প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৬
বন্যা সিকদার
ঝিরঝিরে নদীর হাওয়া আর ঘন পাতার খসখসানি শব্দে চারপাশটা এক ভৌতিক নিস্তব্ধতায় ঢাকা। নিঝুম জঙ্গল‚ যার কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে এক শান্ত নদী। এই জনমানবহীন নির্জন প্রান্তরে জল্লাদের মতো ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন সশস্ত্র যুবক। আর তাদের বৃত্তের ঠিক মাঝখানে‚ মাটিতে হাত-পা শক্ত রশিতে বাঁধা অবস্থায় লুটিয়ে আছে দুটি ছেলে। বাঁচার আকুতিতে তারা মাটিতে পশুর মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে কিন্তু তাদের কান্না শোনার মতো কেউ নেই। ঠিক তখনই জঙ্গলের বুক চিরে পায়ে হেঁটে এগিয়ে এলো আরও দুটি অবয়ব। অবয়ব বললে ভুল হবে‚ তারা একজন পুরুষ আর একজন নারী। দুজনেরই পরনে কুচকুচে কালো পোশাক আর মুখে আঁটা কালো মাস্ক। তারা সামনে এসে দাঁড়াতেই চারপাশের জল্লাদদের মধ্যে এক অদ্ভুত তৎপরতা দেখা দিল।
আচমকা‚ সেই মাস্ক পরিহিত রহস্যময়ী নারীটি তার হাতের একটি আঙুল তুলে বাকিদের দিকে ঠান্ডা ইশারা করল। আর সেই ইশারা পাওয়া মাত্রই হিংস্র নেকড়ের মতো ছেলে দুটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বাকি যুবকেরা। তাদের হাতে থাকা মোটা লাঠি আর রড অনবরত আছড়ে পড়তে লাগল মাটিতে পড়ে থাকা অর্ধনগ্ন শরীর দুটির ওপর। ছেলে দুটির গায়ে কোনো সুতো নেই‚ তাই প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে চামড়া ফেটে ফিনকি দিয়ে কাঁচা লাল রক্ত ছিটকে বের হতে লাগল। তাদের আর্তনাদে জঙ্গলের বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল। মারধর যখন একপর্যায়ে থামল‚ তখন সেই কালো পোশাকধারী নারী ধীর পায়ে ছেলে দুটির ক্ষতবিক্ষত দেহের দিকে এগিয়ে গেল। তার হাতে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা। সে কোমর থেকে একটা ধারালো ছোরা বের করে ছেলে দুটির সারা শরীরে গভীর করে ব্লেড চালানোর মতো আঁচড় কাটতে লাগল। ছাল-চামড়া আলগা হয়ে যাওয়া সেই তাজা ক্ষতের ওপর সে এক লহমায় ঢেলে দিল এক বাটি শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো।
”আল্লাহর দোহায় লাগে ছাড়ুন আমাদের। মরে গেলাম বাঁচাও।
লঙ্কার তীব্র ঝাঝ আর পোড়ানিতে ছেলে দুটি পৈশাচিক যন্ত্রণায় চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু তাদের সেই বুকফাটা হাহাকার দেখে মাস্কের আড়ালে থাকা ওই নারীর ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক ও পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে তীব্র ঘৃণায় ঝুঁকে পড়ল তীব্র জ্বলনে ছটফট করতে থাকা একটি ছেলের দিকে। তার মাথার চুল মুঠো করে ধরে এক হিংস্র বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল‚
”কষ্ট হচ্ছে? ভিষণ কষ্ট হচ্ছে তাই না রে জানোয়ারের দল? ঠিক এই রকমই তীব্র কষ্ট‚ এর চেয়েও হাজার গুণ বেশি নরক যন্ত্রণা হয়েছিল সেই নিষ্পাপ মেয়েগুলোর। যাদের তোরা মানুষ নামের কলঙ্করা এর চেয়েও ভয়াবহভাবে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছিলি।
চুল ধরে থাকা ছেলেটি যন্ত্রণায় চোখ উল্টে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় কোনোমতে বলল‚ “ক ক ক কিসের কথা বলছেন আপনারা? আ আ আ আমরা কাউকে কষ্ট দিইনি! দোহাই আপনাদের‚ আমাদের প্রাণভিক্ষা দিন। আমরা বাঁচতে চাই!
ছেলেটির মুখে বাঁচার আকুতি শুনে সেই নারী এক উন্মত্ত ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির শব্দে তারা শিউরে উঠল। হাসতে হাসতেই আচমকা তার হাতের ধারালো ছুরিটা ছেলেটির হৃৎপিণ্ড বরাবর সজোরে গেঁথে দিল সে! পাসবিক শক্তিতে ছুরিটা বুকের ভেতর ঢুকে যেতেই কলকল করে গরম রক্ত ছিটকে বের হয়ে মৌ’য়ের কালো পোশাক ভিজিয়ে দিল। যন্ত্রণার শেষ সীমায় পৌঁছে ছেলেটি এক গগনবিদারী চিৎকার দিল। নারীটি এক চুলও দয়া না দেখিয়ে‚ ঠিক একইভাবে পাশের ছেলেটির বুকেও ছুরি চালিয়ে তাকেও খতবিক্ষত করে দিল। দুজন নরপিশাচ যখন নিজেদের রক্তের পুকুরে শুয়ে ছটফট করছে‚ তখন ওই নারী ও পুরুষের চোখে এক পরম বিজয়ের আনন্দ চকচক করে উঠল। নারীটি আবারও এক প্রলয়ংকরী হুংকার ছাড়ল।
”প্রাণভিক্ষা চাস তোরা? প্রাণভিক্ষা‚ দিয়েছিলি তোরা সেই অসহায় মেয়ে গুলোকে প্রাণভিক্ষা? যাদের তোরা স্রেফ ওয়ান-টাইম টিস্যুর মতো ইউজ করে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছিলি? তারা যখন তোদের পায়ে ধরে জীবনের শেষ আকুতি করেছিল‚ তখন তো তোদের পাষাণ মন গলেনি। তবে আজ কেন তোদের আমি মুক্তি দিই‚ বল?
প্রথম ছেলেটি রক্তাক্ত মুখ উঁচিয়ে শেষবারের মতো কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেই। মৌ ক্ষিপ্ত হয়ে একটার পর একটা গুনে গুনে ছয়বার তার ধারালো ছুরির ফালা বসিয়ে দিল ছেলেটির ক্ষতবিক্ষত বুকে। প্রতিটি ফালা বসানোর সাথে সাথে মাংস কাটার বীভৎস শব্দ হতে লাগল। ছেলেটি নিজের জীবনের শেষ ভিক্ষা চেয়ে গোঙাতে লাগল। কিন্তু সেখানে কেউ তার কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে নেই। হুট করেই সেই নারী তার সমস্ত রুদ্ধমূর্তি আর খুনে চোখ নিয়ে ছেলেটির কানের কাছে মুখ নামাল। শীতল ও ফিসফিসানি কণ্ঠে আওড়াল‚
”প্রথম ফালাটা দিলাম‚ আমার জানের টুকরোকে মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে তোদের পশুবৃত্তির চাহিদা মেটানোর জন্য। দ্বিতীয় ফালাটা দিলাম‚ আমার জানের নিষ্পাপ হৃদয়টাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলার জন্য। তৃতীয় ফালাটা দিলাম‚ আমার জান তোকে নিজের আপন ভাই ভেবে বিশ্বাস করার পর যেভাবে তুই তাকে পেছন থেকে ঠকিয়েছিস‚তার প্রতিশোধে। চতুর্থ ফালাটা দিলাম‚ আমার জানের ওপর তোরা যে অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিস তার জন্য। পঞ্চম ফালাটা দিলাম‚ আমাদের পরিবারের সকলের বিশ্বাস এভাবে ভাঙার জন্য। আর এই ষষ্ঠ ফালাটা দিলাম‚ কারণ আমার আম্মু তোকে নিজের পেটের ছেলের মতো ভালোবেসে বিশ্বাস করেছিল আর তুই সেই মায়ের অন্ন খেয়ে তার সাথেই বেইমানি করলি।
মৃত্যুর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছেলেটি চোখ দুটো কোনোমতে মেলে। শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে জিজ্ঞেস করল‚ “ক ক কে আপনি?
নারীটি নিজের মুখের মাস্কটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। চাঁদের আলোয় তার চোখের হিংস্রতা আর ঠোঁটের বাঁকা হাসি স্পষ্ট হয়ে উঠল। এবং ততক্ষণে আবারও মুখ ঢেকে সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল‚ ”আমি তালুকদার বাড়ির মেজো মেয়ে এবং চৌধুরী বাড়ির মেজো পুত্রবধূ তাসফিয়া মৌ চৌধুরী!
কথাটা শেষ করেই মৌ আর এক মুহূর্তও অপচয় করল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাক পরিহিত পুরুষটির হাত থেকে এক কোপে মাথা নামানোর চওড়া ও ভারী ‘রামদা’ নিজের হাতে তুলে নিল। সারা শরীর শক্ত করে সে চিৎকার করে উঠল‚
”আল্লাহু আকবর!
সেই পবিত্র ও ভয়ংকর ধ্বনি বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতেই মৌ তার হাতের রামদা দিয়ে সজোরে কোপ বসাল ছেলেটির গলায়। এক কোপেই ধড় থেকে মাথা আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ল বহু দূরে। ঠিক একই ক্ষিপ্রতায় সে পাশের নরপিশাচটির গলাতেও রামদা চালাল। সদ্য গলা কাটা মুরগির মতো দেহ দুটি মাটিতে পড়ে কিছুক্ষণ তীব্রভাবে লাফালাফি করতে লাগল‚ আর তাদের শরীর থেকে বের হওয়া ফিনকি দেওয়া লাল রক্তে চারপাশের মাটি ও ঘাস ভিজে কাদা হয়ে গেল। দেখতে দেখতে দেহ দুটির শেষ স্পন্দনটুকুও স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা নিজেদের পাপের শাস্তি পেয়ে ওপারে পাড়ি জমাল। সেই কালো পোশাক পরিহিত পুরুষটি আর কেউ নয়‚ স্বয়ং সাব্বির। মৌ এক বিশ্বজয়ের তৃপ্তির হাসি হেসে সাব্বিরের দিকে হাত বাড়াল। সাব্বির পকেট থেকে কয়েক বান্ডিল চকচকে টাকা মৌ’য়ের হাতে দিল। মৌ সেই টাকাগুলো যুবকদের হাতে তুলে দিয়ে ইশারা করতেই তারা নিজেদের পারিশ্রমিক পেয়ে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নদীর তীরে লুকিয়ে রাখা স্পিডবোটে উঠে তারা মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারের বুকে হাওয়া হয়ে গেল।
তারা চলে যেতেই মৌ আর সাব্বির দ্রুত নিজেদের গা থেকে রক্তভেজা কালো পোশাক এবং মুখের মাস্ক খুলে ফেলল। চতুর অপরাধীর মতো তারা সমস্ত আলামত নদীর স্রোতস্বিনী জলে ভাসিয়ে দিল‚ যাতে কোনো ফরেনসিক টিম বা পুলিশ খুনের বিন্দুমাত্র চিহ্নও খুঁজে না পায়। তবে যাওয়ার আগে মৌ ওই দুটি মুণ্ডহীন লাশের মাঝখানে ছোট্ট একটা সাদা চিরকুট রাখল‚ আর তার ওপর একটা ভারী পাথর চাপা দিল যাতে নদীর বাতাসে ওটা উড়ে না যায়। সেই রক্তভেজা চিরকুটে গুটিকয়েক অক্ষরে বড় বড় করে লেখা ছিল:
❝ধর্ষণকারীদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো রাইট নেই❞
সবশেষে মৌ আর সাব্বির মূল রাস্তা এড়িয়ে বনের ভেতরের এক বিপরীত ও গোপন পথ ধরে অত্যন্ত সাবধানে তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো‚ যাতে ভুলেও কোনো তৃতীয় ব্যক্তির নজরে তারা না আসে। বেইমানির প্রতিশোধ রক্ত দিয়েই শেষ হলো।
নদীর তীর থেকে ফেরার পথে সাব্বির মেইন রাস্তা দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সতর্কভাবে হেঁটে যাচ্ছিল কিন্তু মৌ যেন একদমই অন্য গ্রহের বাসিন্দা। সে নিজের মতো নেচে-কুদে‚ লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলেছে। একপর্যায়ে লাফালাফি বন্ধ করে সে হুট করেই সাব্বিরে’র হাত জড়িয়ে ধরে ঝুলতে ঝুলতে হাঁটতে শুরু করল। সাব্বির শতবার বারণ করা সত্ত্বেও মেয়েটা আজ কোনো কথাই শুনছে না। ওদিকে সাব্বিরে’র বুকের ভেতর তখন ভয়ের চোটে রীতিমতো ঢাকঢোল বাজছে। সেদিন সামান্য একটু জড়িয়ে ধরার কারণেই উজান তাকে যে ক্যালানি দিয়েছিল‚ তা সে এখনো ভোলেনি। আর আজ কাটফাটা দুপুরে এই রাস্তায় উজান যদি মৌ’কে এভাবে তার গায়ের ওপর লেপ্টে থাকতে দেখে‚ তবে কোনো কিছু না ভেবেই তাকে নির্ঘাত পরপারে পাঠিয়ে দেবে। সাব্বির নিজের নাক কুঁচকে অত্যন্ত তটস্থ হয়ে মৌ’কে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল‚
“লক্ষ্মী বোন আমার। দোহাই তোর‚ একটু দূরে দূরে গিয়ে হাঁটো। এমনিতেই তোকে নিয়ে এই ভরদুপুরে বের হয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেছে। তার ওপর উজান ভাইয়া গতকাল স্পষ্ট বারণ করার পরেও তুই যদি এভাবে আমার গায়ের ওপর লেটকে থাকিস‚ আর ওটা যদি ভাইয়া কোনোভাবে দেখে ফেলে তবে আমার কপালে কী চরম দুর্দশা আছে‚ তুই কি তা বুঝতে পারছিস?
মৌ এক তাচ্ছিল্যের ঝামটা দিয়ে বলল‚ “চুপ করো তো ভাইয়া। তুমি আমার মতো একজন সাহসী‚ বীর বোন পেয়ে মনে মনে গর্ব বোধ না করে উল্টো ভয়ের চোটে কাঁপছো? ছিঃ তোমার তো একটা কুত্তার লেজের সাথে ফাঁসি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত।
“হ্যাঁ‚ এখন শুধু সেটাই বাকি আছে আমার। কিন্তু বইন‚ একটা কথা সত্যি করে বল তো। তুই কীভাবে ওই জানোয়ার দুটোকে ওমন করে জ**বাই করলি রে? না মানে‚ তোর হাতটা একবারের জন্যও কাঁপল না? একটুও ভয় করেনি তোর?
মৌ এবার বেশ শব্দ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল। ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে তারা তালুকদার বাড়ির সীমানার ভেতর ঢুকে পড়েছে। তাই মৌ কণ্ঠস্বর একদম নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল‚
“ওসমান তালুকদারের নাতনি আমি‚ আর তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো আমার ভয় করে কি না? ওসমান তালুকদার নিজে একলা দাঁড়িয়ে একসাথে একশোটা লাশ ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। আর আমি তার রক্তের হয়ে এই সামান্য দুটো পশুকে মারতে ভয় পাবো? হাউ ফানি।
মৌ’য়ের আজব যুক্তি শেষ হতে না হতেই মেহের এবং মৌ’য়ের মা অত্যন্ত ফ্যাকাশে মুখে দৌড়ে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। মৌ’য়ের মায়ের চোখে-মুখে তখন এক চরম আতঙ্ক ও উদগ্রীব ভাব। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপো কাঁপো গলায় বললেন‚ “জানিস মা রহিমা’র কুলাঙ্গার ছেলে আর তার এক বন্ধুকে নাকি কে বা কারা জঘন্যভাবে মারধর করে‚ গলা কেটে মাথা শরীর থেকে আলাদা করে নদীর তীরে ফেলে রেখে গেছে। পুরো গ্রাম তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।
মৌ মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখের সমস্ত ভাব পরিবর্তন করে অবাক হওয়ার নাটক করল। সে নিজের শুকনো মুখ বানিয়ে আমতা আমতা করে বলল‚ “সত্যি বলছো আম্মু? একটা পশুর মতো মানুষ এই জঘন্য কাজটা করতে পারলো? তবে আমার কী মনে হয় জানো আম্মু? যে-ই কাজটা করেছে‚ সে একদম ঠিক কাজ করেনি। তার উচিত ছিল ওই ধর্ষকগুলোর শুধু গলা না কেটে‚ ওদের ‘ইয়ে’টাও আগে কেটে ফেলা। তবেই না আসল শাস্তি হতো।
মৌ’য়ের মুখ থেকে এমন ঘোরতর ও খোলামেলা কথা শোনামাত্রই তার মা পুরো থতমত খেয়ে গেলেন। পাশেই রোহান আর সাব্বির দাঁড়িয়ে আছে‚ আর তাদের মতো জোয়ান ছেলেদের সামনে মেয়েটা কীভাবে এমন অবলীলায় এসব কথা উচ্চারণ করে। মৌ’য়ের মা লজ্জায় আর অস্বস্তিতে তোঁতলাতে তোঁতলাতে বললেন‚ “আচ্ছো তোরা এখানে থাক‚ আমি একটু ওদিক থেকে আসছি।
এই বলে তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে চলে গেলেন। তিনি চলে যেতেই সাব্বির আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হো হো করে হেসে উঠে।
“এই তেঁতুল গাছের পেত্নী! তোর ভেতরের সাধারণ বোধবুদ্ধি কি এক্কেবারে লোপ পেয়েছে নাকি? মামির সামনে কেউ ওমন ইয়ে কাটার কথা বলে?
”যাহ্ বাবা। দোষ করল ওই নরপিশাচ গুলো অথচ তাদের বেলায় কিছু না‚ আর আমি জাস্ট একটা ন্যাচারাল সলিউশনের কথা বলেছি বলেই যত দোষ। হুহ!
মৌ মুখ বাঁকাল। তারপর মৌ এবার ধীরপায়ে মেহেরে’র দিকে এগিয়ে গেল। মেহের তখনো বড় বড় চোখ করে এক ফ্যাকাশে ও শুকনো মুখে মৌ’য়ের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে মৌ’কে কাছে আসতেই অত্যন্ত কাঁপানো গলায় শুধাল‚
“মৌ সত্যি করে বল তো‚ কে করল এসব? গ্রামের মানুষ তো ভয়ে কাঁপছে।
”যে-ই করুক না কেন‚ পাপ করলে তার শাস্তি তো প্রকৃতি কোনো না কোনোভাবে দেবেই। সো‚ জাস্ট চিল বেইবি!
এই বলে মৌ কোনো এক বিজয়ীর মতো মেহেরে’র চারপাশে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। সাব্বির পলকহীনভাবে মেয়েটার এই অদ্ভুত কাণ্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। এত বড় একটা নৃশংস খুনের মিশন শেষ করে এসে একটা মেয়ে কীভাবে এত রিল্যাক্স মুডে ঘুরতে পারে‚ এমনকি অন্যকে চিল করার পরামর্শ দিতে পারে তা ভেবেই সাব্বিরে’র মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা হলো। সাব্বির কিছুটা মৌ’য়ের দিকে ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে আওড়াল‚
“বইন রে‚ তুই এত রিল্যাক্স কীভাবে থাকিস বল তো? আমাকেও একটু ওমন ঠান্ডা মাথায় রিল্যাক্স থাকার টিপস দিস।
”সময় হলে দেবোনি। এবার তুমি এখান থেকে কাটো দেখি ভাইয়া। ওদিকে তোমার গার্লফ্রেন্ড আবার তোমায় দেখতে না পেয়ে অভিমান করে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে‚ যাও যাও।
সাব্বির একগাল মুচকি হেসে সেখান থেকে প্রস্থান করল। সাব্বির চলে যেতেই মৌ মেহেরে’র হাত ধরে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। তার মুখের এই পরম তৃপ্ত ও বিজয়ের হাসি দেখে মেহেরে’র মনের ভেতরের সুপ্ত সন্দেহটা এবার দ্বিগুণ রূপ নিল। গতকাল রাতেও এই মেয়েটা সাব্বিরে’র সাথে আড়ালে ফিসফিস করে কী যেন গোপন কথা বলছিল। এমনকি আজ সকাল থেকেও সে অনেকক্ষণ ধরে বাড়িতে ছিল না। আবার তার ফেরার ঠিক পরপরই খবর এলো যে মেহেরে’র জীবনের সেই ধর্ষকদের বাকি দুজনকে কেউ অত্যন্ত নৃশংসভাবে কেটে নদীর তীরে ফেলে রেখে এসেছে। মেহের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক গভীর সন্দেহভরা ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মৌ’য়ের চোখের দিকে চেয়ে থমকানো গলায় বলে উঠল।
“পাখি একদম সত্যি করে বল তো আমায়‚ এই পুরো কাণ্ডটা তুই নিজে করেছিস তাই না? দেখ পাখি আমার কাছে অন্তত কোনো মিথ্যা কথা বলবি না। পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত ঘটনার কথা আমি কিন্তু আজও ভুলে যাইনি। সেদিনও হয়তো তুই তীব্র রাগের মাথায় ওই চার কুলাঙ্গারের মধ্য থেকে একজনকে চলন্ত গাড়ির সামনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলি। আর তার ঠিক তিন বছর পর‚ দ্বিতীয়জনকেও কেউ একজন ছুরি দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলেছিল। যার ভয়ে বাকি দুজন কুলাঙ্গার এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আর আজ‚ দুই বছর পর যখনই তারা আবার এই গ্রামে পা রাখল‚ ঠিক তখনই তোর হুট করে এই গ্রামে আসার জন্য জেদ চাপল। এই সবকিছুর টাইমিং কেমন যেন বড্ড সন্দেহজনক লাগছে আমার কাছে। প্লিজ পাখি‚ আমায় বল কী হয়েছিল আজ সকালে?
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৫
মেহেরে’র এমন অকাট্য যুক্তি ও জেরা শুনেও মৌ’য়ের মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের রেখা ফুটল না। সে মেহেরে’র গাল দুটো আলতো করে টিপে দিয়ে অত্যন্ত আদুরে সুরে বলল‚
”ওহ বেইবি! তুইও না পারিস বটে। আমি এসব খুনাখুনির বিন্দুমাত্র কিছু জানি না। তুমি ওসব আজেবাজে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে জাস্ট এটা ভেবে খুশি হ যে‚ পাপীরা শেষমেশ তাদের নিজেদের করা পাপের চরম শাস্তি পেয়ে গেছে। এবার এই আজগুবি গোয়েন্দাগিরি বন্ধ করে সোজা নিজের বরের কাছে যা তো দেখি। ইফাত ভাইয়া তার বউকে ছাড়া নিশ্চয়ই ওদিকে ছটফট করছে। আর আমি বরং একটু গিয়ে দেখি‚ আমার ওই খাটাস প্রফেসর বরটা আবার কোথায় কোথায় টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই বলে মৌ মেহের’কে উঠানে একা দাঁড় করিয়ে রেখে নিজের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত হালকা পায়ে বাড়ির পেছনের বাগানটার দিকে এগিয়ে গেল।
