তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৫
আশফিয়া হিয়া
সময় ও স্রোত কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। রুদ্ধদের কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার আজ দু – তিন মাস কেটে গিয়েছে। সকলের জীবনই খুব সুন্দরভাবে অতিবাহিত হচ্ছে। আরু ও ইয়াজের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলা বেরিয়েছে মাস খানেক আগেই। দুজনেই পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে। এই নিয়ে শেখ বাড়িতে আনন্দের শেষ নেই। রুদ্ধ পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়েছে। আরু প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। তাই তার আর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কোনো চাপ নেই। রুদ্ধ তাকে ঢাকার বাইরে যেতেও দিবে না তাই এসব ঝামেলার মাঝে সে আর যায়নি। অন্যদিকে ইয়াজ দেশের বাইরেই বাকি পড়াশুনা শেষ করবে তাই তারও এসব নিয়ে কোনো চাপ নেই। আগামীকাল রুহানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফারিশের ঘরে তুলে দেয়া হবে। এতদিন নানা ঝামেলার কারণে যেই কাজটি করা হয়নি, আগামীকাল সেই কাজটিই সম্পূর্ণ করা হতে যাচ্ছে। ফারিশ আগেই জানিয়েছিল সে তেমন কোনো অনুষ্ঠান করতে চাইছে না, সকলেই তাতে মত দিয়েছে। রুহানির নিজেরও এত ঝাঁকঝমকভাবে বিয়ে করা পছন্দ নয়। তার আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল ঘরোয়াভাবেই বিয়ে করবে। সেই অনুযায়ী আগামীকাল কাছের কিছু আত্নীয় – স্বজন নিয়ে বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে। ফারিশের নিজেরও চারকুলে কেউ নেই একমাএ মামা – মামী ছাড়া।
রোহান কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে শেখ বাড়িতে এসেছিল। মিতা বেগমের জোরাজোরিতে এক রাত থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে। আজ অনেকদিন পর সে এই বাড়িতে এল। আরু তাকে রিজেক্ট করার পর থেকে রোহান একবারও শেখ বাড়িতে আসেনি। আরুর রোহানের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বিষণ সংকোচ হচ্ছে, রোহানের অনুভূতি জানার পর থেকে তার সঙ্গে আগের মতো মেশাও সম্ভব নয়, তাছাড়া রুদ্ধ জানতে পারলেও তার কপালে দুঃখ আছে। তাই রোহানের সঙ্গে তেমন সাক্ষাৎ হয়নি তার। রাতে খাওয়া – দাওয়ার পর আরু নিজেদের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, করিডর পেরিয়ে নিজেদের ঘরে যাওয়ার পূর্বেই রোহানের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল। পেছনে ঘুরে বলল,
– ‘ কিছু বলবেন ভাইয়া?’
রোহান মৃদ্যু হেসে বলল,
– ‘ তুমি তো কিছুই বলোনি, তাই আমিই বলতে বাধ্য হলাম। ‘
আরু কিছুটা বিব্রত হলো, রোহান নিজে থেকেই বলল,
– ‘ খুব ভালো আছো নিশ্চয়?’
– ‘ জ্বী।’
রোহান ব্যাথাতুর হেসে বলল,
– ‘ খুব ভালো, আমিও ভাবছি এবার বিয়েটা করে নিব। মা অনেকদিন ধরেই বলছিলেন আমিই এতদিন আটকে রেখেছিলাম বিষয়টা তবে আমারও মনে হয় এবার নিজের জীবনটা গুছিয়ে নেয়া উচিত। ‘
আরু হালকা হেসে বলল,
– ‘ জ্বী বয়স হচ্ছে, মামা – মামীরও তো আপনাকে নিয়ে কিছু আশা রয়েছে, আপনার জীবনে যে আসবে আপনাকে খুব ভালো রাখবে দেখবেন।’
রোহান হুট করে এগিয়ে এসে আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– ‘ জীবনে খুব সুখী হও। ‘ বলেই চলে গেল। এই ছোঁয়াটুকুতে কোনো খারাপ আভাস ছিল না, পুরোটুকুতেই স্নেহ মাখা ছিল ,আরুর বিন্দুমাএ অসস্বি হয়নি। সে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আজ ঘরটা আগে থেকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। আরু ঘরে আসার পরেই সবসময় ঘরের বাতি বন্ধ হয়, তবে আজ এই পরিবর্তন দেখে আরু ভারী অবাক হলো। হাতড়ে হাতড়ে ড্রিম লাইটা জ্বালালো। রুদ্ধ চোখের ওপর এক হাত রেখে শুয়ে রয়েছে। আরু কয়েকবার ডাকলেও সারা পেল না। আরু ভাবল ক্লান্ত থাকাই হয়তো রুদ্ধ আজ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই আর বেশি ঘাটল না, প্রতিদিন আরু বেড শোয়া মাএই রুদ্ধ তার ওপরে এসে চড়াও হয়। এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে, যে আরুর হারগোর ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম তবে আজ এমন কিছু না দেখতে পেয়ে আরুর কেমন খারাপ লাগা কাজ করছে, ঘুমই আসতে চাচ্ছে না, সে রুদ্ধরদিকে ঘুরে তাকে জরিয়ে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করল। মাঝ রাতে টের পেল একটা হাত তাকে শক্ত করে জাপ্টে ধরে বুকে মুখ গুজে দিয়েছে। আরুর মুখে তখনি মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
আরু এখন অনেকটাই সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করছে। রুদ্ধ ও বাড়ির সকলের পছন্দ অনুযায়ী রোজ মা অথবা শ্বাশুড়ির কাছ থেকে রান্না শিখছে। বাড়ি ঘর গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখে। আজ সকালের নাস্তাটাও সেই নিজেই বানিয়েছে। সকলের জন্য গরম গরম পরোটা ও সবজি রান্না করেছে, সঙ্গে গরুর মাংস ভুলা করেছে। সবাইকে নিজের হাতে বেড়েও দিচ্ছে। রুদ্ধ নামল বেশ কিছুক্ষণ পরে, রুদ্ধর মুখটা কেমন থমথমে দেখাচ্ছে, আরু সেই মুখের দিকে এক পলক তাকিয়েই বুঝে ফেলল রুদ্ধ রেগে আছে ভীষণ। তবে রাগ করার কারণটা আরু বুঝতে পারল না। আরু চুপচাপ তার খাবারের প্লেট রেডি করে দিতে চাইলে রুদ্ধ থমথমে মুখে বলল,
– ‘ আমি পারবো।’
আরুর মুখটা চুপসে গেল, তার মানে আবহাওয়া খুব গরম হয়ে আছে। আরু নিরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। রুদ্ধর দৃষ্টি প্লেটের দিকের আবদ্ধ নিরবে খেয়ে যাচ্ছে সে যেন খাওয়া ছাড়া আপাতত তার কোনো কাজ নেই। খেতে খেতে রুদ্ধ এক পর্যায়ে বলল,
– ‘ আমাদের অফিসের পাশে যে খালি জায়গা রয়েছে, সেটা আমি কিনে নিতে চাচ্ছি বাবা। তুমি আর চাচ্চু মিলে আজ জায়গায়টা একটু দেখে এসো।’
আসলাম শেখ বললেন,
– ‘ হঠাৎ করে ওই জায়গাটা কিনতে চাচ্ছো কেনো?’
– ‘ সেই জায়গাটা নিয়ে আমার বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে বাবা, তোমাদের পরে ডিটেইলসে বলবো বিষয়টা নিয়ে। ‘
আসলাম শেখ মাথা নাড়ালেন। আজাদ শেখ মেয়েটাকে এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
– ‘ দাঁড়িয়ে কেনো মা? তুমিও বসে পড়ো।’
– ‘ আমি মায়েদের সঙ্গে খাব তোমরা খেয়ে নাও।’
রুদ্ধ খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল৷ কিছু সময় পর আরুও তার পিছু নিল। রুদ্ধ তখন ড্রেসিং টেবিলে সামনে দাঁড়িয়ে একহাতে ঘড়ি পড়তে ব্যস্ত। আরু পা টিপে টিপে গিয়ে পেছন থেকে দু হাতে রুদ্ধকে জরিয়ে ধরে পিঠে মুখ ঘষে বলল,
– ‘ কি হয়েছে আপনার এমন রেগে আছেন কেনো?’
রুদ্ধ জোর করে হাত দুটো সরিয়ে নিতে চাইলেও পারল না। আরু বেশ শক্ত করেই চেপে ধরেছে। রুদ্ধ লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
– ‘ ছাড় আমাকে আরু।’
আরু দু দুকে মাথা নেড়ে বলল,
– ‘ একদমই ছাড়বো না আগে বলুন কি হয়েছে, কাল রাত থেকে আপনি এমন করছেন, আমাকে কাল একবারও জরিয়েও ধরেননি, বলুন না কি এমন করেছি আমি যার জন্য আমাকে এমন ইগনোর করছে। ‘
রুদ্ধ আরুর হাত জোর করে ছাড়িয়ে, আরুর দিকে ঘুরে বলল,
– ‘ তোর তো আমার সাথে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই, তোর কথা বলার অনেক মানুষ রয়েছে, যা গিয়ে রোহানের সঙ্গে গল্প কর আমার চোখের সামনে থেকে যা। ‘ শেষ কথাটা ধমক দিয়ে বলল যার কারণে আরু কেঁপে উঠল। আরু রুদ্ধর হাত ধরে বলল,
– ‘বলুন না কি হয়েছে, কি করেছি আমি।’
।’ রুদ্ধ তার কথা শুনলো না আরুর হাত ধরে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইল আরু যেতে চাইল না চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। রুদ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ‘ এসব কান্না রোহানের সামনে গিয়ে কর, মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিবে।’ তার মানে কাল রাতে রুদ্ধ তাদের দেখেছিল। আরু কিছু বলতে চাইল তবে রুদ্ধ তা শুনল না। আরুকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে মুখের ওপ ল্র দরজা লাগিয়ে দিল। আরু হতবাক হয়ে গেছে। বিয়ের এতগুলো দিন পর রুদ্ধ তার সঙ্গে এই কাজটা করল। বিয়ের আগেই তো যখন তখন ঘর থেকে বের করে দিত তাকে তাই বলে এখনো এমনটা করবে? কি এমন করেছে সে, প্রচন্ড অভিমানে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার। আরু চোখ মুছে নিজের তথাকথিত বাপের বাড়ি চলে গেল। নিজের ঘরে এসেই ধুম করে বেডে শুয়ে পড়ল। পুরো বেডে গড়াগড়ি খেয়ে মনে মনে ভেংচি কেটে বলল,
– ‘ ঠিক আছে গেলাম না ঔই রুমে হুহ।’
আহিদের স্কুলে এখন ব্রেক টাইম চলছে। সবাই যে যার মতো গল্প করছে, খাবার খাচ্ছে। আহি ও তার বান্ধুবীরা মিলে একজন অন্যজনের খাবার কেড়ে নিয়ে খাবার খাচ্ছে। তাদের স্কুলটা কলেজ পর্যন্ত ছেলে – মেয়েরা মিলেই একসাথে পড়ে এই স্কুলে। খাওয়ার মাঝেই একটা বাচ্চা মেয়ে এসে আহিকে একটা চিঠি দিয়ে গেল। চিঠি দেখেই তার বান্ধুবীরা এক্সাইটেড হয়ে পড়েছে, মিতু বলল,
– ‘ বাবাহ এই যুগে এসেও চিঠি দেয়, দেখিতো চিঠিতে কি আছে।, বলতে বলতেই সে চিঠিটা খুলে ফেলল। সেখানে হিবিজিবি করে কিছু বাক্য লেখা ছিল। প্রেম নিবেদন মনে হচ্ছে। শেষের দিকে এটাও লেখা রয়েছে,তার চিঠিতে সম্মতি থাকলে স্কুলের শেষে পাশের মাঠে আসতে। আহির সেসবদিকে ধ্যান নেই সে নিজের খাওয়া নিয়েই ব্যস্ত। তানহা বলল,
– ‘ তোর চিঠি এসেছে, আর তোরই কোনো হেলদোল নেই।’
আহি ভাব নিয়ে বলল,
– ‘ আমার এতদিকে তাকানোর সময় নেই বুঝেছিস? আমার রাজপুএ তো ঠিক করাই আছে, ঠিক সময় এসে আমাকে ঠিক নিয়ে যাবে।’
মিতু ও তানহা ওহোহো বলে চেঁচিয়ে উঠেছে। আহিকে বারংবার জিজ্ঞাসা করছে কে সে?
– ‘ সময় হলেই জানতে পারবি,এখন এটাকে আমার সামনে থেকে সরা তো, পারলে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেল।’
মিতু বলল,
– ‘ চল না গিয়ে দেখি কোন হাদারাম তোকে চিঠি দিয়েছে?
তানহাও সঙ্গে তাল মেলালো। আহি বারবার না করছে কেউ শুনছে না, একসময় সেও রাজি হয়ে গেল। দেখে তো আসাই যায়, কে তাকে চিঠিটা দিয়েছি।
স্কুলে ছুটির ঘন্টা বেজেছে কিছুক্ষণ আগেই। আহি গাড়ির দিকে না যেয়ে বান্ধুবিদের নিয়ে মাঠের কাছে চলে এল। এদিক – ওদিকে তাকিয়ে তেমন কাউকেই নজরে পড়ল না। মিতু বলল,
– ‘ তেমন কেউই তো নেই বোকা বানাল নাকি?’
তানহা বলল,
– ‘ আরেএএ দু মিনিট অপেক্ষা করে দেখি না কি হয়।’
দু মিনিট অপেক্ষা করেও কারোর দেখা তারা পেল না, তবে তিনমিনিটের মাথায় ইয়াজকে ঠিকই মাঠে দেখা গেল। তার মুখটা প্রচন্ড রাগে যেমন হয়ে থাকে ঠিক তেমনই হয়ে আছে। ইয়াজকে দেখে মিতু ও তানহা আহির থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আহি ইয়াজকে দেখে খুশি হলো ভীষণ আজও তাকে নিয়ে যেতে এসেছে নিশ্চয়? আহি তার দিকে এগিয়ে যেতেই ইয়াজ থমথমে সুরে বলল,
– ‘ এখানে কেনো এসেছিস?’
আহি আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ এমনি এসেছিলাম। চলো গাড়িতে গিয়ে বসি?’
– ‘ চিঠির ডাকে সারা দিতে এসেছিলি তাই তো?’
আহি অবাক হয়ে বলল,
– ‘ চিঠির ব্যাপারে তুমি জানলে কি করে?’
– ‘ কারণ চিঠিটা আমিই দিয়েছিলাম আর আমার বিশ্বাসও ছিল তুই আসবি না।আমি বিডি থাকার পরেও এই অবস্থা, আমি না থাকলে না জানি কি কি করে বেড়াবি, হয়তো একাধিক ববয়ফ্রেন্ড ও জুটিয়ে ফেলবি তাই না?’
– ‘ কি বলছো এসব, আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম চিঠিটা কে দিয়েছে আর কিছুই না বিশ্বাস করো।
– ‘ বিশ্বাস তাও আবার তোকে। দেখতে এসেই তো প্রেম হবে, প্রেম থেকে বিয়ে পর্যন্ত গড়াবে বিষয়টা।’
আহি অতিষ্ট গলায় বলল,
– ‘ মাথা ঠিক আছে তোমার? কিসব উল্টো – পাল্টা কথা বলছো? চিঠিটা তো তুমিই দিয়েছো যদি প্রেম হয় তাহলে তো তোমার সাথেই হবে।’
– ‘ আজ যদি আমার জায়গায় অন্যকেউ থাকত তার সঙ্গেও নিশ্চয় প্রেমটা হয়ে যেত। ‘
আহি কপাল চাপড়াল নিজের। এর নিশ্চয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে তাই এমন ভুলভাল বকছে। আহি বোঝানোর ভঙ্গিতে আবারও বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৪
– ‘ আমি এখানে একা আসিনি শুধুমাএ কৌতূহল থেকেই এসেছি তাই বলে তুমি আমাকে এমন ভাববে?’
ইয়াজ শুধুমাএ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ‘ তোর ব্যবস্থা আমি করছি জাস্ট ওয়েট। ‘
আহি হতবাক হয়ে ইয়াজের যাওয়ার পথে চেয়ে রইল। কি থেকে কি হয়ে গেল তার মাথাতেই ঢুকল না।
