দাহশয্যা পর্ব ৫৮
Raiha Zubair Ripti
১৬ ই মার্চ মহাদেবপুর ইব্রাহিম আসলো ঊর্মি কে নিতে। ইমনের আসার কথা ছিলো কিন্তু ইব্রাহিম ব্যাটা ইমন কে ভংচং বুঝিয়ে বলেছে— “ আমিও রুমাইসা কে আনতে মহাদেবপুর যাচ্ছি, তো আমি যখন যাচ্ছি তখন তোমার বোন কেও আমি নিয়ে আসবো। তোমার কষ্ট করে যেয়ে লাভ নেই। তাছাড়া তোমাকে আর ইয়াসিন কে তো আজ বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে খাবার সামগ্রী দিতে।
ইমন ইব্রাহিমের ভংচং কে সোজা মনে নিয়েই বৃদ্ধাশ্রমের দিকে চলে যায় ইয়াসিনের সাথে। ইব্রাহিম ফুরফুরে মেজাজে চলে আসে মহাদেবপুর। ঊর্মি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো ভাইয়ের। কিন্তু হুট করে মেয়র সাহেব কে দেখে থতমত খেয়ে যায়। ইব্রাহিম গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলে-
“ ভেতরে এসে বসা হোক। ”
ঊর্মি এদিক-সেদিক তাকালো। সেটা দেখে ইব্রাহিম বলল-
“ তোমার ভাই আসে নি। আমিই এসেছি নিতে। ভেতরে আসো। ”
ঊর্মি উঠে বসলো গাড়িতে। ইব্রাহিম স্টার্ট দিলো গাড়ি। গাড়ি চালানোর মাঝে বারবার ইব্রাহিম ঊর্মির দিকে তাকাচ্ছিলো। সেটা দেখে ঊর্মি বিরক্ত হয়ে বলল-
“ গাড়ি চালানোর সময় আপনার আমাকে এই দেখাদেখির জন্য যদি গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়ে আমাকে পটল তুলতে উপরে চলে যেতে হয় তাহলে কিন্তু খবর আছে। ”
ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-
“ কয়টার খবর রমণী? ”
“ আপনি সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান দয়া করে। ”
“ পাশে এমন সুন্দরী বেবি গার্ল থাকলে সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাবো কি করে? ”
“ ফ্লাট করছেন আমার সাথে? ”
“ কসম একদমই না। ”
“ তাহলে এসব লুইচ্চা মার্কা কথা বলেন কেনো? ”
“ হোপ মেয়ে, এসব লুইচ্চা মার্কা কথাবার্তা না। ”
“ তাহলে কি? ”
“ ভালোবাসার কথা। ”
ঊর্মির কপাল কুঁচকে আসলো।
“ হোয়াটস মিন ভালোবাসা? কিসের ভালোবাসা? ”
ইব্রাহিম ঊর্মির পানে তাকালো। শান্ত গলায় বলল-
“ আমাদের বিয়ে করে নেওয়া উচিত ঊর্মি। ”
ঊর্মির চোখ বড় বড় হয়ে আসলো।
“ আর ইউ ম্যাড? হুঁশে আছেন? আপনি কোথায় আর আমি কোথায় ভেবে দেখেছেন? আকাশ-পাতাল তফাৎ আপনার আর আমার মাঝে। ”
“ যদি তাই হয়। তাহলে আমি আকাশ থেকে পাতালে নামতে প্রস্তুত। আই নিড ইউ। আমার ভালো লাগে তোমাকে। বিয়ে করে সংসার করার ইচ্ছে আছে আমার। ”
“ দেখুন মজা ক…”
“ অ্যাম সিরিয়াস ঊর্মি। মজা করার বয়স অনেক আগেই পাড় করে এসেছি। আমি তোমায় বিয়ে করতে চাইলে তোমার আপত্তি কেনো এতে? ”
“ আমাদের বয়স দেখছেন? স্ট্যাটাস দেখছেন? আমার ভাই দিবে না আপনার কাছে আমাকে। ”
“ কেনো দিবে না? অবশ্যই দিবে। ”
“ চেয়ে দেখেন,যদি দেয় তাহলে আমি রাজি। ”
“ ওকে। খুব শীগ্রই তোমার ভাইয়ের কাছে তোমাকে চাইবো। আশা করি ইমন আমায় ফিরিয়ে দিবে না। ”
“ ফিরিয়ে দেওয়ার চান্স টাই বেশি। ”
ইব্রাহিম রুমাইসা কে ভিলার সামনে থেকে নিয়ে সন্ধ্যার আগ দিয়ে ঢাকা চলে আসলো। ইমন বোনকে নিয়ে ইব্রাহিমের বাগান বাড়িতেই রাখলো। রুম ৪ টা থাকায়,আরামসে ঊর্মি একটায় থাকলো। আর রুমাইসা নিবাসে চলে গেলো।
১৭ই মার্চ সকাল সকাল বউ আর বোন কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো এজওয়ান বাশার সুলতান কে একা নিবাসে রেখে। বাশার সুলতান মুখ গোমড়া করে বসে ছিলো। এমন পেটের শত্রু থাকলে আর বাহিরের শত্রুর দরকার হয় না। কিভাবে বাপ কে ফেলে রেখে বউ বোন নিয়ে চলে যাচ্ছে । আবার যাওয়ার সময় বলেও যাচ্ছে –
“ ফিরে এসেই তোমাকে বিয়ে দিব। সো নো মন খারাপ। ”
দুইটা প্রাইভেট কারে করে রওনা দেওয়া হলো। এজওয়ানের গাড়িতে এজওয়ান, মাহি,রুমাইসা,বাহাদুর বসেছে। আর ইব্রাহিমের গাড়িতে ঊর্মি,ইমন,ইব্রাহিম আর ইয়াসিন।
শাহবাগ থেকে তারা সকাল ছয়টায় যাত্রা শুরু করল। প্রথমে শাহবাগ থেকে মহাখালী মোড় অতিক্রম করে মিরপুর-সায়েদাবাদ রোড ধরে উত্তরে টঙ্গীর দিকে এগোল। টঙ্গী অতিক্রম করে তারা কাজীপুর হয়ে পদ্মাসেতু অতিক্রম করার পর তারা মাওয়া হয়ে গোপালগঞ্জ শহরের দিকে নেমে এল। শহর অতিক্রম করার পর মাঝপথে দুপুর দুইটার দিকে তারা গোপালগঞ্জের ভোজন বিলাস রেস্টুরেন্টে থেমে লাঞ্চ করল। খাবারের পর আবার গাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করল।
খুলনা জাতীয় সড়ক ধরে খুলনা শহরের দিকে চলে গেল। খুলনা শহর অতিক্রম করে তারা মংলা বন্দর রোড ধরে কচিখালী ঘাটে পৌঁছাল। ঘাটে গাড়ি রেখে নৌকায় উঠে তারা বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্টে এসে উঠলো।
এই রিসোর্টেই উঠবে বলেছে রুমাইসা। এজওয়ান অন্যটায় উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু রুমাইসা বলেছে সে এটাতেই উঠবে। তূর্ণ কে রুমাইসা জিজ্ঞেস করেছিল কোন রিসোর্টে উঠবেন আপনি? তূর্ণ বলেছো বনবিবি তে উঠবে সে।
বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্টে এজওয়ান চারটা কাপল রুম নিলো। একটায় মাহি আর এজওয়ান, আটেক টায় ইব্রাহিম, ইমন,আর বাকি দুইটায় রুমাইসা ঊর্মি আর ইয়াসিন বাহাদুর।
রিসোর্ট টা জাস্ট ওয়াও আর ওয়াও। তারা আজকে আর বের হবে না। খাওয়া দাওয়া করে রিসোর্টেই থাকবে। আগামীকাল বের হবে ঘুরতে। সন্ধ্যা হতেই তারা হাল্কা পাতলা নাস্তা খেয়ে রিসোর্ট টা ঘুরতে লাগলো। হাল্কা শীত থাকায় তারা কাঠ জ্বালালো। তারা সকলে জ্বলন্ত কাঠের চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। এমন সময় ইব্রাহিমের ফোন আসলো। সোলেমান ফোন করেছে। ইব্রাহিম ফোনটা রিসিভ করে জিজ্ঞেস করলো-
“ বল। ”
সোলেমান লিভিং রুমে রেডি হয়ে মেহরিনের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু বাশার সুলতান ফোন দিয়ে আক্ষেপের সহিত মন খারাপ নিয়ে বলল- তার ছেলে ছেলের বউরা তাকে রেখে চলে গেলো কি করে?
“ চাচা কে একা রেখে ঘুরতে গেছিস শুনলাম? ”
“ হুমম। ”
“ ব্যাটা যে হার্টফেল করতেছে। আমাকে ফোন দিয়ে বলতেছে। ”
“ বিয়ে দিয়ে দে তোর চাচাকে। ”
“ তোর কোনো খালা থাকলে এনে দে,বিয়ে পড়িয়ে দেই শালা। ”
“ আফসোস কেউ নেই। তা তোর খবর কি? বউ নিয়ে তো সেই আরামে আছিস। ”
“ আর আরাম! আরামের জন্য এসেছি আমি? এখন পার্টিতে যাব বউ নিয়ে। ইনভাইট করা হয়েছে। ”
“ সুখবর নিয়ে ফিরিস। ”
“ শালা বউই ছুঁতে পারি নি ঠিকমতো আর তুই পড়ে আছিস সুখবর নিয়ে? বউ এখনও বাচ্চা। এত তাড়াতাড়ি শুনছিস না।”
“ তাহলে আমার পরে নিস বেবি। ”
“ তোর পরে মানে? ”
“ আমার বিয়ের পর। আমাদের বেবির পর নিস। ”
“ আগে বিয়ে কর মিসকিন,তারপর বলিস। বউ নাই সে আবার বাচ্চা অব্দি চলে গেছে। রাখছি এখন। তাড়াতাড়ি ঘুরে বাড়ি যা। বুড়ো তা না হলে আমায় জ্বালিয়ে মা’রবে। ”
সোলেমান কেটে দিলো ফোন। সিঁড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো মেহরিন কে। হাল্কা পিংক কালারের লং সিফনের গ্রাউন ফুল হাতার। হাতে লেডিস ব্যাগ। মাথায় সুন্দর করে সেম কালারের হিজাব বাঁধা আর মুখের উপর সেম কালারের নিকাব।
সোলেমান এগিয়ে গেলো। হাত বাড়িয়ে দিতেই মেহরিন হাতটা ধরে ফেললো। উঁচা জুতা পড়তে হয়েছে মেহরিন কে। কিন্তু মেহরিন কম্ফোর্ট ফিল করছে না হাই হিলে। সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে গাড়ির কাছে আসলো। গার্ড দরজা খুলে দিতেই তারা উঠে বসলো। ড্রাইভার রিয়ম গাড়ি চালাচ্ছে। এংগাডিন ভ্যালি থেকে তারা জেনেভার Cercle de la Terrasse ক্লাবে চলে আসলো। মেহরিন কে নিয়ে ভিতরে ঢুকতেই মেহরিন দেখতে পেলো অনেক মহিলা ও পুরুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ড্রিংকস খাচ্ছে কথা বলছে। পোষাক চোখে লাগার মতন। স্লিভলেস হাতার লং পোশাক, তারা আবার উরুর সাইড থেকে আড়াআড়ি ভাবে কাটা। জামার গলা ইয়া বড় বুকের অনেকাংশই উন্মুক্ত। পিঠ পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। এদের কাছে এসব নর্মাল পোশাক। পুরুষ গুলো কেমন কথা বলার সময় শরীরের দিকে বাজেভাবে তাকাচ্ছে।
দু’জন লোক এসে সোলেমান কে অভ্যর্থনা জানালো।
মেহরিন চোখ সরিয়ে সোলেমানের দিকে তাকালো। সোলেমান দৃষ্টি সামনের দিকে ঐ দুজন লোকের দিকে স্থির, আশেপাশে তাকাচ্ছেই না। ফুলের তোড়া তার গার্ডরা নিয়ে নিলো।
মেহরিনের হাত টা সবসময় ধরে রাখে সোলেমান। এক সেকেন্ডের জন্যও ছাড়ে না। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে উপরে চলে গেলো। উপরে সোলেমানের ম্যানেজার লুকা অপেক্ষা করছিলো করিডরে।
সোলেমান কে দেখামাত্রই সালাম দিয়ে চোখ গেলো সোলেমানের পাশে থাকা মেহরিনের উপর। সাথে সাথে চোখ সরিয়ে মাথা নত করে ফেললো লুকা। সামনে থেকে সরে গিয়ে বলল-
“ সব ব্যবস্থা করা আছে। ম্যাম কে নিয়ে ঐ কক্ষে যেতে পারেন। কেউ আসবে না। ”
সোলেমান কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলো। মেহরিন কে এখানে পাঁচ মিনিটের জন্য রেখে সে নিচে গিয়ে পার্টি টা অ্যাটেন্ড করে চলে আসবে। মেহরিন ওখানে থাকলে অস্বস্তিতে পড়বে। সোলেমান কক্ষের ভিতরে ঢুকে দেখলো লুকার বউ অ্যালিজা বসে আছে। সোলেমান মেহরিন কে অ্যালিজার কাছে বসিয়ে বলল-
“ খেয়াল রেখো ওর। আমি পাঁচ মিনিটের ভেতর ফিরে আসবো। ”
অ্যালিজা মাথা নেড়ে আচ্ছা জানালো। সোলেমান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ জাস্ট ফাইভ মিনিটস জান। পাঁচ মিনিট পর আমি চলে আসবো। ততক্ষণ অ্যালিজার সাথে থাকো। ”
সোলেমান চলে যেতেই অ্যালিজা মেহরিন কে দেখতে লাগলো। ফেস দেখা যাচ্ছে না। মেহরিন কে জিজ্ঞেস করলো-
“ নাম কি তোমার? ”
মেহরিন গুটিশুটি হয়ে বলল-
“ জ্বি মেহরিন তাবাসসুম। ”
“ নাইস নেইম। নেকাব টা সরানো যাবে মুখের সামনে থেকে? আমি আর তুমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। ”
মেহরিন আশেপাশে তাকিয়ে নিকাব উপরের দিকে উঠিয়ে বলল-
“ শিওর। ”
অ্যালিজা দেখলো মেহরিন কে। একদম হুর পরীর মতন দেখতে মেয়েটা। মুখে কোনো প্রসাধনী নেই তারপরও কি স্নিগ্ধ সুন্দর লাগছে। এজন্যই সোলেমান বউ কে সবার সামনে আনে না? ”
“ তুমি ভীষণ সুন্দর দেখতে মেহরিন। ”
মেহরিন প্রতিত্তোরে কিছু বললো না। উল্টো জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনি কে হোন সোলেমান সাহেবের আপু? ”
অ্যালিজা হেঁসে বলল-
“ বাহিরে একটা টাকলা কে দেখেছো? তার একমাত্র বউ আমি। ”
মেহরিন হেঁসে ফেললো। কিভাবে স্বামী কে টাকলা বলছে তার সামনে।
সোলেমান নিচে এসে জ্যাকসনের সাথে কুশলাদি করলো। পার্টির সবাই সোলেমানের দিকে তাকিয়ে আছে। উপরে যাওয়ার সময় তারা সোলেমানের সাথে একটা মেয়েকে দেখেছে। তাও আবার একদম মুখ ঢাকা। কৌতূহলের শেষ নেই। এত বড় বিজনেসম্যান কাকে নিয়ে এসেছে?
সোলেমান পার্টিতে টুকটাক কথা বলে জ্যাকসন কে বললো সে ইনভেস্ট করতে রাজি তার কোম্পানি তে। তবে ৫০% না ৭৫ % শেয়ার তার চাই। যদি রাজি থাকে তাহলে সে টাকা দিবে।
জ্যাকসন রাজি হয়ে গেলো। সোলেমান ছাড়া কেউ নেই যে এত টাকা ইনভেস্ট করবে তার কোম্পানি তে। সোলেমান যে রাজি হয়েছে এটাই অনেক।
সোলেমান উপরে গিয়ে অ্যালিজা কে ধন্যবাদ বলে মেহরিন কে নিয়ে কক্ষ থেকে বের হলো। করিডরে আসতেই মেহরিন বলল-
“ শুনুন না। আমার এই উঁচু হিল পড়ে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। ”
সোলেমান এ কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলো। সে খেয়ালই করে নি যে মেহরিন হাই হিল পড়েছে।
হাঁটু গেঁড়ে বসে জামা উঁচু করে দেখলো যথেষ্ট উঁচু এই জুতা।
“ এত উঁচু জুতা কেনো পড়েছো? নিচু জুতা ছিলো না? ”
মেহরিন আমতা-আমতা করে বলল-
“ ঐ আপুরা বলল যে এটার সাথে এই উঁচু জুতাই মানাবে। আর আমাকে লম্বা দেখাবে আপনার সাথে। সেজন…”
“ সেজন্য এটা পড়বে? যেটায় কম্ফোর্ট ফিল করবে না সেটা কখনও পড়বে না, মানা করে দিলাম। দেখি এখান টায় বসো খুলে দিচ্ছি জুতা টা।
সোলেমান মেহরিন কে পাশেই লম্বা সোফায় বসিয়ে জুতা খুলে দিলো। পা দুটো এখন হাল্কা লাগছে,শান্তি লাগছে। সোলেমান জুতা দুটো বা হাতে নিয়ে মেহরিনের হাত থেকে ব্যাগ টা নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে মেহরিনের হাত ধরে বলল-
“ এখন ভালো লাগছে? ”
মেহরিন হুম বলল। সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে ওভাবেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে জুতা হাতে ঝুলিয়ে মেহরিন কে নিয়ে ঐ পার্টির মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে আসলো। পার্টির সবাই হা হয়ে গেলো। নওয়াজ সোলেমান সুলতানের কাঁধে লেডিস ব্যাগ হাতে ল্যাডিস জুতা!
কানাঘুঁষা শুরু হলো। মেহরিন নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো।
ক্লাব থেকে বেরিয়ে দেখলো আকাশে মেঘ জমেছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশে। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে গাড়িতে বসতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। সোলেমান বিরক্তির চরম পর্যায়ে চলে গেলো। বৃষ্টি টা এখনই শুরু হওয়ার দরকার ছিলো? ভিলায় ফেরার পর হলেও তো পারতো।
মেহরিনের দারুন লাগছে এই বৃষ্টি টাকে। সোলেমান জানালা লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মেহরিন খুলে হাত ভেজাতে লাগলো পানি তে। সোলেমান সেটা দেখে বলল-
“ ভেতরে আনো হাত মেহরিন। ভিজে যাচ্ছ তো। ঠান্ডা লাগবে। ”
মেহরিন শুনলো না সোলেমানের কথা। সে মনের সুখে হাত ভেজাতে ব্যস্ত। রিয়ম না থাকলে সে নিকাব খুলে মুখটা ভেজাতো।
সোলেমান হতাশ হলো। মেহরিন শুনছে না তার কথা। সোলেমান রিয়ম কে বলল-
“ রিয়ম গাড়িতে ছাতা আছে? ”
রিয়ম বলল- “ হ্যাঁ আছে। ”
” ছাতা টা নিয়ে চলে যাও তুমি। আমার বউয়ের সামনে তোমাকে রাখতে চাচ্ছি না আর। ”
রিয়ম গাড়ি থেকে ছাতাটা নিয়ে চলে গেলো। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে সামনে এসে বসলো। রাস্তায় তেমন গাড়ি নেই বললেই চলে। সোলেমান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“ আমার কথা শুনছো না কেনো তুমি মেহরিন? ভিজতে যে না করলাম। ”
মেহরিন মুখের উপর থেকে নিকাব টা সরিয়ে বলল-
“ ভালো লাগছে ভিজতে। চলুন না ভিজি। ”
“ এই না মেহরিন। ঠান্ডা লাগবে। ”
“ লাগলে ঔষধ খেয়ে নিব। চলুন না ভিজি। আমার খুব ইচ্ছে আপনার সাথে আমি বৃষ্টি বিলাস করবো। চলুন না ভিজি। ”
গাড়িটা মালোয়া পাস রাস্তায় আসতেই সোলেমান গাড়ি চালানো থামিয়ে দিলো। এই রাস্তা টা মারাত্মক সুন্দর দুপাশে pine আর fir বন। সাথে আরো আছে হ্রদ, পাহাড়। বৃষ্টি তে বরফ গলতে শুরু করেছে পাহাড়ের। সোলেমান নিজে গাড়ি থেকে বের হয়ে ওপর পাশে গিয়ে দরজা খুলে মেহরিন কেও বের করলো। বৃষ্টির পানিতে তাদের শরীর ভিজতে লাগলো। মেহরিন দু হাত মেলে দিয়ে ভিজতেছে। তার খুব খুব ভালো লাগছে। সোলেমান মেহরিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। মেহরিনের মুখে হাসি দেখে বলল-
“ যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ভিজো। যত ইচ্ছে ভিজো। শুধু শরীর খারাপ হলে খবর আছে। ”
মেহরিন আড়চোখে তাকালো। ভিজতেও বলছে আবার শাসাচ্ছেও!
মেহরিন সোলেমানের বাহু জড়িয়ে ধরলো। কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল-
“ শাসাচ্ছেন কেনো হু? অসুস্থ হলে সেবাযত্ন করবেন বউয়ের। ”
সোলেমান কোমর চেপে মেহরিন কে টেনে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল-
“ আমার যত্ন তুমি নিতে পারবে না ওয়াইফি। তখন বলবে ছেড়ে দে জামাই কেঁদে বাঁচি। ”
মেহরিন হেঁসে ফেললো। সোলেমান সেই হাসি দেখে বলল-
“ একদম এভাবে হাসবা না। বাহিরে আছি। নিজেকে যথেষ্ট কন্ট্রোলে রেখেছি তোমায় এই অবস্থাতেও দেখে। জেন্টেলম্যান হিসাবে আছি সেভাবেই থাকতে দাও। এভাবে হাসলে কিন্তু এখানেই একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলবো বলে রাখলাম। ”
মেহরিন হাসি থামিয়ে ফেললো। বিদেশের মাটিতে এই প্রথম বৃষ্টি বিলাশ তার স্বামীর সাথে। ব্যাপার টা মন্দের নয়।
মেহরিন হাঁটতে হাঁটতে এবার সামনে এগিয়ে গেলো। সোলেমান বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেহরিনের বৃষ্টি বিলাস দেখতে লাগলো। কেমন দু হাত মিলে ঘুরছে চোখ বুঁজে। মেয়েটা ছোট্ট ছোট্ট জিনিসে খুব খুশি হয়। এই মেয়েটা জীবনে না আসলে সোলেমানের জীবন টা আসলেই পানসে থেকে যেত। খুব খুব সুখ দিবে মেহরিন কে সোলেমান। এই মেয়েটাকে কখনও নিজের কাছ থেকে হারাতে দিবে না সোলেমান। তারজন্য যা যা করার দরকার সোলেমান তাই করবে।
আকস্মিক সোলেমান মেহরিন কে ডেকে উঠলো-
“ মেহরিন..”
মেহরিন পেছন ফিরলো। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ হু? ”
সোলেমান দৃষ্টি মেহরিনের দিকে রেখে রাস্তায় বসে হাঁটু দু হাতের মাঝে চেপে বলল-
“ মেরি হোকে হামেশা হি রেহনা। কাভি না কেহনা আলবিদা…”
মেহরিন এগিয়ে আসলো। সোলেমানের সামনা-সামনি বসে দু হাত দিয়ে সোলেমানের মুখ জড়িয়ে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল-
“ ইনশাআল্লাহ জনাব। ”
সোলেমান মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে সেখানে আধঘন্টার ও বেশি সময় ধরে ভিজলো। এরপর আর মেহরিম থাকতে পারে নি শীতে। শরীর তার বরফের মতন জমে যাচ্ছিলো। হাত পা কাঁপছিলো। সোলেমান ধরে নিয়ে এসেছে গাড়িতে। সারাটা রাস্তা মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল সোলেমান। ভিলায় এসে মেহরিন কে তাড়াতাড়ি ড্রেস চেঞ্জ করে নিতে বলল। মেহরিনের ড্রেস চেঞ্জ করাটা এখন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর, ঝামেলার কঠিন কাজ মনে হচ্ছে। এলোমেলো পায়ে কাঁপতে কাঁপতে ড্রেস চেঞ্জ করে কামিজ পড়ে নিলো। বোকা মেহরিন ওয়াশরুমের দরজাটা ভালোমতো লাগিয়েছিলো না। দরজাটা কিঞ্চিৎ ফাঁকা ছিলো। সোলেমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট খুলতে গিয়ে কিছু-মিছু দেখে ফেলছে। আর দেখেই শরীর রক্ত জমে গেছে। গলা শুকিয়ে গেছে। বারবার হাত দিয়ে মুখ মুছতেছে ঢোক গিলতেছে।
মেহরিন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। শরীরে ওড়না নেই। যদিও মেহরিন সবসময় ঢোলাঢালা জামাকাপড় পরিধান করে। শরীরের ভাজ বোঝা সম্ভব নয়। তবুও সোলেমান বোঝার বৃথা চেষ্টা করছে। মেহরিন টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বিছানায় বসে বলল-
“ জ্বরের মেডিসিন থাকলে দিন তো। ”
সোলেমান এগিয়ে আসলো খালি গায়ে। বেড টেবিল থেকে মেডিসিন বের করে মেহরিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। মেহরিন মেডিসিন টা মুখে নিয়ে কেবলই পানি টা খেতে যাচ্ছিলো কিন্তু চোখটা হুট করে সোলেমানের উন্মুক্ত শরীরে পড়তেই সব পানি মুখ থেকে ছিটকে সোলেমান বুকে মুখে গিয়ে পড়লো।
সোলেমান হতবিহ্বল হয়ে গেলো আকস্মিক এভাবে পানি ছিটে আসায়। মেহরিন ভয়ে জমে গেলো। এই বুঝি লোকটা রাগে ধমক দিয়ে বকবে।
মেহরিনের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সোলেমান আসলেই শুধু বকতো না আরো কিছু করতো। কিন্তু বউ তো। বউয়ের সামনে সিংহও বিড়াল হয়ে যায় আর সেখানে সোলেমান তো ভেজা বিড়াল হয়ে যাবে।
সোলেমান টাওয়াল দিয়ে শরীর মুখ মুছে ফের মেডিসিন আর পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। মেহরিন মেডিসিন নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল-
“ প্লিজ কিছু পড়ে আসুন। আমার অস্বস্তি হচ্ছে এভাবে আপনায় খালি গায়ে দেখে। ”
সোলেমান মেহরিনের গালের সাথে নিজের গাল ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল-
“ আমার তো বেশ লাগে তোমাকে ওভাবে দেখতে। ”
মেহরিনের কান গরম হয়ে আসলো। সোলেমান একটা টিশার্ট পড়ে আসলো। ডিনার আর করবে না তারা। সোলেমান রুমের লাইট নিভিয়ে দিলো। মেহরিন বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই হুট করে সোলেমান কে তার উপরে আসতে দেখে চমকে উঠলো। মেহরিন কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ এ..এভাবে উপরে উঠে আসলেন কেনো? ”
সোলেমান মেহরিনের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে চুমু খেয়ে বলল-
“ বিয়ের ৯ মাসে আমরা কাছে এসেছি মাত্র একবার। তাও আবার সেটা ছিলো ক্ষণিকের জন্য। যেটা নিয়মিত হবার কথা, সেটা আমাদের মাঝে হচ্ছে না। ভীষণ রকমের অনিয়মিত আমরা। আমাদের উচিত নিয়মিত হওয়া মেহরিন। তাহলে আমাদের মন শরীর দুটোই ভালো থাকবে। ”
কথাগুলো বলে সোলেমান আরো চেপে আসলো। সোলেমানের পেশিবহুল দেহের নিচে চাপা পড়ে যেত লাগলো মেহরিনের ছোট্ট শরীর টা। সোলেমানের এক একটা চুমু মেহরিনের শরীরে ঝড় তুলতে সক্ষম।
আজ মিয়াচি নেই তাই সোলেমান কে লজ্জা দেওয়ার মতনও কেউ নেই।
মেহরিন চেপে ধরলো সোলেমানের পিঠ। ছোঁয়া গুলো কি মারাত্মক। মেহরিন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। সোলেমান আসতে আসতে মেহরিনের একেবারে কাছে চলে আসলো। যতটা কাছে আসলে দু’জন মানুষের মাঝে আর কোনো দূরত্ব থাকে না।
মেহরিনের ছোট্ট শরীর টা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে ব্যাথায়। তবে শব্দ করছে না। গতবার অজ্ঞান হয়ে গিয়ে সোলেমান কে খুব বিপাকে ফেলেছিল আজ চাইছে না আর বাঁধা দিতে।
সোলেমান মাঝেমধ্যে মেহরিনের কুঁচকে ফেলা মুখ দেখে কানের লতিতে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে –
“ কষ্ট হচ্ছে জান? ”
মেহরিন হা না কিছুই বলছে না। শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে সোলেমান কে। অসংখ্য আঁচড় পড়েছে সোলেমানের পিঠে মেহরিনের। সোলেমান বেশি ওয়াইল্ড হতে চাচ্ছে না। কিন্তু না হয়েও পারছে না। মেহরিন শুধু দাঁত চেপে সহ্য করে গেছে।
রাতের শেষ প্রহরে এসে সোলেমান মেহরিনের থেকে সরে আসলো। সরে এসে মেহরিনের গায়ে চাদর টেনে দিতেই মেহরিন এবার কেঁদে ফেললো।
সোলেমান ভরকে গেলো। কাঁদছে কেনো মেয়েটা? এতক্ষণ তো কাঁদলো না। সরে আসার পর তাহলে কেনো কাঁদছে?
সোলেমান মেহরিন কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল-
“ এ্যই কাঁদছো কেনো? কি হয়েছে? ”
মেহরিন সোলেমানের উন্মুক্ত বুকে মুখ গুঁজে কিল মে’রে বলল-
“ ব্যথা কেনো দিলেন আমায়? বর্বর অসভ্য লোক একটা। ”
সোলেমান জাস্ট বোকা বনে চলে গেলো। মানে যখন ব্যথা দিলো তখন কাঁদলো না। এখন সরে আসার পর কেঁদে বিচার দিতেছে!
বেচারা সোলেমান বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“ পেইন কিলার খেলে ব্যথা সেরে যাবে জান। কাঁদে না। ”
মেহরিন ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলল-
“ জ্বলছে। ”
সোলেমান অন্য মনস্ক হয়ে বলল-
“ কি জ্বলছে ? ”
মেহরিন সোলেমানের বুক থেকে মাথা সরিয়ে সোলেমানের মুখের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল-
“ আপনি জানেন না কি জ্বলছে? ”
দাহশয্যা পর্ব ৫৭
সোলেমান সাথে সাথে বুঝলো না। ৫ সেকেন্ড পার হতেই বুঝতে পেরে মেহরিনের মাথাটা আবার বুকের সাথে চেপে ধরে সরু চোখে বলল-
-“ প্লিজ, রাত টা সহ্য করে নাও জান। সকালেই ডক্টর নিয়ে আসবো, জ্বালা ব্যথা সব কমে যাবে…
