Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ১৬

দুইজনাতেই পর্ব ১৬

দুইজনাতেই পর্ব ১৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

“ বউ যদি হয় অদিতি আন্টির মেয়ে দ্বিতীকা তাসনিম, তখন এসব পন্থা অনুসরণ করা খারাপ কিছু নয়। ”
দ্বিতীর চোখ মুখে রাগের ভাব স্পষ্টই ফুটে উঠল মুহূর্তেই। নাকের অগ্রভাগ ইতোমধ্যেই লালচে আকার ধারণ করেছে। দ্বিতীর এভাবে হার মানতে ভালো লাগছে না। তার উচিত সাক্ষ্যকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানো। অথচ সে পারছে না। এই আফসোসেই তার মন চাচ্ছে মরে যেতে। সাক্ষ্য তাকাল। দ্বিতীর থমথমে মুখশ্রীটার দিকে তাকিয়েই র আরো দ্বিগুণ হাসি আসল যেন। মেয়েটাকে রাগলে আরো বেশি মিষ্টি মনে হয়। মনে হয় যেন ছোট্টো কোন বাচ্চা বায়না ধরেছে কোন কিছুর জন্য। গাল, নাক লাল হয়ে উঠে রাগের তোপে। সাক্ষ্য মৃদু হাসে ঠোঁট কামড়ে। বলল,

“ প্লিজ, এভাবে রেগে হাইপার হবেন না। একটা মাত্রই বউ আমার। ”
সাক্ষ্যর হাসিটা বোধহয় স্বাভাবিকই কিন্তু দ্বিতীর সহ্য হলো না হাসিটা। তার বিনিময়ে এমন ভাবে চাইল যেন সত্যি সত্যিই সাক্ষ্যকে ও এই মুহূর্তে মেরে দিবে। ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ফেলে রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“ আপনার মনে হচ্ছে না আপনি ইদানিং অতিরিক্ত ঢং দেখাচ্ছেন স্যার? ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকায়। ঘাড় ফিরয়ে চেয়ে বলে,
“ একদম নয়। বউকে নিয়ে আহ্লাদ করা ঢং কেন হতে যাবে? এটাকে ঢং বলে না অবশ্যই। ”
ওহ,সত্যি? ঢং বলে না? যে মানুষ ক্লাসরুমে বউ তাকিয়েছে বলে বউকে ক্লাসরুম থেকেই বের করে দিয়েছে সে মানুষ কিনা দ্বিতীকে শেখাতে এসেছে বউ নিয়ে আহ্লাদ করা? দ্বিতী তীর্যক চাহনি ফেলল সাক্ষ্যর দিকেই।রুক্ষ স্বরে জানাল,

“ আমাকে জোকার মনে হয়? এই দেখলাম কাছ ঘেষে একদম ঢং দেখিয়ে প্রেম দেখাচ্ছেন আবার এই দেখলাম খুব নাক উঁচু মানুষ হয়ে ঘুরঘুর করছেন চোখের সামনে দিয়েই৷ পাগল আমি? বুঝি না এসব? ”
সাক্ষ্য চাইল। এবারেও হাসি এল। খুব পরিমাণেই হাসি পাচ্ছে তার। অথচ হাসল না। বলল,
“ পাগলরা তো আর তারা নিজেরা যে পাগল এটা বুঝতে পারে না৷ আপনি কি করে বুঝলেন? ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে কপাল কুঁচকে নিয়েই চাইলেন। কি বুঝাল? পাগল সে? বলল,
“ কি বুঝাতে চাইছেন? পাগল আমি? ”
সাক্ষ্য এবারে হাসি চেপে গম্ভীর মুখ করে জানাল,
“ একদম নয়। কে বলল? ”
দ্বিতী রাগে চোখমুখ লাল করেই উত্তর করল,
“ আপনাকে দেখে গা জ্বলছে আমার বুঝলেন? একদম হাসবেন না এভাবে দাঁত কেলিয়ে। ”
“ এত রাগ নিয়ে কি হবে বলুন? তার চেয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। শান্ত হয়ে বসি এক রুমে। কথা বলি। দেখি আদৌ খু’নাখু’নি হয় কিনা। ”
দ্বিতী বাঁকা চোখে তাকায়। পা বাড়াতে বাড়াতেই জানাল,

“প্ল্যান কি আপনার? মিথ্যে ট্র্যাপে ফেলে এখানে আনার কারণ? উদ্দেশ্য তো ভালো মনে হচ্ছে না। ”
“ তো কেমন মনে হচ্ছে? ”
“ অবশ্যই খারাপ মনে হচ্ছে। শুনুন, খু’নাখু’নি হয়ে যাবে কিন্তু… ”
দ্বিতী অনেকটা আঙ্গুল উঁচিয়েই কথাটা বলছিল৷ সাক্ষ্য তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। কি ভাবছে? দ্বিতীকে কোন ভাবে এইসেই বুঝিয়ে আসলেই খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে? সাক্ষ্য গলা ঝাড়ল। আরেকটু মজা করে ঝুঁকল সে। একদম দ্বিতীর কানের কাছেই মুখ নিয়ে গম্ভীর স্বরে জানাল,
“ তেমন খারাপ নয় অবশ্য উদ্দেশ্য। এইতো মিসেস সাক্ষ্য এহসানকে কাছে পাওয়া। ”
দ্বিতী বোধহয় আচমকা এমন ঝুঁকে যাওয়াতে আর এতোটা কাছে বিড়বিড় করে বলাতে ঘাবড়াল কিছুটা। নিঃশ্বাসের অস্তিত্ব টের পাওয়া মাত্রই দুই পা পিছিয়ে গেল। দ্রুত জবাব দিল,

“ কেমন কাছে? ”
সাক্ষ্যর আসলেই হাসি এল প্রশ্নটা শুনে।ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করল,
“ কেমন কাছে চান? আপনি যতটুকু চান ততটুকুই এগোব। ”
সাক্ষ্যর মুখের চাপা হাসি হাসি ভাবটা দ্বিতীর একটুও সহ্য হলো না। চোখে দপাদপ রাগ নিয়ে চাইতে সাক্ষ্য ফের ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ ভয় পাচ্ছেন নাকি? এত দূরে, একা বাসায় নির্ঘাত.. ”
“ নির্ঘাত? ”
সাক্ষ্য ঠোঁট এলিয়ে হাসল। এবারে দ্বিতীর কপালে পড়া চুলগুলো তর্জনী আঙ্গুলের ছোঁয়ায় কানের পিছনে গুঁজে দিতে দিতেই বলল,
“ নির্ঘাত আপনার সাথে বড়সড় কোন ফয়সালা হয়ে যাবে। তবে, ভয় নেই। সাক্ষ্য এহসান এতোটাও ডেস্পারেট নয় যে মিথ্যে অযুহাত দেখিয়ে এতদূর নিয়ে আসবে আপনাকে। ”

একটা সাধারণ বাসা, তিন তিনটে রুম, এবং একটা কিচেন। দ্বিতী ঘুরে ঘুরে দেখল। দেখে এইটুকুই বুঝল যে এই বাসায় কেউ থাকে। অথচ কে থাকে তা আন্দাজ করতে পারল না। আর সাক্ষ্য ও যে এত দূরে এসে কোন বাসায় থাকবে না এইটুকু তো শিওর। সাক্ষ্য অবশ্য বাসার চাবিটা নিচের দারোয়ান থেকেই নিয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল তারা পরিচিত। দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে। চারপাশ ঘুরে জানালা দিয়ে দেখল বাইরের দৃশ্যও। মোটামুটি গাছগাছালি তে ভরপুর। তারপর অল্প অল্প পা ফেলে এল সাক্ষ্যর কাছে এল। সাক্ষ্য তখন নিজের ব্যাগ থেকে জামা বের করছিল গোসলে যাবে বলে। দ্বিতীকে আসতে দেখেই ঠোঁট বাঁকা করে হাসল। বলল,
“ যাক! রুম চিনতে পেরে গেছেন নিজে নিজে। তো কি এত দেখছিলেন ঘুরেফিরে?”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল। কথা বলার ভঙ্গি এবং হাসিটা দেখে। সাক্ষ্য এহসানকে সহ্যই হচ্ছে না এমন একটা ভাব নিয়েই বলল,

” দেখছিলাম সাক্ষ্য এহসান কতোটা মিথ্যুক! একটা শান্ত মস্তিষ্কের ধূর্ত মানুষ। ”
সাক্ষ্য হাসে এবারে। গলায় তোয়ালে জড়িয়ে বলল,
“ ভেরি গুড। আর কি জানলেন আমার সম্পর্কে? শুনি । ”
দ্বিতী এবারে উত্তর করল না। বিনিময়ে তীর্যক চাহনি ফেলে জানতে চাইল,
“ কার বাসা এটা? ”
দ্বিতীর কৌতুহল দেখে সাক্ষ্য মজাই পেল যেন। বলল,
“ যার বাসাই হোক। আপনার একসাথে রুমে থাকা নিয়ে ভয়টা দূর হলেই তো হলো। ”
উত্তর না পেয়ে দ্বিতী আবার ত্যাড়া কন্ঠে বলল,
” কার বাসা সত্যি করে বলুন। ”
“ আমার বাসা এতদূরে নিব কেন আমি? পাশাপাশি কোথাও নিব। যাতে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভ করে আসতে আসতেই এতো সময় না লাগে। ”
দ্বিতী শুনল। একপাশে বসে বসে পা দুলিয়ে বলল,

” তিনটে রুম আছে। যেকোন একটায় আমি থেকে যেতে পারব। আপনার সাথে আর একরুমে থাকার ঝামেলাও নেই, খু’নাখু’নি হওয়ার ভয়ও নেই। ”
“ জ্বী না ম্যাম। তিনটে রুমের দুটোতেই অন্যরা থাকবে। একটা শুধু আপনার আর আমার জন্য বরাদ্ধকৃত। ”
দ্বিতী ফের প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হু? কারা থাকবে? বাসায় তো মানুষের হাড্ডিও দেখতে পেলাম না। ”
“ আছে। দেখতে পাবেন। ”
দ্বিতী তাকাল কেবল সরু চাহনিতে। সাক্ষ্য তখন চাপা হেসে তোয়ালে, জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়েছে।অতঃপর বেশ খানিকটা সময় সে ওয়াশরুমের ভেতরই ব্যয় করল। অপরদিকে দ্বিতী যখন এদিক ওদিক ঘুরঘুর করছিল ঠিক তখনই কলিংবেলের আওয়াজ হলো। ভ্রু কুঁচকে গিয়ে দরজা খুলতেই সর্বপ্রথম একটা যুবককে চোখে পড়ল। দ্বিতী এর আগে কখনো দেখে নি। এই প্রথমই দেখছে অবশ্য এই যুবককে। দ্বিতী যখন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ভাবতে নিল ঠিক তখনই যুবকটি হেসে বলে উঠল,

” আসসালামু আলাইকুম ভাবি। ভালো আছেন? ”
” কে আপনি? ”
কে আপনি? যার বাসা তাকেই বলছে কে আপনি? ছেলেটা হতাশ। অন্যদিকে দ্বিতী উত্তর না পেয়ে মুখের উপরই দরজাটা লাগাল। কে বলতে পারে কোন চোর-ডাকাত কিনা৷ দরজা লাগিয়ে হেলেদুলে আসতেই দেখল সাক্ষ্যর ফোন বাঁজছে৷ এতো জোরে বাজছে যেন সে নিজের প্রাণ নিজে দিয়ে দিতে পারলেই বাঁচে। দ্বিতী ফোঁসফাঁস শ্বাস একবার ওয়াশরুমের দিকে চাইল। দরজা আটকানো তখনো। আবারও কল আসাতে এবার নিজেই রিসিভড করল। ওপাশ থেকে মুহূর্তেই গম্ভীর কন্ঠে বলা হলো,
“ এই সাক্ষ্য হারামি, তোর জন্য বাসর সাজানোর প্ল্যান করতেছি আমরা রাত জেগে। আর তুই আমার বাসায় আমারেই ডুকতে দিলি না? তোদের আমার শ্বশুড়বাড়ি নিয়েই যাব না।”

দ্বিতী মুহূর্তেই চোখমুখ কুঁচকাল। কি বলবে বুঝল না। তবে ফের আবারও কানে এল,
“ আমি আর নিষাদ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দরজা খোল বেয়াদব। কখন সাজাব নয়তো। ”
দ্বিতী ওভাবেই ফোনটা রেখে একপাশে বসল। বাসর সাজাবে কেন? সাক্ষ্য বলেছে? তার মানে আসলেই উদ্দেশ্য খারাপ? স্বামী হয়, সে হিসেবে অধিকার আছে দ্বিতী নিজেও জানে। কিন্তু সাক্ষ্য যতদিন তার কাছে ধরা না দিচ্ছে সেও ধরা দিবে না। কখনোই না। এসব বাসর ফাসর তো আরো না। দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলেই বেলকনিতে গিয়ে বসল। নিজের মোবাইলে গ্রুপ কলে তখন খেয়া, মিহু, ঈশান আর কিয়ান। কোন একটা এসাইনমেন্ট নিয়েই কথা হচ্ছিল বোধহয়। ঠিক এরমাঝেই দ্বিতী জানালা দিয়ে সাক্ষ্যকে ওয়াশরুম ছেড়ে বের হতে দেখল। আর তখনই গলা উঁচিয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠল,

“ ইশশ ঈশান। তুমি যদি থাকতে এখানে তাহলে বেশ প্রকৃতিময় ছবি তুলতে পারতে। এখানে চারপাশে এত গাছগাছালি। পরিবেশটা কি সুন্দর। আমারও কয়েকটা ছবি তুলে দিতে পারতে। সত্যিই তোমায় মিস করছি এই মুহূর্তে ঈশান। ”
সাক্ষ্য বোধহয় শুনল। মুহূর্তের মধ্যেই কান খাড়া হলো। ভ্রু বাঁকিয়ে কথা যেদিক থেকে আসছে ওদিকে তাকিয়েই দেখল খিলখিলিয়ে হাসছে দ্বিতী। এতোটা হাসছে যেন এর থেকে খুশি জীবনেও হয়নি। সাক্ষ্যর আসলেই এই হাসিটা ভালো লাগল। চাপা শিরশিরে এক রাগ শরীরে বয়ে গেল মুহূর্তেই। দ্বিতী পুনরায় আবারও বলল,
“ তুমি সত্যিই অনেক সুন্দর ছবি তুলতে পারো ঈশান। অনেক সুন্দর ফটোগ্রাফি পারো। আমাকেও শিখিয়ে দিও। ”
সাক্ষ্য তখন একদম দ্বিতীর পিছনে দাঁড়ানো। দ্বিতীর কানে চেপে রাখা ফোনটার দিকে চেয়েই গলা ঝাড়ল প্রথমে। দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্যকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী? অথচ সাক্ষ্য উত্তর করল না। ওপাশ থেকে উত্তর শোনা গেল,
“ ধুরর, তুমি সুন্দর বলেই তোমার ছবিগুলো এত সুন্দর আসে দ্বিতী। আমি মোটেও অতো ভালো পারি না ফটোগ্রাফি।”
সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকায়। বাহ বাহ!সুন্দর হলে সুন্দর। কিন্তু ঈশান কেন বলবে তা? সাক্ষ্য চাপা গলায় বলল,
“ আপনার ফোনটা একটু নিচ্ছি। দরকার আছে আমার। ”
ওপাশে সাক্ষ্যর গলাটা শোনা গেল কিনা তা নিয়ে মাথাব্যথা হলো না সাক্ষ্যর। তবে দ্বিতীকে এইটুকু বলে অপেক্ষাও করল না। হাত বাড়িয়ে ছটফট করেই ফোনটা নিল। দ্বিতী বিরক্ত হলো যেন। কথা বলছে দেখছে না? এখন কি দরকার? তাছাড়া দ্বিতী এগিয়ে না দিতেই এভাবে কেড়ে নিল কেন? হুহ? সাক্ষ্য তখন কল কাঁটল আরাম করেই। কপাল তখনও কুঁচকানো। সদ্য গোসল সেরে আসা মানুষটার চোখমুখ তখন পানিতে ভেজা। চুলগুলো বোধহয় মোছা হয়নি। টপাটপ পানির ফোঁটা পড়ছে।সাক্ষ্য তখন ফোনটা আলগোছেই পকেটে নিল৷ দ্বিতীই বলল এবারে,
“ এভাবে মোবাইল কেড়ে নেওয়াটা কোন ধরণের অসভ্যতামো? ফোন দিন। ছবি তুলব আমি। ”
সাক্ষ্যর গম্ভীর স্বর,

“ বলেই নিয়েছি। কাজেই অসভ্যতামো নয়। ”
“ আমি কি দিব বলেছি? আমার ফোন আমায় দিন। ”
“ যা দেখছি, আপনার ফোনটা আমার জন্য বিপদজনক। বিপদজনক জিনিসপত্র সাথে না রাখাই ভালো। ”
দ্বিতী নাক ফুলাল। রাগে ফোঁসফোঁস করে শ্বাসও তুলল। অদূরে একটা গাছের ডালে দুটো কবুতর বসা তখন৷ সাদা পায়রা। একটা অন্যটার ঘাড়ের দিকে ঠোঁট দিয়ে বুলিয়ে দিচ্ছে। এই আদুরে দৃশ্যটা দ্বিতী কথা বলা শেষ হলেই ফোনে তুলে নিত। অথচ তার ফোন নিয়ে নিয়েছে সাক্ষ্য। দ্বিতী শোনাল,
“ ফোন দিন। আমি বিপদজনক জিনিস রাখতে পছন্দ করি। বিশেষ করে আপনার জন্য যা বিপজনক। দিন, কবুতরের ছবি তুলব। ”
সাক্ষ্য নিজেও তখন তাকাল। অতঃপর তাকিয়েই ঠোঁট এলিয়ে হাসল। আরো এক কদম পা এগিয়ে একদম দ্বিতীর পিছনে দাঁড়িয়েই ঝুঁকল। দ্বিতীর কানের দিকে মুখ নিতেই ভেজা চুল গুলো গিয়ে ঠেকল দ্বিতীর ঘাড়ে। চুলের পানি গুলো মুহূর্তেই ছুঁয়ে গেল শীতল এক স্পর্শে। দ্বিতী কিছুটা অপ্রস্তুত হতেই সাক্ষ্য বিড়বিড় করে বলল,
“ মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম, অন্যের প্রেম দেখতে হয় না এমন নির্লজ্জের মতো। পারলে নিজে প্রেম করুন কিংবা অন্যকে সুযোগ দিন। ”
কন্ঠটা হাসি নিয়ে বললেও দ্বিতী মুহূর্তেই ছিটকে সরল দুয়েক পা৷ কন্ঠটা কেমন শোনাল? নাকি তার নিজেরই এমনি এমনি শিরশিরে এক অনুভূতি হলো? দ্বিতী নিজের এহেন অবস্থা মোটেও ধরা পড়তে দিল না। জানাল,
“ নির্লজ্জের মতো দেখব নাকি সলজ্জের মতো দেখব তা আসার ব্যাপার। আগে আমার ফোন দিন। আমি ছবি তুলব ওদের। ”

সাক্ষ্য এ পর্যায়ে অনবরত বাজতে থাকা কলিংবেলটা খেয়াল করল। নির্ঘাত নিষাদরা এসে গেছে?এইটুকু ভেবেই পা বাড়াতে বাড়াতে নিজের ফোনটাই এগিয়ে দিল দ্বিতীর দিকে। জানাল,
“ আমার ফোনের ক্যামেরা ভালো। অন্যের প্রেম ট্রেম ভালো ক্যাপচার করতে পারবে। বরং এটাতেই তুলুন। আমিও নাহয় গ্যালারিতে এসব দেখে মাঝেমধ্যে প্রেমট্রেম শিখব। ”
কি চালাক। তবুও দ্বিতীর ফোনটা দিল না? ইচ্ছে করেই দিল না? দ্বিতী অবশ্য সাক্ষ্যর ফোনটা এমনিতে হার মেনে গিয়েই নিল না। মনে মনে উদ্দেশ্য হলো এই লোকের ফোনে কি আছে দেখা যাবে। ফোনের বারোটা বাজিয়ে তবেই নাহয় দিবে। এইটুকু ভেবেই বলল,
“ লক করা তো। ”
সাক্ষ্য যেতে যেতেই একটা সংখ্যা বলে গেল। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে শুধার,
“ আবার বলুন। ”

সাক্ষ্য এবার গলা উঁচিয়ে আবারও সংখ্যাটা বলল। দ্বিতী দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে লিখল ও তা৷ অতঃপর হুট করেই খেয়াল করল সংখ্যাগুলো কেমন বার্থডেইট টাইপের যেন। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ভাবলও। অতঃপর অল্প একটু ভেবেই বুঝতে পারল আসলেই বার্থডেইট। প্রথমটা সাক্ষ্যর আম্মুর, শেষেরটা কথার আর মাঝখানেরটা? মাঝখানেরটা কি দ্বিতীর? দ্বিতী ভ্রু কুঁচকেই তাকিয়ে রইল। সত্যিই? সাক্ষ্য এহসান তার বার্থডেইট খেয়াল রেখেছে? দ্বিতীর তো বিশ্বাস হয় না। মনটা এবার আসলেই উঠে পড়ে লাগল এটা জানতে যে ঐ একই দিনে আর কার বার্থডে আছে? নাকি দ্বিতীরই? না নাহ! সাক্ষ্য আবার তাকে এত গুরুত্ব কবে থেকে দিচ্ছে?

দ্বিতী তুলল ছবি। মনের ভেতর কৌতুহল নিয়েই তুলছিল। ঠিক ঐ সময়ই বাইরে থেকে শোনা গেল,
“ তোর বউ আমাকে ডুকতে দেয়নি সাক্ষ্য। মুখের উপর দরজা লাগিয়ে চলে গেছে। কি দুঃখটা পেয়েছি আমি।”
তখন ফের আবার সাক্ষ্যর গলাটাও শোনা গেল,
“বেশ হয়েছে। পরিচয় না দিলে অপরিচিত মানুষকে ডুকতে দিবে কেন আমার বউ? দোষ আমার বউয়ের না, তোদের। ”
“ এই না বউ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে কেঁদে কেঁদে চোখ ভাসাচ্ছিলি? এখন বউয়ের পক্ষ টানছিস? ছিঃ ছিঃ! বউপাগল সাক্ষ্য এহসান। ”
“ তোর মতো না। আকদের আগেই বউয়ের পিছু পিছু ঘুরঘুর করছি না সবার সামনেই। চক্ষুলজ্জা আছে আমার। ”
“ বাহ বাহ! যে লজ্জা! ”

দুইজনাতেই পর্ব ১৫

দ্বিতী শুনছিল শুধু দুই বন্ধুর কথোপকোতন। অতঃপর ছবি তুলতে তুলতেই গ্যালারিতে গিয়ে সেসব ছবি ভালোভাবে দেখতে দেখতেই হুট করে চোখে পড়ল তার ছবিও। ছবিগুলো দ্বিতীরই। ভার্সিটির ক্যাম্পাসে। প্রেজেন্টেশনের দিনেরই। শাড়ি পরা অবস্থায়। দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। কখন তুলেছে? তারই তো ছবি। দ্বিতী কৌতুহল নিয়ে ছবিগুলো আরেকটু নিতেই সাক্ষ্য এবার পিছন থেকে এই ফোনটাও কেড়ে নিল৷ ধমক দিয়ে বলল,
“ কি আশ্চর্য! গ্যালারি ঘাটছেন কেন? ছবি তুলছেন, ছবি তুলেই তো দিয়ে দিবেন। এসব কি ধরণের অসভ্যতামো?”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য ফোনটা নিয়ে দ্রুত পা বাড়াল। যেতে যেতে নিজেই বিড়বিড় করে বলে গেল,
“ কোন ফোনই তো এই মেয়ের হাতে দিয়ে শান্তি নেই। উফফ!”

দুইজনাতেই পর্ব ১৭

2 COMMENTS

Comments are closed.