Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩১
নুসরাত ফারিয়া

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে এসেছে। বিয়ে শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। মেঘলা ও রহিতকে ফুলে সজ্জিত গাড়িতে দেওয়া হয়েছে, আর বাকী গাড়িতে সবাই। আলো তার কাজিন ও বোনদের সাথে বসেছে। ওই ঘটনার পর থেকে আর সে মানুষটার সামনে যায়নি। আর না মানুষটা তার কাছে এসেছে। আলো সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে বাইরের রাতের আকাশ দেখছে। বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো ভাবে উড়ছে। সকালে একদফা অভিমান করে ছিল স্যারের ওপর! কিন্তু সে বেহায়ার মতো অভিমান সব ভুলে গিয়ে মানুষটার কাছে গিয়েছিল। সে আবার বেশিক্ষণ রাগ, অভিমান করে থাকতে পারে না। আর যদি হয় সেটা ভালোবাসার মানুষ, তাহলে তো কোনো কথায় নেই!

এই ভালোবাসার জন্য সে কী না কী করেছে? বেহায়া, নির্লজ্জ, পাগল, ছ্যাচড়া, ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু হয়েছে। এমনকি নিজের আত্মসম্মানও ত্যাগ করে বারবার ওই মানুষটার কাছে ছুটে গেছে। সে আগে থেকেই জানত, ওই লোকটা তাকে পছন্দ করে না! কিন্তু, পরবর্তীতে মানুষটা তো পাল্টে গেল। তার যত্ন করা থেকে তো সবকিছু করত। আর সে এইগুলোর প্রতিই তো ধীরে ধীরে ভীষণ বাজেভাবে মায়ায় পড়ল। তার বিশ্বাস ছিল, মানুষটা এইভাবেই ঠিক একদিন তাকে মেনে নিবে। অথচ, লোকটা এক মূহুর্তের মধ্যেই কেমন জানি পাল্টে গেল।
আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। জানালার বাইরে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে বলে উঠল,
-“এমন নিষ্ঠুর ভালোবাসা তুমি, আমারে না দিলেও পারতে!”
গাড়ির ভেতরে সবাই গানের কলি খেলছিল আর হাসাহাসি করছিল। তাই কেউ-ই মেয়েটার কথাটা শুনতে পেল না। মায়া আপুর উদ্দেশ্যে বলল,

-“তুমি একটা গান শোনাও আপু।”
আলো অন্য সময় হলে মানা করে দিত। কিন্তু, আজ তার মন খারাপ! ভীষণ, ভীষণ মন খারাপ। তাই সে কোনো আপত্তি না করে, চোখ বুজে খালি গলায় গুনগুন করতে শুরু করল—
❝​কিভাবে বোঝাবো তোমাকে
কতটা ভালোবাসে এই মন,
এখানে ওখানে তোমাকে
খুঁজে যাই পাগলের মতন…
​তুমি হয়তো বা ভালোবাসো না আমায়
আজও আমি শুরু থেকেই চাই তোমায়,
যত দেখি তোমাকে মন শিহরে উঠে
ছন্দরা ছন্দ হারায়…
​তুমি ছুঁয়ে দেখো আমায়
তুমি ছুঁয়ে দেখো আমায়…
ছুঁয়ে দেখো আমায়
আমাকে জড়িয়ে বুকে রেখে দাও…
​কখনো কি ভেবেছো আমায় একটুও আপন?
দূরে দূরে রেখেছো সারাক্ষণ,
রাতেরও আকাশে যখন বৃষ্টি বাদল গর্জন
আমারও মনের ভিতর তুফান…
​আমি শুরু থেকে জানি
তুমি হবে না আমারি,
তবু আমি পাগল হয়েছি তার কারণে….!❞

ভোরের দিকে নতুন বউকে নিয়ে সবাই রহমান বাড়িতে পৌঁছাল। সবাই যেহেতু ক্লান্ত ছিল, তাই সব নিয়মকানুন মেনে বউকে বাড়ির ভেতর নিয়ে এসে রেস্ট নিতে গিয়েছে যে যার রুমে। একটু আরাম করে না-হয় বাকী কাজ করা যাবে।
হালকা ফুলে সজ্জিত বাসর ঘরে, মেঘলা ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়েছে৷ একটু পর রহিত এসে দরজা বন্ধ করে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সোজা বউয়ের কাছে গিয়ে কোনো কথা ছাড়াই চুমু খেতে শুরু করল। স্বামীর এহেন কাজে মেঘলা হকচকিয়ে উঠল। সে দু’হাতে নিজের ওপর পড়ে থাকা শরীরটাকে ঠেলতে শুরু করল। কিন্তু রহিত একটুও নড়ল না, বরং মেয়েটার দু’হাত বিছানার সাথে চেপে ধরে ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরল।
-“র…রহিত প্লিজ না! আ-আমি ক্লান্ত। আমাকে ঘুমাতে দাও। এসব রাতে হ্যাঁ?”
রহিত এক হাতে মেয়েটার শাড়ির কুঁচি খুলতে খুলতে হিসহিসিয়ে বলল,
-“তুই তো তোর বাপের বাড়িতে আরাম করে বসে ছিলিস, আর আমি জার্নি করে গেলাম আর এলাম। সেখানে তো আমার ক্লান্ত হওয়ার কথা! তাহলে তুই ক্লান্ত হলি কেন?”
একটু থেমে পুনরায় হিসহিসালো,
-“সমস্যা নেই মেঘ জান! তোর ক্লান্তি না-হয় আরেকটু বাড়িয়ে দিই। এত বছর ধরে এই মূহুর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছি, তাই…আজ আর একটুও অপেক্ষা নয়৷ তুই শুধু দেখ আর অনুভব কর, আমি তোকে আজ ঠিক কতটা ভালোবাসি।”
মেঘলা লজ্জায়, ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। বাঁধা দিতে চেয়েও আর বাঁধা দিতে পারল না। অসভ্য লোকটা তার বাঁধা মানলে তো৷ মেঘলা স্বামীর এলোমেলো স্পর্শে আঁখি জোড়া বুঁজে নিল৷ অতঃপর তার পরণের শাড়ির জায়গা হয় সফেদ মেঝেতে…

আলো নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে কোনোমতে টেনেটুনে দোতলায় নিয়ে এল। ঘুমে সে একপ্রকার ঢুলছে! চলন্ত গাড়িতে সে আবার ঘুমাতে পারে না৷ ফলস্বরূপ পুরো রাত পেঁচার মতো জেগে ছিল। নিজের রুমে এসে দেখে, সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে, পিছনে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে বসে আছে আধার স্যার। আলো নজর সরিয়ে নিতেই কিছু একটা খেয়াল করে, চমকে উঠে স্যারের ব্যান্ডেজ করা ডান হাতের দিকে তাকায়। মানুষটা ব্যথা পেয়েছে ভাবতেই, এক মূহুর্তের জন্য সবকিছু ভুলে তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে পাশে বসল। তারপর আস্তে করে হাতটা নিজের কোলের ওপর নিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“কী হয়েছে আপনার হাতে? আঘাত পেলেন কীভাবে?”
আধার মেয়েটার কোল থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তেমন কিছু হয়নি।”
আলো কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে অশ্রু পড়া থেকে বন্ধ করল। সে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে হাঁটতে হাঁটতে শান্ত গলায় বলল,

-“আঘাত করার ইচ্ছে হলে আমাকে করুন, তবুও আমার জন্য শুধু শুধু নিজেকে আঘাত করবেন না প্লিজ!”
একথা বলে আলো এইড বক্স নিয়ে এসে আবারো বসল মানুষটার পাশে। কাঁপা কাঁপা হাতে স্যারের ডান হাতটা ধরতে যাবে, তখনই আধার সোজা হয়ে বসে মেয়েটার কাছ থেকে এইড বক্স নিয়ে বলল,
-“আমি নিজে ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করতে পারব৷ তুমি রেস্ট নাও।”
আলো বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ওই সুন্দর মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুপচাপ চলে গেল ওয়াশরুমে। একটু সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে খেয়াল করল, স্যার সোফায় শুয়েছে। আলো নিজেকে সামলিয়ে বারান্দায় চলে গেল। তারপর ওখানেই দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। এবং একসময় ঘুমিয়েও গেল!
আধার ঘুমায়নি। সে উঠে বারান্দায় এসে ঘুমন্ত মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে রুমে গেল। নরম বিছানায় সাবধানে শুয়ে দিয়ে ঝুঁকে এসে কপালের মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমার সব প্রশ্নের উত্তর ও নিজের অবাধ্য অনুভূতির সম্পর্কে জানতে হলেও, আমাদের ক্ষণিকের জন্য দূরত্ব প্রয়োজন।”

একথা বলে আবারো ঠোঁট ছোঁয়াল মেয়েটার কপালে৷ সরে যাওয়ার সময় অনুভব করল, আলো ঘুমের ঘোরেই একহাতে তার টি-শার্টের গলা খামচে ধরেছে। রক্তিম ঠোঁট নাড়িয়ে কী যেন বিরবির করে বলছে। আধার অপলক নয়নে মাসুম চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি মেয়েটার লালচে ঠোঁটের দিকে নিবদ্ধ। সে বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে মেয়েটার কোমল ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। এই বেয়াদব ঠোঁট জোড়া তাকে অনেকবার ছুঁয়েছে। আচ্ছা? সে যদি এখন একটু ছুঁয়ে দেয়, তাহলে কী খুব বেশি অন্যায় হয়ে যাবে?
কোনো জবাব পেল না আধার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সহসাই মেয়েটার দুগাল চেপে ধরে, মাথা নিচু করে ঠোঁটের মাঝে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। মূহুর্তেই সে এক অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেল৷
ঘুমন্ত অবস্থায় আলো শ্বাস নিতে না পেরে দু’হাতে চাদর খামচে ধরে ছটফটিয়ে উঠল। এটা টের পেতেই আধার চট করে মেয়েটার ওষ্ঠদ্বয় ছেড়ে, ভেজা ঠোঁট মুছে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
আলোর ঘুম পুরোপুরি ভেঙে যেতেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে হাঁপাতে লাগল। বুকের কাছটায় জামা খামচে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তার হঠাৎ করে এমন কেন হচ্ছে? মনে হচ্ছিল, কেউ তার নিঃশ্বাস আটকিয়ে রেখেছিল। তখনই খেয়াল করল সে রুমে। আর ওয়াশরুম থেকে স্যারকে বের হতে দেখে আলো বালিশ ছুঁড়ে মে’রে চিল্লিয়ে উঠল,
-“আপনি আবার আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে—নাকমুখ চেপে ধরে মে’রে ফেলার প্ল্যান করেছিলেন তাই না?”
আধার ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার রক্তিম, ফুলে ওঠা ঠোঁটের দিকে তাকায়। তার বলতে ইচ্ছে করছিল, “হ্যাঁ, আজ তোমার ঘুমের একটু হলেও সুযোগ নিয়েছি৷ তবে তোমাকে মে’রে ফেলার জন্য নয়, বরং নিজের তৃষার্থ মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য!”
তবে মুখে বলল,

-“কোনো প্রমাণ আছে? বা তুমি আমাকে দেখেছো, নিজের নাকমুখ চেপে ধরে রাখতে?”
আলো দমে গেল। আসলেই তো, সে দেখেনি তো এমনকিছু। নিজের মাথা চুলকিয়ে বিরবির করে বলল,
-“তাহলে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস এমন অস্বাভাবিক হলো কেন?”
আধার ফ্লোর থেকে বালিশ তুলে বিছানায় রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“উমমম…হতে পারে স্বপ্নে কেউ তোমার নাকমুখ চেপে ধরেছিল। তাই এমনটা মনে হচ্ছে!”
-“স্বপ্নে আবার কে ধরবে? নিশ্চয়ই আপনি ধরেছেন। কারণ এখন তো আপনি আমার থেকে মুক্তি চান!”
আধার কিছু না বলে আলোর পাশে এসে শুয়ে পড়ল। তারপর মেয়েটাকে টেনে নিজের বুকের ওপর নিয়ে আসতেই, আলো সরে গিয়ে বলল,
-“আমি আর আপনার বুকে কখনো থাকব না।”
আধার কপাল কুঁচকে আবারো মেয়েটাকে টেনে বুকের ওপর নিয়ে এল। কিন্তু আলো একপ্রকার যুদ্ধ করেই নিজেকে সরিয়ে নিল। ঠিক তখনই অনুভব করল, তার শরীরের ওপর অসভ্য লোকটা নিজেই উঠে এসেছে। আধার ঘাড়ে মুখ গুঁজে শান্ত গলায় বলল,
-“ঠিক আছে, তুমি আমার বুকে না থাকো। কিন্তু আমি তোমার বুকে থাকব!”
আলো কান্না আটকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“ক-কেন?”
আধার বুকের ওপর মাথা রেখে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“কারণ আমি এখানে শান্তি পাই। খুব শান্তি পাই! ঠিক যেমনটা আমি আমার মায়ের বুকে মাথা রেখে পেতাম।”
আলো প্রতিত্তোরে কিছু না বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। দু’হাতে মানুষটাকে এলোপাতাড়ি মা’রতে মা’রতে চিৎকার করে বলে উঠল,

-“আ…আপনি এমন কেন? আমাকে কী আপনার মানুষ মনে হয় না? সবসময় নিজ মন মতো চলবেন? আপনি নিজ থেকে আমার কাছে আসবেন, আবার হঠাৎই বলবেন দূরে থাকতে। আমি দূরে থাকতে চাইলে, আপনি আবারো আমার কাছে আসবেন। অথচ আমি আপনার কাছে একটু গেলে আপনি বিরক্ত হোন! না আমাকে সহ্য করতে পারেন, আর না আমাকে ফেলতে পারেন। আপনি আসলেই কী চান বলুন তো? নাকি এইভাবেই আমাকে কষ্ট দিয়ে শেষ করে দিতে চান?”
আধার চোখ বুজে নিল। তার আসলেই কি চাই, সেটা ও নিজেই বুঝতে পারছে না। তবে এইটুকু ঠিকই উপলব্ধি করতে পারছে, তার হৃদয়ে কিছু-মিছু একটা হয়েছে। নয়তো তার বেহায়া মনটা কেন বারবার মেয়েটার কাছে আসতে চাচ্ছে? এসব তো আগে কখনো হয়নি! সে যথেষ্ট ধৈর্য্যবান পুরুষ। তাহলে এখন কেন সে অধৈর্য্য হচ্ছে? তবে কি সে সত্যি সত্যিই মেয়েটাকে….
আর ভাবতে পারল না আধার। তড়িঘড়ি করে মেয়েটার ওপর থেকে সরে গেল এবং বিছানা থেকে নেমে আলমারি খুলে নিজের পোশাক বের করে ব্যাগে ভরতে লাগল। তার মনের সকল প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু একজনের কাছেই পাওয়া যাবে। আর সেটা হচ্ছে তার দাদাজান। যাকে সে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করে।

-“কোথায় যাচ্ছেন?”
-“বাড়িতে।”
-“কেন?”
-“তোমাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।”
একথা বলে আধার চলে গিয়েও আবার ফিরে এসে আলোর উদ্দেশ্য বলল,
-“আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাবো, নয়তো তুমিই চলে এসো।”
আলো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“আর যদি না যাই, তাহলে?”
-“তাহলে কী? নতুন আবার আরেকটা বিয়ে করে নিবো। আর তোমার বেবি মানে টুনা, টুনিকেও তাকে দিয়ে দিবো, সাথে এই পুরো আমিটাকেও!”
কথাগুলো বলে আধার চলে যায়। সে মজা করে বললেও আলোর কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। পিছনে ফিরে বালিশে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার পুরো জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেল এক মরীচিকাকে ভালোবেসে! যার শেষ পরিণাম আদৌ কেমন হবে জানা নেই। শুধু জানে তার হৃদয়টা ভেঙেছে!

দু’দিন আলো নিজেকে রুম বন্দী করে রেখেছে। না ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছে আর না ঠিকমতো গোসল করেছে। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকে! যখন খুব বেশি খিদে লাগে তখন একটু শুকনো খাবার খায়। এই দু’দিনেই চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে। যেই মেয়েটা কথা বলে থাকতে পারত না, সেই মেয়েটাই আজ দু’দিন থেকে নিশ্চুপ। মুখের হাসি তো সেই কবেই গায়েব হয়েছে। স্যার ওইদিন চলে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি। তাকে নিতেও আসেনি। আর সেও নিজ থেকে যাওয়া কিংবা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। নিজেকে আর কত ছোট করবে? কম তো হলো না। এখন না-হয় নিজেকে নিয়েই ভাবা যাক!
আজ মেঘলা আলোকে রুম থেকে টেনেটুনে নিয়ে এসেছে। মেয়েটাকে বকতে বকতে, ড্রয়িংরুমে নিয়ে এসে সোফায় বসিয়ে দিল। মাথার চুলের অবস্থা খারাপ! জোট বাঁধিয়ে ফেলেছে। মেয়েটার এমন ছন্নছাড়া রূপ দেখে মেঘলা মাথায় তেল দিয়ে দিতে দিতে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“বর কে মিস করছিস?”
আলো সোজাসাপ্টা জবাব দিল, -“না!”
-“তাহলে নিজের হাল এমন করেছিস কেন?”
-“অলস হয়েছি, তাই নিজের যত্ন নিতে ভালো লাগছে না।”
-“সমস্যা নেই, আমি আছি না? আমি তোরে যত্ন করে দিবো।”
আলো কিছু বলল না। আলেয়া রহমান মেয়ের জন্য হালিম তৈরি করেছে। দুটো হালিমের বাটি নিয়ে এসে টি-টেবিলের ওপর রাখল। আলোর নজর যেতেই মনে পড়ল, খান বাড়িতে থাকাকালীন আধার স্যারও তাকে নিজ হাতে হালিম বানিয়ে খাওয়ায় ছিল। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
-“আমি খাবো না মা। তুমি আমার ভাগেরটা নিয়ে যাও।”
আলেয়া রহমান গম্ভীর মুখে বললেন,
-“না খেয়ে খেয়ে শরীরটার কী অবস্থা করেছো?”
আলো বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
-“দুই বেলা না খেলে কেউ ম’রে যায় না।”
আলেয়া রহমান রেগেমেগে কিছু বলতে যাবেন, তখনই মেঘলা ইশারা করে থামিয়ে দিল উনাকে। তারপর বলল,
-“ওর যখন ইচ্ছে করবে, তখন খেয়ে নিবেনি মামণি।”
আলেয়া রহমান সেখান থেকে চলে গেলেন। মেঘলা যত্নের সাথে মাথায় তেল দিয়ে চুলগুলো দুই দিকে বিনুনি করে দিল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আজ বিকেলে তোর ভাইয়ের সাথে ঘুরতে যাবো, তুই যাবি?”
-“না।”
-“কেন?”
-“তোমাদের মাঝে আমি গিয়ে কী করব।”
-“কী করবি আবার? বসে থেকে আমাদের রোমাঞ্চ দেখবি।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“আমার দেখার এত শখ নেই।”
-“অন্যের প্রেম দেখার শখ থাকবে কেন? তুই তো নিজেই স্বামীর আদর খেয়ে পোটলা হয়ে আছিস!”
আলো মনে মনে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

-“আদর? উনি আমাকে একটু ছুঁতে এত দ্বিধা, এত আপত্তি, এত অস্বস্তি অনুভব করে, তিনি আবার আমাকে আদর করবে? অসম্ভব! উনি পারলে উনার কাছে এই আমিটাকেও ঘেঁষতে দিবে না। সেখানে আদর করাটা বিলাসিতা।”
বিকেলের দিকে আলোকে কোনোমতে রাজি করিয়ে নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছে মেঘলা। ছায়া, মায়া বান্ধবীদের বাসায় গিয়েছে, তাই তাদের নিতে পারেনি। পরবর্তীতে পরিবারের সবাই মিলে একসাথে ঘুরতে বেরোবে।
ড্রাইভিং সিটে রহিত বসে থেকে কার ড্রাইভ করছে আর পাশে বসা রমণীকে আড়চোখে দেখছে৷ মেঘলা আইসক্রিম খাচ্ছে আর ব্যাক সিটে বসা আলোর সাথে গল্প করছে। ঘুরতে এসে আলোর মনটা একটু ভালো হয়েছে। সে-ও আইসক্রিম খেতে খেতে ভাবী ওরফে বড় আপুর সাথে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। ঠিক তখনই তার নজর বাহিরে যায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে রহিত ভাইয়াকে গাড়ি থামাতে বলে।

আলো একদৃষ্টিতে রাস্তার ওই পাশে তাকিয়ে আছে। যেখানে আধার স্যার দাঁড়িয়ে থেকে একজন রমণীর সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। মেয়েটাও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। দুজনকে একসাথে দারুণ মানিয়েছে, আর মেয়েটাও সবদিক থেকে মাশাআল্লাহ! তার থেকে বহুগুণ সুন্দরী এবং স্মার্ট। দেখতে শান্তশিষ্ট, ভদ্রও লাগছে। আলো আনমনে হেঁসে হাতের অর্ধেক আইসক্রিমটা জানলার বাইরে ফেলে দিয়ে বড় ভাইয়াকে গাড়ি স্টার্ট করতে বলল। তারপর সিটে মাথাটা ঠেকিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। অথচ তার বুকের ভেতরটা কেমন একটা করছে। স্যারের ওইদিন বলা কথাগুলো বারবার কানের কাছে ঘুরপাক খাচ্ছে! তাহলে কী মানুষটা সত্যি সত্যিই তাকে ভুলে যাচ্ছে? কই এর আগে তো কখনো তার সাথে এইভাবে হেঁসে হেঁসে কথা বলেনি? এমনকি কোনো মেয়ের আশেপাশেও যায়নি। অথচ আজ মানুষটা ওই মেয়েটার সাথে কি নির্দ্বিধায় হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। তাও এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকে। এসব ভাবতেই আলোর এক চোখে বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে নিয়ে জানালার বাইরে খোলা আকাশের দিকে তাকাল।

-“এটাই তাহলে তোমার শ্যামা পাখি?”
আধার মুচকি হেঁসে মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে। মিরা হেঁসে উঠে ফোনে থাকা হাস্যজ্জল রমণীর ছবিটা জুম করে দেখতে দেখতে বলল,
-“পুঁচকে মেয়ে হলেও কিন্তু তোমার সাথে দারুণ মানিয়েছে ভাইয়া। তা, তোমার বউয়ের সাথে কবে আমাকে দেখা করাবে হুহ্? আমি কিন্তু এই পিচ্চিকে ভাবী বলে ডাকতে পারব না। তাহলে আমার শরম করবে।”
আধার গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে, দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে শান্ত গলায় বলল,
-“আপাতত এখন ও ওর বাবার বাড়িতে রয়েছে। আগামীকাল যাবো নিয়ে আসতে। তুই তোর ভাইকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আছিস। ওই বেয়াদবটা দেশে ফেরার পর তো আমার সাথে দেখাই করেনি। শুধু ফোনে কথা হয়েছে।”
-“বড় ভাইয়া প্রচুর ব্যস্ত মানুষ। আমাকেও সময় দেয় না। সারাক্ষণ এখানে সেখানে দৌড়ে বেড়ায়!”
-“গায়ক বলে কথা। একটুআধটু তো ব্যস্ত থাকবেই!”
মিরা ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“তোমার তো এই বিয়ে, ভালোবাসা, প্রেমে ফোবিয়া ছিল। তাহলে এখন এসব কীভাবে হলো?”
আধার ফোনটা নিয়ে আলোর ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“বিয়ে তো শুধুমাত্র দাদাজানের জন্য করেছি।”
-“মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, আলোকে ভালোবাসো না?”
আধার আনমনে হেঁসে বলল,
-“ভালোবাসলে যদি আবার তাকে হারিয়ে ফেলি তখন?”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“তোমার অতীত নিয়ে আমি কিছু বলব না ভাইয়া। কারণ এই ভালোবাসার জন্যই আমার ভাইটা না ম’রে বেঁচে আছে। তবে সবাই তো বেইমান নয়! আর তোমার অতীতে যা যা হয়েছে, সেগুলো যে বর্তমানে আবারো হবে সেটাও তো না। আই নো, তুমি ভালোবাসতে ভয় পাও। শুধু ভাবো, ভালোবাসলেই বুঝি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তুমি তো দাদাজানকে ভালোবাসো৷ উনি কি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে? তাহলে তুমি ওই মেয়েটাকে কেন ভালোবাসছো না? একবার নিজের ভয়কে কাটিয়ে একটু ভালোবেসে দেখো, ভাইয়া। তখন বুঝবে আসল ভালোবাসা ঠিক কতটা শান্তির।”
আধার ফোন পকেটে ভরে কপাল কুঁচকে বলল,
-“এসব ভালোবাসার জ্ঞান আমাকে না দিয়ে তোর ভাইকে দে। ওরেও যতদ্রুত সম্ভব বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কর! নয়তো সারাজীবন দেবদাস হয়ে থাকবে।”
-“কম তো চেষ্টা করছি না ভাইয়া। কিন্তু কী করব বলো? বড় ভাইয়া কিছুতেই ওই ছলনাময়ীকে ভুলতে পারছে না। আর না নিজের আশেপাশে কোনো মেয়েকে ঘেঁষতে দেয়।”
আধার তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

-“এইজন্যই আমি ভালোবাসতে বিশ্বাস করি না। এটা শুধু মানুষকে ধ্বংসই করতে পারে। যেমনটা আমার আদরের একমাত্র বোনকে শেষ করে দিয়েছে!”
মিরা হেঁসে বলল,
-“আর এখন তোমার পালা।”
আধার হেঁসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলে উঠল,
-“আধার খান কখনো কাউকে ভালোবাসবেই না।”
-“নিজের বউকেও না?”
মিরার কথা শুনে আধার চুপ হয়ে গেল। এটা দেখে মেয়েটা শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“তুমি মানো বা না মানো, বাট আই অ্যাম শিওর! তুমি একটু হলেও ওই মেয়েটার প্রেমে পড়েছো। শুধু এটা মানতে চাচ্ছো না, আর না নিজের মুখে স্বীকার করছো।”
আধার বিরক্তিতে বলল,
-“এমন কিছুই না!”
মিরা মুখ ভেংচি কেটে বলল,
-“সেটা দেখা যাবে—ভবিষ্যতে, হুম।”

রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করে এসে আলো গাড়িতে উঠে বসল। মেঘলা উঠে বসতেই রহিত আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“কানে ইয়ারফুন গুঁজে, চোখ বন্ধ করে থাক পাক্কা ত্রিশ মিনিট।”
আলো ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
-“কেন?”
-“তোর আপুকে চুমু খাব তাই।”
ভাইয়ের কথা শুনে আলো খুকখুক করে কেশে উঠে তড়িঘড়ি করে কানে ইয়ারফুন গুঁজে, চেহারার সামনে ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে চোখদুটো বন্ধ করে নিয়ে বলল,
-“এবার ঠিক আছে?”
রহিত হেঁসে বলল,
-“একদম পারফেক্ট।”
অন্যদিকে মেঘলা কয়েকটা ধুমাধুম বসিয়ে দিল স্বামীর পিঠে। রহিত হাসতে হাসতে মেয়েটাকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। গাড়ির ভেতরের আলো নিভিয়ে শাড়ির আঁচল ভেদ করে কোমর চেপে ধরতেই মেঘলা হাসফাস করে বলল,
-“এটা কিন্তু ঠিক নয়! মেয়েটা এখন কী ভাবছে!”
-“হুঁশশশ! ও কিছু মাইন্ড করেনি। আর তুই আমার প্রেমিকা না, বউ হস আমার। সবার সামনে তিন কবুল বলে তোকে বিয়ে করেছি। তোর উপর সম্পূর্ণ হালাল অধিকার রয়েছে আমার!”
মেঘলা কি বলবে বুঝতে পারল না। তাকে আর কিছু বলার সুযোগও দিল না রহিত! সে পরম আবেশে প্রিয়তমার ওষ্ঠপুট নিজের দখলে নিয়ে নিল।
দীর্ঘক্ষণ এক চুম্বনের পর ওষ্ঠদ্বয় ছেড়ে আলতো করে কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখল রহিত। দুজনেই হাঁপাচ্ছে। মেঘলা লাজুক হেঁসে চোখ বুজে নিল। রহিত কপালে, গালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তোরে অনেক ভালোবাসি মেঘ!”
মেঘলার রক্তিম, ফুলে ওঠা ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে-ও ফিসফিস করে বলল,
-“আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি রহিত।”
প্রাপ্তির হাসি হাসল রহিত। সে আরেকটুখানি ভালোবাসার মানুষটিকে আদর করে দিয়ে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসে থাকল

-“এখন চলো, অনেক রাত হয়ে এসেছে৷ সবাই চিন্তা করবে তো।”
রহিত মেঘলাকে ছেড়ে দিল। মেয়েটা সিটে এসে নিজের পরণের এলোমেলো হয়ে যাওয়া শাড়িটা ঠিক করে নিল। রহিত আলো জ্বালিয়ে পিছনে তাকায়। হাত বাড়িয়ে বোনের চেহারা থেকে ওড়না সরিয়ে দেখে, আলো ঘুমিয়ে গেছে। রহিত কিছু না বলে কান থেকে ইয়ারফুন খুলে রেখে দিল। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই আলোর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমু ঘুমু চোখে আশেপাশে তাকায়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে চুপচাপ নিজের হাতের চুড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকল।
-“বুঝলে রহিত? আমার ননদিনী তার স্বামীকে প্রচুর মিস করছে। তাই তো বারবার স্বামীর দেওয়া চুড়ি দেখছে!”
একথা বলে ঠোঁট টিপে হাসল মেঘলা। রহিত লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে বলল,
-“তুই চাইলে, আমি এখনই তোকে খান বাড়িতে নিয়ে যেতে পারি। যাবি?”
-“আমাকে বিরক্ত না করে নিজের বউকে বিরক্ত করো। আর আমি কোথাও যাচ্ছি না। চুপচাপ বাড়িতে চলো।”

রহিত ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আর কিছু বলল না। গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে ছুটে চললো নির্জন রাস্তা দিয়ে। ঠিক তখনই ঘটে গেল এক অঘটন!
এক বিশাল বড় ট্রাক এলোমেলোভাবে ধেয়ে আসছে। হয়তো গাড়ির ড্রাইভার নেশাগ্রস্ত! তাই তো এমনভাবে ড্রাইভ করছে। রহিত চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে যাবে, ঠিক তখনই ট্রাক-টি সজোরে ধাক্কা মে’রে দিল তাদের গাড়িতে।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩০

সঙ্গে সঙ্গে কালো রঙা গাড়িটা উল্টেপাল্টে দুমড়েমুচড়ে গেল। ধাক্কাটা এতোটাই জোরে ছিল যে গাড়িটা উল্টো হয়ে বিকট শব্দ তুলে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। মূহুর্তেই ভেঙেচুরে যাওয়া জানালার মাঝে, একখানা চুড়ি পরিহিত র’ক্তা’ক্ত হাত অবহেলায় আছড়ে পড়ল…

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩২

1 COMMENT

Comments are closed.