Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ২৫

দুইজনাতেই পর্ব ২৫

দুইজনাতেই পর্ব ২৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

তীব্র উত্তাপের পর প্রকৃতি বোধহয় কিছুটা স্বস্তি দিতেই বর্ষনের সূত্রপাত ঘটাল। আশপাশ জুড়ে ভারী বর্ষন জুড়তেই দ্বিতী হাত বাড়াল জানালার দ্বারের বাইরে। পানির ছিটকে হাতে পড়ার সাথে সাথে এসে ভীড়ল তার চোখেমুখেও। ফোঁটা ফোঁটা পানি। আবেশে এক মুহূর্ত চোখ বুঝতেই হুট করে কানে এল সাক্ষ্যর গলা,
“ মিসেস এহসান? ”
আচমকা ডাকটা শুনে দ্বিতী কিছুটা চমকালেও চোখ মেলে চাইল পরমুহূর্তেই। গলাটা কেমন শোনাল কি সাক্ষ্যর? নাকি নিজেরই এমন শিরশিরে অনিভূতি হলো? দ্বিতী সে শিরশিরে অনুভূতিটা প্রকাশ না করেই ঘাড় বাঁকাল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“ কি? ”
সাক্ষ্য কয়েক কদম দূরত্বেই দাঁড়ানো।বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়েই মুহূর্তেই শুধাল,
“ কি বদনাম করে এলেন আমার নামে? যে সাক্ষ্য এহসান আকদ হওয়ার পরও বউয়ের থেকে দূরে থেকেছে তার নামে এমন একটা বদনাম করলেন কেন ? ”
দ্বিতী কিছুই বুঝল না যেন। বিভ্রান্ত হয়ে ভাবল কি বদনাম করেছে। তা দেখেই সাক্ষ্য চাপা হাসল। মজা পেল যেন এই প্রথম দ্বিতীকে বিভ্রান্ত দেখে। ফের আবারও দ্বিতীকে বিভ্রান্ত করতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ আমার মতো সৎ চরিত্রের ছেলে আর দুটো পাবেন কোথাও? এখনতো মানুষ বলে বেড়াবে আমার চরিত্র খারাপ। বউকে নিয়ে বন্ধুর বিয়েতে এসে বউ এর সাথে…”
আহা! সৎ চরিত্র? উপর দিয়ে ভদ্র গম্ভীর রূপ দেখিয়ে ভেতরে ভেতরে যে দ্বিতীকে একা পেলেই কাছ ঘেষে? এসব কি? দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। মুহূর্তেই বলে উঠল,

“ বউ এর সাথে কি? ”
সাক্ষ্য গলা একটু গম্ভীর বানিয়েই এবারে বলল,
“ কিছু না। কে বলেছিল এই ঠোঁটফোলা নিয়ে বাইরে যেতে? বলেছিলাম আমি? ”
দ্বিতী শুধু কপাল কুঁচকায়। বাইরে গেলেও সে মুখে হাত দিয়েই রেখেছিল যাতে কারোর চোখে না পড়ে। সাক্ষ্যর তিড়িং বিড়িয় বন্ধু দুটো অবশ্য বারবার তাকিয়ে জিজ্ঞেসও করেছে মুখে হাত দিয়ে রেখেছে কেন। দ্বিতী আবার কথা আর সাম্য সরতেই নিধির সামনে ইচ্ছে করেই হাত সরিয়ে নিয়েছিল। তখন হুট করেই শামীম এসেছিল। দেখে নিয়েছিল কি?
দ্বিতী আনমনে ভেবেই হাঁসফাঁস করল। আসলেই কি দেখেছে? ভেবেছিল তো কেবল নিধি দেখেছে। দ্বিতী নিজের দিকটা নড়বড়ে টের পেলেও নিজের দিকটা মোটেই ছাড়ল না। বরং গলা শক্ত করে বলল,

“ আপনার কথা মতো বাইরে যাব আমি? ”
“ অবশ্যই। বদনাম যখন আমার নামেই করেছেন তখন আমার অনুমতি নিয়ে বাইরে যাওয়া উচিত ছিল না? ”
“ আমি মোটেই আপনার নামে বদনাম করিনি। তবুও যখন আপনার নামেই বদনাম হলো তার মানে আপনিই দোষী। ”
কাটকাট স্বরে কথাগুলো বলেই থামল দ্বিতী। সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকায়। এক কদম এগিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ আবার বলুন, কে দোষী? ”
দ্বিতী ভাবল। দোষী নয়? দ্বিতী কার জন্য ফোন দেখছিল? কার জন্য গ্রুপের সব ম্যাসেজ পড়ছিল? সাক্ষ্যর জন্যই। তার মানে সাক্ষ্যই দোষী৷ ফের আবারও দম নিয়ে বলল,
“ অবশ্যই আপনি। আপনার কারণেই আমার মুখের বারোটা বেজেছে…”
সাক্ষ্য এবারে ভ্রু নাচিয়েই বলে উঠল
“ শিওর? ”
“ হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। ”
এই পর্যায়ে সাক্ষ্য আচমকায় হাত বাড়াল। দ্বিতীর চিকন ফর্সা হাতটা টেনে ধরে নিজের দিকে নিয়ে আসতে আসতেই বলল,
“ ওকে। দোষ না করেই দোষী হচ্ছি যখন এদিকে আসুন ম্যাম। দোষটা করেই দোষী হই নাহয়। ”
আচমকা হেঁচকা টানে দ্বিতী থমকাল। নিজের অবস্থান তখন সাক্ষ্যর একদম সামনেই। কপাল কুঁচকে নিতেই টের পেল সাক্ষ্যর এক হাত তার কোমড়ে ঠেকেছে। দুইজনের দূরত্ব বলতে ইঞ্চিকয়েক দূরত্ব। দ্বিতী হুট করেই শুধাল,

“ মানে? ”
সাক্ষ্য বাঁকা হাসে। নিজের মুখ এগোতে এগোতে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
“ মিথ্যে দোষের দোষারোপ সাক্ষ্য এহসান নিবে না ম্যাম! বুঝেশুনে দোষ দেওয়া উচিত ছিল তো। ”
অতঃপর সাক্ষ্যর দেরি হলো না দ্বিতীর অধরের দখল নিতে। নিজের দোষটজ সত্যিকারের দোষরূপেই প্রকাশ করল অল্পস্বল্প সময় নিয়ে। অন্যদিকে আকস্মিক শান্ত, শীতল আবেশে দ্বিতীর অনুভূতি কেমন হওয়া উচিত তাই বোধহয় বুঝে উঠল না সে। অন্যসময় বেশ চতুর হলেও এই মুহূর্তে এসে আচমকা বোকা বনে গেল।ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে সাক্ষ্য যখন তার দোষটা ফলিয়ে সরে দাঁড়াল দ্বিতী শুধু এইটুকুই বলল,
“ সৎ চরিত্রের নমুনা ছিল এটা? ”
“ বউকে কাছে টানলে অসৎ হয়ে যায় নাকি ম্যাম? ”
দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। প্রথবারের মতো সাক্ষ্যর এহেন কার্যকলাপে সাক্ষ্যর কেন ভাবাবেগ না দেখে বলল,
“ অসৎ হয়না, তবে আমি ভেবেছি আপনি বহু ভদ্র। আকদের পর বউ এর থেকে দূরে থেকেছেন। তাই ভদ্রই ভেবেছি। ”
সাক্ষ্য বাঁকা হাসল। দ্বিতীর দিকে চেয়ে বলে উঠল,
“ দূরেই থেকেছিলাম মূলত অভদ্র না হতে। পরে ভাবলাম, বউয়ের কাছে এত ভদ্রতা দেখিয়ে লাভটা কি? অভদ্র তো একদিন হতেই হতো। ”
“ এটা তাহলে অভদ্রতার নমুনা ছিল? ”
দ্বিতীর মুখচাহনিতে কপোট রাগ। গলা শক্ত। সাক্ষ্যর শুধু হাসিই পেল। তবুও হাসিটা চেপে রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,

“ দোষ করেছিই না? দেখলাম, আসলেই দোষ করাটা কেমন। ”
সাক্ষ্যর মুখের চাপা হাসিটা দ্বিতীর সহ্য হয় না যেন। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে উঠল,
“ হাসি চেপে রেখেছেন কেন? সাহস হলে সরাসরিই হাসুন। আপনি মজা নিচ্ছেন ? কি ভেবেছেন আমি অসহায়, অবলা মেয়ে? আপনার এই দোষ করাতে আমি হার মেনে নিব?
“ একদমই না। চাইলেও আপনিও দোষী হতে পারেন ম্যাম। প্লিজ। আমি মোটেই দোষারোপ করব না। ”
দ্বিতী সাক্ষ্যকে এক হাতে ধাক্কা দিয়ে সরল শুধু। উত্তরে বলে উঠল,
“ মানুষ আপনার মতো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না খালি। সুযোগের সৎ ব্যবহার করার ইচ্ছে নেই আমার। ”
সাক্ষ্য হাসল। বড় গলায় এই কথা বলা মেয়েটাই রাতের বেলায় তার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েছে। সাক্ষ্য যেতে যেতেই বলে গেল,
“ তবুও ভালো। সুযোগের সৎ ব্যবহার করে ও তো আর অস্বীকার করছি না।”

দ্বিতী এতোটা সময় এই ফোলা ভাব নিয়ে চিন্তিত না হলেও এখন চিন্তা করছে। খালি মনে হচ্ছে যে কেউই তাকে দেখলে একটু আগের ঘটনাটা বুঝে যাবে। কথা, সাম্য এদের সামনে যাবে কি করে? যে বিষয়টা একটি আগে অব্দিও স্বাভাবিক ঠেকছিল তা এখন চিন্তার বিষয়। দ্বিতী বেশ কয়েকবারই আয়না দেখল। এমন না যে সাক্ষ্যর করা দোষের পর তার কোন পরিবর্তন ঘটেছে তবুও মনের ভেতর খচখচ করছেই। দ্বিতী এই চিন্তা নিয়েই তৈরি হয়ে বসে থাকতেই সাক্ষ্য এল। জিজ্ঞেস করল,
“ তৈরি আপনি? চলুন তাহলে। ”
দ্বিতী তবুও উঠল না। মুখে রাগ রাগ ভাব ফুটিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করল,
“ কথা কোথায়? ”
“ আছে বাইরে। ”
“ সাম্য ভাই কোথায়? ”
“ সবাই ই বাইরে। কেন? ”
দ্বিতী আচমকা সাক্ষ্যর দিকে চাইল। দ্রুতই কাটকাট স্বরে বলল,
“ আমি কথা আর সাম্য ভাইয়ের সামনে কিভাবে যাব? ”
“ হেঁটে যাবেন। হেঁটে না যেতে পারলে কোলে যাবেন। ”
দ্বিতী এবার সাক্ষ্যর সামনেই গেল। প্রশ্ন ছুড়ল৷
“ বুঝা যাচ্ছে কিছু? ”

সাক্ষ্য এবারে বোধহয় বুঝে উঠল। বাহ বাহ! রাগ দাম দেখানো মেয়েটাও লজ্জা পাচ্ছে? সাক্ষ্যর হাসি পায় যেন। বুঝেও না বুঝার মতো বলল
“ কি? ”
“ ঢং করবেন না সাক্ষ্য। জলদি গিয়ে আমার জন্য একটা মাস্ক এনে দিন। ”
“ মাস্ক? ”
দ্বিতী কপট রাগ দেখিয়েই বলল,
“ তো আমি এই ফোলা ঠোঁট নিয়ে সবার সামনে ঘুরঘুর করব এখন? ”
সাক্ষ্য এবারে ভ্রু নাচাল। পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে যেন তার। তবুও মুখ গম্ভীর রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ সকালে না ঘুরঘুর করেছেন? তাহলে এখন কি সমস্যা? ”
“ সকালের হিসেব ভিন্ন ছিল। এখনকার হিসেব ভিন্ন। ”
হাসি চেপেই বলল সাক্ষ্য,
“ কেন? ”
এতক্ষনে সাক্ষ্যর চেপে রাখা হাসিটা চোখে পড়ল দ্বিতীর। রেগে মুহূর্তেই বলল,

“ মজা নিচ্ছেন আপনি? মাস্ক আনবেন কি আনবেন না?”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচাল। বলল,
“ না আনলে? ”
“ না আনলে আপনার ঠোঁটের অবস্থা এর চেয়েও বেগতিক করব। দেখি আপনি কি করে ছোট ভাইবোনের সামনে ঘুরঘুর করেন। ”
“ এতোটা প্রতিশোধস্পৃহা? আশ্চর্য! অদিতি আন্টির মেয়ে লজ্জা পায় এটা এক আশ্চর্যজনক বিষয়। তার চেয়েও আশ্চর্যজনক বিষয়, মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম কিনা আরেকজনের ঠোঁট নিয়ে চক্রান্ত করছে? ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য পা বাড়াল। দ্বিতী শুধু ফোঁসফাঁস শ্বাস তুলে বলল,
“ সুযোগ আমারও আসবে স্যার। আমিও তখন মুনাফা-মূলধনে শোধ করব। ”

কথা আর সাম্য নিচেই দাঁড়ানোর গাড়ির সামনে। দ্বিতীরা আসতেই রওনা দিবে ওরা। সাম্য অনেকটা সময় বেলকনিতে চাইল। ওটা স্নেহার বেলকনি। এই যে বিদায় নিয়ে চলে এল স্নেহা তার দিকে তাকিয়ে ছিল কেমন করে৷ সাম্যর ধারণা এই মেয়েকে প্রোপোজ করলেই রাজি হয়ে যেত। কিন্তু বড়ভাইয়ের বন্ধুর বোন বলে কথা। তাই সাহস হয়নি। অতঃপর কথাকেই বিরক্ত করতে বলল
“ কাঁথার বাচ্চা শোন? প্রোপোজটা কি এখনই করা উচিত ছিল? পরে যদি ভুলে যায় ? আমার কাছেতো ফোন নাম্বারও নেই। তোর কাছে কি আছে? ”
কথা ক্লান্ত চোখে চাইল। স্নেহা নিজেই সাম্য ফোন নাম্বার, সোশ্যার মিডিয়ার একাউন্টের নাম সব নিয়েছে কথার থেকে। দুই পক্ষের টান দেখে তার কেমন একটা রাগ হচ্ছিল বোধহয়। আবার বোধহয় খারাপও লাগছিল। তবে প্রকাশ করল না। শুধু বলল,

“ আছে। ”
সাম্য এবারে বলল,
“ তা ভালো। কিন্তু প্রোপোজটা স্নেহাকে করব নাকি নিধিকে? আমার দুইজনের জন্যই মন কান্দে! ”
কথা বিরক্ত হলো যেন। বলল,
“ মন আবার কিভাবে কান্দে সাম্য ভাই?”
“ সুন্দরীদের দেখলে সুন্দর ছেলেদের মন কান্দে। ইম্প্রেস করতে মন চায়। তোর কি মনে হয়, ওরা ইম্প্রেস হলো?”
“ স্নেহার কথা জানি না। তবে নিধির তো ভাইয়াকে পছন্দ করে। ”
সাম্য ভ্রু বাঁকাল। বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ ভাইয়াকে? ”
“হু।,”
“ ছিঃ! বেডিমানুষ এমনই। বিবাহিত পুরুষকে পছন্দ করে। আমাকেও তো করতে পারত তাই না? ”
কথা চেয়ে উত্তর করল,
“ পারত। ইভেন করতেও পারে। তুমি আর ভাইয়া দেখতে প্রায় একই। লম্বা ও একই। চোখগুলোও মিলে। শুধু তুমি ভাইয়ার মতো ভালো না। ”
সাম্য মুহূর্তেই কপাল কুঁচকে তীব্র বিরোধীতাা নিয়ে বলল,

“ ভালো না? খারাপ কি করছি? তোকে যে আমাদের বাসায় এখনো থাকতে দিয়েছি এটাও তো ভালোমানুষি। খারাপ হলে তো কবেই তোর বাপের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। ”
“তোমার বাসায় থাকি না আমি যে তুমব পাঠাই দিবা। নানুর বাসায় থাকি।,”
“ থাকিস না বুঝলাম। তো খাবার খেয়ে যে একটা ছোটা হাতি হয়ে গেছিস এই ছোটা হাতিটা তোকে কে বানাল? আমার আব্বুই তো। ”
আবারও ঐ শরীর নিয়ে কথা। কথা ক্লান্ত ভঙ্গিতে চাইল। শরীর রিয়ে কথা শুনলে কষ্ট পেলেও হজম করতে জানে সে। বলল,
“ তোমার আব্বু আমার মামা হয়। ”
“ তোর মামা পরে, আগে আমার আব্বু হয়। তুই তো জন্মালি আমার পরে। যখন জন্মালি তখন আমিও পিচ্চিই। আব্বু তোকে আর আমাকে সমানই ভালোবাসত। আম্মুও। কিন্তু যখন ফুফি মারা গেল, আর তুই আমাদের বাড়িতে শিফট করলি এরপর থেকেই আব্বু তোকে মাথায় করে রাখত। মনে হতো বাড়িতে সব আদরই তোর। আমি তো অন্যের পোলা। আব্বুর প্লেটের খাবারগুলাও তোকে দিত খাওয়ার জন্য। আমি তো কুড়িয়ে আনা ছেলের মতো এক দিকে পড়ে থাকতাম। ”
কথা শুনল। দীর্ঘ এক কাহিনী শুনে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ তোমার আমাকে শত্রু মনে হয় তাই না? ”
সাম্য পাত্তা দিল না এমন ভঙ্গিতেই বলে উঠল,
“ আগে ভাবতাম। এখন ভাবি না। কারণ বুঝলাম যে, তুভ এতোটাও গুরত্বপূর্ণ না যে তোরে শত্রুর স্থানে রাখব। শুধু তোর প্রশংসা হজম হয় না আমার। বিরক্তিকর লাগে তোকে। ”
কথা মলিন হাসল। মনে মনে আওড়াল,
“ তবুও ভালো৷ আমাকে দেখো? তোমাকে দিয়ে দিয়েছি মনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটাই! যাকে ছোঁয়ার সাধ্য কিনা আমার কখনোই হবে না। শুধু দূর থেকেই অনুভূতি পুষতে পারব। ”
দ্বিতীরা নামল তার একটু পরই। সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।দ্বিতী সামনে সাক্ষ্যর সাথে আর কথা আর সাম্য পেছনে বসল। সাম্য আচমকায় শুধাল দ্বিতীকে,
“ মাস্ক পরেছিস কেন দ্বিতু? ”
দ্বিতী এতটা সময় কারোর প্রশ্নের সম্মুখীন না হলেও এবারে ক্লান্ত ভঙ্গিতে তাকাল। বলল,
“ মাস্ক? মাস্ক… এই যে রাস্তায় ধূলো অনেক তাই। ”
“রাস্তায় ধূলো বলে? সিরিয়াসলি? ”
সাক্ষ্য শুধু আয়নায় দ্বিতীর হতাশ হওয়া চোখজোড়া দেখছিল আর হাসি চেপে রাখছিল। ভালো রকমের প্যাচে পড়ে গিয়েছে যেন। দ্বিতী ওর মুখের দিকে একবার চেয়েই উত্তর দিল,

“ হু।আর কি জন্য পড়ব সাম্য ভাই? ”
“ তুই এত আহ্লাদি বাচ্চা কবে হয় গেলি দ্বিতু যে ধূলো মানাতে পারবি না?আর গাড়িতে ধূলো আসবে কেন? ”
দ্বিতীর এবার কেঁদে দিতে মন চাইল। বোধহয় বান্ধবীর অবস্থাটা কথা বুঝল৷ তাই তো বিরক্তিভঙ্গিতে বলল,
“ ওর পরতে ইচ্ছে হয়েছে তাই পরেছে সাম্য ভাই। তোমার সমস্যা? ”
সাম্য রেগে চাইল। বলল,
“ তুই কেন নাক গলাচ্ছিস? তোকে যে সাথে বসতে দিয়েছি এটাই তো তোর ভাগ্য। বেডির মতো দেখতে মেয়েদের পাশে আমি বসি না।”
“ কাকে বেডি বললা তুমি? ”
“ তোকে। ”
দ্বিতী এবারে নিজেই বলল কপাল কুঁচকে,

“ তোমার ওকে বেডি কোনদিক থেকে মনে হলো সাম্য ভাই? ”
“ বেডিরাই ওর মতো মোটা হয়। বুঝলি? ”
এই পর্যায়ে সাক্ষ্য ধমকে উঠল। আয়নায় স্পষ্টই কথার চুপসে যাওয়া মুখটা চোখে পড়ল। শক্ত স্বরে বলে উঠল,
“ সাম্য! একদিন বলেছি না এসব নিয়ে কথা বলবি না? ওর শরীর নিয়ে তোর এত সমস্যা কি? ”
সাম্য চুপ হয়ে গেল একেবারে। ভাইকে সে ভয় পায়। শুধু জানালার দ্বারে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল,
“ ও কষ্ট পেলে আমার ভালো লাগে ভাইয়া। শান্তি লাগে এসব বলে ওর মলিন মুখ দেখতে। ”

দুপুর গড়িয়ে বিকালের একটু আগেই সাক্ষ্যদের বাসার সামনে গাগি থামল। সাম্য আর কথা নেমে পড়ল ছটফট। দ্বিতীকে বলে ম পাও বাড়াল। অতঃপর সাক্ষ্য যখন গাড়ি স্টার্ট দিবে তখনই দ্বিতী বলে উঠল,
“ আমিও নামব। সাজি আম্মুর সাথে দেখা করে আসি…”
দ্বিতী নামতে নিতেই সাক্ষ্য তার হাত চেপে ধরল। শান্ত স্বরে মুহূর্তেই বলল,
“ দরকার নেই।গিয়ে আমার মানসম্মান আর ডুবিয়ে আসতে হবে না দয়া করে। বন্ধুদের সামনে করেছেন মেনে নিয়েছি।আম্মু আব্বুর সামনে করলে এক সপ্তাহ আর বাসায় আসতে পারব না। ”
“ তাহলে যেতেই হবে। হাত ছাড়ুন.. ”
সাক্ষ্য থামল না। এক হাতে দ্বিতীর হাতটা ধরে ওভাবেই ড্রাইভ করতে করতে বলল,
“ একেবারে পার্মানেন্টলিই আসুন। সেদিন শান্তিমতো ঘরে তুলব। ”
“ না আসলে? ”
সাক্ষ্যর মুখে বাঁকা হাসি ফুটল। বলল,
“ মত যখন দিয়েছেন তখন না আসলেও তুলে নিয়ে আসব। নো টেনশন। ”
তার আরেকটু সময় পর দ্বিতীকে নিয়ে ওদের বাসার সামনে হাজির হওয়ার পরই সাক্ষ্য গাড়ি থামাল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“ আই থিংক একই রুমে থাকার এক্সপেরিয়েন্স খুব একটা খারাপ না। খু’নোখু’নি, মারামারি কিছুই হলে না। তো আমরা পার্মানেন্টলি একই রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিতেই পারি। রাইট? ”
সাক্ষ্যর চোখে হাসি। দ্বিতী রাগে কপাল কুঁচকাল। সকালের ঘটনার পর সে এখন নেচে নেচে বলবে একই রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিবে? কক্ষনো না। রাগ রাগ ভাব নিয়েই বলল,

দুইজনাতেই পর্ব ২৪

“ একদমই না। আমি সাজি আম্মুকে আগেই বলে রাখব আপনি আর আমি আজীবন আলাদা রুমে থাকব। আপনি এক রুমে আর আমি এক রুমে। মাঝখানে থাকবে ইয়া বড় এক দেওয়াল। ”
সাক্ষ্য দ্বিতীর রাগ রাগ মুখে বলা উত্তর শুনেই সন্তুষ্ট হতে পারল। আওড়াল,
“ আস্তাগাফিরুল্লাহ। এসব বলতে নেই! ”

দুইজনাতেই পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here