তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৮
নওরিন মুনতাহা হিয়া
ক্লাসে বসে গাড়ির ঘটনা মনে করে মিটমিট করে হাসছে মেঘ। তার মুখে মাক্স পড়া আর গলা উড়না দ্বারা আবৃত। ঠোঁটে আর ঘাড়ে থাকা লাভ বাইট লুকানর নূন্যতম চেষ্টা করেছে মেঘ। নূহা বেশ দীর্ঘ সময় ধরে মেঘের হাস্যজ্বল মুখের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সাধারণ মেঘ ক্লাসে যথেষ্ট গম্ভীর মুখশ্রী নিয়ে বইয়ের ভিতর মুখ গুঁজে বসে থাকে। কিন্তু আজ এমন অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছে? প্রেমে পড়লে মানুষ যেমন অন্য মনষ্ক থাকে মিটিমিটি করে হাসে মেঘ তাদের মধ্যে করছে কেন? তবে কি মেঘ কারো প্রেমে পড়েছে? কিন্তু কে সে? ফারহান চৌধুরী? নূহা তার মনের সন্দেহ দূর করার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করে
“মেঘ‚ তুমি এমন মিটমিট করে হাসছ কেন? আর তোমার মুখ লজ্জায় এমন লাল হয়ে গেছে কেন? তুমি কি কারো প্রেমে পড়েছ? কে সেই ছেলে? ফারহান চৌধুরী?”
মেঘের ভাবনার মধ্যে হঠাৎ পাশে থাকা নূহার কণ্ঠ শুনে থমকে যায় মেঘ। সে এতোখন কি করছিল তা ভেবে আপসোস করে? মেঘ হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দেয়
“নূহা‚ তুমি কি বলছ এইসব? আমি কার প্রেমে পড়তে যাব? আর ফারহান চৌধুরীর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কাল ফারহান চৌধুরী সমগ্র কলজের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে মেঘকে প্রপোজ করেছে। আর মেঘ হ্যাঁ বলে দিয়েছে! তবুও মেঘ কেন বলছে ফারহানের সাথে তার কোন সম্পর্ক নাই। নূহা পুনরায় প্রশ্ন করে উঠে
“সম্পর্ক নাই মানে? ফারহান চৌধুরী তোমার হবু স্বামী হয় মেঘ? একমাস পর তোমাদের বিয়ে! তুমি কি ফারহান স্যারকে ভালোবাস না?”
কাল কলেজ গাউনে প্রপোজ করার সময় ফারহান তার পরিচয় মেঘের হবু স্বামী হিসাবে দিয়েছে। তাছাড়া একমাস পর তাদের বিয়ে এই কথা ও সবাইকে বলেছে! হয়ত নূহা তখন শুনেছে। কিন্তু মেঘ ফারহানকে ভালোবাসে না। তার সাথে একমাস পর বিয়ের করার কোন প্রশ্নই উঠে না! মেঘ স্পষ্ট স্বরে বলে
“না‚ নূহা আমি ফারহান চৌধুরীকে ভালোবাসি না। তার সাথে আমার কখন বিয়ে হবে না। বড় আব্বুর বন্ধুর ছেলে ফারহান ওনি তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। কিন্তু আমি খুব শীঘ্রই বড় আব্বুকে নিষেধ করে দিব। ফারহান চৌধুরীকে বিয়ে করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়!”
মেঘের কথা শুনে নূহা বেশ কৌতূহল নিয়ে বলে উঠে
“কিন্তু কেন মেঘ? ফারহান চৌধুরীকে বিয়ে না করার কারণ কি? ওনি যথেষ্ট সুদর্শন আর ধনী!”
“কারণ আমি ফারহান চৌধুরীকে ভালোবাসি না নূহা।”
নূহা সন্দিহান দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেঘকে প্রশ্ন করে
“তবে তুমি কি অন্য কাউকে ভালোবাস মেঘ? কিন্তু কাকে? আদ্রিয়ান স্যারকে?”
নূহার এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে মেঘ মৃদু কেশেঁ উঠে। নূহা বেশ সন্দিহান দৃষ্টি নিয়ে মেঘের মুখের আদল পর্যবেক্ষণ করে। ____ আদ্রিয়ানের নাম শুনার পর মেঘের লজ্জামিশ্রিত হাসি। গালে লাল রক্তিম আভা চলে আর চোখের মণিতে মায়া আর ভালোবাসার সপ্ন সবকিছুর উপর নজর যায় নূহার। তারা দুইজন যখন আড্ডা দিচ্ছিল তখন ক্লাস রুমে প্রবেশ করে আদ্রিয়ান।
ক্লাসের সব ছাএ ছাএী উঠে দাঁড়ায় আর জোরে শব্দ করে একসাথে বলে উঠে
“গুড মনিং আদ্রিয়ান স্যার।”
ক্লাসে প্রবেশ করার সর্বপ্রথম আদ্রিয়ানের চোখ যায় শেষের সারিতে বসা মেঘের উপর। মেঘের শান্ত আর মায়বী মুখ দেখে ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি জমা হয়। আদ্রিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করার পর নূহা আর মেঘ কথা বলা থামিয়ে দেয়। মেঘ চোখ পিটপিট করে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে। গাড়ির ঘটনা ক্ষণিক সময়ের জন্য ভুলে গেলে ও এখন আদ্রিয়ানকে দেখার পর। চোখের সামনে সব দৃশ্য ভেসে উঠে মেঘ লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেয়! আদ্রিয়ান হয়ত মেঘের মনোভাব বুঝল মুচকি হেঁসে সব ছাত্র ছাএীর উদ্দেশ্য বলে
“গুড মনিং। সবাই বসে যাও।”
প্রায় পাঁচ মিনিট পর ক্লাস শুরু হয় মেঘ বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে। আদ্রিয়ান বোর্ডে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে। বোর্ড পড়া বুঝার সময় প্রায় মেঘের চোখ আদ্রিয়ানের উপর পরে কিন্তু তারা দুইজন যথেষ্ট স্বাভাবিক আচরণ করে। বাসায় তারা স্বামী স্ত্রী হলেও কলেজে আদ্রিয়ান মেঘের টির্চার হয়! প্রথম সারিতে বসে থাকা মেয়েদের দলের সম্পূর্ণ মনোযোগ আদ্রিয়ানের উপর। এমন করে তাকিয়ে আছে যেন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে! বোর্ডে পড়াশোনা বুঝান শেষ করে আদ্রিয়ান সব শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে
“স্টুডেন্ট তোমরা সবাই কি বোর্ডের পড়া বুঝেছ? কোন প্রবলেম থাকলে বল আমি স্লব করে দিব।”
সকল ছাএ ছাএী হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিয়ে বলে উঠে
“স্যার‚ আমরা বুঝতে পারছি।”
বোর্ডের লেখা মুছে যখন আদ্রিয়ান ক্লাস শেষ করে রুম থেকে বের হয়ে যাবে। তখন প্রথম সারির এক শিক্ষার্থীর নজরে আসে আদ্রিয়ানের গলায় থাকা লাল পার্পেল মার্ক রয়েছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন লাভ বাইট? কিন্তু আদ্রিয়ান স্যার বিবাহিত নন? তবে কি করে সম্ভব? প্রথম সারির একজন মেয়ে দ্রুত জিজ্ঞেস করে
—– আদ্রিয়ান স্যার। আপনার গলায় এমন লাল দাগ হয়ে গেছে কেন?পার্পেল মার্কর মতো?—–.
হঠাৎ একজন ছাত্রীর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আদ্রিয়ান অবাক হয়ে যায়। দ্রুত তার হাত চলে যায় গলায়। মেঘ বইপএ ব্যাগে গুছিয়ে রাখছিল। কিন্তু প্রশ্নটা তার কানে পৌঁছান মাএই চোখ বড়বড় করে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে। আদ্রিয়ান তার শার্টের কলার উঁচু করে উপরের বোতাম লাগিয়ে নেয়। এরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলে উঠে
—– কাল রাতে খুব বড় এক মশা এসে গলায় কামঁড় দিয়েছিল। এইজন্য এমন দাগ হয়ে গেছে?—.
ক্লাসের অন্য ছাত্রীরা পুনরায় প্রশ্ন করে উঠে
—- স্যার। আপনার বাসায় এতো বড়ো মশা থাকে?
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকিয়ে সবার চোখের আড়ালে চোখ টিপ দিয়ে বলে উঠে
—– হুম। আমার বাসায় বিশাল বড় হাতির সাইজের এক মশা আছে। এখন প্রায় প্রতিরাতে এমন মশার কামড় খেতে হবে। —-.
দাঁত কটমট করে আদ্রিয়ানের দিকে তাকায় মেঘ। কতো বড়ো সাহস মেঘকে মশা বলল! তাও আবার বিশাল বড় হাতির সাইজের। কাল রাতে শুধু মেঘ গলায় কয়েকটা কামড় দিয়েছিল। কিন্তু আদ্রিয়ান যে কাল মেঘের ঠোঁটের গলায় কামড়ের দাগ বসিয়ে দিয়েছে? এইজন্য ইচ্ছা করে গাড়ির মধ্যে কামড় দিয়েছে মেঘ। আদ্রিয়ান মেঘের রাগী মুখ দেখে মুচকি হাসে! ছাএীরা জিজ্ঞেস করে
—- আদ্রিয়ান স্যার। আপনি তবে মশা তাড়ানর কোন ব্যবস্থা করেন না কেন? তবে ডেঙ্গু হয়ে যাবে তো?—-
আদ্রিয়ান ছাএীর প্রশ্ন শুনে হাসে এই মশার কামড়ে যদি ডেঙ্গু হয়ে যায়। তবুও তাড়ান যাবে না! আর আদ্রিয়ান চাই যেন তার সারা শরীর জুড়ে এই মশার বিস্তার হয়। এই মশা দূরে চলে গেছে তার বাঁচার সাধ্য নাই। আদ্রিয়ান সব কথা মনে মনে বলে মুখে শুধু বলে
—- এই মশা খুবই বেয়াদব। আমার শত তাড়ানর পর ও ঘাড় থেকে নামবে না। আচ্ছা বাদ দাও এইসব কথা। ক্লাস শেষ এখন আমি আসি —-.
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে মুচকি হেঁসে ক্লাস থেকে বের হয়ে যায়। কাঁধে থাকা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে মেঘ আদ্রিয়ানের ফোনে মেসেজ দিয়ে বলে
—- আদ্রিয়ান স্যার। ওই কামড় মশায় নয় বরং মেঘ দিয়েছে.
কেবিনে বসে মেঘের মেসেজ দেখে শব্দ করে হেঁসে উঠে আদ্রিয়ান। এরপর মেসেজের উত্তরে বলে
—- ওহ্ তাই? বর্তমানে মশা আর মেঘ দুইটাই খুব দুষ্ট হয়ে যাচ্ছে।—
মেঘ মৃদু হেঁসে মেসেজ করে
— আর আপনি ওই দুষ্ট মশার জামাই হন —
আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে ফোনের স্কিনের দিকে তাকিয়ে দেকে এরপর মেসেজ দেয়
—- কি? আমি মশার জামাই!
মেঘ দুষ্ট হেঁসে আহ্লাদী হয়ে বলে
— না। আপনি এই মেঘের জামাই হন। আই লাভ ইউ জামাই জান।
—- উফফ কি মিষ্টি করে ডাক দিল আমার বউটায়। আই লাভ ইউ টু বউ জান —-.
একে অপরের মেসেজ পড়ে দুইজনে হেঁসে উঠে। এরপর তারা আর কিছুসময় এমন প্রেম আলাপ করে। [ আমি পড়তে যায় কারণ আমার কোন জামাই নাই। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষা আছে ]
দুপুর প্রায় ২: ০০ টার সময় কলেজ ছুটি দেয় মেঘের। বেশ দীর্ঘক্ষণ ধরে গাড়ির ভিতরে ড্রাইভিং সিটে বসে মেঘের জন্য অপেক্ষা করছে আদ্রিয়ান। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে প্রায় দশ মিনিট আগে মেঘ এখন ও কেন বের হচ্ছে না? আদ্রিয়ানের ভাবনার মাঝে হঠাৎ গাড়ির কাঁচের জানালায় কেউ নক করে! আদ্রিয়ান দ্রুত গাড়ির কাচঁ নামায় জানালার অপর পাশে মেঘ দাঁড়িয়ে আছে। আদ্রিয়ান বলে
—- মেঘ। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে প্রায় দশ মিনিট আগে তুমি এতোখন কোথায় ছিলে? তুমি দেরি করে আসলে আমার টেনশন হয়! এখন দ্রুত গাড়িতে উঠে বস।—-.
মেঘ মুখ কাচুঁমাচু করে আদ্রিয়ানের দিকে তাকায়। ফারহানের সাথে ডেইটে যাওয়ার কথা কি বলবে আদ্রিয়ানকে? কিন্তু আদ্রিয়ান যদি রাগ করে ? ফারহানের সাথে যদি দেখা করতে না দেয়? তখন কি করবে মেঘ? মেঘ সিদ্ধান্ত নেয় ফারহানের সাথে ডেইটে যাওয়ার কথা লুকিয়ে যাবে। মেঘ ভয়ার্ত কণ্ঠে মিথ্যা অযুহাত দিয়ে বলে
—- আদ্রিয়ান স্যার। আপনি আজ একায় বাসায় যান। আমি নূহার সাথে শপিংমলে যাব।—-.
শপিংমলে যাবে মেঘ? এই কথাটা শুনে আদ্রিয়ান অবাক হয়। হয়ত নতুন জামাকাপড় কেনা প্রয়োজন তাই যাবে! কিন্তু শপিংমলে যাওয়ার জন্য এমন ভয় পাচ্ছে কেন মেঘ? চোখে_ মুখে স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠছে! কণ্ঠে অদ্ভুত এক জড়তা। মেঘ কি কোন কথা লুকানর চেষ্টা করছে তার থেকে। তবে আদ্রিয়ান আর কথা বাড়ায় গাড়ির স্টার্ট দিয়ে মেঘের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলে
—– ওকে আমি একাই বাসায় চলে যাচ্ছি। তুমি নূহার সাথে শপিংমল থেকে ঘুরে আস৷ কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসবে। লেইট যেন না হয়। —–.
আদ্রিয়ান চুপচাপ মেঘের কথা মেনে নিয়েছে দেখে মেঘ যথেষ্ট খুশি হয়। মেঘ বলে
— হুম আমি খুব দ্রুত চলে আসব। আপনি বাসায় যান।—.
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দেয় আদ্রিয়ান। মেঘ স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে শান্ত হয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ মেঘের ফোনে ফারহানের নাম্বার থেকে কল আসে। মেঘ ফোন রিসিভ করে । অপর পাশে থাকা ফারহান বলে উঠে
—– মেঘ তুমি কোথায়? আমি রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেছি। কলেজ কি ছুটি হয়েছে তোমার? —
মেঘ সম্মতি সূচক উত্তর দেয়
—- হুম আমার কলেজ ছুটি হয়েছে। আপনি রেস্টুরেন্টের অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।—
— ওকে।—-.
প্রায় তিরিশ মিনিট পর রেস্টুরেন্টে পৌঁছায় মেঘ। রেস্টুরেন্টের ভিতরে প্রবেশ করে দেখে এক পাশের কোণায় এক টেবিলে বসে আছে ফারহান। মেঘ এগিয়ে যায় ফারহানের কাছে এরপর তার কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। ফারহান মেঘকে দেখে বলে
—- মেঘ। তুমি এসে পড়েছ। কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আমি।—
মেঘ জানে ফারহান বেশ দীর্ঘ সময় ধরে তার জন্য অপেক্ষা করছে। মেঘ বলে
—- আই এম সরি ফারহান। আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে। আপনাকে অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হল।–
ফারহান মৃদু হেঁসে উত্তর দেয়
— ইট’স অল রাই মেঘ। এখন বল কি খাবে? তোমার পছন্দের কোন খাবার অর্ডার দিব আমি।
—- ফারহান আমি কিছুই খাব না। আমি শুধু আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা বলতে চাই। আমায় দ্রুত বাসায় ফিরে যেতে হবে। —-
—- মেঘ আমরা আজ প্রথম ডেইটে এসেছি। তুমি যদি কিছুই না খাও তবে কি করে হয়। আমি তোমার সব কথা শুনব আগে খাবার অর্ডার করি।—
ফারহানের জোরে বাধ্য হয়ে মেঘ বলে
—- ফারহান। আমি শুধু কফি খাব। আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই।
ফারহান বেশ আগ্রহ দেখিয়ে মেঘের কাছে জানতে চাই
—- আচ্ছা যাও আমি শুধু কফির অর্ডার করব। কিন্তু এখন বল কি এমন জরুরি কথা। যার জন্য এতো তাড়া দিচ্ছো তুমি?
এতোখন ফারহানের সাথে কথা বলার জন্য বেশ আগ্রহ প্রকাশ করছিল মেঘ। কিন্তু এখন তার সব কথা কেমন জানব গুলিয়ে যাচ্ছে? কোথা থেকে শুরু করবে বা কোথায় গিয়ে শেষ করবে তা বুঝতে পারছে না। মেঘ যথেষ্ট ইতস্তত বোধ করছিল তবুও মনে সাহস দিয়ে সরাসরি বলে উঠে
___ ফারহান স্যার। আমার দ্বারা আপনাকে বিয়ে করা সম্ভব হয়। একমাস কেন আগামী সাত জন্মে ও আমি আপনার হতে পারব না —
হঠাৎ মেঘের মুখে এমন কথা শুনে ফারহান অবাক হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় মেঘের দিকে। ফারহান যেন কথাটা শুনলে ও বুঝতে পারেনি। ফারহান বলে
—- মেঘ। তুমি কি বলছ এইসব? আমার আর তোমার বিয়ে একমাস পর হবে৷ জামান আঙ্কেল নিজে আমার আব্বুর সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছেন। ___.
ফারহানের কথার মানে মেঘ বুঝে! বড় আব্বু তার বিয়ে জন্য ফারহানের বাবার সাথে কথা বলেছে। কিন্তু সে কি করে ফারহানকে বিয়ে করবে? মেঘ বিবাহিত! তার স্বামী এখনও জীবিত। তাছাড়া মেঘের দ্বারা আদ্রিয়ান ছাড়া অন্য কোন পুরুষকে ভালোবাসা সম্ভব নয়! মেঘ বলে
—- বড় আব্বুর কথার মান আমি রাখতে চাই ফারহান। কিন্তু আমার দ্বারা আপনাকে বিয়ে করা সম্ভব নয় ফারহান। আমি পারব না —-
ফারহান এই যথেষ্ট জোড়াল প্রশ্ন করে উঠে
—- কিন্তু কেন মেঘ? কেন তুমি আমায় বিয়ে করতে পারবে না। এর কারণ কি? উত্তর চাই আমার!
ফারহানের প্রশ্নে মেঘ শান্ত স্বরে শুধু একটা কথায় বলে
—– কারণ আমি বিবাহিত ফারহান। স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় অন্য কোন পুরুষকে আমি কি করে বিয়ে করব?
মেঘের বিয়ের কথা শুনে ফারহান অবাক হয়নি। কারণ সে জানে মেঘ বিবাহিত! তবুও সে চাই মেঘকে বিয়ে করতে। কোন মানুষের অতীত দিয়ে তাকে বিচার করে না ফারহান! ফারহান বলে
—– মেঘ। আমি অনেক আগে থেকেই জানি তুমি বিবাহিত। কিন্তু এতে আমার কোন অসুবিধা নাই মেঘ। আমি তোমায় ভালোবাসি। তাছাড়া তোমার স্বামীর সাথে আর পঁচিশ দিন পর তোমার ডিভোর্স হবে যাবে। তখন আমাদের বিয়ে হবে।
ফারহানের কথার বিপরীতে মেঘ দৃঢ় কণ্ঠে বলে
—– ফারহান। আমি আমার স্বামীকে তালাক দিতে চাই না। ওনার সাথে সংসার করতে চাই!
—- কিন্তু কেন মেঘ? যে মানুষটা তোমায় নয় বছর আগে বিয়ের আসর থেকে রেখে চলে গিয়েছে। শুধু মাএ তার স্বার্থপরতার জন্য। তার সাথে তুমি কেন সংসার করতে চাও? তোমার ওই সয়তান স্বামী তোমার ঘৃণা ডিজার্ব করে ভালোবাসা নয়! —-.
___ ফারহানের কথা যে খুব ভুল তা কিন্তু নয়! আদ্রিয়ান নয় বছর আগে যা করেছে মেঘের সাথে তা অন্যায়। কিন্তু এখন আদ্রিয়ান নিজের ভুল বুঝতে পারছে। শুধুমাএ একবার মেঘের কাছে শেষ সুযোগ চেয়েছে! মেঘের কি একটা সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না। মেঘ বলে
___ ফারহান আমার স্বামী আমার সাথে যা করেছে তা অন্যায়। কিন্তু এখন সে নিজের ভুল বুঝতে পারছে! আমার কাছে শেষ সুযোগ চেয়েছে। তার ভুল ক্ষমা করে দেওয়া কি উচিত হয় আমার জন্য!
মেঘের শেষ কথা শুনে ফারহান বেশ অবাক হয়। মেঘের স্বামী ভুলের ক্ষমা চেয়েছে মানে? জামান সাহেবের ছেলের সাথে কি মেঘের দেখা হয়েছে? আমেরিকায় এসে! কিন্তু কে সে! ফারহান বলে
—– মেঘ। কে তোমার স্বামী! নয় বছর আগে ঠিক কার সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে? নাম কি তার?
মেঘ বেশ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে ফারহানের কথা শুনে এরপর শান্ত কণ্ঠে বলে
—- আমার স্বামী নাম আদ্রিয়ান রোদোয়ান। বর্তমান আমেরিকার হার্ট সাজন। আর আমি যে কলেজে পড়ি ওই মেডিক্যালের টির্চার ওনি।
___ মেঘের মুখে আদ্রিয়ান রোদোয়ান নাম শুনে ফারহান হতবাক হয়ে যায়! নবীন বরণ অনুষ্ঠানে যে শিক্ষকের সাথে ফারহানের দেখা হয়েছিল ওনার নাম ছিল আদ্রিয়ান! তবে কি ওনিই মেঘের স্বামী! জামান তালুকদারের বড় সন্তান। আদ্রিয়ান তালুকদার! এইজন্য কি ফারহানের সাথে মেঘকে দেখে আদ্রিয়ান এমন রাগ করছিল!
রেস্টুরেন্টের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক গাড়ির ভিতরে বসে আছে আদ্রিয়ান। তার চোখে মুখে এখন রাগ আর বিরক্তি স্পষ্ট ফুটে উঠছে! আজ মেঘ তাকে মিথ্যা কথা বলছে। নূহার সাথে মেঘ কোন শপিংমলে যায়নি! বরং এই রেস্টুরেন্টে এসেছে? কিন্তু কেন? মেঘ আদ্রিয়ানের থেকে লুকিয়ে রেস্টুরেন্টে কেন আসবে? তখন মেঘের ব্যবহার দেখে আদ্রিয়ানের সন্দেহ হয়েছিল। তাই আদ্রিয়ান বাড়ি না গিয়ে মেঘের পিছনে পিছনে এই রেস্টুরেন্টে আসে।
বেশ অনেক সময় ধরে মেঘ এই রেস্টুরেন্টে ভিতরে গিয়েছে। কিন্তু এখনও বাহির হচ্ছে না কেন? কি এমন সত্যি আছে যা মেঘ আদ্রিয়ানের থেকে লুকাতে চাই। আদ্রিয়ানের তা জানতে হবে। গাড়ির দরজা খুলে বাহিরে বের হয় আদ্রিয়ান। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় রেস্টুরেন্টের কাছে। রেস্টুরেন্টে কাঁচের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে আদ্রিয়ান।হঠাৎ দূরে কোণায় থাকা দৃশ্য দেখে সে অবাক হয়ে যায়। দাঁত কটমট করে তাকায় সেইদিকে। রাগে ক্ষোভে জ্বলে যাচ্ছে তার শরীর। আদ্রিয়ান জোরে শব্দ করে রাগী কণ্ঠে ডাক দেয়
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৭
____ মেঘ।
মেঘের ডান পাশের হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে কাঁধে হাত রেখে ফারহান কিছু কথা বলছিল মেঘকে। কিন্তু হঠাৎ দরজায় কারো চিৎকার শুনে দুইজনে তাকায় ওইদিকে। মেঘ দূরে থাকা আদ্রিয়ানের রাগী চেহারা দেখে ভয়ে শুকন ঢুক গিলে। আদ্রিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরে কণ্ঠে চিবিয়ে বলে
___ ফারহান চৌধুরী। তোর সাহস কি হয় আমার বউকে ছুঁয়ার। তুই যে হাত দিয়ে আমার মেঘকে ছুঁয়েছিস ওই হাত আমি ভেঙে দিব। তোকে আজ খুন করে ফেলব আমি। _
