এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২০
ফাতেমা তুজ জোহরা
সেখানে রুশভিয়ান স্পষ্ট বলছে আমারে দু*ই কো*টি টাকা দিয়া মা*ই*য়া লইয়া যান রত্নকুঞ্জ থেইকা …….
সন্ধ্যা সাতটা,,ইনান কেবলই গোসল করে বারান্দায় বসে আছে সোফায় । ভেজা চুল গুলো পিঠে ছড়িয়ে রাখা আছে। সে চিন্তা ভাবনায় বিভোর কি করলে এই ন*র*ক থেকে মু*ক্তি পাবে এমন সময় ইনান পিছনে পায়ের শব্দ পেতেই মনে করলো হয়তো কাজের মেয়েটা এসেছে তাই একভাবে বসে রইলো। কিন্তু তার নাসারন্ধ্র হলো পারফিউমের ঘ্রান। আর এই ঘ্রান ইতালির দামী পারফিউম ছাড়া অন্য পারফিউম না। তার আব্বু এই পারফিউম ব্যবহার করতো। ইনান কপাল কুচকে গেল এই পারফিউম তো রুশভিয়ান ও ব্যবহার করে না তাহলে কে আসতে পারে ঘরে। ইনান ঝট করে সোফা থেকে উঠতে ডান হাতে টান পড়লো তার। ইনান হকচকিয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই আবিষ্কার করলো একজন অপরিচিত লোক কে।লোকটা পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট।চুল গুলো আন্ডার কাট দেওয়া। মুখে বি*কৃ*ত পূর্ন হাসি বিদ্যমান। ইনান সাথে সাথে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে শক্ত করে রেলিঙ টাকে চেপে ধরে তেজী কন্ঠে বলল, ” কে আপনি?
লোকটা হেলেদুলে এসে ইনানের জায়গা বসে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইনানের পুরো কায়াটাকে মাপতে লাগলো। ইনান লোকটার এমন কু*রু*চি পূর্ন দৃষ্টি দেখে ওড়নাটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে শরীরের সাথে জড়িয়ে বলল,” কে আপনি?
লোকটা তার দাঁত বের করে একগাল হেঁসে বলল,” আমি ডেভিড, আর আজ থেকে তোমার শ*রী*রে*র একমাত্র মালিক? ” ডেভিড কথা গুলো বলে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলো। ইনান ডেভিডের কথার মানে ধরতে পারলো না, সে অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ডেভিডের দিকে।
ডেভিড এগিয়ে গেল ইনানের দিকে পকেট থেকে বের করলো কিছু গোলাপের পাপড়ি যা হাতে মুঠোয় পুরে নিয়ে ইনানের মাথায় ছড়িয়ে দেয়, পাপড়ি গুলো ইনানের কেশরাজি স্পর্শ করে নিচে গড়িয়ে পড়লো । ইনান ডেভিডের থেকে বাঁচতে আরো দেয়ালের সাথে সিটিয়ে লেগে গেল সে। ডেভিড এগিয়ে গেল ইনানের দিকে, ইনান ভ*য়ে বারান্দায় থেকে দরজার দিকে বারবার তাকাচ্ছে রুশভিয়ান কে দেখার জন্য। ইনানের এমন উদ্বিগ্নতা দেখে ডেভিড ফিচেল হেঁসে বলল,” এত দরজার দিকে দেখে লাভ নাই সুন্দরী তোমার বর তোমাকে আমার কাছে দুই কো*টি টাকাতে বি*ক্রি করে দিয়েছে ” ডেভিড কথাটা বলেই তার দুটো আঙ্গুল উঁচিয়ে ইনান কে দেখলো।
ইনানের অবস্থা কা*হি*ল, ঠোঁট জোড়া তিরতির কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ, কপাল বেয়ে স্বেদের ধারা অর্নগল প্রবাহিত হচ্ছে সে ডেভিডের কথা শুনে তা নাকোচ করে আত্নবিশ্বাসের সাথে বলল,” উনি আমাকে বি*ক্রি করতে পারেন না, হয়তো উনি আমার উপরে অ*ত্যা*চা*র করতে পারে কিন্তু বি*ক্রি করবে না, এটা আমার বিশ্বা… ইনানের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই ডেভিড তার মুখোম চাল টা চেলে দিলো। একটা ভয়েস রের্কডর অন করতেই ইনানের পুরো দুনিয়া থমকে গেল, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল তার। এতক্ষণ যে মানুষটাকে নিয়ে এতটা বিশ্বাসের বুলি আওড়াছিলো সে মানুষটা তাকে খাদে ধা*ক্কা মে*রে ফেলে দিলো।
ডেভিড আবারো ভয়েসটা অন করলো সেখানে রুশভিয়ান স্পষ্ট বলছে আমারে দুই কোটি দিয়া মা*ই*য়া লইয়া যান রত্নকুঞ্জ থেইকা? ডেভিড বারং বার ভয়েসটা ইনানের কানের কাছে বাজাতে লাগলো । ইনান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না তাকে বি*ক্রি করে দেওয়া হয়েছে। কথাটা মনে মনে আওড়াতেই ইনানের চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এলো শ্বাস প্রশ্বাস দ্রু*ত চলতে লাগলো তার। একহাত দিয়ে শক্ত করে ওড়নাটাকে চেপে ধরলো ইনান মনে মধ্যে রুশভিয়ানের কথাটা বাজতে থাকলো। ইনান দুই হাত দিয়ে কান চেপে মেঝেতে বসে ডুকরে কেঁদে উঠল।
ডেভিড যেন সুযোগ পেয়ে গেল। মনে মনে তিয়াসা ধন্যবাদ জানাতে ভুললো না।তার জন্য এইরকম একটা সুন্দরী মেয়েকে ভো*গ করতে পারবে সে। ফোনটাকে সোফায় ছুড়ে ফেলে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে গেল ইনানের দিকে। আর ইনান তখন কান্না করতে ব্যাস্ত তার ধ্যান নেই ডেভিডের দিকে।
ডেভিড সম্পূর্ণ শার্ট ছু*ড়ে ফেলে ইনানের ওড়না ধ*রে এ*ক*টা**নে নি*জে*র কা*ছে নিয়ে নেয় । হকচকিয়ে গেল ইনান, কান্না করা চোখ গুলো বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো ডেভিডের দিকে। ডেভিড তখনও ওড়নাটাকে হাতের সাথে পেঁ*চাতে ব্যস্ত। ইনান ধ*ড়*ফ*ড়ি*য়ে উঠে একসাইডে দাঁড়িয়ে আকুতি স্বরে বলল,” আমাকে ছে*ড়ে দিন…. ইনানের কন্ঠে আকুতির সঙ্গে মিশে ছিলো নিঃশব্দ আ*ত*ঙ্ক। পিঠটা দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে, দুই হাত দিয়ে ওড়নার প্রান্ত শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে সে। চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়ছে অনবরত। অথচ সেগুলো মুছে ফেলার কথাটুকু তার মনে নেই।
ডেভিড তার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। ইনান তৎক্ষনাৎ একটু সাইডে সরে পিছিয়ে গিয়ে বলল,” দ*য়া করেন…. আমার কাছে আ*সবেন না। আমি আপনার কোন ক্ষ*তি করিনি। আমাকে যেতে দিন” তার কন্ঠ ক্রমশ কেঁপে উঠছিলো। প্রতিটি শব্দ যেন তার বুক চিঁ*ড়ে গভীর থেকে বেরিয়ে আসছে।
ডেভিডের ঠোঁটের কোনে আবারো সেই কু*ৎ*সি*ত হাসিটুকু ফুটে উঠলো। সে ঘাড়টাকে বাঁকিয়ে বলল,” এত ভ*য় কেন পাচ্ছ সুন্দরী, তোমার স্বা*মী*র থেকে আমি বেশি সু*খ দিতে পারবো এগিয়ে এসো আমার দিকে ” বলেই দুইহাত বাড়িয়ে ইনানের দিকে এগিয়ে গেল।
ইনান দ্রুত ডানদিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তার পথ আ*ট*কে দাঁড়াল লোকটা। ইনান হাত দিয়ে তাকে ঠেলে দূরে সরানোর চেষ্টা। কিন্তু ডেভিড নির্বিকার। বরং তার মুখের হাসিটা আরও প্রশস্ত হলো। ইনান এবার চি*ৎ*কা*র করে বলল,” স*রে দাঁড়ান?
ডেভিড তার উন্মুক্ত বুকে দুটো হাত বেঁধে বলল,” চি*ৎ*কা*র করলে ও লাভ হবে না। এখানে তোমার চি*ৎ*কা*র শোনার মতো কেউ নেই।
কথাটা শুনে ইনানের শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহুর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল। তার চোখ ছুটে গেল বারান্দার দিকে।
সত্যিই কি রুশভিয়ান তাকে একা ফেলে চলে গেল।কিছু মুহূর্তে আগেই যে মানুষটার ওপর নিজের শেষ আশাটুকু ধরে রেখেছিলো, তার সেই আশাটা ও এখন কাঁ*চে*র মতো বু*কে বিঁ*ধ*ছে। ইনান তবুও শেষ বারের মতো ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলল,” রুশভিয়ান কে ডাকুন আপনি সব মিথ্যা বলছেন ও আমার সাথে এরকম করবে না।
ডেভিড অ*ট্রহাসিতে ফেটে পড়লো। কোনমতে হাসিটুকু গিলে বলল,” ওকে ডাকছো?যে মানুষটা তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছে। ইনানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। মুখ দিয়ে অস্ফুটে স্বরে বেরিয়ে এলো, “না “। শব্দটা এতটাই ক্ষীন ছিলো যে বাতাস ছাড়া আর কেউ শুনলো কি না বোঝা গেল না। ডেভিড আবার এগিয়ে আসতেই ইনান হঠাৎ পাশকাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ডেভিড অত্যত চালাক আর ধু*র্ত। সে আবারো হাত বাড়িয়ে ইনানের পথ রোধ করলো। ইনান ম*রিয়া হয়ে উঠলো পা*লা*নোর জন্য । সে একবার দরজার দিকে তাকাল, তারপর বারান্দার অন্য প্রান্তে। কোথাও যেন পা*লা*নোর রাস্তা খুঁজছে তার চোখ। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন এত দ্রুত ছুটছে যেন মনে হচ্ছে পাঁজর ভে*দ করে বেরিয়ে আসবে। ইনানের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আর ডেভিডের মুখে বি*কৃ*ত হাসি মুহূর্তের জন্য ও মিলিয়ে গেল না।
ঠিক তখনই দূর থেকে ক্ষীন শব্দ ভেসে এলো। কেউ যেন ঘরের বাইরে হাঁটছে। ইনানের কান খাড়া হলো, ডেভিড ও এক মুহূর্তের জন্য পিছন ফিরে তাকালো। সেই সামান্য অসর্তকতার সুযোগ নিল ইনান।। একঝটকায় ডেভিড কে পাশকাটিয়ে দরজার দিকে ছুটে গেল।
ডেভিড পিছন থেকে চি*ৎ*কা*র করে বলল,” এই!
ইনান পিছন ফিরে তাকালো না। খালি পায়ে মেঝের উপরে ছু*টতে ছু*টতে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে এলো। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে, শ্বাস নিতে ক*ষ্ট হচ্ছে। তবুও থামার অবকাশ নেই। তার মাথায় একটাই চিন্তা তাকে এই ন*র*ক থেকে পালাতে হবে। পিছনে ডেভিডের পায়ের শব্দ ক্রমশ ভেসে আসছে। ইনান দৌ*ড়াতে দৌ*ড়াতে রত্নকুঞ্জের মুল ফটকের সামনে আসতেই থমকে দাঁড়াল ।বুকের ভেতর তখন ও দমকা বাতাসের মতো উঠানামা করছে। দৌড়ের, ক্লান্তি, ভ*য় আর অজানা আ*শ*ঙ্কা মিলে শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে। অথচ সামনে যা দেখলো তাতে ক্লান্তির কথা এক মুহূর্তেই জন্য মনে রইলো না। ফটকের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে রত্নকুঞ্জের লাঠিয়ালরা। কেউ উপুর হয়ে,কেউ কাত হয়ে পড়ে আছে। কারও হাত থেকে লাঠি কয়েক দূর হাত থেকে ছিঁ*ট*কে পড়ে আছে । নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে তাদের নি*থ*র পড়ে থাকা অবয়বগুলো দেখে ইনানের বুক কেঁ*পে উঠলো । এরা সবাই অ**জ্ঞা*ন, কিন্তু এমন হলো কিভাবে,কে করেছে। ইনান নিজের মনে কথাগুলো আওড়ে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ দুটো বি*স্ফো*রি*ত। ঠোঁট শুকিয়ে কাট হয়ে আছে, ভ*য়া*ব*হ পরিস্থিতির মধ্যে মনে হলো, অদৃশ্য কোন শক্তি যেন তার জন্য পা*লা*নো*র দরজাটা খুলে দিয়েছে।
পেছন থেকে ডেভিডের ছু*টে আসার শব্দ আসতেই ইনান সম্বিত ফিরে পায়। আর এক মুহুর্ত না, সে দ্রুত ফটকের পা বাড়াল। কিন্তু বাইরে বে*রিয়ে হঠাৎ থমকে গেল তার পা দুটো। ফটকের ডান পাশে অন্ধকারের মধ্যে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের পরনে শার্ট প্যান্ট। হাতে ধরা ব*ন্দু*ক গুলো রাতের ক্ষীন আলোতে ও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । ইনান তাদের পোশাক দেখে বুঝতে পারলো এগুলো ওই লোকটার লোক। কারন রত্নকুঞ্জের প্রতিটি লাঠিয়ালের পরনে শার্ট আর লুঙ্গি থাকে।
ইনানের বু*কের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল। আল্লাহ… শব্দটা ঠোঁট ছুঁয়ে বেরোলে ও কন্ঠে কোন আওয়াজ হলো না। সে সঙ্গে সঙ্গে ফটকের পাশে ছায়াঘেরা জায়গাটায় সরে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে গেল।
লোক গুলো তাকে দেখতে পায়নি। অন্ধকারেই যেন আজ তার বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনান নিজের নিঃশ্বাস টুকু আটকে রেখেছে। বুকের ভেতরে ধুকপুকানি এত জোরে বিট করছে যেন আশেপাশের লোকজন শুনতে পাবে। ইনান দেখলো একজন গার্ড ধীরস্বরে আরেকজনকে কিছু বলল। ইনান ভাবলো হয়তো তারা তাকে দেখে নিয়েছে সে আর দাঁড়াল না। পায়ের শব্দ ক্ষীন রেখে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তারপর ফটকের ছায়া পেরিয়ে অন্ধকার রাস্তার দিকে সরে গেল। একবার ও পেছনে তাকাল না। কয়েক পা যাওয়ার পর তার পা যেন আর শরীরের ভার বহন করতে চাইছিল না। তবুও থামল না ইনান। আজকে থেমে যাওয়া মানেই আবার আবার সেই ন*র*কে ফিরে যাওয়া।
কিয়তক্ষন বাদে,, ডেভিড ছুটে এসে হাঁ*পাতে হাঁ*পাতে তার গার্ডদের উদ্দেশ্য বলল,”কোথায় গেল মেয়েটা? ডেভিড চারদিকে তাকিয়ে অস্থির চোখে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল,” ওকে খুঁজে বের করো ! এখনই!এই রুপনগর থেকে যেন বের না হতে পারে। তার কন্ঠে তখন আগের সেই আত্নবিশ্বাস নেই। বরং শি*কা*র হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আ*ত*ঙ্ক স্পষ্ট । গার্ডেরা বুঝতে পারলো না কার কথা বলছে তবুও বসের হুকুমে ভ*য়ে ভ*য়ে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
কিন্তু ইনান তখন অনেকটা দূরে । অন্ধকারের আড়াল ধরে ছুটে চলেছে। তার পায়ের নিচে কখনো শুকনো পাতা মচমচ করে উঠছে, কখনো কাঁকড় বিঁধে পায়ের তালুতে ব্যা*থা দিচ্ছে। তবুও ব্যা**থা**র দিকে তার কোন খেয়াল নেই।
চোখের সামনে শুধু একটাই পথ রত্নকুঞ্জ থেকে দূরে যেতে হবে। অনেকদূরে। এমন দূরে, যেখানে রুশভিয়ানের ছায়াটুকু তাকে ছুঁতে না পারে। দৌ*ড়াতে দৌ*ড়াতে ইনানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। সে জানে না সামনে কোথায় যাবে, জানে না রাতটা আদো ভালোভাবে কাটবো তো। নাকি সামনে আরো অনেক বড় বি*প*দ অপেক্ষা করছে?
ইনান যখন মহা বি*প*দে তখন ঢাকার অভিজাত পাঁচতারা হোটেলের বিশাল কক্ষ তখন নিস্তব্ধ রাতের আবেশ। বাইরের শহরটা নিজের গতিতে ছুটে চললে ও ঘরের ভেতর যেন সময় থমকে আছে। বিছানার এক প্রান্তে বসে আছে রুশভিয়ান মির্জা। পরনে কালো শার্ট, শার্টের হাতা কুনই পর্যন্ত গোটানো। ফলে দৃঢ় পেশি গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিচে পরা সাদা লুঙ্গিটা তার গম্ভীর অবয়বের সঙ্গে অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করছে। চুলগুলো যথারীতি সযত্নে গোছানো। কপালের ওপর কয়েকটি চুল সামান্য নেমে এসেছে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।
তবে আজ তার মুখের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো মুখে কালো একটি মাস্ক। মাস্ক ঢাকা মুখের বেশিরভাগটাই আড়ালে হয়ে আছে। শুধু চোখ দুটো দৃশ্যমান। আর সেই চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
রুশভিয়ান বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। কালো চশমার উপর দিয়ে সরাসরি দরজার দিকে স্থির দৃষ্টি করছে, কখনো চোখের পাতা ধীরে নামিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সামলে নিলো। তারপর আবারো ও একই দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কারও অপেক্ষা করছে। অপেক্ষাটা দীর্ঘ হচ্ছে ।
তার ডান হাতের আঙ্গুল গুলো অন্যমনস্ক ভাবে বিছানার উপরে টোকা দিচ্ছে । একসময় টোকা দেওয়াটা থেমে গেল। রুশভিয়ান কব্জি উল্টে ঘড়ির দিকে তাকালো। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে , তারপর ও যার আসার কথা, সে আসছে না।
মাস্কের আড়ালে মুখের অভিব্যাক্তি বোঝার উপায় নেই। কিন্তু চোখে স্পষ্ট অধৈর্যতা আর বিরক্তিতে ভরা। আর তার গভীরে লুকিয়ে আছে এমন এক অস্থিরতা যা রুশভিয়ান নিজেও যেন কারও সামনে প্রকাশ করতে চায় না।
হঠাৎ দরজা মৃদু শব্দ হলো। থেমে গেল রুশভিয়ান আঙ্গুল গুলো । সে ধীরে ধীরে মাথা তুললো। চোখ দুটো সরু করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। দরজার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থাকার দরজার লক আপনাআপনি খুলে যেতেই ভেতরে প্রবেশ করলো তিয়াসা রহমান।
তার পরনে সবুজ রঙের সিল্কের শাড়ী , মসৃন কাপড়ের ভাঁজ গুলো শরীরের গড়নকে পরিমিত সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তুলছে। শাড়ির সঙ্গে মানানসই স্লি*ভলেস ব্লাউজ, কানে ছোট ঝুমকা। খোলা চুল গুলো কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। ঠোঁট মৃদু হাসি, আর এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে রুশভিয়ানের বিরুদ্ধে ভ*য়ং*ক*র ষ*ড়*য*ন্ত্র। তিয়াসা শাড়ীর আঁচলটা কোমড় থেকে খানিকটা সরিয়ে লাজুক হেঁসে বলল,” অনেক অপেক্ষা করাচ্ছি তাই না ” কথাটুকু বলে হেলেদুলে রুশভিয়ান সামনের সোফায় বসে গেল।
রুশভিয়ান চশমার আড়ালে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে। তিয়াসা ফিচেল হেঁসে বলল,” এখন বলো কোনটা করবে, আমার হাতে আবার বেশি সময় নেই এখুনি আবার থা*না*য় যেতে হবে?
রুশভিয়ান এবার একটু নড়েচড়ে বসে কপাল কুচকে বলল,” থা*না*য় ক্যান?
তিয়াসা ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি টেনে এগিয়ে এলো রুশভিয়ানের কাছে, তার দুইহাত ঠেকলো রুশভিয়ানের প্রশস্ত কাঁধে । সে একটু নিচু হতেই ও*ড়*না*টা মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। তিয়াসা মুলত রুশভিয়ানকে নিজের শ*রী*র দেখানোর জন্য যতরকমের প্রয়াস করছে। আর রুশভিয়ান শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, বাকি সব দেখার প্রযোজন বোধ করছে না সে।
তিয়াসা ও*ড়*না*টা উঠালো না একভাবে পড়ে রইলো সে তাকালো রুশভিয়ানের দিকে কিন্তু রুশভিয়ান কে তার দিকে তাকাতে না দেখে মেজাজ গ*র*ম হয়ে গেল তার। সঙ্গে সঙ্গে রুশভিয়ানের কাঁধ ছেড়ে শা*র্টের ক*লা*রটাকে শক্ত করে চেপে ধরে হি*স*হি*সি*য়ে বলল,” তোকে আমি ভালোবাসি আর তুই কিনা ওই মেয়েটাকে বিয়ে করলি, তোকে বলিনি আমি তোকে ছাড়া আমি বাঁ*চ*তে পারবো না,তবুও কেন এটা করলি বল।
রুশভিয়ান এতক্ষণে মুখ খুলে বললো, ” তো ম*ই*রা যা? তা হইলে আমারে এত অশান্তি দেখতে হইবো না।
সহসাই তিয়াসার হাত দুটো রুশভিয়ানের কলার থেকে সরে আসলো। চোখ দিয়ে বেরিয়ে পানি। যে মানুষটাকে কিশোরী বয়স থেকে মনের কোনে জায়গা করে দিয়েছে আজকে তার মুখে এইনো কথা শুনে তিয়াসা যেন ভেতর থেকে দু*ম*ড়ে মু*চ*ড়ে গেল। সে কান্নাভেজা চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইলো রুশভিয়ানের দিকে। রুশভিয়ান তার দৃষ্টি অগ্রহ্য করে শক্ত কন্ঠে বলল,” এত কান্না কইরা লাভ নাই, আমি অন্যের খা*ও*য়া মা*ল খা*য় না তাই আমার লগে ভালোবাসার কথা বলবি না ? চাচ্চুর মাইয়া বইলা তোরে কিছু করতে পারিনাই তাই বইলা ভাববি না আমি কিছু দেখিনি বা কিছু শুনিনি। এখন আসল কথা আসতেছি আমার কাগজ গুলান ফেরত দে ?
তিয়াসা চোখো পানি নিয়ে উন্মাদের মতো জোরে জোরে হাসতে লাগলো। তার হাসির শব্দে পুরো রুম ভ*য়ং*ক*র ভাবে কেঁপে উঠলো । তিয়াসা কিয়তক্ষন থেমে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আমায় বিয়ে করবে না হলে কালকে তোমার জে*লে যাওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না” কথাটুকু বলেই তিয়াসা শাড়ীর আঁচল তুলে নিয়ে সামনে হাঁটতে নিলেই রুশভিয়ান তাকে ডেকে উঠলো ৷ তিয়াসা পেছন ঘুরলো কিন্তু মুখে ফুটে উঠলো প্রশান্তির হাসি । অবশেষে তার প্লান কাজ করেছে। তিয়াসা পিছনে ঘুরতেই রুশভিয়ান শান্ত কন্ঠে বলল, ” আমি রাজি, কিন্তু আমারে সব কাগজ গুলো দেওয়া লাগবে?
তিয়াসা চোখ দুটো হেঁসে উঠলো সে হাত বাড়িয়ে রুশভিয়ানের হাত টাকে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,” আমি সবকাগজ তোমায় দিয়ে দেবো তুমি শুধু আমাকে তোমার করে নাও ” বলেই রুশভিয়ান কে জড়িয়ে ধরতে গেলে রুশভিয়ান হাত ছেড়ে পিছনে পিছিয়ে বলল,” আগে ওই মাইয়াটারে তা*লা*ক দিমু তারপর এই জড়াজড়ি করবি এখন সামনে থেইকা যায়। তিয়াসা কিছু বলল না। সে জানে রুশভিয়ান এই ভাবে সবার সাথে কথা বলে। তাই নিঃশব্দে রুশভিয়ান ডানহাতে উপরে চু*মু খেয়ে চলে গেল। আর পিছনে রয়ে গেল রুশভিয়ান ।
তিয়াসা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রুশভিয়ান দরজাটা টাশ করে লাগিয়ে দিয়ে পকেট থেকে বের করলো গ্যা*স*লাইট। রুশভিয়ান গ্যা*স লাইটের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,” আমার পুরো জীবন তার তরে লিখে দিয়াছি, এমনকি আমার শরীরের অঙ্গ গুলো ও” বলেই গ্যা*স লাইট জ্বা*লি*য়ে দেয়, দা*উ*দা*উ করে আ*গু*ন জ্বলে উঠলো রুশভিয়ান তার ডানহাতের উপরটা জ্ব*ল*ন্ত আ*গু*নে*র উপরে ধরে। আশ্চর্যজনক হলো রুশভিয়ানের যেন একটু ব্যা*থা লাগছে না মুখের ভাবভঙ্গি স্থির আর সাবলীল তার। রুশভিয়ান রা*গে ক*টম*ট করতে করতে বলল,” এই হাত টারে ও আমি তার তরে বি*লীন কইরাছি, সেখানে ওই খা*ন*কি*র বাচ্চা তার ন*ষ্টা মুখ দিয়া চু*মা খাইলো আমি তারে কিছুতেই ছাড়মু না। একবার কাগজ গুলান পায় তোর ঠোঁট জোড়া কে*টে আমি কু*ত্তা*রে খা*ও*য়া*মু।
রুশভিয়ানের হাতটা লা*ল টকটকে হয়ে চামড়া ভেদ করে র*ক্ত বের হয়ে আসছে তবুও সে একভাবে দাঁড়িয়ে রইলো চোখ বন্ধ করে। চোখের সামনে ইনানের স্নিগ্ধ গোসল করা মুখটা ভেসে উঠছে।
এরইমধ্যে ঘরে প্রবেশ করলো আমির ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে আঁ*ত*কে উঠলো। সে দৌড়ে গিয়ে গ্যা*স লা*ইট ফেলে রুশভিয়ান কে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ” ভাই তোমার হাত থেইকা র*ক্ত বাইর হচ্ছে , ও ভাই আমার খুব ক*ষ্ট হচ্ছে ,, ক্যান তুমি এইরকম করো ” বলেই ভাইয়ের পিঠে মুখ লুকিয়ে কান্না করতে লাগলো।
রুশভিয়ান আমিরের কান্না দেখে প্রচন্ড বিরক্ত হলো। এতবড় ছেলে কেন কান্না করবে সামান্য র*ক্তে দেখে । রুশভিয়ান আমির কে ঝট করে সরিয়ে দিয়ে পিঠ থেকে ঝাঁ*ঝা*লো স্বরে বলল,” আমার কিছু হয় নাই? এখন যা আমি ঘুম আসতেছে যা ভাগ ” কথাটুকু বলেই র*ক্তা*ক্ত হাত নিয়ে বিছানায় শুয়ে গেল।
আমির এখন ঠোঁট ফুলিয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আর রুশভিয়ান মাস্ক আর চশমা খুলে আয়েশ করে বিছানায় শুয়ে আছে যেন কিছুই হয়নি। আমির কাঁদতে কাঁদতে ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্স বের করে রুশভিয়ানের হাতের কাছে বসে র*ক্ত গুলো মুছতে লাগলো তুলে দিয়ে। রুশভিয়ান কিছু বলল না, তার ঠোঁটে ফুটলো মুচকি হাসি।
আমির সুন্দর করে ব্যা*ন্ডেজ করে চলে যেতে নিলে রুশভিয়ান চোখ বন্ধ করে বলল,” আমির এদিকে আয় তো?
আমির মুখ ফুলিয়ে নাকের ডগাটা ফুলিয়ে অভিমানের স্বরে বলল,” আমি যামু না ভাই?
রুশভিয়ান বিরক্তি স্বরে বলল,” আচ্ছা য….. রুশভিয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই আমির রুশভিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,” কি?
রুশভিয়ান বলল,” যা এখন পরে আসবি?
এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ১৯
আমির বুঝতে পারলো তার ভাই কিছু একটা বলতে চাই কিন্তু বলল না। আমির চলে গেল। রুশভিয়ান তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলো রুশভিয়ান আবারো চোখের সামনে ইনানের সকালের শুয়ে থাকা দৃশ্যটা আবারো ভেসে উঠলো,রুশভিয়ানের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটলো পরক্ষণেই হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে শক্ত করে চোখ বন্ধ করলো…….
