দুইজনাতেই পর্ব ৯+১০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্য দ্বিতীকে সহ নেমে রাস্তার ধারেই দাঁড়াল অল্প কিছু সময়৷ দ্বিতী অন্য পাশ ফিরেই দাঁড়ানো ছিল। মুখটা এমন রাখল যেন মেজাজটা খুব খারাপ। সাক্ষ্য একবার চেয়েই হাসল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ নিধি কে? নিধি কে মিসেস দ্বিতীকা তাসিনম? ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। উত্তর করল,
“ তা আমি জানব নাকি আপনি জানবেন? ”
“ জানতে চান তাহলে? ”
দ্বিতী জানতে চাইল না। শুধু বুকে হাত গুঁজে অন্য পাশ ফিরে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বিরক্ত লাগছে তার। সাথে এই মানুষটাকে অসম্ভব রকমের জঘন্য ও লাগছে। কি মনে করে নিজেকে? কোনভাবে দ্বিতীর দুর্বলতা জেনে গেছে বলে কি ভাবে? দ্বিতী এই লোকের জন্য পাগলপ্রায়? বেহায়া? দ্বিতী ওভাবেই থাকল। সাক্ষ্য আবারও ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ জানতে চাইবেন না? ”
“ না। ”
“ কেন? ”
দ্বিতী কাটকাট স্বরে উত্তর করল,
“ অন্যের পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর মতো আগ্রহ বা ইচ্ছে কোনটাই নেই। ”
সাক্ষ্য পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল। একবার ঘড়িতে সময়ও দেখল। অতঃপর উত্তর করল,
“ আপাতত সবার থেকে লুকিয়ে পার্সোনাল হিসেবে আপনাকেই রেখেছি ম্যাম। এইছাড়া কোন পার্সোনাল টপিক তো চোখে পড়ছে না। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে ফেলল। উত্তর করল,
“ চোখে দেখেন ঠিকঠাক? না দেখলে পকেট থেকে বের করে চশমাটা পড়ুন। তখন স্পষ্টভাবেই দেখতে পাবেন। ”
সাক্ষ্য তাই করল। বউয়ের কথা শুনে পকেট থেকে চশমাটা বের করে চোখে গুঁজে নিল। অতঃপর কিছুই দেখতে পেল না এমন ভঙ্গি করে বলল,
“ কিছুই তো দেখছি না আপনাকে ছাড়া। ”
দ্বিতীর রাগ লাগল। এই পুরুষটি অন্যদের সামনে যতোটা গম্ভীর, যতোটা শান্তশিষ্ট ঠিক ততোটাই নাটকবাজ তার সামনে। যেন একটা গিরগিটি! এই এক রূপ তো, এই অন্য রূপ। দ্বিতী না পারতেই হাতের ফোনটা আনলক করে নিধির ছবি খুঁজল। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল। অতঃপর ঐ ছবিটায় সাক্ষ্যর সামনে তুলে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ লুক, এই যে মেয়েটি? এই হলো আপনার পার্সোনাল সাবজেক্ট। আন্ডারস্ট্যান্ড? ”
সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল নিধির ছবিটার দিকে। অতঃপর নিজেও এভাবে দাঁড়িয়ে ফোন থেকে খুঁজে বের করল নিজেদের কাবিননামার ছবিটা। দ্বিতীর মতো করেই ছবিটা দ্বিতীর সামনে তুলে ধরে বলল,
“ লুক? সিগনেচারে নামটা দেখতে পাচ্ছেন? সি ইজ মাই পার্সোনাল সাবজেক্ট। ”
দ্বিতী তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল এবার। বলল,
“ ওহ রিয়েলি? অথচ তার সাথে আপনার কিছুই মিলে না। না তো ড্রেসের কালার, না তো মতামত, না তো আচার আচরণ। ”
“ মিসটেক, আই থিংক তার সাথে আমার মতামত কি, কারোরই মতামত মিলে না। ”
দ্বিতী এবারে রেগেই তাকাল। জানাল,
“ কিন্তু আপনার সাথে অনেকেরই মিলে। ড্রেসের কালার, ঘুরতে যাওয়া আরো কত কি… ”
সাক্ষ্য বুকে হাত গুঁজেই দাঁড়াল। দ্বিতীর কথার পিঠে বলল,
“ কার সাথে আমার এত মিল জানতে না পারলে তো আপসোস হচ্ছে ম্যাম। প্লিজ টেল মি..”
দ্বিতীর গা জ্বলে উঠল যেন। সহ্য হচ্ছে না পুরুষটাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ নাটক করবেন না মিস্টার সাক্ষ্য এহসান। বোকা পেয়েছেন আমাকে? নাকি মনে হচ্ছে আমার মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই? ”
সাক্ষ্য ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ আছে? ”
দ্বিতী ফুঁসে উঠে বলল,
“ অবিয়েসলি আছে। এইটুকু বুঝার মতো জ্ঞান আমার আছে। ”
“ সবজান্তা জ্ঞানী রমণী! ”
দ্বিতী কেমন করে চাইল যেন। আর এক মুহুর্তও দাঁড়াল না আর। দাঁড়াতে ইচ্ছে হলো না। রাগে গজগজ করতে থাকা দ্বিতীর গা জ্বলছে এখন। সাক্ষ্য এহসানের সাথে এক মুহুর্তও দাঁড়ানোর মতো ধৈর্য্য ও হচ্ছে না আর।এই কারণেই পা বাড়াল। একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই বাসার সামনে রাস্তাটা পার হতে নিতেই একটা রিক্সার সামনে পড়তেই পেছন থেকে কেউ হাত টেনে ধরল। হেঁচকা একটা টান দিয়ে পিছনের দিকে টেনে নিতেই দ্বিতী বোকার মতো চাইল। আরেকটু হলে রিক্সাটা মেরে দিত বোধহয়। যদিও রিক্সার আঘাতে দ্বিতী মরত তবুও কে বাঁচাল তা ফিরে চাইতেই দেখল সাক্ষ্য। মুখে বলল,
“ অদিতি আন্টির মেয়ে এত বেশি জ্ঞানী অথচ পথে ঘাটে এভাবে গাড়িঘোড়ার নিচে পিস্ট হয়ে মরে যাচ্ছে বিষয়টা তো দুঃখজনক! সাবধানে চলাফেরা করেন না কেন? ”
দ্বিতী কাটকাট স্বরে জানাল,
“ মিথ্যে দুঃখ দেখাতে আসবেন না একদম। ”
“ দুঃখ দেখানো যায় মিসেস দ্বিতীকা? ”
“ আপনার মতো মানুষদের লোক দেখানো দুঃখ দেখা যায়। ”
“ আর? ”
“ আর দেখা যায় আপনার সাথে ভার্সিটির মেয়েদের আদুরে প্রেমকাহিনী। খুব জোশ! প্রতি সপ্তাহে একটা একটা করে প্রেমকাহিনী দেখাবেন কেমন? ”
“ ওকে, সঙ্গ দিয়েন আমাকে। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই ফিরে চাইল। বুঝে না উঠে খুবই রুষ্ট হয়ে বলল,
“ কি? ”
সাক্ষ্যর উত্তর এল,
“ প্রেমকাহিনী দেখতে চান যেহেতু সঙ্গ দিবেন। একা একা তো আর প্রেমকাহিনী দেখাতে পারব না। ”
দ্বিতী তীর্যক চাহনিতে চাইল।পরমুহুর্তেই নজর ফেরাতেই দেখা গেল সাক্ষ্য নিজের ফোনটা ফের আবার ও দ্বিতীর দিকে তুলে ধরল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“লুক, মিসেস সাক্ষ্য এহসান। ”
দ্বিতী ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়েই তাকাল। সাক্ষ্যর দিকে না তাকিয়েই চাইল ফোনের স্ক্রিনে। যেখানে সাক্ষ্যর সাথে দেখা গেল আরো তিন তিনটে যুবককেও। চারজনেরই মুখ হাস্যোজ্জ্বল। পেছনের দৃশ্য দেখে বুঝা গেল এটাও একটা মেলা। যেমন মেলার সিন নিধির দেওয়া ছবিতেও ছিল। দ্বিতী মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই সাক্ষ্য বলে উঠল,
“ এতোটা মনোযোগ দিয়ে দেখছেন যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ লেসন ম্যাম। ”
দ্বিতী মুহুর্তেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“ এটা আমাকে দেখানোর মানে? ”
“ বুঝে নিন। ”
“ বুঝলাম না। ”
সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ এই ছবিতে কোথাও কোন মেয়ে দেখছেন আমার সাথে? ”
দ্বিতী আরেকটু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সাক্ষ্যর থেকে অনেক দূরে মেলার মধ্যে দুয়েকজন মেয়ে চোখে পড়ল। আঙ্গুল উঁচিয়ে ধরে বলল,
“ এইতো মেয়ে। একটা, দুটো, তিনটে…”
সাক্ষ্য নিজেও বোধহয় অবাক হলো এবারে। কি বলে? কোথায় পেল এই মেয়ে একটা, দুটো, তিনটে মেয়ে? সাক্ষ্য মুহুর্তেই মোবাইল ফিরিয়ে নিল নিজের দিকে। পরখ করে দেখতে লাগল কোথায় মেয়ে। অতঃপর যা দেখল তা দেখে হতাশ হয়ে শুধাল,
” রিয়েলি? অতে দূরের মেয়ে গুলো আমার সাথের মনে হলো আপনার? আমি বলেছি আমার সাথের মেয়ের কথা…”
“ আপনার সাথে যায় নি তার কি প্রমাণ? ”
সাক্ষ্য ফের মোবাইল পকেট ফুরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল,
“ হু, এই শহরের সব মেয়েই আমার সাথে গিয়েছিল। ”
সাম্য তখন ছাদের এককোণে বসা।একটু আগেই বাবা তাকে হুমকি ধামকি দিয়ে বহু বড় একটা লেকচার দিয়েছে। যার সারমর্ম হলো জীবন নিয়ে সিরিয়াস হও। বন্ধুবান্ধব, ফাজলামো, মজা-মাস্তি করে জীবনে কাঁটবে না। অথচ জীবন নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার ইচ্ছাও সাম্যর নেই। মজা, আড্ডা, ট্রিপ, বন্ধুবান্ধব এসব মানেই এই বাড়ির ছোট ছেলেটা। সাম্য রাগে দুপুরের খাবারটাও খায়নি। বদমেজাজি স্বভাবটা বাবার সামনে না দেখালেও ছাদে এসে দুয়েকটা সিগারেট ফুঁকে সে রাগ উড়ানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই নুপূরের আওয়াজ পাওয়া গেল। চারতালার ছাদের চিলেকোঠার ঘরটাতে কথার বিচরণ হয় প্রায়সই। কারণ গাছেদের পরিচর্যার জন্য সমস্ত কিছু ওখানেই রাখে মেয়েটা। সাম্য ভাবল এই কারণেই এসেছে। কবে নুপূরের আওয়াজটা ক্রমশ নিজের দিকে আসতেই ঘাড় ফিরিয়ে চাইল। কথা এদিকেই আসছে। এক হাতে খাবারের প্লেট,অন্য হাতে পানির বোতল। সাম্যর সামনে এসেই খাবার আর পানির বোতলটা রেখেই হাঁটু গেড়ে বসল। বলল,
“ তুমি না খেয়ে এসেছো কেন? লাটসাহেব সাজছো? ”
সাম্যর মেজাজ খারাপ এমনিতেই। তার উপর যে কথাকে সহ্যই করতে পারে না সে কথাই এসব বলছে। রাগে একপ্রকার জ্বলে উঠেই বলল,
“ তোর মতো হাতি তো আর হচ্ছি না খেয়ে খেয়ে। তো? তোর সমস্যা কি? ”
“ তোমার মতো পাটকাঠি হাতি জতে পারবেও না। খেয়ে নাও। ”
সাম্যর রাগ হলো। আঙ্গুল উঁচিয়ে রক্তলাল চোখে চেয়ে বলল,
“ বলেছিলাম তোকে খাবার আনতে? কেন এনেছিস? ঢং দেখাচ্ছিস হুহ? তুই কত মহান, ভালো তা দেখাচ্ছিস আমায়? ”
কথা ছোটস্বরে বলল,
“ না। খেয়ে নাও, বড় মামাকে আমি বুঝিয়ে বলব। ”
“ বাহ! এসেছেন মহান মানবী। তুই বুঝিয়ে বললে আমি খুব খুশি হয়ে যাব? তুই তো সব নষ্টের মূল। আবার আমার সামনে ভালো সাজিস?”
কথা ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ তোমার কেন মনে হয় আমি ভালো সাজি? আমি সত্যিই তোমার ভালো চাইতে পারি না? ”
” পারিস না। তোকে আমার বিরক্ত লাগে। বিরিয়ানির মাঝে এলাচি যেমন তেমনই তুই। আমাদের পরিবারে কোথায় থেকে উড়ে এসে ঝুড়ে বসেছিস। ”
কথা এবারে ছোটশ্বাস ফেলল। বোধহয় কষ্টও পেল। তবুও চেয়ে ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ আচ্ছা। এখন খেয়ে নাও। বিকাল হয়ে যাচ্ছে। ”
“ দরদ দেখাবি না কাঁথার বাচ্চা কাঁথা? মেজাজ খারাপ হলে তোকে ছাদ থেকেও ফেলে দিব। ”
“ ফেলে দাও। ”
সাম্য হাসল এবারে। হাতের সিগারেটটা অবহেলায় ফেলে দিয়ে বলল,
” অবশ্য তোর আস্ত এক ডাইনোসরকে কি করে ফেলব? যা ওজন করেছিস আমার বাপের টাকায় খেয়ে খেয়ে।”
কথা শুনল। এই পর্যায়ে সত্যিই চোখ টলমল করল মেয়েটার। কষ্ট হলো। গলার কাছে কান্নারা এসে জমে রইল যেন। কথা শুকনো ঢোক গিলল। ওভাবেই খাবারটা রেখে গিয়ে উঠে দাঁড়াল। যেতে যেতে কোনরকমে বলল,
“ যদি মন চায় খেয়ে নিও। তোমার পছন্দের কাচ্চি আছে। বড় আম্মু,আমিো কেউই খাইনি এখনো। বড় আম্মু বলেছে, তুমি খেলে খাবে।বড় আম্মুর কিন্তু মেডিসিনও আছে। ”
এইটুকু বলেই কথা পা বাড়াল। ধীর পায়ে যেতে যেতেই আবারও বলল,
“ তুমি আমাকে খারাপ ভাবলেও আমি তোমার খারাপ চাই না। কখনো চাইনি।”
মাঝে দ্বিতীর সাথে সাক্ষ্যর আর আলাদা ভাবে কথা হয়নি। সাক্ষ্য বরাবরের মতোই ভার্সিটিতে এমন একটা ভান করেছে যেন দ্বিতীকে চেনে না। ঠিক একইরকম ভান দ্বিতী নিজেও করেছে। সাক্ষ্যকে কোন বাড়াবড়ি রকমের গুরুত্ব দেয়নি। তাকায় ও নি। দ্বিতী ক্যান্টিনেই ছিল। কয়েকদিন পর ভার্সিটিতে পহেলা বৈশাখের কালচারাল প্রোগাম বলেই নাচ, গান নিয়ে রিহার্সাল চলছে। মিহু নাচ করবে। খেয়া বোধহয় গান করবে। আর দ্বিতী এসে ঘুরঘুর করে দেখে যাবে আর ছবি তুলবে। এইটুকু ট্যালেন্ট ভেবে নিয়ে দ্বিতী বার্গারে কামড় বসায়। মিহুকে বলল,
“ তুই আর ঈশান না নাচ করবি? ”
“ হু। ঈশান অবশ্য দারুণ নাচ করে। তুই ও তো চাইলে নাচ করতে পারতি দ্বিতী। ”
দ্বিতী হেসে বলল,
” আমি? জীবনেও না। ”
“ ভালো। বসে বসে দেখিস আমার নাচ।এই দোস্ত? আমাদের রিহার্সালটা ভিডিও করে দিস তো। সাক্ষ্য স্যারের সাথে কথা আছে একটু। এরপরই রিহার্সাল। ”
“ কিসের কথা? ”
“ ঐ প্রোগ্রাম নিয়েই। ”
দ্বিতী মানল। অতঃপর খেতে খেতে দুয়েকবার এদিক ওদিক চাইল। তারপর মিহুকে কথা বলে আসতে। তারপর নাহয় রিহার্সাল দেখতে যাবে দ্বিতী। অতঃপর মিহু কথা বলে এল মিনিট পনেরো পরই। এসেই বলল,
“ সাক্ষ্য স্যার তো দারুণ গান গায় রে দ্বিতী। প্রোগ্রামে স্যারও গান করবে। বাহ বাহ! গিটারও বাজাতে পারে দারুণ! ”
দ্বিতী শুনল। পুরোনো কথা নয়। সে জানে এটা। তবুও চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে বলল
” কি? তাই নাকি? তাহলে তো এবার সবাই কন্ঠের উপরও প্রেমে পড়বে। কন্ঠের প্রশংসা করতে করতে ভার্সিটি উড়িয়ে দিবে বল? ”
” প্রশংসা করার বিষয় প্রশংসা করবে না? ”
দ্বিতী মাথা নাড়াল। জানাল,
“ অবশ্যই, অবশ্যই! কেন করবে না?”
অবশেষে প্রোগ্রামের দিনটা হাজির হলোই। দ্বিতীরা তিন বান্ধবীই পরেছে লাল- সাদা শাড়ি। কানে গুঁজেছে লাল গোলাপ। সাথে ভার্সিটির সবটা জুড়েই রঙিন সাঁজ! দ্বিতী ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ভার্সিটির অলিগলি ঘুরে ঘুরে নিজ ডিপার্টমেন্টে হাজির হলো। অতঃপর তিন গল্প গুজবও করল। এর অনেক পরেই গানের আয়োজন শুরু হলো। মিহুদের তখন নাচের রিহার্সাল চলছিল শেষবারের মতো। স্টেপগুলো সহ বিভিন্ন কিছু মিলিয়ে নিচ্ছিল। ঠিক সে মুহুর্তেই শোনা গেল সাক্ষ্য আর নিধির যৌথ গান। নিধির পরনে লাল সাদা শাড়ি। সাক্ষ্যর পরনে সাদা পাঞ্জাবী। হাতে গিটার। একহাতে আলতো করে সুর তুলছিল পাশে দাঁড়িয়েই। দ্বিতী সবটাই মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। দারুণ! দারুণ মানিয়েছে দুইজনকে। আশপাশে তখন নানারকমের গুঞ্জন। এমনিতেই ভার্সিটিতে এই দুইজনকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল তা যেন আজকের অনুষ্ঠানে পরিপূর্ণ হলো। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছের।আশপাশে শুধু বাহবা! দ্বিতী ফিরে চাইতেই দুয়েকজনের মুখে এমনও শুনল,
“ কি সুন্দর কাপল! কি সুন্দর কাপল! সাক্ষ্য স্যার আর নিধিকে সত্যিই কি দারুণ মানিয়েছে রে! ”
দ্বিতী শুনেই আরো সুচালো নজরে চাইল। ফের আবারও শুনল ভীড় থেকে,
“ সেরা! সেরা। সেরা কাপল! ”
দ্বিতীর সহ্য হলো না। একেই তো নিধির সাথর সাক্ষ্যকে সহ্য হয় না। এখন আরো হচ্ছে না। গা জ্বলছে। রাগে জেদে বসে বসে শুধু সুচালো নজরে পরখ করছিল সবটা। দূর থেকেই দেখে দেখে রাগ পুষছিল আর বিড়বিড় করল,
“ মিস্টার সাক্ষ্য এহসান, ভার্সিটিকে কাপল মেমোরি রাখার এত ইচ্ছে তাই না? রাখুন। আমিও রাখব। ”
এইটুকু বলেই উটে দাঁড়াল। নাকটা লাল হয়ে উঠেছে মেয়েটার। চেহারা হয়ে উঠেছে রক্তিম। রাগে জেদে উঠেই হনহন করে পা বাড়াল ডিপার্টমেন্টের দিকে। তখন শেষবারের মতো নাচের রিহার্সাল হচ্ছিল। অতঃপর সাক্ষ্য এহসানের উপর রাগ পুষতে থাকা দ্বিতী ওখানে গিয়েই থমথমে মুখে শুধাল,
“ আমি নাচ করব। ”
সিনিয়র আপুটা দ্বিতীর পরিচিত। ভাব ভালো। দ্বিতীকে রিকুয়েস্টও করেছিল নাচের জন্য। তবে তখন দ্বিতী রাজি হয়নি। হুট করে এই মুহুর্তে এসে বলাতে উত্তর করল,
“ এখন কিভাবে দ্বিতী? তুমি তো রিহার্সাল ও করোনি। নষ্ট হবে নাচগুলো। একক নাচবে? গান সিলেক্ট আছে? প্রেকটিস করেছো হু?”
দ্বিতী উত্তর করল,
“ না, আমি পারব। মিহুর বদলে নাচ করব। ওকে বাদ দিয়ে আমায় দিন। ”
মিহু বেচারা মুখ নারাজ করে তাকাল। বলল,
“ কেন? ”
দ্বিতী যে রেগে আছে বুঝতে বাকি নেই মিহুর। এই প্রশ্নটা শুনেই ফের রেগে বলল,
“ আমার ইচ্ছে। তুই পরেরবার নাচিস। এবার আমাকে নাচ করতে দে। বিনিময়ে সিনিয়র ভাইয়ার সাথে পথ ক্লিয়ার করে দিব। ”
মিহু হয়তো রাজি হতো না। তবুও বান্ধবীর থমথমে মুখ দেখে রাজি হলো। বলল,
“ আচ্ছা। কর। ”
বহু কষ্টে সিনিয়র আপুদেরও মানানো হলো। অতঃপর ঈশানের সাথেই গান চালিয়ে নাচের স্টেপ গুলো দেখানো হলো। দ্বিতী মনোযোগ দিয়েই প্রেকটিস করল। যেন নাচ করবেই জেদ চেপেছে ।এবং এই জেদের কারণেই হয়তো বা প্রথমবার প্রেকটিস করেই দ্বিতী ঈশানের সাথে নাচটা খুব ভালোই করল। ঠিক তখনই ওখানে সাক্ষ্য এল। বোধহয় টাইমটা বলতেই এসেছিল। কিন্তু এসেই এককোণে ঈশানের হাতে দ্বিতীর হাত আর এতোটা কাছাকাছি থেকে দুইজনের নাচের স্টেপ গুলো দেখে সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকাল। বাম ভ্রু উঁচু করে সরু চাহনিতে চাইতেই সিনিয়রদের মধ্যে থাকা মুনিয়া এগিয়ে এল। জানাল মিহু সমস্যা হওয়াতে ওর বদলে দ্বিতী নাচ করবে। সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকাল। মনোযোগ দিয়ে দ্বিতীর পদক্ষেপ গুলো দেখেই হঠাৎ মনে হলো সাক্ষ্যর বোধহয় ঈশানকে হিংসে হচ্ছে। বউ তার। কবুল বলেছে তারই নামে। অথচ শাড়ি পরে নাচ করছে অন্যজনের সাথে? কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেও, আবার হাতও ছুঁয়ে আছে সে ছেলেটা। সে ছেলেটা যে কিনা দ্বিতীকে পছন্দ করে। সাক্ষ্য নিরব থেকেই তাকিয়ে দেখল। অতঃপর হুট করেই গম্ভীর গলায় বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৮
“ দ্বিতীকা তাসনিম? এদিকে আসুন। এভাবে হুট করে আপনাকে নাচে নেওয়া হবে না। ”
দ্বিতী আর ঈশান তখনই থেমে তাকাল। তখনও দুইজন কাছাকাছি দাঁড়ানো। সাক্ষ্য আবারও বলল,
” কি বললাম আপনাকে? এদিকে আসুন। কথা আছে। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকাল। না পারতেও গিয়ে দাঁড়াল সাক্ষ্যর সাথে। সাক্ষ্য ফের আবার বলল,
“ মিহিমা জান্নাত, রোলটা আপনার ছিল না? আপনিই করবেন নাচ। ওকে? আর আপনি? আমার সাথে আসুন।”
শেষের দুই বাক্য দ্বিতীকে উদ্দেশ্য করে বলেই সাক্ষ্য পিছু ঘুরল। পা চালাতে চালাতে দ্বিতীও পা চালাল। কি জন্য ডেকেছে? নিধির আর তার গান শোনানোর জন্য? যত্তসব!
