Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩০
নুসরাত ফারিয়া

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেহেতু দূরের পথ, তাই সবাই সকাল সকালই বেরিয়েছে পড়েছে। কক্সবাজার পৌঁছাতেই প্রায় ৮/৯ ঘন্টার মতো লাগবে। বরসহ পরিবারের লোক, কাজিন সবাই প্রাইভেট কারে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতর সবাই আনন্দ, হইচই করলেও আজ আলোর মনটা খারাপ। সে চেয়েছিল স্যারের সাথে আসতে, কিন্তু লোকটা তাকে ইগনোর করে অন্য গাড়িতে উঠেছে। এটা নিয়েই তার যতসব মন খারাপ।
-“আপু? তুমি ঠিক আছো? না মানে, আজ এত শান্ত?”
আলোর কেন জানি খুব রাগ হলো। সে মূহুর্তেই ছোট বোনের ওপর চেঁচিয়ে উঠল,

-“আমাকে কী তোদের মানুষ বলে মনে হয় না? আমার মন খারাপ, কষ্ট বুঝি হয় না? সবসময় হাসিখুশি, বকবক করি বলে কী কখনো শান্ত থাকতে পারি না? আমার উগ্র স্বভাব, আমার বেশি বলা কথা, আমার পাগলামি, আমার আকাম-কুকাম করা, এমনকি আমার হাসিতেও তোদের সমস্যা হয়! এই পুরো আমিটাতেই সবার সমস্যা। আমি এখন কী করব? বল কী করব? নিজের অস্বস্তিকেই মিটিয়ে ফেলবো?”
সচরাচর আলোকে কখনোই কেউ রাগতে দেখেনি, আর না এমন কথা বলতে দেখেছে। মেয়েটা সবসময় হাসিখুশিই থাকে। কষ্ট পেলেও হাসে, মন খারাপ থাকলেও হাসে! অথচ সেই মেয়েটার আজ এমন রূপ ঠিক সবার হজম হলো না। বড় বোনের চিল্লানি খেয়ে তো ছায়া কেঁদে দিয়েছে। ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে রহিত বসে ছিল। মূলত আলোরা বরের গাড়িতেই বসেছে।
রহিত লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে আলোর উদ্দেশ্য বলল,

-“তুই ঠিক আছিস? সামান্য কথাতে এত রিয়াক্ট করছিস কেন?”
আলো জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“আমি বাজে, তাই এমন করি।”
-“কেউ কিছু বলেছে?”
-“না, পারলে কেউ আমার সাথে কথাও বলবে না।”
আলোর ত্যাড়া ত্যাড়া জবাব ঠিক বুঝতে পারল না রহিত। তবে মেয়েটাকে আর ঘাঁটল না! হয়তো মনমেজাজ বিগড়ে আছে মেয়েটার। ছায়া, মায়ার সাথে লেপ্টে বসে আছে। মাঝেমধ্যে নাক টানছে! আলো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ছোট বোনকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে, জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে শান্ত গলায় বলল,

-“সরি বোনু! তোকে বিনাকারণে বকা দিলাম। আসলে মুড একটু বিগড়ে আছে। তাই ছাৎ করে উঠেছি! প্লিজ রাগ করিস না, বিয়ে বাড়িতে গিয়ে তোরে আমার ভাগের রোস্ট দিবোনি। সমুদ্র পাড়ে গিয়ে যা যা খেতে চাইবি, তোকে আর মায়াকে সব খাওয়াবোনি। এবার চাইলে অক্টোপাসও খাওয়াব! আমি একটুও মানা করব না। এমনকি তিমি মাছও এনে খাওয়াব তোকে। তবুও আমার কথায় কষ্ট পাস না। তুই জানিস তো, তোর আপু একটু অবুঝ! তাই হুটহাট এমন করে ফেলি।”
ছায়া বড় বোনের বুকে মুখ গুঁজে মুচকি হেঁসে বিরবির করে বলল,
-“সব বুঝালাম! কিন্তু তুমি তিমি মাছ কই পাবে? ওইটা তো সমুদ্রে আছে।”
-“তো কী হইছে? সমুদ্র থেকে ধরে আনব ব্যাটারে!”
ছায়া মূহুর্তেই শব্দ করে হেঁসে উঠল। আলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ বুজে, বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“কখনো আপুর কথায় কষ্ট পাবি না, আর না মন খারাপ করবি।”

সকাল গড়িয়ে দুপুর ও দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসেছে। লং জার্নি করে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় সবাই পৌঁছাল। আস্তে-ধীরে সবাই নেমে এল গাড়ি থেকে। আলো নিজের লেহেঙ্গা দু’হাতে ধরে গাড়ির ডোর খুলে নামল। সামনে এগোতে চেয়ে অনুভব করল, পিছনে ওড়না আঁটকে গেছে। আলো বিরক্তিতে পিছনে ঘুরে ওড়না ধরে টানাটানি করতেই, পাশ থেকে একটা পুরুষালী বলিষ্ঠ হাত এসে তার ওড়না ছাড়িয়ে দিল। আলো চমকে উঠে পিছনে ফিরতেই, তার কপাল স্পর্শ করল উত্তপ্ত বুক! খুব চেনা ও অতি প্রিয় পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ পেয়ে আলো মূহুর্তেই পিছনে সরে গেল। অতঃপর কিছু না বলে মানুষটার পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
বাড়ির প্রবেশপথে নারকেল গাছের দীর্ঘ সারিতে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নীল আর সাদা মরিচ বাতি, যা দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, আকাশের নক্ষত্রগুলো নিচে নেমে এসেছে। সাজসজ্জায় আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও ঐতিহ্যের টান স্পষ্ট। সদর দরজায় টাটকা কলাপাতা আর শোলার নকশায় তৈরি করা হয়েছে ‘খোশ আমদেদ’ গেট। উঠোনজুড়ে রঙিন শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, যার নিচে বসে আছে পাড়ার চঞ্চল কিশোরীর দল। তাদের পরনে স্থানীয় তাঁতের শাড়ি, আর চুলে গুঁজে রাখা সতেজ বুনো ফুল।

​বিয়ের বাড়ির এক কোণে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বড় বড় ডেকচিতে রান্না হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মেজ্জানি মাংস এবং সামুদ্রিক মাছের বিশেষ কোনো পদ। ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধ আর মশলার ঝাঝালো ঘ্রাণে চারপাশ ম-ম করছে। প্রবীণরা পান-সুপারি মুখে দিয়ে বসে আছেন বাড়ির বারান্দায়, তাদের গল্পের আসর বসেছে পুরোনো দিনের বিয়ের স্মৃতি নিয়ে।
যেহেতু সবাই অত দূরের পথ থেকে এসেছে তাই মেহমানদের আগেই খেতে দেওয়া হয়েছে। এবং সন্ধ্যার দিকে বিয়ে পড়ানো শুরু হবে!
আলো কথামতো তার রোস্ট ছায়ার প্লেটে দিল। তখনই খেয়াল করল, তার প্লেটে রোস্ট! আলো সরু চোখে পাশে বসা স্যারের দিকে তাকায়৷ আধার দুটো টিস্যু আলোর কোলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“আমাকে পরে দেখো, আগে খাবার খাও!”
আলো কিছু না বলে চুপচাপ খেতে লাগল। আধারও খেতে শুরু করল, আর মাঝেমধ্যে এটা-সেটা বউয়ের প্লেটে তুলে দিল।

সন্ধ্যা হয়ে আসতেই বিয়ে পড়ানো শুরু হয়ে গেল। মেঘলার পরণে লাল টুকটুকে জামদানী শাড়ি! আর রহিতের গায়ে শেরওয়ানি৷ কাজী সাহেব সকল নিয়মকানুন মেনে রহিতকে কবুল বলতে বলে। ছেলেটা সময় নষ্ট না করে তিনবার কবুল বলে দেয়। এটা নিয়ে পাশে দাঁড়ানো কাজিন, বন্ধুবান্ধবরা সবাই হেঁসে উঠল। কাজী সাহেব এবার মেঘলাকে কবুল বলতে বললেন। মেয়েটা একটু সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে কবুল বলতেই সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলল। অবশেষে দুটি মানুষ পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
আলো এক কোণে বসে থেকে আড়চোখে তার স্যারকে দেখতে ব্যস্ত! পরণে সাদা পাঞ্জাবি এবং ওপরে হাতাকাটা কালো কোটি। বাম হাতের কব্জিতে সিলভার রঙা ব্যান্ডেড ঘড়ি, বড় বড় চুলগুলো সুন্দর করে জেল দিয়ে সেটআপ করে রাখা। সুন্দর মুখশ্রীর লালচে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি দেখা যাচ্ছে। মানুষটাকে শার্ট পরলে বেশি মানায় নাকি পাঞ্জাবি পরলে বেশি মানায়?
আলো মনে মনে ভাবল—’আই থিংক পাঞ্জাবিতে বেশি সুন্দর লাগে!’ এটা ভেবে আনমনে হাসল। লোকটা তার বাবার সাথে বসে থেকে টুকটাক কথা বলছে। মাঝেমধ্যে আবার হাসছেও! শশুর, জামাইয়ের মধ্যে এত ভাব হলো কখন ঠিক বুঝতে পারল না আলো। তার বাবা তো জামাইকে পেয়ে একপ্রকার তাকেই ভুলে গেছে। এটা মানতে পারল না আলো। সে লেহেঙ্গা ধরে তার বাবার সামনে গিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,

-“আমার বাবাকে দেখেছেন?”
মেয়ের এহেন কথায় মতিউর রহমান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি অবাক কণ্ঠে বললেন,
-“আমিই তো তোমার বাবা! চোখে কম দেখছো? ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো?”
আলো কিছু বলবে তখনই আধার সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
-“চোখে কম নয় আব্বু! বলুন আপনার মেয়ে খাবারের সাথে নিজের ব্রেনও খেয়ে নিছে।”
স্যারের মুখে ‘আব্বু’ সম্মোধন শুনে আলো চমকে উঠল। তারমানে এই লোকটা তার বাবাকে শশুর বলে মেনে নিয়েছে? কিন্তু কখন?
-“তুমি ঠিক আছো মামণি?”
বাবার কথা শুনে আলো কপাল কুঁচকে বলল,
-“তুমি তো দেখছি, জামাইকে পেয়ে মেয়েকে ভুলে গেছো।”
আধার আবার পাশ থেকে শশুর মশাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
-“আপনার বড় মেয়ে যে এত হিংসুক সেটা জানা ছিল না।”
আলো বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে তার বাবাকে বলল,
-“তুমি কিন্তু এখনো বললে না, আমাকে কেমন লাগছে বাবা!”
মতিউর রহমান হাসলেন। মেয়ের অভিমান বুঝতে পেরে কাছে টেনে পাশে বসিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,

-“আমার মেয়ে আমার ছোট্ট পরী! সে সবসময়ই সেরা এবং অনেক কিউট আর আদুরে।”
বাবার প্রসংশা শুনেও কেন জানি আলোর মন ভালো হলো না। সে উদাস মনে বলল,
-“কিন্তু…আমি অন্যের চোখে বাজে বাবা! খুব বাজে।”
একথা শুনে আধার ঘাড় কাত করে মেয়েটার মলিন চেহারার দিকে তাকায়। তার ওই কথা এখনো ধরে বসে আছে মেয়েটা!
মতিউর রহমান মেয়ের মন খারাপ দেখে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“আমার সোনা একদম বাজে নয়! তোমাকে যে বাজে বলেছে, তার চোখের সমস্যা আছে। নয়তো আমার ফুলের মতো কোমল মেয়েকে কী কখনো বাজে বলতে পারত? আর তুমিও এক বোকা মেয়ে! কে কী বলল, সেটা নিয়ে মন খারাপ করছো কেন? একটা কথা মনে রাখবে, আমরা যেটা পছন্দ করি, সেটা যে সবার পছন্দ হবে সেটাও না কিন্তু। তাই শুধু শুধু মন খারাপ করে লাভ নেই।”
আলো বুঝল বাবার কথা৷ তাই সে কথার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে কিছু বলতে তখনই একজন ভদ্রলোক এসে তার বাবার সাথে কুশল বিনিময় করতে লাগলেন। মতিউর রহমান উঠে দাঁড়ানোর ফলে এখন, আধার ও আলো সামনাসামনি। মেয়েটা সোজা হয়ে বসে আড়চোখে স্যারের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। আলো চট করে নজর সরিয়ে নিল। তবুও সে অনুভব করতে পারছে, ওই অসভ্য লোকটা তাকেই দেখে যাচ্ছে।
বাবাকে ওই মানুষের সাথে চলে যেতে দেখে আলোও উঠে দাঁড়ায়। লেহেঙ্গা দু’হাতে ধরে সামনের দিকে পা বাড়াতেই ওড়নায় টান পড়ল। আলো কপাল কুঁচকে পিছনে তাকায়। লোকটা আলতো হাতে তার ওড়না টেনে ধরে আছে।

-“আমি সুন্দর জিনিসের কখনো প্রসংশা করি না।”
একথা বলে আধার মেয়েটার ওড়না ছেড়ে দিল। আলো কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি আমাকে সুন্দর বললেন?”
-“আই ডোন্ট নো…মিস. কালো।”
-“আবার কালো!!”
আলো দাঁত কিড়মিড় করল। আধার আনমনে হেঁসে কিছু বলতে যাবে তখনই একজন রমণী এসে সোজা তার পাশে বসল। এটা টের পাওয়া মাত্রই আধার তড়াক করে উঠে দাঁড়াল।
-“হাই মিস্টার! আপনি আমার পাশে বসতে পারেন, নো প্রবলেম।”
মেয়েটার কথা শুনে আলোর শরীর জ্বলে উঠল। কতবড় সাহস! তার সামনে তারই স্বামীকে নিজের পাশে বসার জন্য অফার করছে। আধার পিছনে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। সে গম্ভীর কণ্ঠে কিছু বলবে, তার আগেই খেয়াল করল—এক জোড়া হাত এসে তার গলা জড়িয়ে ধরেছে।
আধার শীতল চোখে মেয়েটার মাসুম চেহারার দিকে তাকিয়ে দু’হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে আরো কাছে টেনে নিল। আলো একগাল হেঁসে চোখের কোণা থেকে কাজল নিয়ে স্যারের কানের পিছনে লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“আজকাল দেখছি আমার স্বামীর ওপর শাঁকচুন্নিদেরও নজর পড়ছে!”
আধার ঠোঁট কামড়ে হাসল। এইদিকে তাদের আচরণ আর আলোর কথা শুনে সোফায় বসে থাকা মেয়েটা ফুঁসে উঠল। চট করে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

-“এই মেয়ে? তুমি আমাকে শাঁকচুন্নি বললে?”
আলো ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
-“আমি কী আপনার নাম বলেছি? ওয়েট…ওয়েট! তারমানে আপনি আমার স্বামীর দিকে নজর দিয়েছেন? তাই তো আমার কথাটা আপনার গায়েই লাগল। ওই যে প্রবাদ আছে না? ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি!”
মেয়েটা রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
-“আমি তোমাকে দেখে নিবো বেয়াদব মেয়ে।”
-“কেন? পরে দেখবেন কেন? এখনই দেখুন। আমি তো আর বোরখা পরে নেই।”
মেয়েটা আবার কিছু বলতে যাবে, তখনই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
-“অন্যকে বেয়াদব বলার আগে নিজের ক্যারেক্টার দেখুন মিস! একজন অপরিচিত পুরুষকে নিজের পাশে বসার জন্য অফার করাটা কী ভদ্রতার কাতারে পড়ে? আপনার সো কোল্ড ব্যবহার-ই বলে দিচ্ছে, আপনি ঠিক কতটা বেয়াদব।”
অপমানে মেয়েটার চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। তবে কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে যায়। আলো মুখ ভেংচি কাটল। এএএ এসেছিল তার বরকে পটাতে হুহ্!
-“আপনি যে আমাকে নিয়ে এত জেলাস ফিল করেন, সেটা আগে জানতাম না, মিসেস খান।”
ঘাড়ের ওপর গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই আলোর শরীর মৃদু কেঁপে উঠল। সে দু’হাত নামিয়ে সরে যেতে চাইল। কিন্তু আধার তাকে ছাড়ল না, বরং কোমর চেপে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ করে নিল। আলো হাসফাস করে উঠে বলল,

-“ক-কী করছেন? ছাড়ুন। সবাই দেখছে তো।”
-“আই ডোন্ট কেয়ার!”
কথা বলার পরপরই ঘাড়ের মাঝে নরম ঠোঁটের ছোঁয়া পেয়ে আলো মৃদুস্বরে গুঙিয়ে উঠে দু’হাতে খামচে ধরল পাঞ্জাবির কলার। আধার আজ আবারো নিজের হুঁশ জ্ঞান হারিয়েছে। সে মেয়েটার গলায় নাকমুখ গুঁজে লম্বা শ্বাসের মাধ্যমে মিষ্টি ঘ্রাণটুকু টেনে নিচ্ছে। মাঝেমধ্যে ঠোঁটও ছুঁয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, আলো লজ্জায় পারছে না জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে। তার হাত পা রীতিমতো থরথর করে কাঁপছে! মানুষটার নিশ্চয়ই মাথার তার ছিঁড়ে গেছে। নয়তো এখানে এমন পাগলামি করার কোনো মানেই হয় না!
হঠাৎ করে আধারের কী হলো কে জানে। মূহুর্তেই মেয়েটাকে সোফার মাঝে ছুঁড়ে মে’রে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-“আমার থেকে দূরে থাকবে!”

বলেই হনহনিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। আর আলো স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ, হতভম্বের ন্যায় বসে থাকল। অজান্তেই তার এক চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। সে তো কিছু করেনি! ওই লোকটাই তো তার কাছে এসে তাকে স্পর্শ করছিল। তাহলে এখন এমন ব্যবহার করার মানে কী তার সাথে? নাকি তাকে ছুঁতেও ওই লোকটার ঘৃণা করে?
অন্যদিকে আধার সোজা ওয়াশরুমে চলে এসেছে। দু’হাত বেসিনের পাশে ভর দিকে রেখে মাথা নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে চোখ দুটো বুঁজে নিল। একটু পর পানির ট্যাপ ছেড়ে চোখেমুখে ঝাপটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকায়। হঠাৎই তার মনে হলো, আয়নায় ফুটে ওঠা তারই প্রতিচ্ছবি তাকে দেখে হাসছে আর তাচ্ছিল্যের সুরে বলছে,
“অবশেষে আধার খানও এক মেয়ের প্রেমে পড়ে গেল।”
এটা শুনে আধারের খুব রাগ হলো। সে একটা পাঞ্চ মেরে দিল আয়নার মাঝখানে। সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর আয়নাটা ভেঙ্গে গিয়ে কাঁচগুলো নিচে পড়ল। মাঝখান থেকে কয়েক ফোঁটা তাজা র’ক্তও চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। একই সাথে আধার চিৎকার করে বলে উঠল,

-“বাসি না! ওই মেয়েকে আমি ভালোবাসি না। একটুও ভালোবাসি না। ও…ও শুধু আমার দায়িত্ব! শুধুই দায়িত্ব! এছাড়া আর কিছু না, কিছুই নায়ায়া। শুনতে পাচ্ছিস তুই? ওই পাগল মেয়ের প্রেমে পড়েনি আমি। আর না ওকে আমি ভালোবাসি!”
আধার কথাগুলো বলতে বলতে হাঁটু ভেঙে ফ্লোরের মাঝে বসে পড়ল। তখনই তার প্রতিচ্ছবি তাকে প্রশ্ন করল—

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৯

-“তাহলে পারবি, ওই পাগল মেয়েটাকে ছেড়ে থাকতে?”
আধার শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বুজে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“উঁহু, একটুও পারব না ওই পাগল মেয়েটাকে ছাড়া থাকতে। আর না ওর পাশে অন্য কাউকে সহ্য করব। কারণ, আলো শুধু আধারের৷ শুধুই আধারের! এর বাহিরে আর কারোর নয়!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩১

2 COMMENTS

Comments are closed.