দুইজনাতেই পর্ব ২৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ দ্বিতী, তাই বলে তুই ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমাবি? ভাইয়া এতবার ডাকল। তুই তবু উঠলিই না? কতক্ষনে সাজগোজ করবি শুনি? ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকাল। কথার কথা শুনে ভ্রু জোড়াও কুঁচকে এল তার। যে দ্বিতী বালিশে মাথা রাখলেই ঘুম হয়ে যায়, সে দ্বিতী কিনা ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমাবে? পাগলে পেয়েছে? দ্বিতী ভ্রু জোড়া কুঁচকে আরেকবার চাইল সাক্ষ্যে দিকে। মুখে চাপা হাসি। বুকে হাত গুজানো। চোখাচোখি হতেই সাক্ষ্য ভ্রু নাচাল। দ্বিতী ফুঁসে উঠে কথার দিকে চাইল। বলল,
“ সাজগোজ করব কেন? ”
“ সাজগোজ করবি না? অনুষ্ঠান কার? তোরই তো। ”
দ্বিতীর এতক্ষনে মাথায় এল বোধহয়। ছোটশ্বাস ফেলে চাইতেই কথা বলে গেল,
“ মামনি শাড়ি,গহনা সব বের করে রেখেছে। তুই শুধু বসে থাকবি। আর কোন কাজ নেই। তার আগে খেয়ে নে। একটু পর সব নিয়ে আসছি আমি। ”
দ্বিতী মাথা নাড়াল। কথা ততক্ষনে বাইরে গেল। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলেই সাক্ষ্যর দিকে চেয়ে ভ্রু বাঁকাল। বলল,
“ আমার নামে কত মিথ্যে বলেছেন সবার কাছে? আর কি কি বলেছেন? ”
সাক্ষ্য একপাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আম্মু জিজ্ঞেস করাতে ঐটুকুই বলেছি। ”
দ্বিতী চাইল। এটা বোকামো নয়? আর কিছু বলতে পারেনি? যেখানে সবাই জানে দ্বিতী কি পরিমাণ ঘুমকাতুরে। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সাজি আম্মু যে সাক্ষ্যর এই মিথ্যে দুই সেকেন্ডেই ধরে ফেলেছে তা নিয়ে সে শতভাগ নিশ্চিত। বলল,
“ কেন বললেন? ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচাল। বলল,
“ তো কি বলতাম? আপনি সকালেই ঘুমিয়েছেন, রাতে ঘুম হয়নি তাই ঘুমাচ্ছেন। এটা বলতাম? ”
দ্বিতী বিছানায় বসল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠল,
“ বলতেন। অন্তত এটার থেকে বেটার হতো। যে দ্বিতী এত ঘুমকাতুরে, বালিশে মাথা রাখলেই ঘুমিয়ে পড়ে সে দ্বিতী কিনা ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। এই জন্মেও তো কখনো আমি ঘুমের ঔষুধ খাইনি। কেউ বিশ্বাস করবে এই কথাটা? আশ্চর্য! ”
“ সবাই তো আর জানে না এটা। শুধু বলেছি কান্নাকাটি করে মাথা ব্যথার কারণে ঘুম আসছিল না বলে মেডিসিন নিয়ে ঘুমিয়েছেন। ”
দ্বিতী হেসে ফেলে। সাক্ষ্য মনে করে সে একাই চালাক। আর কেউ বুঝি চালাক না। বলল, আর সবাই বিশ্বাস করে নিল। কত সোজা! বলল,
“ বিশ্বাস করেছে কেউ? আমার এখন দ্বিগুণ অস্বস্তি হচ্ছে। ওরা আপনার মতো ছাগল নয়। মিথ্যেটা ঠিকই ধরে নিয়েছে। ঠিকই বুঝে গেছে এতক্ষনে। আমি ওদের সামনে কিভাবে যাব এখন? কে বলেছিল এসব বলতে আপনাকে? আমার সকালে ডেকে দিলে কি হতো? পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত? ”
দ্বিতীর চোখমুখে রাগ স্পষ্ট। চাহনি তীর্যক। সাক্ষ্য পাশে বসেই শুধাল,
“ পৃথিবী কেন ধ্বংস হবে? কিন্তু বাচ্চামতো ঘুমটা তো নষ্ট হতো। আর দেখলেন না? কথা বিশ্বাস করেছে। বাকিরাও বিশ্বাস করবে। আপনাকে দেখে তেমন কিছু মনে হচ্ছে না যে বিশ্বাস করবে না। বরং বেশ স্বাভাবিক লাগছে। ”
দ্বিতী দাঁতে দাঁত চাপে। মুখ থমথমে রেখে ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“ আপনি চেয়েছিলেন আমাকে অস্বাভাবিক লাগুক? আপনাকে কে বলেছে মানুষকে দেখে বুঝা যাবে কার সাথে কি হয়েছে? ”
সাক্ষ্য হাসল চাপা। দৃষ্টি নিচের দিকে রেখে বলল,
“ না, মানে গতকালের একটুও ছাপ নেই আপনার চোখমুখে। কোন প্রমাণ ও তো মিলছে না। ওরা বিশ্বাস করে নিবেই। ”
দ্বিতী রেগে চাইল। তার চোখেমুখে কিংবা কোথাও কোন প্রমাণ না মেললেও সাক্ষ্যর ঘাড়ের দিকটায় দেখা যাচ্ছে চামড়া ছিলে যাওয়া একটু অংশ। দ্বিতীকে যখন কোলে তুলেছিল তখনই দ্বিতী বাম হাতটা দিয়ে সাক্ষ্যর ঘাড়টা ঝাপটে ধরেছিল। যার দরুন নখের ধারে চামড়া ছিলে গেছে ঐটুকুতে। দ্বিতী হতাশ হয়ে চাইল। টিশার্টটায় কলার নেই। সাদা টিশার্টটা গলা এবং ঘাড়ের দিকে পুরোটায় উম্মুক্ত। এতোটা সময় পর এটা দেখে দ্বিতীর রাগে মুখ লাল হয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ আমার চোখমুখে প্রমাণ মেলছে না ঠিক। কিন্তু নিজেকে খেয়াল করেছেন?
এভাবেই বাইরে গিয়েছিলেন? এই টিশার্টটা পরেই? তাই না? আপনাকে আমার ইচ্ছে করে খু’ন করে ফেলি। ”
সাক্ষ্য বুঝল না যেন। ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে,
“ হু? ”
“ দেরি করে উঠার কারণটা বিশ্বাস করার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও নেই। ধন্যবাদ নিজের ঘাড়টা সবাইকে দেখিয়ে আসার জন্য। ”
সাক্ষ্য না বুঝে আয়নায় গেল। দেখার চেষ্টা করল। অতঃপর চোখে পড়ল। সাক্ষ্য নিজেও এসব বিষয়ে খুব নাজুক। দ্বিতীর সামনে খুব ছুঁইছুঁই স্বভাব দেখালে বড়দের সামনে কিংবা ছোট ভাইবোনদের সামনে সামনে এসব বিষয় সে প্রকাশ করতে চায় না৷ তবুও প্রকাশ পেয়ে যাওয়াতে নিজের মাথাটা মাটিতে মিশে গেল যেন। সাম্যটাও তখন হাসছিল। হেসে হেসে জিজ্ঞেস করছিল, ঘুম ভালো হলো কিনা। এখন কারণটা বুঝে উঠেই সাক্ষ্য গলা ঝাড়ল। ভ্রু নাচিযে বলল,
“ আমায় উষ্কে দিয়েছিল কে? নিষেধ ও তো করা হলো না। বরং সম্মতি জানিয়েছেন। ”
“ বেশ করেছি৷ সে জন্য আপনাকে কি বলেছিলাম সকালে আমায় ডেকে না দিতে? আমায় ডেকে দিলেও আমার চোখে পড়ত অন্তত। আর আপনি যেন খুব ভদ্র! এত ভদ্র হলে আমার উষ্কে দেওয়াতে সাঁই দিতেন? ”
“ না দিয়ে উপায় কি ছিল? বউ তো আমারই হন। ঘরটাও আমারই। মাতাল করা চুলের সুভাসটাও আমার বউয়েরই ছিল। ওভাবে ভেজা চুলগুলো মুখের উপর ছড়িয়ে, কাছাকাছি এসে চুলের সুভাসে মাতাল করার প্রয়োজন ছিল? নাকি নিজের গায়ের মিষ্টি একটা সুভাসের উপস্থিতি দেওয়াটা প্রয়োজনীয় ছিল? ঐ মুহূর্তে উম্মাদ হওয়াটা মোটেও দোষের নয়। আমি অনুমতি চেয়েছিলাম , আপনার কাছে। মনে আছে? আপনি আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন মিসেস এহসান। এখন দোষ একা আমাকে দিবেন না। ”
“ আমি দোষ দিয়েছি আপনার বলদের মতো কাজকর্মের। কখনো দেখেছেন কোন নতুন বউ দিনের এত বেলা অব্দি ঘুমায়? ”
সাক্ষ্য এগোল। বলল,
“ কখনো কারোর বউ দেখতে তো যাইনি। যায় হোক, বেশি ভাবছেন। অতো লুকোচুরি করার হলে আমি বিয়ে করলাম কেন? রিল্যাক্স। ওটা স্বাভাবিক ইস্যু। স্বামী স্ত্রীর স্বাভাবিক ইস্যু। আপনি আমাকে ঘাবড়ে দিচ্ছেন এইসেই বলে৷ ”
“ আমার সত্যিই আপনাকে খুন করে দিতে মন চাইছে। ”
“ আসুন। খু’ন করে দিন। মান সম্মান তো আমার ও ডুবিয়ে দিয়েছেন মিসেস। ”
দ্বিতী আর উত্তরই করল না। শুধু চা টা নিশ্চুপে শেষ করল। অতঃপর উঠে দাঁড়াতেই সাক্ষ্য বলল,
“ শুনুন? অদিতি আন্টি কল দিয়েছিল। আপনি তো বেঘোরেই ঘুমাচ্ছিলেন। বলেছিলাম, উঠলে কল দিব। ”
দ্বিতী চোখ ছোটছোট করে বলে,
“প্লিজ এখন বলবেন না যে, আপনি আম্মুকেও বলেছেন আমি ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছি। ”
সাক্ষ্য ফোনের স্ক্রিনে চাইতে চাইতেই বলল,
“ আনফরচুনেটলি বলেছি। ”
দ্বিতী মুহূর্তেই তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,
“ গুড। রাজ্য জয় করেছেন। মিথ্যুকের নমুনা। এত ধূর্ত মানুষ কি করে মিথ্যে বলতে এত কাঁচা হয়? পাঁচ বছরের বাচ্চা ও ভালো।”
“ পাঁচ বছরের বাচ্চার কি আর বউ থাকে? নাকি আমার মতো এমন সিচ্যুয়েশনে পড়তে হয়? ”
দ্বিতী উত্তরই করল না। শুধু পা বাড়াল বেলকনির দিকে।
কথা শাড়ি পরেছে আজ। মেরুর রং এর একটা স্টোনের কাজ করা। শাড়িতে কথাকে দারুণ না হেোক, তবে সুন্দর লাগছে। কথাও বোধহয় শাড়িটা পরে খুব খুশিই হলো। শাড়িটা তার খুব পছন্দ হয়েছে। বলা চলে চোখ জুড়িয়ে যায় শাড়িটার দিকে চাইলে৷ তাই তো এতোটা সুখ সুখ লাগছিল কথার। কথা সে শাড়িটা পরেই বের হলো। ফুরফুরে মনটা নিয়ে বেশ কিছুটা সময় ঘোরাফেরার পর কথা সাম্য আর ওর বন্ধুবান্ধবদের সামনে পড়ল। সাম্যর বন্ধুরা এসেছে তিনজন। সাম্য সাথে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়ার মাঝেই কথার সাথে কথা বলেছে। সৌজন্যতা বজায় রেখেছে। কথাও হেসে উত্তর করল। আর ঠিক সে মুহূর্তেই সাম্য বলে উঠল,
“ তোকে শাড়ি পরতে কে বলেছে ভাই? একেবারে লাগতেছে একটা মিষ্টি কুমড়োর মতো। তোর মতো ছোটা হাতিকে শাড়িতে মানায় না কাঁথা। প্লিজ চেঞ্জ কর। ইয়াক!”
কথা চাইল। সাম্যর কথাটা শুনে সাথে সাথে হেসে ফেলল তার বন্ধুরাও। কথার পরনে থাকা শাড়িটার দিকে চেয়ে একজন বলেও ফেলল,
“ কিন্তু শাড়িটা সুন্দর। ”
কথার ফুরফুরে মনটায় হুট করেই মেঘ নামতে দেরি হলো না। কান্না এল দু চোখ ভরে। সাম্য ফের আবারও বলল,
“ যদি না খেয়ে একটু ডায়েট কন্ট্রোল করতি তবুও একটা গতি হতো কাঁথা। কিন্তু তুই যা মোটা তাতে গোলগাল একটা ফুটবল মনে হচ্ছে তোকে। তুই কি ভাবছিস? তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে শাড়িতে? কিংবা খুব মানিয়েছে শাড়িতে? কিন্তু বাস্তবটা হলো তোকে বিশ্রী দেখাচ্ছে কাঁথা। কি বিশ্রী! ”
দুইজনাতেই পর্ব ২৮
কথার চোখ টলমল করে। বুকের ভেতর জমা হয় নিরব এক ব্যথা। দুঃখরা জমা হয়ে ভার হয়ে আসে মনটা। সাম্যর বন্ধুদের চোখে মুখে তখনও হাসি। সাম্যর মুখে তো স্পষ্টই উপহাস। আচ্ছা, মোটা হওয়াটা অপরাধ কি? সাম্য ভাই সবসময় তাকে ছোট করে কেন? কথার বুঝি কোন কষ্ট হয় না? নাকি উপহাস গুলোকে সয়ে যাওয়ায় তার কর্তব্য?
