তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৫০
তানিশা সুলতানা
আদ্রিতার জুতোটা হাতে নিয়ে এগোতে থাকে আবরার। ওর পেছনে রয়েছে আমান। দুটো হেলিকপ্টার সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আহাদ ইভান এবং সিয়াম অন্যদিকে খুঁজছে। আশেপাশে মানুষ দেখলেই তাদেরকে আদ্রিতার পিকচার দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছে “এই মেয়েটাকে দেখেছেন কিনা”
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কারণে কেউই আদ্রিতাকে দেখেনি।
সরু এবং চিকন রাস্তা ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে আবরার। কেনো জানি মন বলছে এই রাস্তায় তাকে একটু পথ দেখাবে। পাখিকে খুঁজতে সাহায্য করবে। হলো তাই
এগোতে এগোতে ওরা সেই বাড়িটার এর কাছাকাছি চলে যায়। এবং সেখানে আদ্রিতার ওড়না খুঁজে পায়। ওড়নাটা ঝুলে ছিলো একটা গাছের ডালে। কাটা যুক্ত সেই গাছে হাত দিলেই কাটা ফুটে যাবে।
কিন্তু আবরার কোনো কিছুর পরোয়া না করে সেই গাছের দিকে এগোয়। আমান পেছন থেকে হাজারবার বারণ করতে থাকে।
“আবরার হাতে ব্যাথা পাবি। যাস না ওখানে।
এমনিতেই তো শরীরে অনেক ক্ষত।।
প্লিজ ভাই যাস না।
কিন্তু আবরার আমানের এমন আহাজারি কানে তুলে না।
সে এগিয়ে গিয়ে ওড়না খানা ধরে আর তখনই একটা কাটা হাতে ফুটে যায়।
তাতেও কোনো প্রকার রিয়াকশন দেয় না। বরং আলতো হাতে কাঁটা থেকে ওড়না ছাড়াতে থাকে। সেই মুহূর্তে পা পিছলে যায়। আবরার গড়িয়ে পরে ভয়ংকর খাদে।
আঘাত প্রাপ্ত পায়ে আবার আঘাত পায়। এবং বুকে কয়েকটা কাঁটা বিঁধে।
আমান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। সেও নেমে পড়ে সেই খাদে। তার হাতে পায়েও কাঁটা বিঁধে।
বেশ অনেকটা সময় পড়ে আদ্রিতার ওড়না খানা কাটাযুক্ত গাছ থেকে ছাড়াতে সক্ষম হয় দুই বন্ধু।
এবার মাটি ধরে ধরে রাস্তায় ওঠে। যেখান দিয়ে দুজন হেঁটেছে সেখান দিয়েই র/ক্তের দাগ।।
আবরারের পা যেনো চলছে না। টেনে টেনে পা ফেলছে।
এক একটা কদম যেনো অনেক ভাড়ি। সব সময় পরিপাটি আর গোছানো ছেলেটার শরীরে কত শত আঘাত। সুন্দর মুখ খানা আর সুন্দর নেই। বড় বড় চুলগুলো এলোমেলো, নাকের উপর ক্ষত, একটা চোখ ফুলে গেছে, ডান গালে কাটার দাগ।
ওড়না খানা বুকে জড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে সেই বাড়ির নিকটে পৌঁছায় ওরা। দরজার সামনে পায় আদ্রিতার আরেকটা জুতো।
কিন্তু আবরারের মন বলছে এখানে তার পাখি নেই। বাঁচার তাগিদে পালিয়ে গিয়েছে।
তাই দরজা খোলার তাড়াহুড়ো নেই।
কিন্তু আমানের প্রচন্ড তাড়া। সে খুলে ফেলে দরজা।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে আশাহত হয়। কেনোনা আদ্রিতা নেই। তবে ভাঙা জানালা দেখে বুঝতে পারলো এই জানালা দিয়েই পালিয়েছে।
আবরার হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।
আদ্রিতার ওড়নার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ওঠে নিঃশব্দে। বিড়বিড় করে বলে
“কোথায় চলে গেলে পাখি?
আল্লাহ একবার তোমাকে পাইয়ে দিক
আর কোনদিনও চোখে আড়াল করব না। মরলে দুজনে একসাথে মরবো, আর বাঁচলে একসাথে বাঁচবো।
আবরারের কান্না দেখে আমানের কলিজা কেঁপে ওঠে।সে জীভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে বলে
“আবরার
আমার মনে হয় ও বেশি দূর পালাতে পারেনি। আমরা যদি হেলিকপ্টারে করে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে থাকি তাহলে সহজেই পেয়ে যাবো।
আশার আলো দেখতে পায় আবরার। তাড়াহুড়ো করে উঠে এবং দৌড়াতে থাকে।
ডান পা খানা মনে হচ্ছে যখন তখন খুলে পড়ে যাবে। এখনো রক্ত পড়া কমেনি। আমানের কষ্ট হলো। সে কান্না আটকাতে পারলো না।
কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে থাকে আবরারের পেছন পেছন।
মনা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে মূলত দেখতে এসেছিলো আদ্রিতা কেমন পজিশনে আছে। কিন্তু খানিকটা কাছাকাছি আসার পর যখন দেখলো এখানে আবরার উপস্থিত আর এগোনের সাহস পায়নি। কোনো ভাবে যদি এই সাইকোটা জেনে যায় এসবের পেছনে মনাও রয়েছে। তাহলে কলিজা ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিতে ২ সেকেন্ড ও ভাববে না।
মনার সাথে আবরারের কোনো শত্রুতা নেই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কাউকে চেনে না।
মনা ইয়াং ইউ এর সঙ্গে কাজ করে। আর মালিকের হুকুম মানতে সে বাধ্য। অবশ্য এজন্য মাসে মাসে মোটা অংকের টাকা পায়।
ঘনো জঙ্গল আর উঁচু নিচু পথ শেষই হচ্ছে না। ওই বাড়ি থেকে সমুদ্র যতো কাছে মনে হয়েছিলো ঠিক ততোটা কাছে নয়।
এ্যানি হাঁপিয়ে গিয়েছে। সে আর দৌড়াতে পারছে না। ক্লান্ত হয়ে বসে পরে রাস্তার পাশে। মিউ মিউ আওয়াজ তুলে বোঝায় নিজের দুর্বলতার কথা।
আদ্রিতা বুঝলো তবে থামলো না। ওই তো আর একটু দূরে মেইন রোড দেখা যাচ্ছে। মেইন রোডে উঠতে পারলেই বিপদ কমে যাবে। কারো থেকে ফোন ধার করে বাবা বা মামাকে কল করতে পারবে। এটা ভেবেই সে প্রাণ প্রাণে দৌড়াতে থাকে।
মালিক কে দৌড়াতে দেখে এ্যানি আর বসে থাকতে পারে না। সে ক্লান্ত ভঙ্গিমায় পেছন পেছন হাঁটতে থাকে।
মেইন রোডে পা রাখার সাথে সাথে বিকট শব্দের কয়েকটা হেলিকপ্টার এসে থামলো রাস্তার মাঝখানে। ভয় পেলো আদ্রিতা। মনে হলো তাকে বন্দি করে রাখা ওই লোক গুলো চলে এসেছে। আবার ধরে নিয়ে যাবে। অন্ধকার সেই কুটিরে বন্দি করে রাখবে। সেই ভয়ংকর জায়গায় দ্বিতীয়বার যেতে চায় না।
হাত পায়ে কাঁপন শুরু হয়ে গেলো মেয়েটার। কাদামাখা হাত দুটো শুকিয়ে গেছে। মুখেও লেগে আছে কাদা।
ভাড়ি জামা পড়েছিলো বোনের রিসিপশন উপলক্ষে। সেই ভাড়ি জামাতে কাদা লেগে আরও ভাড়ি হয়ে গিয়েছে। ক্লান্ত আদ্রিতা সেই ভার সহ্য করতে পারছে না। তবুও বাঁচার তাগিদে দৌড়াচ্ছে।
আদ্রিতাকে দেখতে পেয়ে আবরারের অশান্ত মনটা শান্ত হলো। হেলিকপ্টার মাটিতে নামার আগেই সে লাফিয়ে নেমে পড়ে। হাঁটু মুরে পড়ে গেলো পিচ ঢালা রাস্তায়।
ক্লান্ত স্বরে ডাকলো
“পাখি আমি এসেছি।
আদ্রিতা পুনরায় দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু আবরার তাসনিনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে আর দৌঁড়ালো না।
পেছন ফিরে তাকালো।
অতি প্রিয় মানুষটাকে দেখতে পেয়ে আবেগ কন্ট্রোল করতে পারলো না। কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে।
দৌড়ে যেতে চায় মানুষটার নিকট। কিন্তু তখনই নজর পড়ে এ্যানির পানে। সে আবরারকে দেখেই দৌড়ে আসছে। অপর দিক থেকে আসছে একটা ট্রাক।
ট্রাকটা বোধহয় ব্রেক ফেল হয়েছে। না হলে সামনে হেলিকপ্টার দেখেও কিভাবে ফুল স্পিডে এগিয়ে আসতে পারে?
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৯
এ্যানি গাড়ি দেখে সরে যেতে পারে না। বরং রাস্তার মাঝ খানেই বসে পড়ে।
আদ্রিতা অনবরত এ্যানিকে ডাকতে থাকে। তবে অবুঝ বিড়াল সেই ডাক বুঝতে পারে না।
আবরার কোনো রকমে দাঁড়িয়ে দৌড়ে এগিয়ে যায় এ্যানির কাছে। ততক্ষণে ট্রাক একদম কাছে চলে এসেছে।
আবরার এ্যানিকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরতেই ট্রাক ধাক্কা মে/রে দেয় আবরারকে।
মানুষ ছিঁটকে গিয়ে পড়ে আদ্রিতার পায়ের কাছে।
