তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩০
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা রাতের খাবারটা আগেই খেয়ে চলে গিয়েছে উপরে। এখন বসেছে স্নিগ্ধ, সৌরভ আর আরশাদ খান। সৌরভ সুবহার দিকে থেকে থেকে তাকাচ্ছিলো। আর অন্যদিকে আরশাদ খান স্নিগ্ধর সাথে টুকটাক কথা বলছেন। সৌরভ খাবার খেয়ে চলে যাওয়ার পরে সুবহাকেও ডেকে ওর সাথে নিয়ে যায়।
স্নিগ্ধ রুমে ফিরে এসে প্রাণেশাকে বলে তার জামাকাপড় এখানে আছে নাকি? আসার সময় তো হন্তদন্ত হয়ে এক কাপড়েই চলে এসেছিলো। প্রাণেশা কাভার্ড খুলে দেখলো শার্ট, টিশার্ট আছে কিন্তু প্যান্ট নেই। এখন কি করবে? সৌরভের কাছে প্যান্ট চাইবে ছি ছি, স্নিগ্ধ লজ্জায়ই চাইতে যাবে না। শার্ট নাহয় চাওয়া যায় কিন্তু প্যান্ট!
প্রাণেশা প্যান্টের জন্য যাবে স্নিগ্ধ ওকে থামিয়ে দেয়। প্রাণেশা কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“যাবো না কেনো? কি পড়ে থাকবেন?”
স্নিগ্ধ বলল,
“এই বাড়ির জামাই হয়ে তাই প্যান্ট চাইতে পাঠাবো? থাকো তুমি, আমি শশুরের কাছে গিয়ে দেখি সে কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারে নাকি। নাহলে শপিংয়ে যাবো।”
প্রাণেশা বলল,
“তাই কি মানুষ একজনের জিনিস পড়ে না? আপনি তো আমার ভাইয়ের টাই পড়বেন।”
স্নিগ্ধ রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আমি এই বাড়ির জামাই। আমার একটা মানসম্মান আছে। অবশ্য একটু এক্সপেন্সিব আমি।”
প্রাণেশার সরু চোখে তাকিয়ে রইলো।
স্নিগ্ধ আরশাদ খানের রুমে এসে দাড়ালো। এরপরে বলল,
“বাবা একটু দরকারে এলাম। একটা হেল্প করতে করবেন? না করতে পারলেও করতেই হবে।”
আরশাদ খান হেসে বললেন,
“কি হেল্প? নির্দ্বিধায় বলো।”
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“প্যান্ট নেই কি পড়বো? এইটা চেঞ্জ করবো।”
এই শুনে আরশাদ খান হাসতেও পারছেন না। হাসি চেপে রেখে বললেন,
“এখন রাত হয়ে গিয়েছে সকালে নাহয় এনে দিতাম শপিং থেকে। এর থেকে ভালো সৌরভের কাছেও তো আছে ওখানে থেকে এনে দেই?”
স্নিগ্ধ বলল,
“না। আমি তার কাছে চাইতে পারবো না। আমার একটা মান-সম্মান আছে বাবা।”
আরশাদ খান ভাবুক গলায় বললেন,
“আমার কোনোকিছুই তো তোমার লাগবে না।”
স্নিগ্ধ বিছানায় বসলো। আরশাদ খান ওর সামনে এসে বললেন,
“আমার নতুন লুঙ্গি আছে পড়বে।”
স্নিগ্ধ ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
“বাবা লুঙ্গি পড়বো?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমি তো পড়তে পারি না। আর সামলাতেও পারি না।”
আরশাদ খান কাভার্ড থেকে লুঙ্গি বের করতে করতে বললেন,
“পড়তে পারলে সামলাতেও পারবে।”
আরশাদ খান স্নিগ্ধকে লুঙ্গি পড়িয়ে দিলেন। স্নিগ্ধ তো খুশি। আরশাদ খান লুঙ্গির একটা মাথা একটু করে ওর হাতে দিয়ে বললেন,
“লুঙ্গিটা এভাবে এক সাউডে একটু উঁচু করে ধরে হাটবে। তাহলে পড়ে যাবে না। আর অবশ্য ভালোই দেখা যাচ্ছে।”
স্নিগ্ধ খুশি মনে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। প্রাণেশার রুমে ঢুকতেই প্রাণেশা ওকে দেখে তো তাজ্জব বনে চলে গেলো। হাসতে হাসতে স্নিগ্ধকে ধরে বলল,
“এই কি পড়েছেন? শেষে গিয়ে লুঙ্গি?”
স্নিগ্ধ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“হাসাহাসি রেখে বলো কেমন লাগছে আমাকে?”
প্রাণেশা হাসতে হাসতে বলল,
“খুব সুন্দর লাগছে। তবে এটা কোথায় থেকে আনলেন?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“আমার শশুরআব্বা দিয়েছে।”
প্রাণেশা মুখটিপে হেসে বলল,
“ভালোই খারাপ না।”
স্নিগ্ধ একটু এগিয়ে এসে আস্তে করে বলল,
“আমাকে কি ভালো লাগছে? সৌরভ, সুবহা দেখে কি হাসবে?”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে ধরে বলল,
“আরে না, আপনাকে প্রথম লুঙ্গি পড়া দেখে হাসলাম। ওরা হাসবে কেনো?”
স্নিগ্ধ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বলল,
“ওহ সেই তো লাগছে। শশুরআব্বা ভালো জিনিসই দিয়েছে।?”
প্রাণেশা বিছানায় বসে বলল,
“হুমম, শুয়ে পড়বেন এখন?”
“হুমম আসছি। তুমি শোও।”
প্রাণেশা শুয়ে পড়লো। স্নিগ্ধ দরজা লাগিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। মিনিট কয়েক পরে রুমে ফিরে লাইট নিভিয়ে এসে প্রাণেশার পাশে এসে শুলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে বুকে জড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা আমাদের বাচ্চা কার মতো হবে? তোমার মতো নাকি আমার মতো?”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর বুকে চাপর মেরে বলল,
“সবে মাত্র ২ মাস আর এখনই বলছেন বাচ্চা কার মতো হবে, যখন হবে তখনই দেখবেন। আর নাহ, আপনার মতো হবে না। আমার বাচ্চা আমার মতোই হবে।”
স্নিগ্ধ বলল,
“মানে? তোমার একার বাচ্চা নাকি? বাচ্চা আমারও। ফিফটি, ফিফটি।”
সকাল সকাল প্রাণেশা রুম থেকে বেরোলো। কিচেনে তাকিয়ে দেখলো সুবহা কাজ করছে। রোকেয়া বেগম আসেনি। প্রাণেশা সুবহার কাছে এসে দাড়ালো। সুবহার চুল ভেজা দেখে ওকে একটু ধাক্কা দিয়ে হেসে হেসে বলল,
“বাব্বাহ, আজ একটু অন্যরকম লাগছে না এই বাড়ির বউকে।”
সুবহা লাজুক হেসে বলল,
“কেমন লাগবে, প্রতিদিন যেমন লাগে তেমনই।”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“নাহ, আজ অন্যরকম খুশি খুশিই লাগছে। আবার লজ্জাও পাচ্ছে দেখা যায়। আচ্ছা তোদের থেকে খুশির খবর কবে শুনতে পাবো রে? আমারও তো বয়স হচ্ছে। ফুপ্পি শুনবো কবে?”
সুবহা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে হেসে বলল,
“যেই কথায় লজ্জা পাই সেই কথা দিয়েই তু্ই দেখি জ্বালাচ্ছিস।”
প্রাণেশা মুখটিপে হাসলো। স্নিগ্ধ নিচে এলো। সুবহা ভাইকে দেখে কতক্ষন হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। এরপরে প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বোঝালো এটা সত্যি নাকি, প্রাণেশা মাথা নাড়ালো। সুবহা সেই ৮-৯ বছর আগে স্নিগ্ধকে টুকটাক লুঙ্গি পড়তে দেখেছিলো। আর আজকে দেখলো।
সুবহা মুচকি হেসে বলল,
“ভাইয়া অনেকদিন পরে তোমাকে লুঙ্গি পড়তে দেখলাম ভালোই লাগছে।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“থ্যাংক ইউ।”
স্নিগ্ধ সোফায় এসে বসলো। প্রাণেশা কফি নিয়ে এসে স্নিগ্ধকে দিলো। আরশাদ খান বাড়িতে ঢুকলেন। হাতে স্নিগ্ধর জন্য নতুন প্যান্ট। একটা মাত্র জামাই তার, আর সে প্যান্টের কষ্ট করবে এটা মেনে নিতে না পেরে এই সকালেই গিয়েছেন প্যান্ট আনতে। তবে এই সকাল সকাল একটু কষ্ট করেই বন্ধুর দোকান জোর করে খুলিয়ে নিয়ে এসেছে।
স্নিগ্ধ খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল,
“বাবা এই এতো সকালে এগুলো ব্যবস্থা না করলেও পারতেন। আমি একটু পরেই আনতে পারতাম।”
আরশাদ খান বললেন,
“আমার বাড়িতে, আমার জামাই কষ্ট করবে অসম্ভব।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল,
“এখন চেঞ্জ করে আসুন।”
স্নিগ্ধ বিড়বিড় করে বলল,
“পরে করি? ভালোই তো আরাম আরাম লাগে।”
প্রাণেশা বলল,
“কি বললেন শুনিনি।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার থেকে প্যান্টগুলো নিয়ে বলল,
“দাও, এক্ষুনি আসছি।”
স্নিগ্ধ সিঁড়ি দিয়ে উপরে যাওয়ার সময় সৌরভের সাথে দেখা হয়। সৌরভ ওকে ভালোভাবে খেয়াল করেনি নাহলে এতক্ষনে কথা দিয়েই পচাতো। সৌরভ আবারও পেছনে ফিরে তাকালো স্নিগ্ধকে লুঙ্গি পড়া বেশে দেখে প্রাণেশাকে বলল,
“তোর জামাই লুঙ্গি পড়েছে?”
“হুমম।”
“ভালোই তো।”
বিকেলে স্নিগ্ধ, প্রাণেশা, সৌরভ, সুবহা এই চারজনে ঘুরতে বেরোলো। বাড়ি থেকে বেশি দূরে যাবে না, পাশেই একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে সেখানে যাবে।
এর অনেকদিন আগে যখন স্নিগ্ধরা কয়েকটা ছেলেকে মেরেছিলো সেই ৪ জন ছেলেকে দেখতে পেলো স্নিগ্ধরা। স্নিগ্ধরা ভেবেছিলো অনেক দিন আগের ঝামেলা, তাই হয়তো ওরা এসব ভুলে গিয়েছে। স্নিগ্ধ সৌরভকেও বলেছিলো এসব।
স্নিগ্ধরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলো। আর অন্যদিকে সেই ৪ জন ছেলেদের টার্গেটই ছিলো স্নিগ্ধরা। স্নিগ্ধরা খাওয়া-দাওয়া শেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই ৪ জন ছেলেই ওদের সামনে এসে বীরের মতো দাড়ালো। স্নিগ্ধ বলল,
“কি সমস্যা?”
একজন ছেলে বলল,
“সমস্যা তো আছেই। মনে আছে আমাদের কিভাবে মেরেছিলি? এখন তোদের মারলে?”
স্নিগ্ধ ফোন বের করে ওদের রিলেটিভস একজনকে মেসেজ পাঠালো। সে পুলিশ। স্নিগ্ধ তাকেই আসতে বলল। আজকে এই ঝামেলা শেষ না করে ও বাড়িতে যাবেই না।
সৌরভ ছেলেদের বলল,
“তোদের ভুল ছিলো বলেই তো দুইবার মার খেয়েছিস আবারও কি খেতে চাস?”
ছেলেটা বলল,
“এখন তোরা ২জন আর আমরা চারজন। পারবি আমাদের সাথে?”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“তোদের যখন শরীরে এতই শক্তি তাহলে জিমে গিয়ে প্রয়োগ কর, উপকার পাবি, একটা ফিট বডি বানাতে পারবি। তাহলে আমাদের উপরে কেনো?”
পাশের ছেলেটা বলল,
“তোদেরই যে পছন্দ হলো।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশা আর সুবহার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“এই তোমরা যাও গাড়িতে উঠো!”
প্রাণেশা সুবহা গাড়িতে গিয়ে বসলো। স্নিগ্ধ কোমরে হাত রেখে বলল,
“বল কি যেনো বলছিলি! আমাদের পছন্দ হয়েছে? আজ শুধু গায়ে হাত দিয়ে দেখ তোদের হাত-পা ভেঙে দিবো। এরপরে তোদের যদি জেলের ভাত না খাইয়েছি আমিও সোহরাব চৌধুরী স্নিগ্ধ নই।”
ছেলেগুলো হাসলো। এরপরে বলল,
“আমরা ভয় পাইনি। আগে মার খেয়েছি বলে কি এবারও আমাদের মেরে যেতে পারবি। আর ভয় পেয়েই তো ওই দুইটা মেয়েকে গাড়িতে উঠালি এরপরে নিজেরাও দৌড়ে চলে যাবি।”
ছেলেগুলো বারবার এমন কথা বলে স্নিগ্ধ আর সৌরভও উস্কে দিচ্ছিলো। সৌরভ কথা গুলো সহ্য করতে না পেরে তৎক্ষণাৎ একটা ছেলেকে ঘুষি দিতে দিতে নিচে ফেলে দিয়ে ওর কলার চেপে ধরে বলল,
“কুত্তার বাচ্চা তোদের কলিজা এতো বড়? একদম জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
আরও তিনজন ছেলে ওদের দুজনের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়লো। সৌরভ আর স্নিগ্ধ ওদের ৪ জনকেই ধুমধাম পিটিয়েছে।
এরপরেই পুলিশ এসে ওদের ৪ জনকেই ধরে গাড়িতে তুলে নিলো। স্নিগ্ধ পুলিশকে কড়া গলায় বলল,
“ওদের নিয়ে যান আমি আসছি। এর একটাও যেনো বের না হয়।”
“ওকে স্যার।”
পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পরেই ওরা দুজনে গাড়িতে উঠে বসলো। সৌরভ স্নিগ্ধকে বলল,
“পুলিশ খবর দিলে কখন?”
স্নিগ্ধ স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বলল,
“রেস্টুরেন্টে থাকতেই একবার জানিয়ে রেখেছিলাম এরপরে ওর যখন কথা বলল তখনই মেসেজ দিয়েছি আর তারপরই পুলিশ এসে পড়েছে। আর এখন থানায় যাবো দেখি কি করা যায়।”
সৌরভ বলল,
“ভালোই করেছো। ওই ছেলেগুলো বেয়াদব, ওদের জন্য জেলই পারফেক্ট।”
স্নিগ্ধ ৩-৪ এই বাড়িতে থেকে চলে গেলো। প্রাণেশাকে যেতে দিলেন না আরশাদ খান আর সৌরভ।
প্রাণেশা এই বাড়িতে আরও মাস দেড়েক রইলো। রাজিয়া বেগম সহ ওই বাড়ির সবাই এসেছিলো প্রাণেশাকে দেখতে। তার পরেও রাজিয়া বেগম আর সাঈদ রেজা চৌধুরী এসেছেন। তাঁদের বংশের প্রদীপ আসতে চলেছে তারা কি বসে থাকতে পারেন।
সৌরভ ব্যাবসায়িক কাজে আবারও লন্ডনে চলে গেলো। এবার আর পালিয়ে যেতে চায়নি, কাজেই গিয়েছে। সেখানেও ওদের ব্যাবসা আছে। ওখানকার ম্যানেজারই সব দেখাশোনা করেন। আর যখন খুব দরকার হয় তখন সৌরভ যায়।
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৯
সৌরভও বাসায় নেই আর সুবহাও অনেকদিন বাপের বাড়ি যায়নি। তাই প্রাণেশা শশুরবাড়ি চলে যাওয়ার সময় সুবহাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছে। সুবহা যেতে চাইছিলো না, প্রাণেশা জোর করেই নিয়ে গিয়েছে। অবশ্য মেয়েরা সাংসারিক হয়ে গেলে তাঁরা আর কোথাও যেতে চায়না।
