যে বাড়ি আসবেন। একটা ভদ্রঘরের ছেলেরা কখনো এত রাত করে বাড়ি ফেরে না তারপর যদি অফিস থাকতো তাহলে এক কথা ছিলো..!”
ইরাদ মাথা চুলকে বললো,
” ইয়াশ কোথায় খেয়েছে ও..!”
” অবশ্যই খেয়ে ঘুম দিচ্ছে ও। কিন্তু আপনার আজ রাতে আর খাবার নেই। খিচুড়ি ভাত বুঝেনই তো নষ্ট হয়ে গেছে..! ”

ইরাদ মনে মনে কিছুটা হাসফাস করে উঠলেও নিজেকে সামলে বলে উঠলো,
” আচ্ছা সমস্যা নেই বিস্কুট বা চিপস খেয়ে নিবো নে আমি.!”,
বলেই ইরাদ রুমে চলে গেলো। ফারিশা এক নজর সেদিকে তাকিয়ে দেখলো। আজ সে সকাল সকাল রান্না করার ফলে আর চাউল একদমই কম দামের হওয়ায় বেশি রাত অব্দি ভাত ভালো থাকে না তা নষ্ট হয়ে যায়। ইরাশ ফ্রেশ হতে গেলে সেই সুযোগে ফারিশা রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় দুটো শুকনো মরিচ আর পেঁয়াজ হালকা করে ভেঁজে একটা প্লেটে রাখলো তারপর দুটো একসাথে চটকে সাথে লবণ আর সরিষার তেল নিয়ে মাখিয়ে খিচুড়ি ভাত টা মাখালো। কারোর আওয়াজ পেতেই ফারিশা রান্না ঘর থেকে এক নজর ইরাদকে দেখলো বিস্কুট নিয়ে তার ঘরে ঢুকতে। ফারিশা প্লেট টা নিয়ে সোজা ইরাদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড় হয়ে বললো,

” আসবো ভেতরে..?”
ইরাদ সবেমাত্র একটা বিস্কুট মুখে নিয়েছিলো ফারিশার ডাকে কিছুটা গলায় আটকে যেতে যেতে যেনো বেঁচে গেলো তাড়া গলায় বললো,
” হুম..!”
ফারিশা ভেতরে গিয়ে ইরাদের ওপর সাইডে কিছুটা দূরত্ব রেখে বসে পড়লো। প্লেট টা সামনে রেখে খেতে শুরু করলো। ইরাদ আঁড়চোখে এক নজর ফারিশার খাবার দেখে বললো,
” তুমি না বললে খিচুড়ি নষ্ট হয়ে গেছে..?”
” নষ্ট খিচুড়ি মাখিয়ে খেতে অনেক টেস্ট তা আপনাদের মতো বড়লোকরা বুঝবেন কেমন। আপনারা তো সামান্য ভাত নষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও ফেলে দেন। আমার রুমের লাইট বন্ধ ইয়াশের জন্য তাই এই রুমে এসেছি। আপনি আপনার কাজ করুন.! ”
সামান্য একটা কথা জিজ্ঞেস করায় এতগুলো কথা শুনিয়ে দিলো ইরাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে শুধু এক নজর দেখলো ফারিশাকে তারপর ফের বিস্কুট খেতে শুরু করলো। একটা পুরুষ মানুষের যে সামান্য বিস্কুট আর পানিতে পেট ভরে না তা ফারিশা একটু হলেও বুঝতে পেরেছে। এই দিয়ে দুই প্যাকেট বিস্কুট খেয়েছে আরেকটা খুলতে গেলেই ফারিশা থমথমে গলায় বললো,

” রেখে দিন ওটা..!”
” হুমম..!”
ইরাদ বুঝতে পারলো না। ফারিশা কিছুটা এগিয়ে এসে ভাতের লোকমা বানিয়ে ইরাদের মুখের সামনে ধরে বললো,
” হা করুন..!”
ইরাদের যেনো নি:শ্বাস আটকে গেলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। স্থির হয়ে লোকমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,
” খাওয়া যাবে কী..?”
ফারিশা স্থির দৃষ্টিতে তাকাতেই ইরাদ আর প্রশ্ন করলো না হা করে মুখে পুড়ে নিলো তারপর আস্তে ধীরে চিবোতে লাগলে তার কাছে বেশ মজার লাগলো ঝাল ঝাল আবার পেঁয়াজের টেস্ট সাথে খিচুড়ি। ইরাদ ঠোঁট কিছুটা প্রশস্ত করে বললো,

” তুমি এভাবে খাবার বানাতে কয় থেকে শিখেছো বেশ টেস্ট তো..?”
ইরাদের শুনে ফারিশা আড়ালে মুচকি হেসে উঠলো তারপর স্বাভাবিক গলায় বললো,
” সময় কার কখন অবস্থা পরিবর্তন করে কেউ জানে না বুঝলেন তো তাই সবকিছুরই অভ্যস্ত করে রাখতে হয়। এই ধরুন আজ ভালো ঘরে, ভালো বিছানায় শুইয়ে আছেন, আরাম করছেন, বন্ধু আছে, পরিবার আছে কিন্তু ওপরআলার হুকুম এলে সব ছেড়ে যেতে হবে সেই মাটির ঘরে যেখানে কেউ সাথে থাকবে না, আর না থাকবে এই বিছানা, বন্ধু, পরিবার। সাথে যাবে শুধু নামাজ, আপনার ইমান। শুনুন, সবর্দা সৎ থাকবেন আপনি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবেন না, আর না বিচার করে মানুষকে অপবাদ দিবেন না । ”
ইরাদ ফের আরেক লোকমা নিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” বুঝতে পেরেছি ফারিশা। এক ভুলে যা পোহাচ্ছে দ্বিতীয় বার আর সেই ভুল করার প্রশ্নই আসে না..! কিন্তু কাবিশার সাথে আমা…
বাকি কথা বলার আগেই ফারিশা ইরাদের কথা থামিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” নামাজ পড়েন আপনি..?”
ইরাদ চোখ পিটপিট করে আমতা আমতা করে বললো,
” হুম কিন্তু মাঝে মাঝে বাদ যায়..! ”
খাওয়া শেষ হতেই ফারিশা বেড থেকে উঠতে উঠতে বললো,
” ভোরে ডেকে দিবো নামাজ পড়বেন নয়তো সকালের খাওয়ার দিবো না আপনাকে..?”,
বলেই চলে গেলো রুম থেকে ইরাদ ড্যাবডাব কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে থেকে সূক্ষ্ম হেসে উঠলো। বউয়ের শাসন তার কাছে বেশ লাগছে যেনো। ইরাদ দ্রুত রুম আটকে ঘুমিয়ে পড়লো।

মাঝ রাত তখন ঘড়ির কাঁটা যেনো ৩ টা ছুঁই ছুঁই। ইরাদের ঘুম ভেঙে হঠাৎ মশার কামড়ে । চোখ খুলতেই দেখতে পেলো ফ্যান অফ, বুঝলো ইলেক্ট্রিসিটি নেই আচ্ছা এই বাড়িতে কী আইপিএস নেই। ইরাদ ঘেমে যেনো একাকার তবুও চোখ বুজলো ঘুমানোর জন্য কিন্তু না গরমে আর মশার কামড়ে তার আর ঘুম এলো না। বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লো, বেড থেকে নেমে বেলকনিতে যেতেই যেনো হালকা বাতাস পেলো, চাঁদের আলোয় বাইরে ফুটফুটে করছে যেনো । কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্ততে পাশ ঘুরতেই দেখতে পেলো ফারিশার রুমের বেলকনি চট করে তার মাথায় এলো আরেক ফন্দি। নিজের বেলকনি টপকে ফারিশার বেলকনিতে নি:শব্দে চলে গেলো। রুমের দরজা খোলা হওয়ায় টুক করে ঢুকলো ভেতরে। বাইরের চাঁদের আলোর জন্য রুমের দরজা সরাতেই কিছুটা ঝাপসা চোখে দেখা যাচ্ছে সব যেনো, সামনে এগোতেই দেখতে পেলো মশারি টানানো আর তার মধ্যেই ইয়াশ গরমে এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি করছে একটু পর পর আর পাশেই ফারিশা বেহুশে ঘুম পারছে ।

ইরাদ আশেপাশে নজর বুলাতেই দেখলো বেডসাইডে হাতপাখা রাখা। এগিয়ে গিয়ে পাখা টা হাতে নিয়ে এগিয়ে ছেলেকে বাতাস করতেই ইয়াশ যেনো স্থির হলো ক্ষনিকের জন্য। ছেলের ঘুম দেখে ইরাদ মুচকি হেসে উঠলো। ছেলেকে স্থির থাকতে দেখে পাশ ঘুরে গিয়ে ফারিশার পাশেই বেডের সাথে হেলান দিয়ে ফারিশার মুখোমুখি হয়ে বসলো। মশারির জন্য ঝাপসা দেখাচ্ছে তার মুখখানা। ক্ষত হাতখানা এক নজর দেখে কিছু নরম চোখে তাকালো। ইরাদের ভাবনার ব্যাঘাত ঘটলো মশার কামড় খেয়ে, নড়ে উঠলো আশেপাশে তাকাতেই বিরক্ত হলো মশা জ্বালানোর সময় পেলো না। ইরাদ ফারিশার পাশেই বেডের ওপর থুতনি রেখে ফারিশার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
ফারিশার মুখ খানা দেখে মৃদু হেসে উঠলো ভেসে উঠলো যেনো সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো যখন সে অর্নাস পড়াকালীন ফারিশাকে প্রথম দেখেছিলো তখন ফারিশা সবেমাত্র এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলো। ইরাদ তাকে প্রথম দেখেছিলো তার বাড়ির সামনের কলেজে তাকে যাওয়ার সময় , ফারিশার সেই কলেজেই সীট পড়েছিলো। ইরাদের সেদিনের কথা মনে পড়তেই মৃদু হেসে উঠলো, ফারিশার ঘুম মুখ দেখে অজান্তেই গেয়ে উঠলো,

” দু’চোখ ভরে যতই দেখি তোমার হাসিমুখ..
মনে পড়ে আমার প্রেমের হারিয়ে যাওয়া. সুখ
কত স্মৃতি মনে.., আসে ক্ষণে ক্ষণে..
ফিরে. পাই তোমার মাঝে.. তাকেই প্রতিদিন
বসে বসে ভাবি, আমি সারাদিন
কি করে মেটাবো, তোমার এই ঋণ..! ”
ফারিশার ভ্রু কুঁচকানো দেখে ঘুমের ঘোরেই তা দেখে ইরাদ সুন্দর করে চুপটি করে সোজা হয়ে বসে তাকে বাতাস করতে লাগলো, নিজের চোখের ঘুম তো উড়ে গেছেই সাথে মশারির কামড় খেয়ে সে যেনো বিরক্ত হয়ে উঠলো। কিছুটা ঠোঁট উল্টে বাতাস করতে করতে ফিসফিস করে বললো,
” ডেয়ার এ্যাংরি বার্ড, আর কত রাগ করবা? তোমার রাগের মেয়াদ কিন্তু খুব স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত এখন.! ”
ইরাদ কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে টুপ করে মশারির এক সাইড তুলে ফারিশার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
” সরি..!”
ভোর অব্দি বাতাস করে করে কারেন্ট আসতেই সে বেলকনি টপকে নিজের রুমে এসে সবেমাত্রই ঘুমিয়েছিলো আর তার আধাঘন্টা বাদেই ফজরের আযান পড়লে ফারিশা তাকে ডেকে তুলে নামাজের জন্য। ইরাদ ঘুমঘুম চোখে দ্রুত উঠে নামাজ পড়ে তারপর ঘুমালো ফের।

” কী রে তুই যাবি না তুবার বাসায় ওর তো পরশু বিয়ে.?”
সকাল সকাল ফারিশা রান্না করছে আর তখনি এলো জিসানের ফোন। ফারিশা সোজাসাপটা উত্তর দিলো,
” না রে তোরা যা আমি পারলে বিয়ের দিন যাবো.?”
” এটা কেমন কথা মেয়েটা এত করে বললো যাবি না তুই.!”
জিসানের কথা শুনে ফারিশা দম ফেলে বললো,
” তুই তো জানিসই আমি কোথাও যায় না। তোরা যা আমি বিয়ের দিনই যাবো সত্যি বলছি আর শোন, ক্যাফে আজ আর কাল আমি দেখে রাখবো চিন্তা করিস না..?”
ওপাশ থেকে জিসান বললো,
” শোন ক্যাফে না খুললেও চলবে তোর হাতের ওপর প্রেশার দিস না। আমি আর জাহিদ তাহলে যাচ্ছি তুই চলে আছিস কিন্তু পরশু দিন সকাল সকাল..!”,
দু’জনে আর কিছু কথা বলে রেখে দিলো। গরম গরম রুটি আর আলু-বেগুন ভাজি নিয়ে রুমে যেতে যেতে পাশের রুম থেকে ইরাদকে ডাকতেই ইরাদ তাদের রুমে এসে বসলো। ইরাদকে খাবার দিয়ে বললো,

” আপনারা দু’জন বাসায় থাকবেন আজ বের হবেন না আমি একাই ক্যাফেতে যাবো..!”
ইরাদ উরুর ওপর কনুই ভর করে থুতনিতে আঙ্গুল দেখে তখন খাবার দেখতে ব্যস্ত। তা দেখে ফারিশা বললো,
” কী হয়েছে খাবেন না নাকি.?”
” হুম খাবো তো..!”
ইয়াশ পাশ থেকে নিচের ছোট্ট প্লেট মায়ের দিকে এগিয়ে বললো,
” আম্মু বেগুন ফেলো দাও..! ”
ফারিশা জানে সে বেগুন খায় না আস্তে ধীরে বেছে বেছে ছেলেকে খাইয়ে দিলো। তারপর উঠে গিয়ে দুপুরের রান্না করতে গেলো। ইরাদও চুপচাপ না চাইলেও খেয়ে উঠলো। ফোন আসতেই ইয়াশ কে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তিহান বললো,
” ক্যাপ্টেন ভুলে গেলেন এভাবে একটাবার ফোনও দিলেন না..? ”
” ইশশ এতবছর পরে বউ-বাচ্চার সাথে থাজার সুযো পেয়েছি হাতছাড়া করি কি করে..!”
তিহান স্বাভাবিক গলায় বললো,
” এখান থেকে তো নতুন ইউনিফর্ম দিয়েছে আপনার টা আমি নিয়ে এসেছি বাড়ির ঠিকানা দিন পৌঁছে দিচ্ছি..! ”
ইরাদ রেলিঙের ওপর ঝুঁকে এসে বললো,

” আমি তোকে অন্য বাসার ঠিকানা দিচ্ছি সেখানে এসে দারোয়ান এর কাছে দিয়ে যাস..!”
” দেখা করবেন না একটু, কতদিন দেখি না বন্ধুর মুখটা..? ”
” না তোদের সাথে আপাতত ব্রেকাপ যা রাখ ফোন.!”,
বলেই ফোন কেটে দিলো পাশ ঘুরে তাকাতেই চোখে পড়লো মেইন গেইটের দিকে তার বাবাকে আসছে দেখলো ।
ইমদাদুল সবেমাত্র ভেতরে আসতে গিয়েত তারও চোখে পড়লো ইরাদকে। ভেতরে আর না গিয়ে এগিয়ে এলো বাগানের দিকে। মাথা উঁচু করে কড়া গলায় বললো,
” নিচে এসো কথা আছে..?”
ইরাদ রেলিঙের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে এসে বললো,
” এখানেই বলো আগে শুনি কী চাও..!”
” তুমি কাবিশার সাথে ওই কাজ করেছো কেন?”
ইরাদ ভারী শ্বাস ছেড়ে বললো,
” অন্য টপিক নিয়ে কথা বলতে পারো ওটা বাদে..!”
ইমদাদুল বিরক্ত গলায় এবার সোজা কথায় এলো,
” তোমার মা কোথায় ইরাদ। ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না, তার মায়ের বাড়িতেও নেই আর না ফুফুর বাড়ি, কোথায় গেছে আমি জানি তুমি জানো তাই বলো দ্রুত..? ”
ইরাদ বাবার কথায় উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো তারপর কিছুটা গলায় ঝেড়ে জোরে করে বলে উঠলো,

” হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো..! মিস্টার চৌধুরী সাহেবের বউ গায়েব। তিনি তাহলে গেলেন কোথায়? কোথায়…?
সেই শোকে তার বর পাগল হয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে আবার রাগ করে বিদেশে না চলে যায়?
তা জানতে চোখ রাখুন আমাদের বিচ্ছুমার্কা চ্যানেলে এবং সাবসক্রাইব করে পাশে থাকুন.!”
ইয়াশও মাথা উঁচু করে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইমদাদুলকে দেখে সেইম করে বলে উঠলো,
” সাপ-টাইপ কলে পাসে তাকুন..!”
ইয়াশের কথা শুনে ইরাদ ইয়াশকে কোলে তুলে তার বাবাকে বললো,
” কষ্ট পেও না বাবা একটা হারালে আরেকটা এনে দিবে দীদা..!”
” মশকরা করার জায়গা পাও না তুমি। বাবার সাথে ফাজলামো করো, মাকে দ্রুত বলো বাড়ি ফিরতে নয়তো তোমার দীদাকে ফারিশার বাড়িতে জীবনেও আসতে দিবো না কিন্তু..? ”
ইরাদ শক্ত গলায় বললো,
” থ্রেট আমিও দিতে পারি বাবা। তোমাকে পনেরো দিনের সময় দিলাম এর মধ্যে যদি দীদাকে ফারিশার কাছে এসে ক্ষমা না চাওয়াতে পারো তাহলে মাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিবো তখন কী হবে ভেবে দেখুন। হায়! হায়! ভেবে দেখুন.. চৌধুরী সাহেব কী করবেন..! “,
বলেই ভেতরে যেতে গিয়ে আবার পিছু ফিরে বললো,

” এসে খেয়ে যেতে পারেন আমার বউ অনেক সুন্দর করে মজার মজরা রান্না করে..!”
ইমদাদুল রাগে পিছন ঘুরে চলে যেতে যেতে বললো,
” লাগবে না তুমিই খাও, আমি আমার বউকে একাই খুঁজতে পারবো..!”,
বলেই চলে যাচ্ছিলো গেইট পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই বাচ্চার গলা পেয়ে থেমে গেলো। পিছন ঘুরে দেখলো ইয়াশকে। ইয়াশ হাসিমুখে বললো,
” দাদু খেয়ে যাও..!”
ইমদাদুল থেমে গেলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরাদ ইয়াশকে আঁকড়ে ধরে তার বাবাকে নরম গলায় বললো,
” আসতে পারো ভেতরে..?”
একটা নিষ্পাপ শিশুর মায়া বোধহয় অন্যরকম হয় যা ইমদাদুলের মতো শক্ত মনকেও নাড়িয়ে তুললো। ইয়াশের কথা শুনে ফেরত এসে ওপরে উঠে এলো। দরজা খুলতেই ফারিশা কিছুটা অবাক হয়ে দ্রুত ইমদাদুল কে দেখে সালাম দিয়ে ভেতরে বসতে দিলো। ফারিশা ইরাদের দিকে এক নজর তাকিয়ে ইমদাদুল কে বললো,

” আপনি বসুন আমি আসছি..!”,
বলেই রান্না ঘরে ছুটলো। ইয়াশ এগিয়ে এসে ইমদাদুল এর পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললো,
” তুমি মিলাদকে বোকা দিও না মিলাদ ভালো..!”
ইরাদ পাশেই বসে মুচকি হেসে উঠলো আর বললো,
” আহ্ কি গুণ আমাদের ছেলের মাঝে আছে দেখেছো তো..!”
” হে আর আমার ছেলের মাঝে কোনো গুণই নেই.! ”
ইরাদ সূক্ষ্ম হাসলো শুধু। ফারিশা এগিয়ে এসে বিছানায় রুটি, ভাজি আর ডিম রাখতেই ইমদাদুল এক নজর সেদিকে তাকিয়ে খেতে লাগলো। ইমদাদুল খেতে খেতে কিছুটা নরম গলায় ফারিশাকে বললো,
” ভালোই তো রান্না জানো একদম আমার মায়ের হাতের মতো রান্না..! “,
এতটুকু শুনেই ফারিশার মুখে হাসি ফুটলো কিছুটা শশুরের কাছে প্রথম বার নিজের প্রশংসা শুনে মনটা যেনো উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ইমদাদুল খাওয়া শেষ করতেই ইয়াশ পাশ ঘুরে বললো,

” তুমি এবাল আমাল সাথে খেলবে..?”
ইমদাদুল দু’চোখ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে মৃদু হেসে বললো,
” আজ না দাদুভাই অন্য দিন খেলবো..! ”
ইমদাদুল ইরাদের সাথে কিছু কথা বলেই চলে যেতেই ফারিশা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো বেলা ১২ টা বাজতে চললো। দ্রুত গোসল সেরে রেডি হয়ে রুম থেকে বের হতেই ইরাদ এগিয়ে এসে ফারিশাকে দেখতে আসলো। ইরাদ ফারিশাকে দেখলো তার দেওয়া বোরকা পড়তে তা দেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
” মাশাআল্লাহ এখন থেকে এটা পরেই বের হবেন..!”
ফারিশা কথা বললো না সোজা ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বললো,

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৯

” শোনো জ্বালিয়ো না শান্ত হয়ে থাকবে..!”
দরজা খুলে বের হতেই ইরাদ চট করে বললো,
” আমিও ক্যাফেতে যাবো, কফি বানাতে পারি আমি..?”
ফারিশা পিছন ঘুরে স্থির গলায় বললো,
” আসতে পারেন তবে নিজের টাকা খরচ করে আসবেন বুঝলেন..?”,
বলেই চলে গেলো।

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২১