Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪
বন্যা সিকদার

“শুট করে দেবো। ফুল অনলি রোহান তালুকদারের। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে‚ ওর বরটাকে এই পৃথিবী থেকেই চিরতরে মুছে ফেলব। তবুও আমার ফুল’কে আমি আমার বুকে ফিরিয়ে আনবই আনব।
​রোহনে’র মুখ থেকে এমন ভয়ংকর ও পৈশাচিক স্বীকারোক্তি শুনে মৌ‚ মেহের, এমনকি দাদি রোকেয়া বেগমও চরম আতঙ্কে শিউরে উঠলেন। ছেলেটার চোখ-মুখে তখন এক বিধ্বংসী ক্ষোভের আগুন জ্বলজ্বল করছে। তার এই হিংস্র রূপ দেখে মৌ’য়ের বুকটা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে এক অজানা আশঙ্কায় আরও শক্ত করে উজানে’র হাতটা আঁকড়ে ধরল। ভয়ের তীব্রতায় তার হাতের ধারালো নখগুলো উজানে’র চামড়া ভেদ করে ভেতরে ডেবে যাচ্ছে কিন্তু নিজের অজান্তেই সে সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল করতে পারল না।
​মৌ’য়ের এমন অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক আচরণ দেখে উজানে’র কপাল কুঁচকে গেল। এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই মেয়েটার মাঝে কেমন যেন একটা ছটফটানি আর পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সে। হঠাৎ করেই উজান শিউরে উঠল‚ তার হাতের তালুতে মৌ’য়ের গায়ের লাগতেই আগুনের মতো গরম ঠেকল। ​উজান মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের গলা আর কপাল স্পর্শ করে তাপমাত্রা চেক করে দেখল। পুরো শরীর জ্বরে পুড়ছে মেয়েটার। সাথে সাথে তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। সে এক কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল‚
​“পিচ্চি তুমি না কিছুক্ষন আগে বললে তোমার কিছু হয়নি? তাহলে শরীর এত গরম কেন‚ হুম? এত জ্বর বাঁধালে কীভাবে? আমার অবর্তনে বৃষ্টিতে ভিজেছিলে? সত্যি করে বলো আমায়।

​মৌ কিছু বলার আগেই পাশ থেকে মেহের মুখ খুলল‚ “হ্যাঁ‚ হ্যাঁ ভাইয়া। মৌ গতকালকে টানা দুই ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিল। আমি কত বারণ করলাম কিন্তু ও আমার কোনো কথাই শোনেনি। তখনই ওর ঠান্ডা লেগে গিয়েছিল কিন্তু ও কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি। আপনাকে বলতেও আমায় বারণ করেছিল।
​মেহেরে’র মুখে সত্য ফাঁস হতে দেখে মৌ একরাশ অসহায় চোখ নিয়ে তাকাল। মনে মনে ভাবল‚ কোথায় মেহের তাকে উজানে’র বকা থেকে বাঁচাবে‚ তা না করে উল্টো সবার সামনে এভাবে ফাঁঁসিয়ে দিল! ​মৌ অত্যন্ত দুর্বল ও মিনমিন করল‚ “সত্যি বলছি প্রফেসর সাহেব…আমার কিচ্ছু হয়নি। এমনকি একটুও ঠান্ডাও লাগেনি।

​কিন্তু কপাল খারাপ। কথাটি শেষ হতে না হতেই মৌ’য়ের বুক চিরে এক দমকা কাশি উঠে এলো। নিজের মিথ্যা ধরা পড়ে যাওয়ায় মৌ চট করে উজানে’র বুক ঘেঁষে মুখ লুকিয়ে নিল। ​মৌ’য়ের এমন কাণ্ড দেখে উজান রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ধীর কণ্ঠে বলল‚ “রুমে চলো আজ‚ ওখানেই তোমাকে মজা দেখাচ্ছি৷ অনেক বড় হয়ে গিয়েছো‚ নিজের শরীরের যত্ন নিতে পারো না তাই না?
​উজানে’র সেই তীব্র চাহুনি দেখে মৌ’য়ের শুকনো ঢোক গেলা ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। উজান এবার মৌ’য়ের দিক থেকে সাময়িকভাবে নিজের তপ্ত দৃষ্টি সরিয়ে নিল এবং সোজা রোহনে’র দিকে তাকাল। রোহন তখনো ওভাবেই বসে ছিল। উজান হালকা হেসে বলল‚
​“রোহন তুই যেন কী বলছিলি? ও হ্যাঁ‚ কাউকে মার্ডার করার কোনো দরকার নেই দোস্ত। তুই জাস্ট আমাকে ওই মেয়েটির নাম-ঠিকানা বল‚ আমি নিজেই তাকে তোর বুকে এনে দেবো।
​রোহন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জোর করে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল‚ “থ্যাংকস দোস্ত! কিন্তু আমার ফুল’কে পাওয়ার জন্য শুধু আমি একাই লড়াই করব। তোদের কারো সাহায্য আমার লাগবে না। তোরা পারবি না আমার ফুল’কে আমার করে দিতে।
​রোহনে’র এই কথার ভেতরের আসল বিষাক্ত গভীরতা উপস্থিত আর কেউ না বুঝলেও মৌ‚ মেহের আর দাদি রোকেয়া বেগম ঠিকই টের পেলেন। এরপর আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে রোহন গুটি গুটি পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল। ​রোহন চলে যেতেই উজান সোজা রোকেয়া বেগমের দিকে ফিরল। এবং নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“সুইটহার্ট‚ আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা ছিল।
​রোকেয়া বেগম রোহনে’র যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উজানে’র ডাকে তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে তার দিকে তাকালেন। উজান এবার নিজের গলার স্বর কিছুটা নিচু করে প্রশ্ন করল‚ ​“আচ্ছা সুইটহার্ট গত এক সপ্তাহ ধরে এই গ্রাম ও আশপাশের এলাকা থেকে যে ১৬ জন মেয়ে মিসিং হলো‚ এসব ব্যাপারে আপনি কি কিছু জানেন? মানে‚:এই নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে আসলে কার হাত থাকতে পারে?
​রোকেয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখের পান চিবুতে চিবুতে চরম হতাশ গলায় উত্তর দিলেন। ​”জানি না রে দাদাজান। সেদিন ওই মোখলেসের মা এসে বলল ১৬ থেকে ২০ বছরের তরুণী মেয়ে গুলোকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশে খবর দেওয়ার পরেও তারা কোনো পাত্তা দিচ্ছে না‚ হাত গুটিয়ে বসে আছে। এতগুলো মেয়ে উধাও হয়ে গেল অথচ কেউ কোনো হদিস পাচ্ছে না। আজকাল তো পোলাপান ভয়ে স্কুল-কলেজে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ যত মেয়ে হারিয়েছে‚ সব নাকি স্কুল-কলেজের পথ থেকেই উধাও হয়েছে। এলাকার কয়েকজন তো বলাবলি করছে এসব নাকি মানুষের কাজ না‚ কোনো জিন-পরীর নজর পড়েছে মেয়ে গুলোর ওপর। আমার দুই নাতনি তোরা কিন্তু একদম সাবধান। তোরা কেউ ভুলেও এই কদিন বাড়ির বাইরে যাবি না। সারাক্ষণ ঘরের ভেতর থাকবি‚ বুঝলি?

​মৌ আর মেহের বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে দাদির কথায় সায় দিল। উজান এক তীব্র সন্দেহজনক দৃষ্টিতে পাশে থাকা তন্ময়ে’র দিকে তাকাল। নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করে উঠল‚ “স্যাটানিস্ট? নাকি কোনো চক্র? এতগুলো অল্পবয়সী মেয়ে গায়েব হয়ে গেল অথচ পুলিশ রহস্যজনক ভাবে নীরব হয়ে আছে। উল্টো জিন-পরীর অবাস্তব গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এই আধুনিক যুগে এসব ফালতু গল্প কি বিশ্বাস করা যায়? এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো অপরাধচক্র কাজ করছে।
​উজান আর দেরি না করে তন্ময়কে ইশারা করে বলল‚ “তন্ময় আমার সাথে বাইরে আয় তো একবার।
​সে দরজার কাছে গিয়ে আবার একটু থমকে দাঁড়াল। মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল‚ “শালিকা আমার বউ’টাকে একটু ভালো করে কিছু খাইয়ে একটা প্যারাসিটামল দিয়ে দিও তো। আমার ফিরতে একটু রাত হতে পারে। ইফাত‚ তুই বাড়ির সবার খেয়াল রাখিস।

​মৌ কিছু একটা বলতে মুখ খুলেছিল কিন্তু তার আগেই উজান আর তন্ময় ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ​উজান চলে যেতেই মৌ নিজেও বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। এই মানুষটাকে সে কিছুতেই বুঝতে পারে না কখন কী করে বসে। সে নিজের রুমে ফিরে গিয়ে একটু শুয়ে থাকবে ভাবল। মৌ যেই না নিজের রুমের দরজার কাছে পৌঁছাল‚ অমনি এক জোরালো হেঁচকা টানে কেউ তাকে পাশের এক ফাঁকা রুমে ভেতরে টেনে নিয়ে গেল। ​হঠাৎ এমন ঘটনায় মৌ প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে আঁতকে উঠলেও‚:পরক্ষণেই তার হাত ও শরীরের স্পর্শ টের পেয়ে সে বুঝে গেল এই ঘৃণ্য কাজটা কার। মুহূর্তেই তার ভয় রূপ নিল চরম ক্রোধে। সে তীব্র হিংস্র চোখ মেলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোহনে’র দিকে তাকাল।
​রোহন তখনো এক অদ্ভুত ভাব নিয়ে মৌ’য়ের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক বাঁকা হাসি। মৌ আর সহ্য করতে পারল না‚ সে নিজের সমস্ত শক্তি এক করে রোহনে’র বুকে সজোরে এক ধাক্কা দিল।
​আচমকা ধাক্কায় রোহন কিছুটা পিছিয়ে গেল বটে কিন্তু তার ভেতরের শয়তানি কমল না। সে আবার দুষ্টু হেসে বলতে লাগল।

​“বাহ্ বাহ্ আমার ফুল দেখছি এই তীব্র জ্বরের শরীরেও অনেক জোর রাখে। তা এত এনার্জি পাচ্ছিস কোথায় হুম?
​তার এমন নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে মৌ’য়ের মাথার রাগ এক লহমায় চড়ে গেল। সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল‚ “জাস্ট শাট আপ রোহান ভাইয়া। তোমার দিন দিন একটু বেশি স্পর্ধা বেড়ে যাচ্ছে তাই না? তোমাকে কতবার বললে তুমি আমার পিছু ছাড়বে‚ বলো তো? প্রফেসর সাহেব যদি একবারের জন্যও টের পান যে তুমি আমায় এভাবে জোর করে স্পর্শ করেছো‚ তবে তার পরিণতি কী হবে তুমি ধারণা করতে পারছো?

​রোহন এক বিকৃত হাসিতে ফেটে পড়ল‚ “তাতে আমার বা*ল ছিঁড়ে যাবে। তোর ওই প্রফেসর আমার কিছুই করতে পারবে না ফুল। উল্টো তোকে আমি ওর বুক থেকে কেড়ে নিয়ে আমার করে দেখাবো।
​”স্বপ্ন দেখতে থাকো। স্বপ্ন দেখতে তো আর টাকা লাগে না।
মৌ অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। ​মৌ’য়ের মুখে এমন আত্মবিশ্বাসী জবাব শুনে রোহন কিছুটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। মেয়েটার গলার আওয়াজ এতটা শক্ত আর গম্ভীর লাগছে কেন? তবুও সে নিজের জেদ বজায় রেখে দৃঢ় গলায় বলল‚ ​“তুই কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছিস ফুল?
​”হুম‚ করলাম চ্যালেঞ্জ। পারলে আমাকে উজান চৌধুরীর বুক থেকে কেড়ে নিয়ে দেখাও।
​রোহনে’র ঠোঁটের কোণে এক পাশবিক হাসির রেখা ফুটে উঠল‚ “ওকে‚ চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড। তুই এখনো এই রোহান তালুকদারকে চিনিসনি ফুল। রোহান তালুকদার কে‚ তা তোর কল্পনারও বাইরে। এই রোহান তালুকদার তার ভালোবাসাকে নিজের বুকে ফিরিয়ে আনার জন্য শুধু তার বেস্ট ফ্রেন্ড উজান নয়‚ দরকার হলে নিজের আপন ভাইকেও খুন করতে এক সেকেন্ডও ভাববে না।

​রোহনে’র মুখ থেকে উজান’কে খুনের হুমকি শোনা মাত্রই মৌ’য়ের মাথার সব রক্ত যেন এক সেকেন্ডে চড়ে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক উন্মত্ত আক্রোশে সে রোহনে’র বুকে এমন এক সজোরে ধাক্কা দিল যে রোহন ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে বিছানার ওপর পড়ে গেল। ​আকস্মিক এই ধাক্কায় রোহন যখন বিছানায় শুয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই মৌ এক মরণকামড় দেওয়া শিকারির মতো হিংস্র রূপ ধারণ করল। সে এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে নিজের পা-খানা সজোরে রোহনে’র চওড়া বুকের ওপর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে গেল। ​বিছানায় পিষ্ট হয়ে রোহন স্তম্ভিত ও নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল মৌ’য়ের দিকে। তখন মৌ তার ওপর নিজের পায়ের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে হিংস্র বাঘিনীর মতো গর্জন তুলল‚
​”শুট করে দেবো যে আমার স্বামীর দিকে হাত বাড়াবে! মিসেস উজান চৌধুরী যেমন শান্ত‚ তেমনই ভয়ংকরও হতে পারে। আমি হলাম বাঘিনী‚ যার শিকারে যে একবার পড়ে‚ তার কলিজা ছিঁড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখি।

​মৌ’য়ের এমন ভয়ংকর রূপ দেখে রোহানে’র চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হলো। এই শান্ত-শিষ্ট মেয়েটার মাঝে হঠাৎ এত সাহস আর তেজ কোথা থেকে এলো‚ সে কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারছে না। মৌ নিজেই নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিয়ে রোহানে’র বুক থেকে নিজের পা-খানা সরিয়ে নিল। ​ঠিক তখনই রোহন বিছানা থেকে উঠে বসে এক অদ্ভুত জেদ আর হিংস্রতা নিয়ে কুম্ভকর্ণের মতো গম্ভীর স্বরে বলল‚
“ফুল তুই থ্রেট দিচ্ছিস আমায়?
​মৌ তার দিকে এক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। গলার কণ্ঠস্বর আরও শক্ত করে বলল‚ “মিসেস উজান চৌধুরী কখনো কাউকে মুখে থ্রেট দেয় না। সময় যখন আসবে‚ তখন তুমি নিজেই নিজের পরিণতি ঠিকই দেখতে পাবে।

​“তুই জানিস আমি কে? আমার পাওয়ার কতদূর? —রোহন দাঁতে দাঁত চাপল।
​”তুমি কে? তোমার আসল রূপ কী? সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। তবে তুমি এখনো জানো না যে আমি আসলে কে? মেয়ে বলে আমায় এত সহজ ভেবো না। তোমার মতো কত নরপিশাচকে যে আমি নিজের পায়ের নিচে ফেলে পিষেছি। তারা আমার কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল কিন্তু আমি বিন্দুমাত্র ছাড় দিইনি। এখনো সেই নরপিশাচদের মাঝে দুজন জ্যান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তাদের সমূলে ধ্বংস করতে এবার শুধু তাসফিয়া মৌ নয়‚ এসেছে মিসেস তাসফিয়া মৌ চৌধুরী!

​মৌ’য়ের এই কথার ভেতরের আসল গভীরতা আর রহস্য রোহান নিজের বুদ্ধি দিয়ে ছুঁতে পারল না। এমনিতেই মেয়েটার এই মারকুটে রূপ সে নিতে পারছে না। তার ওপর এমন রহস্যময় কথা। সে বুঝতেই পারছে না মৌ আসলে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ​মৌ রুম থেকে চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে অগ্রসর হলো কিন্তু হঠাৎ করেই ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক তাচ্ছিল্যের রেখা।
​”আর হ্যাঁ‚ জিজ্ঞেস করলে না যে আমার এই তীব্র অসুস্থ শরীরেও কীভাবে এত এনার্জি এলো? তাহলে ভালো করে শুনে রাখো‚ যেখানে প্রফেসর উজান চৌধুরী নিজে আছে‚ সেখানে তার ওয়াইফির গায়ে এনার্জির কমতি থাকবে কীভাবে হুম? তোমার মতো একটা নিকৃষ্ট মানুষের ওপর আমি মায়া দেখাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি তো দয়ারও যোগ্য নও। জাস্ট রেডি হও রোহান তালুকদার। তুমি আসলে কে? কী তোমার আসল পরিচয়? আর বিদেশের মাটিতে বসে কীভাবে তুমি রাতারাতি এত কোটি টাকার মালিক হলে সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি গোটা পৃথিবী জানতে পারবে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!
​এই বলে মৌ মুখে এক বাঁকা ও বিজয়ের হাসি ঝুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রোহান এক অদ্ভুত ও স্তব্ধ দৃষ্টিতে তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মৌ’য়ের এই নতুন রুদ্ধমূর্তি মেনে নেওয়া তার জন্য বড্ড কঠিন হয়ে উঠছে।

​মৌ নিজের রুমে এসে বিছানায় সটান শুয়ে পড়েছে। মেহের অত্যন্ত চিন্তিত মুখে তার মাথায় অনবরত জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে মৌ’য়ের শরীরের তাপমাত্রা কমাতো দূরের কথা‚ উল্টো আরও বেড়ে গিয়েছে। মেহের যখন থার্মোমিটার দিয়ে তার জ্বর মেপে দেখলো ১০৩° সেলসিয়াস! জ্বরের এই মাত্রা দেখে মেহেরে’র কপালে দুশ্চিন্তার গাঢ় ছাপ পড়ল। ​সে ইতিমধ্যেই উজান’কে দু-দুবার ফোন দিয়েছে কিন্তু উজান একবারও ফোন রিসিভ করেনি। উজানে’র এই উদাসীনতা দেখে মৌ’য়ের অবুঝ মনে এখন আকাশ সমান অভিমান দানা বাঁধছে। মানুষটা মুখে এত ভালোবাসার কথা বলে‚ অথচ সে দেখে গেল তার এত কড়া জ্বর‚ তবুও এখন পর্যন্ত বাড়ি ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই।
​মেহের নিজ হাতে মৌ’কে কিছুটা খাবার খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিল। ঠিক তখনই রুমের দরজা ঠেলে রুমে এসে হাজির হলো ইফাত। ইফাত’কে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু ও চপল হাসি খেলে গেল। সে বুঝতে পারল এবার কী হতে চলেছে।
​ইফাত রুমে ঢুকেই সোজা এসে বিছানার এক পাশে মেহেরে’র একদম গা ঘেঁষে বসে পড়ল। তবে সে শুরুতে মুখে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ ওভাবেই চুপচাপ বসে থাকার পর সে নিজের স্বভাবসুলভ আকুলতায় নিচু স্বরে আওড়াল‚

​“ফুলকন্যা…রুমে চল না প্লিজ।
​মেহের সাথে সাথে এক তীব্র রাগী দৃষ্টিতে ইফাতে’র দিকে তাকাল। মৌ’য়ের শরীরটা এত খারাপ‚ এত জ্বর নিয়ে মেয়েটা বিছানায় ছটফট করছে। আর এই লোকটা তাকে নিজের রুমে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। মেহের রাগ সামলাতে না পেরে কর্কশ কণ্ঠে বলল‚
“আপনার কি মাথাটা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গিয়েছে? উজান ভাইয়া এখনো বাড়ি ফেরেনি‚ তার ওপর মৌ এই তীব্র জ্বর নিয়ে একা একা রুমে কীভাবে থাকবে‚ বলুন তো? মাঝরাতে যদি ওর কিছু হয়ে যায়‚ তখন কী হবে? ওর যে কতটা কষ্ট হচ্ছে‚ তা কি আপনি বুঝতে পারছেন না? আমি আজ রাতে এখানেই ঘুমাবো‚ আপনি নিজের রুমে যান।

​মেহেরে’র এমন সরাসরি প্রত্যাখ্যান শুনে ইফাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সে মুখটা একদম ছোট করে অসহায় স্বরে আওড়াল‚ ​“ভাবির কষ্ট হচ্ছে সেটা তুমি দেখতে পাচ্ছো অথচ তোমার এই অভাগা বরটার যে কষ্ট পাচ্ছে‚ তা তোমার এই চোখে একবারও পড়ছে না? প্লিজ ফুলকন্যা‚ রুমে চলো না। ভাবি একা রুমে দিব্যি থাকতে পারবে‚ তাছাড়া একটু পরেই তো উজান চলে আসবে তাই না ভাবি?
​ইফাত এবার মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে সাহায্যের আশার বাণী চাইল। কিন্তু মেহের আজ বরের কোনো ওজর-আপত্তি শুনতেই রাজি নয়। সে মৌ’কে মুখ খোলার কোনো সুযোগ না দিয়েই নিজে থেকে কঠোর গলায় বলল‚ “দেখুন আমি আর কথা বাড়াতে চাই না। আমি এই অসুস্থ অবস্থায় মৌ’কে ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। আপনি প্লিজ একটা রাত কষ্ট করে একাই ঘুমান।
​ঠিক তখনই বিছানা থেকে মৌ দুর্বল গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল‚ “মেহু তুই যা না। আমি ঠিক আছি। তাছাড়া….

​”তুই চুপ করবি মৌ। তুই আমার আগে এই পৃথিবীতে আসিসনি। তাছাড়া মামনি তোর কাছে থাকতে চেয়েছিল কিন্তু আমি থাকতে দেয়নি৷ এখন যদি মামনি শোনে তার মেয়েকে একা ফেলে আমি চলে গিয়েছি তখন কি হবে? আর ইনি বউ ছাড়া এত গুলো বছর যখন ও একা একা কাটাতে পেরেছে‚ তবে একটা রাতও ও অনায়াসে পারবে। আপনি যান তো এখান থেকে।
​মৌ এবার মেহেরে’র আড়ালে দাঁড়িয়ে ইফাতকে চোখের ইশারায় কিছু বলল। আর সেই ইশারা পাওয়া মাত্রই ইফাত আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে হুট করে মেহের’কে এক ঝটকায় পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিল এবং রুম থেকে বের হতে হতে বলল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৩

​“আগে বউ ছিল না তাই কষ্ট হলেও একা একা থাকতাম। এখন ঘরে নিজের রূপবতী বউ থাকতেও আমি একা কষ্ট পাবো? ইম্পসিবিল। ভাবি তুমি নিজের খেয়াল রেখো‚ উজান একটু পরেই চলে আসবে।
​কোলে উঠেই মেহের লজ্জায় আর রাগে লাল হয়ে ইফাতে’র চওড়া বুকে একটার পর একটা কিল-ঘুষি মারতে লাগল। ​কিন্তু ইফাত আজ আর ছাড়ার পাত্র নয়‚ সে মেহেরে’র সব বাধা অগ্রাহ্য করে নিজের বিজয়ী বাহুডোরে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রুম থেকে চলে গেল। ​যাওয়ার পথে তাদের এই মিষ্টি কাণ্ড দেখে মৌ খিলখিল করে হেসে উঠল। অতঃপর উজানে’র ওপর এক বুক অভিমান আর ক্লান্তি নিয়ে সে বিছানায় নিজের গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল মৌ।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here