Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৮

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৮

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৮
জেরিন আক্তার

প্রাণেশা স্নিগ্ধকে মনে মনে একশোবার থ্যাংকইউ জানালো। স্নিগ্ধ ক্লাসটা শেষ করে চলে গেলো। প্রাণেশা খুশিতে আজ সবগুলো ক্লাসই করলো। সুবহাও প্রাণেশার খুশির কারণটা ধরতে পারলো। ও জানতো প্রাণেশা এমন কিছুর আশায় থাকতো যে, স্নিগ্ধ যেনো ওকে এখানে পরিচয় করিয়ে দেয়। তবে স্নিগ্ধ এমন একটা কথা বলল যে প্রাণেশা অধিক খুশি হয়েছে।
প্রাণেশা আর সুবহা ছুটির পরে গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধ গাড়ি নিয়ে এসে সামনে দাড়ালো। আর সুবহাকে নিতে এলো সৌরভের ড্রাইভার। ও চলে যাওয়ার পরে প্রাণেশা স্নিগ্ধর গাড়িতে উঠে বসে বলল,

“আজ সবার সামনে আমাকে ওয়াইফ বললেন ব্যাপার কি? কোনো স্পেশাল রিজন ছিলো নাকি স্যার?”
স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বলল,
“স্পেশাল রিজন বলতে তুমিই। তুমি ছাড়া এক্সট্রা কোনো স্পেশাল রিজন নেই।”
“আই লাভ ইউ স্যার।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“আই লাভ ইউ টু। তবে এবার কি শান্তি হয়েছে? এখন আমাকে দেখে কেউ হাসলেও ভাববে আমার বউ আছে।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“হুমম। আর এখন কি বাড়িতেই যাচ্ছেন?”
স্নিগ্ধ বলল,
“হুম, কেনো?”
“আজকে যে সবার সামনে বউকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, সেই হিসেবে আমাকে ট্রিট দিন। নাকি ট্রিট না দিয়ে পালাবেন?”
স্নিগ্ধ নিজের বৃদ্ধাআঙুল কপালে ঘষে বলল,

“বউকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় বউকেই ট্রিট দিতে হবে?”
প্রাণেশা মাথা ডানবাম নাড়িয়ে বলল,
“না না, আমি কেনো বউ হতে যাবো? এখন আমি আপনার স্টুডেন্ট। স্টুডেন্টকে তো ট্রিট দিতেই পারেন।”
স্নিগ্ধ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলল,
“স্টুডেন্ট হিসেবে? আর আমার বাড়িতে বউ আছে। সে যদি জানে আমাকে তার বাপ-ভাই মিলে সোজা….উপরে। তাঁদের কলিজা নিয়ে ঘোরাফেরা করি। অনেক রিস্কে থাকি।”
প্রাণেশা কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমার বাপ-ভাই নিয়ে বদনাম করছেন?”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়ালো,
“নাহ একদম না। ধরো, এখন যদি তুমি তোমার ভাই বা বাবাকেই কল দিয়ে বলো যে, বাবা তোমার জামাই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে তখনই তো তাঁরা এসে আমাকে মেরে তোমাকে নিয়ে যাবে।”
পরপর স্নিগ্ধ গাঢ় গলায় বলল,
“আমি দেখিয়ে দিতে চাই, তাঁরা আমার সাথে তোমাকে বিয়ে দিয়ে ঠকেননি। এমনকি তোমার আমার ভালোবাসা দেখে যেনো বলতে পারে দুজনে ভালো ডিসিশনই নিয়েছে।”
প্রাণেশা আয়েসি ভঙ্গিতে পা তুলে বসে বলল,
“হুমম। তা ঠিক।”

সৌরভ সন্ধ্যায় ড্রইং রুমে বসে অফিসের কাজ করছিলো। সুবহা এসে বসলো। সৌরভ কাজের ফাঁকে আড়চোখে তাকিয়ে ওকে দেখছিলো। সুবহা উঠে চলে গেলো কিচেনে। সৌরভের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এলো।
আরশাদ খান কল দিলেন সৌরভের ফোনে। ও ব্যাস্ত থাকায় ফোনটা সুবহার দিকে দিয়ে বলল,
“কথা বলো আমি কাজ করছি।”
সুবহা ফোন হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। সৌরভ কাজ বাদ দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো। আজকাল সুবহার দিকে তাকিয়ে থাকতেও ভালো লাগে। সুবহার চোখে-চোখ পড়তেই ও চোখ নামিয়ে নিয়ে কাজে মনোযোগ দিলো।
সুবহা কথা বলা শেষ করে, ফোন দিয়ে নিজের একটা ছবি তুলল। সৌরভ দেখলো কিন্তু কিছু বলল না। সুবহা ফোনটা রেখে দিয়ে সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার ফোনে ছবি তুলেছি।”
সৌরভ নিজের কাজে মন দিয়ে উত্তর দিলো,
“ভালো হয়েছে।”

সুবহা বিড়বিড় করে বলছিলো, “আপনি তো দেখি এখন বকেন না। তবে কি ভালোবাসেন?”
সৌরভ উঠে এসে সুবহার একদম কাছে এসে বসলো। সুবহা সৌরভকে নিজের কাছে দেখে একটু সরে বসলো। সৌরভ আরও একটু এগিয়ে এসে বসলো। সুবহা বলল,
“কিছু বলবেন?”
সৌরভ ওর দিকে এগিয়ে বলল,
“তোমাকে যেনো এরপরে থেকে এই বিড়বিড় করে কোনো কথা বলতে না দেখি।”
“আর যদি বলি!”
সৌরভ আরেকটু এগোতেই সুবহা দুইহাত দিয়ে সৌরভকে সরিয়ে বলল,
“বলবো না। আর বলবো না। আমি যাই কাজ আছে।”
সুবহা আলগোছে সেখানে থেকে উঠে চলে গেলো। সিঁড়ি দিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল,, আর কিচ্ছু বলবো না। লোকটা কাছে এলেই ভয় লাগে।
সৌরভ ওর কথা শুনে হেসে উঠল।

রাত ১০ টা,
প্রাণেশা শুয়ে পড়েছে। স্নিগ্ধ পানি খেয়ে এসে শুলো আর কড়া গলায় বলল,
“আজ যদি আমার আগে ঘুম থেকে উঠে বাহিরে গিয়েছো তাহলে তোমার খবর আছে। আমি উঠবো তারপর তুমি আমার সাথে যাবে।”
প্রাণেশা মাথা নাড়ালো। তবে স্নিগ্ধর আগেই উঠে চলে যাবে।
ভোরে,,
প্রাণেশার ঘুম ভাঙার পরে ও উঠে বসলো। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের ওড়না খুঁজছিলো। শেষে দেখলো স্নিগ্ধর পিঠের নিচে। প্রাণেশা ওড়নাটা টান দিতেই স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে কাছে টেনে বলল,
“পরে উঠবে।”
“না এখনই উঠবো। আপনিও উঠবেন।”
“উহু, আরেকটু পরে জান।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে খোচাতে শুরু করলো। স্নিগ্ধ তবুও উঠলো না। আধঘন্টা পরে স্নিগ্ধ উঠল।
দুজনে ফ্রেশ হয়ে একসাথে নিচে নামলো। কোহিনুর বেগম হেসে হেসে বললেন,
“আজকে দুজনে একসাথে ব্যাপার কি? প্রতিদিন তো দেখি দুজনে দুই টাইমে উঠো।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“আজ ওকে ধরে-বেধে রেখেছিলাম। তাই সাথে নিয়ে আসতে পেরেছি। নাহলে এতক্ষনে সারাবাড়িতে ৪-৫ বার টহল দেওয়া শেষ হতো।”
রাজিয়া বেগম বললেন,

“প্রাণেশা তো সুবহার থেকেও চঞ্চল। কই যাবে, কি করবে ধরা যায় না। একটা জায়গায় বসেও থাকবে না। ওই সুন্দর মায়াবী মুখখানা দেখলে কিচ্ছু বলতেও পারি না।”
কোহিনুর বেগম হেসে হেসে বললেন,
“একটা বাচ্চা হোক তারপর ঠিক হয়ে যাবে।”
প্রাণেশা রাজিয়া বেগমের পেছনে গিয়ে সুর ধরে বলল,
“মা..”
কোহিনুর বেগম বললেন,
“মা মা করে লাভ নেই মা। মেয়েরা মা হলে তার চলনবলন পরিবর্তন হয়। তোমার যখন হবে তখনকে পরিবর্তন হবে।”
স্নিগ্ধ সে ব্যাপারে কিচ্ছু বলল না। এখনও তো অনেক সময় আছে বাচ্চা নেওয়ার। বছর দুয়েক যাক। সবে মাত্র বিয়ের আড়াইমাস মাস হলো।

সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি শুরু। সৌরভ বাহিরে থেকে এলো। প্রায় ভিজে গিয়েছে। সুবহা টাওয়াল এগিয়ে দিলো। সৌরভ শার্ট খুলে। কোমরে টাওয়াল পেঁচালো। সুবহা অন্যদিক ফিরে দাড়ালো। সৌরভ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“তুমি অন্যদিক কেনো ফিরছো? আমারই তো অন্যদিক ফিরে চেঞ্জ করা দরকার, উল্টো তুমি ঘুরে দাঁড়াচ্ছো।”
সুবহা সামনের দিকে তাকালো। সৌরভ নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“আমি বললাম আর আমার দিকে তাকালে?”
সুবহা আবার পেছনে ফিরে তাকালো। সৌরভ খিলখিল করে হেসে বলল,
“এমনে তো অনেক সাহসী ভাবে থাকো। জোর গলায় কথা বলো আর আমার সামনে এলে ভয় পাও কেনো?”
সুবহা সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জানি না। তবে আপনি কাছে এলে কেমন যেনো ভয় ভয় লাগে।”
সৌরভ তৎক্ষণাৎ ওর কাছে এলো। সুবহা পিছিয়ে গেলে সৌরভ ওকে ধরে বলল,
“এখনও ভয় লাগছে?”
সুবহা মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হুমম।”
সৌরভ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“যখন চুমু দাও তখন ভয় লাগে না?”
সুবহা লজ্জা পেলো। সৌরভ বাকা হেসে বলল,
“বাব্বাহ এখন লজ্জাও পাচ্ছো দেখা যায়।”
সুবহা মুখ ভেঙচি দিয়ে ফোনটা হাতে বেরিয়ে গেলো। সৌরভ বাকা হেসে বলল,
“হাহ, ভাব নিয়ে ঠিকই যাও কিন্তু শেষে আমার কাছেই তো আসতে হয়।”
রাত বাড়তে শুরু করলে বৃষ্টিও বাড়তে শুরু করলো। একটা সময় মেঘ চারিদিক কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠছে। যারপরনাই সুবহা খাবার খেয়ে ওমনেই রুমে চলে এসে শুয়ে পড়লো বিছানায়। এই কয়েকদিন ধরে আবার দুজনে একসাথেই থাকছে। সুবহা ইচ্ছে করেই ভিতরের রুমটায় থাকছে না। সৌরভও কিছু বলেনি। কারণ সেও ভালোবাসতে শুরু করেছে সুবহাকে।
রাত ১০ টা,
সৌরভ মেইন দরজা বন্ধ করে ড্রইং রুমের লাইট নিভিয়ে রুমে ফিরলো। সুবহা শুয়ে পড়েছে। সৌরভ দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় এলো। সুবহা পাশে সৌরভের অস্তিত্ব টের পেতেই ওকে জড়িয়ে ধরলো। সৌরভের কাছে এইটা নতুন নয়। এই কয়েকদিনে সুবহা দিনে যে কয়বার ওকে জড়িয়ে ধরেছে হিসেব নেই।
কিন্তু সৌরভের একটা জিনিস খুব বিরক্ত লাগে, সেটা হলো সুবহার এই বাজ পড়া দেখে ভয় পাওয়া।
সৌরভ চুপচাপ রইলো। একটু পরে সুবহাকে বলল,

“মুভি দেখবে?”
“না।”
সৌরভ কড়া গলায় বলল,
“উঠো সোজা হও। তোমার ফোন কই?”
“এইযে।”
“একটা মুভি বের করো!”
সুবহা ওর পছন্দ মতো একটা মুভি বের করলো। এরপরে সৌরভের হাতে দিলো। আর সৌরভকে ঘেঁষে শুয়ে রইলো। সৌরভ শ্বাস ছেড়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুভি দেখো, ভয় চলে যাবে।”
সুবহা তাকিয়ে রইলো ফোনের দিকে। ধীরে ধীরে মুভি দেখায় মনোযোগী হলো।
মুভির মাঝে রোমান্টিক সিন এলে সুবহা সৌরভের হাতে ফোনটা দিয়ে চাদরের নিচে মুখ লুকালো। সৌরভ ফোন রেখে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ৩-৪ মিনিট পরে ফিরে এসে লাইট নিভিয়ে বিছানায় এসে শুলো। বাহিরে বাজ পড়ার সাথে সাথে আবার সুবহা সৌরভের বুকে এসে মুখ লুকায়। সৌরভ বাকা হাসলো।

সকাল সকাল সুবহার ঘুম ভাঙতেই নিজেকে সৌরভের উন্মুক্ত বুকে দেখে লজ্জায় নুইয়ে গেলো। সাথে সাথে বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেলো। রাতের কিছু মুহূর্ত মনে হতেই লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল।
মিনিট বিশেক পরে সুবহা ওয়াশরুম থেকে বের হলো চুল মুছতে মুছতে।
সৌরভ ঘুমিয়ে আছে। সুবহা তার দিকে তাকিয়ে হেসে আয়নার সামনে বসলো। ওর হাসিই বলে দিচ্ছে কতটা খুশি।
এরপরে নিজেকে পরিপাটি করে বের হলো রুম থেকে।
এরও আধঘন্টা পরে সৌরভ রুম থেকে বের হলো। সাথে প্রাণেশার নাম্বারে কলও দিচ্ছিলো। আজকে রোকেয়া বেগম আসেনি তাই সুবহা নিজেই রান্না করছে। সৌরভ প্রাণেশার সাথে কথা বলতে বলতে সোফায় গিয়ে বসলো। সুবহা কোমরে শাড়ির আঁচল গুজে রান্নায় ব্যাস্ত। সৌরভ সুবহার দিকে তাকিয়েই ফোনে কথা বলছিলো।
কথা বলে শেষ হলে সৌরভ ফোন রেখে কিচেনে এসে সুবহার পাশে দাড়ালো। সুবহা পেছন ফিরে তাকাতেই সৌরভ হেসে বলল,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৭

“ভালো আছো? রাতে কি ভয় পেয়েছিলে?”
সুবহা লজ্জা পেয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জা জানি না।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here