Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা শেষ পর্ব 

তোমার নামে নীলচে তারা শেষ পর্ব 

তোমার নামে নীলচে তারা শেষ পর্ব 
নওরিন মুনতাহা হিয়া

___ রুমে গিয়ে বিছানায় বসে মিটমিট করে হাসতে থাকে মেঘ। সে প্রথম ব্যাক্তি যার মিথ্যা কথা বলতে শান্তি লাগছে! মেঘ প্রেগনেন্ট না, তার পেটে বাচ্চা আসার কোন সম্ভাবনা নাই! কিন্তু তখন ডিভোর্স আটকাতে তাকে মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে। কারণ সে বাধ্য ছিল। জামান সাহেব যে জেদি যদি সত্যি তার সাথে ফারহানের বিয়ে দিয়ে দিত তখন?
রুমে প্রবেশ করে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয় আদ্রিয়ান। শক্ত চোখে মেঘকে পর্যবেক্ষণ করে, এরপর ওর কাছে গিয়ে বলে

___” মেঘ, সত্যি করে বল তুমি প্রেগনেন্ট হলে কি করে? আমি আজ অবধি তোমায় ছুঁয়ে অবধি দেখিনি। এতো ভদ্র স্বামীর মানে, এমন মিথ্যা অপবাদ দিতে লজ্জা করে না।”
মেঘ বিছানা থেকো উঠে ভ্রু কুঁচকে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে! সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যে কতো ভদ্র তা সে জানে। কিন্তু তার মিথ্যা বলার কথা এখুনি স্বীকার করে না! মেঘ বলে উঠে
___” প্রেগনেন্ট হব কি করে মানে? বিয়ে হয়েছে, স্বামী আছে, বাচ্চা হবে! এইটা স্বাভাবিক?”
আদ্রিয়ান মেঘের চালাকি বুঝে, ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে বিছানায় বসে! মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠে
__” বিয়ের নয় বছর হয়ে গেছে। এখনও বাসর করেনি। অথচ বউ প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে? কি করে সম্ভব শুনি?”
আদ্রিয়ানের মুখের দিকে দুষ্ট হাসি দিয়ে মেঘ বলে

___” বউ আপনার কিন্তু বাসর করেন নাই। এই দোষ কার? শুনি!”
আদ্রিয়ান মেঘের কোমড় জড়িয়ে ধরে ওর কাছে নিয়ে আসে। এরপর মুচকি হাসি দিয়ে বলে
___” ড্রয়িং রুমে সবাইকে যে মিথ্যা বললে। এখন যদি নয় মাস পর সবাই বাচ্চা দেখতে চাই, তখন?”
মেঘ বিছানা ছেড়ে উঠে যায় আদ্রিয়ানের কোলে। ওর গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করে বলে উঠে
___” নয় মাস পর দেখতে চাইলে দেখবে। মিথ্যা সত্য হলে মন্দ হয় না। কি বলেন?”
কাঁধের উপর থেকে মেঘের হাত সরিয়ে দিয়ে, দূরে সরে যায়! মেঘ অবাক করা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু দূর থেকে মেঘের হাতের পিঠে চুমু খায় আদ্রিয়ান! এরপর শান্ত স্বরে বলে উঠে

__” এমন পরিকল্পনা স্বপ্নে করবে না। আগে তোমার পড়াশোনা শেষ হবে। এরপর এখন না।”
মেঘ মুখে ভেংচি কেটে বসে থাকে! নয় বছর আগে যদি তারা একসাথে সংসার করত। তবে হয়ত মেঘ একই আবদার করত! তাই দূরে থাকা উচিত হয়েছে! আর এখনও তাই করতে হবে।
প্রায় ১৫ দিনের মতো জামান সাহেব আর তার পরিবার আমেরিকায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা _ বাণিজ্যর কারণে আবার পুনরায় চলে যেতে হয়। এই পনেরো দিনে প্রতিটা মুহূর্ত আদ্রিয়ানকে নজরে রাখেন ওনি! তবে মেঘের প্রতি আদ্রিয়ানের যত্ন, ভালোবাসা, দেখে ওনি খুশি হন। হয়ত তাদের দুইজনকে একসাথে দেখে যদি পৃথিবীর কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। তবে তিনি হলেন জামান সাহেব! তার মৃত বন্ধুর আমানত সে রাখতে পেরেছে। মেঘকে তালুকদার বংশের পূএবধূ হিসাবে দেখার স্বপ তার পূরণ হয়েছে।

__ ৩ বছর পর _
বাংলাদেশের বিখ্যাত হার্ট সার্জনের মধ্যে অন্যতম হলেন ডক্টর : আদ্রিয়ান রেদোয়ান। আমেরিকার মেডিক্যাল হাসপাতালে আদ্রিয়ান প্রথমে যে বন্ধুর পরিবর্তন। কয়েকদিন টির্চারের জব করেছিল। তার ওই বন্ধু এখন ফিরে এসেছে! যদিও কলেজ কতৃপক্ষ তাকে অনেক জোর করেছিল, টির্চার হিসাবে জয়েন করার। কিন্তু আদ্রিয়ান করেনি।
আমেরিকায় এখন খুব বেশি থাকা হয় না তার। বছরে এক থেকে দুইবার যায়। বাকি সময় বাংলাদেশে থাকে! মেঘের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে, কারণ ওর পড়াশোনা। নয় বছর পরিবার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে শুধু নিজের কেরিয়ারের উপর মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু সে ভুল করতে চাই না! বাংলাদেশে এক হাসপাতালে হার্ট সার্জন হিসাবে জয়েন করেছে। হাসপাতালে সারাদিন কাটিয়ে বাসায় ফিরে এসে, পরিবারকে সময় দেয়। মা, বাবা, ভাই, বোন, চাচা, চাচির সবার সাথে সুখের সংসার তার।

বছরে একবার আমেরিকা যায় তাও সেটা মেঘের সাথে দেখা করার জন্য। গত দুই এক বছর ধরে তাদের মধ্যে যথেষ্ট দুরত্ব তৈরি হয়েছে। মেঘের ফাইনাল ইয়ার চলছিল তাই পড়াশোনার প্রচুর চাপ! আদ্রিয়ান তাকে বিরক্ত করেনি। যদিও প্রতিদিন তাদের ফোনে ঘণ্টার ঘণ্টার কথা হয়।
আদ্রিয়ান প্রায় ৩ বছর আগে বাংলাদেশে চলে এসেছে। মেঘকে বুঝিয়ে! খুব কান্না করেছিল মেঘ। কিন্তু আদ্রিয়ান জানে, সে যদি মেঘের থেকে দূরে না থাকে। তবে মেঘ কখনও পড়াশোনায় মন বসাতে পারবে না! জামান সাহেবের সাথে তার এখন যথেষ্ট ভালো সম্পর্কের। ছুটির দিনে বাবার ব্যবসায় মাঝে মধ্যে বসে। চাচা, বাবার থেকে ব্যবসার কাজ কর্ম শিখে! একসাথে গল্প করে। আদ্রিয়ানের পরিবর্তন থেকে জামান সাহেব যথেষ্ট খুশি। ওনি তো চেয়েছিলেন তার ছেলে তার কাছে থাকুক।

আদ্রিয়ান আর আগের মতো নিজ কেরিয়ার, পড়াশোনার জন্য তার পরিবার থেকে দূরে থাকে না। হাসপাতাল, সার্জারি সব কিছুর পরও সবার সাথে থাকে! তবে মেঘের থেকে দূরে থাকা তার জন্য এতো সহজ ছিল না। কিন্তু সে বাধ্য! মেঘকে অনেক মিস করে! প্রতি মুহুর্তে কিন্তু তা কখনও প্রকাশ করে না। এমনি যে পাগলি বউ তার! যদি তার মনের অস্থিরতা মেঘের কাছে প্রকাশ করে, তবে পড়াশোনা সব বাদ দিয়ে তার কাছে চলে আসবে।
পাঁচ দিন আগে মেঘ ডক্টরি পড়াশোনা শেষ করে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে! কাল সে দেশে ফিরবে। আবিহা, কারান, ফারহানা বেগম, মিলন সাহেব সবাই আসবে। ফাইনালি সে তার মেঘকে দেখতে পাবে! আদ্রিয়ানের অনেক হ্যাপি!
তালুকদার বাড়ির নিজ রুমে বসে কাজ করছে আদ্রিয়ান। ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে! টেবিলে থাকা ফোন হঠাৎ শব্দ করে বেজে উঠে! আদ্রিয়ান চোখের চশমা খুলে, ল্যাপটপ থেকে নজর সরিয়ে ফোন রিসিভ করে। অপর পাশ থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে

____” আদ্রিয়ান, দ্রুত বাগানে চলে আসুন।”
ফোনের নাম্বার চেক করে দেখে মেঘের কল এসেছে। আদ্রিয়ান অবাক হয়, হঠাৎ মেঘ ফোন করেছ? আর বাগানে আসতে বলছে কেন? মেঘ এখন আমেরিকায় কাল আসবে! আদ্রিয়ান বলে
___” কিন্তু কেন মেঘ? তুমি কোথায়?”
ফোনের অপর পাশ থেকে মেঘ বলে
__” আপনি আগে আসুন। বাগানে। খুব দ্রুত।”
এই কথা বলে ফোন রেখে দেয় মেঘ। আদ্রিয়ান অবাক হয়ে যায়! এতো রাতে বাগানে কেন যেতে বলছে? টেবিল থেকে উঠে রুম থেকে বের হয়ে যায় আদ্রিয়ান। সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে সদর দরজা দিয়ে বাহিরে চলে যায়!
ঘুটঘুটে অন্ধকার বাগান চারপাশ অন্ধকার। বাগানে আজ লাইট জানাল হয়নি? আর এই অন্ধকারের মধ্যে মেঘ কেন আসতে বলল! কি কারণ? আদ্রিয়ান আশেপাশে তাকিয়ে বলে উঠে

____” মেঘ? মেঘ?”
মেঘের নাম ধরে ডেকে ফোন হাতে নিয়ে এগিয়ে যায়! বাগানের মাঝ বরাবর অবধি পৌঁছানর আগেই! হঠাৎ ধপ করে, চারপাশের আলো জ্বলে উঠে। আকাশে রঙিন বাজি ফুটে উঠে। বাগানের চারপাশে কৃত্রিম আলো দ্বারা সজ্জিত! হঠাৎ এমন ঘটনায় আদ্রিয়ান চমকে উঠে! কিন্তু সব কিছুর মধ্যে তার চোখ যায়, তার সম্মখে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর দিকে! আদ্রিয়ান অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে
___” মেঘ?”

রঙিন আলেয় শাড়ি পরহিত অবস্থায় মেঘকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। কালো শাড়ি, গলায় নথ, কানে স্বর্ণের দুল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক! এক গাল মিষ্টি হাসি দিয়ে তার দিকে মিটমিট করে হাসছে। আদ্রিয়ানের আত্মা শান্ত হয়ে যায়, প্রায় একবছর পর দেখল তার প্রেয়সীকে! তার প্রিয় মেঘবালিকাকে! আদ্রিয়ান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে হাত বাড়িয়ে দেয়, বুকে টেনে নেওয়ার উদ্দেশ্য। মেঘ আর দেরি করল না দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে তার স্বামীর বুকে। তার নিরাপদ আশ্রয়ে।
আদ্রিয়ানের শরীরে এই সুঘ্রাণ তার বুকের মাথা রেখে পরম শান্তিতে মুখ গুঁজে থাকা। এই বিষয়গুলো মেঘ মিস করেছে! আমেরিকায় থাকতে কতো রাত নিঘুর্ম কাটিয়েছে, শুধুমাএ আদ্রিয়ানের কথা ভেবে। গত তিন বছরের দুরত্বে যেন তাদের ভালোবাসার মরিচা ধরেনি। বরং দূরে থেকেও একে অপরের অধিক ভালোবেসেছে।
আদ্রিয়ানের বুকে লেপ্টে গিয়ে মেঘ বলে উঠে

___ ” সারপ্রাইজ পছন্দ হয়েছে?”
বাহুধরে শক্ত করে ধরে আদ্রিয়ান কাঁধে মাথা রেখে বলে উঠে
___” তোমার আগমন আমার সারপ্রাইজ মেঘ। তুমি বাংলাদেশে এসেছ আমায় বলনি কেন? কখন এসেছ?”
___” আগে বললে সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যেত।”
বুকের ভিতর থেকে মাথা উঠিয়ে মেঘ, চারপাশে থাকা আলোক সজ্জার দিকে ইশারা করে বলে
___” এই সারপ্রাইজ দেখে কোন ঘটনা মনে পড়ে আপনার? আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা?”
আদ্রিয়ানের চোখের সামনে ভেসে উঠে সব দৃশ্য! তাদের প্রথম দেখা, অন্ধকারের মধ্যে মেঘকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচান সব! তার বউ এই সারপ্রাইজ কেন পরিকল্পনা করেছে তা এখন বুঝতে পারে। আদ্রিয়ান হেঁসে বলে
___” সব মনে পড়েছে। তোমার সাথে আমার দেখা হওয়ার পর, থেকেই আমার জীবনের সুন্দরতম অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আই মিস ইউ মেঘ।”

মেঘ অশ্রু সিক্ত চোখে বলে
___” আই মিস ইউ টু।”
আদ্রিয়ানের থেকে একটু দূরে গিয়ে তার শাড়ির নিচ থেকে এক আংটি বের করে। হাঁটু গেঁড়ে বসে, আদ্রিয়ানের সম্মুখে আংটি ধরে বলে
___উইল ইউ ম্যারি মি এগেইন ” ডক্টর :আদ্রিয়ান রেদোয়ান।”
বউয়ের এমন কাণ্ড দেখে শব্দ করে হেঁসে উঠে আদ্রিয়ান। এরপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে
__” অফকোর্স আই উইল! আই লাভ ইউ।”
__” আই লাভ ইউ টু।”
চারপাশে লুকিয়ে থাকা সকলে হাততালি দিয়ে সামনে আসে! আদ্রিয়ান সবাইকে দেখে! আবিহা, কারান, তার পরিবার, সৃষ্টি, জামান সাহেব অবধি উপস্থিত ছিলেন। সবাই একসাথে তাদের উদ্দেশ্য করে বলে
___” কনগ্রেচুলেশন।”
তারা দুইজন সবার দিকে তাকিয়ে হাসে। এরপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। খুব শ্রীঘ্রই তাদের পুনরায় বিয়ে হবে।

___ আজ ৩ মার্চ মেঘ আর আদ্রিয়ানের শুভ বিবাহ __
রুমে লাল টকটকে শাড়ি, গাঢ় রঙের লিপস্টিক, হাতে কাঁচের চুড়ি, পায়ে আলতা। মাথায় সাদা শুভ্র রঙের উড়না। বেশ লাল টুকটুকে বউ লাগছে মেঘকে! মেকআপ আর্টিস্ট তার সাজসজ্জা শেষ করে মেঘকে বলে
___” ম্যাম, দেখেন আপনার সাজ কি পছন্দ হয়েছে? ভীষণ সুন্দর লাগছে আপনাকে।”
চোখের পাতা পিটপিট করে খুলে তাকায় মেঘ। বৃত্তকার আয়নায় তার বধূবেশের সাজসজ্জা জলমল করে ফুটে উঠছে। বউ বউ লাগছে! আগের বার যখন তাদের বিয়ে হয়েছিল, তখন মেঘের আপসা কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ে! তবুও সে সৃতি সে যত্ন করে নিজ মনের কুটিরে রেখে দিয়েছে। প্রথমবার নিজ স্বামীর উদ্দেশ্য “কবুল” বলে তার বিবাহিত জীবন শুরু হয়েছিল। সব ঘটনা এতো শীঘ্রই কি ভুলে যাওয়া যায়!
মেঘের সাজসজ্জা শেষ হলে রুমে আসে আবিহা। আবিহা আর কারানের একটা ছোট ছেলে রয়েছে আহান! যার বয়স ২ বছর এখনও হয়নি! আবিহা তার প্রিয় বান্ধবীকে বউ সাজে দেখে হা করে তাকিয়ে থেকে বলে
___” মাশাআল্লাহ কতো সুন্দর লাগছে আমার মেঘ পরীকে। কারো নজর যেন না লাগে।”
মেঘ হাসে, আবিহা ওর কাঁধে হাত রাখে! নিজের চোখ থেকে কালি নিয়ে এসে মেঘের থুতনির উপরে লাগিয়ে দেয়। আবিহা বলে

___” এখন চল মেঘ। আদ্রিয়ান ভাই বিয়ের আসরে জামাই সেজে অপেক্ষা করছে তোর জন্য।
মেঘ লাজুক হাসে! এরপর আয়নার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে! আজ তার মা _ বাবাকে বড্ড মনে পড়ছে। তারা থাকলে হয়ত অনেক খুশি হতো! কিন্তু তারা পারল না দেখে যেতে। মেঘকে নিয়ে রুম থেকে বের হয় আবিহা।
দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছেন জামান সাহেব। মেঘ দরজা খুলে বের হয়, জামান সাহেব একবার তাকায় মেঘের দিকে! কতো সুন্দর লাগছে আজ তার মেয়েকে। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তার। চৌদ্দ বছর বয়স থেকে মেঘকে নিজ মেয়ের মতো বড়ো করেছে সে। আর সেই মেঘ তার ছেলের বউ হয়ে তার ঘরে যাচ্ছে! জামান সাহেবের দুই চোখ যেন পড়তে পারে মেঘ, সে বলে

___” বড় আব্বু, কেমন লাগছে আমায়?”
জামান সাহেব মেঘের মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠে
___” তালুকদার বাড়ির বড় গিন্নি। আর আমার মেয়ের মতো লাগছে। ”
জামান সাহেবের কথা শুনে মেঘ হাসে! এই মানুষটা সত্যি তাকে কখনও বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি! জামান সাহেবের জন্য আজ তার জীবনে এতো সুখ এসেছে! জামান সাহেব মেঘের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে
___” হাত ধরে। আমার মেয়েকে বিয়ের আসরে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
জামান সাহেবের কথায় মেঘ সম্মতি দিয়ে বলে উঠে
___ চল বড় আববু।”

মেঘ জামান সাহেবের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যায়। পা বাড়ায় বিয়ের আসের উদ্দেশ্য।
তালুকদার বাড়ির সামনে ফাঁকা অংশে বিশাল বড়ো করে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। শত শত অতিথি, বন্ধু _বান্ধব সকলে এসেছে। তিহান আর নূহাও এসেছে ওরা বর্তমানে রিলেশনে আছে। গত তিন বছরে তাদের মধ্যে একটু একটু করে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে! কখন যে একে অপরের ভালোবেসে ফেলেছে তা বুঝতে পারেনি। নূহা তিহানের পাশে সবসময় থেকেছে। নিজের প্রিয় শএুকে ভালোবেসে ফেলেছে তিহান!
আর জিয়া, ওর বিয়ে হয়ে গেছে এক ডক্টরের সাথে। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় পার্থ নামের এক ছেলে তাকে বেশ পছন্দ করত। কিন্তু কখনও বলার সাহস হয়নি। জিয়া আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে এই ভেবে সে তার ভালোবাসা প্রকাশ করেনি।

তবে আদ্রিয়ান বাংলাদেশে চলে আসার পর। জিয়া একা হয়ে যায় হাসপাতাল তাকে একাই সামলাতে হতো। তখন তার নিকটে আসে পার্থ! কাজ করার সুবিধার্থে তারা এক সাথে থাকত! এরপর প্রেম, বিয়ে! জিয়া এখন বুঝতে পারে, ভালোবাসা আর পাগলামির মধ্যে হাজার খানিক পার্থক্য রয়েছে। আর পার্থকে সে ভালোবাসে! জিয়া নিজেকে খুব লাকি মনে করে পার্থর মতো এমন হাসবেন্ডকে পেয়ে। তারা এখন সুখে সংসার করছে।
বিয়ের স্টেজে বর সেজে বসে আছে আদ্রিয়ান। তার মধ্যে এক অদ্ভুত নার্ভাস নেন্স কাজ করছে! মেঘকে বউ সেজে কেমন লাগছে তা বড্ড দেখার ইচ্ছা করছে তার। আদ্রিয়ানের অপেক্ষার মধ্যে সদর দরজা দিয়ে বউ সেজে বাহিরে আসে মেঘ।

সারা জায়গায় জুড়ে লাল কারপের্ট আর অভিনব সাজসজ্জা। আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়ায়! জামান সাহেবের হাত ধরে এগিয়ে আসে মেঘ! তার চোখে পূর্ণতার হাসি। ১২ বছর পর নিজ ভালোবাসার মানুষকে পুনরায় বিয়ে করতে যাচ্ছে সে! অবশেষে তার অপেক্ষা সার্থক, একতরফা ভালোবাসাকে হারিয়ে নিজের প্রিয় মানুষের মন জয় করে নিল!
মেঘকে বউ সাজে দেখে, আদ্রিয়ান এক দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে। তাদের দুইজনের চোখে জল! আদ্রিয়ান চোখ দিয়ে ইশারা করে, সব ঠিক আছে মেঘ! অবশেষে তুমি আমার!
স্টেজে এগিয়ে আসার পর, আদ্রিয়ান হাত বাড়িয়ে তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। পাশাপাশি দুই চেয়ারে বসে আছে তারা। কাজী খাতা বের করে, নাম, পরিচয় পরে এরপর মেঘকে বলে

___” মা, তুমি কি এই বিয়েতে রাজি? রাজি থাকলে বল কবুল। ”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে মেঘের। শান্ত কণ্ঠে বলে উঠে
__” কবুল কবুল কবুল। ”
কাজি পুনরায় আদ্রিয়ানকে জিজ্ঞেস করে
___ তুমি কি মালিহা জান্নাত মেঘকে নিজ স্ত্রী রূপে গ্রহণ করেছে? তবে বল কবুল?
আদ্রিয়ান তার মনে সুপ্ত খুশি লুকিয়ে রেখে বলে
___” কবুল, কবুল, কবুল।”
সবাই একসাথে বলে উঠে
___” আলহামদুলিল্লাহ। ”
নতুন বর _ বঁধুর উপর ফুল ছড়িয়ে দেয়। স্টেজের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে নূহা আর তিহান! তিহান তার হাতে থাকা ফুল নূহার দিকে ছুঁড়ে দেয়! আর বলে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৬৫

___” নূহা, ওদের দুইজনের বিয়ে দেখে। আমারও বিয়ে করার ইচ্ছা করছে। চল না বিয়ে করি।”
নূহা মুচকি হেঁসে ভাব দেখিয়ে বলে
___” আমি রাজি না।”
___” তাহলে উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করব।”
__” আচ্ছা?
__” হুম মিস : ঝগড়ুটে বউ হবেন আমার?
নূহা হেঁসে বলে উঠে
___” হুম হব মিস্টার ; সয়তান।”
রাতের আকাশে সহস্র তারার মাঝে। আজ এক নীলচে তারার উদয় হয়েছে। যার নীভু নীভু রশ্নি এসে পড়ছে দুই বিবাহিত দম্পতির উপর। তাদের পূর্ণতার হাসি যেন চারদিকে নীলচে আলোর ঝলক তৈরি করেছে।

সমাপ্ত