তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৪
নওরিন মুনতাহা হিয়া
ছাতা হাতে নিয়ে কলেজের গেইট অতিক্রম করে মেঘ গাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছায়। গাড়ির পিছনের দরজা খুলে ভিতর প্রবেশ করে এরপর ছাতার হাতলে চাপ প্রয়োগ করে ছাতা বন্ধ করে পাশের সিটে রাখে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয় গন্তব্য এখন বাসায় যাওয়া।
অন্যদিকে তিহান মেঘের গাড়িতে উঠা অবধি তার দিকে তাকিয়ে ছিল, তার হৃদয়ে এক সুখের অনুভূতি হয় মেঘকে দেখে। বুকের বা-পাশে তিহান তার হাত রাখে সে উপলব্ধি করে তার হার্টবিট ফাস্ট হয়ে গেছে। সত্যি বোধহয় সে প্রথম দেখায় মেঘ নামক এক রূপবতী নারীর প্রেমে পড়ে গিয়েছে। তিহান যখন মাথায় হাত দিয়ে মাঠের মাঝ বরাবর স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন হঠাৎ করে তার শরীরের সাথে ধাক্কা লাগে এক বস্তুর। তিহান দ্রুত পিছনে ঘুরে তাকায় তার সাথে ধাক্কা লাগা বিষয়টা কোন বস্তু না বরং রক্তে মাংসে গড়া এক মানবের। যার নাম নূহা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হঠাৎ করে ধাক্কা লাগায় নূহা টাল সামলাতে না পেরে যখন পা পিছলে পড়ে যেতে লাগে। তখন তিহান তার হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে ফেলে নূহার হাত। এরপর এক টান দিয়ে নূহাকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
নূহার শরীর যখন তিহানের বুকের সাথে মিশে যায় নূহা তখন চোখ বন্ধ করে ফেলে। তিহান তার চোখ দিয়ে নূহার মুখ দেখে নূহার চোখের পাপড়ি বেয়ে বৃষ্টির বিন্দু বিন্দু পানি পড়ছে, তার কম্পিত ঠোঁট, মায়াময় মুখশ্রী দেখে তিহার ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আজ বোধহয় তার কাছে পৃথিবীর সকল মেয়েকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
রিমঝিম বৃষ্টির ফোঁটা যখন নূহা আর তিহানের শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তখন হয়ত দুইজনের হুঁশ ফিরে আসে। নূহা দ্রুত তিহানের বুকের উপর থেকে উঠে পড়ে এরপর তার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে সরে দাঁড়ায়। তিহান তার শার্টে হাত দিয়ে পানি মুছতে থাকে, নূহা তাকায় তার শরীরের দিকে। এতোখন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তার সম্পূর্ণ শরীর পানিতে ভিজে গেছে। নূহা রাগী দৃষ্টিতে তিহানের দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলে উঠে
”এই আপনি কি পা’গ’ল? রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ছিলেন কেনো?”
তিহান শার্ট থেকে বৃষ্টির পানি ঝেরে মুছতে ছিল কিন্তু হঠাৎ নূহার এমন রাগী কণ্ঠ শুনে তার দিকে তাকায়। এই মেয়ে তাকে পা’গ’ল বলল? তিহান বলে
” না আমি পা’গ’ল নয়, কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই অন্ধ। যদি অন্ধ না হন তবে রাস্তার মাঝে যে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তা কি খালি চোখে দেখেন নি?
তিহানের মুখে অন্ধ কথাটা শুনে নূহার রাগের পরিমাণ দিগুণ হয়। প্রথমত নিজে এমন পা’গ’লের মতো মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল, এরপর ধাক্কা দিয়ে নূহাকে ফেলে দিয়েছে। এখন আবার তাকে দোষ দিচ্ছে, নূহা বলে
”আমি অন্ধ তাই না? আপনি কি সাধু? দেখুন আপনার জন্য আমি সম্পূর্ণ ভিজে গেছি? ”
তিহান নূহার শরীর আর জামাকাপড় দিকে তাকিয়ে সত্যি নূহার সম্পূর্ণ শরীর বৃষ্টি পানিতে ভিজে গেছে। শরীর বেয়ে চুয়ে চুয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, অবশ্য সবটা তার দোষ যদি সে মাঝ রাস্তায় না দাঁড়িয়ে থাকত তবে হয়ত নূহার সাথে তার ধাক্কা লাগত না। কিন্তু তিহান নিজের দোষ স্বীকার করে না ঝগড়া প্রথম নূহা শুরু করেছে। তাছাড়া তিহান পুরুষ মানুষ হয়ে একজন নারীর সাথে ঝগড়ায় হেরে যেতে পারে না অসম্ভব। তিহান বলে
”এই মেয়ে আপনি তো দেখি ভীষণ ঝগড়ুটে? রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন পরপুরুষের সাথে পায়ে পা রেখে ঝগড়া করছেন?”
তিহানের কথার জবাবে নূহা বলে
” ওহ্ আমি ঝগড়ুটে তাই না? আর আপনি কি দুধে ধোয়াঁ তুলসিপাাতা? আর আপনার কি লজ্জা করে না একজন মহিলার সাথে পায়ে পা রেখে ঝগড়া করতে? ”
নূহার কথার জবাবে তিহান কিছু বলতে যাবে তার আগেই নূহা হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে
” দেখুন এই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনার সাথে ঝগড়া করার বিন্দুমাএ ইচ্ছা বা আগ্রহ আমার নেই। দয়া করে সামনে থেকে সরুন, আমি বাহিরে যাব ”।
তিহান আর কথা বাড়ায় না সে এই সাইড হয়ে সরে যায় নূহা বড় বড় পা ফেলে হেঁটে তিহানের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ঝড়, বৃষ্টির মধ্যে তিহান এই একলা মাঠে দাঁড়িয়ে আর কি করবে? তাই বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মাথায় হাত দিয়ে দ্রুত হেঁটে কলেজের গেইটের কাছে এগিয়ে যায়।
কলেজ গেইটের সামনের রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে নূহা। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, সারা রাস্তা ফাঁকা মানুষ অবধি দেখা যাচ্ছে না। নূহা ঘাড় ঘুরিয়ে উঁকি দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখন তিহান সেখানে উপস্থিত হয়। তিহানকে দেখে নূহা তার মুখ ঘুরিয়ে নেয় তিহান গিয়ে নূহার থেকে একটু দূরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রায় পাঁচ মিনিট পর রাস্তায় এক গাড়ির আগমন হয় নূহা দ্রুত হাত নাড়িয়ে গাড়িকে থামায়। এরপর এগিয়ে যায় গাড়ির কাছে সামনে সিটে বসে থাকা ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে
”ড্রাইভার আপনি সামনে বাস স্টেশনে যাবেন?
ড্রাইভার সম্মতি দিয়ে বলে
” জি ম্যাম যাব। আপনি গাড়িতে উঠে বসুন ”।
ড্রাইভারের কথা শুনে নূহা গাড়িতে উঠে বসতে যাবে, তখন তিহান আসে সেখানে। তিহান ড্রাইভারকে বলে
”আমি ও সামনে বাস স্টেশন অবধি যাব।
তিহানের যাওয়ার কথা শুনে নূহা বলে
” না আমি ওনার সাথে এক গাড়িতে কোথাও যাব না, অসম্ভব ”।
নূহার না যাওয়ার কথা শুনে তিহান তার দিকে তাকায়, মেয়েটার কি জেদ একটু ধাক্কা দিয়েছে বলে তার সাথে এক গাড়িতে যাবে না বলছে। নূহা গাড়ির দরজা থেকে হাত সরিয়ে নেয় কিন্তু তিহান সে নূহার রাগের পড়ুয়া করল না। গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল নূহা ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল গাড়ির বাহিরে। ড্রাইভার যখন গাড়ির স্টার্ট দিতে যাবে তখন তিহান তাকে থামিয়ে দেয়। গাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা নূহার দিকে তাকায় বৃষ্টির মাঝে এমন ফাঁকা রাস্তা নূহার একা দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। তিহান গাড়ির জানালা খুলে নূহার দিকে তাকিয়ে বলে
” এই যে মিস ঝগড়ুটে! এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজা শরীরে দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে উঠে বসুন ”।
” আমি আপনার মতো এমন বেয়াদব মানুষের সাথে এক গাড়ি করে কোথাও যাব না ”।
নূহার কথা শুনে তিহানের রাগ হয়, কিন্তু সে রাগ করে না ভদ্র আর শান্ত স্বরে বলে
” আমি বেয়াদব, কিন্তু বাঘ বা সিংহ নয় যে আপনাকে খেয়ে ফেলব। নির্জন রাস্তায় একা মেয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়, রাত কিন্তু প্রায় হয়ে গেছে ”।
তিহানের কথা নূহা ভাবে সত্যি রাত হয়ে গেছে, অন্ধকার নেমে এসেছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উচিত হবে না। নূহা রাগ, জেদ, বাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে তিহান একটু দূরে সরে যায়। নূহা পাশের সিটে বসে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয় । গাড়িতে উঠার পর নূহা তার ভিজে চুল পরহিত উড়না দিয়ে সযত্নে মুছতে থাকে চুল ভিজা থাকলে সর্দি লেগে যাবে। তিহান একবার তাকায় নূহার দিকে, বেশ মনোযোগ দেয় নূহার প্রতি। মেয়েটা ফর্সা ত্বক দুধের মতো সাদা, চোখ দুইটি কাজল কালো, মুখের আদলে কি ভীষণ মায়া। তিহান মুগ্ধ হয়ে নূহার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নূহা যখন চুল মুছা শেষ করে পাশের দিকে ঘুরে তাকায় তখন তিহানকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। তিহান আর নূহার দৃষ্টি মিলিত হয় তিহান দ্রুত তার চোখ সরিয়ে নেয় নূহার উপর থেকে। নূহা ও গাড়ির সামনের দিকে তাকায়।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামে বাসার সামনে মেঘ গাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। বাড়ির কাজের লোকেরা খাবার ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র পরিস্কার করছে মেঘকে দেখে একজন মহিলা এগিয়ে এসে বলে
” মেঘ ম্যাম আপনি কি দুপুরের খাবার খেয়েছেন?রান্নাঘর থেকে কি খাবার গরম করে নিয়ে আসব? ”
পেটে খুদা লাগার কারণে গড়গড় শব্দ করছে মেঘের দুপুরে কলেজ কেন্টিন থেকে কোন খাবার কিনে খায়নি। নূহা অবশ্য মেঘকে অনেকবার জোর করছিল, খাবার খেতে যাওয়ার জন্য কিন্তু মেঘ যায়নি। খাবার খাওয়ার খুদা বা ইচ্ছা ছিল না তখন তার, কিন্তু এখন তার ভীষণ খুদা লাগছে। মেঘ বলে
“ তুমি খাবার গরম করে টেবিলে রাখো। আমি রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি “।
কাজের লোক মেঘের জন্য খাবার গরম করতে রান্না ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। তখন মেঘের মনে পড়ে আদ্রিয়ানের কথা, ফোনে মেসেজ করে বলেছিল যে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাবে সে। এখন ও কি বাড়িতে ফিরে আসেনি? মেঘ বলে
“ আদ্রিয়ান স্যার কি হাসপাতাল থেকে এখন ও বাড়িতে ফিরে আসেনি? ”
মেঘের কথার উত্তরে কাজের মহিলা বলে
“ আদ্রিয়ান স্যার তো দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু দুপুরের খাবার খেতে নিচে আসে নি, তাই আমি ডাক দিতে গিয়েছিলাম। দরজায় অনেক সময় কড়া নাড়ার শব্দ হলে ওনি বললেন যে ওনার শরীর অসুস্থ। যার জন্য দুপুরের খাবার খাবেন না “।
কাজের লোকের কথা শুনে মেঘ অবাক হয় আদ্রিয়ান দুপুরের আগে বাড়ি ফিরে এসেছে মানে! তবে কি সে হাসপাতালে যায়নি? হয়ত শরীরে অসুস্থ বোধ _ করছিল যার জন্য হাসপাতালে যেতে পারেনি। মেঘের এখন আদ্রিয়ানকে ডিস্টার্ব করা উচিত হবে না, ওনি বরং নিজের রুমে রেস্ট নিতে থাকুক।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায় মেঘ নিজের রুমে গিয়ে কাঁধে থাকা মেঘ টেবিলে রাখে এরপর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে নিচে চলে যায়, কাজের মহিলা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। মেঘ খাবার খাওয়া শেষ করে আবার নিজের রুমে ফিরে আসে শরীর বেশ টার্য়াড থাকায় বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত প্রায় নয়টা মেঘ তার রুমে বসে টেবিলের উপর বই রেখে পড়াশোনা করছিল। তখন হঠাৎ তার ফোনে ফারহানা বেগমের কল আসে, হঠাৎ ফারহানা বেগম কল করেছে কেনো? মেঘ অবাক হয়ে ফোন রিসিভ করে ফোনের অপর পাশ থেকে ফারহানা বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বলে
“ মেঘ তুমি কোথায়? এখুনি একবার আদ্রিয়ানের রুমে যাও, ওর শরীর ভীষণ অসুস্থ। শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে রীতিমত শরীর কাঁপছে “।
ফারহানা বেগমের উদ্বেগ আর চিন্তা মিশ্রিত কণ্ঠ শুনে মেঘ বুঝতে পারে হয়ত আদ্রিয়ান সত্যি খুব অসুস্থ। জ্বরের জন্য হয়ত আজ হাসপাতালে যায়নি কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। কিন্তু মেঘের এখন কি করা উচিত? মেঘ কি একবার গিয়ে দেখবে আদ্রিয়ানের শরীরের অবস্থা এখন কেমন? কিন্তু মেঘের মন কেনো আদ্রিয়ানের অসুস্থতার কথা এতো বিচলিত হচ্ছে! আদ্রিয়ান অসুস্থ হলে মেঘ কেনো তার সেবা করবে? সেবা করার জন্য জিয়া আছে। একমাস পর যখন জিয়াকে বিয়ে করবে, তবে এখন থেকে আদ্রিয়ানকে সেবা করে সুস্থ করার দায়িত্ব জিয়ার।
মনের বিচলতা আর অস্থিরতাকে মেঘ প্রাধান্য না দিয়ে জেদ ধরে টেবিলে বসে থাকল। কিন্তু তার মন সহ সারা শরীর ছটফট করছে আদ্রিয়ানকে একবার দেখতে যাওয়ার জন্য। মেঘ পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে থাকলে ও পড়া তার কণ্ঠ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে না। টেবিলে বসে থাকা অবস্থায় মেঘের ফোন কারান, আবিহা সহ ফারহানা বেগমের শত – খানিক কল আসে। মেঘ সব উপেক্ষা করে তার জেদ, আর আত্মাসম্মানকে প্রাধান্য দেয়।
হঠাৎ করে যখন শব্দ করে মেঘের ফোনে আবার কল আসে তখন মেঘ বিরক্ত হয়ে ফোনের দিকে তাকায়। ফোনের স্কিনে মিরাজ চৌধুরী নাম ভেসে উঠে, মিরাজ সাহেব মানে কারানের বাবা তাকে ফোন করছে। মেঘ দ্রুত তার হাত বাড়িয়ে ফোন রিসিভ করে বলে
“ আসসালামু আলাইকুম মিরাজ আঙ্কেল “।
মিরাজ সাহেব দ্রুত সালামের উত্তর দিয়ে বলে
“ ওয়ালাইকুম সালাম। মেঘ তুমি কি আদ্রিয়ানের রুমে গিয়েছ? এখন কেমন আছে আদ্রিয়ান? ওর জ্বরের তীব্রতা কি কমেছে? আমি কি ড্রাইভারকে ফোন করে বলল, বাসার ভিতরে এসে আদ্রিয়ানকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে?
মিরাজ সাহেবের কণ্ঠে হাসপাতালে এডমিট করার কথা শুনে মেঘ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। মেঘ টেবিলে থাকা বই বন্ধ করে ফোনের অপর পাশে থাকা মিরাজ সাহেবকে বলে
“ আঙ্কেল আপনি টেনশন করবেন না, আমি এখুনি আদ্রিয়ান স্যারের কাছে যাচ্ছি “।
মেঘ টেবিলের উপর ফোন রেখে দ্রুত পায়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়ে যায় এরপর দৌড়ে আদ্রিয়ানের রুমে ছুটে যায়। আদ্রিয়ানের রুমের দরজার কাছে পৌঁছে দরজায় কড়া নাড়ে সৌভাগ্যবশত দরজা নক করা ছিল না যার জন্য দরজা খুলে যায়। মেঘ রুমের ভিতরে প্রবেশ করে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে আদ্রিয়ান। মেঘ দরজার পাশে থাকা সুইচে চাপ দিয়ে লাইট জ্বালায় এরপর বিছানার কাছে এগিয়ে যায়। বালিশে মাথা রেখে কাত হয়ে শুয়ে আছে আদ্রিয়ান, মেঘ বিছানার এক কোণায় বসে এরপর ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের শরীরের উপরের অংশ থেকে চাদর সরায়। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে আর জ্বরের তীব্রতায় আদ্রিয়ানের শরীর রীতিমত কাঁপছে। মেঘ তার হাত নিয়ে রাখে আদ্রিয়ানের কপালে, কপাল স্পর্শ করার সাথে সাথে মেঘ ভয়ে তার হাত সরিয়ে নেয়।
মেঘ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে কারণ আদ্রিয়ানের শরীরে শুধু জ্বর আসেনি বরং জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তার। ফারহানা বেগম আর মিরাজ সাহেবের চিন্তার কারণ এখন সে বুঝতে পারছে, মেঘ তার হাত দিয়ে আবার আদ্রিয়ানের হাত, গলা স্পর্শ করে। শরীর আগুনের মতো গরম হয়ে গেছে, আদ্রিয়ানের শরীরে এখন যা জ্বর রয়েছে তাকে সত্যি হাসপাতালে এডমিট করা উচিত। কিন্তু এতো রাতে হাসপাতালে নিয়ে কি করে যাবে? ড্রাইভার নিশ্চয়ই বাড়ি চলে গেছে। মেঘ এখন কি করবে? জ্বরের তীব্র বেড়ে যদি খিচুড়ি শুরু হয়ে যায় তখন?
হঠাৎ করে আদ্রিয়ানের শরীরে এতো জ্বর কি করে আসল? নিশ্চয়ই তিনদিন আগে বৃষ্টিতে ভিজার কারণে এমন হয়েছে। মেঘ শান্ত হও, ভয় পেলে চলবে না। মেঘ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে, টেবিলে থাকা কয়েক পাতা ঔষধের দিকে তার চোখ যায়। মেঘ দ্রুত ঔষধ হাতে নিয়ে দেখতে থাকে এই ঔষধের পাওয়া একদম কম। সাধারণ নাপার মতো। এমন তীব্র জ্বরে এই ঔষধ খেলে কোন লাভ হবে না। আদ্রিয়ানের জন্য দরকার এখন এন্টিবায়োটিক ঔষধ। মেঘ টেবিল, আলমারি সহ সারা রুম খোঁজার পর ও আর কোনো ঔষধ পায়নি।
কাজের লোককে দিয়ে ফামার্সি দিয়ে ঔষধ কিনে নিয়ে আসতে হবে। মেঘ পাশে থাকা এক খাতার থেকে কাগজের কিছু অংশ ছিঁড়ে কলম দিয়ে সেখানে কিছু পরিচিত আর প্রয়োজনীয় ঔষধের নাম লিখে। এরপর দ্রুত ছুটে যায় নিচে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে কাজের লোকের রুমে যায়। রাত প্রায় দশটা বাজে কাজের লোকেরা সবাই দরজা লাগিয়ে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। মেঘ অনবরত দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে, কাজের লোক কিছু সময় পর দরজা খুলে বের হয়। এতো রাতে মেঘকে তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। মেঘ বলে
“ আদ্রিয়ান স্যারের শরীরে প্রচুর জ্বর উঠেছে। তুমি দারোয়ান বা ড্রাইভারকে দিয়ে এই ঔষধ গুলো নিয়ে আসার ব্যবস্থা কর। দ্রুত যা-ও “।
“ ওকে ম্যাম “।
মেঘ দ্রুত পায়ে আবার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। শরীর থেকে জ্বর কমাতে হলে শরীর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুছিয়ে দিতে হবে। মেঘ ওয়াশরুম থেকে বালিত করে পানি আসে, এরপর বালিত বিছানার কাছে রাখে। আদ্রিয়ানের পাশে বসে মেঘ তার শরীর মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে
“ আদ্রিয়ান স্যার বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসুন। আপনার শরীরে অনেক জ্বর পানি ঢালতে হবে “।
মেঘের কথা হয়ত আদ্রিয়ানের কানে পৌঁছায় না ঠিক মত, অতিরিক্ত জ্বরের প্রভাবে আদ্রিয়ানের সম্ভবত হুঁশ নাই। মেঘ অনেক সময় ধরে ডাকার পর ও আদ্রিয়ান চোখ খুলে তাকায় না। মেঘ আদ্রিয়ানের কাঁধে থাকা বালিশ বিছানার বা পাশে নিয়ে আসে, যেখানে পানির বালতি রাখা ছিল। এরপর কাঁধ থেকে বালিশ সরিয়ে দেয় বালিতে থেকে পানি ঢালে তার মাথায়। পানির বিন্দু বিন্দু কণা যখন আদ্রিয়ানের মাথা বেয়ে চোখে গড়িয়ে পড়ে হয়ত তখন একটু হুঁশ ফিরে আসে তার।
পিটপিট করে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকায় আদ্রিয়ান, জ্বরে তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আদ্রিয়ান দেখে মেঘ তার মাথার কাছে বসে পানি ঢালছে। মেঘ যখন দেখে আদ্রিয়ান চোখ খুলে তাকিয়েছে তখন মেঘ বলে
“ আদ্রিয়ান স্যার আপনার হুঁশ ফিরে এসেছে? আপনার কেমন লাগছে এখন? কাজের লোককে বলে ফার্মেসি থেকে ঔষধ আনতে বলেছি। আপনি খুব শীঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবেন “।
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে তার কণ্ঠে দিয়ে হয়ত কিছু শব্দ উচ্চারণ করার চেষ্টা করে
“ মে- ম — ঘ, মেঘ “।
“ হ্যাঁ বলুন আমি মেঘ। কিছু বলবেন আপনি? “
“ মেঘ তোমার রুমে ফিরে যাও তুমি। আমার সেবা করতে হবে না। আমি এমনি সুস্থ হয়ে যাব “।
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ অবাক হয়ে বলে
“ চলে যাব মানে? আপনার শরীরে ১০২ ডিগ্রি জ্বর অথচ আপনি বলছেন যে আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন? যতখন না আপনি সুস্থ হবেন, এই মেঘ কোথাও যাবে না “।
“মেঘ জেদ কর না যাও রুমে যাও, পড়াশোনা কর গিয়ে। আর রইল বাকি আমার কথা। আমি জ্বরে মারা গেলে ও কারো কিছু যায় আসে না মেঘ “।
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ হাসল, সত্যি কি কারো যায় আসে না তার মৃত্যুতে। তালুকদার পরিবারের সকলে কষ্ট পাবে আদ্রিয়ানের মৃত্যুতে, আর বেশি হয়ত পাবে মেঘ। হ্যাঁ মেঘ হয়ত আদ্রিয়ানের থেকে দূরে থাকতে চাই, কিন্তু সে পাষাণ নয়। একজন ডক্টর হয়ে অসুস্থ মানুষের সেবা করা তার কতৃব্য। আর যদি সেই অসুস্থ ব্যক্তি তার স্বামী হয় তবে তো দায়িত্ব পরিমাণ দিগুণ হয়ে যায়। আদ্রিয়ান হয়ত মেঘকে স্ত্রী হিসাবে মানে না, কিন্তু সত্যি এইটা যে মেঘ তার বউ। আদ্রিয়ান মেঘের স্বামী, নিজের স্বামীকে এমন অসুস্থ অবস্থায় রেখে মেঘ কিছুতে শান্তি পাবে না। আদ্রিয়ান যদি মারা যায় তবে মেঘ বিধবা হয়ে যাবে। কোন নারী বিধবা হতে চাই না মেঘ ও হয়ত চাই না। কিন্তু আদ্রিয়ানকে সে এইসব কথা বলে না মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আমি একজন ডক্টর। ডক্টর হয়ে রোগীর সেবা করা আমার কর্তৃব্য “।
আদ্রিয়ান মেঘকে আর কিছু বলতে যাবে, তকর আগেই কাজের মহিলা এসে দরজায় কড়া নাড়ে। কাজের মহিলা বলে
” মেঘ ম্যাম এই যে ঔষধ নিয়ে এসেছি ”।
মেঘ দ্রত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এরপর কাজের মহিলার থেকে ঔষধ নেয়। মেঘ বলে
” আচ্ছা তুমি এখন রুমে গিয়ে বিশ্রাম কর। আমি আদ্রিয়ান স্যারকে ঔষধ খায়িয়ে দিব ”।
কাজের মহিলা চলে যায়, মেঘ টেবিল থেকে পানি নিয়ে আসে। মেঘ বলে
” আদ্রিয়ান স্যার উঠুন ঔষধ খেতে হবে ”।
আদ্রিয়ান উঠার চেষ্টা করল কিন্তু তার শক্তি হয়ে উঠল না। মেঘ বাধ্য হয়ে বিছানায় বসে এরপর আদ্রিয়ানের মাথা তার কোলের উপর নিয়ে আসে। তার মুখে ঔষধ গুঁজে দেয় হাতে থাকা পানির গ্লাস থেকে মাথা উঁচু করে পানি খায়িয়ে দেয়। আদ্রিয়ানের এতোখন হুঁশ থাকলে এখন আবার জ্বরের কারণে শরীর নেতিয়ে পড়েছে। আদ্রিয়ান মেঘের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে, মেঘ তার হাত নিয়ে রাখে আদ্রিয়ানের চুলের ভাঁজে। সেখানে আলতো হাত বুলিয়ে দেয়। আদ্রিয়ান ঘুমিয়ে পড়ে।
মাঝ রাতে যখন আদ্রিয়ান ঘুমের ঘোরে অন্য পাশ ঘুরে তখন মেঘের কোলে মাথা রাখার ফলে। তার ঠোঁট মেঘের পেট স্পর্শ করে মেঘ তখন সজাগ ছিল। আদ্রিয়ান মুখ গুঁজে মেঘের পেটে, আকস্মিক এমন ছোঁয়ায় মেঘের সারা শরীর কেঁপে উঠে। মেঘ বিছানার চাদর শক্ত করে চেপে ধরে রাখে আর অন্য হাতে আদ্রিয়ানের চুল খামছে ধরে।
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৩
আদ্রিয়ান মেঘের কোমড় জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে দেয় মেঘের পেটে। এরপর ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়। মেঘ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে এরপর সে ও বেডে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
