দুইজনাতেই পর্ব ৩৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
পুরো ছাদটা ঘুরেও যখন দ্বিতীর দেখা মিলল না তখন আপনাআপনিই সাক্ষ্যর কপালটা কুঁচকে এল। এত রাতে তার বউ হুট করে নিশ্চয় উধাও হয়ে যাবে না? আবার এই বউকেই আজকাল না দেখতে পেলে, বিরক্ত করতে না পারলে এমনকি ঝগড়া করতে না পারলে সাক্ষ্যর ভালো লাগে না। তাই তো মুখ ভার করল। কথাকে একবার জিজ্ঞেসও করল। বলল সন্ধ্যায় বাসাতেই ছিল।
সাক্ষ্য ওভাবেই ফিরল বাসায়৷ বারকয়েক দ্বিতীকে কল ও দিল। অথচ অপরপ্রান্ত থেকে কল তোলা হলো না। আর না তো ফিরতি কল দেওয়া হলো৷ সাক্ষ্য যখন চিন্তায়,অস্থিরতায় এবারে কেমন বোধ হলো তখন আর ও একবার বাসার প্রতিটা ঘর উঁকি দিল। না দ্বিতী নেই। সাক্ষ্য তখনই ভাবল একবার বাসার সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখবে কোথাও গিয়েছে কিনা। তারপর নাহয় দ্বিতীর আম্মুকে কল দিবে। এসব ভেবেই রুমে ফের আসতেই টেবিলের উপর চোখে পড়ল ছোট্ট একটা বক্স। সুন্দর পেপারে মোড়ানো। তার পাশেই বোধহয় কিছু একটা লিখতে বসেছিল মেয়েটা। গুঁটি গুঁটি অক্ষরে লিখা একটা কাগজ। সাক্ষ্য এগোল। কাগজটা তুলে ধরতেই চোখে পড়ল,
“ আজ ১৬ ই জুলাই মিস্টার সাক্ষ্য এহসান। সাপ দিবস। আমি অবশ্য সন্তুষ্ট হতে পারছি না সাপ দিবস ভেবে। আজ তো হওয়া উচিত ছিল গিরগিটি দিবস। ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টানো প্রানিটির জন্মদিন যেহেতু এটাই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আপনি গিরগিটি হয়েও সাপ দিবসেই জন্মগ্রহণ করেছে। সম্ভবত আপনার গিরিগিটি সম্প্রদায় ও আপনার রং পাল্টানো দেখে আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই না বলুন? ”
সাক্ষ্য হেসে ফেলল আচমকা। আনমনে ভেবে ফেলল যে তার বউ বোধহয় তাকে জন্মদিন নামক দিনটাতে গোল খাওয়ানোর জন্যই কোথাও লুকিয়ে আছে ।হয়তো এই কারণেই দেখতে পাচ্ছে না। আবার ফের মনে হলো, দ্বিতী তো এত কাঁচা না। জন্মদিনের লেখাটা সারপ্রাইজ হিসেবেই যদি দেওয়ার থাকে তাহলে এখনো তো বারোটা বাজেনি। তাহলে? সাক্ষ্য ঘড়িতে সময় দেখল। কপাল কুঁচকে দু পা বাড়িয়ে মায়ের কাছে যাবে ভাবতেই ঠিক তখনই তার মা এসে হাজির হলো। মুখচোখে চিন্তার ছাপ রেখে দ্রুত শুধাল,
“ দ্বিতী কোথায় সাক্ষ্য? কথা হয়েছে তোর ওর সাথে? ”
সাক্ষ্য মায়ের এমন চিন্তিত মুখের কারণ বুঝল না বোধহয়। তবে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ফোন ধরলে তো কথা হবে আম্মু?”
“ কথা হয়নি? মেয়েটা গেল কোথায় সাক্ষ্য? পুরোটা বাড়ি, বাড়ির নিচ হতে উপর সব খুঁজে এসেছি। এসেই রুমে এসে খুঁজেছি। পাইনি দেখে সবটা খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পেলাম না। ফোনটাও তুলছে না সাক্ষ্য৷ অদিতি ও ফোনটা তুলছে না। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে রে সাক্ষ্য। মেয়েটাকে তখন কি না কি বলে বের হলাম। নিশ্চয় কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা। আমিও না! কণাকে তখন ওভাবে কাঁদতে দেখে মাথাটাই ঠিক ছিল না। ”
সাক্ষ্য এবারে ভ্রু বাঁকাল। আচমকা জিজ্ঞেস করল,
“ কি বলেছ আম্মু? ”
সাক্ষ্যর আম্মু ছোটশ্বাস ফেলল। নিজে উপস্থিত থাকা অব্দি যতোটা তার সামনে হয়েছিল বা বলা হয়ে়ছিল সবটাই ছেলেকে শুধালেন এক মুহূর্তে। সাক্ষ্য এক মুহূর্ত বোধহয় চুপ থাকল। ঠিক পরমুহূর্তেই বলল,
“ কণার সাথে আমার বিয়ে কোনদিক থেকে ঠিক ছিল আম্মু? আমি মেনেছিলাম কখনো ওকে? নাকি আমায় আগে থেকে জানিয়েছিলে? কণা জায়গা ছেড়েছে বলে দ্বিতী কিভাবে আসল তাহলে? আর তুমি? তুমি ওকে বউ করে আনার স্বপ্ন দেখেছিলে আম্মু। বউ তো হয়নি সে আমার। তাহলে যে আমার বর্তমানে স্ত্রী তার সামনে তুমি কথাগুলো বললে কেন? নাকি কণাকে বড় দেখাতে বলেছো আম্মু? এ কথাগুলো তো কারোরই বলা উচিত হয়নি। হয়েছে? তুমি জানো কথাটা দ্বারা কি বুঝিয়েছো আম্মু? ”
সাক্ষ্যর আম্মু নিরবই রইল। উত্তর করল না। সাক্ষ্য ফের আবার ও শক্ত গলায় বলল,
“ আর দ্বিতী বাসায় না আসতে বলে তো খারাপ কিছু করেনি। আমি নিজেই ওকে বারবার বলেছি দূরে থাকতে। এসব বেহায়াপনা করতে। তোমাকেও বলেছিলাম, মনে আছে? আর গায়ে হাত তোলা? নিশ্চয় কোন কারণ ছিল বলেই মেরেছে আম্মু। কণা এত বাড়াবাড়ি করে যে গায়ে হাত তোলাটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে না আম্মু। ”
শেষটুকুতে সাক্ষ্য আবারও বলল,
“ তোমার থেকে এমনটা আশা করিনি আম্মু। তুমি যেমন নিজের ভাইয়ের মেয়ে কণাকে চেনো, ঠিক তেমনই নিজের বান্ধবীর মেয়ে দ্বিতীকে ও চেনো। চেনো? দুইজনই ছোট থেকে আদরে বড় হয়েছে। দুইজনই তাদের পরিবারের আদরের রাজকন্যা। তাহলে একজনের দুঃখ ভেবে দেখলে, অন্য জনকে না ভেবেই কথার আঘাতে দুঃখ দিলে কেন? কেন? ”
সাক্ষ্যর আম্মু এবারেও উত্তর দিতে পারল না। শুধু হতবিহ্বল নজরে চেয়ে থাকল।
সাক্ষ্য ততক্ষণে আর দাঁড়াল না। দ্রুত পা বাড়াল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে টের পেল তার পিছু পিছু নামছে তার আম্মুও। গাড়িতে উঠতে নিতেই পাশ থেকে দ্রুত বলে উঠলেন,
“ সাক্ষ্য,আমিও যাব। মেয়েটাকে তখন এতগুলো কথা বলেছি এখন নিজেরই ছটফট ছটফট লাগছে। প্লিজ না করো না আব্বু। ”
সাক্ষ্য না করল না। ওভাবেই আম্মুকে পাশে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। মনে মনে কেমন অস্থিরতায় ছটফট করছে যেন। কেবল মনে হচ্ছে দ্বিতীর প্রতিক্রিয়া কি হবে? কি করবে দ্বিতী?
দ্বিতী কাঁদছে। চোখমুখ এতোটা সময়ে ফুলে এসেছে মেয়েটার। লাল টকটকে হয়ে এসেছে চোখজোড়া। প্রথম দফায় মায়ের বুকে সব অভিযোগ পেশ করলেও এবারে রাগ জন্মাল। জেদ হলো। ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মেয়েটা নিজের চুল নিজে খামচে ধরল। কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল,
“ কেন অনুরোধ করেছিলে আম্মু? কেন অনুরোধ করেছিলে বলো? বলেছলাম আমি? বলেছিলাম ঐ ছেলেটাকর বিয়ে করব? আমায় কেন ছোট বানিয়েছো আম্মু?কেন? কেমন আমার পরিবারকেও করুণার পাত্র বানালে বলো? তুমি, তোমরা, সবাই.. সবাই আমার সাথে অন্যায় করলে আম্মু। সবাই! সবাই আমাকে মিথ্যের খোলসে আবৃত এক চকচকে ভালোবাসা দেখালে। আমার জীবনটা নিয়ে খেললে। এন্ড ফাইনালি আমাকে খুব স্বস্তা, খুব স্বস্তা এক মানুষে পরিণত করে দিলে আম্মু। অথচ দ্বিতী এতোটা স্বস্তা নয়। এতোটা স্বস্তা নয় দ্বিতী। ”
দ্বিতী কথাটা বলতে বলতেই নিজের মাথাটা হাঁটুতে ঠুকল বারকয়েক। উম্মাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে নিজের চুল নিজে টেন ধরল খাঁমচে৷ কাঁদতে কাঁদতে যখন মেয়েটার প্রায় দমবন্ধ হয়ে এল ঠিক তখনই এসে হাজির হলো দ্বিতীর বাবাও। ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলেন যেন লোকটা। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে ছুটে আসতেই দ্বিতী মাথা তুলে চাইল। এক হাত বাড়িয়ে মুহূর্তেই কঠিন গলায় বলে উঠল,
“ থাক আব্বু, আর অভিনয় করতে হবে না আব্বু। আমি জেনে গেছি… আমি জেনে গেছি তোমাদের সংসারটা সংসার নয়। শুধুই মরিচীকা। যে মরিচীকাকে আমি সুখী একটা পরিবার ভেবে আঁকড়ে ছিলাম এতগুলো বছর! এতগুলো দিন। কেন আব্বু? কেন দুইজনে আমায় এভাবে ঠকালে কেন বলো? বাইরের মানুষ তো ঠকাল। কিন্তু তোমরাও? তোমরা আমার আপন মানুষ হয়েও ঠকালে এভাবে? কেন আব্বু? আমি কি ডিজার্ব করতাম এই ঠকানোটা? বলো না, করতাম?”
দ্বিতীর বাবা বোধহয় হাঁটু গেড়ে বসল মেয়ের সামনে। কিছু বলতে নেওয়ার আগে দ্বিতী আহাজারি করে কেঁদে উঠল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কোনরকমে বলে উঠল,
“ আব্বু, সব মিথ্যে। সব মিথ্যে আব্বু। তুমি, আম্মু, এই সংসার। সব মিথ্যে। আমি কাকে বিশ্বাস করব বলো? কাকে? আমাকে কি বলেছে জানো আব্বু? কি বলেছে? আমি ভাঙা সংসারের মেয়ে! আমাকে ভাঙা সংসারের মেয়ে বলেছে ওরা আব্বু! বলেছে আমার মায়ের নাকি সংসার করার যোগ্যতা নেই আব্বু। কেন বলল? কেন? কেন আমার আম্মুকে নিয়ে প্রশ্ন তুলল ওরা? কেন আমাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলল আব্বু? তুমি…তুমি কেন আমার আম্মুর হাতটা ছেড়ে দিয়েছিলে আব্বু? ”
দ্বিতীর আব্বু বোধহয় এবারে কেঁদেই ফেলবে যেন। বোধহয় দমবন্ধ হয়ে এল। মেয়েকে কি করে বুঝাবে যে তার আম্মুর হাতটা উনি পুণরায় বহুবার আগলে নিতে চেয়েছিলেন। বহুবার!কিন্তু সম্ভব হয়ে উঠেনি৷ সম্ভব হয়েছিল কেবল মেয়ের সামনে এই অভিনয়টুকু। উনি দী্র্ঘশ্বাস ফেললেন কেবল।
সাক্ষ্য ততক্ষনে দ্বিতীদের দরজার সামনেই দাঁড়ানো। শেষ কথাগুলো সে শুনেছে। স্পষ্টই শুনেছেে।সাথে দ্বিতীর এই রূপটাও চোখের অগোচরে নয়। সাক্ষ্যর নিজেরই লজ্জা হলো কেমন। কে বলেছে এসব? তার আম্মু? নাকি কণা? সাক্ষ্য জানে না। তবে দ্বিতীর অমন বোহাল অবস্থা দেখে সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ই ছুটে এল। শুকনো ঢোক গিলে দ্বিতীর সামনে বসেই কাঁপা স্বরে বলে উঠল,
“ দ্বিতী? ”
দ্বিতী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চাইল। অশ্রুভেজা চাহনিতে তাকাতেই সাক্ষ্য তার হাতটা নিজের হাতে নিল। দ্বিতী প্রায় তড়িৎগতিতেই হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গেই বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নিজ ঘরে যাওয়ার জন্য৷ সাক্ষ্য বোধহয় অপেক্ষা করল না। নিজেও দ্রুতই উঠে দাঁড়াতেই দ্বিতী তীব্র ঘৃণা, রাগ আর জেদ নিয়ে বলে উঠে উঠল,
“ কেন এসেছেন সাক্ষ্য? কেন? একে একে সবাই এসে দয়া দেখাবেন আমাকে? করুণা করবেন? এত করুণা দিয়ে আমি কি করব বলুন? কি করব?”
দ্বিতী বহুকষ্টে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলেও পারল না থামাতে। কেঁদে ফেলল মেয়েটা। অশ্রুভেজা চোখ মুখ, ফোলা চোখ, অগোছালো চুল সব মিলিয়ে এক বিধ্বস্ত দ্বিতী যেন এ। মুখচোখের বেহাল ভাবটা দেখে সাক্ষ্যর কলিজাটা কেমন করল যেন। অস্থির অস্থির অনুভব নিয়ে দ্বিতীকে ফের কিছু বলতে নিতেই দ্বিতী বলে উঠল
“ চলে যান, চলে যান সাক্ষ্য। আমি আপনার সামনে নিজেকে আর করুণার পাত্র হিসেবে দেখতে পারছি না। ঘৃণা হচ্ছে। নিজের প্রতি, আমার পরিবারের প্রতি, আপনার প্রতি, সবার প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। চলে যান সাক্ষ্য..আমি আপনাদের কারোর কোন করুণা নিব না আর। ”
এইটুকু দৃঢ় গলায় বলেই যখন দ্বিতী পা বাড়াতে নিল নিজের ঘরের দিকে ঠিক তখনই সাক্ষ্য হাত টেনে ধরল। কেন মনে হচ্ছে মেয়েটার যে সাক্ষ্য তাকে করুণা করতে এসেছে? কেন? সাক্ষ্য ওভাবেই হাত চেপে ধরে নিজের দিকে টানল দ্বিতীকে। দ্বিতী যখন হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করল ঠিক তখনই সাক্ষ্য উপস্থির সবাইকে ভুলে জড়িয়ে ধরল দ্বিতীকে। শক্ত হাতে চেপে ধরেই বলল,
“ সাক্ষ্য কখনো আপনাকে করুণা করেনি দ্বিতী। কখনো নয়৷ সাক্ষ্যর আপনাকে প্রয়োজন ছিল বলেই জীবনে জড়িয়েছে। সাক্ষ্যর আপনাকে চাই বলেই বিয়ে করেছে। সাক্ষ্যর প্রতি এইটুকু করুণা করে থাকলেও কান্নাটা থামান দ্বিতী। আমি আপনার এরূপ দেখতে চাইনি। কখনো না। আমার বুকের ভেতর যন্ত্রণা হচ্ছে দ্বিতী। কান্নাটা থামান…”
দ্বিতী থামাল না কান্না। বরং সাক্ষ্যর কথাগুলোতে তার কান্না আরো দ্বিগুণ হলো। সে ওভাবেই কাঁদতে কাঁদতে সাক্ষ্যকে ধাক্কা দিয়ে সরাল৷ সমস্ত দুঃখ উজাড় করে আচমকা অশ্রুভেজা
রক্তিম চোখজোড়ায় চেয়ে বলে উঠল,
“ মিথ্যে আর কত সাক্ষ্য? বাচ্চামানুষ নই তো আমি। বুঝি না আমি? এত মেয়ে থাকতে একটা ভাঙা সংসারের মেয়েকে কেন বিয়ে করেছেন সাক্ষ্য? কেন? দয়া করেছেন আমার প্রতি? দয়া? আমার মা বাবার সংসার টিকেনি
বলে আমার উপর দয়া করেছেন আপনি? ”
দ্বিতী কান্না থামাতে পারে না। কান্নার বেগ যেন বাড়তেই থাকে। হেঁচতি উঠে যায় মেয়েটার কাঁদতে কাঁদতে। তবুও বলল,
“ যেখানে ভালোবাসা নেই, যেখানে ভালোবাসার নামে মিথ্যে অভিনয় আছে সেখানে মানুষ কি করে থাকে সাক্ষ্য? কি করে? আমিও ভেবেছিলাম, সবাই ভালোবাসে আমায়। সবাই! সাজি আম্মু, আব্বু, আপনি, সাম্য ভাই, কথা..বোধহয় একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। দিনশেষে কি জানলাম জানেন? সব মিথ্যে। সবই ছিল লোক দেখানো। সবই ছিল মিথ্যে খোলস এক! আমি কি বোকা দেখেছেন সাক্ষ্য? যেখানে আপনি আকদে রাজিই ছিলেন না, আকদের পরও কখনো মানুষ হিসেবেও দ্বিতীর একটু খোঁজখবর নিলেন না,কখনো কোনদিন বললেনই না ভালোবাসেন কিনা সেখানে আমি কি ভেবে নিলাম? ভেবে নিলাম সাক্ষ্য এহসান আমায় ভালোবাসে। কি বোকামো করেছি দেখেছেন? ছিহ! আমার তো নিজেকেই বেহায়া লাগছে। যেখানে আপনি কোনদিন আমাকে ভালোইবাসলেন সেখানে আমি আপনাদের দুইজনের সম্পর্কে কি করে ডুকে পড়লাম বলুন তো। কি করে! ছিহ! কি বেহায়া আমি যে অন্যের জায়গায় গিয়ে বসেছি.. ”
কথাগুলো বলতে বলতেই দ্বিতী বহুবার আটকাল। বারবার হেঁচকি উঠে আটকে যাচ্ছিল মেয়েটা। কেমন নেতিয়ে যাচ্ছিল। তবুও কাঁদছিল। ওভাবেই থেকে থেকে কাঁদছিল আর বলে যাচ্ছিল ওসব৷ শেষ পর্যায়ে এসে শরীরটা আর ধরে রাখতে পারল না বোধহয় সে। নেতিয়ে পড়বে বোধহয়। সাক্ষ্য চেয়েই স্থান কাল সব ভুলে ক্রন্দনরত দ্বিতীকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল। কপালে, ভেজা চোখ মুখে অস্থিরের মতো চুমু দিতে দিতে শুধাল,
“ ভালোবাসি, ভালোবাসি তো দ্বিতী। কে বলেছে বাসি না? ভালোবাসি দ্বিতী। তোমাকেই..শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। তুমিই আমার প্রথম ভালোবাসা দ্বিতী। সে ছোট্ট মেয়েটাই
আমার প্রথম ভালেবাসা। সে চঞ্চল দ্বিতীই আমার প্রথম অনুভূতি। সে মিষ্টি দ্বিতীই আমার প্রথম অস্থির অস্থির অনুভবের কারণ। দ্বিতী, তোমাকেই ভালোবাসে সাক্ষ্য এহসান। তোমাকেই।আর কাউকে নয়। ”
দ্বিতী ঐ মুহূর্তটায় ও সাক্ষ্যর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছিল। যেন সাক্ষ্যর শরীরে থাকলেই তার শরীর জ্বলসে যাবে। অথচ ক্লান্ত শরীরে পারল না। সাক্ষ্যর বাহুবন্ধনেই এলিয়ে পড়ল কেমন। সাক্ষ্য দেরি করে না। দ্বিতীকে কোলে তুলে নিয়েই দ্বিতীর রুমে গেল। বিছানায় শুঁইয়ে দিয়ে নিজেও বসল দ্বিতীর পাশটায়। আর তার ঠিক একটু পরই দ্বিতীর মা এল। শুকনো ঢোক গিলে বলে উঠল,
“ সাক্ষ্য? কিছু মনে না করলে আমি বলি? চলে যাও সাক্ষ্য। আমার মেয়েটাকে আমি সামলে নিব। আস্তে আস্তে বুঝাব। কিন্তু তুমি বা সাজি থাকলে আমার মেয়েটা আরো কষ্ট পাবে সাক্ষ্য। ওর বারবার মনে হবে ওকে করুণা করেছে কেউ। দয়া করেছে কেউ। ”
সাক্ষ্য ফ্যালফ্যাল করেই দেখছিল দ্বিতীকে। কপালে এলোমেলো হয়ে পড়া চুলগুলো হাতে আঙ্গুলে সরিয়ে দিচ্ছিল কানে। অশ্রুভেজা মুখটা রুমালে মুঁছে দিয়েছে। ঠিক তখনই কথাগুলো শুনে সে থমকাল। মাথা তুলে চাইতেই দ্বিতীর আম্মু আবারও বলল,
“ তোমাকে অনুরোধ করেছিলাম সাক্ষ্য? আমি কি বলেছিলাম আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হবেই?বলিনি তো। তাহলে? তাহলে কেন বিয়েটা করে এখন আমার মেয়েটাকে কথা শুনাবে সাক্ষ্য? ”
সাক্ষ্য বোধহয় জবাব দিতে পারল না। অপরাধবোধে কঠিন হয়ে উঠল ভেতরটা। দ্বিতীর মা আবারও বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৩৮
“ তোমায় বলেছিলাম না সাক্ষ্য? যে আমরা একটা সংসারে নেই। তবুও আমরা দ্বিতীর জন্য একটা সংসারে আছি। বলেছিলাম তো তাই না? এও বলেছিলাম দ্বিতীকে এ সত্যটা জানতে দিও না। তোমাকে জানিয়েছিলাম আলাদা ডেকে, কারণ তোমার যদি পরে প্রবলেস হয় তাই। তুমি তো সেদিন বলেছিলে প্রবলেম নেই। বলেছিলে না সাক্ষ্য? তাহলে আজ? আজ কি হলো? তোমায় বিশ্বাস কো কি উচিত ছিল না আমার সাক্ষ্য? ”
