Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৩

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৩

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৩
নওরিন মুনতাহা হিয়া

প্রায় তিরিশ মিনিট পর ক্লাসের ঘণ্টা পরে আদ্রিয়ান বোর্ডের লেখা শেষ করে উপস্থিত সকল ছাএ ছাএীকে উদ্দেশ্য করে বলে
“ স্টুডেন্ট আজকের মতো ক্লাস এখানে শেষ করছি কাল প্রতৈকে তোমরা বোর্ডে লেখা পড়াসমূহ। অবশ্যই পড়ে আসবে “।

আদ্রিয়ান তার বই খাতা গুছিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে যায় ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী রুম থেকে বাহিরে বের হয়ে গেছে অন্য স্যার আসতে কিছুক্ষণ সময় লাগবে। বোর্ড থেকে বাকি পড়া লিখে মেঘ খাতা বন্ধ করে গুছিয়ে ব্যাগে রেখে দেয়। ব্যাগ থেকে নতুন বই বের করে শান্ত হয়ে মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকে কিন্তু মেঘের এমন আচরণে নূহা বিরক্ত হয়। ক্লাস শেষ করে মেঘের সাথে বাহিরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার কিন্তু মেঘ এখন পড়াশোনা করছে। নূহা মেঘের হাতের বাহুর মধ্য ধাক্কা দিয়ে বলে

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ মেঘ কি সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকো তুমি? চলো না বাহিরে যায় ক্লাসের সকলে বাহিরে আড্ডা দিচ্ছে ।
নূহার কথায় মেঘ পড়াশোনা বাদ দেয় না বরং পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে। কিন্তু নূহা যখন পুনরায় মেঘকে বাহিরে আড্ডা দিতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে তখন মেঘ ছোট করে উত্তর দেয়
“নূহা আমার বাহিরে যেতে বা আড্ডা দিতে ইচ্ছা করছে না। তোমার ক্লাসে বোরিং লাগছে তুমি যাও “।
মেঘের বারণ নূহা শুনল না সে বারবার মেঘকে বাহিরে যাওয়ার কথা বলছিল আড্ডা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিল। নূহার কথায় জন্য মেঘ তার পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না যার ফলে বিরক্ত হয়ে মেঘ ক্লাস রুম থেকে বাহিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মেঘ বলে
“নূহা থাক আর অনুরোধ করতে হবে না। চলো বাহিরে যায় “।
মেঘের কথা শুনে নূহা খুশি হয়ে যায় তারা দুইজন ক্লাস থেকে বের হয়ে বাহিরে করিডরে গিয়ে দাঁড়ায়।

কলেজের মাঠে আকাশ থেকে নেমে আসা বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকায় এখন প্রায় বৃষ্টির আগমন হয় শীতের তীব্রতা কে বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। মেঘ বৃষ্টি পানির দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ নিস্তব্ধ হয়ে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ বা আশেপাশে মানুষের কোলাহল মেঘের কানে পৌঁছায় না। মেঘ দেয়ালের সাথে ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তবে মনের গহীনে একটা লোভ জন্মাল তার। বৃষ্টির পানির বিন্দকে ছোঁয়ে দেখার তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠল মেঘের মনে তাই মেঘ আর দেরি করল না। সাদা এফরনের ভিতরে থাকা হাত বের করে এরপর এগিয়ে যায় বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে দেখার উদ্দেশ্য।

আকাশ থেকে নেমে আসা বর্ষণের পানি গড়িয়ে পড়ে মেঘের হাতে তার কনুই বেয়ে পড়া পানি। শুকনো লাল শাড়ি জুড়া ভিজে যায় বৃষ্টির পানি ছোঁয়ায় মেঘের বিষন্ন মন ভালো হয়ে যায়। ঠোঁটে ফোটে উঠে মৃদু হাসি মেঘ হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে দিচ্ছে তার সাথে খেলছে। বৃষ্টি মেঘের ভীষণ প্রিয় বাংলাদেশে থাকতে যখন বৃষ্টি হতো তখন মেঘ আর সৃষ্টি বৃষ্টিতে ভিজত। এই বৃষ্টি ভিজা নিয়ে শার্লিন বেগমের কাছ থেকে তারা দুইজন কতো বকা খেয়েছে তা হয়ত গুণে শেষ করা যাবে। কিন্তু এখন সব সৃতি অতীত হয়ে গেছে। মেঘের জীবনে যদি কোন সুন্দর মুহূর্ত আসে, তবে খুব দ্রুত তা জীবন থেকে বিলীন হয়ে যায়।

মেঘ যখন বৃষ্টি বিলাস করেছিল তখন হঠাৎ বিকট শব্দে তার ফোন বেজে উঠে। মেঘ বিরক্তি নিয়ে হাতে থাকা ফোনের দিকে তাকায়, স্কিনে জ্বল জ্বল করে ভেসে উঠে আদ্রিয়ানের নাম। মেঘ কিছুটা অবাক হয় আদ্রিয়ান হঠাৎ তাকে ফোন করছে কেনো? মাএই ক্লাস শেষ করে আদ্রিয়ান তার কেবিনে গেছে যদি কোন জরুরি কথা বলার থাকে তবে ক্লাসের পরে বলতে পারত। মেঘ সকল চিন্তা বাদ দিয়ে ফোন রিসিভ করে, অপরপাশ থেকে আদ্রিয়ান বলে উঠে

“ হ্যালো মেঘ ? “
আদ্রিয়ানের কণ্ঠ শুনে মেঘ বলে
“ জি আদ্রিয়ান স্যার, হঠাৎ ফোন করলেন কেনো? কিছু বলবেন?
আদ্রিয়ান বলে
“ মেঘ হঠাৎ জরুরি প্রয়োজনে আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে একবার। তোমার সাথে একসাথে বাড়ি ফিরতে পারব না, কিন্তু গাড়ি রেখে যাব কলেজে। তুমি ক্লাস শেষ করে গাড়ি করে বাড়ি ফিরে যেও, তুমি কি একা যেতে পারবে মেঘ? “
আদ্রিয়ানের কথায় মেঘ সম্মতি দিয়ে বলে নিশ

“ জি অবশ্যই পারব স্যার। আপনি নিশ্চিতে হাসপাতালে যান “।
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে স্বস্তি পায়, এরপর মেঘকে
“ সাবধানে যেও “ কথাটা বলে ফোন রেখে দেয়। মেঘ আর কিছু বলে না সে পুনরায় বৃষ্টি দেখার উপর মনোযোগ দেয়। মেঘকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নূহা ভাবে হয়ত মেঘের মন খারাপ তাই সে আর মেঘকে বিরক্ত করে না। আশেপাশে থাকা অন্য বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে, ফিরে আসে মেঘের কাছে। নূহা বলে
“ মেঘ কে ফোন করেছিল তোমাকে? কার সাথে কথা বলছিলে তুমি? “
মেঘ নূহাকে আদ্রিয়ানের কথা বলে না,মেঘ বলে
“ আমার এক আত্মীয়র সাথে কথা বলেছিলাম। আচ্ছা এখন চলো নূহা, ক্লাসে যাওয়া যাক। স্যার চলে আসবে
“।
“ হুম চলো মেঘ “।

মেঘ আর নূহা ক্লাসে চলে যায় পরবর্তী ক্লাসের জন্য শিক্ষক চলে আসে। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর মেঘের কলেজ শেষ হয় দুপুর তখন ২: ০০ বাজে। মেঘ আর নূহা ক্লাস শেষ করে বাহিরে বের হয়, উদ্দেশ্য এখন তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়া। কিন্তু বাহিরে বৃষ্টির তীব্র এখন ও কমে নি, নূহা বলে
“ মেঘ বাহিরে যা বৃষ্টি পড়ছে বাড়ি কি করে ফিরব? কলেজের গেইট অবধি পার হওয়ার আগেই তো বৃষ্টিতে ভিজে যাব “।
নূহার কথা শুনে মেঘ বলে
“ হুম নূহা তুমি ঠিক বলেছ। আমেরিকায় ইদানীং প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এই তীব্র বৃষ্টির মধ্যে কলেজ থেকে বের হওয়া ঠিক হবে না, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। বৃষ্টি থেমে গেলে তখন বাড়ি ফিরে যেতে হবে “।
নূহা আর মেঘ কিছুক্ষণ বৃষ্টি থামার জন্য করিডরে অপেক্ষা করছিল অন্য ছাএ ছাএী তাদের সাথে ছিল। প্রায় বিশ মিনিট পর বৃষ্টির তীব্র কমে যায়, এখন তারা বাড়ি ফিরে যাবে। নূহা বলে
“ মেঘ তুমি একটু দাঁড়াও আমার জন্য। আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি “।
“ওকে “।

নূহা ওয়াশরুমে চলে যায় মেঘ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে করিডরে। হঠাৎ মেঘ খেয়াল করে কলেজের গেইটে আদ্রিয়ানের দাঁড়িয়ে আছে, ড্রাইভার গাড়ির জানালা খুলে মেঘের জন্য অপেক্ষা করছে। মেঘ ওয়াশরুমের দিকে তাকায় কিন্তু নূহা আসছে না এখন তাই মেঘ আর নূহার জন্য অপেক্ষা করে না। মেঘের কাছে ছাতা ছিল না তাই বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্য মেঘ তার মাথায় হাত দিয়ে এগিয়ে যায় কলেজের গেইটের দিকে। কলেজের মাঠ বিশাল বড় হওয়ায় গেইট বেশ দূরে ছিল, মেঘ বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছিল প্রায়।

মেঘ যখন মাথায় হাত দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে মাঠের মধ্যে এসে পৌঁছায়, তখন হঠাৎ মাথার উপর বৃষ্টির পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাহিরে মুষুলধারে বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু মেঘের মাথার উপর তার এক বিন্দু গড়িয়ে পড়তে না দেখে। মেঘ অবাক হয়ে তাকায় উপরে, খেয়াল করে তার মাথার উপর একজন ছাতা ধরে রেখেছে। ছাতা ধরে রাখা বক্ত্যির হাত অনুসরণ করে পিছনে ঘুরে তাকায় মেঘ এরপর বলে

“কে আপনি? আমার মাথায় ছাতা ধরে রেখেছেন কেনো? “
মেঘের মাথায় ছাতা ধরে রাখা আগন্তুক ব্যক্তিকে মেঘ
প্রশ্ন করে। ছাতার আড়ালে তার মুখের আদল স্পষ্ট হয় না মেঘের কাছে তবে শারিরীক গঠন দেখে কোন পুরুষ মনে হচ্ছে। হাতের কনুই অবধি শার্টের হাতা, আঙুলে পোড়া সিগারেট, ঠোঁট কালচে রঙের, গাঢ় বাদামি রঙের শার্টের উপর সাদা এফরন। অপর পাশ থেকে ব্যক্তির উত্তর না পেয়ে মেঘ পুনরায় জিজ্ঞেস করে
“ কি সমস্যা কথা বলছেন না কেনো? কে আপনি?
মেঘের কথা শুনে আগন্তুক মানব তার মুখের উপর থেকে ছাতা সরিয়ে ফেলে। কিন্তু মেঘ প্রথম দেখায় তাকে চিনতে পারে না সে ভ্রু কুঁচকে এখন তাকিয়ে আছে সামনে থাকা মানুষটার দিকে। আগন্তুক ব্যক্তি হাসি মুখে মেঘের কথার জবাব দেয়

“ হাই আমার নাম তিহান মেডিক্যাল কলেজের ফাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। আমরা একই ক্লাসে পড়াশোনা করি, আপনি মাথায় বৃষ্টির পানি পড়ছিল তাই ছাতা ধরেছি “।
নাম – পরিচয় দেওয়ার সময় তিহান তার হাত মেঘের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কথাটা বলে। মেঘ সৌজন্যে রক্ষায় তার হাত ও বাড়িয়ে দিয়ে তিহানের হাত ছুঁয়ে বলে
“ ওহ ধন্যবাদ আপনাকে তিহান। আর আমি মেঘ, আপনি কি বাঙালি?
তিহান সম্মতি দিয়ে বলে
“ জি আমি বাঙালি। পড়াশোনা করার জন্য আমেরিকায় এসেছি “।
তিহান মেঘের দিকে তাকায়, কি মিষ্টি মুখের আদল, মায়াময় চেহারা, কাজল কালো চোখ। প্রথম দেখায় সে মেঘের প্রেমে পড়ে গিয়েছে। পৃথিবীতে হাজার হাজার মেয়ে থাকার পর ও মেঘকে তার চোখে ভীষণ সুন্দর লাগছে। মেঘ তিহানের তাকিয়ে থাকা দেখে অবাক হয়, তবে সে হয়ত স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে বিষয়টা।

কলেজের গেইটে যখন গাড়ির হর্ন শব্দ শুনা যায়, তখন মেঘের খেয়াল হয় ড্রাইভার তার জন্য অপেক্ষা করছে। তিহান এখন মেঘের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে রেখেছে, মেঘ যখন ছাতার নীচ থেকে বের হয়ে যেতে চাই। তখন তিহানের হাত শক্ত বাঁধন তাকে আটকে দেয়, মেঘ বলে
“ তিহান আমার হাত ছাড়ুন। আমি বাড়ি যাব “।
তিহানের কানে হয়ত মেঘের কথা যায়নি, সে বলে
“ কি ছাড়ব? “
মেঘ বিরক্তি নিয়ে বলে
“ আমার হাত ছাড়বেন “।
মেঘের কথা শুনে তিহান তার হাত ছেড়ে দেয়, মেঘ তার হাত ছাড়া পেয়ে যখন ছাতার নিচ থেকে বের হবে। তিহান পুনরায় তাকে আটকে বলে
“ মেঘ ছাতার নিচ থেকে কোথায় যাচ্ছেন? বৃষ্টিতে ভিজে যাবেন তো? এই ছাতা নিয়ে বাড়ি যান “।

তিহানের কথা শুনে মেঘ বলে
” কিন্তু তিহান আপনার হাতে তো মাএ একটা ছাতা, যদি আমি নিয়ে চলে যায়। তবে আপনি বৃষ্টিতে ভিজে যাবেন? ”
” কোন সমস্যা নাই মেঘ আমার বৃষ্টিতে ভিজার অভ্যাস রয়েছে। আপনি ছাতা নিয়ে যান ”।
মেঘ ছাতা নিতে চাই না কিন্তু তিহান জোর করে ওর হাতে ছাতা ধরিয়ে দেয়। ড্রাইভার গাড়িতে অপেক্ষা করছিল তার জন্য তাই মেঘ আর কথা বাড়ায় না।তিহানের হাত থেকে ছাতা নিয়ে দ্রূত চলে যায়, যাওয়ার আগে বলে
” কাল ক্লাসে আপনার হাতে আমি ফিরত দিয়ে দিব তিহান ”।
তিহান মাথা নাড়িয়ে শুধু বলে ” হুম ”।

মেঘ দ্রুত পায়ে হেঁটে গাড়ির কাছে চলে যায়। তিহান মেঘের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এক হাত বুকে রাখে। মেঘ গাড়িতে উঠার আগে একবার পিছনে ফিরে তিহানের দিকে তাকায়। মেঘের তাকানো দেখে তিহান মাথায় হাত দিয়ে মেঘকে দেখতে থাকে। সত্যি বোধহয় তার জীবনে প্রেম চলে এসেছে।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২২

” প্রথম দেখায় প্রথম প্রেম ”।
আমার প্রি টেস্ট পরীক্ষা চলছে যার জন্য গল্প দিতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। কাল ও পরীক্ষা আছে একটা। সবাই পরীক্ষার জন্য দোয়া করবেন। আর দেরি করে গল্প দেওয়ার জন্য দুঃখিত।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৪