দুইজনাতেই পর্ব ৩৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতী তখন মেঝেতে বসে। চোখজোড়া স্থির, টলমলে। এই নিয়ে ছয়বার সে তার মাকে কল করেছে। ছয় ছয়বার কল করার পরও যখন ওপাশ থেকে কেউ কল তুলল না তখন দ্বিতী একপ্রকার ছুঁড়েই ফেলে দিল ফোনটা। ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা। চোখমুখ লালাভ হয়ে উঠতেই দুই হাতে খামচে ধরল নিজের ছেড়ে দেওয়া চুলগুলো৷ দ্বিতীর শরীর কাঁপল। চোখজোড়া বয়ে নামল নোনা পানির স্রোত। বুকের ভেতরে বয়ে চলা তীব্র অস্থিরতাকে সামলানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা না চালিয়েই সে চুল আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করল,
“ আম্মু? সত্যিই? সত্যিই তোমরা আলাদা আছো? সত্যিই মিথ্যে মিথ্যে নাটক করেছো? আমি…আমি সত্যিই ভাঙা সংসারের মেয়ে আম্মু? আমিই? কিভাবে মানব বলো? এই আম্মু? কিভাবে মানব আমি এটা যদি সত্যি হয়? ”
দ্বিতীর কান্না থামে না। পা খামচে বসে থেকে ঠিক একই ভাবেই বলতে লাগল,
“ আম্মু জানো? তোমার মতো না আর কেউ আমায় ভালোবাসেনি আম্মু। কেউই না। সবাই শুধু ভালোবাসার ভান করে। কেউই সত্যিকারের আপন হয় না। কেন হয় না আম্মু? ঘাটতি ছিল আমার মাঝে? আমি তো চেষ্টা করেছি, প্রাণপন চেষ্টা করেছি আম্মু।আমায় কেন কেউ আপন ভাবল না?কেন কেউ ভালোবাসল না আম্মু? কেন কেউ আমার দিকটাও ভাবল না বলো? ”
দ্বিতী ফের বলল,
“ তুমি সত্যিই অনুরোধ করেছিলে? কেন করেছিলে আম্মু? কেন? তোমার নিজের আত্মসম্মানটা বিলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আমার আত্মসম্মানটাও তো মিশিয়ে দিলে আম্মু। বুঝালে, আমি ঠুনকো। আমি তুচ্ছ! আমাকে এমনি কি কেউ বিয়ে করত আম্মু? সংসারে তুলত না? তুমি তাহলে কেন অনুরোধ করেছিলে উনাদের?”
দ্বিতীর চোখমুখ ক্রমশ লাল হয়ে উঠল। চোখের পানি অঝোরে পড়ছে গাল বেয়ে। কাঁদতে কাঁদতেই মেয়েটা আচমকা নিজের মাথাটা দেওয়ালে আঘাত করল। পরমুহূর্তেই হাঁটু ভাজ করে তার উপর মাথা রেখে বলতে লাগল,
“আমি কি বোকা সাক্ষ্য! বোকাই! অল্প ভালোবাসা দেখলেই ভেবে নিই যে সবাই আমায় ভালোবাসে। অথচ..অথচ সাজি আম্মু নিজেও কণাকে আপনার বউ হিসেবে চেয়েছিল। সাম্য ভাই ও কণাকে আপনার বউ হিসেবে চেয়েছিল। বাহ! আমাকে আপনারা পুরো পরিবার দয়া করলেন? আমার আম্মুর কথা রাখতে আমাকে বিয়েও করলেন। সবাই এমন ভাব দেখালেন যে আমি ভেবেই নিলাম আমাকে বউ হিসেবে পেয়ে সবাই খু্ব খুশি। সবাই আমাকে ভালোবাসে৷ সবাই! কিন্তু….. ”
দ্বিতীর কন্ঠ থেমে এল। কাঁদতে কাঁদতে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল মেয়েটার।শেষ মুহূর্তে নিজের মধ্যে থাকা সমস্ত অভিমান, অভিযোগ নিয়ে ও বলে উঠল,
“ সবাই কণাকে চেয়েছিল। কণাকে চেয়েছিল আপনার বউ হিসেবে৷ তাহলে আমায় কেন টানা হলো আল্লাহ?কেন? আমায় এভাবে হীন বোধ না করালেই কি হতো না? আমায় এভাবে আঙ্গুল তুলে নিজের জায়গাটা না দেখিয়ে দিলেই হতো না? আমি তো কেউ না, কেউ না! এ বাড়িতে আমার উপস্থিতির ভিত্তি নেই সাক্ষ্য। একটুও না। ”
দ্বিতী কথাগুলো বলতে বলতেই হেঁচকি উঠে গেল। হাত পা কাঁপছে কেমন। কাঁদতে কাঁদতে যখন দ্বিতী আরো দুইবার নিজের মাথাটা দেওয়ালে আঘাত করল ঠিক তখনই ফ্লোরে পড়ে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। দ্বিকী চটজলদিই হাত বাড়াল। ফোনটা নিলও। ভাবল তার আম্মুই কল করেছে। অথচ তাকে ভুল করে দিয়ে কলটা করেছে সাক্ষ্য। দুই দুইবার রিং হয়ে কল থেমে তৃতীয়বার যখন আবারও কল এল তখন দ্বিতীর শরীরটা ঘিনঘিন করে উঠল যেন। কেমন একটা রি রি করা অনুভূতি সে ফের আবারও ছুড়ে মারল ফোনটা। রাগে কাঁপতে কাঁপতেই বিড়বিড় করল,
“ কণার সাথে বিয়ে ঠিক ছিল না সাক্ষ্য? ছিল তো।আমি তো কেবল মাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত এক উপস্থিতি, অনাকাঙ্ক্ষিত এক আগমণ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটির সাথে আপনার যোগাযোগ না হোক সাক্ষ্য। না হোক! ”
এইটুকু বলেই আচমকা উঠে দাঁড়াল দ্বিতী। ফোনটা হাতড়ে নিয়ে আলমারি থেকে নিল নিজের হাতব্যাগটা৷ ওড়না টেনে নিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সর্বপ্রথম প্রশ্ন এল,
“ যাও কই এতরাতে? ”
দ্বিতী চাইল। এতোটা সময়ে কেঁদেকেটে মেয়েটার চোখমুখ ফুলে গিয়েছে। চুলগুলো বড্ড এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মুখচাহনি এমন যেন বিধ্বস্ত এক রমণী সে। দ্বিতী উত্তর করল না আজ। ধীর পায়ে পা এগিয়ে সদর দরজায় গিয়ে থামতেই পেছনে থেকে সাক্ষ্যর নানু ফের আবার ও বলল,
“ রাগ জেদ এসব করে স্বামীর সংসার ছাইড়াই চইলা যাইতে পারবা। তোমরা আর সংসার করতে পারব না বুঝছো? হইছো তো পুরো মায়ের মতো৷ স্বামীর সংসারে এমন কত কি হইব যাইব৷ তাই বইলা চ্যাৎ কইরা চইলা যাইতে হয় না। মা ও তো পারে নাই সংসার ধইরা রাখতে। সংসারে সফলও হয় নাই। তুমিও আর কত পারবা? একই মায়ের সন্তানই! মাও সংসার ধরে রাখতে ব্যর্থ হইঝে তুমিও হইবা। তারপর আর কি, মায়ের মতো জীবন কাঁটাইবা। ”
দ্বিতী সব গুলো কথাই শুনল। অতিরিক্ত রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল আরো। চোখে পানি জমেছে আরো। তবুও দ্বিতী থামল না। পেছনে ঘুরে উত্তরটুকুও করল না। ধুপধাপ পা ফেলে যেতে যেতে বিড়বিড় করল,
“ আম্মু? এই আম্মু? তোমার কাছে এই উত্তরটা চাই না। প্লিজ প্লিজ আম্মু, তুমি আমায় অন্য উত্তর বলবে আম্মু। বলবে, এসব মিথ্যে। বলবে তুমি আব্বুকে ভালোবাসো। আব্বুও তোমায় ভালোবাসে। ”
দ্বিতী প্রায় অনেকটা অগোছালো হয়েই ভেঙে পড়া এক মেয়ের মতো ধুপধাপ পা ফেলে মায়ের কাছে পৌঁছাল। বুকের ভেতর চাপা এক অস্থিরতা, টলমল করা চোখজোড়া আর বিধ্বস্ত রূপ নিয়ে যখন প্রায় রাত নয়টায় দ্বিতী মায়ের সামনে হাজির হলো তখন ঠিক প্রথমেই অদিতি আহমেদের বুক কাঁপল। মেয়ের মুখটা ভালো করে পরখ করেই অস্থির হয়ে জানতে চাইলেন,
“ কি হয়েছে দ্বিতী? মুখের এমন হাল কেন তোর? কল দিয়ে এমন উধাও হতে কয়বার নিষেধ করেছি হুহ? আমি একটু নিচে দোকানে গেলাম। এসে দেখি এতগুলো কল! তারপর থেকেই কল দিচ্ছি, তুলছিলি না কেন হুহ? চিন্তায় রাখতে ভালো লাগে তোর? ”
দ্বিতী হতবিহ্বল চাহনিতে চাইল মায়ের দিকে।কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকেই হুট করে কি হলো কিজানি মেয়েটা আচমকাই মাকে জড়িয়ে ধরল। এতোটা জোরে জড়িয়ে ধরল যে অদিতি আহমেদ দুই কদম পিছিয়ে গেলে মায়ের আকস্মিক জড়িয়ে ধরাতে। দ্বিতী ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল, বলল
“ আম্মু… ”
দ্বিতীর গলার স্বরটাও অন্য রকম। অদবতি আহমেদ যখন মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে অস্থির হয়ে বারবার জানতে চাইছিল যে কি হয়েছে কি হয়েছে ঠিক তখনই দ্বিতী আকস্মিক বলে উঠল,
“ আমায় ঠকালে কেন আম্মু? কেন আমার সামনে মিথ্যে মিথ্যে ঘর খেললে? কেন আমায় শেখালে আমরা একটা সুখি পরিবার? কেন আম্মু?”
অদিতি আহমেদ বোধহয় চমকালেন। বিস্ময় নিয়ে চাইলেন সঙ্গে সঙ্গে৷। দ্বিতী ফের আবারও আহত নজরে বলল,
“ আমি ভাঙা সংসারের মেয়ে তাই না আম্মু? তুমি আর আব্বু কেবল অভিনয় করেছো।কি নিঁখুত অভিনয়। আমি এতগুলো বছর বুঝতেই পারিনি। ”
অদিতি আহমেদ মেয়েকে ওভাবে কাঁদতে দেখে দ্রুতই মেয়ের মুখ আগলে ধরলেন। অস্থির হয়ে বলতে লাগলেন,
“ কিসব বলছিস? কে বলল আম্মু তোকে? কে বলল বল? ”
“ ভাঙা সংসারের মেয়েকে ভাঙা সংসারের মেয়ে বলবে না আম্মু? তাই বলেছে। দোষ কি বলো? কিন্তু অন্য কোথাও দোষ আছে অবশ্যই! আমার আম্মুর দিকে বারবার আঙ্গুল তুলেছে। আমার আম্মুর দিাকে। আমার আম্মুর সংসার করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করেছে। আমার আম্মুকে নিয়ে কেন প্রশ্ন করল বলো আম্মু? কেন আঙ্গুল তুলল বলো? কেন এভাবে আঘাত করল বলো?”
অদিতি আহমেদ এবার বোধহয় ধরে নিলেন যে সাজিয়া আফরোজ বা ওর ফেমিলির কেউই বলেছে সবটা। ওরাই তো জানে। যে সত্যটা এতগুলো বছর যাবৎ লুকিয়ে এসেছিল সে সত্যটাই কত নির্দ্বিধায় আঘাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। মেয়ের সাথে সাথে এবার বোধহয় কাঁদলেন উনিও। নোনা পানিরা বইল চোখ বেয়ে৷ দ্বিতী দেখল। ফের আবার প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কেন আম্মু? কেন এই মিথ্যে নাটকটা
করে গেলে এত গুলো বছর যাবৎ? কেন আমার চোখে কাপড় বেঁধে রেখেছিলে? কেন আম্মু? তোমরা কি
ভেবেছিলে কখনো এই সত্যিটা জানার
পর আমি কতোটা কষ্ট পাব
ভেবেছিলে আম্মু? ভেবেছিলে ছোটবেলা থেকে মা বাবাকে সুখী দেখার পর যখন এই কথাটা জানতে পারব তখন আমার মনের কি হবে?কেন ভাবোনি আম্মু? তার চেয়ে বরং আগেই বলতে আমায়। আগেই জানতাম। তাহলে তো কেউ আমার মা
বাবাকে নিয়ে কথা বলতে পারত না আম্মু। কেউ আমায় ভাঙা সংসারের মেয়ে বলতে পারত না। কেউ আমার
মায়ের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারত।আমি দিতামই না আম্মু। ”
কথা তখন ছাদের দোলানাটায় মৃদু আলোয় পড়ছে। রাত প্রায় দশটা। অনেকটা সময় আগেই সাক্ষ্য দ্বিতীকে কলে পাচ্ছে না দেখে কথাকেই কল করে বলেছিল ফিরতে দেরি হবে।কথা ভেবেছিল একবার নিচে গিয়ে বলে আসবে। আবার কি বুঝে যায়নি। সে সন্ধ্যে থেকেই সে ছাদে এসে বসেছে। গত দুইদিনে তার দুটো আইটেমে পেন্ডিং হয়েছে। আগামীকাল যাতে ভালোভাবেই সবটা দিতে পারে তাই মন দিয়ে পড়ছিল। এমন সময়ই সাম্য এল। বিরিয়ানির মৌ মৌ কো গন্ধ নিয়ে বিরিয়ানির প্যাকেট খুলল কথার পাশেই দোলনাটায় বসে। অতঃপর এক গ্রাস মুখে তুলে বলল,
“ মাত্রই কাচ্ছিটা বানিয়েছে বোধহয় বুঝলি? কি সুন্দর ঘ্রাণ বল কাঁথা? রেস্টুরেন্ট থেকে মাত্রই এনেছি। ভোবেছি ছাদে এসে শান্তিতে খাব। কিন্তু তুই বলদ যে এখানে বসা জানতাম না। ”
কথা পাশ ফিরে চাইল। বলল,
“ আমার থাকাতে অসুবিধে হচ্ছে? ”
“ হবে না কেন? জীবনে খেয়েছিস তুই? যদি নজর টজর লাগিয়ে দিস? তখন তো আমার ডায়রিয়া হয়ে যাবে।”
“ ডায়রিয়া হয়ে গেলে হসপিটালে এডমিট হবে। আর কি? ”
“ ছিঃ! অমন সুন্দরী সুন্দরী ডক্টর দের সামনে আমি পাতলা পায়খানা নিয়ে হাজির হবো? পাত্তা দিবে আমাকে? তুই তো দেখি ঘর শত্রু বিভীষণ রে। মানুষজন যাতে আমায় পাত্তা না দেয় তাই বুদ্ধি দিচ্ছিস। ”
কথা সামান্য বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ ভালো। বকবক না করলে ভালো হয় একটু। আমার এমনিতেও দু দুটো পেন্ডিং জমে আছে।”
সাম্য ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ কয়টা? ”
“ দুটো। ”
সাম্য এই পর্যায়ে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ ছিঃ! ছিঃ! ওয়াক থুউউউ! এই তোর ব্রেইন? এই? সারাদিন খেয়ে পড়েও তোর মাথা এতটুকু কাঁথা? লজ্জা হওয়া উচিত। তোর মতো পড়লে তো আমি এতদিনে আইনস্টাইন হয়ে যেতাম। ”
“ হয়ে যেতে পারলে হয়ে যাওয়া উচিত নয় কি? ”
“ একদমই উচিত নয়। সাম্য আইস্টাইন হতে যাবে কেন? সাম্য হবে সাম্যস্টাইন! ”
কথা হেসে উঠল আচমকা। হাসতে হাসতেই শুধাল,
“ আচ্ছা। ”
সাম্য ততক্ষনে কয়েক গ্রাস মুখে তুলেছে। তারপর কি বুঝেই কথার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
“ কিরে? তোকে আজকে খাবার দেয়নি আমার বাপ? মুখচোখ এমন শুকনো লাগে কেন? নাকি শুকিয়ে যাচ্ছিস তুই? ছিঃ ছিঃ! শুকিয়ে গেলে আমি তোকে অপমান করতে পারব না। কষ্ট দিতে পারব না। খবদ্দার, শুকাতে পারবি না। ”
কথা যখন কপাল কুঁচকে চাইতে নিবে ঠিক তখনই সাম্য নিজের হাতের বিরিয়ানিটা ঠেলে দিল৷ বলল,
“ নে, এটা শেষ কর। ওজন বাড়া। তবেই না আমি তোকে অপমান করতে পারব বল? ”
এইটুকু বলেই কথার হাত থেকে বইটা টেনে নিল সে। বিরিয়ানিটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ নে শেষ কর। বাপের টাকায় হলেও আমার পকেটের টাকাতেই কিনেছি। কষ্ট করে বাইক চালিয়ে রেস্টুরেন্ট অব্দি গিয়েছি, বয়ে নিয়ে এসেছি। একটা দানাও নষ্ট হলে তোকে ছুড়ে ফেলব আমি। ”
“ আনা হয়েছে কার জন্য? আমার জন্য? ”
“ যার জন্যই আনা হোক। শেষ করার দায়িত্ব তোর। ”
এইটুকু বলে যেতে নিতেই পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল কথার বিড়ালটাও। সাম্য ওকে দেখেই নাক সিঁটকে বলে উঠল,
“কিরে বেঈমান মালিকের বেঈমান বিলাই, ভালো আছিস? ”
কথা মুহূর্তেই বলল,
“ বেঈমান মালিক মানে? ”
“ অবশ্যই তুই। আর কে হবে? ”
“ আর ও কেন বেঈমান হলো? ”
“ কারণ ও তোর বিলাই। ”
সাম্য এটা বলেই বিড়ালটার দিকে ঝুঁকে বসল। চেপে ধরে দুই হাতের দখলে বিড়ালটাকে নিয়েই দাঁত কেলিয়ে হাসল সে ব লল,
“ কিরে? তোর আম্মা দেখি তোরে কিছু বললেই ছ্যাৎ ছ্যাৎ করে । কারণ কি?”
বিড়ালটা বিরক্ত হলো বোধহয়। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য খামচি ও দিল। মুখে আওয়াজ তুলতেই সাম্য ছুড়ে ফেলল বিড়ালটাকে। বলল,
“ দুইডাই তো সেইম হইছস! একটু থেকে একটুতেই ছ্যাৎ ছ্যাৎ করতাছস। আজব!”
সাক্ষ্য ফিরল প্রায় রাত এগারোটায়। কণাকে কণাদের বাসায় দিয়ে এসেছে তার আম্মুসহই। এরপর আবার ফের ফিরে আসতে আসতে এতক্ষণ। এই এতোটা সময়ে সাক্ষ্য প্রায় আটবার কল দিয়েছে দ্বিতীকে। কি হয়েছে কিছুই জানে না সে। তবে যা বুঝেছে বোধহয় দ্বিতীর সাথে কণার ঝামেলা হয়েছিল। ঝামেলা হওয়াটা স্বাভাবিক। বরং এতগুলো দিন দ্বিতীর মতো চঞ্চল মেয়ে এসব সহ্য করে এসেছে দেখেই সাক্ষ্য অবাক হয়েছিল।
সে নিজেও কণাকে ওয়ার্নিং দিয়েছিল। বারবার বলেছিল এসব ছাগলের মতো আচরণ না করতে। যেমন কণা বিয়ের সময় যে ড্রেসটা নিয়েছিল তা সাক্ষ্যই চেঞ্জ করেছিল। একই রকমের আরো একটা ড্রেস দ্বিতীর জন্য কিনে পাঠিয়েছিল। কণার ড্রেসটা সে নিজেই নিজের আলমারিতে রেখেছিল যাতে এসব না করতে পারে৷ সাথে নিরটে গলায় দুয়েকটা ধমকও দিয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। বুঝিয়েও লাভ হয়নি। তার মাকে বুঝিয়ে ফের আবারও অন্য ডিজাইনের হলেও একইরকমের ড্রেস কিনেছিল।
সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলে। এসেই ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো। অতঃপর কাপড় চেঞ্জ করার সময় টিশার্ট আর টাউজার নিয়ে যেতে যেতেই দুয়েক পলক চাইল এপাশ ওপাশ। না, দ্বিতী নেই। ভাবল হয়তো বেলকনিতে আছে। তাই এক পলক দ্রুত গিয়ে দেখল বেলকনিতেও। অথচ তার বউটা ওখানেও নেই। সাক্ষ্য হতাশ হলো। কাপড় পাল্টে এসে কথার খোঁজ নেওয়ার অযুহাতে একবার কথার ঘরেও গেল। না নেই। পরমুহূর্তে রান্নাঘরে গেল। ওখানেও নেই। সাক্ষ্য হাঁসফাঁস করল বোধহয়। কোথায় তা জানার জন্য সাম্যকেই গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল,
“ বাসায় এসেছিস কতক্ষন? ”
“ এক ঘন্টা হবে। কেন ভাইয়া? ”
“ আম্মুর বান্ধবীর মেয়ে মিসিং। দেখতে পেয়েছিস কোথাও? ”
সাম্য ভাবার চেষ্টা করল। ভেবে বলল,
“ ছাদে দেখেছো? কাঁথা তো ওখানে। হতে পারে ওখানে লুকিয়ে আছে কথার সাথে। ”
দুইজনাতেই পর্ব ৩৭
সাক্ষ্য চাইল। পরপর পা বাড়াল ছাদের দিকে। নিশ্চয় সাক্ষ্যকে নিয়ে কোন ঝামেলা হয়েছে কণা আর দ্বিতীর মাঝে? হ্যাঁ, এমনই হবে৷ আর নয়তো কি ঝামেলা হবে? তাই হয়তো দ্বিতী রাগ দেখিয়ে কল তুলেনি। রাগ দেখিয়ে ঘরেও নেই হয়তো। উফফ! এত রাগ কেন তার বউয়ের? আল্লাহ তার বউকে এত রাগ জেদ না দিলেও তো পারত। ভাবতে ভাবতেই সাক্ষ্য পা বাড়াল। কারণ দ্বিতীকে না জ্বালালে কার ভাত হজম হয়না। দ্বিতীর সাথে ঝগড়া করতে না পারলে উশখুশ উশখুশ লাগে। দ্বিতীকে বিরক্ত করতে পারলে নিজেরই দমবন্ধ লাগে। তাই তো দ্রুত ছুটল ছাদে। অথচ সাক্ষ্য জানেই না, দ্বিতী আজ রাগে নি। আজ জেদ করেনি। বরং দ্বিতীকে আজ জীবন্ত লাশ হিসেবে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে একপ্রকার। তার বউয়ের আজকের অনুভূতিটা শুধুই বিষাদময়, শুধুই! কোন রাগ জেদ সেখানে ঠাঁই পেতে পারেনি।
