এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩২
নুসরাত ফারিয়া
আধার আজ ভার্সিটি শেষে শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সে ওইদিন যেতে পারেনি! কারণ দাদাজান গ্রাম থেকে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাই সে আলোকে নিতে আসতে পারেনি। আর ওই বজ্জাত মেয়েটাও খান বাড়িতে যায়নি, এমনকি ভার্সিটিতেও আসেনি। সে কল দিয়েছিল গতকাল, কিন্তু কেউ কল ধরেনি। আর না পরবর্তীতে তাকে কল দেওয়া হয়েছে। তিন দিন পর অবশেষে সে তার বউয়ের কাছে যাচ্ছে। আধার মনে মনে ভেবে নিয়েছে, ওখানে গিয়ে মেয়েটাকে কয়েকটা কথা শোনাবে! সাথে কান দুটোও মলে দিবে। সে না-হয় আসতে পারেনি, তাই বলে কী মেয়েটাও ফিরবে না? এই পাঁজি মেয়েটা দিনদিন আরো ঘাড়ত্যাড়া হয়ে যাচ্ছে। এইটাকে তাড়াতাড়ি সোজা করতে হবে। নয়তো ভবিষ্যতে তাকে আরো জ্বালিয়ে খাবে।
আধার এসব ভেবে আনমনে হাসল। মাত্র পাঁচ দিন মেয়েটাকে দেখেনি, অথচ তার মনে হচ্ছে পাঁচ বছর ধরে দেখেনি। আধার আসার পথে ফুলের দোকান থেকে দোলনচাঁপা ফুল নিয়েছে। এটা নাকি মেয়েটার প্রিয় ফুল! আধার ঠোঁট কামড়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রহমান বাড়ির গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। গাড়ি থেকে নামতেই তার নজর সর্বপ্রথম গেল—বাগানে থাকা একটি কবরের ওপর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সদ্য কাউকে কবর দেওয়া হয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত এই দৃশ্যটা দেখে আধার কয়েক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এই কবরটা তো এখানে ছিল না! তাহলে এখন কীভাবে এল? আর কাকে কবর দেওয়া হয়েছে? এই পাঁচ দিনের মধ্যে এমন কী ঘটেছে? তাকে কেউ কিছু বলেনি কেন?
আধারের হৃদয়টা কেমন করে উঠল। সে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতর যেতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ড এসে জানালেন, ভেতরে কেউ নেই। আধার থেমে গিয়ে পিছনে ফিরে সিকিউরিটি গার্ডকে ওই কবরটা দেখিয়ে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,
-“ও…ওটা কার কবর?”
রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-“এই বাড়ির একমাত্র ছেলের।”
মূহুর্তেই আধারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এই বাড়ির একমাত্র ছেলে মানে—রহিত! কিন্তু…কিন্তু এসব কীভাবে হলো? কয়দিন আগেই না ছেলেটার বিয়ে হলো? তাহলে এখন এ-সব….
আধার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“এটা কীভাবে হয়েছে? আর বাড়ির সবাই কোথায়?”
-“তিন দিন আগে রহিত বাবা তার বউকে নিয়ে ঘুরতে গেছিল। রাতে ফেরার পথে ভয়ানক একটা এক্সিডেন্ট হয়। আর…আর রহিত বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ম..মা-রা যায়! পরিবারের সবাই সিটি হাসপাতালে আছে।”
আধার আর দাঁড়াল না, গাড়ি নিয়ে মূহুর্তেই ছুটে গেল হাসপাতালে উদ্দেশ্যে। ছেলেটার অকাল মৃ’ত্যুতে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই কত খুশি ছিল, নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বউ হিসেবে পাওয়ার জন্য। অথচ এক ঝটকায় সবকিছু শেষ হয়ে গেল। ছেলেটার আর প্রিয় মানুষটির সাথে সংসার করা হলো না!
সিটি হাসপাতালে পৌঁছে ইনফরমেশন ডেস্ক থেকে খোঁজ নিয়ে, আইসিইউর দিকে বড় বড় পা ফেলে যায় আধার। কিছুদূর এগিয়ে আসতেই দেখতে পেল, সবাই রুমের বাইরে থম মে’রে বসে আছে। আধারের এলোমেলো দৃষ্টি আলোকে খুঁজে চললো। কিন্তু মেয়েটাকে কোথাও দেখতে পেল না। আচ্ছা, ওই মেয়েটা কোথায় গেছে?
আধারকে এখানে দেখেও কেউ কিছু বলল না। আধার কী বলবে ভাষা খুঁজে পেল না। সে নিজেই তো শকড! এমন কিছু হতে পারে, সেটা কখনো কল্পনাও করেনি। তবুও সে নিজেকে সামলিয়ে আস্তেধীরে হেঁটে ছায়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়৷ তারপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার আপু কোথায়? না মানে, তাকে দেখছি না যে!”
দুলাভাইয়ের কথা শুনে ছায়ার চোখদুটো ভরে উঠল। সে কোনোমতে নিজের কান্নাকে গিলে খেয়ে বলল,
-“আসুন, আমার সাথে!”
আধার কপাল কুঁচকে মেয়েটার সাথে যেতে শুরু করল। আরেকটি আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে, আঙুল তুলে অবজারভেশন উইন্ডোর দিকে ইশারা করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“ও…ওই য-যে আমার আ-আপু, ওখানে!”
আধার চমকে উঠে সেদিকে তাকায় এবং সঙ্গে সঙ্গে চারশো চার বোল্ডের ঝটকা খেল। কেবিনের ভেতর বেডের ওপর নিস্তব্ধ হয়ে, শুয়ে আছে আলো! মেয়েটার মাথা, হাতপা থেকে শুরু করে সব জায়গায় ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা। মুখে অক্সিজেনের মাক্স, একহাতে র’ক্ত ও অন্য হাতে স্যালাইন চলছে। পাশেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে! হার্টবিট মাপার মেশিনে মেয়েটার হার্টবিট কম।
আলোকে এই অবস্থায় দেখে আধার ঠোঁট কামড়ে ধরল। অনুভব করতে পারছে, তার বুকের ভেতরে অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেউ হৃদয়টা খামচে ধরেছে! সে তো মেয়েটাকে সুস্থ অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, তাহলে এখন কেন মেয়েটার এই করুণ অবস্থা?
-“গ-গাড়িতে শুধু ভা-ভাইয়া আর ভাবী ছিল না। আ-আপুও ছিল! ত-তিন দিন হয়ে যাচ্ছে, অথচ আপুর জ্ঞান ফেরেনি।”
ছায়ার কথা শুনে আধার এক হাতে মাথা চেপে ধরে দেয়ালে হাত রাখল। মেয়েটা হাসপাতালে তিনদিন ধরে মৃ’ত্যুর সাথে লড়াই করছে, অথচ সে কি-না আরামে বাড়িতে বসে ছিল? একবারের জন্যও কারোর থেকে সামান্য খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেনি! উল্টো মেয়েটাকে মনে মনে বকে এসেছে।
আধার জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না, তার যে কষ্ট হচ্ছে! খুব, খুব কষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে কারোর চিৎকারের আওয়াজ শুনে চমকে উঠল। গলাটা বেশ পরিচিত মনে হলো। সে আর ছায়া তড়িঘড়ি করে আগের আইসিইউর দিকে গেল।
কেবিনের ভেতর থেকে দু’জন ওয়ার্ড বয় নিঃশব্দে স্ট্রেচারে করে মেঘলার নিথর, ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে নিয়ে এসে পরিবারের সবার সামনে রাখল। কেউ একজন ধীর হাতে চেহারার ওপর থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে দিতেই আর্তনাদ করে উঠলেন মিসেস রাজিয়া শেখ। নিজের আদরের মেয়ের ক্ষতবিক্ষত নিস্প্রাণ মুখটা দেখে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। মেঘলার শীতল দেহটাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। আর সেই কান্নায় হাসপাতালের করিডোরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
দীর্ঘ তিনদিনের অসম লড়াই আর অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে আজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে মেঘলা। অথচ, তারা স্বামী-স্ত্রী কেউই জানল না একে অপরের মৃ’ত্যুর কথা! মেয়েটার হাতের মেহেদী মুছে যাওয়ার আগেই—সে নিজেই এই দুনিয়া থেকে মুছে গেল।
মূহুর্তেই হাসপাতালে কান্নার রল পরে যায়। আধার স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। তার শূন্য চোখের দৃষ্টি মেঘলার মুখশ্রীর দিকে নিবদ্ধ। এমনই একটা দিনে তো, তার বোনটাও এইভাবে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শুধু পরিস্থিতিটা আলাদা ছিল! চোখের সামনে অতীতের কিছু দৃশ্য ভেসে উঠতেই আধার দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল।
সে মানতে পারছে না, রহিত ও মেঘলার মৃ’ত্যু! সে একটু হলেও তো এদের সাথে মিশেছে৷ এই পরিবারের সবার সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। অথচ একটা সুন্দর পরিবার এক মূহুর্তের মধ্যে ভেঙে গেল।
-“ডক্টর…ডক্টর…ডক্টর!”
একজন নার্স হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে আর ডাক্তারকে ডাকছে। ডাক্তার এগিয়ে এলে নার্সটি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
-“আইসিউ-এর ওই পেসেন্টের অবস্থা খারাপ, উনার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।”
একথা শোনা মাত্র আলেয়া রহমান জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। মতিউর রহমান নিজের বুক চেপে ধরে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লেন। মাহবুব রহমান ও নীলিমা রহমান ছেলে, বউমাকে হারিয়ে আগে থেকেই ভেঙে পড়েছিলেন। এখন আবার আরেকজনকে হারাতে বসে, তারা নিজেদের সামলাতে পারলেন না। ফ্লোরের মাঝে বসে নীলিমা রহমান হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বিলাপ করতে শুরু করলেন৷ তাদের সুখের পরিবারটা শেষ হয়ে গেল৷ ছায়া, মায়া এত এত শোক সইতে পারল না। মূহুর্তেই দুই বোন শক্ত মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ওইদিকে মাহিন পাথর হয়ে আছে! বোন, ভাইকে হারিয়ে ছেলেটা কথা বলতেও ভুলে গেছে। এখন আবার আরেক বোনকে হারাতে চলেছে…সে নিজের কষ্টকে চেপে রেখে পরিবারের সবাইকে সামলানোর চেষ্টা করল আর ছায়া, মায়াকে দ্রুত কেবিনে শিফট করিয়ে দিল।
ডাক্তারের পিছু পিছু আধারও ছুটে এসেছে। তার ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি না থাকলেও বাইরে অবজারভেশন উইন্ডোর সামনে দাঁড়িয়েছে। একহাত গ্লাসের মাঝে রেখে অন্য হাতে নিজের বুকটা চেপে ধরল। বাইরে রিসিপশনের ভিড় আর কোলাহল থাকলেও আইসিইউর গ্লাসের এপাশে সব থমকে আছে। মনিটরের সবুজ রেখাটা এখন আর আগের মতো নাচছে না, বরং ক্লান্ত হয়ে ধীর পায়ে এগোচ্ছে। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল—ডিজিটাল স্ক্রিনে সংখ্যাটা দ্রুত কমছে… ৪২… ৩৮… ৩৫।
ডাক্তার দ্রুত আলোর চোখের মণি আর পালস চেক করে নার্সের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বললেন,
-“ডিফিব্রিলেটরটা নিয়ে আসুন, জলদি!”
মুহূর্তের মধ্যে নার্স মেশিনটি এগিয়ে দিলেন। প্যাডেল দুটিতে জেল মেখে ঘষে নিয়ে ডক্টর আলোর বুকের নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করলেন। উচ্চ ভোল্টেজের সেই বৈদ্যুতিক শক স্পর্শ করা মাত্রই আলোর নিথর শরীরটা একবার ঝটকা দিয়ে সজোরে বিছানা থেকে ওপরে উঠে এল। মেশিন সরাতেই নিস্তেজ শরীরটা আবার বেডের ওপর আছড়ে পড়ল।
ডক্টর মনিটরের দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও একই প্রক্রিয়ায় শক দিলেন। যান্ত্রিক সেই শব্দের সাথে মেয়েটার ছোট্ট শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। কয়েকবার চেষ্টার পর একসময় মনিটরের সেই সোজা হয়ে যাওয়া রেখাটা হঠাৎ মৃদু কেঁপে উঠল। একটা ছন্দ ফিরে আসতেই কেবিনে উপস্থিত সবার চোখেমুখে দীর্ঘক্ষণ পর স্বস্তির আভা দেখা দিল। তবে আলোর হৃদস্পন্দন এখনো স্বাভাবিক নয়, অত্যন্ত ক্ষীণ আর ধীর লয়ে তার হার্ট বিট করতে শুরু করেছে। মৃ’ত্যুর দুয়ার থেকে মেয়েটা ফিরে এলেও বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ডক্টর একটা ইনজেকশন পুশ করে আবারো পেসেন্টকে চেক-আপ করে নার্সকে কিছু বলে, বেরিয়ে এলেন। উনাকে দেখা মাত্রই আধার এলোমেলো পায়ে এগিয়ে এসে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,
-“ও…বাঁচবে তো ডক্টর? নাকি সবার মতো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, ওই নিষ্ঠুর আকাশের বুকে??”
ডাক্তার সাহেব আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-“আমি এখন শিওর কিছু বলতে পারছি না। কারণ উনার লাইফ রিক্সে রয়েছে। উনি গাড়ির ব্যাক সিটে থাকলেও মাথায় বেশ গুরুতর ভাবে আঘাত পেয়েছে। এই মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলেই মেঘলা নামের পেসেন্টের মৃ’ত্যু হয়েছে৷ আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি উনাকে বাঁচাতে! কিন্তু শেষমেশ আমাদের হাতে কিছু ছিল না৷ এখন ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করুন, এই পেসেন্টের যেন জ্ঞান ফিরে এবং হার্ট বিট অস্বাভাবিক না হয়। আরেকবার যদি এমন হয়, তাহলে উনাকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ দ্বিতীয় বার উনার শরীর বৈদ্যুতিক শক নেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়!”
কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে যায় ওখান থেকে। আধার পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত কথাগুলো হজম করল। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহনিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল। পাশেই একটা মসজিদ রয়েছে। সে ওজু করে জুতো খুলে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। তারপর মিহরাবের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে, ছলছল চোখে তাকিয়ে থেকে অভিযোগের সুরে বলে উঠল,
-“কেন? কেন তুমি বারবার আমার সাথে এমনটা করো? প্রথমে আমার পুরো পরিবারকে কেঁড়ে নিলে! তাদেরকে না-হয় আমি খুব ভালোবাসতাম, তাই আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছো। কিন্তু….কিন্তু ওই মেয়েটাকে তো আমি ভালোবাসি না, তাহলে কেন তুমি ওকে কেঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছো? এই হারানোর ভয়ে তারে আমি ভালো বাসলাম না, অথচ তুমি আজ আবারো আমার সেই ভয়টাকে সত্য করে দিলা। আমার ভাগ্য কী এতটাই খারাপ? আমি কি একটুও সুখ, শান্তি, ভালোবাসা ডিজার্ভ করি না? আমি তো তারে আমার জীবনে চাইনি, এই তুমিই আমার জীবনে তাকে এনে দিয়েছো। আর এখন এই তুমিটাই তাকে কেঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছো। ওই মেয়েটাকে যদি নেওয়ারই হতো, তাহলে কেন আমার ভাগ্যের সাথে জড়ালে?
আমার সাথে এতকিছু করার পরেও আমি তোমাকে ভুলিনি, সবসময় চেষ্টা করেছি তোমার ইবাদত পালন করার। নিজের খারাপ ভাগ্য মনে করে, সব মেনে নিয়েছিলাম। ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে গুমরে ম’রি! আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই। আচ্ছা, একটুও কি আমার উপর তোমার মায়াদয়া হয়না? তোমার এই বান্দা নিজের প্রিয়জনদের হারাতে হারাতে ক্লান্ত! বড্ড ক্লান্ত। আমি আর এই যন্ত্রণা সইতে পারব না। এবার অন্তত রেহাই দাও আমাকে। নয়তো আমাকেই নিজের কাছে নিয়ে যাও। তবুও আলোকে আধারের জীবন থেকে কেঁড়ে নিও না। ওই পাগল মেয়েটাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না, ওকে চাই আমার। তুমি এইভাবে আমার বউকে ছিনিয়ে নিতে পারো না, আমি দিবো না তাকে। একটুও দিবো না!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আধার৷ হাতের বাহুতে মুখ লুকিয়ে কেঁদে দিল। কেউ জানি বলেছিল, পুরুষদের কাঁদতে নেই! অথচ আজ এক পুরুষ সবকিছু ভুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে মাথা নত করে নিজের চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে। আজ আধার খানের সকল গুমোর এক মূহুর্তেই ভেঙেচুরে শেষ!
সময় বড্ড নিষ্ঠুর! এই সময়ই কারোর জীবনে সুখ বয়ে আনে ও কারোর জীবনে দুঃখ। ভাগ্য যে কখন, কোন মূহুর্তে ঘুরে যাবে সেটা বোঝার বড়োই দায়! এই তো কিছুদিন আগেই রহমান পরিবারে কতোই না সুখ, শান্তি, আনন্দ ছিল। অথচ এক কালবৈশাখী ঝড়ের উথানে সবকিছু তচনচ করে দিয়েছে। সুখের পর দুঃখ নেমে এসেছে পুরো পরিবার জুড়ে। মৃ’ত্যু কখনো বলে কয়ে আসে না। আমরা কে কখন, কোন সময় মৃ’ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করব, সেটা কেউই বলতে পারব না। ঠিক তেমনই মেঘলা, রহিতও জানত না তাদের বিয়ের পর আর সংসার করা হবে না। তাদের যে চলার পথ এতটুকুই ছিল! তারা কী কেউ কখনো এটা ভেবেছে? উঁহু, কখনো হয়তো কল্পনাও করেনি। আমরা যেটা ভাবি, ঠিক তার উল্টোটায় ঘটে যায়। কারণ আমাদের ভাবনাচিন্তার আগেই ওপরওয়ালা সবকিছু ঠিক করে রাখেন। উনিই তো এই দুনিয়ার মালিক! আর আমরা শুধু এই সুন্দর পৃথিবীর অতিথি, তাও ক্ষনিকের জন্য।
মেঘলার মৃ’ত্যুর একদিন পর তাকে রহিতের পাশেই কবর দেওয়া হয়। দুই পরিবারের এখনো কেউ-ই এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃ’ত্যুটা মেনে নিতে পারছে না। তাদের মনে কোনো দুঃস্বপ্ন! ঘুম ভেঙে গেলেই আবার সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু….স্বপ্ন আর ভাঙল কই? এটা যে বাস্তব! আর বাস্তব যতটাই কষ্টের হোক না কেন, তবুও বুকের মাঝে পাথর চেপে রেখে মেনে নিতে হয়। কারণ আমাদের কারোর হাতেই কিছু করার নেই! আর না সার্মথ্য আছে।
আধার শশুর বাড়ির লোকের সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে সব কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে হাসপাতালে ফিরে এল। আলোর এখনো জ্ঞান ফেরেনি! তেমন কিছু উন্নতিও হয়নি। এটা নিয়ে সে গতকাল রাত থেকে বারবার মসজিদে ছুটে যাচ্ছে, আর ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছে। তার উপর যদি উনার একটু দয়া হয়! আর মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেয়৷ এছাড়া তার কিছুই চাওয়ার নেই।
আজ বড্ড মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছে আধারের। চোখদুটো কেমন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে আসছে! মনের সাথে শরীরটাও ভীষণ দূর্বল। হয়তো মানষিক চাপ আর নিতে পারছে না। আধার নিজেকে বাইরে থেকে শক্তপোক্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে। অজানা ভয় এসে হানা দিয়েছে তার হৃদয়ে। যেটার মধ্যে থেকে সে চাইলেও বেরিয়ে আসতে পারছে না।
আধার এলোমেলো পায়ে হেঁটে এসে আইসিইউর সামনে দাঁড়ায়। তার সাথে মতিউর রহমান ও মাহিন রয়েছে। আর বাকীরা সবাই অসুস্থ হয়ে বাড়িতে রয়েছেন। একটু পরই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডক্টর! আধার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আমার ওয়াইফ ঠিক আছে তো, ডক্টর?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন,
-“আই অ্যাম সরি মিস্টার খান। উই ডিড আওয়ার বেস্ট, বাট হার কন্ডিশন ইজ ভেরি ক্রিটিক্যাল। শি ইজ ইন আ কোমা নাউ!”
একথা শুনে আধার কয়েক পা পিছিয়ে গেল। মতিউর রহমান নিজের মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন। তার আদরের মেয়ে নাকি কোমায়! এটা আদৌ মেনে নেওয়া যায়? মাহিন উনাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। একের পর এক ঝটকা খেয়ে মনে হচ্ছে, এবার না সে নিজেই স্ট্রোক করে। এত কষ্ট যে আর সহ্য হচ্ছে না!
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই তেড়ে এসে দু’হাতে ডাক্তারের এপ্রনের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“মিথ্যে বলছেন, আপনি মিথ্যে বলছেন তাই না? ওই…ওই পাঁজি মেয়েটা আপনাকে এসব শিখিয়ে দিয়েছে? ও তো আমাকে জ্বালাতে খুব ভালোবাসে, তাই এমন জ’ঘন্য প্ল্যান করেছে। সাথে আপনাকেও দলে টেনে নিয়েছে, রাইট? এ্যাইইই….ডক্টর! চুপ করে আসেন কেন? কথা বলুন, আর আমাকে বলুন এসব মিথ্যে। আমার আলো কখনোই কোমায় যেতে পারে না। ও একটু কথা না বলে থাকতে পারে না, সেখানে কোমায় যাওয়া? অসম্ভব৷ এ আমি বিশ্বাস করি না!”
ডাক্তার আধারের উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললেন,
-“শান্ত হোন মিস্টার খান! আই নো, আপনার এখন মনের অবস্থাটা কেমন। বাট…এসব বললেই কী আপনার ওয়াইফ কোমা থেকে ফিরে আসবে? আর আমি অ্যাজ আ ডক্টর! সেখানে কেন আপনাকে মিথ্যে বলব? তাও এই সিরিয়াস বিষয় নিয়ে? লিসেন মি. খান! আপনার ওয়াইফ কোমায় গেলেও বেঁচে আছেন। আর উনার ঠিকঠাক ভাবে চিকিৎসা চললে একদিন না একদিন জ্ঞান ফিরে আসবে। হতে পারে একমাস, আটমাস, একবছর বা পাঁচ বছর। তবুও দিনশেষে আপনি আপনার ওয়াইফকে ফিরে পাবেন ইনশাআল্লাহ। এখন শুধু আপনাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে এবং ওপরওয়ালার প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে এই। আই হোপ, উনি আপনাকে নিরাশ করবেন না!”
ধৈর্য্য? আর আধার? সে তো ডক্টরের কথাগুলো শোনা মাত্রই জ্ঞান হারিয়েছে ফেলেছে। ফ্লোরে পড়ে যেতে নিলে ডাক্তার চমকে উঠে আধারকে ধরে, ওয়ার্ড বয়কে ডেকে স্ট্রেচারে করে পাশের কেবিনে শিফট করা হলো। এই লোকটার আবার কী হলো কে জানে!
পুরো চব্বিশ ঘন্টার পর আধারের জ্ঞান ফিরে এসেছে। সে বেড থেকে উঠে, হাতের স্যালাইন টেনেটুনে খুলে ছুঁড়ে মে’রে হনহনিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। এই মেয়েটা কীভাবে পারল তাকে ছেড়ে কোমায় চলে যেতে? একটুও কী বুক কাপলো না?
আধার সোজা আইসিইউর রুমে প্রবেশ করল। বজ্জাত মেয়েটা তাকে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে, কি আরামসে ঘুমাচ্ছে। তার বুঝি কষ্ট হচ্ছে না?
-“তুমি তো বড়োই স্বার্থপর মেয়ে বেরোলে। এইভাবে আমাকে একা করে দিয়ে কোমায় যেতে লজ্জা করল না? আরে, তোমাকে তো একটু দূরে থাকতে বলেছিলাম! তাই বলে এত দূরে সরে যাবে?”
আধার কথাগুলো বলে আলোর পাশে বসল। একদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আলতো করে মেয়েটার ডান হাত ধরে, নিজের গালে ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
-“কেন করলে এমনটা, মিসেস খান? আমি এখন কার সাথে ঝগড়া, দুষ্টুমি, রাগারাগি করব? কার চুল, জামাকাপড় ধরে টানাটানি করব? কাকে বকাবকি, কথা শোনাব? কে আমাকে রেঁধে খাওয়াবে, যত্ন করবে? রাত হলে এখন কে আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে বুকের মাঝে এসে শুয়ে থাকবে? এই আমিটাকে কে হুটহাট করে ছুঁয়ে দিবে? আমার মাইগ্রেনের ব্যথা উঠলে ম্যাসাজ করে দিবে কে? আর আমি কার কোলে মাথা রাখব? নিজের মাকে হারানোর পর, এই তোমার কোলেই মাথা রেখেছি! সাথে তোমার বুকেও। অথচ আজ থেকে তুমি, আমি কাছাকাছি থেকেও থাকব বহু দূরে। এই দূরত্ব মেনে নিতে যে, বড্ড কষ্ট হচ্ছে মিস. কালো! উমম…আলো! আমার আলো।”
আধার আনমনে হাসল। উঠে এসে মেয়েটার দিকে ঝুঁকে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
-“সরি! আমি খুব সরি। আর কখনো তোমাকে হার্ট করব না। তুমি শুধু এই পঁচা আমিটার কাছে একবার ফিরে এসো, আমি কথা দিচ্ছি কখনো তোমার মনে কষ্ট দিবো না। তবুও তুমি ফিরে এসো!”
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। আধারের এক চোখ থেকে টুপ করে অশ্রু পড়ল মেয়েটার চোখের পাতায়৷ আধার আলতো হাতে পানি মুছে দিয়ে, বন্ধ দুই চোখের পাতায় চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“সমস্যা নেই। আমি তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব। তবুও দিনশেষে এই তোমাকেই চাই আমার! শুধুই তোমাকে!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“তোমার সব দুঃখ, কষ্ট আমার হোক।”
আলোকে অন্য প্রাইভেট হাসপাতালে শিফট করা হয়েছে। এখান থেকেই মেয়েটার সব চিকিৎসা চলবে। আধার চায়নি আলো তার থেকে দূরে থাক! তাই তো সবাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের এলাকায় নিয়ে এসেছে। যাতে তার যাওয়াআসায় কোনোরকম সমস্যা না হয়। আর সে অহেতুক সময়ও নষ্ট করতে চায় না। পারলে খান বাড়িতে, নিজের বেডরুমেই এনে রাখত মেয়েটাকে।
আধার সবকিছু ঠিকঠাক করে বাড়িতে ফিরে এল। আজ ক’টা দিন ধরে বাড়িতে আসেনি, আর না ভার্সিটিতে গিয়েছে। অবশ্য নিজের সমস্যার কথা জানিয়েছে। সোবহান খান নাতবউয়ের এমন পরিস্থিতির কথা শুনে, তিনিই অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ হাসিখুশি একটা মেয়ের কী থেকে কী হয়ে গেল। বাড়িতে ফিরে আধার সোজা নিজের রুমে চলে যায়। তার কেন জানি নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছে! সে যদি ওইদিন মেয়েটাকে না রেখে আসত, তাহলে হয়তো এখন এই দিনটা দেখতে হতো না তাকে। নিজের একটা ভুলের জন্য সব শেষ!
রুমের ভেতরে পা রাখতেই আধারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখের সামনে তাদের কাটানো দৃশ্যগুলো ফুটে উঠল। ওই তো, ওই সোফায় তার কোলে বসে থেকে সেদিন চুমু খেল মেয়েটা! অথচ সে বিরক্ত হয়েছিল। মেয়েটা যতবার কাছে এসেছে, ঠিক ততবারই সে দূরে সরিয়ে দিয়েছে৷ আর আজ যখন মেয়েটা সত্যি সত্যিই তার থেকে বহু দূরে, তখন কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আধার লম্বা শ্বাস নিয়ে ভেতরে এসে আলমারি খুলে আলোর একটা ওড়না বের করল। তারপর ওইটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে, নাকমুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ টেনে নিল। মেয়েটা তার কাছে না থেকেও, পুরো অস্তিত্ব রেখে গিয়েছে এই পুরো রুম জুড়ে।
হঠাৎই কারোর খিলখিল করে হেঁসে ওঠার শব্দ শুনে আধার চমকে উঠল৷ তড়াক করে পাশে তাকিয়ে দেখল, আলো সোফায় বসে থেকে হাসছে। হাসতে হাসতেই মেয়েটা বলে উঠল,
-“কি ব্যাপার স্যার? আপনি এত কষ্ট পাচ্ছেন কেন? আপনি না আমাকে ওইদিন ছুঁড়ে মে’রে বলেছিলেন, দূরে থাকতে? এই দেখুন না, আমি আপনার কথা রেখেছি! নিজেকে আপনার থেকে বহু দূরে সরিয়ে নিয়েছি। এখন তো খুশিতে আপনার ডান্স করার কথা! কারণ, আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে না, জ্বালাবেও না। সাথে চুমুও খাবে না। এই পাগল আমিটার সাথে সংসার করতে হবে না আর দায়িত্বও পালন করতে হবে না। অবশেষে আপনি মুক্ত! এখন আলো বিহীন সুখে-শান্তিতে থাকুন।”
বলেই হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা। আধার ছুটে এসে চিৎকার করে বলল,
-“প্লিজ আলো! আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি তুমি বিহীন কিছুতেই থাকতে পারব না। আ..আমি আর কখনো বলব না তোমাকে দূরে যেতে। আমার মুক্তি চাই না, মিসেস খান! একটুও চাই না। শুধু তোমাকে চাই।”
কথাগুলো বলতে বলতে হাঁটু ভেঙে ফ্লোরে বসে পড়ল আধার। তখনই রাত দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“আমার থেকে আলোকে কেঁড়ে নিয়েছো তুমি, আর তোমার থেকে কেঁড়ে নিয়েছে ওপরওয়ালা। ব্যাপারটা দারুণ ব্রো!”
রাতের কথা যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। বউয়ের শোকে এমনিতেই আধারের মাথা ঠিক নেই, তারওপর ছেলেটার এমন কথা শুনে নিজের রাগ-কে কন্ট্রোল করতে পারল না। চোখের পলকে আধার তেড়ে এসে রাতের নাক বরাবর ঘুষি মে’রে দিল। শার্টের কলার খামচে ধরে গর্জে উঠল,
-“ওই মেয়েটা কখনোই তোর ছিল না। ও আমার বউ, আমার সবকিছু। শুনেছিস তুই? আলো শুধু আধার খানের। আর আমি না, তুই এসেছিস আমাদের মাঝখানে! তাই নিজের লিমিটের মধ্যে থাকার চেষ্টা কর। নয়তো এ বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবো।”
বলেই রাতকে দরজার বাইরে ছুঁড়ে মা’রতেই খেয়াল করল, সোবহান খান দাঁড়িয়ে আছেন। আধার কিছু না বলে ভেতরে চলে গেল। আর রাত উঠে দাঁড়িয়ে নাকের র’ক্ত মুছে, রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে যায়। সোবহান খান ধীর পায়ে হেঁটে রুমের ভেতর প্রবেশ করে দেখেন, তার নাতি ওড়না জড়িয়ে ধরে নিচে বসে আছে। তিনি এগিয়ে এসে বিছানায় বসে ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“এমন করছো কেন দাদুভাই? তুমি তো মেয়েটাকে ভালোবাসো না, তাহলে?”
আধার শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলল,
-“বাসি তো দাদাজান। খুউউউউব ভালোবাসি! আর সেটা বুঝতে অনেক দেরি করে ফেললাম৷ তাই তো মেয়েটা আমাকে শাস্তি দিচ্ছে।”
অবশেষে আধার আজ নিজের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি করল। সে দাদাজানের কাছে এগিয়ে এসে, দুই পা চেপে ধরে বাচ্চাদের মতো আবদার করল,
-“ওই মেয়েটাকে এনে দাও না দাদাজান! তুমিই তো আমাকে দিয়েছিলে, কিন্তু আমি সঠিক মূল্য দিতে পারিনি। কিন্তু…. এখন আমি প্রমিস করছি! মেয়েটাকে একটুও অবহেলা করব না, ওকে আমার ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখব। তবুও তুমি আমার বউকে এনে দাও। ও দাদাজান? তুমি চুপ করে আছো কেন? আমি যখন চাইনি, তখন হুট করে এনে দিয়েছো। আর এখন এত করে চাচ্ছি, তবুও তুমি নিশ্চুপ।”
সোবহান খানের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কোনোমতে নিজের চোখের পানিকে আঁটকে রেখে ধরা গলায় বললেন,
-“তুমি নিজের অনুভূতি থেকে পালাতে চেয়েছিলে, কিন্তু আজ দেখ! সেই তুমিই নিজের ভালোবাসার কথা স্বীকার করছো। শুধু তফাৎ, মেয়েটা এখন তোমার কাছে নেই। অথচ মেয়েটা এতদিন তোমার কাছে ছিল, কিন্তু তুমি তাকে বুঝতে পারোনি। সারাক্ষণ দূর দূর করেছো। কথায় আছে না? কেউ সহজেই কিছু পেয়ে গেলে, সেটার মূল্য দিতে জানে না। ঠিক তেমন তুমি! আজ মেয়েটার অস্তিত্বকে হারিয়ে তুমি নিজের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পেরেছো! আর যদি এমনটা না হতো, তাহলে তুমি কখনোই ভালোবাসা স্বীকার করতে না৷ কারণ—আধার খান মচকাবে, তবুও ভাঙবে না। কিন্তু আজ তোমাকে ভাঙতেই হলো, তাও খুব বাজেভাবে!”
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩১
কথাগুলো বলে সোবহান খান চলে গেলেন৷ আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফ্লোরের মাঝে শুয়ে পড়ল। সে যেটার থেকে এতদিন পালিয়ে বেড়িয়েছিল, আজ পরিস্থিতি সেটার মধ্যেই তাকে বন্দী করে দিয়েছে। সে এখন চাইলেও আর এই ভালোবাসা নামক ধ্বংসের মাঝ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ সে নিজেও এর শেষটা দেখতে চায়। দিনশেষে যদি তাকে ধ্বংসই হতে হয়, তাহলে সে ভালোবেসেই না-হয় ধ্বংস হবে। তবুও সে ভালোবাসবে!
