Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৭ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৭ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৭ (২)
noorayn

আরহাম ডোরাকে কোলে নিয়ে আলিশার কক্ষের দরজায় একের পর এক কড়া নাড়তে লাগলো।
–ঠক… ঠক… ঠক…
“এই লিশা? দরজাটা খোল প্লিজ। এই বিচ্ছু বাচ্চাটাকে আমি আর সামলাতে পারছি না।”
–বাবার দেখাদেখি ডোরাও নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে দরজায় ঠুপ ঠুপ করে বাড়ি দিতে শুরু করেছে।
ছেলের কাণ্ড দেখে আরহাম ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“এই ছোট মরিচ! তুই দরজায় বাড়ি দিচ্ছিস কেন?”
“আপ… আয়া… ইইই…”
ডোরা নিজের মনমতো আধো আধো শব্দ করে বাবার কথার জবাব দিচ্ছে।

–প্রায় দশ মিনিট পর আলিশা দরজা খুললো।
দরজা খুলতেই তার চোখে পড়লো আরহামের করুণ অবস্থা ; চুলগুলো সম্পূর্ণ উসকোখুসকো, টি-শার্ট কুঁচকে একাকার, তার ওপর বুকের কাছে ছোট্ট একটা অংশ ছেঁড়া! আর বাবার কোলে থাকা ডোরা মাকে দেখেই আনন্দে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে।
আলিশা ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলো –
“কি সমস্যা? এখানে কেন এসেছো?”
“আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখ..তোর আন্ডা আমার কি দশা করেছে!
“তো? এখানে আমার কি করার আছে?”
“তো”! শুধু ‘তো: বললেই হবে? বাঁচা…আমাকে এই বুলডোজারের হাত থেকে বাঁচা!”
“তাইত… তাইততত…”
বাবার কথা মোটেও পছন্দ হয়নি ডোরার। সে সঙ্গে সঙ্গে পা ছুড়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করলো।
আরহাম চোখ পাকিয়ে বললো –

“তোর ওই ‘তাইত’ তুই তোর ডায়াপারের ভেতরেই রাখ!”
আলিশা নির্বিকার ভঙ্গিতে সব পরোখ করছে…
“এখানে কেন এসেছো? সেটা বলো আর যাও।”
“আমাকে বাঁচাতে এসেছি… না, মানে তুই আমাকে বাঁচা! ছোট মরিচ আমাকে একটুও শান্তি দিচ্ছে না। দেখ, দুধ খাওয়ার জন্য আমার টি-শার্টই ছিঁড়ে ফেলেছে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার!”
আলিশা ঠোঁট চেপে হাসি সামলে রেখেছে কোনোমতে…
“তাহলে দুধ দাওনি কেন? ওর ক্ষুধা পেয়েছে বলেই তো খুঁজছে। যাও, আমার ছেলেকে দুধ দাও।”
আরহাম যেন আকাশ থেকে পড়লো।
“কিইই?!””
ডোরা মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

“আম… আম… মা…”
–ছেলেকে মায়ের দিকে হাত বাড়াতে দেখে আরহাম বেশ খুশি হয়ে গেলো।
“দেখ, ডোরাও তোর কোলে যাবে…নে ওকে।”
“ইয়াম…ইয়াম..”
আলিশা ডোরার হাতে চুমু খেয়ে আদর দিয়ে বললো –
“বাবা দেবে… ইয়াম ইয়াম!”
–বাবা ‘ইয়াম ইয়াম’ দেবে শুনেই ডোরা আবারও দুই হাত দিয়ে আরহামের বুকজুড়ে খাবার খোজার মহান অভিযানে নেমে গেলো।
“এই বেয়াদব মহিলায়ায়া! এতটুকু আন্ডাকে এসব কি ধরনের বেয়াদবি শেখাচ্ছিস? আমি কোথা থেকে দুধ দেব?”
আলিশা একদম নির্বিকার। সে হায় তুলতে তুলতে শুধালো –

“কেন? তোমার বুক থেকে দেবে…”
–এই কথা শুনে ডোরা যেন আরও উৎসাহিত অনুভব ল
করলো। সে বাবার বুকে মুখ গুজে নিজের মিশন আরও জোড়দারভাবে শুরু করেছে।
আরহাম প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। না পারছে সইতে না পারছে কিছু করতে…
“বাপ আমার! আমার কাছে কিছুই নেই! আমি দুধওয়ালা গাভি না… না মানে… গরুও না!”
–মুসিবতে পড়ে আরহাম মুখ ফসকে কি থেকে কি বলছে তা যেন সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না…
ডোরা আবারও আধো গলায় বলে উঠলো –
“ইয়াম… ইয়াম…”
আরহাম না পারতে এবার ‘আম্মুউউউ বাঁচাও’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
বাবার দেখাদেখি ডোরাও দুই হাত নেড়ে আধো আধো গলায় ডেকে চলছে – “আম… উউ… বাটাও!”
ঠিক তখনই আরহামের চিৎকার শুনে নিচতলা থেকে খুন্তি হাতে শাইনা বেগম গলা উঁচু করে বললেন,
“আবার কি কাণ্ড করেছিস, হতচ্ছাড়া?”
–নতুন শব্দ কানে আসতেই ডোরা আনন্দে বাবার কোলে লাফাতে লাফাতে বলতে শুরু করলো,
“হট… তারা… হটতারা…”
আরহাম ছেলের দিকে থতমত খেয়ে তাকালো।

“এই ঢোলের বাচ্চা! যা শুনিস তা সবই কপি করতে হবে কেন তোর?”
তবে, বাবার ধমকে ডোরার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে তো দিব্যি নিজের সুরে বলে চলেছে –
“বাব্বা… হটতারা… হটতারা…”
আরহাম রেগেমেগে কিছু বলার আগেই নিচ থেকে আবারও শাইনা বেগমের বজ্রকণ্ঠ ভেসে এলো,
“কি হলো? জবাব দিচ্ছিস না কেন? আবার কি কীর্তি করেছিস? দাঁড়া, আমি এখনই আসছি!”
আরহাম ঘাড় কাত করে একবার করিডোর থেকে নিচে উঁকি দিয়ে দেখলো শাইনা বেগম খুন্তি হাতে উপরে আসছেন।
“ইয়া মাবুদ, আমাকে বাঁচাও! বাচ্চা বুলডোজারই কি কম ছিলো না? এখন এর দাদিও যোগ হতে আসছে…তাও আবার খুন্তি হাতে!”

–সামনের দৃশ্যটা দেখে আলিশার মনটা বেজায় শান্তি লাগছে। এতক্ষণে তার মনে হলো, আরহামকে অন্তত একটু হলেও শায়েস্তা করতে পেরেছে সে।
তবে, পরিস্থিতি যে আরও বেগতিক হতে যাচ্ছে আর ডোরারও ক্ষুধা পেয়েছে ; সেটা বুঝে আলিশা আর দেরি না করে ডোরাকে কোলে তুলে নিয়ে আরহামের মুখের সামনেই দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।
দরজা বন্ধের পর এপাশ থেকেই আরহামের প্রতিবাদী গলা শোনা গেলো – “কত্ত বড় বেয়াদব মহিলা! স্বামীর মুখের ওপরই দরজা লাগিয়ে দেয়!”
কথাটা শেষ হতেই সিঁড়ি বেয়ে খুন্তি হাতে হাজির হলেন শাইনা বেগম।
“কাকে বেয়াদব বলছিস তুই? আজ তোর সব বেয়াদবি আমি বের করছি!”
কিন্তু, শাইনা বেগম কাছে পৌঁছানোর আগেই আরহাম পগারপার।

বাইরে দমকা হাওয়া বইছে। জানালার ফাঁক গলে সেই ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতরে ঢুকে পর্দাগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। নীলা নীরবে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে।
সকালে থেকেই আরশাদের মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ। আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের সাবমিশন ছিলো ; অথচ তাদের টিম এখন পর্যন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি।
তবে, অফিসের চাপ সে সাধারণত বাসায় নিয়ে আসে না। কাজের ঝামেলা অফিসেই রেখে আসে। কিন্তু, আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। আরহামের আচরণ তার মেজাজকে আরও তিক্ত করে তুলেছে যার জন্য সে সকাল থেকে নীলার সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলছে না।
নীলা একবার তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো –

“খাবার খাবে না? অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে…”
“না।”
“কেন?”
“ইচ্ছে করছে না।” গম্ভীর কন্ঠ।
“আমিও এখনো খাইনি… তোমার সঙ্গে একসাথে খাবো বলে অপেক্ষা করছি।”
আরশাদ হঠাৎ শোয়া থেকে উঠে বসলো।
“আজব! আমি কি তোমাকে খেতে মানা করেছি, নীলা? এসব কেমন বাচ্চামো?”
নীলা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলো –
“মেজাজটা এখনো ঠিক হয়নি?”
“না। আর মনে হয় হবেও না।”
“কেন?”
“তা গিয়ে তোমার ভাইকে জিজ্ঞেস করো। এত দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করার জন্যই কি সে বিয়ে করেছিলো আমার বোনকে?”
“আমার ভাই নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেনি। কেমন পরিস্থিতিতে ওদের বিয়ে হয়েছে, সেটা তোমার অজানা নয়।”

“এখনো ভাইয়ের পক্ষ নিচ্ছো?”
“আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না। শুধু সত্যিটাই বলেছি।”
“তাহলে তোমার কি মনে হয়, আরহাম আজ যা করেছে ; সেটা ঠিক?”
“একদমই না। কিন্তু ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে আমাদের খুব বেশি হস্তক্ষেপ না করাই ভালো।”
আরশাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
“বাহ, নীলা! মানে তুমি একপ্রকার ওর আচরণটা এড়িয়ে যাচ্ছো!”
“আমি কারও ভুলকে এড়িয়ে যাচ্ছি না। তুমি বরং অকারণে কথাটা বড় করে ফেলছো।”
“কারণ আলিশা আমার বোন। কতটা আদরের বোন, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। ওর সঙ্গে কোনো অন্যায় হলে আমি চুপ করে থাকতে পারব না।”
“আলিশার সাথে কেন কোনো অন্যায় হবে? আর হলেও আমরা সেটা হতে দেব না।”
“এখনো একই কথা বলছো? তোমরা ভাই-বোন কি সত্যিই কিছু বুঝতে চাও না?”
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“শাদ, প্লিজ… কথা আর বাড়িও না। আমার ভালো লাগছে না এসব।”
আরশাদ দু’হাতে নিজের চুল চেপে ধরে বসে রইলো। নীলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার কাঁধে নিজের মাথা রাখলো।

“এতো চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিছুক্ষন শান্ত থেকে আরশাদ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো –
“আরহাম আর আলিশার বিয়েটা একটা ভুল ছিলো, নীলা।”
“এখন এসব ভেবে লাভ কি? যা হওয়ার তা হয়ে গেছে ; এখন সেটা মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হবে।”
“আমি আগেই বলেছিলাম, ওদের দুজনের মধ্যে কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই। সারাক্ষণ ঝগড়া করে ; অথচ সংসার কিভাবে সামলাতে হয় সেটাই এখনো শেখেনি। তার ওপর আবার বাচ্চাও নিয়ে ফেলেছে!”
নীলা চুপচাপ তার কথাগুলো শুনে গেলো।
“বাবাকে কত করে বলেছিলাম যাতে আলিশাকে আমার কাছে ইতালিতে পাঠিয়ে দেয় তবে শুনলোনা। যদি সময়মতো আমার কথা শুনতো তাহলে আজ হয়তো পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।”
নীলা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো –

“এতটা জটিল মানে?”
“আমি আরশানের কথা বলছি..এই বয়সে আরহাম-আলিশার বাচ্চা নেওয়া উচিত হয়নি। তাদের ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে বাচ্চাটাই।”
“তুমি হয়তো একটু বেশিই ভাবছো…এমন কিছুই হবেনা।”
–হঠাৎই, আরশাদ নিজের কাধ থেকে নীলার হাতটা সরিয়ে দিলো। তার গলায় কঠোরতা স্পষ্ট।
“তাই যেন হয়, নীলা। কিন্তু, একটা কথা ঠিকমতো তোমার ভাইকে বুঝিয়ে দেবে ; আমার বোনের সাথে কোনো অন্যায় হলে আমি তা মেনে নেবোনা।”
“আচ্ছা, বুঝিয়ে দেবো। এখন খাবার নিয়ে আসি? ক্ষিদে পেয়েছে আমার।”
“নিয়ে এসো…”

আয়শার সঙ্গে নিয়াজ সাহেবের বেশ জোরে কথা কাটাকাটি হয়েছে।
আয়শার রাগের একটাই কারন ; কেন তিনি গিয়ে আলিশাকে আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো কথা বললেন? তার মেয়ের সংসারে এমনিতেই অশান্তির শেষ নেই, সেখানে এসব কথা বলে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার কি প্রয়োজন ছিলো?
নিয়াজ খান পুরো সময়টাই নীরব থাকলেও ; আয়শা থেমে নেই…
“আপনার কি দরকার ছিলো মেয়ের কাছে গিয়ে এসব বলার?”
নিয়াজ খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আহা আয়শা, থামো তো। কি শুরু করেছ এসব?”
“শুরু আমি করিনি। আপনি করেছেন। আম্মার কানে যদি এসব কথা যায়, তখন কি হবে ভেবে দেখেছেন? উনি তো মনে করবেন, আমিই আপনাকে এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে বলিয়েছি।”
“এমন কিছুই হবে না। আর আম্মা তোমাকে নিয়ে এতটা নিচু ধারনাও রাখেন না।”
আয়শা তিক্ত হেসে বললেন,
“সত্যিই কি তাই? আমার তো মনে হয়, এত বছর পরও উনি আমাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। সেখানে, যদি আমার মেয়ের সংসার নড়বড়ে হয়ে যায় তবে প্রথম দোষটা তিনি আমার ঘাড়েই চাপাবেন।”
–নিয়াজ খান স্ত্রীর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। এই কথাগুলোর জবাব তার কাছে নেই। কারন, আয়শার ভয়টা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।
–অতীত….

প্রায় ত্রিশ বছর আগে নিয়াজ খান আর আয়শার প্রথম দেখা হয়েছিলো নিয়াজ খানের এক আত্মীয়র বিয়েতে। যেখানে, আয়শা ছিলেন কনের বান্ধবীর ছোট বোন। প্রথম দেখার সেই পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিলো প্রনয়ের সম্পর্কে।
আয়শা ছিলেন একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আর নিয়াজ খান দেশের প্রতিষ্ঠিত এক উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। সামাজিক অবস্থানের ফারাক ছিল আকাশ-পাতাল, কিন্তু সেই ব্যবধান কখনোই তাদের ভালোবাসার মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
তিন বছরের সম্পর্কের পর হঠাৎই যখন আয়শার পরিবারে তার প্রেমের সম্পর্কের কথা জানাজানি হয় তখনই আয়শার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন শুরু করে। তাদের বিশ্বাস ছিলো ; উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে কখনোই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করবে না। তাদের ধারণা, নিয়াজ খান হয়তো সময় কাটাচ্ছেন; একদিন মোহ কেটে গেলে ঠিকই আয়শাকে ছেড়ে চলে যাবেন। সেই ভয় থেকেই আয়শার অগোচরে তার অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
তবে, আয়শার বড় বোন আশার সাহায্য নিয়াজ খান সঠিক সময়ে সবকিছু জানতে পেরেছিলেন।
সবকিছু জানার পর, নিয়াজ খান নিজের পরিবারকে আয়শার কথা জানান। কিন্তু, সেখানেও অপেক্ষা করছিলো কঠিন এক প্রত্যাখ্যান।

বিশেষ করে মেহরোজা আক্তার কোনোভাবেই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। তার দৃঢ় বিশ্বাস ; আয়শা টাকার লোভেই তার ছেলেকে নিজের প্রেমের ফাঁদে ফেলেছে।
দুই পরিবারের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত আর কোনো পথ খোলা ছিল না। শেষে, নিজেদের ভালোবাসার বাঁচাতেই আয়শা নিজের পরিবার ছেড়ে নিয়াজ খানের হাত ধরে পালিয়ে বিয়ে করেন।
সেদিনের পর থেকেই নিজ জন্মদাতা পরিবারের সঙ্গে আয়শার সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও কেউ আর তার খোঁজ নেয়নি। আর না আয়শা কোনোদিন সেই বাড়ির পথে ফিরে তাকিয়েছে।
অন্যদিকে, ছেলের জেদের কাছে হার মেনে মেহরোজা আক্তার আয়শাকে খান বাড়িতে ঠায় দিলেও মন থেকে কখনো তাকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। তখন, বাড়ির বড় পুত্র ইজাজ খানও অবিবাহিত ছিলেন।
বিয়ের এক বছরের মাথায় বড় নাতি আরশাদের জন্মের পর মেহরোজা আক্তারের মন কিছুটা নরম হয়েছিল ঠিকই কিন্তু আয়শার মনের সেই শূন্যতা আর কোনোদিন ভরে উঠেনি।
আজও কখনো কখনো তার মনে হয় ; এই বিশাল খান বাড়িতে তিনি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনো মানুষ
যাকে সবাই সহ্য করে নিয়েছে ঠিকই তবে মন থেকে কেউই কখনো আপন করে নিতে পারেনি….

ডোরাকে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করে আসতে পেরে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো আরহাম।
“আহ…কি শান্তিইই।”
–এখন একটা জমিয়ে শাওয়ার না নিলেই নয়। তারপর দিব্যি টানটান একটা ঘুম। কতদিন পর একটু শান্তি মিলবে! ঢোলও নেই, ঢোলের মাও নেই। আজ আর কেউ তাকে জ্বালাবেনা।
অন্যদিকে, এতক্ষণ পর ছেলেকে বুকে পেয়ে আলিশা যেন আদরে আদরে ভাসিয়ে দিচ্ছে ছেলেকে।
“আমার ছানা, আমার জান… আই মিসড ইউ বাচ্চা।”
“দোরা মিচ মা…মাম”
“ডোরাও মাম্মাকে মিস করেছে?”
“ইয়াম… ইয়াম…”
ডোরার এখন কোনোদিকে মনোযোগ নেই। সে বারবার মায়ের বুকে মুখ ঘেষছে। ছেলের বেশ ক্ষিদে পেয়েছে বুঝতে পেরে আলিশা আর দেরি না করে তাকে ফিড করাতে শুরু করলো।
নিজের অতিপ্রিয় খাবার পেয়ে ডোরা এক হাতে মায়ের ওড়নার একাংশ শক্ত করে মুঠোয় ভরে তৃপ্তি নিয়ে চুকচুক শব্দে করে খাচ্ছে।
একটু পর তার পেট ভরে যেতেই ডোরা ওড়নার নিচ থেকে ছোট্ট মুখটা উঁকি দিয়ে মায়ের দিকে তাকালো।
ছেলের এই লুকোচুরি দেখে আলিশা হেসে ফেললো। সে ডোরাকে বিছানায় বসিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললো –

“আচ্ছা, দেখি তো… বলো গন্ডার।”
ডোরা গোল গোল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে ; যেন বোঝার চেষ্টা করছে ; এটা আবার কি?
“বলো… গ-ন্ডা-র।” আলিশা আবারও শুধালো।
“দন্দার..”
“না, গন্ডার।”
“দন্দার…”
আলিশা এবার নিজের কপালে নিজেই চাপড় দিতে শুরু করলো।
“আচ্ছা, থাক। এবার বলো – বাবা গন্ডার।”
বাবার কথা শুনে ডোরা উৎসাহিত হয়ে হাত তালি দিয়ে বলছে – “বা…বা… দন্দার!”
“আবার বলো।”
“ব্বা…ব্বা… দন্দার!”
আলিশা খুশিতে ছেলের ফোলা ফোলা গালে ফটাফট কয়েকটা চুমু দিলো।
“এই তো! এবার থেকে বাবাকে এটাই বলবে।”
–তারপর আলিশা ডোরাকে কোলে তুলে আরহামের ঘরের দিকে রওনা হলো।
মা-ছেলে কামরায় পৌঁছাতেই দেখে রুম ফাঁকা। তবে, ওয়াশরুম থেকে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে।
আরহাম শাওয়ার নিতে নিতে মনের সুখে নিজের মতো গান গেয়ে চলেছে,

~আহা কি শান্তিইই…
আকাশে বাতাসে…
বউ-বাচ্চা নেই তাই জীবন এখন ফুরফুরে বাতাসে!
হুররে-ইইই… কি যে মজা, কি যে সুখ,
আজ আর কেউ করবে না আমারে ধুকপুক!
ঢোল নাই, ঢোলের মাও নেইইইই নেইই নেইইই…
আজকে আমার স্বাধীনতা ইয়োওওও ইয়োওওও…
হোওও… আহা কি শান্তি আকাশে বাতাসেএএ…
এই শান্তির রাতে আমি আরহাম ফুরফরেএএএ~
–গানের লিরিক শুনে আলিশার চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।
সে চুপচাপ ডোরাকে বিছানায় বসিয়ে নিজে ডিভানের ওপর পা তুলে আরাম করে বসলো।
এদিকে, আরহাম কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে, এক হাতে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো।
গানের পরের লাইন যেই না ধরতে যাবে, ঠিক তখনই…
তার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো!
–বিছানার ওপর দিব্যি বসে আছে ডোরা ; তার হাতে আরহামের আদরের মোবাইল। দেখে মনে হচ্ছে ; যেকোনো মুহূর্তেই তার আদরের ফোনের জীবনের আয়ু শেষ হতে চলেছে…
আরহাম নিজের চোখ দুইবার কচলালো।
না…সে ভুল দেখছে না!
তারপর, পাশ ফিরতেই দেখে ডিভানের ওপর গম্ভীর মুখে বসে আছে আলিশা।

“তুই না আজ পাশের রুমে থাকবি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এখানে কেন?”
“ডোরাকে দিতে এসেছি।”
আরহাম বুক চেপে ধরলো।
“দিতে মানে? একটু আগেই না দিয়ে এলাম?”
“ওর ক্ষুধা পেয়েছিলো তাই নিয়েছিলাম। এখন তোর ছেলে, তুই সামলা। আমি গেলাম…”
দরজার কাছে গিয়ে আবারও ফিরে তাকালো আলিশা।
“আবার, ডোরাকে নিয়ে আমার কাছে এলে কিন্তু খবর আছে!”
বলেই হাতের ইশারায় বেডসাইড টেবিলে রাখা ফিডারটা দেখিয়ে আবারও শুধালো –
“ওখানে দুধ পাম্প করে রেখেছি। ক্ষুধা পেলে খাইয়ে দিবি।”
কথা শেষ করেই আলিশা প্রস্থান নিলো সেখান থেকে।
–দরজা বন্ধ হতেই আরহাম ধীরে ধীরে ডোরার দিকে তাকালো।
ডোরা তখনও মোবাইলটা দু’হাতে ধরে আছে।
আরহাম দৌড়ে গিয়ে মোবাইলটা টান দিয়ে নিতে গেলেই ডোরা তার গুলুমুলু হাতে তা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।

“আতা… তা… তাইত…”
“ছাড়, ছোট মরিচ! ছেড়ে দে..”
“আতা…তাইততত..”
“তুই তাইত, তোর বাপ তাইত…ছেড়ে দে..এটা আমার ফোন।”
কিন্তু, ডোরা ছাড়ার পাত্র নয়।
দুজনের টানাটানির এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই ডোরা ফোনটা ছেড়ে দিলো।
এত সহজে ছেড়ে দেওয়াই আরহাম বেশ অবাক হলো।
পরক্ষণেই ডোরার দৃষ্টি অনুসরণ করে তার আসল মতলব ধরতে পারলো ; কেননা ডোরার দৃষ্টি এখন তার খালি বুকের দিকে নিবদ্ধ! এটা ভেবেই আরহামের চোখ বড় বড় হয়ে এলো।
আসন্ন বিপদের আভাস পেয়ে আরহাম বিদ্যুৎগতিতে নিজের দুই হাত বুকের ওপর ক্রস করে চেপে ধরলো।

“এই! ওইদিকে তাকাস না, ছোট মরিচ!”
“কি কি? চোখ সরা অশ্লীল বাচ্চা।”
“দেখ…বাপের ইজ্জতের দিকে এভাবে তাকাতে নেই। এই অধিকার কেবল তোর মায়ের।”
“ডোরা দেখ…আগে ফোনটা…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই…

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৭ 

–ধাম!
আরহাম আতঙ্কে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো…
নিজের হাত সরানোর সুযোগেই ডোরা মোবাইলটা তুলে দিয়েছে এক আছাড়!
আরহাম একবার মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের ফোনের দিকে তাকায়, আরেকবার নিষ্পাপ মুখে বসে থাকা ডোরার দিকে তাকায় তারপর আবার নিজের বুক ঢেকে রাখা দুই হাতের দিকে তাকায়…
“বা..ব্বা দন্দার…”

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here