Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৯
জেরিন আক্তার

৭ মাস পরে,
প্রাণেশা অনেকদিন পরে বাবার বাড়িতে এলো। আরশাদ খানই গিয়ে বিকেলে নিয়ে এসেছেন। এই বাড়িতে এসেই সুবহার সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। দুই বান্ধবী কিছুক্ষন গল্প করলো। এরপরে প্রাণেশা রুমে ফিরে শুয়ে রইলো।
রাত ৮, টায় সৌরভ এলো বাড়িতে। আরও আগেই আসতো কিন্তু একটা ইভেন্ট এটেন্ট করার কারণে লেট্ হলো আসতে। আর প্রাণেশা কি খেতে পছন্দ করে সব কিছু নিয়ে এসেছে। ও সোজা প্রাণেশার রুমে ঢুকলো। প্রাণেশা শুয়ে শুয়ে স্নিগ্ধর সাথেই কথা বলছিলো। সৌরভকে দেখে ফোন রেখেই উঠে দাড়ালো। সৌরভ আবার আগের মতো প্রাণেশার মুখের সেই হাসিটা দেখতে পেলো। প্রাণেশা খুশিতে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কখন এলে? কেমন আছো ভাইয়া?”
সৌরভ হেসে বলল,
“ভালো তু্ই কেমন আছিস? দাড়া জিনিসগুলো নামিয়ে নেই।”
প্রাণেশা উত্তরে বলল,
“ভালো আছি।”
সৌরভ হাতে থাকা জিনিসগুলো বিছানায় রেখে বলল,
“একটু লেট্ হয়ে গিয়েছে আসতে। একটা ইভেন্ট ছিলো। নাহলে আগেই আসতাম।”
সৌরভ প্রাণেশার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“কিরে এবারও একা এসেছিস। তোর জামাই আসেনি কেনো? তোদের কাহিনী বুঝিনা তো।”
“সে কাজে ব্যাস্ত।”
সৌরভ কোমরে হাত রেখে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“লজ্জা পেয়ে আসেনা আর তু্ই মিথ্যে বলছিস কেনো?”
প্রাণেশা মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,

“মিথ্যে বলিনি। তার কথা বাদ। এখন তুমি আমাকে বলো তুমি কেনো শশুরবাড়ি যাও না?”
সৌরভ উত্তর দিতে গিয়ে থামলো। ও নিজেও তো
স্নিগ্ধর মতো লজ্জা পেয়েই যায় না। বোনের শশুরবাড়ি আবার সেখানে নিজেরও শশুরবাড়ি।
এখন বোনের প্রশ্নের উত্তরও তো দিতে হবে। কি উত্তর দিবে। প্রাণেশা কোমরে হাত রেখে দাড়ালো। সৌরভ তখন হেসে বলল,
“তোর জামাই আর শশুর মিলে আমাকে জোর করে বিয়ে করালো সেই রাগেই যাই না।”
প্রাণেশা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“একটুও বিশ্বাস হলো না। ও আমার বোঝা হয়ে গিয়েছে তুমি আর আমার জামাই একই।”
সৌরভ ধমক দিয়ে বলল,
“এখন এসব রাখ। আয় একসাথে খাবার খাবো।”

প্রাণেশা কিছু বলতে নিলে সৌরভ সেটা পাত্তা না দিয়ে চলে গেলো। প্রাণেশা বিছানায় এসে বসলো। ফোন হাতে নিয়ে দেখলো স্নিগ্ধ কথাগুলো শুনেছে। প্রাণেশা ফোন কানে নিয়ে কথা বলতেই, স্নিগ্ধ বলল,
“তুমি আমাদের দুজনের শশুরবাড়ি যাওয়া নিয়ে ঝগড়া করছিলে?”
“হুমম, ঠিকই তো বলেছি। আপনারা শশুরবাড়ি যান না কেনো?”
স্নিগ্ধ কথা ঘুরিয়ে বলল,
“তোমার ভাই না তোমাকে যেতে বলল যাও খেয়ে এসো। এখনও যাচ্ছো না কেনো?”
প্রাণেশা রেগে গিয়ে বলল,
“যাবো না, আর আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন কেনো? আমি তখন ঠিক বলেছি। আপনারা দুজনই এক।”
স্নিগ্ধ বলল,
“তা পরে শুনবো। এখন যাও খেয়ে এসো। খেয়ে এসে কল দিবে। তাছাড়া কল দিবে না।”
“ঠিক আছে, খাবার খেয়ে এসেই কল দিচ্ছি। এরপরে দেখবো কথা ঘোরান কেমনে?”
স্নিগ্ধ সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে যাও। এরপরে যত ঝগড়া করার করো।”
“হুমম রাখছি।”
স্নিগ্ধ বলল,
“আচ্ছা।”

প্রাণেশা সবার সাথে খেতে বসে কিছুটা অসস্তি ফিল করছে। খেতে ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে বমি করে দিবে। তাও কোনোরকম খেয়ে রুমে ফিরে এসে রেস্ট নিলো। এর মাঝে স্নিগ্ধকে কল দিয়েছিলো ও কাজে ব্যাস্ত আছে একটুপরে কল দিবে।
সুবহা এসে রুমের দরজা লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“দরজা লাগালাম।”
“ঠিক আছে।”
সুবহা লাইট নিভিয়ে এসে ওর পাশে শুলো। রাতটা আজকে প্রাণেশার সাথেই থাকবে। দুজনে আগেই ঠিক করে রেখেছিলো একসাথেই থাকবে।
সুবহা বলল,
“তু্ই এবার চুপচাপ কেনো থাকছিস? শরীর ভালো না নাকি?”
প্রাণেশা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কিছুই ভালো লাগছে কিছুদিন ধরে। ওই বাড়িতেও ভালো লাগলো না।”
সুবহা নরম গলায় বলল,
“তোর কেমন লাগে আমায় বল? কোথাও ঘুরতে যাবি?”
প্রাণেশা কিছু বলতে যাবে ঠিক তখন দরজায় নক করে কেউ। প্রাণেশা উঠে দরজা খুলে দেখলো সৌরভ। ও পিজ্জার একটা স্লাইড খাচ্ছিলো। আর আরেক হাতে পুরো পিজ্জাটা পার্সেল করা। সৌরভ পিজ্জাটা প্রাণেশার হাতে দিয়ে বলল,

“মজা খেয়ে দেখ।”
“তু তুমি আর খাবে না।”
“খেয়েছি তোরা খা। গুড নাইট।”
প্রাণেশা রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে লাইট জ্বালালো। সুবহা উঠে বসলো। প্রাণেশা পিজ্জাটা রেখে বলল,
“ভাইয়া দিয়ে গেলো।”
দুজনে একটা একটা স্লাইড তুলে খেতে শুরু করলো। প্রাণেশা প্রথম কামড়েই নাক-খিচে চলে গেলো ওয়াশরুমে। গন্ধই সহ্য হলো না ওর। শেষে বমি করে বের হলো। সুবহা জিজ্ঞাসা করলো,
“কিরে কি হলো ?”
“গন্ধ লাগে, খেতে পারিনা।”
সুবহা হেসে হেসে রসিকতা সুরে বলল,
“এখন মিষ্টি খাওয়াও। বুঝতে পেরেছি আমি ফুপ্পি সহ মামি হতে যাচ্ছি।”
প্রাণেশা বালিশ ছুড়ে বলল,
“তোর সব বাজে কথা।”
সুবহা হেসে বলল,
“সত্যি হলে কি দিবি সেটা বল?”
দুজনে এরকম রসিকতা, ঝগড়া, হাসাহাসি করে ঘুমিয়ে গেলো।

প্রাণেশা রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে আসার সময় মাথা ঘুরে পরে যায় সেটা সৌরভ ওর রুম থেকেই দেখতে পায়। সৌরভ দৌড়ে এসে হাটু গেরে বসে প্রাণেশাকে ধরে বলল,
“প্রাণেশা! এই, কি হলো রে?”
সৌরভ তৎক্ষণাৎ হাই তুলে সবাইকে ডাকলো।
“বাবা! বাবা! এই সুবহা! আন্টি! উপরে আসুন তো!”
সুবহা দৌড়ে আগে এলো। এরপরে আরশাদ খান আর রোকেয়া বেগমও এলো। সৌরভ প্রাণেশাকে কোলে তুলে নিয়ে রুমে গিয়ে শুইয়ে দিলো। আরশাদ খান তখনই ডক্টরকে কল দিলেন।
প্রাণেশার জ্ঞান ফিরলো। ডক্টর এসে ওকে চেকাপ করে জানালেন প্রাণেশা মা হবে। আরশাদ খান তো খুশি তে সৌরভকে জড়িয়ে ধরলেন। সৌরভ ডক্টরকে বললেন,
“আংকেল আমার বোনের শরীর ঠিক আছে তো?”
ডক্টর বললেন,

“হুমম ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই।”
একটু পরে আরশাদ খান ডক্টরকে এগিয়ে দিয়ে এলেন। সৌরভ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। খুশিতে কি করবে ওর জানা নেই। আরশাদ খান সাঈদ রেজা চৌধুরীকে কল দিলেন। খুশির খবরটা জানানোর জন্য। সৌরভ তখন তার কাছে থেকে ফোনটা নিয়ে নিলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“কেমন আছেন ভাই?”
“আংকেল আমি সৌরভ বলছি। ভালো আছেন?”
“ও তুমি। হ্যা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো বাবা?”
“ভালো। আংকেল একটা জরুরি কথা বলার আছে।”
“কি কথা?”
“স্নিগ্ধ কোথায়?”
“বাড়িতেই। কেনো কিছু হয়েছে?”
সাঈদ রেজা চৌধুরীর মনে চিন্তা ধরে গেলো। সৌরভ বলল,
“কিছু হয়নি। তবে আংকেল স্নিগ্ধকে নিয়ে আপনাকে একটু এই বাড়িতে আসতে হবে।”
“কি হয়েছে একটু বলবে চিন্তা হচ্ছে।”
“চিন্তা করবেন না। আপনারা আসুন।”
“ঠিক আছে আমরা আসছি।”
সৌরভ কল কেটে দিয়ে কাউকে জানাতে না করলো সাথে সুবহাকেও বলল ও যেনো ওর বাড়ির কাউকে না বলে।

আধঘন্টা পরে স্নিগ্ধ এলো। সাথে সাঈদ রেজা চৌধুরী। স্নিগ্ধ ও অনেক বেশি চিন্তিত। কি হয়েছে কেউই বলছে না। শেষে এখানে আসতেই বাধ্য হলো।
স্নিগ্ধ বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই সৌরভকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“ভাইয়া কি হয়েছে? কোনো সিরিয়াস কিছু?”
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“ওভাবে না বললে আসতে না তাই বলেছি। সিরিয়াস কিচ্ছু হয়নি খুশির খবর আছে।”
স্নিগ্ধ কিছুটা স্বস্তি ফেলে বলল,
“কি খুশির খবর?”
সৌরভ হেসে বলল,
“তুমি বাবা হতে যাচ্ছো।”
স্নিগ্ধ পুরো শকড। ঠাই স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের হার্টবিট দ্রুত চলছে। সাঈদ রেজা চৌধুরী পেছনে থেকে শুনে বললেন,
“বলো কি, আমাদের আগে বলবে না স্নিগ্ধ।”
স্নিগ্ধ পেছন ফিরে বলল,
“আমিই তো জানি না বাবা।”
সৌরভ স্নিগ্ধর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“কংগ্রাচুলেশন ভাই। আর ডক্টর এসে ওকে চেকাপ করে বলে গিয়েছে। এখন প্রাণেশা রুমে রেস্ট নিচ্ছে যাও।”
স্নিগ্ধ হেসে মাথা নাড়িয়ে উপরে এলো। আরশাদ খান সাঈদ রেজা চৌধুরীর সাথে কথা বলছেন। সৌরভ সোফায় গিয়ে বসলো।
স্নিগ্ধ প্রাণেশার রুমে ঢুকলো। সুবহা ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করে চলে গেলো। প্রাণেশা চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে রইলো। স্নিগ্ধ পাশে বসে চাদর সরিয়ে দিতে চাইলে প্রাণেশা আরও শক্ত করে চাদর ধরে রইলো। স্নিগ্ধ আর কাছে এসে হেসে বলল,
“এই দেখি তাকাও!”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর বুকে মুখ লুকালো। স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“শরীর খারাপ লাগছিলো আমি তখনই বলেছি চলো ডক্টরের কাছে যাই। আর তুমি পাত্তাই দাওনি। তুমি কি আগেই জানতে?”
প্রাণেশা মিনমিন করে বলল,
“আমি নিজেই তো জানতাম না। ডক্টর এসে বলল।”
স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বলল,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২৮

“ভালোই হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আর সৌরভ আমাদের এমনভাবে আসতে বলল আমরা তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আর এসে এতো ভালো খবর শুনে তো পুরো শকড হয়েছি। জানো কত খুশি হয়েছি। অনেক অনেক খুশি হয়েছি।”
অন্যদিকে সাঈদ রেজা চৌধুরী ফোন দিয়ে বাড়িতে বলে দিলেন। ঘন্টা খানিক পরে তিনি চলে গেলেন। স্নিগ্ধ রইলো। আজ চলে যাওয়ার কোনো মুডই নেই।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here