Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ২৫

মেজর কারদার পর্ব ২৫

মেজর কারদার পর্ব ২৫
ফিনারা ঝুমুর

তিনটে দিন কেটে গেছে। কারদার বাড়ির সেই কোলাহলপূর্ণ আনন্দময় পরিবেশটা যেন আচমকাই কেমন এক নিথর, নিশ্চল রূপ ধারণ করেছে। দিন তিনেক পূর্বে ঘটা করে কিঞ্জা আর সামীর বিবাহের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে সামনের মাসের মধ্যাংশে। কিন্তু সেই শুভ খবরের পর থেকেই কেমন যেন অস্বাভাবিক শান্ত আর জড়োসড়ো হয়ে আছে কিঞ্জা। ওর এই অদ্ভুত পরিবর্তন আর গুমোট ভাব দেখে মিথিলা, রাহাত, আদর ওরাও বিয়ের আনন্দে আর ওমন নাচন-কুদন করছে না। এক অজানা থমথমে নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো অন্দরমহলকে।
​কারদার বাড়ির পেছনের বাগানের মস্ত বড় আম গাছটার একটা নিচু ডালে পা ঝুলিয়ে উদাস মনে বসে আছে মেঘ। আষাঢ়ের ভেজা হাওয়া ওর পিঠময় ছড়িয়ে থাকা দীঘল কুন্তলরাশিকে অবাধ্যের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

​ওর মনের ভেতর তখন অনবরত তোলপাড় করে চলেছে তিন দিন আগের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের সমস্ত নোংরা সত্য, নিজের জারজ পরিচয় আর ঝিলি আপুর সেই নারকীয় মৃত্যুর গল্প শোনানোর পর শীর্ষ কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি। রাগ কিংবা ঘৃণা কিছুই প্রকাশ পায়নি ওনার অভিব্যক্তিতে। সেই নিকষ অন্ধকারে কেবল একটা পাথুরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড্ড নিষ্প্রাণ ও নিস্পৃহ কণ্ঠে একটি মাত্র কথাই বলেছিলেন,
​“রুমে যাও। বাহিরে হিম পড়ছে।”
​সে রাতে শীর্ষর ওমন চরম নির্লিপ্ত ও ভাবলেশহীন আনন দেখে মেঘ আর বাড়তি কোনো কথা বলার অবকাশটুকুও খুঁজে পায়নি। পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল ও শীর্ষর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহারে। যদিও ও মনে মনে নিজেকে এই অবহেলা আর দূরত্বের জন্য বহু পূর্বেই প্রস্তুত করে রেখেছিল; জানত ওর পরিচয় শুনলে আর পাঁচটা পুরুষের মতোই এই তপ্ত পাথর মানবটাও দূরে সরে যাবে। কিন্তু তবুও, শীর্ষর মুখের ওই ক্ষণিকের উদাসীন অবস্থান মেঘের তিলে তিলে গড়ে তোলা জোড়াতালি দেওয়া সহ্য ক্ষমতাটাকে এক লহমায় কাঁচের মতো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
সে থেকে শীর্ষর সাথে ওর কোনো সংযোগ হয়নি। দিন তিনেক শীর্ষর কায়ার ছায়া টুকুরও দেখা মেলেনি। শীর্ষর গলা শুনে নি। ও শুনেছে খুব ভোরে কোথাও চলে যায়, ফিরে মধ্য রাতে। মেঘ শীর্ষর অবহেলা মানতে পারছে। মন মানছে না!
বিষাদ মনে গুণগুণ করতে করতে সুর ধরে-

~ যাও পাখি বলো তারে
সে যেন ভোলে না মোরে;
সুখে থেকো, ভালো থেকো
মনে রেখো এ আমারে!~
মেঘের মনের সেই প্রগাঢ় বিষণ্নতা কিছুতেই দূরীভূত হচ্ছে না। যতক্ষণ না ও নিজের এই চোখ দুটো ভরে ওই তপ্ত জাঁদরেল মেজর সাহেবকে একবারটি সামনাসামনি দেখতে পারছে, ততক্ষণ মনের এই ছটফটানি আর শান্ত হওয়ার নয়। একরাশ উদাসীন ভাবনায় পুরোপুরি বশীভূত হয়ে থাকা মেঘ টেরই পায়নি যে ঠিক কখন ওর সামনে এসে এক দীর্ঘ চওড়া ছায়া এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
​“কালীনি!”

​আচমকা একটা কুৎসিত ও অসম্ভব অশোভন সম্বোধন কানের পর্দায় এসে ধাক্কা দিতেই মেঘের ঘোরের ভ্রম এক লহমায় কেটে গেল। আম গাছের ডাল থেকে নিজের পা দুটো সোজা করে ও অত্যন্ত বিরক্ত ও শক্ত মুখে মাথা তুলে ঠিক সম্মুখ পানে তাকাল। অহংকারী ও কুটিল স্বভাবের মেয়ে সূচি-কে নিজের সামনে ওভাবে হাত আড়াআড়ি করে কড়া চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও মেঘের চেহারায় বিন্দুমাত্র বাড়তি ভাবাবেগ বা ভয়ের সঞ্চার হলো না। ও নিজের গলার স্বর আর চাউনি একটু কঠোর ও ধারালো করে সপাটে জবাব দিল,
​“শিক্ষিত আর বনেদি ঘরের মেয়েদের মুখে এমন অশিক্ষিত ক্ষেতদের মতো নোংরা ভাষা আদেও মানায় না, সূচি আপু। বয়সে এতটা বড় হয়েও নিজের চেয়ে ছোটদের সাথে কীভাবে শালীন ব্যবহার করতে হয়, সেই সাধারণ ভদ্রতা আর কাণ্ডজ্ঞানটুকু কি আপনার নিজের পরিবার আপনাকে কোনোদিন শেখায়নি?”
মেঘের ওমন মুখরা আর চটাং চটাং কথা শুনে সূচির দুই কানের লতি মুহূর্তের মধ্যে অপমানে ও রাগে লাল হয়ে টকটকে হয়ে উঠল। চরম অপমান! কোথাকার কোন মফস্বলের সামান্য স্কুল মাস্টারের মেয়ে, তার কি না এত বড় দুঃসাহস সূচি-কে এভাবে সবার সামনে অপমান করে!​সে নিজের গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠল,

“দুটাকার ওই স্কুল মাস্টারের মেয়ে হয়ে তোর এত বড় দেমাগ আসে কোথা থেকে রে হ্যাঁ? ভুলে যিস না, খাস তো তোরা শেষমেশ আমাদেরই দেওয়া দয়ার টাকায়!”
​মেঘ আম গাছের ডাল থেকে সোজা হয়ে নিচে নেমে দাঁড়াল। ও সূচির চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বড্ড শান্ত অথচ বিষাক্ত গলায় বলল,
​“ভুল বললেন আপনি, সূচি আপু। আপনাদের কোনো দয়ার টাকায় নয়, বরং আমার বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা সৎ উপার্জনের টাকায় আমরা খুব রাজকীয়ভাবেই চলি। আর আমার বাবার সেই সৎ উপায়ের ভেতরে কিন্তু আপনাদের মতো নোংরা অহংকারীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকে তবে সেটা স্রেফ সামান্য এক-একজন শিক্ষার্থী হিসেবে! একজন শিক্ষার্থী হয়ে শিক্ষাগুরুকে কীভাবে ন্যূনতম সম্মানটুকু প্রদর্শন করতে হয়, সেই আদব কায়দাটুকুই যেখানে আপনার জানা নেই, সেখানে নিজেকে নিয়ে এত বড় বাহাদুরি দেখানোর সাহস আপনার আসে কী করে, শুনি?”

​মেঘের এমন যৌক্তিক ও উল্টো ফুঁড়নে সূচি যেন রাগে ও অপমানে তপ্ত তেলের মতো টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। ওর ভেতরের হিংসার আগুন তড়তড়ি করে বাড়তে লাগল। সে জ্ঞান হারিয়ে মেঘের দিকে একপ্রকার তেড়ে এসে মুখ কুঁচকে দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,
​“একে তো রাস্তার ফক্কিন্নি, তা আবার আস্ত এক কালিনী! এত বড় বড় কথা? বলি অঙ্কনের সাথে তোর এত কিসের পিরিত হ্যাঁ? সারাদিন ওর আশেপাশে ওভাবে কেন ঘুরঘুর করিস শুনি? বড়লোক আর হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেই কি তোদের মতো ছোটলোকদের জিব থেকে লোল পড়ে? আস্ত একটা চরিত্রহী—”
​সূচির কুৎসিত কথার শেষাংশে ও উচ্চারণ করার আগেই মেঘের ডান হাতটা সপাটে আছড়ে পড়ল সূচির ফর্সা গালটার ওপর! আস্তে নয়, নিজের ভেতরের জমানো সমস্ত শক্তি ও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বড্ড জোরে এক থাপ্পড় কষাল ও। চড়ের তীব্রতায় সূচির মাথাটা একপাশে ঘুরে গেল। মেঘের পুরো দেহটা তখন চরম ক্রোধ আর অপমানে থরথর করে কাঁপছে। ও নিজের গলা সর্বোচ্চ চড়াও করে বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল,
​“নিজে একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে কথা বলতে তোর লজ্জা করে না? সম্মান দিতে জানিস না ভালো কথা, তাই বলে নিজের ওই নোংরা মন মানসিকতা দিয়ে অন্যকে ওমন জঘন্য অপবাদ দিবি না খবরদার! তোর ওই অঙ্কনের পেছনে ঘুরে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করার মতো কোনো ফালতু সময় আমার নেই। আর যদি ওর আশেপাশে চলেও যাই, তবে মনে রাখিস তার সাথে আমার অত্যন্ত সম্মানীয় ও আলাদা দুটো সম্পর্ক রয়েছে। এক. সে আমার আপন বড় ভাইয়ের কলিজার টুকরো বেস্টফ্রেন্ড। আর দুই.আমার নিজের আপন খালামনি এই কারদার বাড়িরই ছোট বউ! সুতরাং, নিজের মুখটা সামলিয়ে কথা বলবি সূচি না পেঁচি! আস্ত একটা পেঁচামুখো মেয়ে একটা!”

​নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ সূচির মুখের ওপর উগরে দিয়ে মেঘ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ও গটগটিয়ে পা ফেলে সূচির সম্মুখ হতে হনহন করে সরে গেল এবং ড্রয়িংরুমের দরজা ঠেলে একদম অন্দরের ভেতর আড়াল হয়ে গেল।
​আজকের এই নোংরা ঝগড়াটার পর ওর সেই তিন দিন ধরে বিষাদগ্রস্ত হয়ে থাকা মনটা যেন আরও বেশি কুলষিত ও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। চোখে নোনা জল আটকে ও যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সিঁড়ির আর মাত্র দুইটা স্তর বাকি থাকতে মেঘের কানের পর্দায় এসে আছড়ে পড়ল সেই তীব্র, পরিচিত ও পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর! যার জন্য ও গত বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল!

​“মা! ও মা!”
​বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে শীর্ষর ওমন উচ্চস্বরে আর অস্থির হয়ে চেঁচানো শুনে শিউলি বেগম রান্নাঘরের দিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন। বড় ছেলের ওমন রণমূর্তি দেখে তিনি নিজের হাঁপাতে থাকা বুকটা চেপে ধরে বললেন,
​“কী হয়েছে রে শীর্ষ? দুপুরের বেলা বাড়ি ঢুকেই ওভাবে পাড়া মাথায় করে চেঁচাচ্ছিস কেন বাবা?”
​শীর্ষ নিজের কাঁধের ব্যাগটা সোফায় এক আছাড়ে ফেলে দিয়ে, নিজের সেই আগের মতো চিরচেনা জাঁদরেল ও বাজখাই গলা চালু রেখেই কড়া মেজাজে চেঁচিয়ে বলল,
​“তোমাকে আমি এর আগেও কতবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছি মা যে ওই সূচি নামের মেয়েটাকে এই বাড়িতে আসতে সম্পূর্ণ বারণ করতে! ও কেন বারবার আমাদের এই অন্দরে ঢোকার সাহস পায়? ওই মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলেই আমার নিজের হাতে ওকে খুন করতে মন চায়!”
শিউলি বেগম চমকে ওঠেন। শীর্ষর ওমন বাজখাই গলার চিৎকার শুনে যার যার রুম থেকে বাড়ির সবাই একে একে করিডোরে ও ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে আসে। শিউলি বেগম অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে আশেপাশে মেহমান ও আত্মীয়দের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
​“এমন রুক্ষ ব্যবহার কেন করছিস শীর্ষ? মাথা ঠান্ডা কর। ও তোর হবু স্ত্রী, এই বাড়ির হবু বড় বউ। এখানে ও আসতেই পারে, ওর পূর্ণ অধিকার আছে। তাছাড়া, সম্পর্কে ও তো তোর নিজের আপন মামাতো বোন!”
​“হবু বউ মানে কী, মা?”
শীর্ষ নিজের চওড়া কপালটা কুঁচকে ক্ষিপ্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল,

“ওকে কি আমি কোনোদিন আমার স্ত্রী হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছি? কিংবা কোনোদিন মানব? ওর মতো একটা নোংরা আর নিচু মানসিকতার মেয়েকে আমি আমার লাইফ পার্টনার করব? পাগল হয়েছ তুমি মা? ওর নিজের ক্যারেক্টার আদেও ঠিক আছে?”
​শীর্ষর মুখ থেকে নিজের মেয়ের নামে এত বড় বড় অপবাদ আর কুৎসিত কথা শুনে এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না শীর্ষর আপন মামা তৌফিক মৃধা। তিনি হনহন করে শীর্ষর কাছে এগিয়ে এসে অত্যন্ত গম্ভীর ও রাগী গলায় বললেন,
​“আমার একমাত্র মেয়ের নামে সবার সামনে এসব আজেবাজে কথা বলার সাহস তুমি কোথায় পাও শীর্ষ? মেয়ে কি আমার রাস্তায় পড়ে থাকা কোনো ফেলনা জিনিস?”
​“আপনার মেয়ে ফেলনা কি না তা আমি জানি না, তবে ও যে আস্ত একটা ক্যারেক্টারলেস, তা আমি খুব ভালো করেই জানি!”
শীর্ষ নিজের মামার চোখে চোখ রাঙিয়ে প্রখর ও তপ্ত গলায় কথাগুলো বলে দিল। এই মুহূর্তে শীর্ষর ভয়ংকর ইগো আর ক্রোধের সামনে কারোর কোনো তোয়াক্কা নেই। ও চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ওর কি ন্যূনতম মোরাল ভ্যালুজ আছে? ও কি জানে কার সাথে কেমন বিহেভ বা ব্যবহার করতে হয়? অহংকারী, উগ্র আর অসভ্য আপনার ওই আদরের দুলালি সূচি!”
​“কী করেছে আমার মেয়ে? ওমন বানোয়াট অপবাদ দিচ্ছ কেন তুমি?”
তৌফিক মৃধার পেছন থেকে ওনার স্ত্রী শামীমা পারভীন অত্যন্ত চড়া গলায় বলে উঠলেন।​শীর্ষ ওনার কথা শুনল, তারপর ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক ও হিমশীতল হাসি ফুটিয়ে সোজা হাত উঁচিয়ে সিঁড়ির দিকে ইশারা করল,

​“ওই যে সিঁড়ির গোড়ায় যে নিষ্পাপ মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন? সে মেয়েটাকে এই মাত্র আপনার ওই অতি আদরের সুশিক্ষিত মেয়ে বাইরের বাগানে একা পেয়ে কালীনি বলে চরম অপমান করেছে! বড় বড় মুখে বলেছে ওই মেয়ে নাকি আস্ত একটা চরিত্রহীন! তা মামি, আপনার ওই নিজের গর্ভজাত মেয়ে যখন এক অবিবাহিত পরপুরুষের রুমে লুকিয়ে ঢুকে তাকে নিজের সাথে বেড শেয়ার করার অফার দেয়–তখন আপনার সেই মেয়েকে সমাজে ঠিক কোন নামে ডাকা চলে? তাকে আদেও চরিত্রবান বলা চলে কি?”
​শীর্ষর মুখ থেকে ওমন জ্বলন্ত ও বিস্ফোরক কথাটি শোনামাত্রই উপস্থিত ড্রয়িংরুমের সবার পায়ের তলার মাটি যেন এক লহমায় সরে গেল! সবাই চরম চমকে উঠে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
​ওদিকে ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলেয়া বানু যখন সিঁড়ির ওপরে মেঘের দিকে তাকালেন, তখন দেখলেন ওনার আদরের ছোট মেয়েটার ফর্সা মুখশ্রী অপমানে আর কষ্টে এক্কেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে। তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে মেঘের কাছে ছুটে গেলেন। আর ঠিক তখনই পিংকি বেগমও অপর পাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে মেঘের কাছে যেয়ে ওকে পরম স্নেহে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে আগলে নিলেন।

​পিংকি বেগম মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে আর্দ্র গলায় শুধালেন,
“সূচি তোকে সত্যিই এই একটু আগে বাইরে ওসব নোংরা কথা বলেছে, মা?”
​মেঘ নিজের চোখ ফেটে আসা জলটুকু চেপে ধরে মেজো খালামনির বুকের মাঝে আলতো করে মাথা নাড়ল। পিংকি বেগম এক বুক ফাটানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে সূচির দিকে চরম তপ্ত চোখে তাকালেন।
​এদিকে ড্রয়িংরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে কিঞ্জা, মিথিলা, রাহাত আর আদরওরা চারজন মিলে কোনো টিকিট ছাড়াই কারদার বাড়ির এই লাইভ ও ফ্রি সিনেমা তথা মেজরের রূঢ় অ্যাকশন বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখছে! বেশ হবে সূচি, বূচি সাজা পেলে। ওরা নাচবে।
​তৌফিক মৃধা নিজের মেয়ের ওমন কুৎসিত কীর্তির কথা সবার সামনে ফাঁস হয়ে যেতে দেখে অপমানে ও রাগে কাঁপতে কাঁপতে শীর্ষর দিকে তেড়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে বললেন,

​“বাইরের একটা ফক্কিন্নি মেয়ের জন্য আজ নিজের ঘরের মামাতো বোন আর হবু বউকে এভাবে সবার সামনে অপমান করছ তুমি, শীর্ষ? ভুলে যেও না সম্পর্কে আমি কিন্তু তোমার আপন মামা হই!”
“সেটা ভুলিনি বলেই তো আপনার মেয়ে এখনও অক্ষত দেহে বেঁচে আছে, মামা। ওটা ভুলে গেলে ওকে জ্যান্ত কেটে পিস পিস করে পদ্মায় ভাসিয়ে দিতে এই শীর্ষর এক সেকেন্ড সময় লাগত না!”
​শীর্ষর লাল হয়ে যাওয়া তপ্ত মুখশ্রী আর চোখের সেই খুনে হিংস্রতার দিকে তাকিয়ে তৌফিক মৃধা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে এক্কেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। ওনার মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও সরল না। ড্রয়িংরুমের বাকি সবাই যখন শীর্ষর ওমন রণমূর্তি দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে চুপ করে গেছে, ঠিক তখনই সমস্ত লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে সূচি এগিয়ে এসে শীর্ষর চওড়া কাঁধের ওপর নিজের হাত রাখল। অত্যন্ত আকুল ও ভাঙা গলায় কেঁদে উঠে বলল,
​“আমি তোমায় বড্ড বেশি ভালোবাসি, অঙ্কন! ওমন একটা নগণ্য মেয়ের জন্য তুমি আমায় এভাবে সবার সামনে রিজেক্ট কেন করছ, বলো? কী আছে ওর মাঝে?”
​শীর্ষ নিজের কাঁধ থেকে সূচির হাতটা এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ড্রয়িংরুম কাঁপিয়ে সপাটে ঘোষণা করল,
​“কারণ, তোর নজরে থাকা ওই দুটাকার মেয়েটাই আইনত এবং ধর্মীয়ভাবে আমার একমাত্র বৈধ স্ত্রী! আমার অর্ধাঙ্গিনী!”

​শীর্ষর মুখ থেকে বের হওয়া এই একটা মাত্র বাক্য পুরো কারদার বাড়ির অন্দরে যেন এক জীবন্ত পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাল! সবাই নিজের চোখ দুটো মস্ত বড় বড় করে চরম বিস্ময়ে শীর্ষ আর সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল। সূচি চরম অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে শীর্ষর দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে বলতে লাগল,
​“মিথ্যে বলছ তুমি! এটা অসম্ভব! আমাকে তোমার পিছু ছাড়ানোর জন্য তুমি এই সাজানো মিথ্যে গল্প বলছ, অঙ্কন!”
​শীর্ষ এবার সূচির দিকে সরাসরি না তাকিয়ে বড্ড খ্যাঁকখ্যাঁক করে অবহেলার সুরে বলে উঠল,
“কোথাকার কোন ফালতু মেয়ে রে তুই? তোকে নিজের পিছু ছাড়ানোর জন্য এই শীর্ষকে মিথ্যে নাটকের আশ্রয় নিতে হবে কেন, হ্যাঁ? মেঘকে আমি নিজের সমস্ত জোর খাটিয়ে বিয়ে করেছি। ও আমার বিবাহিত বউ। এই কারদার বাড়ির হবু বড় বউ আর স্বয়ং শীর্ষ কারদারের হৃদকুঠিরের একমাত্র মালকিন!”

​কথাটা শেষ করেই শীর্ষ নিজের মায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জাঁদরেল কমান্ডিং গলায় নির্দেশ দিল—,
“আজ রাতের ভেতর মেঘের সাথে আমার আনুষ্ঠানিক কাবিনের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করো। বড্ড দ্রুত!”
​উপস্থিত সকলকে আরও একবার চরম অবাক করে দিয়ে, শীর্ষ হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। পিংকি বেগমের কোল থেকে আড়ষ্ট ও স্তম্ভিত মেঘকে এক ঝটকায় নিজের শক্ত দু-হাতে ছাড়িয়ে নিয়ে, আলতো করে নিজের চওড়া কাঁধের ওপর তুলে নিল ও! মেঘ লজ্জায় আর বিস্ময়ে ওনার পিঠে হাত দিয়ে মৃদু ছটফট করে উঠলেও শীর্ষর লোহার মতো শক্ত বাঁধন আলগা হলো না।
​ভারী বুটের শব্দ তুলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে শীর্ষ পেছন ফিরে নিচের মিথিলা আর কিঞ্জার উদ্দেশ্যে চড়া গলায় বলে গেল,

মেজর কারদার পর্ব ২৪

​“নিচের সোফায় মেঘের আনা সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর ব্যাগ রাখা রয়েছে। তোরা ওগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ পরেই ওপরে এসে ওকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিবি। আর হ্যাঁ মা, আমার এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার আগে ওনারা যেন কোনোভাবেই এই বাড়ির সীমানা পার না হতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করো!”

মেজর কারদার পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here