তোমাকে চাই গল্পের লিংক || মারিয়া আক্তার

11884

তোমাকে চাই পর্ব ১
মারিয়া আক্তার

ক্যান্টিনে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কোথা থেকে যেন দীপ্ত ভাইয়া এসে আমার গালে সজোরে থাপ্পড় মারেন। তার থাপ্পড়ে আমি তাল সামলাতে না পেরে চেয়ার থেকে পড়ে যাই। পুরো ক্যান্টিনের সবাই আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। লজ্জায় অপমানে আমি নিচে বসেই মাথা নিচু করে রয়েছি। আমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। কখনো এতোটা অপমানিত হইনি আমি। দীপ্ত ভাইয়া আমাকে কেন থাপ্পড় মারলেন সেটা আমি বুঝতে পারলাম না। উনি সম্পর্কে আমার ফুফাতো ভাই হন। আমার বড় ফুফুর বড় ছেলে তিনি।আমার বাবা আর ফুফু একসাথেই বাড়ি কিনেছেন। দীপ্ত ভাইয়াদের বাড়ি আমাদের বাড়ির একদম কাছে। দীপ্ত ভাইয়া আমাদের ভার্সিটিতে মাস্টার্সে পড়ছেন। খুব গম্ভীর একটা মানুষ তিনি। তুখোড় মেধাবী এই ছেলেটি খুব বদমেজাজি। তবে সেটা শুধুই আমার ক্ষেত্রে। বাকিদের কাছে তিনি খুব নম্রভদ্র ছেলে।

– এখানে এভাবে সঙয়ের মত বসে আছিস কেন? উঠতে মন চাচ্ছেনা তোর?
দীপ্ত ভাইয়ের বাজখাঁই গলায় কথাটুকু শুনে আমি চোখের পানিটুকু মুছে তার সামনাসামনি দাঁড়াই। সবসময় আমাকে শুধু ধমক দিয়ে কথা বলবে। আমার ওপর তার কিসের এত অধিকারবোধ, আমায় তা জানতেই হবে।
– আপনি আমায় থাপ্পড় মেরেছেন কোন সাহসে দীপ্ত ভাইয়া?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

একবুক সাহস নিয়ে দীপ্ত ভাইয়াকে কথাগুলো বললাম। আমার তার মুখের ওপর কথা বলা নিষেধ। কখনো বলতে পারিনি। আজকে কোথা থেকে আমার এত সাহস আসলো আমি নিজেও জানিনা। তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ তিনি যখন অনেক রেগে থাকেন তখন তিনি এমনভাবে তাকান যেন চোখ দিয়েই আমায় ভস্ম করে দিবেন। আর অন্য সময় শীতল দৃষ্টিতে তাকান তখন তার দৃষ্টি দেখে সারা শরীর আমার কাঁটা দিয়ে ওঠে। তাই কখনো তার চোখে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারিনি আমি। আজকে তাকিয়ে আছি আমি তার চোখে। তার চোখের রং বলে দিচ্ছে আজ সে খুব রেগে আছে।

– তোর সাহস দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না মৌ। তুই আমার সাথে এভাবে কথা বলছিস? চোখ নামা। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস তোকে কে দিয়েছে। যা এক্ষুনি বাড়ি যাবি তুই। আমি যেন এর ব্যতিক্রম না দেখি। তোর সাথে হিসেব-নিকেশতো আমার বাড়ি গিয়ে হবে।

– আমার সাহস নিয়ে আপনার প্রশ্ন না করলেও চলবে। আর আমার ওপর আপনার কিসের এত অধিকারবোধ? ফুফাতো ভাই ফুফাতো ভাইয়ের মত থাকবেন। একদম অধিকার ফলাতে আসবেন না।
কথাটা বলতে দেরি হয়েছে কিন্তু আমার আরেক গালে থাপ্পড় পড়তে দেরি হয়নি। এর আগে কখনো দীপ্ত ভাই আমায় থাপ্পড় মারেন নি। আজ কেন বারবার থাপ্পড় মারছেন আমায় সেটাই আমি বুঝলাম না।
– তুই আমাকে আমার জায়গা দেখাচ্ছিস। আজ বাড়ি যা তুই। ছোট মামি আজ বাড়িতেই আছে।

আম্মুর কথা বলায় আমার কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে। আম্মু যদি জানতে পারে আমি দীপ্ত ভাইয়ার সাথে এভাবে কথা বলেছি তাহলে আমাকে এর আস্ত রাখবেন না। আমি আম্মুকে ভীষণ ভয় পাই। আমার আম্মু ভীষণ স্ট্রিক্ট একজন মানুষ। আম্মু কেন যেন দীপ্ত ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসেন। দীপ্ত ভাইয়া যা বলবেন তাই সঠিক। আমি যদি নিজের আমার গলা কেটেও কিছু বলি তাও আম্মু আমার আগে দীপ্ত ভাইয়াকে বিশ্বাস করবেন।

তাই দীপ্ত ভাইয়া কেন থাপ্পড় মারলেন সেটা জানতে চাওয়ার মত সাহস আমার আর রইলো না। এখন কিছু বললে তিনি আর আমায় আস্ত রাখবেন না। যেটুকু বুঝলাম ওনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। তাই মাথা নিচু করে আমি ক্যান্টিন ত্যাগ করলাম। এখন আমায় বাড়িই যেতে হবে। দীপ্ত ভাইয়া যদি জানতে পারে আমি এখন বাড়ি যাইনি তাহলে আমার খবর করে ছাড়বেন উনি। বাড়ি যেতে যেতে আমার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেল আমি কি এমন করলাম যার জন্য দীপ্ত ভাইয়া আমাকে সবার সামনে থাপ্পড় মারলেন। নিশ্চয়ই বড় কিছু হয়েছে নাহলে উনি আমায় বকাবকি করলেও কখনো আমায় গায়ে হাত উঠান নি।

ভার্সিটি থেকে এসে ফ্রেশ না হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে উচ্চস্বরে কারো আওয়াজ শোনা গেল। যতদূর বুঝলাম আমার নাম ধরেই কেউ ডাকছে। এবং কন্ঠটাও দীপ্ত ভাইয়ার। তাহলে কি দীপ্ত ভাইয়া আম্মুকে বলে দিয়েছে। কথাগুলো ভাবতেই আমার কলিজার পানি শুকিয়ে গেল। আমি তড়ঘড়ি করে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলাম। দেরি হলে এই খাটাশ আবার তখন কি করে কে জানে। আমি মুখ কাচুমাচু করে ড্রয়িংরুমের এক প্রান্তে এসে দাঁড়ালাম। আমায় দেখে আম্মু তার কাছে যেতে বললো। আমি পা টিপে টিপে সিঙ্গেল সোফাটার কাছে গিয়ে ঠেস দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। সোফায় আমার ছোটবোন পুষ্পিতা বসে বসে চকলেট খাচ্ছে।আমি আড়চোখে একবার দীপ্ত ভাইয়ার দিকে তাকালাম। উনি এতক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাকানো মাত্রই দৃষ্টি সরিয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

– মৌ যেহেতু চলেই এসেছে। তাহলে আমি কথাটা বলি।
দীপ্ত ভাইয়ার কথায় আমার বুক ঢিপঢিপ করা শুরু করে দিল। কি বলতে চাইছেন দীপ্ত ভাইয়া। আমার ভাবনার মাঝেই আম্মু মৃদু হেসে দীপ্ত ভাইয়ার উদ্দেশ্যে বলেন,
– হ্যাঁ বলো তুমি কি বলতে চাইছো।

– মামি। মৌ যেখানে প্রাইভেট পড়ে মানে যার কাছে পড়ে ওই স্যার নাকি পড়ানোর চাইতে স্টুডেন্টদের সাথে ফাজলামো করেন বেশি। তাহলে তুমিই বলো সেখানে পড়ে ওর সময় নষ্ট করার কোনো মানে আছে কি?
দীপ্ত ভাইয়ার কথায় আমি তেতে উঠলাম। উনি আমার সব ব্যাপারে নাক গলাবেন কেন? আমি যার কাছে ইচ্ছা তার কাছে পড়বো। ওনার তাতে কি। রাগ দমন করতে না পেরে আমি বেশ জোরেই বলেই ফেললাম,
– স্যার ভালো করে পড়াক। না হয় না পড়াক। নাহলে ফাজলামো করুক তাতে আপনার এত মাথাব্যথা কিসের দীপ্ত ভাইয়া? কই পুষ্পির বেলায়তো এত খবরদারী করেন না আপনি। তাহলে আমার বেলায় কেন?

কথাগুলোতো বলে ফেললাম। এখন আমার কপালে কি আছে আল্লাহই ভালো জানেন। তাকিয়ে দেখি দীপ্ত ভাইয়া আমার শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তিনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমার সারাশরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। উনি জানেন না ওনার এভাবে তাকানোতে আমার অস্বস্তি হয়। উনি এভাবে তাকালে আমার মনে হয় উনার চোখ আমায় কিছু বলতে চায়। কিন্তু শেষে ধমক ছাড়া আর কিছুই বলেন না তিনি। তার চোখের এই ভাষাও তখন বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমার ভাবনার মাঝেই আম্মুর উচ্চআওয়াজে আমার ভাবনার সুঁতো কাঁটে।

– তুমি দিনদিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো মৌমিতা। কিভাবে বড়দের সাথে কথা বলতে হয় ভুলে গেছো তুমি?
আম্মু যখন খুব রেগে যায় তখনই আমায় মৌমিতা বলে ডাকেন। নাহলে অন্য সময় মৌ বলেই ডাকেন। তারমানে আমার এভাবে দীপ্ত ভাইয়ার সাথে কথা বলায় আম্মু খুব রেগে গেছেন। আমার মৌনতা দেখে আম্মু আবারও বলে উঠলেন,
– কি হল দাঁড়িয়ে আছো কেন? দীপ্তকে সরি বলো।

আমার চোখে পানি চলে আসে। আসলে আমাকে কেউ কিছু বলতে না বলতেই আমি কান্না করে দেই। কারো কটু কথা আমি সহ্য করতে পারি না।সেজন্য আমার কাজিনমহল আমায় ছিঁচকাঁদুনে বলে ডাকে। আমি নিজের চোখে পানিটাকে যথাসম্ভব লুকানোর চেষ্টা করলাম। দেখাবো না এই লোকটাকে আমার চোখের পানি। অসভ্য লোক একটা। ওনার জন্যইতো আম্মু আমায় বকলো। আমি চাইছি না আম্মু আমায় আরো বকুক তাই ভেঁজা গলায় দীপ্ত ভাইয়ার উদ্দেশ্যে বললাম,

– আ’ম সরি ভাইয়া।
তারপর আমি দৌঁড়ে আমার রুমে চলে আসলাম। রুমে এসে জোরে কান্না করে দিলাম। অনেক্ষণ কান্না করার পর আমার মনে হলো কেউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি দীপ্ত ভাইয়া বুকে হাত গুঁজে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকে এখন আমার রুমে দেখে রাগে আমার শরীর রি রি করে ওঠে।
– আপনি এখানে কেন এসেছেন?

আমার কথার উত্তরে দীপ্ত ভাইয়া কিছু না বলে আমার বিছানায় আরাম করে বসলেন। এক হাত দিয়ে বিছানার সাথে ঠেস দিয়ে বসে বললেন,
– আসল কথাটাতো মামিকে এখনো বললামই না। তার আগেই এত কান্না। যদি মামিকে এখন সেটা বলে দেই। তখন তোর কি হবে বলতো?
দীপ্ত ভাইয়ার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি কি আসল কথা আম্মুকে বলবেন। সেটা আমার বোধগম্য হলো না। আমার ভাবনার মাঝেই উনি এমন একটা কথা বললেন যার জন্য আমার কান্না একেবারের বন্ধ হয়ে গেল।

তোমাকে চাই পর্ব ২