Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (৩)
Raiha Zubair Ripti

প্রচণ্ড ঘৃণা আর অসহায় ক্ষোভ নিয়ে জানালার পাশে মেঝেতে এলোমেলোভাবে বসে আছে মেহরিন। চোখ দুটো রক্তিম, অথচ কান্না যেন আর বেরোতে চাইছে না। কিছু কিছু কষ্ট আছে, যা চোখের জল হয়ে ঝরে না নীরবে বুকের ভেতর জমাট বেঁধে থাকে। একটুও দেখা করতে দিলো না তার বাপটার সাথে তাকে! ওরা কি জানে না এই কুৎসিত নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মেহরিন কে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসার জন্য নিজের সুখ, স্বপ্ন, আর জীবন পর্যন্ত মেয়ের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার জন্য, চোখ বন্ধ করে মেহরিনের সমস্ত দুঃখ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য, তার এক জীবন বয়ে নেওয়ার জন্য বাপ মোতালেব ভুঁইয়া ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু না! ওদের মতো তো তার বাপ টা ক্ষমতাধর না। তাই একজন অসহায় বাবার ভালোবাসা ক্ষমতার দেয়ালের কাছে হেরে গেল। মেয়ের জন্য ছুটে আসা মানুষটা শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরে গেল। একবারও মেয়ের মুখটা দেখতে পারল না। মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহময় বৃক্ষছায়ার মতো বলতে পারলো না,

” আম্মা চিন্তা কইরো না। আব্বা আছি না? সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার আম্মা ডাক্তার হবেই। আব্বা থাকতে চিন্তা কিসের এতো মা আমার? ”
ভাবতেই মেহরিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তার সমস্ত ঘৃণা গিয়ে জমল এক মানুষের ওপর। নওয়াজ সোলেমান সুলতান। লোকটার প্রতি তার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। কীভাবে এতটা নির্মম হতে পারে? একজন মেয়েকে তার বাবার কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে রাখতে পারে? লোকটার মধ্যে অনুতপ্তের ছিটেফোঁটাও নেই। মেহরিনের দায় কিসের এক পাপীর সাথে ঘর করার? সোলেমান কী কারণে পাপ করে, কার জন্য করে, কিংবা কোন যুক্তিতে করে সেসবের একটাও মেহরিনের জানার দরকার নেই। তার কাছে একটাই সত্য। অন্যায়ের কোনো অজুহাত হয় না। সোলেমান একজন পাপী। আর একজন পাপীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বেঁচে থাকা যায় না। আর মেহরিন কোনো পাপীর পাপের বোঝা বইতে সে জন্মায়নি।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। মেহরিন মাথাও ঘোরাল না। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে ভেতরে ঢুকল সোলেমান। সাদা শার্টের হাতা গোটানো। মুখে দিনের ক্লান্তি স্পষ্ট। তবু চোখে সেই স্বাভাবিক স্থিরতা। সে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মেহরিন একবারও তার দিকে তাকাল না। সোলেমান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বলল,

“সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিছু খেয়েছ?”
কোনো উত্তর নেই। সোলেমান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবার বলল,
“সকাল থেকেও কিছু খাওনি। এভাবে না খেয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
এবার মেহরিন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। চোখ দুটো জ্বলছে।
” তাতে আপনার কি? যে মানুষ একটা মেয়েকে তার বাবার সঙ্গে পাঁচ মিনিট দেখা করতে দেয় না, তার মুখে চিন্তার কথা মানায় না।”
সোলেমান চুপ করে রইল।
“জানেন আজ আমার সবচেয়ে বেশি কী করতে ইচ্ছে করছে?”
“কী?”
“আপনাকে ঘৃণা করতে।” একটু থেমে আবার বলল, “না… সেটা তো অনেক আগে থেকেই করি। আজ ইচ্ছে করছে আপনাকে মেরে ফেলতে।”
কথাগুলো শুনেও সোলেমানের মুখের ভাব বদলাল না। সে ধীরে বলল,
“তোমার আব্বা ভালো আছেন। দুদিন পরই তোমার রেজাল্টের দিন দেখা করিয়ে নিয়ে আসবো কথা দিচ্ছি। ”
মেহরিন চিৎকার করে উঠল।

“চুপ! একদম চুপ। আমার বাবার নাম আপনার মুখে নেবেন না।”
” আচ্ছা নিব না। এবার কিছু খেয়ে নাও। ”
” খাব না। কিচ্ছু খাব না আমি। একদিন আল্লাহ ঠিকই আপনার এই ক্ষমতা কেড়ে নেবেন। সেদিন বুঝবেন অসহায় মানুষের কষ্ট কাকে বলে।”
সোলেমান স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর শুধু বলল,
“হয়তো। কারন ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব এগুলোর কোনোটাই স্থায়ী নয়। এটা আমি তোমার চেয়ে ভালো জানি।”
“তাহলে ব্যবহার করেন কেন?”
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর প্যান্টের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে জানালার দিকে তাকাল। ঠান্ডা, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“কারণ পৃথিবীটা নীতিকথায় চলে না, মেহরিন। ক্ষমতায় চলে।”
মেহরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

“তাহলে আপনি স্বীকার করছেন, আপনি অন্যায় করেছেন?”
সোলেমান মুচকি হাসল।
“অন্যায়? ন্যায়? এসব শব্দ অভিধানে সুন্দর লাগে। বাস্তবতায় এগুলোর দাম খুব কম। ”
“তাই বলে মানুষের জীবন নিয়ে খেলবেন? অন্যের জীবন নিয়ে খেলার অনুমতি কে দিয়েছে আপনাকে?”
সোলেমান এবার তার চোখে চোখ রেখে বলল,
“যেদিন বুঝলাম, ক্ষমতাহীন মানুষের ন্যায়বিচার শুধু গল্পের বইয়ে থাকে মূলত সেদিন থেকেই কারও অনুমতির প্রয়োজন পড়েনি।”
মেহরিন ক্ষোভে কাঁপতে লাগল।
“আপনি নিজেকে কি ভাবেন?”
” তেমন কিছুই ভাবি না।”
” আল্লাহর ভয়ডর বলতে কি কিছুই নেই? পরকালে কি জবাব দিবেন? ”
“আল্লাহর ভয় আছে বলেই অনেক কিছু করি না।”
“আর যা করেন?”
” যখন যেটার প্রয়োজন তখন সেটাই করি।”
“প্রয়োজনের নামে অন্যায় করেন।”
“অন্যায়? এই পৃথিবীতে ন্যায় অন্যায় বলতে কিছু নেই। তবে একটা কথা বুঝি না।”
“কী?”

“তোমার খোদা তো বলেছেন পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। তাহলে তুমি কেন তাঁর কথাই অমান্য করছ? পাপের সঙ্গে সঙ্গে পাপীকেও ঘৃণা করছ কেন?”
তারপর মেহরিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল,
“খোদা এটাও বলেছেন, জালিমের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ। আমি সেটাই করছি।”
সোলেমানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“ভয় পাও না এই জালিম কে?”
“আল্লাহকে ভয় করা মানুষ, মানুষের ক্ষমতাকে ভয় পায় না।”
“কথা সুন্দর বলতে শিখেছ।”
“সত্য কথা বলতে শিখেছি।”
সোলেমান ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“সত্য… খুব বিপজ্জনক জিনিস। বিশেষ করে যখন সেটা প্রিয়তমার মুখ থেকে ঝড়ে।”
” আপনার মতো মানুষের শেষটা খুব ভয়ংকর হবে দেখে নিবেন। ”
সোলেমানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।

“শেষের ভয় আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি, মেহরিন। তবে এখন শুধু একটা ভয় আছে আর সেটা হলো আমার কাছের মানুষদের দিকে কেউ হাত বাড়ালে আমি তার হাত পা চোখ সহ পুরা জান টাই দেহ থেকে টেনে বের করে আলাদা করে ছাড়বো। তাই বলছি লক্ষীটি রাগ করে থেকো। ঘৃণাও করো। কিন্তু না খেয়ে থেকো না। তোমার শরীর খারাপ হলে কষ্টটা আমারই হবে। খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি খেয়ে নিও। আমার হাতে তো খাবে না নিশ্চিত। তাই জোর করবো না এই বিষয়ে। ”
“আমি কোনোদিনও আপনার কাছের মানুষ হব না, নওয়াজ সোলেমান সুলতান। আপনার এই ঔদ্ধত্য ভাব যতদিন না বদলাবে। যতদিন না আপনি সম্পূর্ণ রূপে বদলে একজন সাধারণ মানুষ হবেন। কোনো পাপ কলঙ্ক শরীরে থাকবে না। আপনার মনে অনুতপ্ত জাগবে না। অনুতপ্তের আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হবেন না। ততদিন আমি আপনাকে কেবল ঘৃণাই করবো। ”

” তাহলে দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে, প্রিয়তমা তোমার চোখের ঘৃণা নিয়েই আমার মরণ হবে। ”
” মৃত্যুকেও ভয় পান না আপনি সোলেমান? মরণের ওপারেও একটা জীবন আছে। ভুলে যাবেন না। ”
” মৃত্যু কে ভয় পেলে কি আর মানুষ খারাপ কাজ করতো মেহরিন? তবে সব খারাপেরই একটা সমাপ্তি থাকি। তাদের কর্ম ফল অনুযায়ী তারা শাস্তি পায়। আমিও পাবো। ঠিক কবে,কিভাবে,কখন,কতটা পরিমাণ পাবো জানি না। তবে নিশ্চিত থাকো একদিন পাবো। ”
” আমি চাই আপনি আপনার পাপের শাস্তি পান। আর সেটা দুনিয়াতেই পান। ”
” তোমার মনে আশা পূরণ হোক তবে। আমিন। তবে একটা আফসোস থাকবে আমার মেহরিন। লোকে বলে আমি নাকি অনেক সুখী একটা মানুষ। আমার নাকি কোনো দুঃখ নাই। অথচ আমি জানি আমি কেমন। এই যে এই দুনিয়াতে তোমাকে আমি মন ভরে ভালোবাসতে পারলাম না । পরকালেও তোমার সাথে আমার দেখা হবে না। এই যন্ত্রণা এই কষ্ট মাঝেমধ্যে আমার বুক চিঁড়ে ফেলে। তুমি তো পবিত্রতার মেঘফুল। আর আমি? জাহান্নামের ছাই গিলে বাঁচা এক অভাগা রূহ! তোমার আমার ইহকালের মতো পরকালের দূরত্বও বিশাল হবে। ”

” আমি চাই এই দূরত্ব আজন্ম থাকুক তবে। ”
” থাকুক তবে। তোমার সব চাওয়া ইচ্ছে আমার জীবনে ফরজ হয়ে নেমে আসুক। আমি সাদরে তাদের আলিঙ্গন করবো। ”
মেহরিনের সমস্ত শরীর ঘৃণায় শিউরে উঠল। একজন মানুষ কতটা অধঃপতনের অতলে ডুবে গেলে নিজের জন্য মুক্তি বা ফিরে আসার পথও আর খোঁজে না? পাপের অন্ধকারে কতটা তলিয়ে গেলে মানুষ অনুতাপের ভাষাটুকুও ভুলে যায়? তার জলজ্যান্ত উদাহরণ নওয়াজ সোলেমান সুলতান। তার কথার কোথাও ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা নেই, অনুতাপ নেই, ভালো হয়ে ওঠার ইচ্ছেও নেই। ছিঃ!
সোলেমান রুম থেকে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বাশার সুলতান আসলেন মেহরিনের সাথে দেখা করতে। এত মাস পর বাড়ির বউ বাড়ি ফিরেছে দেখা করাটা আবশ্যক। হাসিখুশি মুখ নিয়ে দেখা করতে ঢুকলেও সেই হাসি মুখে থাকতে দিলো না মেহরিন। বাশার সুলতান কে দেখা মাত্রই তার রাগ হুরহুর করে বেড়ে গেলো। বুড়ো খাটাশ একটা লোক। আজকের নওয়াজ সোলেমান সুলতান হওয়া পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী এই লোক। অমানুষের মতো গড়ে তুলেছে সোলেমান কে। নিজের ছেলেকে সুন্দর জীবন উপহার দিয়ে সোলেমান কে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে। এমন চাচা কারো না হোক।
বাশার সুলতান মৃদু হেসে বললেন,

“কেমন আছো মা?”
” খবরদার আমাকে ওই নামে ডাকবেন না।”
বাশার সুলতানের হাসিটা খানিকটা ম্লান হলো।
“রাগ করেছো, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু..”
“কিন্তু কী?” মেহরিন উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটো রক্তিম। আবার বলল, “আপনারা কি অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত হন না? আপনাদের অস্কার দেওয়া উচিত অভিনয়ের জন্য। কি দারুন অভিনয় করেন আপনারা। দারুন,ফাস্টক্লাস। তবে ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন বাশার সুলতান আপনাদের এই ভালো মানুষের মুখোশ খুবই শীগ্রই আমি টেনে জনসম্মুখে উন্মোচন করবো। কথা দিচ্ছি। আর আমি মেহরিন তাবাসসুম কথা দিলে কথা রেখেই ছাড়ি। আপনাকে যদি আমি শাহবাগ চত্বরে এনে দাঁড় না করিয়েছি। আপনার ক্ষমতা আপনার থেকে কেঁড়ে নিয়ে আপনাকে ভঙ্গুর না করেছি তাহলে আমিও মেহরিন তাবাসসুম না। আপনাদের পতনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। ”

বাশার সুলতানের কপালের রগ ফুলে উঠলো।
” বড্ড বেশি কথা বলছো না তুমি মেহরিন? ভালো মুখে কথা বলছি সেটা ভালো লাগছে না বুঝি? তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করলে এই রুম থেকে এক পাও বাহিরে রাখতে পারবে না। বন্দি করে রাখা হবে। ”
এ কথা শুনে মেহরিন শব্দ করে হেঁসে উঠলো।
” তা আমাকে এভাবে কতদিন আঁটকে রাখবেন এই চার দেওয়ালের মাঝে? পাখিকে আজীবন খাঁচায় আঁটকে পোষ মানানো যায় না। একদিন না একদিন সে খাঁচার বাহিরে বের হয়। সূত্র অনুযায়ী আমিও হব বের। আর সেটাও নওয়াজ সোলেমান সুলতানেরই হাত ধরে তখন কি করবেন? জানেন তো আপনার ভাইস্তা মেহরিন তাবাসসুম বলতে পাগল?”
বাশার সুলতানও হেঁসে ফেললো এবার।
” তাহলে পরীক্ষা করে দেখা যাক? সোলেমান আমার কথায় ওঠবস করে নাকি তোমাকে আমার বিরুদ্ধে গিয়ে বের করে রুম থেকে। তোমাকে মেয়ের মতই স্নেহ করতাম। কিন্তু তুমি তা আর করতে দিলে কই। আমার রিজিকে হাত মেরে দিতে চাইছো। আমার রিজিকে কেউ হাত দিলে সেটা আবার আমার সহ্য হয় না। অনেক পুরোনো অভ্যাস তো। তুমিও রেহাই পেলে না মা..ওপস সরি মেহরিন। ”
“আপনি এখন যেতে পারেন। আপনাকে আর এক মুহূর্তও এই ঘরে দেখতে চাই না।”
” ওকে। কাউন্টডাউন কিন্তু শুরু হয়ে গেছে মেহরিন। আমার সাথে লড়াইতে নামার ফল পেতে চলছো। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। ”

তানভীরদের বাড়িতে ফিরে মোতালেব ভুঁইয়া চুপচাপ রুমের এক কোণে পুরোনো কাঠের চেয়ারটায় বসে আছেন। মাথাটা নিচু। চোখ দুটো শূন্য। চারপাশে কে কী বলছে, কে সান্ত্বনা দিচ্ছে কিছুই যেন তাঁর কানে পৌঁছাচ্ছে না। সকালে সেই যে পাউরুটি আর কলা খেয়ে বের হয়েছিল তারপর থেকে মানুষটা এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলেননি।
তানভীর কয়েকবার এসে বলেছিল,
” খালু একটু ভাত খেয়ে নাও।”
তিনি শুধু মাথা নেড়ে না বলে দিয়েছেন। খাবার কি আর গলায় নামে? সে কীভাবে শান্তিতে ভাত খাবে? তার মেয়েটা কি কিছু খেয়েছে? হঠাৎ তিনি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলেন। সন্ধ্যার দিকেও একবার গিয়েছিলেন সুলতান নিবাসের সামনে। এই আশায় যদি মেয়েটাকে এক ঝলক দেখতে পায়। কিন্তু পারে নি। এত অসহায় লাগলো নিজেকে! তার বাবা মন মেয়েকে সামনে থেকে না দেখতে পেলে হয়তো এই অস্থিরতা কমবে না। কাল আবার যাবে। সোলেমানের হাতে পায়ে ধরে বলবে যেন মেয়েটাকে একটু দেখতে দেয়। এরিমধ্যে খবর পেলো ইমন আহত হয়ে হসপিটালে ভর্তি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছাত্রশিবিরের একাধিক সাংগঠনিক বৈঠকের খোঁজ পায় পুলিশ। সেই তথ্য অনুযায়ী শহরের উপকণ্ঠে একটি গোপন বৈঠকে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। যে যেদিকে পারে পালানোর চেষ্টা করে। ইমনও সবার নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু পালানোর সময় পুলিশের ধাওয়ায় ভাঙা দেয়াল টপকাতে গিয়ে তার বাম হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে হাঁটু ফেটে যায়। তবু ধরা না পড়ে কোনোভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে বেশিক্ষণ নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি সে। নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তার সঙ্গীরা দ্রুত তাকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। হসপিটালে আজ ডক্টরের সংকট থাকায় ডক্টর আঁখি কেবিনে এসে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার সময় হুট করে ইমন কে দেখে থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলেন। এই লোকটাকে সে চিনে। সেদিন বোন কে নিয়ে এসেছিল। আখি ইমনের ক্ষত স্থানে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে আর অতিরিক্ত কাটা জায়গা সেলাই করে দেয়।
মোতালেব ভুঁইয়া ছুটে আসলেন। কেবিনে ঢুকেই অস্থির গলায় বললেন,
” এখন কেমন আছো বাবা? অনেক জায়গা কেটে গেছে দেখছি। ”
” আমি ঠিক আছি চাচা। ”
বেশ অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললো। মূলত আওয়ামী লীগের সরকারি পাঠিয়েছিল পুলিশ। কথা বলার এক পর্যায়ে মেহরিনের কথা উঠলে ইমন বলল,

” চাচা আপনি বাড়ি ফিরে যান। সুলতানরা এক কথার মানুষ। যখন বলেছে দেখা করতে দিবে না। তারমানে দিবে না। সোলেমান তো বললো এক সপ্তাহ পর নিয়ে যাবে দেখা করাতে। হয়তো সত্যি নিয়ে যাবে। আমি ঊর্মির মাধ্যমে খোঁজ খবর নিয়ে আপনাকে জানাবো। গ্রামে ডাকাতের উৎপাত বেরেছে খুব। চাচি একা আছে। সেরিন তো শ্বশুর বাড়ি। আপনি বাড়ি ফিরে যান নিশ্চিন্তে। মেহরিনের ক্ষতি সোলেমান করবে না এটা জানি। ”
মোতালেব ভুঁইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাজি হলেন অবশ্য। তানভীর কে ফোন করে বলে দিলেন সে নওগাঁ চলে যাবে। হসপিটাল থেকে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাবার পথে সোলেমানের ক্লাবঘর টা সামনে পরে। মোতালেব ভুঁইয়া কি মনে করে যেন আগে ক্লাব ঘরে যেতে চাইলেন। এখানে হয়তো সোলেমান বা বাশার সুলতান কেউ আছে। কথা বলবে একটু। মোতালেব ভুঁইয়া এগোলেন। কিন্তু সোলেমান নেই ক্লাব ঘরে। সে একটু সাভার উপজেলায় গিয়েছে। ভেতর থেকে বাশার সুলতানের গলার আওয়াজ পেলেন। এক বুক ভরসা বুকে সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলেন ক্লাব ঘরের দিকে।
মোতালেব ভুঁইয়া চলে যাওয়ার পর পর ইমনও হসপিটাল থেকে বের হলো। আঁখি প্রেসক্রিপশন লিখে ইমন কে দিতে এসে দেখলো লোকটা কেবিনে নেই। করিডরের দিকে তাকাতেই দেখলো লোকটা শার্ট পড়তে পড়তে বেরিয়ে যাচ্ছে। আখি ডাকলো,

” মিস্টার ইমন কোথায় যাচ্ছেন? শুনিয়ে,রুক যাইয়ে। আপ এখনো সুস্থ হন নি। আপকা প্রেসক্রিপশন। ”
ইমন ফিরেও তাকালো না চলে গেলো। আখি তপ্ত শ্বাস ফেললো। ঘটনা শুনে শুরুতেই বুঝেছিল লোকটা রাজনীতির সাথে যুক্ত। আখির আবার রাজনীতি করা ছেলেপেলের প্রতি একটা টান আছে। তার বাবাও পাকিস্তানের একজন এমপি। খুবই সৎ আর নিষ্ঠার সাথে রাজনীতি করে। ইমনের বাসার ঠিকানা রিসিপশন থেকে কালেক্ট করে রাখলো আখি।
বৃষ্টিময় এক রাত। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু বৃষ্টির একঘেয়ে শব্দ আর মাঝেমধ্যে আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাতের গর্জন। নিজের ঘরের এক কোণে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল মেহরিন। বুকের ভেতরটা কেমন অকারণ অস্থিরতায় ভরে আছে। মনে হচ্ছে, কোথাও যেন খুব ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এমন এক অজানা আতঙ্ক বারবার তার বুকের ভেতরটা চেপে ধরছে। কখন যে ক্লান্ত চোখ দুটো ঘুমের কাছে হার মেনে ফেলল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। হঠাৎ বাইরে থেকে তুমুল চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। মেহরিন ছুটে গিয়ে জানালার পর্দা সরাতেই তার বুকটা যেন থেমে গেল।
গেটের সামনে তার বাপ মোতালেব ভুঁইয়া। ভেজা শরীর, এলোমেলো চুল, হাঁপাতে হাঁপাতে দু’হাতে দারোয়ানদের সরিয়ে ভেতরে ঢোকার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। দুজন দারোয়ান সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ঠেকিয়ে রেখেছে। অথচ আজ বৃদ্ধ মানুষটার শরীরে যেন কোথা থেকে এক অদ্ভুত শক্তি এসে ভর করেছে। মনে হচ্ছে তিনি কোনো টগবগে যুবক। তিনি শুধু একটাই নাম ধরে ডাকছেন

“মেহরিন…! ও মেহরিন মা…!”
ডাকটা শুনেই মেহরিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দৌড়ে দরজার কাছে গেল। আশ্চর্য! আজ দরজায় কোনো তালা নেই।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ছুটে নেমে এল বাগানে। ঠিক তখনই দেখতে পেল, মোতালেব ভুঁইয়ার পেছন দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন বাশার সুলতান। সঙ্গে আরও কয়েকজন যুবক। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে দেখেই থমকে দাঁড়ালেন। মুহূর্তেই তাঁর চোখ ভরে উঠল জলে। এ যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি মুছে যাওয়ার দৃশ্য। এটাই তো তাঁর প্রাণ। তাঁর বুকের ধন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তিনি কাঁপতে কাঁপতে দুই হাত বাড়ালেন। একবার মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু ভাগ্য যেন সেই অধিকারটুকুও তাঁকে দিল না।

হঠাৎ পিছন থেকে এক যুবক মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করল তাঁর পিঠে। “আহ…” চিৎকার করে ব্যথায় কুঁজো হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন তিনি।
“আব্বু…!” হৃদয়বিদারক এক চিৎকার দিয়ে তাঁর দিকে দৌড়ে গেল মেহরিন। কিন্তু পৌঁছাতে পারল না। দুজন লোক শক্ত করে তার দুই হাত চেপে ধরল। সে ছটফট করছে, চিৎকার করছে, কাঁদছে…আর ওদিকে একের পর এক লাঠির আঘাত নেমে আসছে তার বৃদ্ধ বাবার শরীরে।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দেহটা প্রতিটি আঘাতে কেঁপে উঠছে। তবুও তিনি নিজের ব্যথা ভুলে শুধু মেয়ের দিকেই তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে বলতে চাইছেন, “ভয় পাস না মা… আব্বা তো আছেই…” কিন্তু ঠোঁট নড়লেও শব্দ বের হলো না। কথার বদলে তাঁর মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল টকটকে লাল রক্ত। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বাশার সুলতান নিষ্ঠুর তৃপ্তির হাসি হাসছেন।
সেই হাসিটা যেন মানুষের নয়। একটা হিংস্র জানোয়ারের।
মেহরিন অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকে তাকালেন। বাশার সুলতান বললেন,
” বলেছিলাম না মেহরিন তোমার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে? সোলেমান তোমার ন্যাকামি সহ্য করলেও আমি করবো না। তোমাকে বলা হয়েছিল সংসার করার জন্য। কিন্তু তুমি বাপ বাপ করে হেদিয়ে মরলে। তোমার বাপটাও হতচ্ছাড়া আস্ত ঠেঁটা। মেয়ে মেয়ে করে হেদিয়ে মরছিলো। এবার বাপ বেটি একে ওপরকে শেষ বারের মতো দেখে নাও। কারন এরপর আর কখনো কেউ কাউকে দেখতে পাবে না। ”
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। কান্নারত গলায় বারবার বলতে লাগলো আকুতি মিনতি করে বাশার সুলতান কে,

” এমন টা করবেন চাচা। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার আব্বুকে ছেড়ে দেন। আমি সংসার করবো। হ্যাঁ, আপনার ভাইস্তার মতো পাপী এক মানুষের সাথে আমি সংসার করবো। আমার সন্তানের খুনির সাথে আমি সংসার করবো। শত শত মানুষের খুনি হলেও আমি তার সাথেই থাকবো। একটা টু শব্দও করবো না। আপনারা যা বলবেন তাই মেনে চলবো। তবুও আমার আব্বুকে ছেড়ে দেন। আপনারা আমাকে মাইরেন। আমি কিচ্ছু বলবো না। এই পৃথিবীতে আমার আব্বু ছাড়া আমাকে ভালোবাসার মতো কেউ নেই। আপনি দয়া করে আমার আব্বুকে মাইরেন না। আমি আব্বুকে বলে দিব, আমাকে দেখতে যেন আর না আসে। আব্বু আব্বু.. তুমি আর আমায় দেখতে আইসো না। আমি খুব ভালো থাকবো, বিশ্বাস করো। তুমি আর আইসো না, আব্বু। আমি বলে দিছি। আব্বু আর আসবে না। আর মাইরেন না আমার আব্বুকে। আল্লাহ! আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। আমি মরে যাচ্ছি। সন্তান হয়ে নিজের বাবাকে মার খেতে দেখছি, আর আমি কিছুই করতে পারছি না। এর চেয়ে বড় শাস্তি আমার জন্য আর কী হতে পারে! ও খোদা, আমার আব্বু কে তুমি অন্তত বাঁচাও। ”

মেয়ের সেই বুকফাটা আর্তনাদ শুনে মোতালেব ভুঁইয়া শেষবারের মতো চোখ তুলে তাকালেন। রক্তে ভিজে গেছে তাঁর পুরো শরীর। বৃষ্টির পানি সেই রক্ত ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবুও চোখ দুটোয় শুধু মেয়ের মুখ। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। তবে মৃত্যুকে তার চাইতেও বেশি ভয় পায় পিতা মাতারা। কারন মৃত্যু তাদের দুয়ারে এসে দাঁড়ালে তারা প্রথমে ভাবে তাদের সন্তানের কথা। তারা না থাকলে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাদের সন্তানদের কে তাদের মতো করে আগলে রাখবে? কেউ না। মোতালেব ভুঁইয়ার নিজের মৃত্যুকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের সাথে সাথে তার কলিজার টুকরা মেহরিনের মৃত্যুকেও খুব কাছ থেকে দেখতে পেলো। শেষবারের মতো মেয়েটাকে আর বুকে জড়িয়ে ধরা হলো না। আর ঠিক তখনই মোটা লাঠিটার শেষ আঘাতটা সজোরে এসে পড়ল তাঁর মাথায়। শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন মোতালেব ভুঁইয়া। বৃষ্টির পানির সঙ্গে লাল রক্ত মিশে ছোট্ট একটা স্রোত হয়ে বয়ে যেতে লাগল।
“আব্বু-উ-উ-উ…!” মেহরিনের বুকফাটা চিৎকারে যেন আকাশটাও কেঁদে উঠল। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে মোতালেব ভুঁইয়া কষ্ট করে চোখ দুটো খুললেন। ভাঙা নিঃশ্বাসে, কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

“আ… আব্বারে মাফ কইরা দিও আম্মা। অজান্তেই আমি।বাপ হইয়া নিজের হাতে তোমার জীবনটা নষ্ট কইরা দিছি। যে বাপ সারাজীবন তোমারে আগলাইয়া রাখছে… সেই বাপের কারণেই… তোমার জীবনটা নষ্ট হইয়া গেসে.” প্রতিটি শব্দের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসছিল তাঁর মুখ দিয়ে। মোতালেব ভুঁইয়া আবার বললেন “কথা দিছিলাম… তোমারে আজীবন আগলাইয়া রাখবো। তোমার সব কষ্ট নিজের কাঁধে নিব। তোমার এক জীবন আমি বয়ে নিব। কিন্তু,তোমার আব্বা কথা রাখতে পারল না মা। আমি হাইরা গেছি” এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তাঁর চোখের কোণ বেয়ে। “এই জানোয়ারগুলারে কোনোদিন ক্ষমা কইরো না । একদমই না। আমি নাই বলে ভেঙে পড়বা না খবরদার। আমি তোমার মাঝেই বেঁচে থাকবো। তোমাকে বাঁচতে হবে। হাজার বছর বাঁচতে হবে। ভালো থেকে আম্মা। পরকালে অবশ্যই আমাদের দেখা হবে। তখন বুকে জড়িয়ে ধরে শেষ আক্ষেপটা পূরণ করবো……”

শব্দগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো চিরদিনের জন্য। মেহরিন যেন নিজের ভেতর থেকেই একটা মৃত্যুর শব্দ শুনতে পেল। বাশার সুলতান নির্বিকার মুখে হাতের ইশারা করতেই লোকগুলো মেহরিনকে টেনে-হিঁচড়ে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল।
সে পাগলের মতো ছটফট করছে। দুই হাত বাড়িয়ে বাবার দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু পারলো না।
শুধু বুকফাটা চিৎকার করে কেঁদে বলছে,
” ছাড়ুন আমাকে। আব্বুউ আব্বুউ তুমি আমাকে ছেড়ে যেওনা আব্বুউ। আমার যে তুমি ছাড়া কেউ নেই। ও আব্বুউ… আব্বুউউউ…”

মেহরিন আব্বু আব্বু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চারপাশটা যেন অন্ধকার হয়ে গেল। বৃষ্টির শব্দ আরও তীব্র হয়ে উঠল। দূরে কোথাও বজ্রপাতের বিকট আওয়াজ তারপরই ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে গেল মেহরিনের। সে হাঁপাচ্ছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, অথচ বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। কাঁপা হাতে নিজের বুক চেপে ধরে বসে রইল সে। বাহিরে তাকিয়ে দেখলো বাহির টা পুরো ফাঁকা। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল সবটাই স্বপ্ন ছিল। তবে কেন যেন সেই স্বপ্নের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কান্না এখনো তার বুকের ভেতর বাস্তবের মতোই ধ্বনিত হচ্ছে।
সোলেমান তখন ভেজা শরীরে রুমে প্রবেশ করলো। সে রাজনৈতিক কাজে সাভার গিয়েছিল। কাজ শেষ হওয়া মাত্রই এই বৃষ্টির মধ্যেই রওনা দিয়েছিল। মেহরিন তাকে দেখেই এগিয়ে গেলো। অস্থির গলায় তার হাত দুটো চেপে ধরে বলল,

” আমাকে একটু আব্বার সাথে কথা বলিয়ে দিবেন? দেখা করাতে হবে না। আমি শুধু তার গলার আওয়াজ টা শুনবো। একটু দিন না। ”
সোলেমান কিছুই বুঝলো না। মেহরিন এভাবে হাঁপাচ্ছে কেনো? রাত এখন বাজে তিনটা। মেহরিন কে শান্ত ভাবে বিছানায় বসিয়ে বলল,
” তুমি শান্ত হও। আমি ফোন দিচ্ছি। ”
সোলেমান ফোন দিলো মোতালেব ভুঁইয়ার ফোনে। কিন্তু ফোন সুইচঅফ বলছে। তানভীর দের ফোনে ফোন করলে তানভীর জানায় মোতালেব ভুঁইয়া নওগাঁ চলে গেছে। তাদের বাসায় নেই। সোলেমান বলল,
” সকালে কথা বলার ব্যবস্থা করবো। তোমার বাবার ফোন বন্ধ। তিনি ঢাকায় নেই। বাড়ি চলে গেছে তানভীর বললো। ”
দেখা না করেই চলে গেলো মোতালেব ভুঁইয়া?

” কথা দিন কথা বলাবেন আব্বুর সাথে সকাল হলে? ”
” কথা দিলাম। এবার ঘুমোও। আমি পাল্টে আসছি। ”
মেহরিন ঘুমানোর চেষ্টা করলো। তবে ঘুম আসলো না।।ছটফট করতে করতে রাত টা পার করলো। সকাল হতেই সোলেমান কে দিয়ে আবার ফোন দেওয়ালো। ফোন এখনো বন্ধ। মেহরিন অনিক ভাইকে ফোন দিতে বললো। সোলেমান অনিক কে ফোন দিলো। দু বার কেটে যাওয়ার পর তিনবারের মাথায় রিসিভ হলো। সোলেমান বলে উঠলো,

” হ্যালো অনিক? তুমি কোথায় আছ? আর মেহরিনের বাবার ফোন সুইচঅফ কেনো? রাতে ফোন দিলাম তখনও বন্ধ বললো। মেহরিন কথা বলবে তার বাবার সাথে। তাকে একটু খবরটা জানাও। ”
অনিক কিছু বলার আগেই সোলেমান শুনতে পেলো মসজিদের মাইক দিয়ে ইমাম সাহেব বলছেন,
” একটি শোক সংবার,অত্র এলাকার সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আমাদের এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি মোতালেব ভুঁইয়া সাহেব গত কাল রাত চার ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মরহুমের জানাজার নামাজ আজ বাদ জোহর গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ। জানাজায় উপস্থিত থাকার জন্য এলাকাবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে। সবাই মরহুমের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।”

দাহশয্যা পর্ব ৯৭ (২)

এটা শুনেই সোলেমানের হাত থেকে মোবাইলটা ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। ফোনের ওপাশে অনিক কী বলছে, সেটাও আর তার কানে পৌঁছাল না। বারবার শুধু মসজিদের মাইকে ভেসে আসা সেই বাক্যটাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল,
“আমাদের এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি মোতালেব ভুঁইয়া গতকাল রাতে চার ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছেন…”

দাহশয্যা পর্ব ৯৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here