তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৫
noorayn
মধ্যাহ্নের অলস আবেশে খানবাড়ির নারী সদস্যারা ড্রয়িংরুমে বসে গল্পে মশগুল। বরাবরের মতোই মেহরোজা আক্তার নিজের এবং উনার প্রয়াত স্বামী মুজাহিদের প্রেমকাহিনি শুনিয়ে চলেছেন নাতনিদের।
নীলা গালে হাত ঠেকিয়ে একের পর এক হাই তুলতে তুলতে সেই গল্প শুনছে। আর আলিশা সোফায় আধশোয়া হয়ে আঙুলে নিজের চুল পেঁচিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চিপস খেয়ে যাচ্ছে – তার আপাতত অন্যাদিকে মনোযোগ নেই।
এদিকে, শাইনা সবার জন্য যত্ন করে ফল কেটে দিচ্ছে। আয়শা এক হাতে তেলের বাটি নিয়ে নীলা আর আলিশার পিছু নিয়েছেন ; তেল লাগাবেন বলেই যেন তার এই একরোখা যুদ্ধ। তবে দুজনের কেউই এতে রাজি নয়। শেষমেশ, আয়শার কড়া ধমকে হার মেনে নীলা মুখ গোমড়া করে চুলে তেল দেওয়ার জন্য নিচে বসে পড়লো।
–ঘরে প্রত্যেকে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলেও সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দু একটাই – ছোট্ট আরশান ; যে এখন প্লেয়িং ম্যাটের ওপর বসে আপনমনে খেলনা নিয়ে খেলছে। কখনো একদিকে হামাগুড়ি দিচ্ছে তো আবার মুহূর্তেই অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। হাঁটতে শিখেছে বেশ কিছুদিন হলেও সে যেন হামাগুড়ি দিয়েই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। খেলায় মশগুল থাকলেও ছোট্ট ডোরার নজর একটু পর পর সবার দিকে ঘুরছে ; বিশেষত নিজের মায়ের দিকে।
–খেলতে খেলতেই হঠাৎ ছোট্ট ডোরার গোলগাল চোখ দুটো মায়ের দিকে গিয়ে আঁটকালো। মায়ের হাতে রঙিন একটা প্যাকেট দেখে তার কৌতুহল চেপে বসলো সেটা নেওয়ার। এই মুহূর্তে সেটা যেন তার পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিস হয়ে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের সোফার কাছে এসে পৌঁছালো।
ওদিকে, আলিশা তখনও নিজের ভাবনার জগতে ডুবে আছে; আঙুলে চুল পেঁচাতে পেঁচাতে একের পর এক চিপস মুখে তুলছে।
ইতিমধ্যেই, সুযোগ বুঝে ছোট্ট ডোরা নিজের নরম, তুলতুলে গুলুমুলু হাতটা সোজা বাড়িয়ে দিলো চিপসের প্যাকেটের দিকে।
“হুপ!”
–প্যাকেটটা আঁকড়ে ধরার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে। কিন্তু তার হাত এতটাই ছোট যে প্যাকেটের অর্ধেকও ধরতে পারলো না। তবুও হাল ছাড়ার পাত্র সে নয়। ঠোঁট গোল করে আবারও হাত বাড়ালো সেদিকে।
আলিশা চমকে তাকিয়ে দ্রুত প্যাকেটটা সরিয়ে নিলো।
“ডোরা! এদিকে কী করছো তুমি? যাও, নিজের খেলনা নিয়ে খেলো। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।”
–বকুনি শুনে ডোরা একদৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলো। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে আধো আধো গলায় বললো –
“মা…ম্মা…”
“মাম্মা বেড়াতে গেছে। এখন গিয়ে খেলো।”
ডোরা মাথা কাত করলো। তারপর আবার নিজের হাতদুটো বাড়িয়ে দিয়েছে আলিশার দিকে…
“কু…লে…”
“বলেছি না, মাম্মা বেড়াতে গেছে। যাও, ফুমার কাছে যাও।”
মা কোলে নিচ্ছেনা দেখে ছোট্ট মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো।
“মাম্মা… বেড়ু… দাই?”
“হ্যাঁ, মাম্মা বেড়াতে গেছে।”
–কথাটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস হলো না তার। গোলগাল দুই হাত একবার মুঠো করে, আবার খুলে মায়ের দিকেই বাড়িয়ে দিলো।
“নাইই… মাম… নান্নাই…”
অভিমান মেশানো সেই আধো আধো কথাগুলো শুনে ঘরে থাকা সবাই হেসে উঠলো।
–ডোরা এবার একবার মায়ের কোলে ওঠার চেষ্টা করছে তো আবার ফাঁক পেলেই চিপসের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে – এই মুহূর্তে তার চিপ্স আর মায়ের কোল ; দুটোই চায়।
ডোরা মাকে ছাড়া একমুহূর্তে থাকতে চায়না। আলিশার সারাদিন কাটে বাচ্চাকে নিয়ে। তবে এই অভ্যাস ধীরে ধীরে ঠিক করতে হবে নাহলে সামনে আলিশার এক্সাম থাকলে সে কিভাবে সব ম্যানেজ করবে? এসব ভেবে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো “ডোরা… মাম্মা একটু রেস্ট নিচ্ছে। ফুমার কাছে যাও।”
–নীলা তখন দুই হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে ডাকলো –
“এই যে আমাদের শান! ফুমা এখানে। এসো, ফুমার কাছে এসো।”
পরক্ষণেই ডোরা ঘাড় ঘুরিয়ে নীলার দিকে তাকালো। দু’সেকেন্ড ভেবে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে টুপটাপ করে গিয়ে ফুপার কোলে উঠে বসলো।
নীলা আর দেরি না করে ফোলা ফোলা দুই গালে ফটাফট কয়েকটা চুমু এঁকে দিয়েছে।
কিন্তু ডোরার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
তার সব মনোযোগ গিয়ে আটকালো, নীলার হাতে ঝুনঝুন শব্দ করা রঙিন চুড়িগুলোয়।
সে দুই হাত দিয়ে সেগুলো ধরার চেষ্টা করছে আবার সুযোগ পেলেই মুখে পুরে নেওয়ার আয়োজন করছে।
নীলা যতবার হাত সরিয়ে নিচ্ছে, ততবারই ডোরা নাক ফুলিয়ে এমন অভিমানী চোখে তাকাচ্ছে ; যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা এখন তার সঙ্গেই করা হচ্ছে।
–শাইনা একপলক সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“দাদুভাই? কিছু খাবেন?”
কিন্তু ডোরার সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। এই মুহূর্তে তার সমগ্র মনোযোগ জুড়ে রয়েছে নীলার হাতে টুংটাং শব্দ করা রঙিন চুড়িগুলো। ছোট্ট ছোট্ট আঙুলে সেগুলো আঁকড়ে ধরে টানার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে। সুযোগ পেলেই যেন মুখে পুরে নেবে। নীলা যতবার হাত সরিয়ে নিচ্ছে ততবারই সে ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে অভিমানী চোখে নিজের ফুমার দিকে তাকাচ্ছে। আবার পরমুহূর্তেই, নতুন উদ্যমে চুড়িগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
এদিকে, আয়শা নীলার চুল বেধে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। “আলিশা, উঠো। এদিকে এসো।”
আলিশা সঙ্গে সঙ্গেই মুখ কুঁচকে ফেললো।
“মাম্মা, আমি তো বলেছি তেল দেবো না।”
“তোমার কথা শুনতে চাইনি আমি। আসতে বলেছি, এদিকে আসো।”
শাইনা ফলের বাটিটা সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন,
“আগে দাদুভাইকে একটু কিছু খাইয়ে দিক। তারপর না হয় তেল লাগিয়ে দিবি। দেখ না, কেমন করে নীলার হাত ধরে মুখে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ক্ষিদে পেয়েছে বোধহয়।”
–কথাটা শুনে আয়শারও দৃষ্টি গেল আরশানের দিকে। তিনি এগিয়ে গিয়ে নাতিকে কোলে তুলে নিলেন। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আদর করতে করতে স্নেহভরা গলায় বললেন –
“আমার নানুভাইয়ের বুঝি খুব ক্ষিদে পেয়েছে?”
–ডোরা কিছু বলল না। গোল গোল চোখ মেলে নানুমার মুখের দিকে পিটপিট করে চেয়ে রইল। যেন প্রাণপণ চেষ্টা করছে তার কথাগুলোর অর্থ বুঝতে।
আয়শা আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
“কী খাবেন আমার নানুভাই? খিচুড়ি খাবেন?”
— ‘খাবেন’ শব্দটা কানে যেতেই ডোরার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। সে মুহূর্তেই মায়ের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঠোঁট গোল করে অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত-পা দাপাদাপি করতে লাগলো- “ইয়াম… ইয়াম…”
মাঝে মাঝে নিজের ছোট্ট জিভ বের করে আবার হাত নেড়ে মায়ের দিকেই ইশারা করছে সে। যেন বোঝাতে চাইছে – “আমার খাবার চাই, এখনই চাই!”
–নাতির মুখে সেই আধো আধো ‘ইয়াম ইয়াম’ শুনে আয়শা বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফেললেন।
–এক বছরের বাচ্চা কি শুধু মায়ের দুধ খেয়ে থাকবে?
“আলিশা, তুমি বাচ্চাকে কিছু খেতে শেখাও না কেন?”
রাগ মেশানো চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি আবারও বললেন – “নিজে তো সারাদিন শুয়ে-বসে থাকো, আর হাতে থাকে শুধু মোবাইল। এসবের ফাঁকে বাচ্চাটাকে অন্তত একটু খাওয়াতে তো পারো। এখনো দুধের অভ্যাসটাই ছাড়াতে পারলেনা তুমি।”
–আলিশা শোয়া ছেড়ে উঠে বসলো।
“উফ, মাম্মা! আমি কী করেছি? আমি কি কম চেষ্টা করি ওকে খাওয়ানোর? ও যদি মুখই না খোলে তবে আমি কি করবো?”
“আমি এত কিছু জানি না। আমি এখনই সেরেলাক বানিয়ে আনছি। আজ পুরোটা শেষ করাবে তুমি।”
আলিশা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো –
“সব দায়িত্ব কি আমার একার? ওর বাপকেও তো কিছু বলতে পারো তোমরা।”
“ওর বাবা সারাদিন বাইরে কাজ করে। তবুও বাড়ি ফিরে ছেলেকে সময় দেয়।”
আলিশা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলো –
“তুমি আমার মা নাকি ওই গন্ডারের মা?”
“আবার বেয়াদবি করছো? কতবার বলেছি, নিজের স্বামীকে এসব নামে ডাকবে না। স্বামীকে সম্মান করতে শেখো। যথেষ্ট বড় হয়েছো তুমি।”
–শাইনা তখন নাতিকে কোলে নিয়ে আয়শাকে মৃদু ধমক দিলেন- “তুই আমার ছেলের বউকে আর একটা কথাও বলবি না, আয়শা।”
আয়শা হাল ছেড়ে দিয়েছে। এই মেয়েকে কিছু বলতে গেলেই সকলে তেড়ে আসে তার দিকে।
“হ্যাঁ, তোমরা সবাই আদর দিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে মাথায় তুলেছো।”
মেহরোজা আক্তার ও নাতনির পক্ষ নিতে দেরি করলেন না।
“ছোট বউমা, এত কথা না কইয়া আগে আমার আরশান দাদুভাইয়ের লাইগা কিছু খাবার বানাইয়া আনো।”
–শাশুড়ির কথা আর অমান্য করলেন না আয়শা। নিঃশব্দ ভঙ্গিতে পা বাড়ালেন কিচেনের দিকে।
–আয়শাকে কিচেনের দিকে যেতে দেখে শাইনা পিছন থেকে ডাক দিলেন – “আমি আসবো আয়শা?”
“লাগবেনা আপা। আমি করে নেবো।”
“ঠিক আছে। তবে সব কাজ একা হাতে করে নিসনা। আমি আসছি একটু পরে।”
এদিকে, ডোরা শাইনার কোলে থেকেই আবার ছটফট শুরু করেছে। ছোট্ট দুই হাত মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে আবার পা দুটো ছুঁড়ছে যেন সে এখন দাদির কোলে থাকবেই না। তার এখন মাকে চায় মানে চায়। আধো আধো গলায় ডাকছে – “মা…ম্মা..কুলে..।”
“মা..দাই..দোরা মাম দাই…”
–নাতির অপ্রান চেষ্টা দেখে শাইনা আর দেরি করলেন না। তাকে আলিশার কোলে তুলে দেওয়ার জন্য উদ্যাত হলেন।
–আলিশা ছেলেকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো।
“আমার জানবাচ্চা।”
“ডান..বাত্তা…ডানবাত্তা…”
“ডানবাত্তা না, বলো জানবাচ্চা।”
“ডান ডান…মাম ডান দোরা ডান…”
“আমার বাচ্চা।”
“মাম..মাম বাত্তা?”
“হ্যাঁ, ডোরার মাম বাত্তা।”
প্রেস কনফারেন্স শেষেই আরহাম পুরো টিমকে নিয়ে ফিরে এলো এ.এম.কে স্টুডিওতে।
–স্টুডিওতে পা রাখতেই যেন স্বস্তির একটা ঢেউ বয়ে গেলো সবার মধ্যে। গত কয়েকদিনের টানটান চাপের পর আজ প্রথমবারের মতো সবার মুখে নিশ্চিন্ত হাসি।
নেহাই সবার আগে উচ্ছ্বাস সামলাতে না পেরে বলে উঠলো –
“আজকের প্রেস কনফারেন্সটা একেবারে সুপারহিট হয়েছে! যারা এতদিন মুখে যা নয় তা বলছিলো ; তারা আজ সকলেই চুপ।”
আদি হেসে আরহামের দিকে তাকালো –
“একটা কথা বল তো, এই আইডিয়াটা তোর মাথায় এলো কীভাবে?”
আরহাম কাঁধ ঝাঁকাল।
“আলাদা করে কোনো আইডিয়া বের করতে হয়নি। আমি তো সত্যিটাই বলেছি…তবে আংশিক।”
কাহাফ তখন ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বললো –
“সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই আমাদের ট্যাগ করছে। রেসপন্সটা দারুণ।”
নিধি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
“আজ রাতে অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারবো। গত দুদিন ধরে টেনশনে ঠিকমতো চোখই বন্ধ করতে পারিনি।”
–চারপাশে আনন্দের আবহ ছড়িয়ে থাকলেও একজনের মুখে তার ছিটেফোঁটাও নেই।
আরাফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুখজুড়ে গভীর চিন্তার ছাপ।
রিহান তার কাঁধে আলতো চাপড়ে হেসে জিজ্ঞেস করলো –
“কিরে, ব্রো? আজ তো খুশি হওয়ার দিন। তোর মুখটা এমন পাংশুটে কেন?”
আরাফ ধীর গলায় জবাব দিলো –
“আমি আরহামকে নিয়েই ভাবছি।”
নেহা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকালো।
“আরহামকে? কেন? ওর আবার কী হলো?”
আরাফ এবার সবার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে।
“আজ ও প্রেস কনফারেন্সে যা বলেছে ; আলিশা তো তার কিছুই জানে না। পরে যদি বিষয়টা নিয়ে ওদের সংসারে কোনো সমস্যা হয়? একবারও কি তোরা এই নিয়ে ভেবে দেখেছিস?”
–কথাটা শুনে মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ খানিকটা গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
নেহা মুখটা বাঁকিয়ে বিরক্ত নিয়েই শুধালো –
“উফ! জাস্ট লিভ ইট। যার সংসার, তারই কোনো খবর নেই ; আর পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম নেই।”
আদি সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি জানালো-
“নেহা, স্টপ ইট। আরাফ ভুল কিছু বলেনি।”
আরহাম হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিলো –
“হেই! তোরা আর এটা নিয়ে তর্ক করিস না। আমি সব সামলে নেবো।”
আরাফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরহামের দিকে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়লো –
“যেদিন পুরো সত্যিটা সামনে আসবে, সেদিনও কি এভাবেই সামলাতে পারবি?”
আরহাম ঠোঁটের কোণে একরকম নির্লিপ্ত হাসি টেনে দায়সারাভাবে জবাব দিলো –
“যা হওয়ার তা তখন দেখা যাবে।”
–আরহামের এমন দায়সারা উত্তর শুনে আরাফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আর একটি কথাও না বলে ভারী পায়ে ধুপধাপ শব্দ তুলে সেখান থেকে প্রস্থান নিলো সে।
কাহাফ একবার আরহামের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে আরাফের পিছু পিছু গেলো।
–কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইলো।
–সবার নীরবতা ভাঙতে নেহাই সবার আগে কথা বলা শুরু করলো।
“উফ! আরাফটা না, সবকিছু নিয়েই অতিরিক্ত ভাবে। তুই ওর কথা মাথায় নিস না, আরহাম। আজকের দিনটা অন্তত উপভোগ কর।”
–পরিবেশটা আবার হালকা করার চেষ্টা করে রিহানও দুষ্টু হেসে বললো –
“যাই হোক, আমাদের কিন্তু ট্রিট চাই। আজ রাতেই একটা নাইট ক্লাব বুক করে ফেলবো নাকি?”
আরহাম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জবাব করলো – “আজ নয়… কালকের জন্য বুক কর।”
স্টুডিওর ছাদে এসে একটা সিগারেট ধরালো আরাফ। গাঢ় ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল নিস্তব্ধ আকাশে। অথচ তার দৃষ্টি স্থির রইলো ওপরে ; যেন আকাশের বিশাল শূন্যতার মাঝেই নিজের উত্তরগুলো খুঁজছে।
–কিছুক্ষণ পর কাহাফ এসে নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মুহূর্ত দুজনের কেউই কথা বললো না। শুধু বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া আর নীরবতার ভার মিশে ছিলো।
–অবশেষে কাহাফই নীরবতা ভেঙে শুধালো –
“এখনো ভুলতে পারিসনি তাকে?”
–আরাফ ম্লান হেসে ধোঁয়ার শেষ টানটা ছেড়ে দিলো।
“ভুলে যাওয়ার কথা ছিল কি?”
–প্রশ্নটার জবাব কাহাফের কাছে নেই। তবুও কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো –
“মুভ অন, ব্রো।”
আরাফ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“চাই না মুভ অন করতে।”
“এভাবে আর কতদিন?”
আরাফ আকাশের দিকেই তাকিয়ে রইল
“হয়তো… সারাজীবন।”
কাহাফ বিরক্তি মেশানো সুরে বললো
“জীবন কোনো ছেলেখেলা নয়, আরাফ।”
আরাফের ঠোঁটে ফুটে উঠল তিক্ত এক হাসি।
“আমার জীবনটা বোধহয় তাই। নয়তো যাকে মন দিয়ে ভালোবাসি, তাকেই কেন সৃষ্টিকর্তা বারবার আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন?”
“হয়তো… তার জন্য সেটাই ভালো ছিলো।” শান্ত কন্ঠ।
“যদি সত্যিই তার ভালো হতো। তবে আমি খুশি মনেই নিজের অনুভূতিগুলো মাটিচাপা দিতাম। কিন্তু বল তো… সত্যিই কি ওর জন্য ভালো হয়েছে?”
–প্রশ্নটার কোনো উত্তর নেই কাহাফের কাছে।
“She’s happily married… with one kid.”
আরাফ নিঃশব্দে হেসে ফেললো।
“Is she… really happy?”
–কাহাফ চোখ নামিয়ে ফেললো।
“এসব ভাবা আমাদের কাজ নয়।”
আরাফের ঠোঁটে আবারও সেই বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠলো। এমন এক হাসি, যার ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো অপ্রাপ্তি।
“আমি শুধু চাই… একদিন যেন ওকে সত্যিই ভুলে যেতে পারি।”
কাহাফ তার কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে আসস্ত করলো –
“পারবি ভুলতে। নাহলে যে একদিন আমাদের সবার বন্ধুত্বের সম্পর্কেই ভাটা পড়বে।”
আরাফ এবার দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলো –
“সেটা আমি কোনোদিনও হতে দেব না। আরহাম আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। জান থাকতে ওকে কিছু জানতে দেব না। আশা করি, তুইও না।”
কাহাফ এক মুহূর্তও দেরি করলোনা জবাব দিতে।
“এত বছর দেইনি। সামনেও দেবো না।”
–কথাটা বলেই সে আরাফকে নিজের দিকে টেনে বগলদাবা করে জড়িয়ে ধরলো।
আরাফও কোনো আপত্তি করলোনা। দুই বন্ধুই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো ছাদের কিনারায়। তাদের সামনে বিস্তৃত আকাশ ; আর বুকের ভেতর লুকিয়ে রইলো এমন এক গোপন সত্য ; যার ভার তারা বছরের পর বছর নীরবে বয়ে চলেছে।
আলিশা মাত্রই ছেলেকে নিয়ে এক দফা যুদ্ধ শেষ করেছে।
আরশান খিচুড়ি মুখে তুলবেই না। তবুও বহু চেষ্টায় একটু হলেও খাওয়াতে পেরেছে সে।
–বিগত ১ ঘন্টা যুদ্ধ শেষে আলিশা সোফাতেই কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। ডোরা তখনও মায়ের কোলে হাত-পা ছুড়ে দাপাদাপি করছে ; যেন প্রতিবাদ করছে, কেন তাকে তার অপছন্দের খিচুড়ি দেওয়া হলো? তার ‘ইয়াম ইয়াম’ কোথায়?
–ছেলের দাপাদাপিতে আলিশা বিরক্ত হয়ে শাইনাকে বললো- “বড় মা, ওকে নিয়ে ফ্রেশ করিয়ে দাও তো। আমার আর শক্তি নেই।”
শাইনা বেগম নাতিকে কোলে তুলতে তুলতে বললেন –
“তুইও ফ্রেশ হয়ে নে পুতুল। দুষ্টটা তোর গায়েও সব খিচুড়ি লাগিয়ে দিয়েছে।”
“হুম, একেবারে শাওয়াও নিয়ে আসি।” বলেই আলিশা চলে গেলো নিজের রুমে।
“চলেন দাদুভাই, আপনাকে ফ্রেশ করিয়ে দেই।”
“দোরা ফেশ.. ফেশ…”
“জ্বী ডোরা এখন ফ্রেশ হবে।”
আলিশা শাওয়ার নিয়ে একটু আগেই ফিরেছে। এখন লাঞ্চ করে একটা ঘুম দেবে ছেলেকে নিয়ে।
“মাম্মা, ক্ষিদে পেয়েছে। খাবার দাও।”
“টেবিলে বসো। আমি দিচ্ছি।” আয়শা
আলিশা টেবিলে না বসে লিভিং রুমে দাদি আর নীলার কাছে গিয়ে বসলো।
নীলার কোলে বসে আছে আরশান। তার সম্পুর্ন মনোযোগ এখন নীলার ফোনে চলতে থাকা ‘বেবী শার্ক’ গানটায়।
–মেহরোজা আক্তার তখন বসে বসে পান খাচ্ছেন। তার হাঁটুর পাশেই মিনু বসে একের পর এক পান বানিয়ে দিচ্ছেন উনাকে।
–শাইনা এসে সবাইকে ডাক দিলেন দুপুরের লাঞ্চের জন্য।
–সবাই যখনই উঠে ডাইনিং টেবিলের দিকে যাবে ; ঠিক তখনই বাড়িতে হতদন্ত হয়ে প্রবেশ করলেন নিয়াজ খান। উনার মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট বিদ্যামান।
“আয়শা…আয়শায়ায়া..”
–হঠাৎ স্বামীর এমন ডাকে আয়শা বেগল শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে আসলেন।
“কি হয়েছে? আর আপনি এই সময়ে বাড়িতে? সব ঠিক আছে তো?”
“কিছু ঠিক নেই। আজ আরহাম সবকিছুর সীমা পেড়িয়েছে।”
“কি বলছেন এসব?”
নিয়াজ সাহেবর মুখে এমন কথা শুনে সকলেই থমকে গেলো।
আলিশা বাবাকে জিজ্ঞেস করলো –
“কি হয়েছে বাবা?”
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৪
“ফোন কোথায় তোমাদের? বাড়িতে টিভি নেই? এতকিছু হয়ে গেছে আর এখনো কেউ কিছুই জানোনা?”
–সবাই একসাথে ছিলো বিধায় কেউ আর ফোন/টিভি কিছুই চালায়নি। দিনের এই সময়টা সকলে একে অপরকে সময় দেয়, গল্প করে। তাই একটু আগে ঘটে যাওয়া প্রেস কনফারেন্সের বিষয় নিয়েও তারা এখনো কেউই কিছু জানে না।
–নিয়াজের কথা শুনে আলিশা তড়িঘড়ি নিজের ফোন হাতে নিলো। মিনুও জলদি করে লিভিং রুমে থাকা টিভি চালিয়ে দিলো।
