Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৫)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৫)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৫)
মাইশা জান্নাত নূরা

তেজ নির্ঝরের সামনে এসে দাঁড়ালো কোমরের উপর দু’হাত রেখে। তেজ ওর ভ্রু যুগল কুঁচকে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্ঝর ওর মুখ ভর্তি করে অনেক গুলো ছোট ছোট পিঁয়াজু নিয়েছে। ফলস্বরূপ চিবানোর মতো অবস্থাও নেই ওর৷ গাল দু’টো ফুলে আছে। আর দু’হাতেও দু’টো করে চারটে সিঙ্গারা ধরে রেখেছে নির্ঝর। তেজ নাক ছিঁ*টকে বললো….

—”শা*লার বেটা, রা*ক্ষ*সের মতো সবগুলো পিঁয়াজু মুখে ভরে নিয়েছিস আবার সিঙ্গারা গুলোর উপরেও রাজত্ব বসিয়েছিস৷ এখন গলায় আটকে পটল তুলিস যদি তখন তোর জন্য আমায় মা*র্ডা*র কেসে ফাঁ*সতে হবে।”
নির্ঝর তেজের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে চিবোনোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আর একটু পরপর ঢোক গি*লছে। মুখ দিয়ে কেবল ‘উমম ওও’ এমন টাইপের আওয়াজ ভেসে আসছে নির্ঝরের। তেজ ওর এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের মুখ বরাবর উঁচু করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো…..

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”ইচ্ছে তো করছে এই ঘুঁ*ষি তোর দু’গালে মারি। তাহলে আর এতো কষ্ট করে তোকে চিবোতে হবে না। ওভাবেই গিলে নিতে পারবি। কি বলিস? মা*রবো?”
নির্ঝর দ্রুত ওর মাথা এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিলো। তেজ বললো….
—”তাড়াতাড়ি নিজের এই মুখ নামক গুদামঘর ফাঁকা কর। বাহিরে যেতে হবে।”

ইলমা যেই হাত অনুর কাঁধের উপর রেখেছে ওর সেই হাত মৃদুভাবে কাঁপছে। অনু বললো……
—”তখুনি দাঁ-টা বাবার বুকের ঠিক বাম পার্শে গেঁথে গেলো। খেয়াল করলাম দাঁ-এর উপর হাত কেবল আমারই রাখা ছিলো। বাবার চোখের আকৃতি অনেক বড় দেখাচ্ছিলো। মা নিজের মুখের উপর একহাত চেপে ধরে দু’কদম পিছিয়ে গেলেন। বাবার বুকের গেঁথে যাওয়া অংশ ফাঁ*ক দিয়ে র*ক্ত গুলো ছিটকে এলো আমার চোখে-মুখে, গলায়-হাতে। আত*ঙ্কে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। মুখটা হা হয়ে গিয়েছে। নিঃশ্বাস পড়ছিলো ভিষণ ঘন ঘন ও ভাড়ি ভাবে। চোখের সামনেই বাবা ধ*প করে পিছন দিয়ে আধপাঁকা মেঝের উপর পরে গেলেন। বিকট এক শব্দ হলো। বাবার মুখের দু’পাশ দিয়ে গল গল করে র*ক্ত পড়তে শুরু হলো। হাত-পা হালকা ঝাঁকিয়েই বাবা স্থির হয়ে গেলেন। বাবার থেকে ১-দেড় হাত দূরে মায়ের ছোঁ*ড়া পাথরের আ*ঘা*তে অচেতন হয়ে থাকা সেই লোকগুলোর সেন্স ফিরে এসেছে। তারা দু’হাতে নিজেদের মাথা ও শরীরের ক্ষ*ত স্থান গুলো চেপে ধরে বসে পড়েছেন।

আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। পুরো পৃথিবী যেনো আমার সামনে থেমে গিয়েছে। কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। শরীরও চলছে না। মা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘অনু চল আমার সাথে। তোকে ট্রেনে উঠায় দিতে হবে। ট্রেনটা যে চলে যাবে। এই ট্রেন চলে গেলে তোর বাপের মতো তোর জীবন এর বাতিও বুইজ্জা যাবে।’ মায়ের কথাগুলো যেনো আমায় শক্তি জোগাতে পারছিলো না নিজ জায়গা থেকে নড়াচড়া করার জন্য। বাবার সঙ্গী লোকগুলো যখন নিজেদের সামলে নিয়েছেন অনেকটা তখনই তাঁদের নজর পড়লো বাবার নিথর ভাবে পরে থাকা দেহটার উপর। যে দেহের বুকের উপর এখনও ধাঁ*রা*লো দাঁ-টা গেঁথেই রয়েছে। মা এবার আমাকে ঝাঁকালেন। জোড়ে জোড়ে ঝাঁকালেন। আমি আমার হাত দু’টো সামনে তুলে ধরলাম। তাজা র*ক্ত আমার হাতে লে*প্টে আছে। আমি প্রাণহীন চোখে তাকালাম মায়ের দিকে।

বললাম, ‘মা র*ক্ত, আমার হাতে কতো র*ক্ত দেখো! সব বাবার র*ক্ত। মা, আমি আমার বাবাকে জানে মা*ই*রা ফেলছি। বাবার জান আমার আ*ঘা*তে গেলো মা! ঐযে বাবার বুকে দাঁ-টা বসানো আছে, ঐ দাঁ আমি বসাইছি। আমার চোখে-মুখে বাবার কলিজা ছেঁদ করা র*ক্ত গুলো ছিঁ*টকে ছিঁ*টকে এসে লাগছে মা। আমি খু*নি। ও মা, কও না আমি খু*নি? খু*ন করছি আমি আমার বাপরে? কও না মা!”
অনু থামলো। ও এখনও নিজের সামনে হাত দু’টো উঁচু করে ধরে আছে। অনু দৃষ্টি ইলমার উপর স্থির। সেই ভ*য়, সেই আ*তঙ্ক যা সেইরাতে অনু চোখে-মুখে ফুটে ছিলো তা এখনও ফুটে উঠেছে। যেনো মাত্রই অনু খু*নটা করলো। এই রুমেই মেঝের উপর পরে আছে যেনো অনুর বাবার নি*থর দেহখানা। আর অনুর সামনে যে আ*ত*ঙ্ক ভরা মুখশ্রী নিয়ে বসে আছে সে ইলমা না সে যেনো ওর মা।

নীরার রুমে বিছানার উপর বসে আছে পিহু। নীরা পিহুর সামনেই মেঝের উপর পায়চারি করছে। পিহু তীক্ষ্ণ নজরে নীরাকে পর্যবেক্ষণ করছে অনেক সময় হলো। পিহু বললো…..
—”নীরা! কি হয়েছে তোমার? এমন অস্থির অস্থির দেখাচ্ছে কেনো তোমায়?”
নীরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো….
—”বুঝছি না ভাবীপু, কিচ্ছু ভালো লাগছে না। বুকের ভিতরটাতে কেমন যেনো অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে।”
—”আমার পাশে এসে বসো তো। তারপর বলো আমায় কি চলছে তোমার মনে।”
নীরা শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে পিহুর পাশে এসে বসলো। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বললো না। পিহু আবারও বললো….

—”ছেলেকে মিস করছো?”
—”হু। নির্বাণের কথাও মনে পড়ছে ভিষণ। ওর দায়িত্ব যেই ২ জন কেয়ারটেকারের উপর দিয়ে এসেছিলাম তাঁদের মধ্যে একজন তো তালবাহানা শুরু করে দিয়েছে ক’দিন হলো। তাই চিন্তাও হচ্ছে ভিষণ।”
—”নির্বাণকে বাংলাদেশে নিয়ে আসলে কেমন হয়?”
নীরা অবাক চোখে পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো….
—”কি বলছো এসব তুমি ভাবীপু! নির্বাণকে বাংলাদেশে আনবো কি ভাবে? আর ওকে আনার পর রাখবোই বা কোথায়?”

—”রাখলে এই বাড়িতেই রাখতে হবে। আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই নির্বাণকে রাখার মতো।”
—”এই বাড়িতে? এই বাড়িতে ওকে কোন পরিচয়ে আনবো? বাড়ির সবাই তো সবটা বুঝে যাবে তখন কতোটা বা*জে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে ভেবে দেখেছো?”
—”উহুহ, হবে না এমন কিছু৷ কোমর বেঁধেই মাঠে নামতে হবে ছয় বলে ছয় ছক্কা মা*রার জন্য।”
—”মানে?”
—”মানে-টানে পরে বুঝায় বলবো। আগে আমি পরিকল্পনাটা সাজিয়ে নেই তারপর তোমার ভাইদের সাথেও আলোচনা করতে হবে এই বিষয়ে। তারপর তো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় আসবে।”
নীরা আর কিছু বললো না।

শিউলি আর আতুশি তাহমিনার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আতুশি ফিসফিস করে বললেন…..
—”বড়ভাবীকে কি এখুনি এই বিষয়ে বলাটা ঠিক হবে মেজো ভাবী?”
শিউলিও ফিসফিসে প্রতিত্তুর করলেন…..
—”এখন না বললে কখনই বলতে পারবি না। আর সবথেকে বড় কথা ছেলেটা অনেকদিন হলো মেয়ে খুঁজছে বিয়ের জন্য৷ আমরা কিছু বলা বা করার আগে যদি নিজেই কোনো ব্যবস্থা করে নেয় তখন কিন্তু তোকে বসে বসে মুড়ি খেতে হবে।”
আতুশি মাথা উপর নিচ হালকা ভাবে নাড়াতে নাড়াতে বললেন….

—”হুম, ঠিক বলেছো। চলো তাহলে, ভিতরে যাওয়া যাক।”
—”হুম, চল।”
পরক্ষণেই শিউলি তাহমিনার রুমের দরজায় নক করে ভিতরে আসার অনুমতি চাইলো। অনুমতি পাওয়া মাত্র শিউলি ও আতুশি একসাথে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তাহমিনা শুয়ে ছিলেন। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিলো তাঁর। হালকা ঘুমও এসেছিলো হয়তো। চোখজোড়া কেমন ছোট ছোট হয়ে আছে। শিউলি বললেন….
—”বড় ভাবী! এই সময় শুয়েছিলে যে তুমি? শরীর খারাপ নাকি?”
তাহমিনা উঠে বসে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা কম্বলটা টেনে কোমর পর্যন্ত নিয়ে বললেন…..

—”হুম একটু খারাপ লাগছে। শীত শীতও করছে। জ্বর বইছে হয়তো ভিতর ভিতর৷”
আতুশি তাহমিনার কাছে এগিয়ে এসে তাঁর কপাল-গাল ও গলা ছুঁয়ে দেখে বললেন….
—”ভেতর ভেতর না বাহির থেকেও এই জ্বরের তাপমাত্রা ঠাঁহর করা যাচ্ছে বড়ভাবী। আমাদের পারিবারিক ডাক্তার সাহেবকে ডেকে পাঠাই। এসে চেকআপ করে যাবেন তোমায়।”
—”আহহ, ছোট! এতো অস্থির হোস না তো। আমার হালকা অসুস্থতায় তোদের এমন অস্থির অবস্থা দেখে আরো বেড়ে যাবে। তাই শান্ত হ। রাতে খাবার খেয়ে প্যরাসিটেমল খেয়ে নিবো। সেরে যাবে আস্তে আস্তে।”
শিউলি আতুশির পাশে এসে বসে তাহমিনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন….
—”তোমার সবকিছুর দিকেই খেয়াল থাকে বড়ভাবী। থাকে না শুধু নিজের শরীরের দিকে। এইটা ভেবেও তো নিজের প্রতি একটু যত্ন নিতে পারো যে, ‘এই সংসার, আমরা, আমাদের ছেলে-মেয়েগুলো সবাই তোমায় ছাড়া অ*চল প্রায়। তোমার একটু কিছু হলে আমরা কেউ ভালো থাকবো না’।”
তাহমিনা আলতো হেসে বললেন…..

—”এই পাঁকাপোক্ত শরীরে ক্ষ*য় ধরেছে ঠিকই কিন্তু মনে হয় না এতো সহজে তা ভে*ঙে গু*ড়িয়ে পড়বে। যদি পড়েও তাহলে তোরা দু’টোতে মিলে যে এই সংসারটাকে ঠিক সামলে নিবি, সবার সেভাবেই খেয়াল রাখবি যেভাবে আমি বর্তমান থাকা অবস্থায় রাখছিস এতোটুকু বিশ্বাস-ভরসা আমার তোদের উপর আছে বুঝলি! তাই আমি বড্ড নিশ্চিন্ত মন নিয়েই আমার চোখ দু’টো বুঁজতে পারবো।”
আতুশি বললেন….
—”আল্লাহর দোহাই লাগে বড়ভাবী, ওভাবে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলো না তুমি। কষ্ট হয়। বিশ্বাস করো!”
তাহমিনা আতুশির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন….
—”পাগলী, এক মেয়ের মা হয়েছিস ক’দিন মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে নাতী-পুতির মুখ দেখছি এখনও ছোট্টটিই রয়ে গেলি।”
—”আমি তোমাদের কাছে ছোট ছিলাম, ছোট আছি আর ছোটই থাকতে চাই। কতো কম বয়সে এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছি বলো তো! তখন থেকে আমার সুখ-দুঃখের সাথী তো সর্বক্ষণ তোমরাই হয়েছো। আমাদের মধ্যকার এই বন্ধন যেনো সারাজীবন অটুট থাকে এতোটুকু চাওয়া কি চাইতে পারি না আমি বলো!”
—”হয়েছে বাবা, হয়েছে। এখন বল তো এই সময়ে আমার রুমে কি মনে এসেছিস তোরা হুম?”
শিউলি আর আতুশি একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। অতঃপর শিউলি বললেন….

—”তখন যে তেজ বাবার বন্ধু জাকির ছেলেটা এসেছিলো ওকে তোমার কেমন লাগে বড়ভাবী?”
—”হুম, ছেলে হিসেবে জাকির তো ভালোই। অনেক ছোট থেকেই তেজের বন্ধু হওয়ার সুবাদে আমাদের বাসায় ওর আসা-যাওয়া ছিলো। মাঝে যদিও বন্ধ হয়েছিলো। আর ছেলেটার নিজের দাঁড় করানো এতো বড় ব্যবসাও আছে। এই কমবয়সে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে ও বলতে হবে।”
—”হুম, জাকিরকে আমাদের নীরার জন্য ভাবছিলাম আমি আর আতুশি। তুমি কি বলো? নীরার সাথে জাকিরকে মানাবে?”
—”মানানো না মানানোর বিষয় তো পরে আসবে। আগে আমাদের নীরার সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে। ওর কাউকে পছন্দ করে রাখা আছে কিনা সেটা না জেনেই আমাদের পছন্দকে ওর উপর চাপিয়ে দেওয়াটা একদম ঠিক হবে না।”
—”সেটা ঠিক বলেছো। আর নীরাকে জিজ্ঞেস করা, ওর মনের খবর জানার এই কাজটা বড় বউমাকে দিয়েই করালে মনে হয় ভালো হবে। কারণ এ ক’দিনে বড় বউমার সাথে নীরার ভাব জমেছে বেশ ভালোই।”
—”ঠিক আছে, আমি আগামীকাল পিহু মায়ের সাথে এই বিষয়ে কথা বলে দেখবো।”

পার্কিং সাইড থেকে নিজের বাইকে করে নির্ঝরকে নিয়ে খান ভিলা থেকে বেড়িয়ে পড়লো তেজ। বাইকের পিছন সিটে বসা নির্ঝর তেজের দিকে কিছুটা ঝুঁকে বললো……
—”কোথায় যাবে এখন তুমি তেজ ভাই?”
তেজ বললো…..
—”আমার স্পার্ম বাতাসে উড়ে যেই আন্টিকে প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দিয়েছিলো তার গুষ্টির তুষ্টি উদ্ধার করতে যাবো।”
নির্ঝর মনে মনে বললো….
—”নিশা আন্টি আব তো তুম গেয়া কামছে।”

পার্টি অফিস থেকে একটা মিটিং শেষ করে সবে মাত্র বেড়িয়েছে সারফারাজ। ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আহাদ। সারফারাজ বললো….
—”মিটিংরুমে ব্লাক কোট পড়া যেই লোকটাকে দেখলে ওর বিষয়ে পুরো ডিটেইলস আমায় পাঠিয়ে দিও আজ রাতেই।”
আহাদ বললো….
—”ওকে বস। বস, মাফ করবেন কিন্তু আপনি ঐ লোকের ডিটেইলস কেনো চাচ্ছেন তা কি আমি জানতে পারি?”
—”মিটিংয়ের পুরো টাইম একটু পর পর লোকটা যে আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো তা আমার নজর এড়াতে পারে নি। তাই ওনার বিষয়ে সবটা জানা আমার জন্য জরুরী আহাদ।”
আহাদ আর কথা বাড়ালো না। অতঃপর সারফারাজ ও আহাদ গাড়িতে উঠে বসলো। আহাদ ড্রাইভারকে পরবর্তীতে কোথায় যেতে হবে তা বলে দিলে ড্রাইভার সেইপথেই রওনা হলো।

অনু ইলমার দিকে ওভাবেই তাকিয়ে থেকে বললো….
—”মা! তুমি চুপ করে আছো কেনো? কিছু বলছো না কেনো?”
ইলমা নিজেকে সামলে নিয়ে অনুর দু’গালের উপর হাত রেখে বললো…..
—”অনু, অনু, অনু! নিজেকে সামলাও। আমি ইলমা। তুমি এখন সেই স্টেশনে নেই। আর না তোমার সামনে তোমার মা দাঁড়িয়ে আছেন! তুমি অন্য জায়গায় আছো। সম্পূর্ণ অন্য জায়গা।”
অনুর কানে ইলমার কথাগুলো পৌঁছালেও সেগুলো ওর মস্তিষ্ককে স্পর্শ করতে সক্ষম হলো না। অনু ডুবে গিয়েছে যেনো পুরোপুরি নিজের অতীতের সাগরে অতল গহ্বরে।

———ফ্ল্যাশব্যাক——-
অনুর মা অনুর এমন পা*গল প্রায় অবস্থা দেখে কি করবেন, কি বলবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অনুর বাবার সঙ্গী লোকগুলোর মাঝে একজন চিৎকার করে বললেন……
—”মা*ইরা ফেলছে, এই মা-মেয়ে মিল্লা লোকটাকে মাই*রা ফেলছে রে। এক্কেরে কলিজার উপর দাঁ-টা বসাইয়া দিছে। কেমন ডা*কা*ত এরা। এদের পালাতে দিলে হইবো না। এ ভাইয়েরা তোমরা উঠো। জাগো তোমরা। আমাদের সঙ্গী, আমাদের ভাইকে হ*ত্যা করছে এই মা-মেয়ে আজ এদের দু’জনেই লাঠির আ*ঘা*তে আ*ঘা*তে মা*ইরা ফেলতে হবে। উঠো ভাইয়ের, উঠো।”
লোকটা সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাকি লোকগুলোও বললেন, ‘হ উঠো উঠো। মা*রতে হবো ওদের। বদ*লা নিতে হইবো।’
অনুর মা লোকগুলোর এরূপ কথাগুলো শুনে সঙ্গে সঙ্গে অনুর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললেন…..

—”ভাগ অনু ভাগ৷ ওরা তোরে মা*ইরা ফেলবো নয়তো।”
এই বলে তিনি অনুকে নিয়েই ট্রেন যেইদিকে গিয়েছিলো তখন সেইদিকেই ছুটতে শুরু করলেন। অনুর মধ্যে কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না এইমূহূর্তে। পায়ে যে তখন পরে গিয়ে আ*ঘা*ত এমন পেয়েছিলো যে এক পা সামনে ফেলার শক্তি অনু পাচ্ছিলো সেই পা নিয়েই এখন এভাবে ছুটছে কিন্তু একটু কোনো য*ন্ত্র*ণা*রা ওর মুখে কিন্ঞ্চিত ভাঁজ ও ফেলতে সক্ষম হচ্ছে না। অনু বারবার পিছন ফিরে চাইছে। যতো ওরা মা-মেয়ে সামনের দিকে আগাচ্ছে ততোই অনুর বাবার লা*শটা ছোট ও অস্পষ্ট হয়ে আসছে। অনুর বাবার সঙ্গী লোকগুলো ওদের দু’জনের পিছন পিছনেই ধাওয়া করেছে। সবার হাতেই রয়েছে মোটা মোটা লাঠি। ট্রেনটা মাত্রই ছেড়ে দিয়েছে। ধীর গতিতে একটু একটু করে সামনের দিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরপর কয়েকবার হুইসিলের শব্দ কানে পড়লো ওদের। একেবারে শেষ বগিতে অনুকে উঠিয়ে দিলেন অনুর মা।
অনু দরজার দু’হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনের গতি আস্তে আস্তে বাড়ছে। অনুর মা ট্রেনের সাথেই হাঁটছেন। ছলছল নয়নে অনুকে উদ্দেশ্য করে বললেন…..

—”কথা দে মা, বাঁচবি তুই! আল্লাহর হুকুম না হওয়া পর্যন্ত নিজের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার সবরকম চেষ্টা করবি তুই! আর কখনও এই গাঁয়ে ফিরবি না। অনেক ভালো ভাবে বাঁচবি দূরে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে! কথা দে!”
অনু প্রাণহীন চোখে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”তুমিও চলো আমার সাথে মা। ওরা তোমায় বাঁচতে দিবে না।”
উনি হাসিমুখে বললেন……
—”তোরে বাঁচানোর জন্য এই বুড়ির প্রাণ গেলে যাবে। সে হাসিমুখে তা ত্যাগ করতে রাজি আছে। কিন্তু তুই বাঁচবি সেই কথাটা আমায় দে মা!”
অনু ঢোক গি*লে উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে বললো….
—”আমি বাঁচবো মা। বাঁচতে আমাকে হবেই। বাঁচবো আমি।”

ট্রেনটা এবার গতি আরো বাড়িয়ে দিলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে আর ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছিলেন না অনুর মা। অনুর হাত থেকে হাত ছুটে গেলো তাঁর। তখুনি পিছন থেকে তাঁর মাথার উপর স্বজোরে লাঠির বা*রি পড়লো। বি*কট চিৎকার দিয়ে মাথা চেপে ধরে নিচে বসে পড়লেন অনুর মা। অনু ট্রেনে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে ‘মা, মা’ বলে কাঁদছে। বলছে, ‘মে*রো না তোমরা আমার মা’কে। মে*রো না।’ কিন্তু অনুর চিৎকার গুলো ঐ লোকগুলোর কান পর্যন্তই পৌঁছাতে পারলো না স্পষ্ট ভাবে। লোকগুলো অ*মানুষের মতো একের পর এক লাঠি*কা*ঘা*ত করতে শুরু করলেন অনুর মায়ের শরীরে। তিনি মুখ থু*বড়ে পরে গেলে মেঝের উপর। চোখ দু’টো খোলা। দূরে আরো দূরে চলে যাচ্ছে যেই ট্রেনটটা তাঁর উপরেই স্থির। মাথার ফাঁ*টা অংশের ফিনকি দিয়ে র*ক্ত ছিটকে ছিটকে পড়ছে।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৬ (৪)

শরীরে এখন পড়তে থাকা আ*ঘা*ত গুলো আর য*ন্ত্র*ণা দিচ্ছে না যেনো অনুর মা’কে। র*ক্ত মাখা ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। এই হাসি হয়তো বিজয়ের। নিজের মেয়েকে ন*র প*শুগুলোর হাতে ব*লি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারার আনন্দ। পরতৃপ্তিতে হয়তো সেইরাতে নিজের প্রাণ ত্যা*গ করেছিলেন তিনি।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৭