Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ২৬

দুইজনাতেই পর্ব ২৬

দুইজনাতেই পর্ব ২৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

বন্ধুর আকদ অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পরই সাক্ষ্য আবারও আগের ফর্মেই ফিরে এল। ভার্সিটিতে যেটুকু সময় কাটে দ্বিতীর মনে হয় সাক্ষ্য দ্বিতীকে কখনো দেখেইনি এমনই একটা ভাব নেয় যেন। অথচ এই সাক্ষ্যই একা পেলে এমন একটা ভান করে যেন কতকালের প্রেম তার। দ্বিতীর এহেন রং পাল্টানো ভালো লাগে না। দুইদিনের অভ্যাসে সে এতোটাই অভ্যস্ত হলে যে বাসায় ফিরেই ছটফট করল। বারবার ফোনে তাকাল এই একটা সপ্তাহ। যদি সাক্ষ্য কল করে, ম্যাসেজ দেয়। সিঙ্গেল ম্যাসেজ হলেও তো হতো। কিন্তু সাক্ষ্য কোনরকমই যোগাযোগ করল না। পুরোপুরি ভাবে নিজের দিনদুনিয়ায় মেতে দ্বিতীকে যেন সরিয়েই দিল অন্য দুনিয়ায়।
দ্বিতী মেয়েটা একটু ভিন্ন। এই সাক্ষ্যর প্রতি দুর্বলতা সে তা প্রকাশ করতে পারে না। সাক্ষ্যর সামনে সাক্ষ্যর মতে করেই দেখানোর চেষ্টা করে যে তারও কোন ইন্টারেস্ট নেই সাক্ষ্যর প্রতি। অথচ পারলে তো তা। কঠিন দুর্বলতা বলে কথা। তাই ছটফট করতে করতে দ্বিতী খেয়াকেই ম্যাসেজ করল,

“ দোস্ত? কাউকে মিস করেও কথা বলতে না পারাকে কি বলে? ”
উত্তর এল,
“ ইগো বলে। ”
ইগো? ইগো তো দ্বিতীর আছেই। সাক্ষ্যরও কি কম? কম এটিটিউড দেখায় নাকি? দ্বিতী তবু নিজের ইগোকে একটু স্যাক্রিফ্রাইস করে তার
আম্মুর নতুন কেনা সিমটা থেকেই বার কয়েক কল কেল সাক্ষ্যকে। জ্বালানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কল করেছিল। অতঃপর সাক্ষ্য কল তুলতেই মুখে তেয়ালে পেঁচিয়ে মোটা গলায় বলল,
“ আসসালামুআলাইকুম স্যার, আপনাক একটা কথা বলার ছিল।”
সাক্ষ্য কে বা কারা কিছুই জিজ্ঞেস করল না। দ্বিতী ভেবেছিল জিজ্ঞেস করবে। শুধু বলল,
“ শুধু একটাই? ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়। এমন ভাবে বলছে যেন দশটা কথা বললে সে খুশি হতো। মেয়ে মানুষ কল করলে এমনই করে মনে হয়! দ্বিতী ফুঁসে উঠল অজানা রাগে। বলল,

“ কয়টা শুনতে চান স্যার? ”
“ আপনি কয়টা বলবেন? ”
দ্বিতী সাক্ষ্যকে জ্বালানোর জন্য কল দিলেও মেজাজ খারাপ লাগল। বলে উঠল,
“ আমাকে চেনেন আপনি? অপরিচিত মেয়ের থেকে কথা শুনতে চাইবেন কেন? ”
“ অপরিচিত মেয়ের কথা শুনতে ভালো লাগছে তাই। ”
দ্বিতীর ফর্সা মুখ তখন লাল হয়ে উঠল। নাকের ডগা টকটকে লাল। বলল,
“ ডেইলি কত মেয়ের কথা শুনতে ভালো লাগে? ”
“ আন্দাজ করুন তো…”

দ্বিতী এর পরের মুহূর্তে আর কোন উত্তরই দিল না। শুধু রাগে ফোন রাখল। অথচ এই সাক্ষ্যকেই সে এই এক সপ্তাহ জুড়ে মনে করেছে বারংবার। ঘুমোতে গেলে অব্দি দুইদিনের সে অভ্যস্ততা মনে করেছে। মনে পড়েছে স্মৃতি গুলোও। বোধহয় প্রথম প্রথম প্রেমিকের সাথে ঘুরলে ফিরলেও প্রেমিকারা বারংবার এই স্মৃতিগুলে মনে করে। লজ্জায় কুঁকড়ে যায় কিংবা ভালো লাগারা ছুঁয়ে যায় অজান্তেই।
দ্বিতী ফোঁসফাঁস শ্বাস ফেলে। সেদিনের সে রাগ নিয়েই ভার্সিটিতে গেল। ক্লাস করল। সাক্ষ্যকেও আড়াল খেকে দেখল বার কয়েক। তবুও রাগ শান্ত হলো না। দ্বিতী ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসা ছিল। সময়ের খাতা অনুযায়ী আজ দ্বিতীর বিয়ের কেনাকাটা করা হবে। দ্বিতী শিওর, এই সাক্ষ্য আবারও ঢং দেখাবে। বউ বউ ভাব দেখাবে তার সাথে। কাছ ঘেষবে। তারপর আবারই লাপাত্তা হয়ে যাবে। একদম চিনবেই না। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলতেই খেয়া এল ওখানে। পাশপাশি বসা ছিল মিহু ও। নিধির প্রসঙ্গেই মিহু বলে উঠল,
“ নিধি আর সাক্ষ্য স্যারকে নিয়ে লম্পজম্প করে না তাই না? ব্রেকাপ ট্রেকাপ হয়ে গেল নাকি দুইজনের? ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকে তাকাল। তপ্ত মেজাজে বলে উঠল,

“ কেন?ব্রেকাপ হলে তুই চেষ্টা করবি? ”
“ ছিঃ! স্যার হয় আমার। ”
দ্বিতী কফিতে চুমুক দিল। ভ্রু নাচিয়ে বলল
“ স্যার বলেই তো তাকিয়ে থাকিস। ”
মিহুর মুখটা দেখাল বাংলার পাঁচের ন্যায়। চুপসে নিয়ে অপর পাশ ফিরতেই দেখা গেল সাদাব আর কিয়ানকেও৷ মিহুকে ওভাবে বসে থাকতে দেখেই কিয়ান ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
“ কিরে? কান্দে কেন ও? কাঁদে না বাবু। চকলেট দিব। ”
মিহু কটমট করে চাইল। সাদাব ততক্ষণে চেয়ার টেনে বসল অপরপাশটায়। কুঁচকানো ভ্রু শিথীল করেই একবার চাইল খেয়ার দিকেও৷ মেয়েটার চুলের একাংশ ডেকে আছে কপাল। চোখেজোড়ায় দিয়েছে সূক্ষ্ম কাজলের রেখা। দেখতে মায়াবীই বোধ হয় এই মেয়েটাকে। তাকালে তাকাতে ইচ্ছে হয় যেন। অথচ সাদাব নিজের সে ইচ্ছেটাকে বর্জন করেই ফিরে চাইল অন্যপাশে। খেয়ার চাহনি তখন মিহুদের দিকেই ছিল। তারপর হঠাৎ সাদাবের দিকে চেয়েই কি মনে করে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ সাদাব? ট্যুরে যাচ্ছিস? ”
কয়েকটা দিন পরই এক সপ্তাহের ট্যুর। ডিপার্টমেন্ট থেকেই। কিয়ান, মিহু আর খেয়া যাবে। দ্বিতী কোন এক অজানা কারণে আগেই যাবে না বলেছে বন্ধুমহলকে।বাকি রইল সাদাব। তাই জিজ্ঞেস করা। অথচ ও যতোটা শান্ত শীতল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল তাতে সাদাব ততোটাই বিরক্তি নিয়ে চাইল। কপালে ভাজ ফুটিয়ে বলে উঠল,
“ তোমাকে যে উত্তর দিব সে আশা করলে কি করে খেয়া? আমার বিষয়ে নাক গলাতে নিষেধ করেছি না ? তবুও এত আগ্রহ দেখাও কেন? ”
খেয়া চুপ হয়ে গেল। খারাপ লাগায় চুপসে এল মুখ। উপস্থিত বাকি তিনজনও সাদাবের কথাতে ভ্রু কুঁচকাল। সবসময়ের মতো আজও সাদাবের ব্যবহারটা হজম হলো না। কিয়ানই প্রথমে বলল,
“ ফ্রেন্ড হিসেবেই তো জিজ্ঞেস করেছে। এমন করার কি আছে ওর সাথে? ”
“ তোর কষ্ট হচ্ছে কি? ”
এবারে দ্বিতীই বলল,
“ কষ্ট হবে না কেন সাদাব? সবসময় ওর সাথে এই ব্যবহারটা ও ডিজার্ব করে না৷ তুই তবুও ওর সাথে এভাবে কথা বলবি কেন? ”

সাদাব হুট করেই উঠে গেল। পা বাড়াতে বাড়াতর গিয়ে বসল অন্যদিকে অন্য একটা মেয়ের পাশে। মেয়েটা তাদের জুনিয়র। দেখতে মিষ্টি, সুন্দর। খেয়া যখন মেয়েটাকে দেখছিল ঠিক ঐ সময়ই কিয়াস বলে উঠল,
“ ওর উড বি । আমি বুঝি না ও সংসার করবে কেমনে। না জানব বউয়ের সাথে কত রাগ দেখাবে। ”
আচমকা কথাটা শুনেই খেয়া নির্বাক হয়ে চাইল। উড বি? সাদাবের? সাদাব তাহলে বিয়ে ও করছে? অথচ তাকে বলল না যে? অবশ্য বলবে কেন? তাকে কব বন্ধু ভাবে নাকি সাদাব। খেয়া কেমন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মনে মনে আওড়াল,
“ তবুও ভালো। যা সম্ভব নয় তাতে আশা নিয়ে পড়ে থেকে লাভ ও কি হতো? ”

দ্বিতী ভার্সিটি থেকেই বাসায় ফিরছিল। মাঝপথে দাঁড়াল রিক্সার জন্য। কারণ আম্মু বলেছে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আজ সব কেনাকাটা করবে বলে কথা। দ্বিতী তবুও অলসভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। রিক্সার জন্য দাঁড়াতে দাঁড়াতেই যখন বিরক্ত হলো ঠিক তখনই তার সামনে এসে থামল একটা গাড়ি। কাঁচ নামিয়ে বলে উঠল,
“ মিসেস এহসান, উঠে বসুন। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকায়।সাথে কপালও। যে সাক্ষ্য তাকে এতদিন উপেক্ষা করল সে আবার হাজির? দ্বিতী মুখ কুঁচকায়। বলে,
“জ্বী স্যার? কিছু বলছেন? ”
“ উঠে বসুন। ”
“ কেথায়? ”
সাক্ষ্য হুট করেই হাসল। বলল,
“ কোথায় বসতে চাইছেন? কোলে? বসলে বসুন। নিষেধ নেই আমার। ”
দ্বিতী চোখ খিচে নিল। এই ছেলে আস্ত এক ফাজিল। অথচ ভাবখানা দেখায় কত ভদ্র।দ্বিতী নিজেই বলল,

“ আমার বাসায় আমি একা যেতে পারব। স্যার হয়ে এতটুকু ভাবার জন্য ধন্যবাদ স্যার।”
“ স্টুডেন্ট হিসেবে কে কোলে উঠতে বলে? ”
দ্বিতী দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কি হিসেবে বলছেন স্যার? ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ কি হিসেবে বললে খুশি হবেন? ”
দ্বিতী কিছুই বলল না। শুধু ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল। সাক্ষ্য এবারে আবারও বলল,
“ উঠবেন না? মাঝরাস্তায় জোরজবরদস্তি করে গাড়িতে তুলব? ভালো দেখাবে? আপনি চাইলে অবশ্য…”
দ্বিতী মুহূর্তেই উত্তর করল,
“ পা আছে আমার। ”
“ গুড। তাহলে উঠতে ভয় পাচ্ছেন কেন? ভয় নেই, একা পেয়ে আবার দোষ করে বসব ভেবে নিবেন না।”
রিক্সা নেই। আবার কেনাকাটার জন্য এমনিতেও সাক্ষ্যর সাথে যেতেই হবে ভেবে উঠে বসল। ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,

“ আপনার কি মনে হচ্ছে? দোষ করার সাহস করলেই দোষ করতে পারবেন? যদি না আমি প্রশ্রয় দেই? ”
“ প্রশ্রয় তো দিয়ে দিয়েছন বহু আগে। এখন শুধু প্রশ্রয় দেওয়ার ফল উশুল করবেন মিসেস। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চেয়েই শুধাল এবারে,
“ মিসেস? ”
“ মিস নাকি? ”
“মিসেস টা মনে করতে পেরেছেন কব করে? আমি তো ভেবেছব আপনার মেমোরি লস হয়ে গেছে। ”
দ্বিতীর মুখটা টানটান। মৃদু রাগ স্পষ্ট। সাক্ষ্য তা বুঝেই বলল,

“ যে মেমোরিতে আপনি আছেন তা লস হয় কি করে ম্যাম? ”
“ লস করার ইচ্ছে থাকলেই হয়। ”
“ লস করার ইচ্ছে? ছিঃ! এসব ইচ্ছে আমার নেই। ”

দুইজনাতেই পর্ব ২৫

সাক্ষ্য এ কথাটা বলার সাথে সাথেই সাক্ষ্যর ফোনে কল এল। ফোন স্ক্রিনে স্পষ্টই অদিতি আন্টি নামটা ফুটে উঠল। অতঃপর নামের নিচ দিয়ে দেখা গেল তারই আম্মুর কেনা নতুন সিমের নাম্বারটাও। দ্বিতী চোখ সরু করেই চাইল। এই সাক্ষ্যর কাছে এই নাম্বারটাও থাকার প্রয়োজন ছিল কি? আম্মু নিশ্চয় সিম কিনেই সর্বপ্রথম নিজের মেয়ে-জামাইকেই নাম্বারটা দিয়েছিল?

দুইজনাতেই পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here